বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ 


৩৮

জনাই বেরিয়ে যেতে রামালি ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, প্রতি প্রহর শেষ হলেই কি এখানে ঘন্টা বাজানোর নিয়ম? সকালে শুনলাম একবার, এখন দুবার। সারা দিনরাতে এরকম মোট আটবার ঘন্টা বাজানো হয় - প্রতিদিন?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ। চটির অতিথি এবং কাজের লোকদের সুবিধের জন্যেই ঘন্টা বাজাতে হয়। কাকে কখন খেতে দিতে হবে। কার কখন কী কাজ - সেসব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে…”।

“বাবা। কী করে বোঝে ঠিক কখন কখন প্রহর শুরু হচ্ছে আর শেষ হচ্ছে? সূর্য দেখে?”

“সূর্য দেখে মোটামুটি বোঝা যায় ঠিকই – কিন্তু মেঘলা দিনে কিংবা রাত্রে কি সূর্য দেখা যায়?”

“না। তাহলে?”

“ঘড়ি আছে – জলঘড়ি”।

“জলঘড়ি? সে এবার কী?”

“ঘড়ির দুটো মানে হয় – ঘটিকা বা ঘন্টা – মানে প্রতি প্রহরের তিনভাগের এক ভাগ। আবার যে যন্ত্র দিয়ে এই ঘটিকা মাপা যায় – তাকেও ঘড়ি বলে। বিকেলে জনাইকে বলব, জলঘড়ি কেমন হয় তোকে দেখিয়ে দেবে। ব্যাপারটা বেশ মজার। বড়োসড়ো একটা গামলায় জল ভরে রাখা থাকে। সেই জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট একটা ঘটি। সেই ঘটিটা সাধারণ নয় – তার তলায় খুব ছোট্ট একটা ছিদ্র করা থাকে। সেই ছিদ্র দিয়ে গামলার জল ধীরে ধীরে ঘটিতে চুঁয়ে চুঁয়ে ঢোকে। এভাবে জল ঢুকতে ঢুকতে ওই ফুটো-ঘটিটা ভরে গেলেই, টুপ করে গামলার জলে ডুবে যায়। ওই ঘটিটা ভরতে যত সময় লাগে সেটাই হল এক ঘটিকা বা ঘন্টা। এরকম তিনবার হলে – এক প্রহর হয়। এই ব্যবস্থার জন্যে নির্দিষ্ট লোক আছে – যাদের কাজ হল – ঘড়িটা সঠিক চালানো - এবং ঘটিকা গুণে প্রহর শেষের ঘন্টা বাজানো। বড়ো বড়ো শহরে – প্রতি ঘটিকাতেই ঘন্টা বাজানো হয়, আবার প্রহর শেষেও ঘন্টা বাজানো হয়”।             

   রামালি অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ভল্লা আবার বলল, “নে এবার বাঁধানো মেঝেয় গা এলিয়ে একটু আরাম করে নে, এমন সুযোগ আবার কবে পাবি কে জানে। কেমন দেখলি বীজপুর?”

রামালি মেঝেয় শুয়ে শুয়েই বলল, “কী বলি বলো তো ভল্লাদাদা? শহর তো কোনদিন দেখিনি, অন্যের মুখে শুনেছি। এখানে এসে ভাবলাম, এটাই বুঝি শহর। শাম্‌লাকে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলল, ধুস্‌ - এটা নাকি শহর! শহর হল অনন্তপুর – বছর চারেক আগে একবার গিয়েছিলাম। শহর বটে একখানা। জিজ্ঞাসা করলাম, সেটা আবার কোনদিকে? বলল, এখান থেকে তিনদিনের হাঁটা পথ – রাজপথ ধরে পুবমুখো গেলেই হল”।

ভল্লা হাসল, বলল, “এই তো সবে শুরু রে, রামালি। অনেকদূর যাবি, অনন্তপুর তো তুচ্ছ, রাজধানী কদম্বপুরে তুই দাবড়ে ঘুরে বেড়াবি”। রামালি স্বপ্ন দেখা চোখে বলল, “সে আর কবে হবে, ভল্লাদাদা। আমার কপালে এই অব্দি যে এসেছি সেই ঢের”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হল, “আজ থেকে ছমাস আগে বীজপুর আসবি ভেবেছিলি? কপাল-টপাল কোন কাজের কথা নয়, রামালি। ওসব অকর্মাদের ধূর্তামি – আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে মনোমত ফল না পেলে, বলে কপালে নেই তো করবো কী? তুই তো তেমন নস, তুই কেন কপালের দোষ দিবি?”

রামালি ঠোঁটে বিটলেমির হাসি নিয়ে বলল, “তুমি যদি নোনাপুরে না এসে, অন্য কোন দূরের  গ্রামে যেতে – তাহলে আমার কপাল খুলত কি?”

মুখে বিরক্তির আওয়াজ তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল ভল্লা, রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল, তারপর হেসে বলল, “চ্যাংড়ামো করছিস না? কিন্তু সেটাও কপাল নয় – সুযোগ। তুই একটা সুযোগ পেয়েছিস – তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছিস। অনেকে সুযোগ পেয়েও যোগ্য হতে পারে না – তারা হিংসুটে শল্কু হয়। নে অনেক বকবক হয়েছে, জনাই আসা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নিই চল...। রাত্রে আবার দৌড়তে হবে।” 

৩৯ 

মহড়ার মাঠ থেকে সন্ধের পর ভল্লা আর রামালি বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই, বালিয়া এল। পিঠের বোঝা থেকে বের করল অনেকগুলো ভল্ল, বলল, “ভল্লাদাদা, পনের জোড়া মানে তিরিশখানা ভল্ল হয়ে গেছে। একবার দেখে নাও তো, ঠিকঠাক হয়েছে কিনা?” বালিয়া পাঁচটা ভল্ল এগিয়ে দিল ভল্লার দিকে।

“বাবা, একদিনের মধ্যে তিরিশখানা?” বালিয়ার হাত থেকে নিয়ে ভল্লগুলো পরখ করতে করতে, ভল্লা বলল।

“আমার ছোটভাইকেও লাগিয়ে দিয়েছি ভল্লাদাদা। ও লোহার পাত বানায়। আমি ফলার তির-মুখগুলো বানাই আর বাবা, ঘষে মেজে ফলাগুলোকে ধারালো বানায়। বাস, তারপর ভাই আর আমি দুজনে মিলে বাঁশের আগায় ওগুলো বসিয়ে দিই”।

ভল্লা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, “ভালই তো হয়েছে রে। এর আগে রণপার খুড়ো আর ফলাগুলোও ঠিকঠাক হয়েছিল। তুই এক কাজ কর, আজ জোড়া ছয় সাতেক রণপাও নিয়ে যা, কাল বাকি ভল্লগুলো আর যতগুলো সম্ভব রণপা বানিয়ে নিয়ে আসবি। কি রে রামালি, রণপা দিলে অসুবিধে হবে?”

রামালি বলল, “তা একটু হবে, কিন্তু রণপাগুলো তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক করে না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তুই ছজোড়া রণপা এখন নিয়ে যা, পারলে কালই নিয়ে আসিস”।            

বালিয়া চলে যেতে রামালি রান্নার যোগাড়ে বসল। ভল্লা একটু চাপা স্বরে রামালিকে জিজ্ঞাসা করল, “অমাবস্যার আর কয়েকটা দিনই বাকি। আমাদের ছেলেরা পারবে? তোর কী মনে হয়, রামালি?”

রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমাদের মধ্যে বারো-তের জন তো ভালই তৈরি হয়েছে…এ কদিনে বাকিরাও হয়ে যাবে। আমার মনে হয় একটা ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি”।

ভল্লা বলল, “নিজের সম্পর্কে তোর কী ধারণা, পারবি রক্ষীদের কোমর ভাঙতে?”

রামালির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, ঘাড় ঘুরিয়ে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “পারতেই হবে - আর আমার হাতেই উপানুর মরণও হবে – এ আমি তোমায় বলে রাখলাম ভল্লাদাদা”।

ভল্লা দেখল রামালির মুখের ওপর আগুনের আভা খেলা করছে এবং তার দু চোখে জ্বলছে আগুন…। ভল্লা কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল রামালির দিকে।

মারুলা নিঃশব্দে ঢুকল ভল্লার উঠোনে, ভল্লার পাশে বসে বলল, “কখন ফিরলি তোরা, বীজপুর থেকে?”

ভল্লা বলল, “শেষ রাতে”।

“রামালি, বীজপুর কেমন দেখলি? কিছু আনিসনি ওখান থেকে?”

“এনেছি বৈকি। ভালো চাল-ডাল, আনাজ-পত্র… চাল-ডালের খিচুড়ি আর ভাজি বানাচ্ছি…” রামালি হেসে উত্তর দিল।

“যাক বাবা, রোজ তোর ওই জোয়ারের রুটি আর ভুট্টার ঝোল খেতে খেতে জিভটা চামচিকের পাখনা হয়ে  উঠছিল - আজ স্বাদ বদলাবে। একটা সুখবর দিই ভল্লা, রাজধানীর গোশকটগুলো আজ রাত্রে বীজপুরে ঢোকার কথা। তার মানে আর তিন-চারদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্রভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে”।

“অস্ত্র ভাণ্ডারের কী অবস্থা?”

“চারপাশের দেওয়াল হয়ে গেছে। সামনের দিকে আর উত্তরের দিকে লোহার গেট লেগে গেছে। তুই যে চারটে ঘর দেখে এসেছিলি, তার মধ্যে বড়ো ঘরদুটোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভাণ্ডারের দেওয়ালে তাক ঝোলানোও হয়ে গেছে। তুই বলেছিলি দেওয়ালে বড়ো বড়ো লোহার কীল বসিয়ে কাঠের মোটা পাটা বসিয়ে দিতে। কুলিকপ্রধান কীলগুলোকে দেওয়ালে গেঁথেছে, তার ওপর, দেওয়ালের একটু ওপর থেকে লোহার শিকলের টানা লাগিয়ে দিয়েছে। বলেছে তাকগুলো এমন পোক্ত হবে, যত ভারই দিন – ভেঙে পড়বে না। তুই দেখলে তোর তাক লেগে যাবে, রে শালা”।

“বাঃ, রাজধানীর অস্ত্রভাণ্ডারের দেওয়ালেও একই রকম ব্যবস্থা দেখেছি। তার মানে কুলিকপ্রধান যথেষ্ট অভিজ্ঞ। কিন্তু বাকি ঘরদুটো কবে শেষ হবে”?

“ঘর হয়ে গেছে, ছাদের কাঠামোও হয়ে গেছে। টালি দিয়ে ছাইতে আর কদিন – খুব জোর তিন-চারদিন”?

“হুঁ, তার মানে, রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র এসে গেলে, ওখানেই রাখা যাবে। কিন্তু শষ্পক কী করছে? বলেছিল সমস্ত ব্যয়-ট্যয় ধরে, অঙ্ক কষে অস্ত্র-শস্ত্রের কী মূল্য হতে পারে, জানাবে? জানালো না তো?”

“এখনও হয়নি। বলছে, গোশকট থেকে নামিয়ে, অস্ত্রভাণ্ডার পর্যন্ত সমস্ত অস্ত্র ঘরের ভিতর সাজিয়ে তুলতেও অনেক শ্রমিক লাগবে – সে সব ব্যয় ধরে, তারপর তোকে পাঠাবে”।

“ঠিক আছে, বুঝলাম”। একটু চিন্তা করে ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “আস্থান থেকে অস্ত্রভান্ডারের দূরত্ব কতটা হবে বল তো?”

“আস্থান থেকে উত্তর-পশ্চিমে, তা ধর ক্রোশ দুয়ের বেশিই হবে”।

“অমাবস্যার রাতে আস্থান থেকে কাজ সেরে, আমাদের ছেলেরা যদি এদিকে না এসে অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে যায় – ওখানে কয়েকটাদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা সম্ভব?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “বুদ্ধিটা মন্দ নয় ভল্লা, রণপা চড়ে তোরা একবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে – রক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে ওদিকে চলে যাওয়া সহজ হবে…”।

“দাঁড়া, তার আগে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা তোকে বলি, তাহলে তোর বুঝতে সুবিধা হবে। রামালি তোর রান্না কদ্দূর?”

    “এই হয়ে এসেছে, তুমি শুরু কর আমি আসছি”। রামালি সাড়া দিল।


পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫ "

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩২ 


৩৯ 

জনাই চমকে উঠে বলল, “ওরে বাবা। দশহাত মাপের ধুতিই যদি ধরি। চল্লিশখানা মানে – চারশ হাত কাপড়? তাও কালো? অসম্ভব বীজপুরের বিপণিতে একসঙ্গে এত কালো কাপড় পাওয়া যাবে না। আমি বলি কি চল্লিশখান সাদা ধুতি কিনে নে না – তারপর সেগুলো কালো রঙে ছুবিয়ে নিবি ... চলবে না?”

দিনের প্রথম প্রহরের সমাপ্তি ঘোষণা করে, প্রহরী চটির পেটা ঘন্টায় আওয়াজ তুলল ঢং।    

কিন্তু রঙ উঠে গেলে?”

“ধুর ব্যাটা। রঙ উঠবে কেন? আমি তো তাই করি। চটিতে নানান ধরনের লোকজন আসে। অনেকে বিছানাতে বসেই নেশা করে – খায় দায় – আর বিছানার চাদরে ছোপ ধরিয়ে চলে যায়। সে ছোপ না উঠলে সুবিধেমতো রঙে ছুবিয়ে নিই। সে রঙ তো ওঠে না – তবে হ্যাঁ,  কালো রঙ কোনদিন ব্যবহার করিনি”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে তাই কর – চল্লিশটা সাদা ধুতি – আর পর্যাপ্ত কালো রঙের ব্যবস্থা কর। কত ব্যয় হবে?”

“আমি আনিয়ে নিচ্ছি – যা ব্যয় হবে দিয়ে দিবি”।

“আচ্ছা, এবার বল – বারো হাত লম্বা, দশ হাত চওড়া ইঁটের ঘর বানাতে কত ব্যয় হতে পারে? তোর কোন ধারণা আছে? সব কিছু নিয়ে – ভিত থেকে ছাদ অব্দি”।

“দ্যাখ, এই চটিতে ভৃত্যদের থাকার ঘরগুলো মোটামুটি ওই মাপেই বানাই, তার ব্যয় হয় ঘর প্রতি তিনটে রূপো। কিন্তু তোদের নোনাপুরের ব্যয় অনেকটাই বেশি পড়বে – এখান থেকে ইঁট-চুন-সুরকি-বালি নিয়ে যাবে, কাজের লোকরাও অতটা দূরে গিয়ে থাকবে – তাদের থাকা, খাওয়া-দাওয়া...। আমি ডেকে পাঠাচ্ছি – দেখি না কত বলে। আর কিছু?”

“না আর কিছু না। আজ সন্ধের একটু পরেই আমরা কিন্তু বেরিয়ে পড়ব – কাল সকাল সকাল নোনাপুরে ঢুকতে হবে”।

ঠিক আছে – আমি হাটে লোক পাঠাচ্ছি, আর সুমেরকেও বার্তা পাঠাচ্ছি। একটু বস”।  

জনাই উঠে দাঁড়াতে, রামালিও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, আমি হাট থেকে একটু ঘুরে আসব? জনাইদাদার লোকটির সঙ্গে?”

ভল্লা রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিছু চিন্তা করল, তারপর বলল, “ঠিক আছে - যা ঘুরে আয়”।

চটির কিছু কাজকর্ম সেরে জনাইয়ের ঘরে ফিরতে একটু দেরিই হল। ঘরে এসে দেখল, ভল্লা মাটিতে শুয়ে আছে। অবশ্য জনাইয়ের পায়ের শব্দে ভল্লা উঠে বসল, বলল, “বসে থাকতে থাকতে চোখটা একটু লেগে এসেছিল...”।

জনাই মাটিতে ভল্লার মুখোমুখি বসে বলল, “তোর খবর মাঝেমাঝেই পাই। তুই তো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিস চারদিকের গ্রামগুলোতে। তবে একথাও বলব, আস্থানের রক্ষীরাও এর জন্যে দায়ী। তারা মোটেই ঠিক কাজ করছে না - গ্রামপ্রধানকে পিটিয়ে মেরে ফেলল? তার ওপর কবিরাজমশাইকে মেরেধরে বন্দী করে রেখে দিল আস্থানে? ফসল ভালো হয়নি বলে, রাজকর কিছুটা কম করার অনুরোধ করেছিল। সেটা তাদের অপরাধ হয়ে গেল? ছি ছি তার জন্যে এরকম নৃশংস হত্যা? বড্ডো বাড়াবাড়ি করছেন আস্থানের আধিকারিক।

আমাদের এই অঞ্চলের লোকরাও ক্ষেপে উঠছে, জানিস? এরকম চললে, নোনাপুর কিংবা সুকরা নয় আরও অনেক গ্রামেই এরকম আগুন ছড়িয়ে পড়বে। বীজপুরে তোর নাম এখন বীজমন্ত্র হয়ে উঠেছে, রে শালা”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে শুনছিল জনাইয়ের কথা। রাজধানীর নিবিড় ষড়যন্ত্রের কথা জনাই জানে না। ভল্লার এ অঞ্চলে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তার ধারণা ভাসা-ভাসা। কিন্তু জনাই যেহেতু এই চটির অধ্যক্ষ, বহুলোক - ধনাঢ়্য তীর্থযাত্রী, সম্পন্ন বণিক এবং এই জনপদের সকল মানুষের সঙ্গেও তার নিত্য ওঠাবসা। বলা বাহুল্য সকলের সঙ্গেই তাকে সদ্ভাব রাখতে হয়। জনাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গী তার পরিচিত সকল মানুষের ধারণার প্রতিচ্ছবি। অতএব ভল্লার কাছে জনাইয়ের মন্তব্য অমূল্য।

“শুনেছি গ্রামের লোকরা একবার আস্থানে হানা দিয়েছিল। আবার দেবে না তো? এখানকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ছোকরার দল, কিন্তু চাইছে – নোনাপুরের ছেলেরা উচিৎ শিক্ষা দিক – আস্থানের রক্ষীদের। আর ওই যে উপানু – ও হতভাগা রক্ষীদলের সর্দার হল কী করে। ব্যাটা মাথামোটা, হোঁৎকা! শুনেছি আস্থানের অধিকারী শষ্পক সজ্জন-ভদ্র মানুষ – তিনি কী পারবেন এই পরিস্থিতি সামলাতে?”

ভল্লা আলস্যে আড়মোড়া ভেঙে, বড়ো করে হাঁই তুলে বলল, “আমাকে বলছিস কেন? শষ্পককে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর। আমি নির্বাসনে থাকা অপরাধী – আমি কী করব?”

জনাই তীক্ষ্ণ চোখে ভল্লাকে দেখল, বলল, “শালা, এমন ভাব করছিস ভাজা মাছ যেন উলটে খেতে জানিস না? চল্লিশটা কালো ধুতি নিয়ে কী করবি – তুই আর তোর ওই সেনাধ্যক্ষ রামালি? কী ভাবিস – আমি কিছুই বুঝি না?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “না রে - তুই কী ভাবছিস জানি না। গ্রামের কিছু ছোকরা ঠিক করেছে – এখন থেকে তারা সাদা ধুতি পরবে না। সাদা ধুতি ময়লা হয় বেশি – দাগছোপ ধরে তাড়াতাড়ি – তার চে কালো ধুতি পরা ভালো। ওরা সবাই দরিদ্র – জানিস তো? প্রতিদিন ক্ষার-সোডা দিয়ে  কাপড় কাচাও ওদের কাছে বিলাসিতা”।

জনাই মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলল, “তোকে আমি আজ থেকে চিনি ভল্লা? সেই ছোকরা বয়েসের ডামল থেকে চিনি। তুই কোনো গোপন কাজে, গোপন নামে এখানে এসেছিস, সে আমি জানি। কিন্তু কাজটা কী – সেকথা তুই বলবি না, সেও জানি। আর আমিও জানতে চাই না। কিন্তু তাও বলব, এদিকের সাধারণ লোক চাইছে – তোরা কিছু একটা কর, রক্ষীদের গুমোর ভেঙে দে”।

“পাগল হয়েছিস? আমি ওসবের মধ্যে জড়াবো কেন? আর আস্থানের রক্ষীরা জব্দ হলে, রাজধানী থেকে সেনাবাহিনী পাঠাবে। সে ধাক্কা গ্রামের সাধারণ এই ছোকরার দল সামলাতে পারবে”? জনাই ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভল্লা হেসে জনাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমার কাজের কোন কথাই তোকে বলতে পারব না, বন্ধু। কিন্তু ধৈর্য ধরে দেখতে থাক – আগে আরও কী কী হয়। এটুকু বলতে পারি – নোনাপুরের ছেলেরা তোকে এবং বীজপুরবাসীদের হতাশ করবে না। যাগ্‌গে ওসব ছাড় – আমার মাছের ঝোল কী হল?”

“শালা তোর কপালটা ভালো – প্রায় দুসেরের একটা রহু পেয়েছি – একদম জ্যান্ত – এতক্ষণে মনে হয় রান্না শুরু হয়ে গেছে”। হাসতে হাসতে জনাই বলল।

“ওফ্‌, সেই পিপুলতলা ছাড়ার পর এই প্রথম মাছের ঝোল আর ভাত খাবো। ভুট্টার রুটি আর সেদ্ধ ভুট্টা খেতে খেতে জিভে চড়া পরে গেছে, রে জনাই”।

ওদের কথার মধ্যে রামালি ঘরে ঢুকল। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “বীজপুরের হাট দেখলি?”

“হ্যাঁ, ভল্লাদাদা - কী না পাওয়া যায় হাটে, বাস্‌ রে – অর্ধেকের বেশি পসরা এই প্রথম চোখে দেখলাম”! রামালি মেঝেয় বসতে বসতে একটু উচ্ছ্বসিত হয়েই বলল।

ভল্লা হাসল, বলল, “ধুতি পেয়েছিস?”

রামালি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ধুতি – কালো রঙ সবই পাওয়া গেছে। শাম্‌লা – যার সঙ্গে আমি হাটে গেলাম – বলল এখানেই কালো রঙ করে দেবে...”।

জনাই বলল, “হ্যাঁ আমাদের বাঁধা রজক আছে – বড়বড়ো মাটির গামলায় রঙ গুলে একসঙ্গে সব ছুপিয়ে দেবে। আমার এখানে শুকোতে দেওয়ার অনেক জায়গা – রোদ্দুরে মেলে দিলে দণ্ড দুয়ের মধ্যে শুকিয়েও যাবে। তোরা ওসব করেছিস কখনো? গণ্ডগোল হয়ে গেলে শালা পুকুরের জলই কালো হয়ে কেলেংকারি কাণ্ড হবে – একবার ডুব দিলে কেলেকাত্তিক হয়ে উঠে আসবি... তুই মাছ খাস তো রামালি?”

রামালি বলল, “কয়েকবার খেয়েছি – তবে আমাদের দিকে তেমন কেউ খায় না”।

জনাই হেসে বলল, “ব্যস্‌ ব্যস্‌, ওতেই চলবে। তুই ভাই নিরিমিষ খেলেও আমার কোন অসুবিধে নেই – চটিতে সব ব্যবস্থাই রাখতে হয়…”।  

চটির ঘন্টা দুবার বাজল ঢং ঢং করে। জনাই ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে বলল, “ওঃ দুই প্রহর শেষ হয়ে গেল…ভল্লা, আমি একটু ঘুরে আসি রে - জনা চারেক মাননীয় অতিথি আছে – মাঝে মাঝে গিয়ে আমার মুখটা না দেখালে – তাদের রাগ হয়ে যাবে। বড়োলোকের পীরিত – শালা ক্ষণে রঙ্গ, ক্ষণে ভঙ্গ... ”। জনাই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “খাওয়ার সময় চলে আসব, একসঙ্গে খাবো”।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪ "


মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ 

২৮ 

পরের দিন সকালে বসে অনেকক্ষণ ছেলেদের মহড়া দেখছিল ভল্লা। একসময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিছুই হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না...এভাবে তোরা কোনদিনই কোথাও পৌঁছতে পারবি না...”। ভল্লার কথায় ছেলের দল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরে শল্কু বলল, “তুমি তো এভাবেই আমাদের অভ্যাস করতে বললে, ভল্লাদাদা”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “বলেছি। কিন্তু এমন তো বলিনি এটুকু শিখলেই আমাদের শিক্ষা সব শেষ? রণপায় চড়ে স্বাভাবিক হাঁটাহাঁটি করতেই কাল সারাটা দিন চলে গেল – এখনও ঠিকঠাক চলতে পারছিস না। টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিস বারবার। ভল্ল ছোঁড়ার অভ্যেস করতে বললাম, কুড়িবার ছুঁড়লে খুব জোর তিনবার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছিস। বাকিগুলো বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে নয়তো গাছের গুঁড়িতে বিঁধছে...। একই জিনিষ নিয়ে কতদিন কতবার রগড়াবি?”

কেউ কোন কথা বলল না, মাথা নীচু করে রইল। শল্কু বলে উঠল, “আহা একদিনেই সবাই পারে নাকি...সবাই কী আর তোমার মতো হতে পারে? তুমিই কী একদিনে সব শিখে ফেলেছিলে?”

ভল্লা বিরক্ত মুখে বলল, “একদিনে শিখে ফেলা যায় না, সে কথা তোর থেকে আমি অনেক ভালো জানি, শল্কু। কিন্তু কালকের শিক্ষার থেকে আজকের শিক্ষায় যদি কোন উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় – সে রকম দায়সারা শিক্ষায় লাভ কী? মনে এই সামান্য জেদটুকুই যদি না আসে – আজ যেটুকু শিখব সেটা নিখুঁত শিখব। আগামীকাল সেটাকে নিয়ে আবার না রগড়ে – নতুন কিছু শিখবো। তা নাহলে এতো অনন্তকাল চলতেই থাকবে...”।

ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “দ্যাখ সব জিনিষ সবাইকে দিয়ে হয় না। একলক্ষ লোকের মধ্যে খুব জোর হলে হাজার পাঁচেক রক্ষী হয় আর হাজার দুয়েক সৈন্য হয়। আমি আর দু’-তিনদিন দেখব...উন্নতির কোন লক্ষণ না দেখলে বলব”...ভল্লা হঠাৎ হাতজোড় করে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “ক্ষ্যামা দাও বাপাসকল, অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যাও – বাপের সঙ্গে চাষবাসের কাজে লাগো গে...নয়তো দীঘীর পাড়ের অশথ তলায়, গুটি সাজিয়ে বাঘবন্দী খেলো গে...”।  ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে রণপা নিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেদের অনুশীলনের মাঠ থেকে।

 

দুপুরে খেতে এসে রামালি বাসায় ফিরে দেখল, ভল্লা ঘরের সামনে নির্দিষ্ট পাথরে বসে গম্ভীর মুখে কিছু চিন্তা করছে। রামালি কিছু বলল না। ঘরে ঢুকে জলের কলসি নিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর স্নান সেরে ভরা কলসিটা ঘরে রেখে রান্নার যোগাড় করতে করতে লক্ষ্য করল, ভল্লা একই ভাবে বসে আছে। রামালি উনুন ধরিয়ে বলল, “কী ভাবছো, ভল্লাদাদা? তুমি রাগ করে চলে আসার পর ছেলেরা সত্যিই ভয়ানক পরিশ্রম করছে। ওরা আজ খেতেও যায়নি। বলেছে সন্ধ্যে পর্যন্ত অভ্যাস করে, কাল তোমাকে ওরা চমকে দেবে...”।

ভল্লা মুখ তুলে রামালির মুখের দিকে তাকাল। বলল, “তাই? আর ওই শল্কু?”

রামালি হাসল, বলল, “ওর তেমন হেলদোল নেই, ওর ধারণা ও সব শিখে ফেলেছে”।

“তাই, না? হতভাগার ডানা গজিয়েছে – পিমড়ে – ডানা গজালেই ভাবে উড়তে শিখেছে...মরবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া আর আসে না কেন রে?” বালিয়া নোনাপুর গ্রামেই থাকে, বাপ-ঠাকুদ্দাদের সময় থেকেই তারা লোহার কাজ করে। রামালি বলল, “লড়াই-টড়াই করা ওর পছন্দ নয়। শান্তিপ্রিয় নিরীহ ছেলে। ও বলে আমাদের খেটে খেতে হবে রামালিদা – লড়াই শিখে করবো কী আর খাবোই বা কী? ভল্লাদাদাকে বলো অন্য কাজ থাকলে, আমাকে যেন বলে”।

ভল্লা খুশি হল, বলল, “বাঃ, বালিয়া বেশ বুঝদার ছেলে তো! ঠিকই বুঝেছে - লড়াই সবার জন্যে নয়। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে, ওকে খবর পাঠাস তো। ওকে দিয়ে কিছু কাজ করাব। রণপাগুলোর তলায় লোহার খুড়ো আর ডগায় লোহার ফলা বসাতে হবে। এখন আমরা মাটিতে চলাফেরা করছি বলে তেমন ক্ষইছে না। কিন্তু পাথরে বাঁধানো পাকা রাস্তায় চললে বাঁশের ডগাগুলো দাঁতনের মতো ছরকুটে যাবে। লোহার খুড়ো দিয়ে বাঁধিয়ে নিলে বেশি দিন টিকবে”।

“আজ বিকেলেই এক ফাঁকে গিয়ে বলে আসবো”।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু কথা বলল না। রামালি রান্না নিয়ে ব্যস্ত, ভল্লা আগের মতোই চুপ করে বসে কিছু চিন্তা করতে লাগল। রান্নাটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি বটতলির সনাতন কবিরাজকে আমাদের গ্রামে পাঠিয়েছিলে?” রামালির আচমকা এই প্রশ্নে ভল্লা আকাশ থেকে পড়ল, “বটতলির সনাতন কবিরাজ? আমি তাকে চিনিই না, ডাকব কী করে?”।

অবাক হয়ে রামালি বলল, “তাহলে? কে ডাকল তাঁকে? আজ সকালে আমাদের গ্রামে এলেন। প্রধানমশাইকে, আমার কাকাকে দেখে গেলেন। বিনা দক্ষিণায় ওষুধ-পথ্যি করে গেলেন। কেন?” ভল্লার মনে পড়ল এবার, বলল, “ও হ্যাঁ হ্যাঁ। গতকাল বণিক অহিদত্তকে বলেছিলাম বটে। আমাদের কবিরাজকাকা তো গ্রামে নেই, যদি ওদিক থেকে কাউকে... বাঃ, তার মানে বণিক অহিদত্ত কথা রেখেছে? দেখে কী বলল?”।

রামালি মাথা নাড়ল, বলল, “কাকার অবস্থা তেমন কিছু নয়, দু-পাঁচদিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। কিন্তু প্রধানমশাইয়ের অবস্থা ভয়ংকর। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি অচৈতন্য থাকেন। সনাতন কবিরাজ তেমন ভরসা পাচ্ছেন না”।

“বলিস কী?”

রামালি কোন উত্তর দিল না, রান্না সারতে লাগল চুপ করে। ভল্লা আবার জিজ্ঞাসা করল, “আর ভীলককাকা?”

“ভীলককাকার তিনটে দাঁত ভেঙে গেছে – মাড়ি ফেটে গেছে। জিভও কেটে গেছে অনেকটা। চোয়ালে গভীর ক্ষত। কিছু বটিকা দিয়েছেন, জলে গুলে খাওয়াতে হবে আর প্রলেপ দিয়েছেন। বলেছেন সামনের তিন-চারদিন খুবই সংকট – সাবধানে থাকতে হবে। এরমধ্যে ক্ষতগুলো যদি বিষিয়ে না যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সেরে উঠবেন, নচেৎ...”।

ভল্লা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। রামালির রান্না হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করল, “চান করেছ ভল্লাদাদা? আমার রান্না হয়ে গেছে”।

ভল্লা বিষণ্ণ মুখে বলল, “এদিকে প্রধানমশাইকে প্রায় শেষ করে দিল আর ভীলককাকারও যা অবস্থা কতদিনে সুস্থ হবেন তার ঠিকানা নেই। ওদিকে কবিরাজমশাইকেও আস্থানে নিয়ে গিয়ে, কী অত্যাচার করছে, কে জানে? ওই কটা রক্ষী এসে, নোনাপুর আর সুকরা গ্রামদুটোকে একেবারে কানা করে দিয়ে গেল”।

রামালি কিছুক্ষণ ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুমি চলে আসার পর মহড়ার মাঠে শল্কু বলছিল, তুমি রাজি হলে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা আস্থান আক্রমণ করব। গ্রামে এসে রক্ষীদের অত্যাচারের চরম শোধ তুলব আমরা”।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয়, তোরা পারবি?”

“আমাদের মধ্যে অন্ততঃ জনা ছয়েক বল্লম চালানো আর রণপা ব্যবহারে মোটামুটি দক্ষ তো হয়েছি”, ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “অবশ্য, সে বিচার তুমিই ভাল করতে পারবে। কিন্তু সুরুল আর আমার মত অন্য। এত তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বিপদ বাড়ানোর মানে হয় না। আমরা যতটুকু শিখেছি, তাতে রক্ষীদলের কোমর ভাঙা সম্ভব হবে না। উলটে আমাদেরই কোমর ভেঙে যেতে পারে। রক্ষীদলের দু-তিনজন হয়তো আমাদের হাতে মরবে, কিন্তু আমাদের মরবে কিংবা আহত হবে তার থেকে অনেক বেশি। আমাদের এই ছোট্ট দলের পক্ষে সে আঘাত হবে মারাত্মক। এবং সেই আঘাত সেরে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ই পাবো না। তার আগেই রক্ষীরা আমাদের গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে আমাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চিন্ত আশ্রয়গুলোকে উচ্ছন্ন দেবে”।

ভল্লা রামালির বিচক্ষণতায় আশ্চর্য হল। রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আস্থান থেকে যেদিন আমরা অস্ত্র লুঠ করলাম, সেদিন আমাদের গায়ে কোন আঁচও তো লাগেনি। তখন তো তোরা লড়াই করার কিছুই জানতিস না, তাই না? উলটে ওদেরই তো তিনজন পটল তুলল”।

রামালি অনেকক্ষণ ভল্লার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ভল্লাদাদা, একথার উত্তর দিলে ছোট মুখে বড়ো কথা হয়ে যাবে কিন্তু”।

ভল্লা রামালির মুখের ওই হাসি এবং তার কথা বলার ভঙ্গিতে রীতিমতো সতর্ক হয়ে উঠল। আচমকা বলে উঠল, “না রে, তোর কথা পরে শুনব। এখানে নয়, নিরিবিলিতে। খুব খিদে পেয়েছে। চট করে পুকুরে কটা ডুব দিয়ে আসি দাঁড়া – তুই খাবার বাড়…”।

রামালি গম্ভীর হয়েই ভল্লাদাদার কথাগুলো শুনলো, তার মুখে হাসি নেই। তবে তার মনে তৃপ্তির হাসি, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রাজাধিকারিকও তার কথায় এমন চমকে উঠল?

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩ "

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩ 


৩০

 মারুলা চলে গেল বনের পথে দক্ষিণ দিকে, ভল্লা আর রামালি রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। যেতে যেতে ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝছিস, রামালি? ভয় করছে না তো?”

“ভয় যে করছে না, তা নয় ভল্লাদাদা। করছে, তবে সেটা প্রাণের ভয় নয়। এতবড়ো একটা ষড়যন্ত্র, যার পেছনে রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের প্রশাসন। ভয় হচ্ছে তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব কিনা। তোমাদের কথায় অনেক কিছুই বুঝলাম। কিন্তু সে বোঝায় বেশ কিছু ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর এটাও বুঝছি না, এই পুরো প্রক্রিয়াতে আমার অবস্থানটা কোথায়? এই দুটো ব্যাপার বুঝতে চাই। তবে এখন নয়, নিরিবিলিতে কোন এক সময় আলোচনা করব...”।

ভল্লা বলল, “সেই ভালো। এবার তোকে সব কিছু খুলে বলার সময় এসেছে। ও হ্যাঁ, দুপুরে খাওয়ার আগে তুই ছোট মুখে কিছু বড়ো কথা বলতে চেয়েছিলি, কী কথা বলতো?”

রামালি হাসল, বলল, “আমার মুখ এখনও ছোটই আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু কথাগুলো আরও বড়ো হয়ে উঠেছে, তোমার আর মারুলাদাদার আলোচনা শুনতে শুনতে। সে কথাও এখন তোলা থাক। কিন্তু একটা কথা বলো তো, ভল্লাদাদা, তুমি কি সত্যিই প্রধানমশাইয়ের জন্যে দুশ্চিন্তায় রয়েছ?”

ভল্লা একটু চমকে উঠল, তাকাল রামালির মুখের দিকে। তারার আলোয় রামালির মুখটা অস্পষ্ট, কিন্তু চোখদুটো চিকচিক করছে, তাকিয়ে আছে ভল্লার দিকে। ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “প্রধানমশাইয়ের জন্যে যে খুব চিন্তায় আছি, সে কথা হয়তো সত্যি নয়। কিন্তু কমলিমায়ের জন্যে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। মায়েরা যেমন হন আর কি, নরম মনের মানুষ, সহজ-সরল। বহু বছর আগে পুত্রদের হারিয়েছেন, এখন যদি চোখের সামনে স্বামীর এমন অসম্মানের মৃত্যু হয়। কমলিমায়ের পক্ষে এই ধাক্কা সহ্য করা শক্ত হবে”।

রামালি কিছু বলল না। ভল্লা আবার বলল, “কমলিমায়ের মুখটা মনে পড়লেই…এই যে এতদূরে এসে এইসব রাজকার্য করছি… মাঝে মাঝে মনে হয়, যা কিছু করছি, ঠিক করছি কি… কোনটা যে কর্তব্য, আর কোনটা করণীয় নয়…সেটাই আজকাল কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে রে, রামালি…”! পাশাপাশি চলতে চলতে কেউ কোন কথা বলল না অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পর রামালি বলল, “আমরা বনের সীমান্তে চলে এসেছি ভল্লাদাদা, এখানেই রণপাগুলো রেখে, চলো গ্রামে ঢুকি”।

 কমলিমায়ের বাড়ির পিছনের বেড়া ডিঙিয়ে ভল্লা আর রামালি ঢুকল। এবারে আর কোন সংকেত না দিয়ে, ভল্লা নিঃশব্দে সামনের উঠোনে গিয়ে, দাওয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল কমলিমায়ের ঘরের দরজার পাল্লা ভেজানো, ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভল্লা তিনধাপ সিঁড়ি বেয়ে দাওয়ায় উঠে দরজার সামনে গিয়ে খুব নীচু স্বরে ডাকল, “মা, মা রে, এখনও ঘুমোসনি?” কোন সাড়া পেল না। ভল্লা সন্তর্পণে দরজার পাল্লায় চাপ দিল, একটু ফাঁক হতে দেখল, জুজাক শুয়ে আছেন খাটিয়ার বিছানায়। তাঁর মাথার দিকে মেঝেয় বসে আছেন কমলিমা। হাঁটুতে কনুইয়ের ভর দিয়ে রাখা হাতের ওপর মাথাটি রেখে চোখ বুজে বসে আছেন। দীপের ম্লান আলোতে তাঁর মুখটা কিছুক্ষণ দেখল ভল্লা। অসহায় ক্লান্ত মুখে জমে আছে জীবনের যাবতীয় বিষণ্ণতা। ভল্লা নিঃসাড়ে কাছে গিয়ে বসল, কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রাখল। কমলিমা চোখ মেলে তাকালেন। দু চোখে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই, আনন্দ নেই...। জিজ্ঞাসা করলেন, “কতক্ষণ এসেছিস, চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল রে। কেমন আছিস ভল্লা?”

“কী চেহারা করেছিস রে মা? এ ভাবে নিজেকে কষ্ট দিলে প্রধানমশাইকে সারিয়ে তুলতে পারবি? তার আগেই তুইই তো মারা পড়বি রে মা? খাওয়দাওয়া বন্ধ করেছিস, ঘুমোচ্ছিস না”।

“কে বললে, খাচ্ছি না, ঘুমোচ্ছি না? সবই করছি। জীবন কারও জন্যে থেমে থাকে নাকি? এই তো গতকাল সকালে বটতলির সনাতন কবিরাজ এল। প্রধানকে দেখে গেল। ওষুধ-পথ্যি বুঝিয়ে দিল। আধমরা একটা মানুষকে ওষুধ কী ভাবে খাওয়াবো বল তো? সেদিন থেকে প্রধানের কোন সাড় নেই – শুধু প্রাণটুকুই কোনমতে ধুকধুক করছে! দিনে দশবার করে নাকের নীচে হাত রাখি - শ্বাস পড়ছে তো? বুকের ওপর কান পাতি – ধুকধুক করছে তো! আচ্ছা, সনাতন কবিরাজকে কে পাঠাল বল তো। তুই? তুই ছাড়া আর কে পাঠাবে? কবিরাজদাদা কবে আসবে জানিস? তাকে কেন ধরে নিয়ে গেল রে, আস্থানের আঁটকুড়ির ব্যাটারা? কী অপরাধ করেছে সে? ডাকাতি? হত্যা? কবিরাজদাদা থাকলে, প্রধান এতদিনে ঠিক উঠে বসত...”।

ভল্লা কমলিমায়ের দুহাঁটুতে হাত রেখে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিল। কান্নায় ভেঙে না পড়েও, এমন কথার হাহাকার সে কোথাও কোনদিন শোনেনি।

“দরজায় কে দাঁড়িয়ে রে? তোর সঙ্গে এসেছে বুঝি? দরজায় দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসতে বল”। রামালি নিঃশব্দে দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল, ঘরের ভেতরে ঢুকল। “ও মা রামালি? ঘরে এসে বস। শুনলাম তোর কাকিমা তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তুই এখন ভল্লার সঙ্গেই থাকিস। প্রধান তোর কাকার সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলেছিল। সে আর হল কই? তার আগেই এসব। তা বেশ করেছিস। ভাসুরপো, ভাইপো এ সম্পর্কগুলো আজকাল বহুদূরের সম্পর্ক বাবা... কোন ভরসা নেই, কোন বিশ্বাস নেই। কে জানে কবে তোর খাবারে বিষ দিয়ে তোকে হয়তো মেরেই ফেলত...তার থেকে এ বরং ভালই হল...নিজের জীবনটা নিজের মতো গড়ে নে। আমাদের দিন তো শেষ হয়ে এল, দেখছিস। গ্রামপ্রধানকেই ধরে চোরের মার মার রাজার রক্ষীরা। শুনলাম কবিরাজদাদাকে এমন করে ধরে নিয়ে গেছে, যেন সে ডাকসাইটে অপরাধী। সাধারণ মানুষের মান-সম্মান-মর্যাদার আর কানাকড়ির মূল্যও নেই রাজশক্তির কাছে”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, “তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন, মা? দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রধানমশাই আবার উঠে দাঁড়াবেন। কবিরাজমশাইও ফিরে আসবেন…এত ভাবিস না…”।

কমলিমা ভল্লার হাতের মুঠিতে থাকা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই নাকি আমাদের ছেলেদের নিয়ে দল গড়েছিস? শুনতে পাই, তাদের লড়াই করতে শেখাচ্ছিস?” চোখ তুলে তিনি ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যি না কি রে?” এই মানসিক অবস্থার মধ্যেও কমলিমা আচমকা এমন একটা প্রশ্ন করে বসবেন, ভল্লা আদৌ অনুমান করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে সত্যি না মিথ্যে কোনটা বলা সমীচীন হবে চট করে ভেবে পেল না। ভল্লার পিছনেই বসে থাকা রামালি বলল, “আমরা হাত-পা গুটিয়ে, ঘাড় হেঁট করে, বসে থাকবো, জেঠিমা? গ্রামের এতবড়ো অপমানটা আমরা বসে বসে দেখে যাব? শোধ নেব না?”

কমলিমা অবিশ্বাসী চোখে রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, অস্ফুট স্বরে বললেন, “শোধ নিবি…?” একটু থেমে আবার বললেন, “রাজশক্তির বিরুদ্ধে… কী বলছিস রে?”

“হ্যাঁ জেঠিমা, আমাদের মরতে হবে জানি… কিন্তু আমাদের মারার আগে ওরাও টের পাবে, মৃত্যুর গন্ধ কাকে বলে …। সেটাই বা কম কি, জেঠিমা?”

কমলিমা কোন উত্তর দিলেন না, একইভাবে তাকিয়ে রইলেন রামালির দুই চোখের দিকে। আহত-অচেতন প্রধানমশাইকে গ্রামের মানুষরা সেদিন যখন ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে এল। তাদের মুখে সব কথা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন থেকে শোক, দুঃখ, বেদনার কোন অনুভূতিই আর অবশিষ্ট ছিল না তাঁর মনে। আজ হঠাৎই তাঁর সেই নির্বাক দুই চোখ ভাসিয়ে নেমে এল অশ্রুধারা।


সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯ 


 

ভল্লা নালার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোল বাঁধের কাছে। প্রভাত সুর্যের আলো তখন সবে ছড়িয়ে পড়ছে গাছের পাতায় পাতায়। বাঁধের উঁচু পাড়ে উঠে ভল্লা চারদিকে তাকাল। এই বাঁধের বাঁদিকে নোনাপুর গ্রাম। আর ডানদিকে সুকরা। এই নালাই এতদিন ছিল দুই গ্রামের সীমানা। যখন থেকে ভল্লা এই নালায় বাঁধ বানানোর তোড়জোড় শুরু করেছে, দুই গ্রামের লোকজন কৌতূহলী হয়েছে। ভল্লার কথায় তারা বুঝেছে, এই বাঁধের জলে গ্রামের পুরো ক্ষেত না হোক কিছু কিছু জমিতে সারা বছর চাষবাস করা সম্ভব। সেই থেকে তারা ভল্লার সঙ্গে মেতে উঠেছে, তাকে সর্বতো সাহায্য করেছে, বাঁধ নির্মাণে। দুপক্ষই উৎসাহী হয়ে নালার দুপাশের অনাবাদী বেশ কিছু জমিকে আবাদযোগ্য করে তুলেছে। সরু সরু শিরার মতো নালা কেটে তারা দুপাশের জমিতে চারিয়ে নিয়েছে বাঁধের জল। বপন করেছে বাদাম ও তুলোর বীজ। বিগত পনের-বিশ দিনে সে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ কয়েকটি মাঠ।

একধরনের নেশা আছে সবুজ রঙে। বিশেষ করে সে সবুজ যদি হয় সম্ভাব্য শস্যের স্বপ্ন। সে স্বপ্নে চাষীরা বিভোর হয়ে থাকেন। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে, বাড়িতে গিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। রাত্রে ঘুম ভেঙে বারবার উঠে বসেন। জঙ্গলের ইঁদুর, খরগোশ, শজারুরা রাত্রেই খাবারের সন্ধানে বের হয়। চারাগাছ উপড়ে বীজ খেয়ে তারা যদি শস্যের সর্বনাশ করে? যতদিন না গাছগুলি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, ততদিন এই দুশ্চিন্তা।

ভল্লাকে দেখে সুকরা গাঁয়ের বয়স্ক চাষী ভীলককাকা একগাল হেসে বললেন, “গতকাল রাত্রে গাঁয়ের ছোকরারা সব রামকথা শুনতে গিয়েছিল। তুই যাসনি, বেটা?”

ভল্লা হাসল, বলল, “ইচ্ছে তো ছিল, কাকা। রামকথা শুনতে অনেক ধরনের লোক যায় – আমাকে চিনে ফেললে, বিপদে পড়ে যাব। সেই ভয়ে যাইনি। এই যে তোমাদের এখানে এসেছি, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে…কেউ দেখে ফেললেই বিপদ”।

ভীলককাকা বললেন, “হুঁ। তার মানে তুই জানিস না। নোনাপুরের এক ছোকরাকে কাল রাতে সাপ কামড়েছে!

“সাপে কেটেছে? কই শুনিনি তো! কাকে কেটেছে জানো, কাকা?”

“হানোকে। ডাকাবুকো তাজা ছেলেটা – এভাবে মারা যাবে - ভাবা যায় না”।

“হানো? কী বলছো, কাকা? সেই জন্যেই আজ ভোরে কেউ আসেনি আমার কাছে। ভাবলাম, পালাগান শুনে হয়তো শেষ রাত্রে বাড়ি ফিরে সব ঘুমোচ্ছে...। কিন্তু...কিন্তু আমার এখন কী করা উচিৎ, কাকা? আমার যে একবার হানোর বাড়িতে যাওয়া খুব দরকার। ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসত – যা বলতাম সব শুনত - দারুণ কাজের ছেলে”।

ভীলককাকা বললেন, “সবই বুঝছি, ভল্লা। কিন্তু এসময় তোকে গাঁয়ে দেখলে, সকলেরই বিপদ বাড়বে। শত্রুর তো আর শেষ নেই গ্রামে”।

ভল্লা চিন্তাগ্রস্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তা ঠিক”। কোন কথা না বলে নোনাপুর গ্রামের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর অবসন্ন গলায় বলল, “আমি নোনাপুর গ্রামে আসার পর থেকেই নানান অঘটন ঘটে চলেছে, কাকা। আমার মনে হয় এই অঞ্চল ছেড়ে আরও দূরে কোথাও আমার চলে যাওয়া উচিৎ”।

ভীলককাকা বললেন, “অঘটন? অঘটন আবার কী ঘটল?”

অন্যমনস্ক ভল্লা বলল, “ওই যে, রাজকর্মচারী শষ্পক গ্রামপ্রধানকে অপমান করল। গ্রামপ্রধান কর আদায়ে কিছুটা ছাড়ের জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। শুনলাম শষ্পক এককথায় তাঁর সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। আমাকে নিয়েও কি কম কথা শুনিয়েছে, বয়স্ক সম্মানীয় গ্রামপ্রধানকে। যাচ্ছেতাই, সে সময় আমি তো ছিলাম সামনে, সব শুনেছি। সে সব কথা কানে শোনাও পাপ। এখন আবার হানোটা এভাবে অপঘাতে চলে গেল...না কাকা, এ অঞ্চলে আর নয়”।        

 ভীলককাকা সান্ত্বনার সুরে বললেন, “বুঝতে পারছি, হানোর এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা তোর বুকে বড়ো বাজছে। কিন্তু এসবের জন্যে তুই নিজেকে দুষছিস কেন? তুই কী করবি? জ্ঞান হয়ে থেকে রাজকর্মচারীদের ঔদ্ধত্য আর অপমানের কথা আমরা শুনে আসছি, আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের থেকে। ও সব আমাদের কাছে নতুন নাকি? আর সাপে কামড়ানোর কথা বলছিস? আশেপাশের চার-পাঁচখানা গাঁয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ। ছেলে-ছোকরা, ব্যাটাছেলে বা মেয়েছেলেদের মধ্যে দু-একজনের অপঘাত মৃত্যু হয়নি – এমন একটা বছর আমাকে দেখা তো। সাপেকাটা, জলে ডোবা, গলায় দড়ি... একটা না একটা অপঘাত মৃত্যু লেগেই আছে প্রতি বছর। এই তো গত বছর, একটু মেঘ করে – চটাপট এমন শিলাবৃষ্টি হল, আমাদের গাঁয়ের রাখাল কালডি মারা গেল ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। সঙ্গে মরল চারটে ছাগল। এসবই আমাদের জীবনের অঙ্গ রে ভল্লা, তোর থাকা না থাকায় কী আসে যায়? তোর কমলিমা আর গ্রামপ্রধান জুজাকের দুটি ছেলেই যে সাপের কামড়ে মারা গেছিল – সে কথা শুনিসনি?”

বাঁধের ওপর ভীলককাকা আর ভল্লা দুজনেই চুপ করে পাশাপাশি বসে রইল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর ভীলককাকা আবার বললেন, “তুই এসে এই যে নালার মধ্যে বাঁধ গড়ার বুদ্ধি দিলি। তোর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা সেই বাঁধ বানালাম। আমাদের দুটি গ্রামের বেশ কিছু বাঁজা জমিকে আমরা সবাই মিলে আবাদী করে তুললাম। এর মূল্য কিছু কম নাকি? সে কথা ভুলে যাচ্ছিস কী করে?”                

ভল্লা বলল, “কাকা, এ বাঁধটা আমরা ভালই বানিয়েছি, কী বলো?”

সে কথা আর বলতে! বাপ পিতেমোদের সময় থেকেই তো এই নালা বয়ে চলেছে। কারও মাথায় আসেনি এখানে বাঁধ দিয়ে কিছু জমি চাষবাস করা সম্ভব। তুই এসে পথ দেখালি, রে ব্যাটা”।

“কিন্তু এ বাঁধের নীচের সরু সরু ছিদ্র দিয়ে জল কিন্তু ভাটায় বেরিয়ে চলেছে, কাকা। সেই জলের গতি কমাতে না পারলে, এ বাঁধ কিন্তু দুর্বল হয়ে যাবে। সামনের বর্ষায় হয়তো ভেঙেই পড়বে”।

“এ কথা তুই আগেও বলেছিস, বেটা। কিন্তু কী দিয়ে আটকাবো?”

“শক্ত এঁটেলমাটি যোগাড় করতে পারো না, কাকা? তোমাদের সুকরা কিংবা নোনাপুরে?”

“সে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সে মাটিতে কী হবে?”

“এঁটেলমাটির বড়ো বড়ো চাঙর বাঁধের জলে ফেলে দিও। সে মাটি গলে গিয়ে জলের সঙ্গে বইতে থাকবে ওই সরুসরু নালিপথে। ধীরে ধীরে কমে যাবে জলের ধারা ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নোনাপুরের কেউ আজ মাঠে আসেনি – হানোর হঠাৎ মৃত্যুটা সবাইকে পাথর করে দিয়েছে, না কাকা?”

হ্যাঁ। ও গাঁয়ের পাঁচজন লোক সারারাত পাহারা দিয়েছে, আমাদের লোকদের সঙ্গেই।  যেমন রোজ দেয়। কিন্তু সকালে কেউ আসেনি”

“রাতে কিসের পাহারা, কাকা?”

“ইঁদুর, শজারু আছে, মাঝে মাঝে আসে হরিণের পাল – তাদের থেকে শস্য পাহারা দেওয়া আমাদের বরাবরের অভ্যাস বেটা। ডপলি, ঢাকের আওয়াজ করে, আগুনের মশাল জ্বেলে তাদের দূরে রাখতে হয়”।

“তাই? দুটো শস্যের জন্যে কী পরিশ্রমই করতে হয়, তাই না, কাকা? কিন্তু রাজারা রাজস্ব আদায়ের সময় এসব কথা চিন্তাও করে না”। ভল্লার স্বরে কিছুটা উষ্মা।

“এটা ঠিক নয়, বেটা। তোরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা বুঝিস না, রাজা এই সমস্ত জমির মালিক।  তিনিই আমাদের জীবন ধারণের জন্য বাস্তু আর আবাদের জমি দিয়েছেন। তার বদলে তাঁরা কর নেবেন না? কর না নিলে তাঁদের চলবে কী করে? কী করে বানাবেন রাস্তাঘাট? কী করে রাজ্যের সুরক্ষা সামলাবেন?”

“রাজা কী করে জমির মালিক হলেন? এই মাটি, জল, হাওয়া, রোদ্দুর, শস্যের বীজ সবই তো ভগবান সৃষ্টি করেছেন”।

ভীলককাকা প্রশ্রয়ের হাসি মাখা মুখে বললেন, “ভগবানই তো সৃষ্টি করেছেন, বেটা। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু বিলিব্যবস্থার জন্যে তিনি যে রাজাকেও নিয়োগ করেছেন”।

ভল্লা কিছুক্ষণ ভীলককাকার স্নেহসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, “সেই রাজার শালা, বছরের পর বছর মেয়েদের যাচ্ছেতাই অসম্মান করবে। রাজা মুখ বুজে বসে বসে দেখবে। আমরা রক্ষীরা তাকে শায়েস্তা করলে আমাদের নির্বাসন দেবে। এই কাজের জন্যেও কি ভগবান রাজাকে নিযুক্ত করেছিলেন, কাকা?” হঠাৎ করেই ভল্লা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকা তুমি আমাকে যতই বোঝাও, আমি বুঝব না। আমি এখন চলি কাকা, তোমরা সাবধানে থেক।

বাঁধ থেকে নেমে নালার ধারের ঝোপঝাড়ের আড়ালে হনহন করে ভল্লা এগিয়ে গেল তার কুটিরের পথে। ভীলককাকা তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, “ভগবান যে এই সব কিছুর মধ্যে নেই, সে কথা কী আর আমরা বুঝি না, বেটা? আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে, তোর মতো কেউ পাশে দাঁড়ালে, হয়তো আমরাও…। ভগবান তোকে দীর্ঘ পরমায়ু দিন, বেটা”। 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১



নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/১৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...