বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯ 


 

ভল্লা নালার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোল বাঁধের কাছে। প্রভাত সুর্যের আলো তখন সবে ছড়িয়ে পড়ছে গাছের পাতায় পাতায়। বাঁধের উঁচু পাড়ে উঠে ভল্লা চারদিকে তাকাল। এই বাঁধের বাঁদিকে নোনাপুর গ্রাম। আর ডানদিকে সুকরা। এই নালাই এতদিন ছিল দুই গ্রামের সীমানা। যখন থেকে ভল্লা এই নালায় বাঁধ বানানোর তোড়জোড় শুরু করেছে, দুই গ্রামের লোকজন কৌতূহলী হয়েছে। ভল্লার কথায় তারা বুঝেছে, এই বাঁধের জলে গ্রামের পুরো ক্ষেত না হোক কিছু কিছু জমিতে সারা বছর চাষবাস করা সম্ভব। সেই থেকে তারা ভল্লার সঙ্গে মেতে উঠেছে, তাকে সর্বতো সাহায্য করেছে, বাঁধ নির্মাণে। দুপক্ষই উৎসাহী হয়ে নালার দুপাশের অনাবাদী বেশ কিছু জমিকে আবাদযোগ্য করে তুলেছে। সরু সরু শিরার মতো নালা কেটে তারা দুপাশের জমিতে চারিয়ে নিয়েছে বাঁধের জল। বপন করেছে বাদাম ও তুলোর বীজ। বিগত পনের-বিশ দিনে সে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ কয়েকটি মাঠ।

একধরনের নেশা আছে সবুজ রঙে। বিশেষ করে সে সবুজ যদি হয় সম্ভাব্য শস্যের স্বপ্ন। সে স্বপ্নে চাষীরা বিভোর হয়ে থাকেন। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে, বাড়িতে গিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। রাত্রে ঘুম ভেঙে বারবার উঠে বসেন। জঙ্গলের ইঁদুর, খরগোশ, শজারুরা রাত্রেই খাবারের সন্ধানে বের হয়। চারাগাছ উপড়ে বীজ খেয়ে তারা যদি শস্যের সর্বনাশ করে? যতদিন না গাছগুলি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, ততদিন এই দুশ্চিন্তা।

ভল্লাকে দেখে সুকরা গাঁয়ের বয়স্ক চাষী ভীলককাকা একগাল হেসে বললেন, “গতকাল রাত্রে গাঁয়ের ছোকরারা সব রামকথা শুনতে গিয়েছিল। তুই যাসনি, বেটা?”

ভল্লা হাসল, বলল, “ইচ্ছে তো ছিল, কাকা। রামকথা শুনতে অনেক ধরনের লোক যায় – আমাকে চিনে ফেললে, বিপদে পড়ে যাব। সেই ভয়ে যাইনি। এই যে তোমাদের এখানে এসেছি, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে…কেউ দেখে ফেললেই বিপদ”।

ভীলককাকা বললেন, “হুঁ। তার মানে তুই জানিস না। নোনাপুরের এক ছোকরাকে কাল রাতে সাপ কামড়েছে!

“সাপে কেটেছে? কই শুনিনি তো! কাকে কেটেছে জানো, কাকা?”

“হানোকে। ডাকাবুকো তাজা ছেলেটা – এভাবে মারা যাবে - ভাবা যায় না”।

“হানো? কী বলছো, কাকা? সেই জন্যেই আজ ভোরে কেউ আসেনি আমার কাছে। ভাবলাম, পালাগান শুনে হয়তো শেষ রাত্রে বাড়ি ফিরে সব ঘুমোচ্ছে...। কিন্তু...কিন্তু আমার এখন কী করা উচিৎ, কাকা? আমার যে একবার হানোর বাড়িতে যাওয়া খুব দরকার। ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসত – যা বলতাম সব শুনত - দারুণ কাজের ছেলে”।

ভীলককাকা বললেন, “সবই বুঝছি, ভল্লা। কিন্তু এসময় তোকে গাঁয়ে দেখলে, সকলেরই বিপদ বাড়বে। শত্রুর তো আর শেষ নেই গ্রামে”।

ভল্লা চিন্তাগ্রস্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তা ঠিক”। কোন কথা না বলে নোনাপুর গ্রামের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর অবসন্ন গলায় বলল, “আমি নোনাপুর গ্রামে আসার পর থেকেই নানান অঘটন ঘটে চলেছে, কাকা। আমার মনে হয় এই অঞ্চল ছেড়ে আরও দূরে কোথাও আমার চলে যাওয়া উচিৎ”।

ভীলককাকা বললেন, “অঘটন? অঘটন আবার কী ঘটল?”

অন্যমনস্ক ভল্লা বলল, “ওই যে, রাজকর্মচারী শষ্পক গ্রামপ্রধানকে অপমান করল। গ্রামপ্রধান কর আদায়ে কিছুটা ছাড়ের জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। শুনলাম শষ্পক এককথায় তাঁর সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। আমাকে নিয়েও কি কম কথা শুনিয়েছে, বয়স্ক সম্মানীয় গ্রামপ্রধানকে। যাচ্ছেতাই, সে সময় আমি তো ছিলাম সামনে, সব শুনেছি। সে সব কথা কানে শোনাও পাপ। এখন আবার হানোটা এভাবে অপঘাতে চলে গেল...না কাকা, এ অঞ্চলে আর নয়”।        

 ভীলককাকা সান্ত্বনার সুরে বললেন, “বুঝতে পারছি, হানোর এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা তোর বুকে বড়ো বাজছে। কিন্তু এসবের জন্যে তুই নিজেকে দুষছিস কেন? তুই কী করবি? জ্ঞান হয়ে থেকে রাজকর্মচারীদের ঔদ্ধত্য আর অপমানের কথা আমরা শুনে আসছি, আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের থেকে। ও সব আমাদের কাছে নতুন নাকি? আর সাপে কামড়ানোর কথা বলছিস? আশেপাশের চার-পাঁচখানা গাঁয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ। ছেলে-ছোকরা, ব্যাটাছেলে বা মেয়েছেলেদের মধ্যে দু-একজনের অপঘাত মৃত্যু হয়নি – এমন একটা বছর আমাকে দেখা তো। সাপেকাটা, জলে ডোবা, গলায় দড়ি... একটা না একটা অপঘাত মৃত্যু লেগেই আছে প্রতি বছর। এই তো গত বছর, একটু মেঘ করে – চটাপট এমন শিলাবৃষ্টি হল, আমাদের গাঁয়ের রাখাল কালডি মারা গেল ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। সঙ্গে মরল চারটে ছাগল। এসবই আমাদের জীবনের অঙ্গ রে ভল্লা, তোর থাকা না থাকায় কী আসে যায়? তোর কমলিমা আর গ্রামপ্রধান জুজাকের দুটি ছেলেই যে সাপের কামড়ে মারা গেছিল – সে কথা শুনিসনি?”

বাঁধের ওপর ভীলককাকা আর ভল্লা দুজনেই চুপ করে পাশাপাশি বসে রইল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর ভীলককাকা আবার বললেন, “তুই এসে এই যে নালার মধ্যে বাঁধ গড়ার বুদ্ধি দিলি। তোর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা সেই বাঁধ বানালাম। আমাদের দুটি গ্রামের বেশ কিছু বাঁজা জমিকে আমরা সবাই মিলে আবাদী করে তুললাম। এর মূল্য কিছু কম নাকি? সে কথা ভুলে যাচ্ছিস কী করে?”                

ভল্লা বলল, “কাকা, এ বাঁধটা আমরা ভালই বানিয়েছি, কী বলো?”

সে কথা আর বলতে! বাপ পিতেমোদের সময় থেকেই তো এই নালা বয়ে চলেছে। কারও মাথায় আসেনি এখানে বাঁধ দিয়ে কিছু জমি চাষবাস করা সম্ভব। তুই এসে পথ দেখালি, রে ব্যাটা”।

“কিন্তু এ বাঁধের নীচের সরু সরু ছিদ্র দিয়ে জল কিন্তু ভাটায় বেরিয়ে চলেছে, কাকা। সেই জলের গতি কমাতে না পারলে, এ বাঁধ কিন্তু দুর্বল হয়ে যাবে। সামনের বর্ষায় হয়তো ভেঙেই পড়বে”।

“এ কথা তুই আগেও বলেছিস, বেটা। কিন্তু কী দিয়ে আটকাবো?”

“শক্ত এঁটেলমাটি যোগাড় করতে পারো না, কাকা? তোমাদের সুকরা কিংবা নোনাপুরে?”

“সে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সে মাটিতে কী হবে?”

“এঁটেলমাটির বড়ো বড়ো চাঙর বাঁধের জলে ফেলে দিও। সে মাটি গলে গিয়ে জলের সঙ্গে বইতে থাকবে ওই সরুসরু নালিপথে। ধীরে ধীরে কমে যাবে জলের ধারা ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নোনাপুরের কেউ আজ মাঠে আসেনি – হানোর হঠাৎ মৃত্যুটা সবাইকে পাথর করে দিয়েছে, না কাকা?”

হ্যাঁ। ও গাঁয়ের পাঁচজন লোক সারারাত পাহারা দিয়েছে, আমাদের লোকদের সঙ্গেই।  যেমন রোজ দেয়। কিন্তু সকালে কেউ আসেনি”

“রাতে কিসের পাহারা, কাকা?”

“ইঁদুর, শজারু আছে, মাঝে মাঝে আসে হরিণের পাল – তাদের থেকে শস্য পাহারা দেওয়া আমাদের বরাবরের অভ্যাস বেটা। ডপলি, ঢাকের আওয়াজ করে, আগুনের মশাল জ্বেলে তাদের দূরে রাখতে হয়”।

“তাই? দুটো শস্যের জন্যে কী পরিশ্রমই করতে হয়, তাই না, কাকা? কিন্তু রাজারা রাজস্ব আদায়ের সময় এসব কথা চিন্তাও করে না”। ভল্লার স্বরে কিছুটা উষ্মা।

“এটা ঠিক নয়, বেটা। তোরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা বুঝিস না, রাজা এই সমস্ত জমির মালিক।  তিনিই আমাদের জীবন ধারণের জন্য বাস্তু আর আবাদের জমি দিয়েছেন। তার বদলে তাঁরা কর নেবেন না? কর না নিলে তাঁদের চলবে কী করে? কী করে বানাবেন রাস্তাঘাট? কী করে রাজ্যের সুরক্ষা সামলাবেন?”

“রাজা কী করে জমির মালিক হলেন? এই মাটি, জল, হাওয়া, রোদ্দুর, শস্যের বীজ সবই তো ভগবান সৃষ্টি করেছেন”।

ভীলককাকা প্রশ্রয়ের হাসি মাখা মুখে বললেন, “ভগবানই তো সৃষ্টি করেছেন, বেটা। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু বিলিব্যবস্থার জন্যে তিনি যে রাজাকেও নিয়োগ করেছেন”।

ভল্লা কিছুক্ষণ ভীলককাকার স্নেহসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, “সেই রাজার শালা, বছরের পর বছর মেয়েদের যাচ্ছেতাই অসম্মান করবে। রাজা মুখ বুজে বসে বসে দেখবে। আমরা রক্ষীরা তাকে শায়েস্তা করলে আমাদের নির্বাসন দেবে। এই কাজের জন্যেও কি ভগবান রাজাকে নিযুক্ত করেছিলেন, কাকা?” হঠাৎ করেই ভল্লা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকা তুমি আমাকে যতই বোঝাও, আমি বুঝব না। আমি এখন চলি কাকা, তোমরা সাবধানে থেক।

বাঁধ থেকে নেমে নালার ধারের ঝোপঝাড়ের আড়ালে হনহন করে ভল্লা এগিয়ে গেল তার কুটিরের পথে। ভীলককাকা তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, “ভগবান যে এই সব কিছুর মধ্যে নেই, সে কথা কী আর আমরা বুঝি না, বেটা? আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে, তোর মতো কেউ পাশে দাঁড়ালে, হয়তো আমরাও…। ভগবান তোকে দীর্ঘ পরমায়ু দিন, বেটা”। 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১



শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ " 


১৩

 

শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।

শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”

জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।

শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।

জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।

শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে”।

জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর, শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”

ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।

শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্‌গির সম্ভব, সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান, ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”

শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!

ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটা বুঝে নিতে চাই”। একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য মুদ্রা হলে ভালো হয়”।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।

“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব। তাতেই আপাতত চলে যাবে”।  

শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ? আশ্চর্য!”

“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর ডাকাতি করব”।

“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না, হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি, ভল্লা?”

“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।

শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির স্থাপনা করেন...”।

শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে! রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় নেই।”

“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।

শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”

“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।

আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।

“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।

“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।

এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড। মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস, তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে – সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”

লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ! 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮



সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৪ 


২১ 

মারুলা আর ভল্লা রণপা নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে একটা নির্দিষ্ট বিশাল গাছে উঠে বসল। বিশাল এই মহানিম গাছের মস্ত মোটা একটা ডালে দুজনে মুখোমুখি বসল, পা ঝুলিয়ে, বেশ আরাম করে। তাদের পায়ের নীচে এবং মাথার ওপর ঘন পাতার ছাউনি। নীচ থেকে কেউ ওপরে তাকালেও সহজে তাদের কেউ খুঁজে পাবে না। তার ওপর মধ্যরাতের একটানা হাওয়ায় পাতায় পাতায় যে রকম ঝরঝর শব্দ হচ্ছে, তাতে গাছের তলা থেকে তাদের কোন কথাই, নীচের থেকে শুনতে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। গাছের ডালে রণপা জোড়া ঝুলিয়ে রেখে মারুলা বলল, “কী বলল, তোর কমলিমা?”

ভল্লা খুব চিন্তিত ও বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “খুবই খারাপ বার্তা রে মারু। যে কাজটা করতে আমার মন থেকে একটুও সায় নেই...সে কাজটাই এখন খুব শিগ্‌গির আমাকে করতে হবে অথবা কাউকে দিয়ে করাতে হবে”।

অবাক হয়ে মারুলা বলল, “কী কাজ? কী করতে হবে তোকে?”

ভল্লা উপরের দিকে তাকিয়ে ঝিলিমিলি পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশের দিকে চোখ রেখে  বলল, “যে কবিরাজের কথা তোকে তখন বলছিলাম না? সেই কবিরাজ। হতভাগা বুড়ো বড়ো বেশি বুঝে ফেলেছে। বুঝেছিস তো বুঝেছিস, সে বেশ কথা, নিজের মনে চুপ করে থাকলে কোন ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তা না, বুড়ো সেসব কথা লোককে বলেও বেড়াচ্ছে। গ্রামপ্রধান জুজাক জানে, জানে কমলিমা...হয়তো আরও অনেকে”।

মারুলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝে ফেলেছে?”

ভল্লা বলল, “আমি এ গাঁয়ে আসার পরেই, জানিস নিশ্চয়ই, ওই বুড়োই আমার চিকিৎসা করেছিল। শুনেছি, আমি যখন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম – সে সময়েই নাকি বুড়ো বলেছিল, এ ছোকরা, অর্থাৎ আমি, নাকি সাধারণ লোক নই। বলেছিল, বহুদূর থেকে আসা, ভয়ংকর অসুস্থ এই ছোকরা আমাদের গ্রামে যে আচমকা এসে পড়েছে – এমনটা হয়তো নয়। হয়তো এখানে আসার পিছনে বড়ো কোন পরিকল্পনা আছে”!

“বলিস কী? এ কথা শষ্পককে বলেছিলি?”

“না, বলিনি। আসলে সে সময় বুড়োর কথায় আমি কেন, গাঁয়ের কেউই তেমন কান দেয়নি। কিন্তু আজ জানতে পারলাম, বুড়ো অসাধারণ বুদ্ধি ধরে। জুজাককে সে বলেছে, গত রাত্রে নোনাপুর গাঁয়ের কেউই নাকি রামকথা শুনতে যায়নি। তার মানে, এই গাঁয়ের ছোকরারাই যে আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত – সে ইঙ্গিতও বুড়ো দিয়ে গেছে”।

“কী বলছিস? বুড়ো তো তার মানে সবটাই বুঝে গেছে”।

“হুঁ। সবটাই। আমার সঙ্গে রতিকান্তর রাজধানীতে ঘটা সেই ঘটনার দিন থেকে মাত্র তিনরাত-তিনদিনে, কীভাবে আমি নোনাপুর পৌঁছলাম, বুড়োর মনে সেটাও সন্দেহ জাগিয়েছে। কোন সুস্থ সবল মানুষের পক্ষেও ওই সময়ে এতটা পথ পায়ে হেঁটে আসা সম্ভব নয়। অতএব, আমি অধিকাংশ পথই যে ঘোড়ায় চড়ে বা রণপায়ে এসেছি...সেটা এই বুড়ো অনুমান করে নিয়েছে। নির্বাসনে যেতে সুবিধে হবে বলে, কোন প্রশাসন একজন অপরাধীকে ঘোড়া দিয়ে সাহায্য করে বল তো?”

“অর্থাৎ, তুই হয় অত্যন্ত ক্ষমতাশালী কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিস। অথবা তোকে রাষ্ট্রই পাঠিয়েছে অত্যন্ত গোপন কোন উদ্দেশে”।

“ঠিক তাই। বুড়োর মনে হচ্ছে দ্বিতীয়টা”।

“সর্বনাশ, এসব কথা পাঁচকান হলে, আমরা সকলেই  ফেঁসে যাবো রে...। তা, তুই এখন কী করতে চাইছিস?”

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “আগেই বললাম না, যে কাজটা করতে আমি চাইছি না - সেটাই খুব তাড়াতাড়ি করাতে হবে। কবিরাজবুড়োকে সরাতে হবে”। ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “নিজের গ্রাম, প্রতিবেশী গ্রামের মানুষজন এমনকি এই রাজ্যের সকলের ভালোর জন্যে সারাজীবন চিন্তা করে গেছে যে বুড়ো। অত্যন্ত বিদ্বান, বুদ্ধিমান কিন্তু বড্ডো সরল এবং একরোখা সেই বুড়োটা মরবার সময়েও বুঝতে পারবে না,  ঠিক কী অপরাধে ওর মৃত্যু হল…”। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ।  

মারুলা ভল্লার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ও ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দে ভল্লা। বুড়োর আয়ু ফুরিয়ে গিয়েছে, হয়তো আগামী দিনটাই তার শেষ...”।

নিজের কাঁধে রাখা মারুলার হাতটা ধরে ভল্লা বলল, “দেখিস আমার নাম যেন কোনমতেই সামনে না আসে”

“নিশ্চিন্ত থাক, ভল্লা। তোর নাম সামনে আসবে কেন?”

“প্রশাসনের হাতে বুড়োর মৃত্যু হলে - আমার কাজটা অবশ্য এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে যাবে”।

মারুলা ভল্লার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “তোর মতো তিলে খচ্চর আমি আর দুটি দেখিনি ভল্লা। একদিকে তুই বলছিস, বুড়োকে তুই বেজায় শ্রদ্ধা করিস। অন্যদিকে তুই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে দিলি। আবার আমাদের হাতে বুড়ো মরলে, গাঁয়ের ছেলেদের মনে যে ক্রোধ জমবে – সেটাকে ভাঙিয়ে তুই বিদ্রোহের আগুনটা আরও উস্কে নিবি। এই না হলে, তুই শালা ভল্লা?”।

ভল্লা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে বলল, “হ্যাঁ, রাজনীতি ব্যাপারটা আদতে খচ্চরদেরই সৃষ্টি। ভালো আর মন্দ, ঔদার্য আর তঞ্চকতা, সহমর্মীতা আর নিষ্ঠুরতাকে মনের মধ্যে পাশাপাশি বসিয়ে রাজনীতির চর্চা করতে হয়। তাঁর বিচক্ষণতার জন্যে রাষ্ট্রের অভিনব এই পরিকল্পনাটাই হয়তো ভেস্তে যাবে। অতএব মরতে তাঁকে হবেই। কবিরাজবুড়োর জন্যে আমি বাইরে শুধু লোক-দেখানে কাঁদব - তা নয়, মনে মনে সত্যিই কষ্ট পাবো। তবে মনে মনে একথা চিন্তা করেও সান্ত্বনা পাব যে, উনি নিজের জীবন দিয়ে আমার কাজটাকেই অনেক সহজ করে দিয়ে গেলেন। জীবনে বহুবার দেখেছি, প্রত্যেক অশুভ কাজের মধ্যেও মঙ্গল লুকিয়ে থাকে, বুঝেছিস মারুলা?” কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, ভল্লা নিজের আবেগটা সামলে নিল, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাগ্‌গে এবার ওদিকের সংবাদ বল? শষ্পকের নির্দেশ কী?

মারুলা বলল, “আস্থানে ডাকাতির সংবাদ শষ্পক রাজধানীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেক তেলমশলা মাখিয়ে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে। কিন্তু ডাকাতির কারণে উনি এখনই কোন গ্রামের ওপরে কোন পদক্ষেপ করতে চাইছেন না। বলছেন যে তাতে তোর নতুন চেলারা ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাবে”।

ভল্লা মাথা নাড়ল, “না, না আমার মনে হয় এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। আস্থানের রক্ষীদল গ্রামে এসে আমাকে পাগলের মতো খুঁজুক। সরাসরি ছেলেদের নয় – বয়স্কমানুষগুলোকে ভয় দেখাক, অপমান করুক। এক কথায় বেশ গভীর একটা সন্ত্রাসের আবহ পাকিয়ে তুলুক। বাবা-জ্যাঠার অপমান হলে গ্রামের ছেলেগুলো আরও তেতে উঠবে। শুধু এই গ্রামেই নয়, আশেপাশের গ্রামগুলোতেও। এর মধ্যেই তো কবিরাজের মৃত্যুটা হতে হবেকীভাবে সেটা তোরাই ঠিক করে নিস। আর গ্রামপ্রধান জুজাকেরও যেন ভালোরকম অপমান হয়। তবে না খেলা জমবে”।

মারুলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, ভল্লার কথা শেষ হলে বলল, “ঠিক আছে তাই বলবো। আর একটা কথা, শষ্পক বলেছেন চৈত্র মাসের পূর্ণিমাতে তিনি এদিকের আস্থান তুলে উত্তরের দিকে রওনা হবেন। তোর কথা মতো জায়গাতেই অস্থায়ী শিবির ফেলে পক্ষকাল বিশ্রাম নেবেন”।

“চৈত্রের পূর্ণিমা? গতকাল মাঘের পূর্ণিমা গেল। তার মানে মোটামুটি মাস দেড়েক। ঠিক আছে, কতদূর কী করা যায়, দেখি! আজ বিকেলেই পাশের রাজ্যের কিছু ছোকরা এসেছিল। তারাও তাদের রাজার বিরুদ্ধে লড়তে চায় এবং প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে চা। শষ্পককে জিজ্ঞাসা করিস, কোন অস্ত্রের কত মূল্য ধরা হবে, সেটা যেন তিনি নির্দেশ করে দেন। অথবা যে বণিক এই অস্ত্র-শস্ত্র বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছে সে যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়, তাহলে বাকিটা আমি বুঝে নেব

“আমার মনে হয় প্রতিবেশী রাজ্যের বিদ্রোহীদের অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রির নির্দেশ রাজধানী কখনোই দেবে না। প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক। তারা যদি জেনে যায়, তাদের রাজ্যের বিদ্রোহীদের আমরা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছি, তাতে দু রাজ্যের সম্পর্ক নষ্ট হবে। নষ্ট হবে বাণিজ্যিক সম্পর্কও”।

ভল্লা একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “না বুঝেই পোঁদপাকামি করিস না তো, মারুলা। আমাদের প্রশাসন ওদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিচ্ছে নাকি?  দিচ্ছি তো আমি! আমি কে? আমি এ রাজ্যের একজন বিদ্রোহী রাজরক্ষী। আমার অপরাধের জন্যে রাষ্ট্র আমাকে অনেক দিন আগেই নির্বাসন দণ্ড দিয়েছে। আমি রয়েছি আমার রাজ্য-সীমানার বাইরে।  আমি যদি কাউকে অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করি – রাষ্ট্রের দায় কোথায়?”

“তা হয়তো ঠিক। কিন্তু তুই অস্ত্র পাচ্ছিস কোথা থেকে? তোর তো আর নিজস্ব অস্ত্রের কারখানা নেই”!

মারুলার সরলতায় ভল্লা এবার হেসে ফেলল, বলল, “আমাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্রাগার থেকে পুরোন অস্ত্র-শস্ত্র বাতিল করে, বিশেষ কয়েকজন বণিককে বিক্রি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বণিক সেই অস্ত্র কিনে কী করবে - মাটির তলায় পুঁতে দেবে। নাকি নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। নাকি খেলনার মতো ভিন্ন রাজ্যের ছোকরাদের হাতে বেচে দেবে – সে তো বণিকদের মাথাব্যথা। তাতে রাষ্ট্রের কী করার আছে? আমি, জনৈক নির্বাসিত অপরাধী হলাম, একজন মাধ্যম – যার কাজ ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সম্পূর্ণ ব্যাপারটার মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়?”

মারুলা তাও ইতস্ততঃ করে বলল, “কী জানি আমার তাও মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা এতই সহজ? রাষ্ট্র এত সহজে দায় এড়াতে পারবে? আমাদের মন্ত্রী আর প্রশাসনিক কর্তারাই শুধু ধূর্ত – আর ও রাজ্যের প্রশাসন একেবারেই বোকাসোকা-ভোঁদাই এমন তো হতে পারে না।

“ছাড় না। আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে আমাদের কী প্রয়োজন? রাষ্ট্র কী করবে সেটা রাষ্ট্রকেই বুঝতে দে। আমাদের দায়িত্ব প্রশাসনের নির্দেশ মতো কাজ করা। ব্যস্‌। রাত্রি শেষ হতে আর হয়তো দণ্ড তিনেক বাকি আছে। তুই কেটে পড়। আমার সঙ্গে তোকে কেউ দেখে ফেললে, ভবিষ্যতে অসুবিধেয় পড়তে হবে।  শষ্পককে সব কথা জানাবি। বলবি, তাঁর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় আমি রইলাম”।

মারুলা গাছে থেকে নেমে আসার উদ্যোগ করতেই, ভল্লা বলল, “মারুলা, কবিরাজকে মেরে না ফেলে, আমাদের উচিৎ তাঁকে একটা সুযোগ দেওয়া, তাই না রে?”

মারুলা কিছু বলল না, ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল চুপ করে। ভল্লা বলল, “না মানে বলছিলাম, বুড়োকে কিছুটা মারধোর করে, আস্থানের বন্দীশালায় যদি ফেলে রাখা হয়। বিনা বিচারে। এখানে বিচার করবেই বা কে? বিচার তো হবে সেই রাজধানীতে। অতএব বিনা বিচারে দীর্ঘ দিন বন্দী। বুড়ো জব্দ হবে, কিন্তু প্রাণে তো বেঁচে থাকবে। কী বলিস?”  

মারুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভল্লাকে বলল, “ঠিক আছে, তাহলে শষ্পককে গিয়ে আমি তাই বলি?”

“কাজের সূত্রে আমি বহু মানুষের প্রাণ নিয়েছি, মারুলা। তারা কোনদিন আমার মনে দাগ কাটেনি। কিন্তু আমাদের হাতে ইনি মারা গেলে, আমার হাত থেকে ওঁর রক্তের দাগ কোনদিন মুছে উঠতে পারব না। হ্যাঁ শষ্পককে গিয়ে তাই বল, আপাততঃ বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাসই হোক ওঁনার ভবিষ্যৎ”।         

গাছ থেকে নেমে মারুলা রওনা হল আস্থানের দিকে। মারুলা নেমে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর ভল্লা রণপা জোড়া কাঁধে নিয়ে মাটিতে নামল। ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল তার বাসার দিকে। সে এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্বে তার মন এখন বিক্ষিপ্ত।

নির্দিষ্ট ঝোপের আড়ালে দুজোড়া রণপা আগে লুকিয়ে রেখে, নিজের বাসার সামনে এসে চমকে উঠল ভল্লা। রামালি! রামালি শুয়ে আছে, তার ঘরের সামনে মাটিতে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬ "    


মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯ 


২৬ 

গতকাল দুপুরে নোনাপুর এবং সুকরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আস্থানের রক্ষীরা যে ব্যবহার করেছে, তারপরে আজকের ভোরটা ভল্লার কাছে অত্যন্ত সঙ্কটজনক। যদিও গতকাল রাত্রে সে আর রামালি দুই গ্রামেরই কিছু ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাতের গোপন অন্ধকারে বড়ো বড়ো কথা বলা, আর প্রকাশ্য দিবালোকে নিজের নিজের পরিবার - মা-বাবা-ভাই-বোনদের সামনে দিয়ে হেঁটে, ভল্লার কাছে মহড়ায় যোগ দিতে আসার অন্য মাত্রা আছে। তার জন্যে প্রয়োজন প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভয়হীন বুকের খাঁচা।  

ছেলেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সকলেই এখন সন্ত্রস্ত। তাদের চোখে-মুখে অসহায় বিপন্নতা। একে তো আস্থানের রক্ষীরা অভিযোগ করেছে, এই গ্রামের ছেলেরাই আস্থানে ডাকাতি করেছে। তিনজন রক্ষীকে মেরে ফেলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, এসবই ঘটেছে, রাজার দণ্ড পাওয়া অপরাধী ভল্লার উস্কানিতে। কোন ঘটনা এবং অভিযোগেরই প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই – সবটাই অনুমান নির্ভর। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই গতকাল তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। বন্দী করে নিয়ে গেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজকাকাকে। বীভৎস প্রহারে মৃতপ্রায় করে দিয়েছে গ্রামপ্রধান জুজাককে। তারপরেও গ্রামের ছেলেরা যদি ভল্লার কাছেই যায় শরীর চর্চা করতে, পরিবার-পরিজনদের এবং প্রতিবেশীদের আতঙ্ক বাড়বে। বাড়বে নিজের নিজের ছেলেদের প্রতি সন্দেহ। যারা বিশ্বাস করত, আমাদের ছেলেরা কোন কুকাজ করতে পারে না। তারাও এবার সন্দিহান হয়ে উঠবে। ছেলেদের এখন লড়তে হবে ঘরে এবং বাইরে। ঘরের লড়াইটাই বেশি কঠিন - স্নেহ-মমতাপ্রবণ পরিবারের সঙ্গে মানসিক লড়াই। তার থেকে বাইরের লড়াইটা অনেক বেশি স্পষ্ট।   

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নোনাপুর গ্রাম থেকে এল চোদ্দজন। আর সুকরা থেকে আটজন। ভল্লা সকলকে বসতে ইশারা করল। সকলে বসার পর ভল্লা বলল, “কী করে এলি তোরা? মা-বাবা, ভাই বোনরা কেউ মানা করল না?”

শল্কু হাসতে হাসতে বলল, “করেনি আবার? আমার মা তো হাতে পায়ে ধরতেই যা বাকি রেখেছেন। বোনদুটো এমন কাঁদছিল বেরোনোর সময়”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? পারবি? এই বাধা রোজ পেরিয়ে, লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে?”

শল্কু বলল, “ভল্লাদাদা, কে কী করবে আমি জানি না। আমি তো আসবোই। রক্ষীদের নাম শুনলেই,  ছোটবেলা থেকে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের দেখেছি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে। তোমার এখান থেকে গতকাল ফিরে গিয়ে যা দেখলাম, যা বুঝলাম, রক্ষীরাও ভয় পায়। এতদিন ওদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি, ওরা যা খুশি করে গেছে। ওদের গায়ে আমরা একবার হাত তোলাতেই – ওরা ভয়ে দৌড়ে চলে আসছে গ্রামে গ্রামে। অপমান করছে গুরুজনদের। কবিরাজকাকাকে ধরে নিয়ে গেল...তিনি কি আমাদের ডাকাতি করতে শিখিয়েছেন? নাকি ডাকাতি করতে আমাদের উস্কেছেন? আসলে এবার ওরাও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে ভল্লাকে। ভয় পেয়েছে ভল্লার দলকে। আমরা যদি ভয়ে সিঁটিয়ে আবার গিয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকি, ওরা তো আমাদের সকলের ঘাড়ে বসে হাগবে, ভল্লাদাদা! যে পথে আমরা এগিয়েছি...সেখান থেকে আমি অন্ততঃ ফিরে আসবো না, ভল্লাদাদা। হয়তো মরবো, কিন্তু মরার আগে ওদের টের পাইয়ে দিয়ে মরবো”।

ভল্লা লক্ষ্য রাখছিল, শল্কু্র কথাগুলো বাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে। তাদের মনে হয়তো কিছু দ্বিধা ছিল, সেটা ফিকে হয়ে উঠছে শল্কুর প্রত্যয়ী কথায়। তাদের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠছে। তাদের চোখে ফুটে উঠছে ক্রোধ।

ভল্লা সবাইকে ভাবতে একটু সময় দিল, তারপর বলল, “তোরাও কি শল্কুর সঙ্গে একমত? মনে কোন ভয় বা দ্বিধা নেই তো?”

ছেলেরা প্রায় একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাদের লড়তে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়বো”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ। আমি শেখাবো। নিজে হাতে ধরেই শেখাবো। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কোনদিন বিশ্বাস ভাঙবে না। প্রাণ দিতে হলেও না। একটা কথা মনে রাখিস – তোদের এই ভল্লাদাদাও কম নিষ্ঠুর নয়। চাপে পড়ে বা ভয়ে কেউ যদি রাজসাক্ষী হয়েছিস – কিংবা আমাদের কথা এই দলের বাইরের কাউকে বলেছিস, অন্য কেউ নয় - আমার হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাজি?”

“রাজি”! সকলের সমবেত চিৎকার, জঙ্গলের মধ্যে গর্জনের মতো শোনালো।

ভল্লা সুকরা গ্রামের সুরুলকে বলল, “সুরুল, গতকাল রাত্রে তোর সঙ্গে কথা বলার সময়, তোর মধ্যে যে জেদ আর রাগ দেখেছিলাম, সেটা কি এখনো আছে? নাকি একটু ভয় ভয় করছে”?

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে গতকাল ওরা যেভাবে অকারণ আঘাত করল, তার শোধ তো আমি তুলবই, ভল্লাদাদা। আমাদের সকলের মনের জোর আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু রক্ষীদের সঙ্গে লড়ার দক্ষতা নেই...তুমি আমাদের শেখাও ভল্লাদাদা।

“তবে, মনে রাখিস, লড়াই শিখতে গেলে জরুরি হচ্ছে, ধৈর্য আর জেদ। এ দুটো যার যত বেশী, সে শিখবে তত তাড়াতাড়ি। চল, তাহলে এখনই শুরু করা যাক”।  

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, আমাদের রণপাগুলো বের কর। আজ রণপার খেলা শেখাই সবাইকে”। রামালি দুজোড়া রণপা এনে ভল্লার হাতে দিল। ভল্লা একজোড়া রেখে অন্য জোড়াটা দিল রামালিকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাঁশের এই লাঠি দুটোয় চড়ে আমরা আজ হাঁটতে শিখব। আমাদের ঘোড়া নেই...ঘোড়ার বদলে আমাদের আছে রণপা। এই রণপা শুধু যে আমাদের পা দুটোকে লম্বা করে দেবে তাই নয়, প্রয়োজনে এই রণপা আমাদের অস্ত্রও হয়ে উটবে। এই লাঠির আঘাতে শত্রুর মাথাও ফাটানো যাবে অনায়াসে। কাজেই রণপা বড়ো কাজের জিনিষ। এখন আমি আর রামালি তোদের দেখাব – কীভাবে এতে চড়তে হয়, কীভাবে হাঁটতে হয়। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে দৌড়তেও হবে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই রণপায়ে চড়ল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখাল সবাইকে। আহোক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী করে শিখলি, রামালি?” রামালি স্বচ্ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বলল, “গতকাল ভোরে ভল্লাদাদা শেখাল। কাল সারাদিনে হাঁটতে শিখেছি...এবার দৌড়তেও শিখব”।

ভল্লা বলল, “সুকরার ছেলেরা ছাড়া, তোরা সবাই জানিস, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কোথায় লুকোনো আছে...চল সবাই ওদিকে যাই...ওখান থেকে রণপা নিয়ে এখনই মহড়া শুরু করব। রামালি তুই আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে আয়, আমি এগিয়ে যাচ্ছি”।

পলক ফেলার আগেই রণপা চড়ে ভল্লা যেন উধাও হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর। দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত ছেলেরা। শুধু একজোড়া লাঠি নিয়েই এত দ্রুত চলাফেরা করা যায়? তাও এই জঙ্গলের রাস্তায়? রামালি ওদের পাশে রণপায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, “শল্কু, কাকার কী অবস্থারে?”

শল্কু খুব মন দিয়ে রামালির হাঁটা দেখতে দেখতে বলল, “আজ ভোরে শুনলাম একটু ভাল আছেন। উঠে বসেছেন। তবে তোর কাকি একদম চুপ মেরে গেছে, জানিস তো? চাইলে তুই আবার ফিরে আসতে পারিস। মনে হয় না, তোর ওপর কাকি আর কোন চোটপাট চালাবে।”

রামালি হেসে বলল, “ধূর কী হবে, কাকার সংসারের বোঝা হয়ে থেকে? আমাকে কিছু না বললেও, কাকাকে ছেড়ে দেবে? এই ভালো – ছোটবেলা থেকে বহু সহ্য করেছি... খুব ভয়ে ভয়ে বড়ো হয়েছি। আর না...এবার বাঁচবো...তার জন্যে যদি মরতে হয়...তাও। মরার আগে এটুকু অন্ততঃ জেনে যাবো... বসে বসে মার খাইনি, চেষ্টা করেছিলাম...”!

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “কাল তোমাদের গাঁয়ে এসে রক্ষীরা কী করেছে, শল্কুদাদা?”

শল্কু বলল, “গ্রামে এসেই তো শুয়োরের বাচ্চারা যাকে সামনে পেয়েছে চাবুক মেরেছে। কেউ কেউ তো আবার বল্লমের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়েছে। বাচ্চা, বুড়ো, মেয়েছেলে কাউকে ছাড়েনি। ভাবলেই মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, কার কার বাড়িতে ডাকাতির মাল রাখা আছে...বার করে দে...নয়তো আগুন ধরিয়ে দেব সব কটা বাড়িতে। সেই সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন কবিরাজকাকা। আর পৌঁছুলেন গ্রামপ্রধান জুজাককাকা...”।

আহোক বলল, “ভল্লাদাদা আমাদের গাঁয়ে ঢুকতে মানা করেছিল। আমরা থাকলে, ভয়ংকর কাণ্ড হয়ে যেত। আমার ছোটকাকার কাছে শুনলাম, প্রধানমশাই ওদের সামনে গিয়ে, বলার মধ্যে বলেছিলেন, “আমি এই গ্রামের প্রধান, আপনাদের কোন অভিযোগ থাকলে, আমাকে বলুন...যাকে তাকে সবাইকে এভাবে আপনারা মারতে পারেন না...দেশে কি রাজা নেই নাকি? এটা কি অরাজক দেশ?” ব্যস্‌, আর যায় কোথায়, গুয়োর ব্যাটারা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমশাইয়ের ওপর। কী মার কী মার। বল্লমের বাঁট, লাথি, চড় ঘুঁষি। কবিরাজকাকা গ্রাম প্রধানকে বাঁচাতে গিয়েছিল, তাকেও বেধড়ক মারল। লাথি মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

এই সময়েই বেরিয়ে এসেছিল রামালির কাকি। গলার শির ফুলিয়ে নাকি চেঁচাচ্ছিল, “ওদের মারছো কেন? ওরা কী করেছে? ডাকাতি তো করেছে, বাপ-মা খেগো রামালি আর ওই আঁটকুড়ির বেটা ভল্লা। তাদেরকে ধরো না। ওদের কাছেই পেয়ে যাবে সব লুঠের মাল। এ গাঁয়ে কোন বাড়িতে কিচ্ছু নেই।

রামালির কাকির চিৎকারে রক্ষীরা একটু থমকে গিয়েছিল। না হলে গ্রামপ্রধান কালকেই শেষ হয়ে যেত। অকথ্য গালাগাল দিয়ে রক্ষীদের সর্দার বলল, এই রামালিটা আবার কোন বেজন্মা? রামালির কাকা গিয়েছিল, বউকে সামলাতে, সে বলল, আজ্ঞে আমার দাদার ছেলে, আমরা গতকালই ঝ্যাঁটা মেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এবার শুরু হল রামালির কাকার ওপরে মার...শুয়োরের বাচ্চা, কে তোদের তাকে তাড়াতে বলেছে?  সে এখন কোথায়? কাকাকে বাঁচাতে, কাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে আর এই গ্রামে নেই... হাভেতে ভল্লার সঙ্গে গিয়ে জুটেছে।

রক্ষীরা যখন রামালির কাকা আর কাকিকে নিয়ে ব্যস্ত, ওদিকে প্রধানমশাইয়ের তখন জ্ঞান নেই, মাটিতে পড়ে আছেন মড়ার মতো। কবিরাজকাকা ধুলো থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গেলেন প্রধানমশাইয়ের কাছে, ওখানেই তিনি নাড়ি পরীক্ষা করে দেখছিলেন প্রধানমশাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে। রক্ষীসর্দারের চোখ শালা শকুনের মতো, ঠিক দেখেছে। রাক্ষসটা কবিরাজকাকার কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাকে ওঠাল, বলল, অ তুই বুঝি সেই কবিরাজ? আশপাশের গাঁগুলোতে তোর কথাও তো খুব শুনেছি...তুইই শালা সবাইকে খেপাচ্ছিস। ঢ্যামনা ঢকঢকে বুড়ো তুই আমাদের সঙ্গে চল...তোর পেটে পা দিলেই, ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসবে গোপন সব কথা।

লোকটা কবিরাজকাকাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল রামালির বাড়ির সামনে। প্রধানমশাইয়ের রক্তাক্ত দেহটা পড়ে রইল মাঠেই। রামালির বাড়ি তছনছ করে কী খুঁজল, দেখল কে জানে। যাবার সময় রামালির কাকাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেল ওদের উঠোনে। তারপর বাইরে এসে সকলে ঘোড়ায় চড়ল, কবিরাজকাকার দুই হাত আর কোমরে দড়ি বাঁধল। রওনা হওয়ার আগে গাঁয়ের সবাইকে শাসিয়ে গেল, ভল্লা আর রামালিকে যদি না পায়, ওরা আবার আসবে। ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। কবিরাজকাকার পা দুটো ঘষটাতে লাগল মাটিতে, ঠোক্কর খেতে লাগল, পথের ধারের পাথরে, ঝোপঝাড়ে”।  

আহোক বর্ণনা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। আহোক আবার বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে এইসব ঘটনার কথা যখন শুনছি, সবাই ছিল সামনে - বাবা, জ্যাঠা, অন্য কাকারা...মা কাকিমারা...ভাইবোনগুলোও...আমি বললাম গাঁয়ের এতগুলো মানুষ রয়েছো – কেউ বেরিয়ে গিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে না? জ্যাঠা গম্ভীর গলায় বলল, জুজাক তো গিয়েছিল। কবিরাজদাদাও গিয়েছিল...ওদের কী হয়েছে সবই তো শুনলি...আমরা গেলেও একই দশা হত...কী আর বলবো...বয়স্ক গুরুজন... রাজরক্ষীদের ভয়ে এরা কোনদিন মাথা তুলে বাঁচতেই শেখেনি...”

সুরুল বলল, “এসব দেখে শুনেও আমাদের রক্ত যদি গরম না হয়...যদি এর শোধ না নিই...রক্তখেকো রক্ষীদের যদি এখনই উচিৎ শিক্ষা না দিই...তাহলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না, আহোকদাদা...রোজ রোজ তিলে তিলে মরার থেকে...ওদের অন্ততঃ একজনকে মেরে যদি মরি...সেটাই হবে প্রকৃত বাঁচা...”।

তেইশজন ছোকরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের পথে।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ "

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...