সোমবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৫

চৈত্র পবনে...


এর আগের রম্যরচনা - " আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ২


    আমাদিগের ছোটবেলাকার কালের সে সব দিন অন্যরকম ছিল। আমরা কাছাকাছি জেলার গেরাম গঞ্জ থেকে কলকেতায় আসিতাম রুজি রোজগারের আশায় কিংবা আমাদের ছেলে পিলেরা আসিত ভালো নেকাপড়া শিকিয়া দেশের দশের উবগার এবং বড়ো হইয়া সংসারের হাল ধরিবার আশায়। মৌমাচির চাকের মতো আমরা বাসা বাঁধিতাম কলকেতার মেসবাড়িগুনোতে। সে সব মেসবাড়িতে দিনরাত ভনভন ভ্যানভ্যান লাগিয়াই থাকিত। আমাদের সংগে কলকেতার তকনো এত মাকামাকি হইয়া ওটেনি, আমারা হপ্তা-পনেরদিন কলকেতায় থাকিতাম ঠিকই, কিন্তু ছুটিছাটা পাইলেই ন্যাজ তুলিয়া গেরামের বাড়িতে পলাইতাম। কলকেতাকে আমরা তকনো পরবাস ভাবিতাম, গেরামের বাড়িতে ফিরিয়া ডাঙ্গার মাচ জলে পড়িয়া যেন পরাণ ফিরিয়া পাইতাম।

    চোত মাসের প্রায় পুরোটাই - বাসন্তীপুজো, রামনবমী, চড়কের মেলা সব মিলিয়ে গেরামে টানা মোচ্ছব চলিত  এই মাসে বাড়িতে কুটুম্বদের আসা-যাওয়া চলিতেই থাকিত। ঘরে ঘরে খাওয়া দাওয়া, বাহিরে ড্যাং ড্যাংআ ড্যাং ড্যাং ঢাকের বাদ্যি; আমরা গেরামের ছেলেপিলের দল খুব মজিয়া থাকিতাম।  

    বেলা একটু বাড়িলেই, মাঠের দিকে চাহিয়া দেকিতাম চোতের রোদ্দুরে দূরের ঝোপঝাড়, গাছপালা ঝিলিমিলি করিতএলোমেলো শুকনো হাওয়া বহিত শনশন। শীতের ঝরাপাতা, সেই হাওয়ার হাত ধরিয়া ঝরঝর শব্দে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঘূর্ণী নেত্য করিতআর জলখাবারের বেলা পার হইলেই আমরা সেই ডাক শুনিতাম “বাবা তারকনাতের চরণের সেবা লাগি, বাবা মহাদেএএএব” মাঠের ওধার থেকে ডাক দিয়ে দিয়ে একমাসের ব্রত লইয়া সেই সন্নিসির দল গেরস্তর বাড়ির দুয়োরে দুয়োরে ভিখ মাগিয়া ফিরিত। আমাদের দোরের সামনে আসার আগেই ঠাকমা বলিতেন “অ বউমা, ওই সন্নিসির দল আসছে, সিধে ঠিক করো, বাছা” সিধে মানে সিদ্ধ করিয়া খাইবার যোগাড়। তাহার মধ্যে থাকিত, আতপ চাল, একটু মুগ, ছোলা কিংবা মটর ডাল, আর টুকটাক কিছু সবজি - আলু, বেগুন, কাঁচকলা কিংবা কুমড়োর ফালি। ছোট বেতের বোনা ধামায় মা সিধে সাজাইয়া তুলিতেনছোট্ট একটি মাটির কটোরায় একটু সরষের তেল, অন্য আরেকটি ভাঁড়ে নুন, কাঁচালংকা। আমাদের দুয়োরের সামনে সেই সন্নিসিদের দল এসে দাঁড়াইত আর বলিত “জয় বাবা তারকনাতের জয়”ঠাকুমা কিংবা মা তাদের ঝোলায় সেই সিধে ঢালিয়া দিতসিধে নেওয়ার পর সন্নিসিরা বলিয়া উঠিত “জয় বাবা মহাদেবের জয়”

    এই ধরনের ব্রত রাখা সন্নিসিরা ছিল একাহারী, দিনের বেলায় একবার মাত্র দুপুরের ভোজন, সূর্যাস্তের পর খাওয়া নিষিদ্ধ। সন্নিসিদের আরো নিয়ম ছিল, তাদের দলের সকলের একবেলার মতো খাবার যোগাড় হইলেই ভিক্ষার সমাপ্তি একেই মাধুকরী বলা হইত। পরের দিনের জন্য খাবার জমাইয়া রাখিলে ব্রতর বিধি ভাঙ্গিয়া যাইত, আর বাড়তি চাল ডাল সবজি বিক্রি করিবার কোন প্রশ্নই ছিল না, সে ছিল মহাপাপ। পর্যাপ্ত সিধে যোগাড় হইয়া গেলে, তারা মাঠের ধারের পায়ে চলা পথ ধরিয়া চলিয়া যাইত চড়ক মেলার মাঠে। খোলা মাঠের মধ্যে কাঠকুটা যোগাড় করিয়া, ইঁট কিংবা পাথরের টুকরোর ওপর মাটির বড়ো মালসার মধ্যে রান্না করিত ফ্যানভাত, সবজিসেদ্ধ, ডালসেদ্ধ। রান্না সারিয়া, পুকুর হইতে ডুবকি স্নান সারিয়া, তাহারা সবাই গোল হইয়া বসিয়া সরিষার তৈল আর নুন মাখিয়া সিদ্ধান্ন সেবা করিত। হাপুস হুপুস শব্দ উঠিত, জিভে কাঁচালংকার ঝাল লাগিলে আওয়াজ করিত সি সি সি সি। খাওয়া সাঙ্গ হইলে মাটির যতো মালসা আর পাত্র ফেলিয়া দিত আস্তাকুঁড়ে। বাসনপত্র, তৈজস সামগ্রী কোন কিচুর প্রতিই লোভ কিংবা মায়া যেন না আসে, তাই এই বিধানযাহাদের এই মায়া থাকে তাহারা তো সন্নিসি নয়, তাহারা গেরস্ত।

    একমাস অবধি এই সন্নিসিব্রতর পর শেষ দিনে এই সন্নিসিরা এবং আশে পাশের অন্য গ্রামের সন্নিসিরাও আসিয়া জড়ো হইত চড়ক মেলার মাঠে। মোটা শালের লম্বা বল্লীর অনেকটা মাটিতে গাড়িয়া খাড়া হইত চড়ক গাছ। তাহার মাথায় লোহার তৈরি মোটা শূল। শক্ত পোক্ত লম্বা একটি বাঁশের ঠিক মাঝখানে গোল ফুটা করিয়া লোহার রিং পড়ানো থাকিতগোল এই ফুটার মধ্যে শালের মাথার শূলের উপর বসাইলে, চড়কগাছ প্রস্তুত, মস্ত এক T-র মতো দেখিতে হইত সেই বাঁশের দুই প্রান্তে থাকিত লোহার মোটা হুক, সেই হুকের মধ্যে লম্বা রশি পড়ানো থাকিত। রশির এক প্রান্ত ধরিয়া থাকিত বয়স্ক আর অভিজ্ঞ কয়েকজন সন্নিসি। আর অন্য প্রান্তে থাকিত পোক্ত লোহার তৈরি বঁড়শির মতো হুক। দুই প্রান্তের দুই হুকে, কোমরে দড়ি বাঁধিয়া এবার দুই সন্নিসি বলিয়া উঠিত “বাবা তারকনাথের সেবা লাগি”সমস্বরে উপস্থিত সমস্ত লোক চিৎকার করিয়া উঠিত “বাবা মহাদেব”এইবার অন্য প্রান্ত ধরিয়া থাকা অভিজ্ঞ সন্ন্যাসীরা, রশিতে টান দিতেই, কোমরে হুক বাঁধা ওই দুই সন্নিসি ঝুলিয়া পড়িত শূণ্যে। রশির টানে তাহারা দুইজন, উঁচুতে আরো উঁচুতে উঠিতে উঠিতে, চড়ক গাছের T-র দুই প্রান্তে  দুলিতে থাকিত ওপর থেকে সন্নিসি দুইজন চিৎকার করিয়া বলিত “বাবা তারকনাথের সেবা লাগি” নিচেয় দাঁড়ানো, অভিজ্ঞ সন্ন্যাসীরা স্বস্তির শ্বাস লইয়া বলিত “বাবা মহাদেব” এই দুই জয়ধ্বনির অর্থ অনেকটা সংকেতের মতো। ওপরের দুই সন্নিসি জয়ধ্বনি দিয়া আসলে বলিল, তাহারা ঠিক আছে, কোনকিচুর অসুবিধে নাই। আর নিচের সন্নিসিরা জয়ধ্বনিতে নিশ্চিন্ত হইয়া যেন বলিল, যাক বাবা, এবার তবে শুরু করচি

    এই শুরু হইবার সময়টাতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসিত। কারণ, নীচের সন্ন্যাসীদের দড়ির টানে তখন চড়ক গাছের মাথা ঘুরিতে শুরু করিয়াছে। ঘুরিবার গতি বাড়িতে বাড়িতে চড়ক গাছের মাথা বন বন করিয়া ঘুরিতে লাগিত সুতোয় বাঁধা ঢিলের মতো, ঝুলিতে থাকা দুই সন্ন্যাসীও মহাশূণ্যে ঘুরিতে থাকিত বন বন করে। সেই দৃশ্যে ভয়ে আমার চোখ বন্ধ করিয়া ফেলিতাম, সর্বদা মনে হইত, যদি কিছু একটা ঘটিয়া যায়, সন্নিসি দুইজনার কি হইবে! আশেপাশের দর্শকরা ভয়াকুল বিস্ময়ে চিৎকার করিয়া উঠিত “জয় বাবা মহাদেবের জয়”

     সেকালে চড়কের মেলায় চড়কগাছের ওই ভয়ংকর খেলা ছাড়াও আরো অনেক খেলা দেখিয়া শিহরিত হইতাম। সন্নিসিরা জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়া নগ্ন পদব্রজ করিতেন। কেহ কেহ জিহ্বায় লৌহ শলাকা বিদ্ধ করাইত; কেহ বা হাতের জ্বলন্ত মশালে মুখ হইতে ক্যারাসিন তৈল নিক্ষেপ করিয়া, আগুনের তীব্র হলকা সৃষ্টি করিত। সন্নিসিদের এইসব ভয়ংকর খেলা দেখিয়া বাল্যকালে আমরা অভিভূত হইতাম। এই সব খেলা দেখিবার পর পিতার হাত ধরিয়া আমরা মেলার নানান পসরা দেখিতাম। পাঁপড় ভাজা, জিভে ছ্যাঁকা দেওয়া গরম-গরম জিলিপি, আলুর চপ, বেগুনি সহযোগে মুখের স্বাদ বদল করিতাম। মায়ের জন্যে কিনিতাম লোহার সাঁড়াশি, তেল উঠাইবার পলা, আলতা, সিঁদুর, ভগিনীদের জন্য কাঠের পুতুল, কাঁচের রঙিন চুড়ি আমরা ভ্রাতাগণ মাটির তৈরি কলা ও পেয়ারা, সুভাষ বোস ও রবি ঠাকুর, কাঠের গোশকট, জিভ বের করা তুলার কুকুর লইয়া বাবার সঙ্গে যখন ফিরিতাম, সূর্য তখন পাটে বসিবার যোগাড় করিতেছেন। মেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুরিয়া পরিশ্রান্ত কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে পিতা কাঁধে তুলিয়া লইতেন। পিতার কাঁধে উঠিয়া পথচলার মজাই আলাদা। কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রতি স্নেহ মিশ্রিত ঈর্ষা লইয়া, পিতার হাত ধরিয়া আমরা আপন গেরামে ফেরার পথ চলিতাম। দুই পা পরিশ্রান্ত হইলে কী হইবে, মন তখনও মেলার বিবিধ মজার স্মৃতিতে থাকিত ভারাক্রান্ত। 

১৬ই চৈত্র, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দ

[আত্মারাম বাগচি মহাশয়ের স্মৃতিকথার আংশিক পরিমার্জিত রূপ “চৈত্র পবনে"; বানান ও শব্দ ব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাগচি মহাশয়ের জন্ম প্রাক-স্বাধীনতা যুগে, কর্ম উত্তর-স্বাধীনতার দিনগুলিতে।] 

--০০--

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...