ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের ষষ্ঠ পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/৬ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
৪.৪.৩ গুপ্তবংশের অন্যান্য রাজা
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর
পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত (৪১৫–৪৫৫ সি.ই.)। তাঁর উপাধি ছিল মহেন্দ্রাদিত্য।
কুমারগুপ্ত ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় রানি ধ্রুবদেবীর পুত্র। তিনি দীর্ঘদিন
রাজত্ব করলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অতএব ধরে নেওয়া যায় তাঁর সময়
বড়োসড়ো যুদ্ধ-বিগ্রহ তেমন কিছু ঘটেনি, যদিও তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন
করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই, মধ্য এশিয়ায়
ঘনিয়ে উঠল গুপ্তসাম্রাজ্যের বিপদের মেঘ।
হুন নামে এক যাযাবর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়ার
ব্যাকট্রিয়া অধিকার করে ফেলল। এই হুনদের দুটি গোষ্ঠীর কথা ইতিহাসে শোনা যায়, শ্বেতহুন
এবং পীতহুন। শ্বেতহুনদের আক্রমণে রোম শহর এবং সাম্রাজ্যের পতন এবং ধ্বংস হয়েছিল।
এই শ্বেতহুনদের নেতা বা রাজা ছিল অ্যাটিলা। অন্যদিকে পীতহুনরা ভয়ংকর বন্যার মতো
এগিয়ে আসতে লাগল উত্তরপশ্চিম ভারতের গিরিপথে। এই হুনজাতি ছিল দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার
এবং যোদ্ধা, তাদের
নৃশংসতার কথা বিশ্বের ইতিহাস মনে রেখেছে।
কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত রাজা হলেন
৪৫৫ সি.ই.-তে এবং রাজা হয়েই তাঁকে হুনদের সম্মুখীন হতে হল। প্রথমদিকে স্কন্দগুপ্ত
হুনদের আক্রমণ শক্ত হাতেই প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু হুনদের ঘনঘন এবং বারবার
আক্রমণে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তাঁর রাজত্বের অধিকাংশ সময়ই কাটতে
লাগল সীমান্ত অঞ্চলে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হুণদের সামলাতে। রাজধানীতে তাঁর দীর্ঘ
অনুপস্থিতিতে, দুর্বল
হতে লাগল গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বেড়ে উঠতে লাগল রাজধানী এবং
রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ল, যার প্রমাণ
পাওয়া যায় এই সময়ের তাঁদের মুদ্রার অবনতি দেখে। ৪৬৭ সি.ই. পর্যন্ত তিনি হুনদের
ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন,
কিন্তু ওই সময় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন শুরু হল
দ্রুতগতিতে। স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী গুপ্তরাজাদের কথা তেমন স্পষ্টভাবে জানা যায় না।
তবে পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে হুনদের ভয়ংকর আক্রমণে গুপ্তরাজাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে
পড়ল এবং হুনরা ঢুকে পড়ল উত্তরভারতে। এর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই গুপ্তসাম্রাজ্য মুছে
গিয়ে, দেশজুড়ে
গড়ে উঠল ছোট ছোট রাজ্য।
প্রথম যে হুন রাজার নাম ভারতের ইতিহাসে পাওয়া যায়
তাঁর নাম তোরমান, তাঁর
রাজ্য ছিল পশ্চিমে পারস্য থেকে খোটান এবং তাঁর রাজধানী ছিল আফগানিস্তানের
বামিয়ানে। এই তোরমান উত্তরভারতে এবং মধ্য ভারতের এরান (মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার
প্রাচীন শহর) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তোরমানের পুত্র
মিহিরকুলও (৫২০ সি.ই.) হুনদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন।
সমসাময়িক এক চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, মিহিরকুল
ছিলেন অভদ্র এবং বদমেজাজী। তিনি মূর্তিপূজা বিরোধী এবং তীব্র বৌদ্ধ বিরোধী ছিলেন।
তিনি অনেক বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেছিলেন। তবে
দ্বাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কলহন তাঁর “রাজতরঙ্গিণী” গ্রন্থে লিখেছেন, লোভী
ব্রাহ্মণরা নাকি হুনদের থেকে প্রচুর জমি দান হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।
যাই হোক, মধ্য ভারতের সমসাময়িক শিলালেখ থেকে
জানা যায় পরবর্তী গুপ্ত রাজারা কিন্তু তখনও হুনদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে, আবার
আক্রমণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আক্রমণে মিহিরকুল পরাস্ত হন
এবং ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলের অধিকার ছেড়ে, কাশ্মীরের ছোট এক রাজ্যে স্থিতু
হয়েছিলেন, এবং
সেখানেই ৫৪২ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই হুনদের দাপট অনেকটাই
স্তিমিত হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হুনদের নতুন নতুন গোষ্ঠী
ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে একটানা অশান্তির সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। এই সময়েই হুণদের
ব্যাকট্রিয়া থেকে উৎখাত করল তুর্কি এবং পারস্যের সাসানিয়ানরা। পরবর্তী কালে
তুর্কিরা পারস্যও জয় করে নিল। এর ফলে উত্তরভারত হুনদের থেকে পরিত্রাণ পেল ঠিকই, কিন্তু
আক্রমণের নতুন মেঘ আবার ঘনিয়ে উঠতে লাগল উত্তর-পশ্চিম আকাশে। এর কয়েকশ বছর পর থেকে
ভারত টের পাবে, তুর্কিদের
প্রবল আক্রমণের ক্রমাগত ধাক্কা।
৪.৪.৪ গুপ্ত রাজাদের ধর্ম
গুপ্তবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম
চন্দ্রগুপ্তর মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবী মূর্তির চিত্র মুদ্রিত ছিল। হতে পারে তিনি
হয়তো লিচ্ছবি-রাণি কুমারদেবীর প্রভাবে সিংবাহিনীদেবীর ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। অতএব
মাতৃকা দেবী হিসেবে “সিংহবাহিনী দেবী” ততদিনে পূজিত হচ্ছেন। সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে
“পরমভাগবত” বলে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন “পরমভাগবত”। তবে
গুপ্তরাজাদের কেউই পরধর্মে বিদ্বেষী ছিলেন না। শিলালিপিগুলি থেকে জানা যায় দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্তের দুই উচ্চপর্যায়ের আধিকারিক সাব-বীরসেনা শৈব ছিলেন এবং আম্রকারদাব
ছিলেন বৌদ্ধ। রাজা কুমারগুপ্ত ছিলেন কার্তিকেয়র উপাসক। অনুমান করা যায় এই কারণেই
তাঁর প্রিয় পুত্রেরও নাম রেখেছিলেন স্কন্দ, কার্তিকেয়র আরেকটি নাম। তাঁর
রাজত্বকালে তিনি বেশ কিছু বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, সূর্য, শিব, বিষ্ণু এবং কার্তিকেয়র মূর্তি
প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। অতএব তিনিও গুপ্ত পরম্পরা অনুযায়ী ধর্ম-সহিষ্ণু ছিলেন।
অর্থাৎ সমসাময়িক সব কটি ধর্মীয় বিশ্বাসকেই তিনি যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন। গুপ্ত
সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট স্কন্দগুপ্ত বৈষ্ণব ছিলেন।
৪.৪.৫ গুপ্ত পরবর্তী পর্যায় ও হর্ষবর্ধন
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতাব্দীর শুরু
পর্যন্ত উত্তর ভারতে চারটি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব ছিল। তাঁরা হলেন, মগধের গুপ্ত
(অনেক ঐতিহাসিক এই গুপ্তদের গুপ্তবংশেরই উত্তরসূরি বলেন, অনেকে বলেন
এঁরা আলাদা বংশ), কনৌজের
মৌখরি, থানেশ্বরের
পূষ্যভূতি এবং বল্লভির মৈত্রক। পূষ্যভূতি বংশের থানেশ্বর ছিল দিল্লির উত্তরে, এখনকার
হরিয়ানা অঞ্চলে। মৌখরি বংশের সঙ্গে পূষ্যভূতিদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল এবং দুই
বংশের বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। যার ফলে মৌখরি বংশের শেষ রাজার মৃত্যুর পর
মৌখরিদের রাজ্য কনৌজ পূষ্যভূতিদের অধিকারে চলে এসেছিল। অন্যদিকে মৈত্রকরা ছিলেন
সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের গুপ্তরাজাদের প্রশাসনিক প্রধান। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর
তাঁরা স্বাধীন হয়ে ওই অঞ্চলেই নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁদের
রাজধানী ছিল বল্লভিতে (আধুনিক ভাবনগর শহরের কাছাকাছি)। একসময় এই বল্লভি নগর
বাণিজ্য এবং শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি রাজ্য ছাড়াও
উড়িষ্যা, আসাম
এবং আরো অনেক অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্যও গড়ে উঠেছিল। এই সব রাজ্যগুলির মধ্যে একমাত্র
মৈত্রক বংশই দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরব
উপজাতিদের আক্রমণের ফলে,
বল্লভি রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছিল।
পূষ্যভূতি বংশের প্রথম শক্তিশালী রাজার নাম পাওয়া
যায় প্রভাকরবর্ধন। বাণভট্টের হর্ষচরিতে, তাঁর বীরত্বের অতিরঞ্জিত বর্ণনা
পাওয়া গেলেও, তাঁর
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন, তাঁর ছেলে হর্ষবর্ধন। সাধারণতঃ তিনি
হর্ষ নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত।
৪.৪.৬ সম্রাট হর্ষবর্ধন
হর্ষের রাজত্বকালের শুরু ৬০৬ সি.ই.-তে। তাঁর
ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কবি বাণভট্ট “হর্ষ-চরিত” নামে তাঁর জীবনী রচনা করেছিলেন। ভারতের
ইতিহাসে কোন রাজার জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থই প্রথম। এর পরের রাজাদের মধ্যে এরকম
জীবন-চরিত রচনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বললেও কম বলা হয়। কিন্তু তাদের তুলনায়, ঐতিহাসিক
অতিরঞ্জন থাকলেও, কাব্য
গুণে “হর্ষচরিত” সবার উপরে।
হর্ষ একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং এই
পর্যায়ে তিনি অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য জয় করে নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে পেরেছিলেন।
যেমন, জলন্ধর
(পাঞ্জাব), কাশ্মীর, নেপাল এবং
বল্লভি রাজ্যেরও কিছুটা। পূর্বদিকে বঙ্গের রাজা শশাঙ্ক তাঁর চিরশত্রু ছিল এবং
দক্ষিণেও তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি। দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমে চালুক্যবংশীয়
দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং এর পর দক্ষিণ জয়ের চেষ্টা তিনি
ছেড়েই দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজধানী থানেশ্বর থেকে সরিয়ে কনৌজে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর
কারণ হয়তো অনেকগুলি,
প্রথমতঃ উত্তর-পশ্চিমের উপজাতিগোষ্ঠীগুলির বারবার আক্রমণ এড়ানো। দ্বিতীয়তঃ
কনৌজ থানেশ্বরের তুলনায় কৃষি উৎপাদনে অনেক বেশি উর্বর। এবং হয়তো সবথেকে
গুরুত্বপূর্ণ হল - কনৌজ থেকে তাঁর সাম্রাজ্যের চারদিকেই স্থলপথে এবং জলপথের
যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনেক প্রাচীন এবং উন্নত।
যুদ্ধ-বিগ্রহ না থাকলে হর্ষ তাঁর সাম্রাজ্যের
বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় এবং কর আদায়ের
ব্যাপারেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তিনি অনেকসময় সরাসরি সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে কথা
বলতেন এবং তাদের অভিযোগ মন দিয়ে শুনতেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতেন, কখনো কখনো
তিনি দুঃস্থ প্রজাদের দানও করতেন। শোনা যায় পাঁচ বছর অন্তর তিনি একটি ধর্ম-উৎসবের
আয়োজন করতেন, এবং
সেখানে অজস্র দান করতেন। তাঁর রাজত্বকালে (৬৪৩ সি.ই.-তে) কনৌজ শহরে একটি বৌদ্ধ
সম্মেলনের তিনিই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
এত ব্যস্ততার মধ্যেও শোনা যায় তিনি নাকি তিনটি
নাটকের রচয়িতা। তার মধ্যে দুটি নাটক প্রথাগত মিলনান্ত নাটক এবং একটি বুদ্ধের
তত্ত্ব নিয়ে চিন্তামূলক নাটক। যদিও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, তাঁরা বলেন
এই নাটকগুলি হয়তো তাঁর লেখা নয়, তাঁর নামে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর কোন ভক্ত নাট্যকার। যাই হোক, এর থেকে
এটুকু স্পষ্ট ধারণা করা যায়, তিনি সাহিত্য এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং উৎসাহীও
ছিলেন।
হর্ষের রাজত্বের অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, বাণভট্ট
রচিত “হর্ষচরিত” থেকে। হর্ষচরিতে বেশ কিছুটা কাব্যিক অতিরঞ্জন থাকলেও, সমসাময়িক
বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার হদিশ পাওয়া যায়। হর্ষচরিতের থেকেও সমসাময়িক ঘটনার
নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত এক চৈনিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে।
তিনি হলেন হুয়েনসাং বা জুয়ানজুয়াং। হুয়েনসাং অত্যন্ত পণ্ডিত এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন।
তাঁর সম্বন্ধে জানা যায়,
তিনি চীনের এক মান্দারিন পরিবারের ছেলে এবং প্রথম জীবনে কনফুসিয়াসের ভক্ত
ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন শুধুমাত্র তীর্থ ভ্রমণের জন্য নয়, বরং বৌদ্ধ
শাস্ত্র পড়তে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করতে। তাঁর লিখিত বিবরণ, তাঁর
পূর্ববর্তী চৈনিক সন্ন্যাসী ফাহিয়েনের মতো, একপেশে বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা
নয়।
হর্ষের রাজত্বের শেষ দিকের ঘটনাগুলিও চৈনিক বিবরণ
থেকেই জানা যায়। হর্ষের সমসাময়িক চীনের তাং সাম্রাজ্যের সম্রাট তাই সুং, হর্ষের
রাজসভায় দুবার রাজদূত পাঠিয়েছিলেন - একবার ৬৪৩ সি.ই.তে আরেকবার ৬৪৭ সি.ই.তে।
কিন্তু দ্বিতীয় রাজদূত কনৌজে এসে পৌঁছোনোর কিছুদিন আগেই হর্ষের মৃত্যু হয়েছিল। সে
সময় তাঁর সিংহাসন অধিকার করেছিলেন কোন এক অযোগ্য এবং অপদার্থ রাজা। হর্ষের
গুণমুগ্ধ সেই চৈনিক রাজদূত এই অনাচার সহ্য করতে না পেরে, নেপাল এবং
আসামে গিয়েছিলেন, সামরিক
সাহায্য এবং সৈন্যসংগ্রহ করতে। নেপাল ও আসাম ছিল হর্ষের মিত্র রাজ্য। এই মিলিত
শক্তি দিয়ে তিনি সেই অপদার্থ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে পেরেছিলেন এবং রাজাকে বন্দী
করে নিয়ে গিয়েছিলেন চীনে।
যাই হোক হর্ষের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য
অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এবং অষ্টম শতাব্দীতে কনৌজ অধিকার করে
নিয়েছিলেন রাজা ললিতাদিত্য।
৪.৪.৬.১ হর্ষের ধর্ম
শোনা যায় হর্ষের পিতা ও পূর্বপুরুষেরা সূর্যের
উপাসক ছিলেন, কিন্তু
হর্ষ ছিলেন পরম শৈব। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর ভগ্নী রাজ্যশ্রীর প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ
ধর্মে দীক্ষা নেন। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষার পর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন
এবং তাঁর সাম্রাজ্য জুড়ে অনেক বৌদ্ধ বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন।
৪.৪.৭ সামাজিক পরিবর্তন - সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা
এর আগে মৌর্য যুগের পর থেকে খ্রিষ্টিয় প্রথম
দুই-তিন শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি
এবং ধর্মীয় পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা করেছিলাম। ভারত ইতিহাসের পরবর্তী
পর্যায়ে যাবার আগে, ভারতের
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও একবার আলোচনা করে নেওয়া যাক। কারণ গুপ্ত যুগের শুরু
থেকে হর্ষ-যুগের শেষ পর্যন্ত – প্রায় চারশ বছর মূল ভারত ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চলই
সুশাসনে বেশ স্থিতাবস্থার মধ্যেই ছিল। তাছাড়া এই পর্যায়ে ইতিহাস রচনার উপাদানের
এতই প্রাচুর্য যে তার থেকে সমসাময়িক ভারতের সামগ্রিক রূপটি বেশ সহজেই ধারণা করা
যায়।
৪.৪.৮.১ পোষাক আশাক ও ফ্যাসান
সেকালের পুরুষেরা নিম্নাঙ্গে পরতেন ধুতি এবং গায়ে
উত্তরীয়। ধুতি পরার নানান ধরণ ছিল, উত্তর ভারতে ধুতির কাছা ছিল আবশ্যিক
এবং দক্ষিণে কোমরে জড়িয়ে রাখার নিয়ম। দরিদ্র বা সাধারণ গ্রাম্য মানুষের সাদা ধুতি
হাঁটু অব্দি লম্বা হত,
ধনী, সম্পন্ন
এবং রাজা-রাজড়াদের হত গোড়ালি পর্যন্ত। ধনী ব্যক্তিরা নানান রঙের ধুতি পরতেন, যেমন নন্দ
রাজপুত্র শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই পীতাম্বর পরতেন। স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ মানুষের ধুতি
সুতির হলেও, ধনীদের
রেশম, মসলিন
বা উত্তম সূতির বস্ত্রই পরিধেয় ছিল। পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস পরার প্রচলন ছিল না।
শীতকালে পুরুষেরা গায়ে জড়াত পশমের বা মোটা সুতোর চাদর। তবে হিমালয়ের কাছাকাছি এবং
শীতপ্রধান অঞ্চলে, পশমের
জ্যাকেট যার নাম ছিল “প্রাবার”-এর প্রচলন ছিল। পুরুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও
সন্ন্যাসীরা মাথা মুড়িয়ে ফেলতেন, অবিশ্যি ব্রাহ্মণদের মাথার পিছনে একগুচ্ছ টিকি বা শিখা
থাকত। তবে সাধারণ সম্পন্ন গৃহস্থ যুবকেরা তৈলাক্ত ও পরিপাটি লম্বা চুল রাখতেই
পছন্দ করত। সম্পন্ন পুরুষদের মধ্যে সোনার অলংকার পরারও যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কানে
কুণ্ডল, আঙুলে
আংটি বা উর্ধবাহুতে অঙ্গদ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অলংকার সাধারণতঃ সোনা বা রূপোর এবং
সঙ্গে থাকত নানান ধরণের দামি পাথর বা রত্ন।
| যক্ষিণী মূর্তি, ১৪৫০ সি.ই. রাজস্থান |
মেয়েদের প্রধান পোশাক ছিল শাড়ি। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী মোটা সুতি, দুকূল, রেশম বা মসলিনের শাড়ির প্রচলন ছিল সর্বাধিক। তবে পশ্চিম এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের সীমিত অঞ্চলে, মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের প্রভাবে মেয়েরা ঘাঘরা এবং চোলি ব্যবহার করত। শহরের উচ্চবিত্ত মহিলাদের মধ্যে অন্তর্বাসের প্রচলন ছিল। নর্তকী এবং বারাঙ্গনারা দামি রেশম বা মসলিনের অর্ধস্বচ্ছ শাড়ি পরত এবং বক্ষে বাঁধত কঞ্চুক বা কাঁচুলি। সাধারণ জনসমাজে মহিলাদের অন্তর্বাস পরার কোন প্রচলন ছিল না। সাধ্য অনুযায়ী সুতি বা পশমের চাদরই ছিল মহিলাদের শীত নিবারণের উপায়।
মেয়েদের অলংকারের কোন সীমা ছিল না। আর্থিক অবস্থা
অনুযায়ী অলংকারের বহুল প্রচলন ছিল। মাথার
খোঁপায়, সিঁথিতে, অথবা চুলের
বেণীতে সোনা এবং রূপার বিচিত্র অলংকারের ব্যবহার ছিল। তেমনি ছিল, নাকে, কানে, আঙুলের আংটি, হাতের বালা, বাজুবন্ধ, বাহুবন্ধ, অজস্র ধরনের
কণ্ঠহার, কোমরের
অলংকার এবং নিতম্বসজ্জার অলংকার, তাছাড়া পায়েরও নানান অলংকার। তবে সাধারণতঃ পায়ের পাতা বা
গোছে সোনার অলংকার ব্যবহার হত না, রূপো বা পেতলের নূপুর, মল, চুটকি ব্যবহার হত। অত্যন্ত মহার্ঘ
এবং মর্যাদার ধাতু হিসেবে সোনার সম্মান ছিল রূপোর অনেক উপরে। সোনার অলংকারের সঙ্গে
বহুল ব্যবহৃত হত নানা ধরনের দামি পাথর, মণি এবং মুক্তা। সোনার অলংকার ছাড়াও
ফুলের মালা দিয়ে অঙ্গসজ্জার প্রচলন ছিল, ফুলের মালা জড়িয়ে রাখা হত, মাথার
খোঁপায় বা মুক্ত বেণীতে।
মেয়েদের অঙ্গরাগ বা প্রসাধনের মধ্যে ছিল চন্দন, সিঁদুর, কাজল বা
অঞ্জন, কুমকুম, গোরোচনা, পুষ্পরেণু।
চন্দনের প্রলেপ সারা গায়েই মাখা হত, তার সুগন্ধের জন্যে এবং
গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শরীরকে শীতল রাখতে। সিঁদুর ও কুমকুমের টিপ কপালে পরা হত।
পূর্বভারতীয় মেয়েদের মধ্যে কাঁচপোকা[1]-র টিপ পরারও
বহুল প্রচলন ছিল। চোখের পল্লবে এবং কোলে
গভীর কাজলরেখায় অঙ্কিত কটাক্ষ-বাণ পুরুষ-হৃদয় ভেদ করার মোক্ষম উপায় ছিল। হলুদ
গোরোচনা[2] কণিকার
বিন্দু দিয়ে সাজিয়ে তোলা হত চিবুক এবং দুই গাল। ফুলের সৌরভময় পরাগ-রেণুতেও মহিলারা
রাঙিয়ে তুলতেন
চিবুক, গাল, ও গ্রীবা।
হাত ও পায়ের আঙুলগুলি অলক্তক বা আলতার রঙে রাঙিয়ে তুলত মেয়েরা। এই আলতা ছিল এক
ধরনের গাছের লালরস। ঠোঁট রাঙিয়ে তুলত তাম্বুল অর্থাৎ পান-খয়েরের রসে। নর্তকী এবং
বারাঙ্গনা সুন্দরীরা দুধের সঙ্গে আলতা মিশিয়ে, গোলাপি আভায় সাজিয়ে তুলতেন তাঁদের
পীন পয়োধর এবং গুরু নিতম্ব।
৪.৪.৮.২ খাদ্য ও পানীয়
প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বৈদিক যুগ পর্যন্ত
মাংস খাওয়ার বহুল প্রচলন ছিল। এই মাংসের মধ্যে গৃহপালিত সকল পশু, এমনকি
জঙ্গলের পশু, নানা
ধরনের পাখি এবং মাছেরও প্রচলন ছিল। নিরামিষ আহারের প্রবণতা বেড়েছে বৌদ্ধ ও জৈন
ধর্মের প্রভাব থেকে এবং অবশ্যই সম্রাট অশোকের সময়ে। তিনি প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ
ঘোষণা করেছিলেন, সেকথা
আগেই বলেছি। যদিও “অর্থশাস্ত্র”-এ প্রাণীহত্যা এবং নগরের কসাইখানাগুলির বিশুদ্ধতা
রক্ষার জন্যে নিয়মিত নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। মহাযানীয় বৌদ্ধ ধর্ম এবং
পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম প্রচলনের সময় থেকে নিরামিষ আহারের প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বেড়ে
গিয়েছিল।
প্রধান খাদ্যে আজকের ভারতীয় খাবারের থেকে খুব
একটা পার্থক্য দেখা যায় না। ভাত এবং গম, যব কিংবা জোয়ারের রুটি, নানান ধরনের
ডাল, সব্জিই
প্রধান খাদ্য ছিল। তার সঙ্গে ছিল নানা ধরনের তেল এবং অবশ্যই ঘি, দুধ, দই, মাখন। ফল
এবং মিষ্টান্নও ছিল বহুবিধ। যে যে মশলা প্রধানতঃ বিদেশে রপ্তানি হত, যেমন
গোলমরিচ, তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জয়িত্রি, জায়ফল ছাড়াও
হলুদ, ধনে, জিরে, সরষে, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের
ব্যবহার প্রচলিত ছিল। যদিও বৌদ্ধ মহাযানী এবং হিন্দু ধর্মের সময় পেঁয়াজ, রসুন
ব্যবহারে কিছুটা লাগাম পড়েছিল।
প্রাচীন এবং বৈদিক যুগে মদ্যপানের বহুল প্রচলন
ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞের আয়োজনে সোমরস পানের রীতি আবশ্যিক ছিল এবং দেবরাজ
ইন্দ্র যে মাত্রাতিরিক্ত সোম পান করতেন, সে কথাও জানা যাবে এই গ্রন্থের পঞ্চম ও শেষ পর্বে।
বৌদ্ধধর্মে মদ্যপানকে পাপ বলা হয়েছে। তবে অর্থশাস্ত্র বিভিন্ন ধরনের মদ্যের বিবরণ
দিয়ে বলেছেন, সরকারি
পরিশ্রুতাগারেই মদ্য প্রস্তুত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার কারণ তিনটি – মদ্যের শুদ্ধতা
রক্ষা, মদ্যপানের
নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি রাজস্ব আদায়। এই মদ্যের মধ্যে ছিল চাল থেকে বানানো মদ্য
“মেদক”, ময়দা
থেকে বানানো, “প্রসন্না”, বেল থেকে
বানানো “আসব”, গুড়
থেকে বানানো “মৈরেয়” এবং আম থেকে বানানো “সহকারসুরা”। পূর্ব ভারতে মধু থেকে বানানো
হত “মাধ্বী”, ঝোলাগুড়
থেকে “গৌড়ী” এবং চাল থেকে বানানো হত “পৈষ্টি”। দক্ষিণ ভারতে তাল ও নারকেলের রস
থেকে “তড্ডি” বা “তাড্ডি” (তাড়ি) মদ্য বানানো হত।
যাঁরা মনে করেন ব্র্যাণ্ডি, হুইস্কির মতো বিলিতি মদ্য ভারতে এনে ব্রিটিশরা আমাদের দেশকে উচ্ছন্ন পাঠানোর সুব্যবস্থা করেছিল - তাঁরা আংশিক সত্য। বহু ধরনের মদ্য-রসে ভারতবাসী বহু যুগ ধরেই সিক্ত ছিল - তফাৎটা হল প্যাকেজিং আর কোয়ালিটি কন্ট্রোলে। মাটির পোড়া হাঁড়ি থেকে শৌণ্ডিকের হাতে পরিবেশিত দেশী মদ্য (কান্ট্রি লিকার) - দাঁড়াতে পারল না কাঁচের দৃষ্টি-নন্দন বোতলে সাজানো বিলিতি মদ্যের (ফরেন লিকার) সামনে। অবশ্য স্বাদে-গন্ধেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। যদিচ আজকের নাগরিক সমাজের বাইরে বৃহত্তর দরিদ্র কিন্তু রসিক ভারতীয় সমাজ আজও প্রাচীন রসেই মজে থাকে।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন