শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ " 


১৩

 

শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।

শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”

জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।

শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।

জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।

শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে”।

জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর, শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”

ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।

শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্‌গির সম্ভব, সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান, ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”

শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!

ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটা বুঝে নিতে চাই”। একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য মুদ্রা হলে ভালো হয়”।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।

“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব। তাতেই আপাতত চলে যাবে”।  

শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ? আশ্চর্য!”

“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর ডাকাতি করব”।

“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না, হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি, ভল্লা?”

“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।

শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির স্থাপনা করেন...”।

শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে! রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় নেই।”

“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।

শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”

“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।

আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।

“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।

“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।

এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড। মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস, তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে – সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”

লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ! 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮



বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৩শ পর্ব

 

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের দ্বাদশ অধ্যায়ঃ ভক্তিযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে  গীতা - ১২শ পর্ব "


আগের পর্বে অর্জুন ভক্তিযোগের মহিমা উপলব্ধি করলেন, কিন্তু তাও তাঁর মনের সংশয় যেন মিটল না। যাঁকে ভক্তি করলে, পরম মুক্তি মিলবে - তিনি ঠিক কে? তাঁকে চিনবই বা কী করে? যাকে তাকে ভক্তি করাটাও তো কোন কাজের কথা নয়। যাঁকে ভক্তি করব -  তিনি যে সত্যিই ভক্তবৎসল তত্ত্বজ্ঞানী - সেটুকু বোধগম্য হতেও যে ভক্তের তত্ত্বজ্ঞান থাকা প্রয়োজন।  গহন অন্ধকারে পথের সন্ধানে ভক্ত নিজেকে সমর্পণ করবে যাঁর হাতে,  তিনি নিজেও যে অন্ধ নন - সেটুকু আস্থা ভক্ত করবে কীভাবে? সেই জ্ঞানগম্যতার জন্যেই অর্জুন  ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন -     


ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ


অর্জুন উবাচ

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব ক্ষেত্রং ক্ষেত্রজ্ঞমেব চ।

এতদ্বেদিতুমিচ্ছামি জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ কেশব।।

অর্জুন উবাচ

প্রকৃতিং পুরুষং চ এব ক্ষেত্রং ক্ষেত্রজ্ঞম্‌ এব চ।

এতৎ বেদিতুম্‌ ইচ্ছামি জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ কেশব।।

অর্জুন বললেন – হে কেশব, প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় এই সমস্ত বিষয়েও আমি জানতে ইচ্ছে করি।

 

শ্রীভগবানুবাচ

ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে।

এতদ্‌ যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রম্‌ ইতি অভিধীয়তে।

  এতদ্‌ যঃ বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ    ইতি তদ্বিদঃ।।

 

 

শ্রীভগবান বললেন- হে কুন্তীপুত্র, এই শরীরকেই ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়। আর এই ক্ষেত্রকে যে তত্ত্বজ্ঞানী উপলব্ধি করেছেন তাঁকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয়ে থাকে।

 

ক্ষেত্রজ্ঞঞ্চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্‌জ্ঞানং মতং মম।।

ক্ষেত্রজ্ঞং চ অপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ জ্ঞানং যৎ তৎ জ্ঞানং মতং মম।।

হে অর্জুন, সকল ক্ষেত্রে আমাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জেনে রাখো। ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের যে জ্ঞান সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান বলে আমি মনে করি।

 

তৎ ক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্‌চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ।

স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।।

তৎ ক্ষেত্রং যৎ চ যাদৃক্‌ চ যৎ বিকারি যতঃ চ যৎ।

স চ যঃ যৎপ্রভাবঃ চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।।

সেই ক্ষেত্র যেমন ধর্মযুক্ত, যেমন বিকারযুক্ত এবং যে ভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং যার প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে, সেই তত্ত্বটি আমি তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করছি শোনো।

 

ঋষিভির্বহুধা গীতং ছন্দোভির্বিবিধৈঃ পৃথক্‌।

ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভির্বিনিশ্চিতৈঃ।।

ঋষিভিঃ বহুধা গীতং ছন্দোভিঃ বিবিধৈঃ পৃথক্‌।

ব্রহ্মসূত্র-পদৈঃ চ এব হেতুমদ্ভিঃ বিনিশ্চিতৈঃ।।

এই তত্ত্বকথা অনেক ঋষিগণ অনেক ভাবে ব্যাখা করেছেন। বেদের নানান শাখায়, নানান ছন্দে এই তত্ত্বের কথা, ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশের সূত্র হিসেবে, নিঃসংশয় যুক্তির সঙ্গে ব্যাখা করা হয়েছে।

 

৬,৭

মহাভূতান্যহঙ্কারো বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ।

ইন্দ্রিয়াণি দশৈকঞ্চ পঞ্চ চেন্দ্রিয়গোচরাঃ।।

ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ।

এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতাম্‌।।

মহাভূতানি অহঙ্কারঃ বুদ্ধিঃ অব্যক্তম্‌ এব চ।

ইন্দ্রিয়াণি দশ একং চ পঞ্চ চ ইন্দ্রিয়গোচরাঃ।। ৬

ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতঃ চেতনা ধৃতিঃ।

এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারম্‌ উদাহৃতাম্‌।। ৭

মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ-এই পাঁচটি মহাভূত থেকে অহংকার, অহংকার থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি থেকে অব্যক্ত ঈশ্বরচেতনা, দশ ইন্দ্রিয় ও মন এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়গোচর অনুভূতি। কামনা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা, ধৈর্য – এই সব নিয়েই বিকারযুক্ত ক্ষেত্রের কথা তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম।

   

৮-১২

অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্‌।

আচার্যোপাসনং শৌচং স্থৈর্যমাত্মবিনিগ্রহঃ।।

ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ।

জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ-দোষানুদর্শনম্‌।।

অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু।

নিত্যঞ্চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।

ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী।

বিবিক্তদেশসেবিত্বমরতির্জনসংসদি।।

অধ্যাত্ম-জ্ঞান-নিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্‌।

এতজ্‌জ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোঽন্যথা।।

অমানিত্বম্‌ অদম্ভিত্বম্‌ অহিংসা ক্ষান্তিঃ আর্জবম্‌।

আচার্য-উপাসনং শৌচং স্থৈর্যম্‌ আত্মবিনিগ্রহঃ।। ৮

ইন্দ্রিয় অর্থেষু বৈরাগ্যম্‌ অনহঙ্কার এব চ।

জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ-দোষ অনুদর্শনম্‌।। ৯

অসক্তিঃ অনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু।

নিত্যং চ সমচিত্তত্বম্‌ ইষ্টা অনিষ্ট উপপত্তিষু।। ১০

ময়ি চ অনন্যযোগেন ভক্তিঃ অব্যভিচারিণী।

বিবিক্ত-দেশ-সেবিত্বম্‌ অরতিঃ জনসংসদি।। ১১

অধ্যাত্ম-জ্ঞান-নিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থ-দর্শনম্‌।

এতৎ জ্ঞানম্‌ ইতি প্রোক্তম্‌ অজ্ঞানং যৎ অতঃ অন্যথা।। ১২

নিজের বিশেষ গুণের জন্যে আত্মশ্লাঘা ও দম্ভ না করা। অহিংসা, ক্ষমা, সারল্য, গুরুর উপাসনা, সদাচার-শুচিতা, স্থৈর্য, আত্ম সংযম, ইন্দ্রিয়ের সুখভোগ থেকে বৈরাগ্য, নিরহঙ্কার; জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি থেকে পাওয়া দুঃখের বারবার দোষবিচার ও বিষয়ে অনাসক্তি; পুত্র, স্ত্রী ও ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন নির্বিকার ভাব। অভীষ্ট লাভ কিংবা অনিষ্ট প্রাপ্তিতে মনের সর্বদা সাম্য ভা্ব; আমার প্রতি অচলা ভক্তিযুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ যোগসাধনা, নির্জন স্থানে বসবাস, অসদাচারী লোকের সংস্রব ত্যাগ, আত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা, সর্বদা তত্ত্বজ্ঞানের পর্যালোচনা এই হল প্রকৃত জ্ঞান ও তার সাধনার পথ। এ ছাড়া আর যা কিছু – সবই অজ্ঞান।

 

১৩

জ্ঞেয়ং যত্তৎ প্রবক্ষ্যামি যজ্‌জ্ঞাত্বাঽমৃতমশ্নুতে।

অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ তন্নাসদুচ্যতে।।

জ্ঞেয়ং যৎ তৎ প্রবক্ষ্যামি যৎ জ্ঞাত্বা অমৃতম্‌ অশ্নুতে।

অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ তৎ ন অসৎ উচ্যতে।।

যা জ্ঞেয় অর্থাৎ জানার বিষয়, যা জানলে অমৃত স্বরূপ পরম মুক্তি লাভ করা সম্ভব সেই কথাই এখন আমি তোমাকে বলব। এই জ্ঞান অনাদি পরম ব্রহ্মস্বরূপ, সৎ ও অসতের ঊর্ধে, এমনই বলা হয়ে থাকে।

 

১৪

সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্‌।

সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি।।

সর্বতঃ পাণি-পাদং তৎ সর্বতঃ অক্ষি-শিরঃ-মুখম্‌।

সর্বতঃ শ্রুতিমৎ লোকে সর্বম্‌ আবৃত্য তিষ্ঠতি।।

সর্ব জীবে তাঁরই হাত ও পা, চোখ ও কান, মাথা ও মুখ রয়েছে এবং এইভাবেই তিনি ইহলোকের সর্বত্রই ব্যাপ্ত রয়েছেন।

 

১৫

সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্‌।

অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।

সর্ব ইন্দ্রিয়গুণ আভাসং সর্ব ইন্দ্রিয়-বিবর্জিতম্‌।

অসক্তং সর্বভৃৎ চ এব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।

সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অতীত হলেও, ইন্দ্রিয়ের সকল কাজে তিনি প্রকাশিত হন। তিনি সকলের আশ্রয় স্বরূপ, কিন্তু তিনি কিছুতেই যুক্ত নন। তিনি তিনগুণের ঊর্ধে, অথচ তিনি এই তিনগুণের পরিণাম ভোগ করেন।

 

১৬

বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ।

সূক্ষ্মত্বাৎ তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।।

বহিঃ অন্তঃ চ ভূতানাম্‌ অচরং চরম্‌ এব চ।

সূক্ষ্মত্বাৎ তৎ অবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চ অন্তিকে চ তৎ।।

সমস্ত চরাচরের তিনিই অন্তর, তিনিই বাহির; তিনিই স্থাবর এবং তিনিই জঙ্গম। তাঁর এই সূক্ষ্মতার জন্যে তিনি অজ্ঞানীর থেকে অজ্ঞেয়তার দূরত্বে থাকেন, কিন্তু জ্ঞানীর নিকটেই অবস্থান করেন।

 

১৭

অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্‌।

ভূতভর্তৃ চ তজ্‌জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।

অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তম্‌ ইব চ স্থিতম্‌।

ভূতভর্তৃ চ তৎ জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।

এই ব্রহ্মস্বরূপ জ্ঞেয় অবিভাজ্য, কিন্তু ইনিই অজস্র ভাগে বিভক্ত হয়ে সমস্ত ভূতের মধ্যেই অবস্থান করেন। ইনিই সমস্ত ভূতকে পালন করেন, বিনাশ করেন আবার সৃষ্টিও করেন।

 

১৮

জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য ধিষ্ঠিতম্‌।।

জ্যোতিষাম্‌ অপি তৎ জ্যোতিঃ তমসঃ পরম্‌ উচ্যতে।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য ধিষ্ঠিতম্‌।।

ইনি জগতের সমস্ত জ্যোতির্মণ্ডলীর জ্যোতি, তাই অজ্ঞান অন্ধকারের অতীত বলা হয়। জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞানগম্যের অন্তরেই এঁনার অধিষ্ঠান।

[ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের সংজ্ঞা ১৩/৮-১২ এবং জ্ঞেয় সম্পর্কে ১৩/১৩-১৭ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন। জ্ঞেয় ব্রহ্মকে জানতে পারলে জ্ঞানগম্য বলা হয়।]

  

১৯

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ।

মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে।।

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ উক্তং সমাসতঃ।

মৎ ভক্ত এতৎ বিজ্ঞায় মৎ-ভাবায় উপপদ্যতে।।

এতক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় –এই তিন তত্ত্ব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম। যাঁরা আমার একান্ত ভক্ত, তাঁরা এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে আমার ব্রহ্মস্বরূপ লাভে সমর্থ হন।

  

২০

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি।

বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্‌।।

প্রকৃতিং পুরুষং চ এব বিদ্ধি অনাদী উভৌ অপি।

বিকারান্‌ চ গুণান্‌ চ এব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্‌।।

প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলেই জানবে। আরও জেনো, প্রকৃতি থেকেই বুদ্ধি-অবুদ্ধি, সুখ-দুঃখ, শোক-তাপের বিকার এবং মোহগুণের সৃষ্টি হয়।

 

২১

কার্যকরণকর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে।

পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে।।

কার্য-করণ-কর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিঃ উচ্যতে।

পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুঃ উচ্যতে।।

প্রকৃতিকে বলা হয়, সমস্ত কার্য-করণের কর্তৃত্বের একমাত্র কারণ। আর পুরুষকে বলা হয় সুখ-দুঃখ ইত্যাদির ভোগের কারণ।

[দেহ হল কার্য; দশ ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মন ও প্রাণ হল করণ। জীব দেহধারণের সঙ্গে সঙ্গে ভূত ও বিষয় গ্রহণ করে। একই সঙ্গে করণের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সুখ, দুঃখ ইত্যাদি প্রকৃতিজাত মোহ। পুরুষ তার চেতনা দিয়ে ভোগ করে সুখদুঃখ, শোকতাপ ইত্যাদি মোহ। প্রকৃতির কার্যকরণের কর্তৃত্বে আর ভোক্তা পুরুষের চেতনার সংযোগে গড়ে ওঠে এই সংসার।]

  

২২

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুঙ্‌ক্তে প্রকৃতিজান্‌ গুণান্‌।

কারণং গুণসঙ্গোঽস্য সদসদ্‌যোনিজন্মসু।।

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থঃ হি ভুঙ্‌ক্তে প্রকৃতিজান্‌ গুণান্‌।

কারণং গুণসঙ্গঃ অস্য সৎ-অসৎ-যোনি-জন্মসু।।

যেহেতু পুরুষ প্রকৃতির মধ্যেই অবস্থান করে ও প্রকৃতিজাত সমস্ত গুণ ভোগ করে, তাই এই গুণের আসক্তিতে জীব, মানুষ কিংবা পশুরূপে - সৎ কিংবা অসৎ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে।

     

২৩

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ।

পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেঽস্মিন্‌ পুরুষঃ পরঃ।।

উপদ্রষ্টা অনুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ।

পরম্‌-আত্মা ইতি চ অপি উক্তঃ দেহে অস্মিন্‌ পুরুষঃ পরঃ।।

দেহে অবস্থানকারী এই যে পুরুষ সাক্ষী স্বরূপে সবকিছু অনুমোদন করেন, পালন করেন ও ভোগ করেন, তাঁকেই পরমাত্মা মহেশ্বর বলা হয়।

  

২৪

য এব বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ।

সর্বথা বর্তমানোঽপি ন স ভূয়োঽভিজায়তে।।

য এব বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ।

সর্বথা বর্তমানঃ অপি ন স ভূয়ঃ অভিজায়তে।।

যিনি এই পরম পুরুষ এবং সমস্ত বিকারগুণ সহ প্রকৃতির স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি যে কোন অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তাঁকে আর জন্ম গ্রহণ করতে হয় না।

 

২৫

ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা।

অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চাপরে।।

ধ্যানেন আত্মনি পশ্যন্তি কেচিৎ আত্মানম্‌ আত্মনা।

অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চ অপরে।।

কেউ কেউ ধ্যানযোগে শুদ্ধ আত্মা হয়ে নিজের আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন। অন্য কেউ কেউ সাংখ্যযোগে, কেউ বা নিষ্কাম কর্মযোগে পরম আত্মাকে অনুভব করেন।

 

২৬

অন্যে ত্বেবমজানন্তঃ শ্রুত্বাঽন্যেভ্য উপাসতে।

তেঽপি চাতিতরন্ত্যেব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণঃ।।

অন্যে তু এবম্‌ অজানন্তঃ শ্রুত্বা অন্যেভ্য উপাসতে।

তে অপি চ অতিতরন্তি এব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণঃ।।

আরও কেউ কেউ আত্মাকে এই ভাবে না জেনে, গুরুর উপদেশ অনুসারে উপাসনা করে থাকেনগুরুর উপদেশে ভক্তিনিষ্ঠ এই ব্যক্তিরাও মৃত্যুময় এই সংসার অতিক্রম করতে পারেন।

 

২৭

যাবৎ সঞ্জায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্‌।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ।।

যাবৎ সঞ্জায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্‌।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তৎ বিদ্ধি ভরতর্ষভ।।

হে ভরত কুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জেনে রাখো, এই জগতে যা কিছু স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, সবই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকেই উৎপন্ন।

  

২৮

সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্‌।

বিনশ্যৎস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।

সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্‌।

বিনশ্যৎসু অবিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।

বিনাশশীল সর্বভূতের সর্বত্র যিনি অবিনাশী পরমেশ্বরকে সমানভাবে ব্যাপ্ত দেখতে পান, তিনিই সম্যকদর্শী জ্ঞানী।

 

২৯

সমং পশ্যন্‌ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্‌।

ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্‌।।

সমং পশ্যন্‌ হি সর্বত্র সমবস্থিতম্‌ ঈশ্বরম্‌।

ন হিনস্তি আত্মনা আত্মানং ততঃ যাতি পরাং

 গতিম্‌।।

 

 

যেহেতু তিনি সর্বত্র সমভাবে ব্যাপ্ত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পর, নিজের আত্মা ও পরের আত্মায় বিভেদ করেন না, সেহেতু তিনিই পরম গতি লাভ করেন।

    

৩০

প্রকৃত্যৈব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ।

যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি।।

প্রকৃত্যা এব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ।

যঃ পশ্যতি তথা আত্মানম্‌ অকর্তারং স পশ্যতি।।

আত্মপুরুষ অকর্তা এবং সকল কর্ম প্রকৃতির কার্য-করণেই নিষ্পন্ন হয় - যাঁর এই উপলব্ধি হয়েছে, তিনিই সত্যদ্রষ্টা।

 

৩১

যদা ভূতপৃথগ্‌ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি।

তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।

যদা ভূত-পৃথক্‌-ভাবম্‌ একস্থম্‌ অনুপশ্যতি।

ততঃ এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।

যখন বিভিন্ন ভূতসমূহকে একই আত্মায় একত্র অবস্থান করতে দেখা যায় এবং সেই আত্মা থেকেই সমস্ত ভূতের বিকাশ - এমন উপলব্ধি করা যায়, তখনই ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হয়।

 

৩২

অনাদিত্বান্নির্গুণত্বাৎ পরমাত্মাঽয়মব্যয়ঃ।

শরীরস্থোঽপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে।।

অনাদিত্বাৎ নির্গুণত্বাৎ পরমাত্মা অয়ম্‌ অব্যয়ঃ।

শরীরস্থঃ অপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, এই পরমাত্মা অনাদি এবং নির্গুণ বলেই অক্ষয় এবং অব্যয়। শরীরের মধ্যে অবস্থান করলেও, ইনি না কোন কর্ম করেন, না তার ফলভোগ করেন।

 

৩৩

যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে।

সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে।।

যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাৎ আকাশং ন উপলিপ্যতে।

সর্বত্র অবস্থিতঃ দেহে তথা আত্মা ন উপলিপ্যতে।।

আকাশ যেমন সর্বব্যাপী হওয়া সত্ত্বেও সূক্ষ্মতার জন্যে কোন কিছুতেই সংযুক্ত নয়, তেমনই দেহের সর্বত্র অবস্থান করেও আত্মা দেহজাত দোষগুণে লিপ্ত হন না।

 

৩৪

যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নঃ লোকমিমং রবিঃ।

ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।

যথা প্রকাশয়তি একঃ কৃৎস্নঃ লোকম্‌ ইমং রবিঃ।

ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।

হে অর্জুন, এক সূর্য যেমন এই সমগ্র জগতকে আলোক দান করেন, তেমনই এক পরমাত্মাস্বরূপ ক্ষেত্রী সমগ্র ক্ষেত্রকে প্রকাশ করে থাকেন।

 

 

৩৫

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা।

ভূতপ্রকৃতিমোক্ষঞ্চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্‌।।

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ এবম্‌ অন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা।

ভূত-প্রকৃতি-মোক্ষং চ যে বিদুঃ যান্তি তে পরম্‌।।

এই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রভেদ এবং সমস্ত ভূত-প্রকৃতির মোহ থেকে মুক্তির উপায় যিনি জ্ঞানচক্ষু দিয়ে বুঝতে পারেন, তিনিই পরমব্রহ্ম লাভ করেন। 

 

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ সমাপ্ত

এর পরে চতুর্দশ অধ্যায়ঃ  " গীতা - ১৪শ পর্ব "

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...