সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯ 


 

ভল্লা নালার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোল বাঁধের কাছে। প্রভাত সুর্যের আলো তখন সবে ছড়িয়ে পড়ছে গাছের পাতায় পাতায়। বাঁধের উঁচু পাড়ে উঠে ভল্লা চারদিকে তাকাল। এই বাঁধের বাঁদিকে নোনাপুর গ্রাম। আর ডানদিকে সুকরা। এই নালাই এতদিন ছিল দুই গ্রামের সীমানা। যখন থেকে ভল্লা এই নালায় বাঁধ বানানোর তোড়জোড় শুরু করেছে, দুই গ্রামের লোকজন কৌতূহলী হয়েছে। ভল্লার কথায় তারা বুঝেছে, এই বাঁধের জলে গ্রামের পুরো ক্ষেত না হোক কিছু কিছু জমিতে সারা বছর চাষবাস করা সম্ভব। সেই থেকে তারা ভল্লার সঙ্গে মেতে উঠেছে, তাকে সর্বতো সাহায্য করেছে, বাঁধ নির্মাণে। দুপক্ষই উৎসাহী হয়ে নালার দুপাশের অনাবাদী বেশ কিছু জমিকে আবাদযোগ্য করে তুলেছে। সরু সরু শিরার মতো নালা কেটে তারা দুপাশের জমিতে চারিয়ে নিয়েছে বাঁধের জল। বপন করেছে বাদাম ও তুলোর বীজ। বিগত পনের-বিশ দিনে সে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ কয়েকটি মাঠ।

একধরনের নেশা আছে সবুজ রঙে। বিশেষ করে সে সবুজ যদি হয় সম্ভাব্য শস্যের স্বপ্ন। সে স্বপ্নে চাষীরা বিভোর হয়ে থাকেন। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে, বাড়িতে গিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। রাত্রে ঘুম ভেঙে বারবার উঠে বসেন। জঙ্গলের ইঁদুর, খরগোশ, শজারুরা রাত্রেই খাবারের সন্ধানে বের হয়। চারাগাছ উপড়ে বীজ খেয়ে তারা যদি শস্যের সর্বনাশ করে? যতদিন না গাছগুলি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, ততদিন এই দুশ্চিন্তা।

ভল্লাকে দেখে সুকরা গাঁয়ের বয়স্ক চাষী ভীলককাকা একগাল হেসে বললেন, “গতকাল রাত্রে গাঁয়ের ছোকরারা সব রামকথা শুনতে গিয়েছিল। তুই যাসনি, বেটা?”

ভল্লা হাসল, বলল, “ইচ্ছে তো ছিল, কাকা। রামকথা শুনতে অনেক ধরনের লোক যায় – আমাকে চিনে ফেললে, বিপদে পড়ে যাব। সেই ভয়ে যাইনি। এই যে তোমাদের এখানে এসেছি, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে…কেউ দেখে ফেললেই বিপদ”।

ভীলককাকা বললেন, “হুঁ। তার মানে তুই জানিস না। নোনাপুরের এক ছোকরাকে কাল রাতে সাপ কামড়েছে!

“সাপে কেটেছে? কই শুনিনি তো! কাকে কেটেছে জানো, কাকা?”

“হানোকে। ডাকাবুকো তাজা ছেলেটা – এভাবে মারা যাবে - ভাবা যায় না”।

“হানো? কী বলছো, কাকা? সেই জন্যেই আজ ভোরে কেউ আসেনি আমার কাছে। ভাবলাম, পালাগান শুনে হয়তো শেষ রাত্রে বাড়ি ফিরে সব ঘুমোচ্ছে...। কিন্তু...কিন্তু আমার এখন কী করা উচিৎ, কাকা? আমার যে একবার হানোর বাড়িতে যাওয়া খুব দরকার। ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসত – যা বলতাম সব শুনত - দারুণ কাজের ছেলে”।

ভীলককাকা বললেন, “সবই বুঝছি, ভল্লা। কিন্তু এসময় তোকে গাঁয়ে দেখলে, সকলেরই বিপদ বাড়বে। শত্রুর তো আর শেষ নেই গ্রামে”।

ভল্লা চিন্তাগ্রস্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তা ঠিক”। কোন কথা না বলে নোনাপুর গ্রামের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর অবসন্ন গলায় বলল, “আমি নোনাপুর গ্রামে আসার পর থেকেই নানান অঘটন ঘটে চলেছে, কাকা। আমার মনে হয় এই অঞ্চল ছেড়ে আরও দূরে কোথাও আমার চলে যাওয়া উচিৎ”।

ভীলককাকা বললেন, “অঘটন? অঘটন আবার কী ঘটল?”

অন্যমনস্ক ভল্লা বলল, “ওই যে, রাজকর্মচারী শষ্পক গ্রামপ্রধানকে অপমান করল। গ্রামপ্রধান কর আদায়ে কিছুটা ছাড়ের জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। শুনলাম শষ্পক এককথায় তাঁর সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। আমাকে নিয়েও কি কম কথা শুনিয়েছে, বয়স্ক সম্মানীয় গ্রামপ্রধানকে। যাচ্ছেতাই, সে সময় আমি তো ছিলাম সামনে, সব শুনেছি। সে সব কথা কানে শোনাও পাপ। এখন আবার হানোটা এভাবে অপঘাতে চলে গেল...না কাকা, এ অঞ্চলে আর নয়”।        

 ভীলককাকা সান্ত্বনার সুরে বললেন, “বুঝতে পারছি, হানোর এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা তোর বুকে বড়ো বাজছে। কিন্তু এসবের জন্যে তুই নিজেকে দুষছিস কেন? তুই কী করবি? জ্ঞান হয়ে থেকে রাজকর্মচারীদের ঔদ্ধত্য আর অপমানের কথা আমরা শুনে আসছি, আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের থেকে। ও সব আমাদের কাছে নতুন নাকি? আর সাপে কামড়ানোর কথা বলছিস? আশেপাশের চার-পাঁচখানা গাঁয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ। ছেলে-ছোকরা, ব্যাটাছেলে বা মেয়েছেলেদের মধ্যে দু-একজনের অপঘাত মৃত্যু হয়নি – এমন একটা বছর আমাকে দেখা তো। সাপেকাটা, জলে ডোবা, গলায় দড়ি... একটা না একটা অপঘাত মৃত্যু লেগেই আছে প্রতি বছর। এই তো গত বছর, একটু মেঘ করে – চটাপট এমন শিলাবৃষ্টি হল, আমাদের গাঁয়ের রাখাল কালডি মারা গেল ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। সঙ্গে মরল চারটে ছাগল। এসবই আমাদের জীবনের অঙ্গ রে ভল্লা, তোর থাকা না থাকায় কী আসে যায়? তোর কমলিমা আর গ্রামপ্রধান জুজাকের দুটি ছেলেই যে সাপের কামড়ে মারা গেছিল – সে কথা শুনিসনি?”

বাঁধের ওপর ভীলককাকা আর ভল্লা দুজনেই চুপ করে পাশাপাশি বসে রইল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর ভীলককাকা আবার বললেন, “তুই এসে এই যে নালার মধ্যে বাঁধ গড়ার বুদ্ধি দিলি। তোর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা সেই বাঁধ বানালাম। আমাদের দুটি গ্রামের বেশ কিছু বাঁজা জমিকে আমরা সবাই মিলে আবাদী করে তুললাম। এর মূল্য কিছু কম নাকি? সে কথা ভুলে যাচ্ছিস কী করে?”                

ভল্লা বলল, “কাকা, এ বাঁধটা আমরা ভালই বানিয়েছি, কী বলো?”

সে কথা আর বলতে! বাপ পিতেমোদের সময় থেকেই তো এই নালা বয়ে চলেছে। কারও মাথায় আসেনি এখানে বাঁধ দিয়ে কিছু জমি চাষবাস করা সম্ভব। তুই এসে পথ দেখালি, রে ব্যাটা”।

“কিন্তু এ বাঁধের নীচের সরু সরু ছিদ্র দিয়ে জল কিন্তু ভাটায় বেরিয়ে চলেছে, কাকা। সেই জলের গতি কমাতে না পারলে, এ বাঁধ কিন্তু দুর্বল হয়ে যাবে। সামনের বর্ষায় হয়তো ভেঙেই পড়বে”।

“এ কথা তুই আগেও বলেছিস, বেটা। কিন্তু কী দিয়ে আটকাবো?”

“শক্ত এঁটেলমাটি যোগাড় করতে পারো না, কাকা? তোমাদের সুকরা কিংবা নোনাপুরে?”

“সে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সে মাটিতে কী হবে?”

“এঁটেলমাটির বড়ো বড়ো চাঙর বাঁধের জলে ফেলে দিও। সে মাটি গলে গিয়ে জলের সঙ্গে বইতে থাকবে ওই সরুসরু নালিপথে। ধীরে ধীরে কমে যাবে জলের ধারা ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নোনাপুরের কেউ আজ মাঠে আসেনি – হানোর হঠাৎ মৃত্যুটা সবাইকে পাথর করে দিয়েছে, না কাকা?”

হ্যাঁ। ও গাঁয়ের পাঁচজন লোক সারারাত পাহারা দিয়েছে, আমাদের লোকদের সঙ্গেই।  যেমন রোজ দেয়। কিন্তু সকালে কেউ আসেনি”

“রাতে কিসের পাহারা, কাকা?”

“ইঁদুর, শজারু আছে, মাঝে মাঝে আসে হরিণের পাল – তাদের থেকে শস্য পাহারা দেওয়া আমাদের বরাবরের অভ্যাস বেটা। ডপলি, ঢাকের আওয়াজ করে, আগুনের মশাল জ্বেলে তাদের দূরে রাখতে হয়”।

“তাই? দুটো শস্যের জন্যে কী পরিশ্রমই করতে হয়, তাই না, কাকা? কিন্তু রাজারা রাজস্ব আদায়ের সময় এসব কথা চিন্তাও করে না”। ভল্লার স্বরে কিছুটা উষ্মা।

“এটা ঠিক নয়, বেটা। তোরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা বুঝিস না, রাজা এই সমস্ত জমির মালিক।  তিনিই আমাদের জীবন ধারণের জন্য বাস্তু আর আবাদের জমি দিয়েছেন। তার বদলে তাঁরা কর নেবেন না? কর না নিলে তাঁদের চলবে কী করে? কী করে বানাবেন রাস্তাঘাট? কী করে রাজ্যের সুরক্ষা সামলাবেন?”

“রাজা কী করে জমির মালিক হলেন? এই মাটি, জল, হাওয়া, রোদ্দুর, শস্যের বীজ সবই তো ভগবান সৃষ্টি করেছেন”।

ভীলককাকা প্রশ্রয়ের হাসি মাখা মুখে বললেন, “ভগবানই তো সৃষ্টি করেছেন, বেটা। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু বিলিব্যবস্থার জন্যে তিনি যে রাজাকেও নিয়োগ করেছেন”।

ভল্লা কিছুক্ষণ ভীলককাকার স্নেহসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, “সেই রাজার শালা, বছরের পর বছর মেয়েদের যাচ্ছেতাই অসম্মান করবে। রাজা মুখ বুজে বসে বসে দেখবে। আমরা রক্ষীরা তাকে শায়েস্তা করলে আমাদের নির্বাসন দেবে। এই কাজের জন্যেও কি ভগবান রাজাকে নিযুক্ত করেছিলেন, কাকা?” হঠাৎ করেই ভল্লা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকা তুমি আমাকে যতই বোঝাও, আমি বুঝব না। আমি এখন চলি কাকা, তোমরা সাবধানে থেক।

বাঁধ থেকে নেমে নালার ধারের ঝোপঝাড়ের আড়ালে হনহন করে ভল্লা এগিয়ে গেল তার কুটিরের পথে। ভীলককাকা তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, “ভগবান যে এই সব কিছুর মধ্যে নেই, সে কথা কী আর আমরা বুঝি না, বেটা? আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে, তোর মতো কেউ পাশে দাঁড়ালে, হয়তো আমরাও…। ভগবান তোকে দীর্ঘ পরমায়ু দিন, বেটা”। 

চলবে...



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...