বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব "


২৭

 অনেকক্ষণ নির্বাক অপেক্ষার পর মহামন্ত্রী বিমোহন অস্ফুট স্বরে বললেন, “আমার ধারণা আমরা সকলেই এখন তাঁর আবাহনের জন্য প্রস্তুত। আমাদের মনে যেটুকু দ্বিধার কুয়াশা ছিল, সে সব কেটে গেছে! আপনি আমাদের এখন কী নির্দেশ করবেন, মহর্ষি?”

মন্ত্রীসভার বাকি মন্ত্রীমণ্ডলীও একবাক্যে বলে উঠল, “আমরা প্রস্তুত, মহর্ষি। আপনি আদেশ করুন আমাদের এখন কী কর্তব্য!”

মহর্ষি ভৃগু গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করলেন, “চারমাস নিদ্রার পর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জাগরণ হয় যে তিথিতে, সেই প্রবোধিনী একাদশী তিথিতে আমরা তাঁকে এবং মাতা লক্ষ্মীকে বরণ করবো। তার চারদিন পর, পুণ্য কার্তিকী পূর্ণিমায় হবে তাঁর রাজ্য অভিষেক। কার্তিকী পূর্ণিমার মতো শুভ তিথি, সম্বৎসরে স্বল্পই আছে, কিন্তু এই বর্ষে পূর্ণিমার চন্দ্রক্ষেত্রে রোহিণী নক্ষত্রের অবস্থানের জন্য, ওই তিথির মহিমা আরও শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীবিষ্ণু ভগবানেরও ওই দিনটিতেই প্রকট হবার বাসনা!”

মহামন্ত্রী বিমোহন জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার এই বিশ্বাসের কারণ কী, মহর্ষি?”

মহর্ষি ভৃগু অদ্ভূত এক আবেগ নিয়ে বললেন, “তাই যদি না হবে, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, এই সময়েই কেন একের পর তাঁর অবতরণের অনুকূল ঘটনা ঘটে চলেছে! রাজাবেণের অসুস্থ হওয়া! অজানা সেই তপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী, তাঁর প্রভাবে রাজ্যময় চারণদলের গান! মহারাণি সুনীথার রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি চাওয়া! আমার ধারণা... না, না ধারণা নয়, বিশ্বাস – তিনি এইভাবেই তাঁর আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন!”

মন্ত্রীমণ্ডলী সকলেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, করজোড়ে সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

তাঁদের উচ্ছ্বাস দেখে মহামন্ত্রী বিমোহন মনে মনে বিরক্ত হলেন, কিন্তু বিরক্তি গোপন করে বললেন, “তিনি স্বয়ং যখন আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আমাদের আর কী করণীয় আছে? তাঁর নির্দিষ্ট সময়েই তিনি নিজেই অবতীর্ণ হবেন”!

মহর্ষি ভৃগু কখনো বিরক্ত হন না, অথবা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করেন না। কিন্তু এখন তিনি স্পষ্টতঃই বিরক্তির স্বরে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, আপনার মুখে এ কথা শোভা পায় না!  আপনিও কি রাজা বেণের প্রভাবে অধর্মে বিশ্বাসী হলেন? আপনি বৃদ্ধ, আপনি প্রজ্ঞাবান্‌ - আপনি কি জানেন না, ঈশ্বরের অবতারকেও আবাহন করে আনতে হয়?  আর্তজনের আগ্রহেই তিনি ধরিত্রীতে অবতীর্ণ হন। ভক্তদের আন্তরিক ও একনিষ্ঠ আরাধনায় বিচলিত হয়েই তিনি এর আগেও  এসেছেন, - চরম বিপন্ন সাহায্যপ্রার্থী দেবতা এবং নরকুলকে রক্ষা করতে! মৎস্য, বরাহ, নৃসিংহ ও কূর্মরূপে এসেছেন, এর পরেও বারবার আসবেন! কিন্তু আমাদের তো তাঁর কাছে আকুল প্রার্থনা জানাতেই হবে!”

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে সন্দেহের দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁরা আবারও সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

মন্ত্রীমণ্ডলীতে সকলের মনোভাব এবং মহর্ষি ভৃগুর বিরক্তি উপলব্ধি করে, মহামন্ত্রী বিমোহন নিজেকে সমর্পণ করে বললেন, “হে মহর্ষি, বিজ্ঞজনেরা বলেন, যে কোন তত্ত্ব বিশ্বাস করার আগে, অন্তর থেকে সকল সংশয় দূর হওয়া উচিৎ! আমার কৌতূহলে যদি আপনার বিরক্তির উদ্রেক হয়ে থাকে, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। কিন্তু, এখন আমার মনে আর কোন দ্বিধা নেই, আপনি নির্দেশ করুন, এখন আমাদের কী করণীয়!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাণি সুনীথাকে অবিলম্বে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। মন্ত্রীমণ্ডলীর এই সিদ্ধান্তের কথা আমি আজই মহারাণিকে অবহিত করাব। মহারাণি এই প্রাসাদ-পরিসরের মধ্যে থাকলে, রাজ্যের সমস্যার কথা তাঁর কর্ণগোচর হতেই থাকবে। অতএব আমার প্রস্তাব, মহারাণি সুনীথা সপুত্র নবনির্মিত উদ্যান বাটিকায় গিয়ে অবস্থান করুন। তাঁদের নিরাপত্তা, যাবতীয় সুখসুবিধা এবং সুচিকিৎসার এতটুকু অবহেলাও, সেখানে যেন না হয়, সেদিকে আপনাদের দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করবো”।

মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “কিন্তু মহারাণি প্রাসাদ ছাড়তে সম্মত হবেন কি?”

জলদগম্ভীর স্বরে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সে দায়িত্ব আমার, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! উদ্যান বাটিকাকে মহারাণি ও রাজার বাসযোগ্য করে তুলতে আপনাদের কতদিন লাগবে, বৎস বৃষভান্‌?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “তিন থেকে চারদিনের মধ্যে সকল আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফেলতে পারবো, মহর্ষি”।

“অতি উত্তম। মহারাণি সুনীথা এবং অসুস্থ রাজা বেণকে বহন করার মতো অশ্বশকটের আয়োজন করতেও ভুলবেন না। আচ্ছা, ওখানে রাজবৈদ্য এবং সেবিকাদের বাসের উপযুক্ত কক্ষ রয়েছে তো?”

“কক্ষের কোন অভাব নেই, মহর্ষি, কোন আয়োজনেরই কোন ত্রুটি হবে না”।

“নিশ্চিন্ত হলাম, বৎস। এদিকে এই প্রাসাদে রাজ অভিষেকের আয়োজন শুরু করুন। বন্ধু এবং শত্রু নির্বিশেষে ভারতভূমির সকল রাজাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। এই নগরের সকল ব্রাহ্মণ, বণিক ও সম্ভ্রান্ত প্রজাদের আমন্ত্রণ করবেন। রাজা বেণের অভিষেক আয়োজনের থেকেও এই অনুষ্ঠানকে অনেক বেশি আড়ম্বরপূর্ণ করে তুলতে হবে, এ কথা সর্বদা মনে রাখবেন। অর্থীদের দানের জন্য পর্যাপ্ত সবৎসা গাভী, সুবর্ণমুদ্রা, শস্য সংগ্রহ শুরু করুন”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই মহর্ষি ভৃগুর নির্দেশে সম্মত হয়ে বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত হোন, মহর্ষি, মহারাজ পৃথুর অভিষেক আয়োজনে কোন ত্রুটি হবে না। কিন্তু প্রবোধিনী একাদশীর অনুষ্ঠান? ওইদিনই তো মহারাজ পৃথু ও তাঁর পত্নী মহারাণি অর্চ্চির আবির্ভাব হবে!”

“সে আয়োজনের সকল দায়িত্ব আমার! কতিপয় ঘনিষ্ঠ পুণ্যাত্মা ছাড়া ওই যজ্ঞ অনুষ্ঠানে কেউ উপস্থিত থাকবেন না। যেই যজ্ঞে কারা উপস্থিত থাকবেন সে আমি আপনাদের জানিয়ে দেবো। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আবির্ভাব হবে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর আড়ালে, সেখানে কোন অবহেলা যেন না হয়!”

“হবে না, মহর্ষি!”

“অতি উত্তম। আমি নিশ্চিন্ত হলাম”। একটু বিরতির পর, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভোজনের কোন আয়োজন নেই?”

“অবশ্যই থাকবে, মহর্ষি”!

মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে বললেন, “ওঃ। আমি অভিষেকের ভোজনের কথা বলছি না, বৎসগণ, আজকের কথা বলছি। মধ্যাহ্ন বহুক্ষণ অতিক্রান্ত, আপনারা কি ক্ষুধামান্দ্যে ভুগছেন? এখনো ভোজনের আয়োজন করছেন না!”

মহর্ষির কথায় প্রথমে সকলেই হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন, তারপর সকলেই হাসতে হাসতে বললেন, “এতক্ষণ আপনারই অনুমতির অপেক্ষা করছিলাম, মহর্ষি। সে আয়োজনও প্রস্তুত”! 


চলবে...







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...