বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৪

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতে পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

উপরের Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের তৃতীয় পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৩ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

চতুর্থ পর্বাংশ 


৪.২.৪ খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর ভারত

কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর অনেক ঐতিহাসিক গুপ্তসাম্রাজ্যের সূচনার সময় পর্যন্ত কমবেশি শতাধিক বছরগুলিকে ভারতের তমসাচ্ছন্ন যুগ বলে থাকেন। কারণ এই সময়ের ইতিহাস বেশ অস্পষ্ট এবং রাজনৈতিক দিক থেকে একান্তই গুরুত্বহীন এবং তাৎপর্যহীন।

সফল রাজা ও রাজ্যের অভাবে, ভারতের ইতিহাস এই পর্যায়ে রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বহীন হলেও, সামাজিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে এই সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

এখনও পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্বের দুটি এবং খ্রিষ্টিয় দুটি শতাব্দীতে আমরা লক্ষ্য করলাম, আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত ভারতভূমিতে অদ্ভূত এক সামাজিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। দেশীয় আর্য এবং অনার্য জনগণের সমাজে মিশে যাচ্ছিল বহিরাগত অজস্র জনজাতি। যাদের মধ্যে ছিল গ্রীক, পারসী, ব্যক্ট্রিয়ান, সিথিয়ান, পার্থিয়ানদের মত অত্যন্ত সভ্য এবং প্রাচীন সংস্কৃতিসম্পন্ন জনজাতি। পাশাপাশি শক, পহ্লব, কুষাণদের মতো বেশ কিছু জনগোষ্ঠী – যারা মাত্র কয়েকশ বছর আগেও যাযাবর কিংবা পশুপালক ছিলেন। এই জনগোষ্ঠীর সকলেই বিজয়ী জাতি হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু ক্রমশঃ তাঁদের সকলেই ভারতীয় সমাজে সম্পূর্ণ মিশে গেল। বহিরাগত এই সমস্ত জনগোষ্ঠী-প্রবাহগুলির প্রত্যেকটি কীভাবে ভারতীয় বর্ণভিত্তিক সমাজ-সমুদ্রে মিশে যেতে পারল, সেকথায় বিস্তারিত যাওয়ার আগে, তখনকার ভারতীয় সমাজের অবস্থান সম্পর্কে একটু আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। 

 

৪.২.৪.১ সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ও বিস্তার

সমুদ্র-বাণিজ্য সূত্রে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের যেমন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তেমনই স্থলপথে উত্তর ভারতের সঙ্গে গ্রেকো-রোমান (Greco-Roman) সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এই যোগাযোগে চিন্তা-ভাবনার আদানপ্রদান যেমন হয়েছিল, তেমনই ভারতীয় সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয়েছিল নান্দনিক স্থাপত্য এবং শিল্পকলার দক্ষতায়। প্রথম দিকে বৌদ্ধরাই ছিলেন এই আদান-প্রদানের প্রধান অনুঘটক, কারণ বিদেশী অর্থাৎ অভারতীয়দের কাছে ব্রাহ্মণ্যধর্মের থেকে বৌদ্ধদের সংস্পর্শ অনেক বেশি সহজ ছিল। সাংস্কৃতিক এই আদান-প্রদানেই, নানান ধরনের লোককথা এবং লোককাহিনী, এমনকি পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা রচিত “পঞ্চতন্ত্র”এর গল্পগুলিও, নানান ভাষায় অনুবাদ হয়ে ইওরোপ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং পরবর্তী কালে তার বেশ কিছু অংশ নিয়ে “ঈশপ’স ফেব্‌ল্‌স্‌” (Aesop’s fables) সংকলিত হয়েছিল। “চতুরঙ্গ” বলে একটি খেলার কথাও শোনা যায়, পশ্চিমে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। যে খেলাটি ভারতীয় চতুরঙ্গ (হস্তী, নৌ, অশ্ব ও পদাতিক) সেনা বিন্যাস নিয়ে বানানো এবং চারজন খেলোয়াড় মিলে খেলতে হত। পরবর্তীকালে এই খেলাই কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে “দাবা” (chess) হয়ে উঠেছে, এবং বিশ্বের বহুদেশেই এটি আজও জনপ্রিয়।

এই আদান-প্রদানে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল ভারতীয় শিল্প, যার সূত্রপাত আফগানিস্তানের গান্ধার অঞ্চলে এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। গান্ধার শিল্পে বহুজাতিক শিল্পের মিশ্রণ ঘটেছিল। তার মধ্যে একটা হল, গ্রেকো-রোমান ব্রোঞ্জভাস্কর্য এবং স্টাকো[1] (stucco) শৈলী। গান্ধার শিল্পের সূচনার কিছুদিনের মধ্যে মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধ মূর্তি বানানোর প্রচলন যখন অনুমোদিত হয়ে গেল, খুব স্বাভাবিক ভাবেই বুদ্ধ মূর্তি বানাতে এই শিল্পের প্রচলন শুরু করলেন বৌদ্ধরাই। সে মূর্তি কখনো গ্রীক শৈলীতে বড়ো পাথরের মূর্তি কিংবা গ্রেকো-রোমান শৈলীর ছোট ধাতব মূর্তি। যদিও গান্ধার শৈলী ভারতীয়দের হাতে পড়ে ভারতীয় শৈলী হয়ে উঠতে কয়েকশ বছর সময় পার হয়েছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ গ্রীক ও রোমান শৈলী নিখুঁত অঙ্গ সৌষ্ঠব এবং সুসমঞ্জস অবয়বের অনুসারী। কিন্তু ভারতীয় শৈলীতে তার পরেও প্রয়োজন ছিল ভাব (Expressions) – পরম কারুণিকের করুণা এবং সর্ব জীবে প্রেমের শরীরি ব্যঞ্জনা।

ভারতীয় দর্শন যে পশ্চিমের ধারণায় নিবিড় প্রভাব ফেলেছিল, সে কথা সবিস্তারে বলেছি, এই পর্বের প্রথম অধ্যায়ে। তবে ভারত সম্পর্কে কিছুদিন আগে পর্যন্ত পশ্চিমের যে ধারণা ছিল, ভারত মানেই সন্ন্যাসী, ম্যাজিক, বিস্ময়কর (Marvellous) এবং মিস্টিক (Mystic) কিছু ব্যাপার-স্যাপার - তারও সূত্রপাত হয়তো এই পর্যায়েই। রোমান ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে পাওয়া যায়, ২৫ বি.সি.ই-তে ভারতীয় কোন রাজ্য থেকে রোমান রাজসভায় দুজন রাষ্ট্রদূত ও কিছু উপহার পাঠানো হয়েছিল, পশ্চিম ভারতের ভৃগুকচ্ছ বন্দর থেকে। দুজন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে একজন ছিলেন, সন্ন্যাসী এবং অন্যজন হস্তহীন কিন্তু দক্ষ তীরন্দাজ এক বিস্ময়-বালক, যে তার দুই পা দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতায় তির ছুঁড়তে পারত! এ ছাড়া সেই জাহাজে ছিল কিছু বাঘ, কিছু মোনাল পাখি, কিছু সাপ আর কিছু কচ্ছপ! ভারতীয় বন্দর থেকে রোমান সম্রাটের মনোরঞ্জনের জন্যে এই উপহার সমুদ্রপথে পৌঁছতে সময় লেগেছিল প্রায় চার বছর!

বৌদ্ধধর্মের প্রচারে খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতে বৌদ্ধরা চীনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি। চীনের লোয়াং শহরে তাঁদের প্রথম বিহারের নাম শ্বেতাশ্ব (White Horse)অবিশ্যি তার অনেক আগে থেকেই চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যে যে বস্তু চীন থেকে আমদানি করা হত তার সঙ্গে চীন শব্দ যোগ করে সেই বস্তুর নাম প্রচলিত ছিল, যেমন চীনাংশুক চীনের রেশমবস্ত্র, কিচক– চীনের বাঁশ[2] (বিশেষ এক ধরনের বাঁশকে চীনা ভাষায় “কি-চক” বলে), চীনামাটি (China-clay, porcelain), চীনাসিঁদুর (Chinese vermilion বা red lead – লাল রং হিসেবে ব্যবহার হত), চীনাবাদাম ইত্যাদি । যদিও পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে ভারতবর্ষেও এই সমস্ত জিনিষের উৎপাদন শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ভারতীয়, বিশেষ করে বঙ্গের রেশম বস্ত্র – মসলিন হয়ে উঠেছিল রোম সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে ইওরোপের অভিজাত সম্প্রদায়ের নয়নের মণি। ভারতে উপনিবেশ গড়ে তোলার পর, এই মসলিন উৎপাদনকে উৎখাত করেছিল, ব্রিটিশ বণিকেরা।

 চীনে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ায় ভারতের প্রতি চীনের আগ্রহ বাড়তে থাকে, এবং পরবর্তী কালে অত্যন্ত দুরূহ এবং দুর্গম পথের কষ্ট স্বীকার করেও বহু যুগ ধরে, বহু চৈনিক পণ্ডিত এ দেশে এসেছিলেন বৌদ্ধ দর্শনের শিক্ষা নিতে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের প্রতিলিপি সংগ্রহ করতে। সৌভাগ্যের কথা, তাঁদের এই কষ্টসাধ্য প্রয়াসের জন্যেই বৌদ্ধ শাস্ত্রের বিপুল সম্ভার উদ্ধার হয়েছে, তিব্বত, চীন ও নেপালের বহু বৌদ্ধ বিহার থেকে। নচেৎ বৌদ্ধ শাস্ত্রের বহু তথ্যই আমাদের অজানা থেকে যেত। তার কারণ ভারতের মূল পুঁথি এবং স্ক্রোলগুলি হয় কালের নিয়মে নষ্ট হয়েছে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে আজ বৌদ্ধ দর্শন এবং শাস্ত্র সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি, তার অধিকাংশই আমরা জেনেছি হয় প্রতিলিপি থেকে অথবা মূল গ্রন্থের তিব্বতি অনুবাদ থেকে। সম্প্রতি তক্ষশিলার (গান্ধার) ধ্বংসাবশেষ থেকে মাটির জালার মধ্যে সংরক্ষিত একটি মূল বৌদ্ধ স্ক্রোল উদ্ধার হয়েছে, যেটি বার্চ গাছের বাকলের (birch-bark) ওপর লেখা। স্ক্রোলটির ভাষা গান্ধারি-প্রাকৃত এবং লিপি খরোষ্ঠী। বিরল এই মূল স্ক্রোলটি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

দক্ষিণ-পূর্বের দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা আগেই বলেছি। এর ফলে নৌপথে ইরাবতীর (মায়ানমার) বদ্বীপ, মালয় উপদ্বীপ, মেকং বদ্বীপ এবং বালিদ্বীপেও ভারতীয় সংস্কৃতি পৌঁছে গিয়েছিল। শোনা যায় জনৈক ভারতীয় ব্রাহ্মণ, নাম কৌণ্ডিন্যেই কম্বোডিয়ার রাজকুমারীকে বিবাহ করেছিলেন, এবং সেখানে হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সময়ে বাংলার মহাস্থান এবং চন্দ্রকেতুগড় প্রধান দুই বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ছিল আরও অনেক ছোট ছোট সমৃদ্ধ জনপদ। কলিঙ্গ থেকেও মায়ানমারের ইরাবতী নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ার কথা শোনা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গোষ্ঠী ভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসকে পরিবর্তিত করে রাজ্য এবং রাষ্ট্রীয় সামাজিক ব্যবস্থায় আনার ব্যাপারে ভারতীয় বণিক এবং কোন কোন রাজপুত্র অনুঘটকের কাজ করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। যার ফলে ওই অঞ্চলের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ভারতীয় ধর্ম এবং সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই অঞ্চলকে সুবর্ণদ্বীপ বলতেন, তার কারণ মনে হয় প্রত্যক্ষ সোনা নয়, বরং ওই অঞ্চলের বাণিজ্য থেকে প্রভূত লাভ অর্জনকে তাঁরা “সুবর্ণ”-র সঙ্গে তুলনা করতেন।

 

৪.২.৪.২ শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা

ক) বিজ্ঞান

প্রথাগত শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি প্রধানতঃ নিয়ন্ত্রণ করতেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং বৌদ্ধ বিহারের অর্হৎগণ। ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় বর্ণভেদে শাস্ত্রপাঠের অনেক বিধিনিষেধ ছিল, সে কথা আগেই বলেছি। কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের সে রকম কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেখানে একমাত্র বিচার্য ছিল শিক্ষার্থীর মানসিক স্থিতি ও নিষ্ঠা এবং শেখার আগ্রহ। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্মীয়দের মধ্যে সন্ন্যাসী তো বটেই সাধারণ গৃহীভক্তদের মধ্যেও শিক্ষার হার বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত।

অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়া এবং গ্রীসের পণ্ডিত মানুষদের থেকে জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy), গণিত এবং চিকিৎসাশাস্ত্র ও ভেষজ বিদ্যার আদান-প্রদান করে দুই সংস্কৃতিই সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিত শুধু পুঁথিগত তত্ত্ব হয়ে আর রইল না, কারণ সমুদ্রগামী জাহাজের দিক্‌নির্ণয়ের জন্যে তারামণ্ডলী, রাশিচক্র, গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান জানা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এ বিষয়ে বণিকশ্রেণী ও সমিতিগুলির আগ্রহ এবং উৎসাহ ছিল সব থেকে বেশি, এই চর্চার পিছনে তাঁদের পরোক্ষ উদ্যোগ থাকাও আশ্চর্যের নয়।

শ্রমণ বা ওঝাদের ঝাড়ফুঁক আর শেকড়-বাকড়ের চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গে সমান্তরাল চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও উদ্ভব হয়েছিল বৌদ্ধ যুগ থেকেই, জীবকের হাত ধরে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে এতদিন মানুষের ব্যাধির কারণ হিসাবে যে তত্ত্বটি প্রচলিত ছিল, সেটি হল বায়ু, পিত্ত এবং কফ - এই তিনের সাম্যতা দেহকে সুস্থ রাখে। এই বায়ুর প্রকার আবার পাঁচ ধরনের –পঞ্চবায়ু। এদের মধ্যে সাম্যতা নষ্ট হলেই, শরীর অসুস্থ এবং ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গাছ-গাছড়া, খনিজ দ্রব্য ও ধাতু এবং প্রাণীজ দ্রব্য থেকে নানান ওষুধ বানানোর পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ব্যাধিতে তার নির্দিষ্ট প্রয়োগ বিধি নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা শুরু করেছিলেন জীবক, যাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় ফার্মাকোপিয়া (Pharmacopeia) বলা যেতে পারে।

জীবকের এই ভেষজবিজ্ঞান চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করলেন চরক। তাঁর লিখিত বা সংকলিত গ্রন্থের নাম “চরক সংহিতা”। এই সময়ে শল্য-চিকিৎসা (Surgery) বিজ্ঞানের চর্চা করেও বিখ্যাত হয়েছিলেন সুশ্রুত। এঁদের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এঁনারা দুজনেই কণিষ্কের সমসাময়িক ছিলেন। এই চিকিৎসা-বিজ্ঞান বিষয়ের বেশ কিছু বার্চ-বাকলের ভারতীয় স্ক্রোল পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ায়। এছাড়াও গ্রীক উদ্ভিদবিদ্‌ থিওফ্রাস্টাসের একটি গ্রন্থ আছে ভারতীয় ওষধি গাছ-গাছড়া এবং লতা-গুল্মের ওপর - যার নাম হিস্ট্রি অব প্ল্যান্টস (History of Plants)অর্থাৎ ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যা পশ্চিমের দেশগুলিকে সমৃদ্ধ করেছিল।

এ বিষয়েও ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের দ্বিচারিতা লক্ষ্য করার মতো। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে চিকিৎসক, বিশেষ করে শল্যবিদদের অবস্থান ছিল সমাজের কিছুটা নিম্ন স্তরে। যদিচ তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং প্রথাগত শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু তাও চিকিৎসকদের, বিশেষ করে যাঁরা শল্যচিকিৎসার চর্চা করতেন, তাঁদের সমাজের উচ্চস্তরের ব্রাহ্মণেরা সুনজরে দেখতেন না। কারণ তাঁদের শল্যবিদ্যা চর্চার জন্যে মৃত মানবদেহ কিংবা পশু দেহ নিয়ে কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন হত। অথচ সমাজে, মানুষের জন্যেই হোক কিংবা হাতি, ঘোড়া ও গবাদি পশুর জন্যেই হোক চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। পরবর্তী কালে এঁদের “বৈদ্য” বলা হয়েছে, এঁরা ব্রাহ্মণ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, এঁদের পৌরোহিত্যের অধিকার দেওয়া হয়নি, এঁরা ছিলেন ব্রাত্য ব্রাহ্মণ!

 খ) পেশাগত শিক্ষা ও দক্ষতা

এই ধরনের প্রথাগত শিক্ষা ছাড়া পেশাগত শিক্ষার প্রচলন করেছিলেন বণিক-সম্প্রদায় বা গিল্ডগুলি। তাঁরা বিশেষ বিশেষ, দেশজ এবং বিদেশী, কুশলী এবং দক্ষ শিল্পীদের নিয়ে সারা দেশেই প্রচুর শিক্ষাকেন্দ্র বানিয়ে তুলেছিলেন। সেখানে তাঁরা আগ্রহী এবং উৎসাহী শিক্ষার্থীদের শিল্পী বানিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই শিক্ষার্থী বাছাইয়েও বর্ণভেদের কোন বালাই ছিল না। বরং পরিশ্রমী শূদ্র ও বৈশ্য তরুণরা সম্মানজনক সৃষ্টিশীল কাজ শেখার আশায় এই সব প্রতিষ্ঠানে যোগ দিত।

এই পেশাগত শিক্ষার যেমন কোন সীমা ছিল না, তেমনই সীমা ছিল না দক্ষতার। খনি থেকে ধাতু নিষ্কাষণ, যেমন সোনা, রূপো, লোহা, তামা, টিন, সীসা। তার থেকে সংকর ধাতু বানানো, যেমন কাঁসা পিতল, ব্রোঞ্জ, কিংবা কাঁচা লোহাকে ইস্পাত বানানো। তার থেকে বাসনপত্র, যন্ত্রপাতি–লাঙলের ফাল, কোদাল, গাঁইতি, কাস্তে, বঁড়শি; অস্ত্রশস্ত্র – তীরের ফলা, তলোয়ার, বর্শার ফলা, খড়গ। আবার ব্রোঞ্জের মূর্তি বানানো, বুদ্ধ, বিষ্ণু, শিব, শ্রী। অথবা সোনা, রূপা বা তামার মুদ্রা। সোনা বা রূপার অলঙ্কার। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এবং প্রত্যেকটি পদে দক্ষতার মাত্রা আলাদা, সংজ্ঞা আলাদা। এভাবে প্রত্যেকটি পেশাই - তাঁতি, সূত্রধর, কুম্ভকার, স্থপতি, তৈলকার, নৌকা বানানো, সমুদ্রগামী জাহাজ বানানো, যুদ্ধের রথ এবং রাজাদের বিলাসভ্রমণের রথ বানানো – সমাজের অজস্র প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল পেশাগত দক্ষতা।

নিবিড় এই শিক্ষার সুষ্পষ্ট লক্ষণ এই যুগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। যেমন এই যুগের এবং পরবর্তী যুগের সোনা, রূপা বা তামার মুদ্রাগুলির চিত্র এবং লিপি মুদ্রণের সূক্ষ্ম শৈলীতে। পাথরের স্থাপত্যে - বৌদ্ধস্তূপ, মন্দির বা পাথর কেটে বানানো গুহাগুলিতে। আগে যে জ্যামিতি এবং পরিমিতি সীমাবদ্ধ ছিল যজ্ঞবেদি বানানোর মধ্যে, সেই জ্যামিতি এবং পরিমিতির জটিল প্রয়োগে গড়ে উঠতে লাগল, অনবদ্য মন্দির এবং প্রাসাদের স্থাপত্য। শুধু মাত্র স্থূল স্থাপত্যই নয়, ছোট-বড়ো, নানান ভঙ্গিমার পাথরের ভাস্কর্যে, তার অলংকরণে, তার সূক্ষ্ম শৈলী ও পালিশে। এই সময় থেকেই ধাতু এবং কাঠের শিল্পসামগ্রী, পাথরের ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যগুলি ভারতীয় স্বকীয় শৈলীতে অনন্য হয়ে উঠতে লাগল।

 গ) ভাষা ও সাহিত্য

৫০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে পাণিনি যে ভাষাতত্ত্ব সহ “অষ্টাধ্যায়ী” ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই মোটামুটি ১৫০ বি.সি.ই-তে পতঞ্জলি তাঁর “মহাভাষ্য” রচনা করলেন। এই মহাভাষ্যে পাণিনির প্রাচীন, অপ্রচলিত এবং দুর্বোধ্য কিছু নিয়মকানুন বাদ দিয়ে, বাক্য বিন্যাস পদ্ধতি এবং অজস্র নতুন শব্দ – বিগত কয়েকশ বছরের সামাজিক পরিবর্তনের ফলে যেগুলির উদ্ভব – অন্তর্ভুক্ত করলেন। পতঞ্জলির মহাভাষ্যের আরও একটি বিশেষত্ব হল, এই ব্যাকরণ শুধুমাত্র তাত্ত্বিক নীরস বর্ণনা নয়, অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনা এবং প্রচলিত কাহিনীর উদাহরণ দিয়ে, শিক্ষার্থী পাঠকের কাছে তত্ত্বগুলি সহজবোধ্য এবং চিত্তাকর্ষক করে তুলেছিলেন। যাঁরা সংস্কৃত জানেন না, অথচ সংস্কৃত ভাষায় আগ্রহী, মূলতঃ তাঁদের কথা মাথায় রেখেই পতঞ্জলি তাঁর এই মহাভাষ্য রচনা করেছিলেন। অর্থাৎ এই সময়ে তাঁর লক্ষ্য ছিল, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের “ম্লেচ্ছ”, “পুলিশ” ও “যবন”-রা - গ্রীক, পারসী ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিত ব্যক্তিরা।

মহাভাষ্যের সমসাময়িক একটি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় “গার্গী সংহিতা” – যে গ্রন্থে যবন রাজা দিমিত্রিয়সের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের “যুগ পুরাণ” অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যবনরা ম্লেচ্ছ এবং বর্বর হলেও তাদের জ্যোতিষবিদ্যার জ্ঞানের জন্য তাঁরা নমস্য এবং পূজনীয়! সমসাময়িক ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিদ্যায় রোম এবং গ্রীসের অবদানের কথা স্মরণীয় করে রেখেছিলেন তাঁদের “রোমক-সিদ্ধান্ত” এবং “পৌলিশ সিদ্ধান্ত” নাম দিয়ে। “রোমক”-এর অর্থ রোমান এবং গ্রীক বা পার্থিয়ানদের সংস্কৃত শাস্ত্রে “পুলিশ”ও বলা হয়েছে; “পুলিশ”-এর তত্ত্ব অর্থে পৌলিশ সিদ্ধান্ত। অথবা আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ পলের (Paul of Alexandria) নাম থেকেও “পৌলিশ” হতে পারে।

এই সময় কালে সংস্কৃত ভাষায় অজস্র শাস্ত্র এবং ধর্মশাস্ত্র রচনা হয়েছে। তার মধ্যে আছে মনুর “স্মৃতি” এবং বেশ কিছু পুরাণ। হয়তো এই সময়েই, অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংযোজন করে লিখে ফেলা হয়েছে, দুটি মহাকাব্য – রামায়ণ ও মহাভারত। লিখে ফেলা হয়েছে সবগুলি বেদ, তার সংহিতা,  ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং সূত্রসমূহ। বেদগুলিতে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের ঝুঁকি নেওয়া হয়নি, কারণ বেদমন্ত্রগুলি, আগেই বলেছি, প্রাচীন ঋষিরা সৃষ্টি বা রচনা করেননি, তাঁরা এই মন্ত্রগুলির দ্রষ্টা অর্থাৎ তাঁরা আদিষ্ট হয়েছিলেন। এই সময়েই সংকলিত হয়ে, লেখা হয়েছে কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র” – এই সংকলক ছিলেন বিষ্ণুগুপ্ত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, রাজা বিম্বিসার এবং মৌর্যযুগ থেকে শুরু করে, এই সময়কাল পর্যন্ত ভারতীয় রাজাদের প্রায় কেউই সংস্কৃতভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেননি। তাঁদের সকলেরই রাষ্ট্রীয়ভাষা ছিল প্রাকৃতভাষার নানান আঞ্চলিক রূপ। প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সংস্কৃতকে প্রশাসনিক ভাষা করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন বিদেশী – উজ্জয়িনীর শক রাজারা, যাঁদের সাধারণতঃ পশ্চিমের ক্ষত্রপ বলা হয়। ক্ষত্রপ রাজা রুদ্রদমনের গিরনার শিলালেখকেই (১৫০ সি.ই.), ঐতিহাসিকরা ভারতের প্রাচীনতম লিখিত সংস্কৃত নথি বলে মনে করেন। প্রসঙ্গতঃ গিরনারের সম্রাট অশোকের প্রাকৃত ভাষার শিলালেখের শিলাতেই, ক্ষত্রপ রুদ্রদমন এই সংস্কৃত নির্দেশ লিখিয়েছিলেন।     

কিন্তু যে কোন ভাষায় তত্ত্ব এবং শাস্ত্রকথা যতই বলা বা লেখা হোক, ভাষা স্বচ্ছন্দ গতি পায় সাহিত্যে। সাহিত্যের জন্যেই কোন ভাষা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যে ভাষায় মনের কথা প্রকাশ করা যায়, সেই ভাষাতেই মানুষ একাত্ম হতে থাকে। এই যুগে ধর্মশাস্ত্র এবং ব্যাকরণ ছাড়াও সাহিত্যের আঙিনায় সংস্কৃত পা রাখতে শুরু করেছিল। প্রাকৃত ভাষায় কবিতা রচনা করেছিলেন, সাতবাহন বংশের রাজা, হাল, সে কথা আগেই বলেছি। তাঁর কবিতা সংকলনের নাম, “গাথাসপ্তশতী” – এই কবিতাগুলির বেশ কিছু প্রেমের, কিছু অতিরিক্ত ভাবপ্রবণ আবার কিছু ছিল আদিরসাত্মক– তা হলেও সাহিত্যের প্রাথমিক পর্যায়ে মোটামুটি রসোত্তীর্ণ। মোটামুটি এই সময়েই সংকলিত হয়েছিল তামিল ভাষার প্রথম কবিতা সংকলন “শঙ্গম”। শঙ্গমের কবিতাগুলি বহু বছর আগে থেকেই ওই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল চারণ কবিদের মুখে মুখে, এবং কবিতার বিষয়বস্তু ছিল ওই অঞ্চলের জনপ্রিয় নানান সামাজিক ঘটনা। এই সময়েই তামিল ব্যাকরণ “তোলকাপ্পিয়ম”ও রচিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, সংস্কৃত এবং প্রাকৃত ভাষার বাইরে, তামিল হচ্ছে প্রথম ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা, যে ভাষার ব্যাকরণ এবং কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল এই পর্যায়ে।

বৌদ্ধ দিকপাল পণ্ডিত অশ্বঘোষের লেখা “বজ্রসূচী” – সম্ভবতঃ এই পর্যায়ের প্রথম সংস্কৃত সাহিত্য। এই গ্রন্থটি ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, তার সামাজিক প্রথা এবং চতুর্বণের প্রতি তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করে লেখা। যদিও অনেকের মতে এটি হিন্দুদের “বজ্রসূচী উপনিষদ” – এবং কোন মতেই অশ্বঘোষের রচনা নয়। যাই হোক, অশ্বঘোষের বুদ্ধের জীবনী নিয়ে লেখা দীর্ঘ কাব্য “বুদ্ধচরিত”– জীবনী কাব্য রচনায় যে পথিকৃৎ, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বুদ্ধচরিতের সংস্কৃত ভাষার অনবদ্য শৈলী, পরবর্তী সংস্কৃত সাহিত্যের পথপ্রদর্শক বললেও খুব একটা অতিরঞ্জন হয় না। এইসময়ের অন্যতম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক, বৌদ্ধ পণ্ডিত নাগার্জুনও সংস্কৃত ভাষাতেই বৌদ্ধ শাস্ত্র রচনা শুরু করেছিলেন। পণ্ডিত নাগার্জুনের সংস্কৃত বৌদ্ধশাস্ত্রগুলি, ব্রাহ্মণ্যধর্মের সংস্কৃত শাস্ত্রের প্রেক্ষীতে লেখা। যার ফলে উভয় ধর্মশাস্ত্রের পণ্ডিতদের মধ্যে দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক কিংবা তাত্ত্বিক বিচারের পথ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। অতএব সংস্কৃত ধীরে ধীরে আবার উচ্চমেধা (elite) এবং পণ্ডিত সমাজের একমাত্র ভাষা হয়ে উঠতে লাগল। যদিও আঞ্চলিক ভাষা কিংবা স্থানীয় প্রাকৃত ভাষার প্রচলন সমান্তরালেই চলতে লাগল, সাধারণ জনগণের মধ্যে।

সম্ভবতঃ এই সময়েই সংস্কৃতে ভাস লিখলেন তাঁর অনবদ্য নাটক “স্বপ্নবাসবদত্তম্‌”। ভাসের সময়কাল সঠিক জানা যায় না, তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তিনি মহাকবি কালিদাসের পূর্বসূরি এবং তাঁর জন্মকাল খ্রিষ্টিয় শতাব্দীগুলির প্রথম দিকেই। তাঁর নাটকের বিন্যাস, আজও ভারতীয় নাটকে অনুসরণ করা হয়। তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু মহাকাব্যিক অথবা ঐতিহাসিক প্রেমের কাহিনী। ভাসের নাটক অবিশ্যি রাজসভা অথবা বিদ্বৎমহলে সব থেকে জনপ্রিয় হয়েছিল। অশ্বঘোষও সংস্কৃতে কিছু নাটক লিখেছিলেন, সেগুলির মূল পাওয়া যায় না। মধ্য-এশিয়ার তুরফান বৌদ্ধবিহার থেকে তাঁর নাটকের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার হয়েছে। যার থেকে অনুমান করা যায়, অশ্বঘোষের নাটকগুলি ধর্মভিত্তিক এবং সাধারণের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উপভোগ্য হয়েছিল, তা নাহলে তার পাণ্ডুলিপি মধ্য-এশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল কী করে?

পরের পর্ব এই সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/৫



[1] স্টাকো (Stucco) হল পাথর বা ইঁট (বা আধুনিক কংক্রিট) দিয়ে বানানো নির্মাণের ওপর কঠিন পলেস্তারার প্রলেপ। এই প্রলেপ শুধু যে নির্মাণকে সুরক্ষা দেয় তাই নয়, নানান নকশা বা আলপনা বানিয়ে নির্মাণকে সুন্দর সুষমাময়ও করে তোলে। বাংলায় একেই আগেকার দিনে “পঙ্খের” কাজ বলা হত, আজকাল সাধারণতঃ “প্লাস্টার অব প্যারিস” (Plaster of Paris) দিয়ে স্টাকো করা হয়ে থাকে।  

[2] বাঁশ (Bamboo) ভারতবর্ষের – বিশেষতঃ পূর্বভারতের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপাদান, এর নানান ব্যবহার ভারতীয়রা আবহমান কাল ধরেই করে আসছে। চীনা বাঁশ হয়তো তার থেকে কিছুটা আলাদা প্রজাতির, এই বাঁশ থেকে সুদৃশ্য আসবাবপত্রাদি বানানো হত।


মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের দশম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব 


২৩

 

আষাঢ়ের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে মহারাণি সুনীথা রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেছেন। এই অংশগ্রহণে তিনি সম্মত হয়েছিলেন, একটি মাত্র শর্তে, মহর্ষি ভৃগুকে রাজপ্রসাদে নিয়মিত পরিদর্শনে আসতে হবে। তাঁর এই শর্তে পূর্ণ সম্মতি ছিল সকল মন্ত্রী এবং অমাত্যমণ্ডলীর। তাঁরা প্রত্যেকেই মহারাজ অঙ্গের অনুপস্থিতিতে মহর্ষি ভৃগুর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মহর্ষি ভৃগুর সুচিন্তিত মতামত এবং অনুমোদন ছাড়া কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হবে না। মহর্ষি ভৃগু তাঁদের এই প্রার্থনায় আপত্তি করেননি। তিনি নিজেও এই রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি আজকাল পক্ষকাল অন্তর রাজপ্রাসাদে আসেন। রাজা বেণের শারীরিক অবস্থার পর্যালোচনা করেন। মহারাণি ও মন্ত্রীমণ্ডলীর সঙ্গে রাজ্য পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা করেন, রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করেন।  তিনি সুচিন্তিত মতামত দেন, উপদেশ দেন।    

মহারাণি পুত্র বেণকে নিজের মহলে নিয়ে এসেছেন অনেকদিন। নিজের শয়নঘরের রাজকীয় পালঙ্কেই এখন পুত্র বেণ শয্যাশায়ী। সেই ঘরেই তিনজন সেবিকা দিবারাত্র তাঁর পরিচর্যা করে।  রাজবৈদ্য মৈত্রেয় পাশের কক্ষে বাস করেন, তিনি অষ্টপ্রহর রাজাবেণের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিরত রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন, সহকারী দুই আয়ুর্বেদজ্ঞ। তাঁরা মহর্ষি ভৃগুর আশ্রমের স্নাতক। আর আশ্রম থেকে নিয়মিত আসেন আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধু।

 

আচার্য বিশ্ববন্ধু এবং মহামন্ত্রী বিমোহন বিমোহনকে সঙ্গে নিয়ে মহর্ষি ভৃগু আজ মহারাণির দর্শনপ্রার্থী হয়েছেন। দাসী পদ্মবালা তাঁদের দেখেই প্রণাম করে অন্দরে গেলেন, মহারাণি সুনীথাকে সংবাদ দিতে। সংবাদ পাওয়া মাত্র মহারাণি সুনীথা ব্যস্ত হয়ে সম্মুখের অলিন্দে বেরিয়ে এলেন, বললেন, “মহর্ষিঠাকুর, এই রাজপ্রাসাদে, এই মহলের সর্বত্র, আপনার প্রবেশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন হয় নাকি? আসুন, ভেতরে আসুন, মহর্ষিঠাকুর। পুত্র বেণ, এখন আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ এবং আমিও অনেকটাই চিন্তামুক্ত”।

“অতি উত্তম সংবাদ মহারাণি। এ সবই পরমেশ্বরের কৃপা”! স্মিতমুখে মহর্ষি বললেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, মহারাজ বেণের অসুস্থতার পর, প্রথমদিন মহারাণিকে যে বিধ্বস্ত অবসন্ন অবস্থায় তিনি দেখেছিলেন, তার তুলনায় মহারাণি এখন অনেকটাই সজীব এবং সপ্রতিভ। তাঁর আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে মহারাণিসুলভ ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ মনোকষ্টে এবং কৃচ্ছ্রসাধনে তাঁর  যে শরীর জীর্ণ হয়ে উঠেছিল, সেই শরীর আজ নির্মেদ ঋজু, কিন্তু মহিমময়ী।

মহর্ষি ভৃগুকে পুত্রের শয্যার পাশে নিয়ে গিয়ে মহারাণি পুত্রবেণকে বললেন, “পুত্র বেণ, দেখ তোমার সঙ্গে দেখা করতে, কে এসেছেন”। রাজাবেণ পাথরের মূর্তির মতো গৃহের ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, মাতার কণ্ঠস্বরে তাঁর দৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন হল না। একইভাবে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। মহর্ষি ভৃগু তীক্ষ্ণ চোখে রাজা বেণকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন, “বৎস মৈত্রেয়, মহারাজ বেণের শারীরিক পরিস্থিতি কেমন? ওঁনার চেতনা এখন কোন অবস্থায়?”

“প্রণাম গুরুদেব। শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। কিন্তু মহারাজ বেণের চেতনা আদৌ সন্তোষজনক নয়। ওঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের প্রায় কোন সংযোগই নেই। পূর্ণ স্নায়বিক বৈকল্য!”

গভীর চিন্তামগ্ন মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অসুস্থতার পর মাসাধিককাল তুমি ওঁনার চিকিৎসায় নিরন্তর নিরত, প্রথমাবস্থা থেকে আজ পর্যন্ত কোন উন্নতিই তুমি লক্ষ্য করছো না?”

“না গুরুদেব, উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন আমি দেখিনি”।

মহর্ষি ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমারও কী তাই মত, বৎস বিশ্ববন্ধু?”

“হ্যাঁ গুরুদেব, আমারও তাই অভিমত। গতবার আপনার নির্দেশিত ঔষধ প্রয়োগে, রাজাবেণের চরম অসুস্থতার আশ্চর্য উপশম হয়েছিল। কিন্তু ওইটুকুই, তারপর আর তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না”। মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের দক্ষিণ হাত তুলে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগে নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে দুই চোখের কনীনিকা নিরীক্ষণ করলেন। তাঁর চোখের অত্যন্ত কাছে অকস্মাৎ হাত নিয়ে গেলেন। কিন্তু রাজাবেণের নির্বিকার চোখের পল্লবে কোন সাড়া পাওয়া গেল না, একইভাবে অবিচল দৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গভীর শ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের পায়ের দিকে গিয়ে, পদতলে নখের আঁচড় কাটলেন, রাজাবেণ তবুও নির্বিকার – জড়পদার্থের মতো ঊর্ধে একইভাবে তাকিয়ে রইলেন

মহর্ষি ভৃগু গভীর হতাশায় মাথা নীচু করে বললেন, “ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া অন্য কোন পথ আর খোলা নেই, মহারাণি। রাজা বেণের চিকিৎসায় এতটুকুও অবহেলা না করে,  আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। হয়তো প্রকৃতির কোন আশ্চর্য লীলায়, রাজাবেণ সুস্থ হয়ে উঠতেও পারেন”।

দুই নয়নে অশ্রুবাষ্প নিয়ে রাজমাতা সুনীথা বললেন, “শুনেছি আজকাল আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে, অনেক দুরারোগ্য ব্যধিও নিরাময় হচ্ছে। আমার পুত্রের আরোগ্যের জন্যে অন্য কোন ঔষধের বিধান কী আপনি দিতে পারেন না, মহর্ষিঠাকুর”?

মহর্ষি ভৃগু মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, “হে মহারাণি, আমি তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ে বার্তা পাঠাচ্ছি, ওখানে চৈনিক, যবন ও ম্লেচ্ছ জাতির চিকিৎসাবিদ্যারও চর্চা হয়ে থাকে। দেখি, তারা যদি কোন প্রতিবিধান করতে পারে! এখন আমাকে অনুমতি দিন, মহারাণি”।

রাজমাতা সুনীথা হঠাৎ ব্যাকুল কান্নারুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, “মহর্ষিঠাকুর, আমি সামান্যা নারী, পুত্রের অসুস্থতা নিয়েই আমি এখন অত্যন্ত বিচলিত, তার ওপর রাজকার্য আমার কাছে যেন বিষম এক ভারস্বরূপ! আমাকে এর থেকে মুক্তি দিন, মহর্ষিঠাকুর, মুক্তি দিন। মহারাজ অঙ্গের কোন সন্ধান পেলেন? যতদিন তাঁর সন্ধান না পাওয়া যায়, আপনারাই এই রাজ্য পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নিন। আমাকে মুক্তি দিন, মহর্ষিঠাকুর, দয়া করুন”।

মহর্ষি ভৃগু রাজমাতা সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, অনেকক্ষণ, তারপর গৃহে উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শান্ত হোন মহারাণি। আমি রাজসভামণ্ডলীর মন্ত্রী ও অমাত্যদের সঙ্গে আলোচনা করে, আপনাকে আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাবো। ততদিন একটু ধৈর্য ধরুন, মহারাণি। এতটা হতাশ হবেন না। মহারাজবেণকে সুস্থ করে তোলাই এখন আপনার ও আমাদের সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য, মহারাণি”। রাজমাতা সুনীথা কোন উত্তর দিলেন না, পুত্রের শয্যার পাশে বসে পড়লেন। পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন চুপ করে, তাঁর দুই গাল বেয়ে নেমে এল বিগলিত অশ্রূ!

 

 

২৪

 

 

মহারাণি সুনীথার মহল থেকে তিনজনে বেরিয়ে, মহর্ষি ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধুকে বললেন, “বৎস বিশ্ববন্ধু, তুমি এখন রাজাবেণের কাছেই থাকো। আমি মন্ত্রীমণ্ডলীর সভা সাঙ্গ করে ফিরে আসছি”।

তারপর রাজসভার দিকে হাঁটতে হাঁটতে, তিনি মহামন্ত্রী বিমোহনকে বললেন, “ভদ্র বিমোহন, আমার মনে হয়, আমাদের অতি সত্বর সর্বসম্মত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবার সময় এসেছে”।

জিজ্ঞাসু মুখে মহামন্ত্রী বিমোহন মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে তাকালেন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কিসের সিদ্ধান্ত, মহর্ষি?”

গভীর চিন্তামগ্ন মুখে হাঁটতে হাঁটতে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “শুনলেন না? মহারাণি রাজ্যশাসনের দায়িত্ব থেকে আশু মুক্তি চাইছেন”!

“তা ঠিক। কিন্তু এখনই এ ছাড়া অন্য আর কোন পন্থা আমরা অবলম্বন করতে পারি, মহর্ষি?”

“চিন্তা করতে হবে, ভদ্র বিমোহন, চিন্তা করতে হবে। কোন একটা উপায় আমাদের বের করতেই হবে! এইভাবে অনন্তকাল তো চলতে পারে না! দীর্ঘদিন এইভাবে রাজ্য পরিচালনা আমাদের এই রাজ্যের পক্ষে শুভকর হবে বলে আপনার মনে হয়?”

“নাঃ মোটেই শুভকর নয়। মহারাণির বয়েস হয়েছে, আমাদেরও বয়েস হয়েছে। নতুন প্রজন্মের হাতে শাসনভার হস্তান্তর করতে না পারলে... কিন্তু...”!

মহামন্ত্রী বিমোহনের কথার মধ্যেই মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আপনি এখনই সমস্ত মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্য অমাত্যদের মন্ত্রণাকক্ষে উপস্থিত করাতে পারবেন? কতক্ষণ সময় লাগবে?”

“এখনই? হ্যাঁ এখনই হতে পারে। আপনি আজ প্রাসাদে আসছেন, সবাই জানে, আমার ধারণা সকলেই রাজসভায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন!”

মহর্ষি ভৃগু তীব্র আপত্তিতে মাথা নেড়ে বললেন, “না, না, রাজসভায় অনেক অপ্রয়োজনীয় বহিরাগত ব্যক্তিদের আনাগোনা থাকে। রাজসভায় নয়, আমাদের আলোচনার গোপনীয়তা জরুরি, আপনি মন্ত্রণাকক্ষেই সকলকে আমন্ত্রণ করুন”।

“তাই হোক। আমি সকলকে সংবাদ পাঠাচ্ছি। মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যঅমাত্যদের”। পিছন ফিরে মহামন্ত্রী দেখলেন, চারজন নিরাপত্তারক্ষী তাঁদের অনুসরণ করছে। তাদের একজনকে ডেকে তিনি বললেন, “রক্ষীগণ, তোমাদের মধ্যে একজন রাজসভায় যাও। সেখানে গিয়ে বলবে, মহর্ষি এবং মহামন্ত্রী, সকল মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্য অমাত্যদের মন্ত্রণাকক্ষে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন – এখনই। আমরা মন্ত্রণাকক্ষেই অপেক্ষা করবো।”

রক্ষীদের প্রধান বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নীচু করে বলল, “হে মহাভদ্র,  আমি এখনই সকলকে বার্তা দিয়ে নিয়ে আসছি”।

“অতি উত্তম, আর মন্ত্রণাকক্ষের বাইরে যেন যথেষ্ট নিরাপত্তা থাকে, সেই দিকেও লক্ষ্য রাখবে”!

“অবশ্যই! ও বিষয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, মহাভদ্র। আমরা জীবিত থাকতে, কোন ষড়যন্ত্রকারী আপনাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না!”

রক্ষী দ্রুত পায়ে রাজসভার দিকে চলে যেতে, মহর্ষি ভৃগু বললেন, “নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনাকে অত্যন্ত সতর্ক দেখছি, কোন গোপন বার্তা আছে কী?”

চিন্তিত মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “নির্দিষ্ট কোন বার্তা যদিও নেই, তবুও আমি সতর্ক থাকি। ঊণিশ মাসের রাজত্বকালে মহারাজ বেণ নিজস্ব একটি প্রশাসন চক্র গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর আকস্মিক এই অসুস্থতার কারণে যে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তাদের মধ্যে অনেকেই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, প্রতিহিংসার ব্যাপারে সচেষ্ট। সেকারণেই সতর্ক থাকি”।

মহর্ষি সম্মতি জানিয়ে বললেন, “সঠিক সিদ্ধান্ত, ভদ্র বিমোহন। আমারও অভিমত, অত্যন্ত সতর্ক থাকাই উচিৎ”।

মহামন্ত্রী বিমোহন অত্যন্ত নীচুস্বরে আরও বললেন, “কিছু লোক এমনও রটনা করছে, মহারাজ বেণের এই অসুস্থতার কারণ বিষ প্রয়োগ। আর সেই বিষ প্রয়োগ করেছে নটী বিদ্যুল্লতা। কিন্তু নটী বিদ্যুল্লতার প্রতি তারা ক্রুদ্ধ নয়। তারা প্রচার করছে, এর পিছনে আছে গভীর ষড়যন্ত্র। আর সেই ষড়যন্ত্রের আড়ালে আছেন...” একটু দ্বিধাভরে থেমে গেলেন মহামন্ত্রী বিমোহন।

স্মিতমুখে মহর্ষিভৃগু তাঁর মুখের দিকে তাকালেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “ষড়যন্ত্রের আড়ালে কে আছেন, ভদ্রবিমোহন?  বলতে গিয়েও থেমে গেলেন কেন?”

“হ্যাঁ মহর্ষি, যদিচ সবটাই রটনা। আমরা বার্তা পেয়েছি, তাদের ধারণা এই ষড়যন্ত্রের আড়ালে আছেন, আপনি”!

মহর্ষি ভৃগু এতটুকুও বিচলিত হলেন না, একটু হাসলেন, বললেন, মন্দ নয়, কী বলেন ভদ্রবিমোহন? এতদিনে ষড়যন্ত্রী হিসেবেও একটা স্বীকৃতি পাওয়া গেল! ও কথায় পরে আসছি, একটা কথা বলুন তো, শুনেছিলাম, মহারাজ বেণের উদ্যানবাটিকার দ্বার উদ্ঘাটন হবে শ্রাবণী পূর্ণিমায়, তার কী অবস্থা?”

“উদ্যানবাটিকা তো বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত মহর্ষি! মহারাজ বেণ অসুস্থ হয়ে না পড়লে, শ্রাবণী পূর্ণিমাতেই দ্বার উদ্ঘাটন হতে পারতো। এখন রক্ষীদের নিরাপত্তায় অব্যবহৃত পড়ে আছে”।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আচ্ছা? অতি উত্তম। চলুন আমরা মন্ত্রণাকক্ষে পৌঁছে গেছি, আশা করি সকলে চলে এসেছে”!   

 

প্রশস্ত কক্ষের পশ্চিমদিকে অলংকৃত রাজাসন নির্দিষ্ট। তাঁর আসন একটু উঁচুতে পাথরের প্রশস্ত বেদিতে, মেঝে থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। তার দুপাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে, মেঝের সমতলে আরও দুটি পাথরের নিরলংকার আসন। এ দুটি আসনের একটি মহামন্ত্রী এবং অন্যটি সংরক্ষিত সম্মানীয় রাজ অতিথি অথবা সম্মানীয় বৈদেশিক রাষ্ট্রদূতের জন্যে। উত্তর ও দক্ষিণের দেওয়াল বরাবর পাথরের লম্বা আসন, সেখানে মন্ত্রী সভার সকল সদস্য ও অমাত্যদের বসবার স্থান।

মন্ত্রণাকক্ষে প্রবেশ করে, মহর্ষি ভৃগু দেখলেন, মন্ত্রীসভার সকলেই উপস্থিত এবং নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট। তাঁরা কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র, সকলেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, প্রত্যেকে নতমস্তকে তাঁদের প্রণাম জানালেন।  তিনি এগিয়ে গিয়ে সাধারণ আসনে বসতে, মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “এ কী, মহর্ষি, আপনি ওখানে বসলেন কেন? আপনার জন্যে তো রাজাসনের পাশের আসন নির্দিষ্ট!”

মহর্ষি ভৃগু হাসলেন, বললেন, “আপনি আপনার আসনে উপবেশন করে, সভা পরিচালনা করুন ভদ্রবিমোহন, আমি এখানেই বেশ আছি। রাজাসনই যেখানে শূণ্য, সেখানে রাজ অতিথির আসন এখন অপ্রাসঙ্গিক”।

মহামন্ত্রী বিমোহন জোর করলেন না, তিনি মহর্ষিকে যেমন শ্রদ্ধা করেন, ভয় পান, তেমনি ঈর্ষাও করেন। মহারাজ অঙ্গের রাজত্বকালে মহর্ষি ভৃগুর যে প্রভাব ও প্রতিপত্তি তিনি দেখেছেন, এই রাজ্যের মহামন্ত্রী হিসেবে সেই গুরুত্ব তিনি কোনদিনই পাননি। এই মন্ত্রণাকক্ষে মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে মহারাজ অঙ্গ বহুবার গোপন মন্ত্রণা করেছেন, তার মধ্যে কতদিন, মহামন্ত্রী বিমোহনের প্রবেশাধিকারই ছিল না। তাছাড়া এই রাজ্যই শুধু নয়, তিনি প্রতিবেশী রাজ্যে কিংবা অতি দূর রাজ্যে যেখানেই গেছেন, মহামন্ত্রী হিসেবে অভ্যর্থনা ও কুশল সংবাদ বিনিময়ের পর, সব থেকে বেশি যে প্রশ্নের সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়েছে, সেটি হল, “মহামন্ত্রী, মহর্ষি ভৃগু কুশলে আছেন তো?” মহর্ষি ভৃগু এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন, তাই তিনি রাজ অতিথির আসন এড়িয়ে গেলেন। তাঁর সম্বন্ধে যে রটনার কথা বলে মহামন্ত্রী বিমোহন তাঁকে সতর্ক করতে চাইছিলেন, নির্বিকার হাসি দিয়ে মহামন্ত্রীর সেই উৎসাহে তিনি জল ঢেলে দিয়েছেন!  কারণ এই রটনার কথা তাঁর কানে এসেছে, আজ নয়, রাজাবেণ অসুস্থ হবার পরের দিনই; আর সেই কারণেই তিনি নটী বিদ্যুল্লতাকে নিজ রাজ্যে নিরাপদে ফিরিয়ে দিয়েছেন। স্বদেশে বিদেশে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি যতই থাক, ভিন্ন রাজ্যের একজন সুন্দরী লাস্যময়ী রমণীর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার মতো রাজক্ষমতা তো তাঁর নেই!


পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা

বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "



                                        এর আগের বড়োদের গল্প - " নতুন চাল "   

হাওড়া দুনম্বর প্ল্যাটফর্ম এখন যুদ্ধক্ষেত্র। ট্রেন ঢুকলেই যেমন হয়, গেটের সামনে তুমুল ধস্তাধস্তি। একদল “আরে, নামতে দিন, নামতে দিন, কী সব লোক রে, বাবা? নামতে দেবেন না নাকি?” বলে নামার জন্যে হাঁকপাঁক করছে। আরেকদল, “একপাশ দিয়ে নামুন না, কত জায়গা লাগে নামতে?” বলে কনুইয়ের গুঁতো মেরে ঠেলে উঠছে। তাদের সঙ্গে আমরাও উঠে পড়লাম। আমি, আমার বন্ধু অভ্রময় ভেতরে ঢুকে দুটো সিট দখল করতে যাবো, ফুটবলের মতো গোল বয়স্কা এক মহিলা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বেদখল করে নিলেন সিটদুটো। একটায় নিজে বসে, অন্য সিটে ব্যাগ চেপে, চেঁচাতে লাগলেন, “ভালো, অ্যাই ভালো, বাসি, অ্যাই বাসি”।

হাতের সিটটা ফস্কে গেল, কিন্তু বয়স্কা মহিলার সঙ্গে বিবাদ করাও চলে না। আমরা গোমড়া মুখে দাঁড়িয়েই রইলাম সামনে। এখন মহিলার ওই ডাক শুনে, আমি অভ্রকে বললাম, “এই বয়সেও ভালোবাসার খোঁজ করছেন”!

অভ্র খুকখুক হাসল ভদ্রমহিলার কানে কথাগুলো না যাওয়ার কথা নয়, তিনি মুখ তুলে ভুরু কুঁচকে আমাদের দুজনকে নিরীক্ষণ করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। ওঠা-নামার ধস্তাধস্তি এখন আর নেই, একটি মেয়ে মহিলার সামনে এসে দাঁড়াতে, হাতের ব্যাগ সরিয়ে মহিলা মেয়েটিকে বসতে দিলেন, আর জিগ্যেস করলেন, “ভালো কোথায়? উঠেছে?”

মেয়েটি ঘাড় নাড়ল, মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “উঠেছে, ওই তো দাঁড়িয়ে আছে”।

“দঁড়িয়ে কেন? কোথাও একটু বসার জায়গা করতে পারল না?”

“আঃ মা, এইটুকু তো যাবো, তার জন্যে...”

“চুকঃ, তোদের শুধু আলসেমি, একটু উয্‌যোগ নিলেই সিট পাওয়া যায়। বললাম, আমার সঙ্গে উটে আয়, তা না, তোরা সেই উটের মতো দাঁড়িয়েই রইলি”।

“ও, আর দশ মিনিটের জন্যে এই বসাটা আলসেমি নয়?”

“চুকঃ, মুকেমুকে তক্কো করিস না”। মা আর মেয়ে সিটে গুছিয়ে বসল। তারপর মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। আর সেই দৃষ্টিপাতে আমার যে অনুভূতি হল, সেটা বাসি নয়, যথেষ্ট টাটকা বাসি মুচকি হেসে লাজুক চোখ নামাল, কিন্তু বাসির মা আমার দিকে এবার মুখ তুলে তাকালেন, বললেন, “এই বয়েসে আমি ভালোবাসা খুঁজিনি, বুঝেছো ডেঁপো ছোকরা? আমার ছেলের নাম ভালো, আর এই মেয়ের নাম বাসি। মা-কাকিমাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখোনি? যাবে তো অনেকদূর, নাকি?”

অভ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি ওর হাত চেপে ইশারা করে বললাম, “হ্যাঁ, অনেকটাই দূর”

মহিলা একটু ব্যাঁকা হেসে বললেন, “সে আমি দেখেই বুঝেছি। আমরা নামবো এই উত্তরপাড়ায়, তখন আরাম করে বসে যেও”।

মাকে কনুইয়ের ঠেলা দিয়ে, মেয়ে মৃদু স্বরে বলল, “মা, চুপ করো না”

“চুকঃ, চুপ করে থাকলে সবাই মাথায় চড়ে যায়”।

এই সময় ভোঁ শব্দ করে, ট্রেনটা ছাড়ল বাসির মা জিগ্যেস করলেন, “লেট করল না? ক মিনিট দেখ তো?” বাসি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে, টাইম চেক করল, বলল, “নটা বাইশ”।

“তার মানে, পাঁচ মিনিট লেট! হ্যারে বাসি, সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছতে পারবো তো?”

“আরামসে পৌঁছে যাবো, মা। টেনসান করো না তো”।

“চুকঃ। টেনসান করবো না? তোদের কালকে সন্ধেতেই চলে আসতে বললাম, শুনলি না। জানতাম এটাই হবে। সকালে তোদের ঘুম ভাঙাতে ছেনি-হাতুড়ি ঠোকার অবস্থা!”

“মা? কী হচ্ছে কি? এটা ট্রেন!”

“চুকঃ, ট্রেন তো কী হয়েছে? আমি কখন বললাম যে এটা বাস”?

বাসির অস্বস্তি অনুভব করে, আমি কথা ঘোরানোর জন্যে বললাম, “কাকিমা, আমাদের কী দেখে বুঝলেন, আমরা অনেক দূরের যাত্রী?”

আমার এই আচমকা প্রশ্নে মহিলা একটু থতমত খেলেন, বললেন, “ইয়ে, মানে, ও আমি তোমাদের চেহারা, আচার-ব্যাভার দেখেই বুঝে গেছি। ডেঁপো আর ফক্কর”। হালুয়ার রেললাইনের জটিলজট ছাড়িয়ে ট্রেনের সবে একটু স্পিড উঠেছিল, আবার কমতে লাগল, লিলুয়া আসছে। আমি খুব নিরীহ মুখ করে জিগ্যেস করলাম, “দূরের ছেলেরা ডেঁপো আর এদিককার, মানে উত্তরপাড়ার ছেলেরা খুব লালু হয় বুঝি?”

“লালু মানে?”

“ডেঁপোর উলটো ব্যাকরণে যাকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে”।

মহিলা রাগরাগ গলায় বললেন, “মোটেও তা নয়, লালু মানে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু”।

ভিজে বেড়ালের মতো আমি বললাম, “না, কাকিমা, লালু মানে ভালো”।

মহিলা এবার সত্যি রেগে গেলেন, বললেন, “আমার ছেলে ভালো, তুমি তাকে বলছো”?

উত্তরে আমি বললাম, “ভালো ভালোই তো, ভালো নয়?”

লিলুয়া পার হয়ে ট্রেন আবার দৌড়তে শুরু করল, মহিলা বললেন, “ভালো ভালো তো বটেই, ওর মতো ভালো আর হয় না”।

বাসি বলল, “মা, বাজে না বকে, একটু থামো না”।

“চুকঃ, বাজে বকছি মানে? আমার বাপু পেটে-মুখে এক কথা, যা বলার মুখের ওপর বলে দিই। সত্যি বলব তাতে ভয় কী”?

“ঠিকই বলেছেন। দূরের স্টেশনের ছেলেরা ডেঁপো আর বাজে। ট্রেনের গার্ডবাবুর ঘন্টাটাও বাজে। ট্রেন যত দূরদূর যায়, ঘন্টাটাও ততবার বাজে। এই বেলুড় ছাড়ার সময় দেখবেন, উনি ঘন্টা বাজিয়ে দেবেন”।

মহিলা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, বললেন, “তার মানে? ঘন্টা বাজার সঙ্গে বাজে ছেলের কি সম্পর্ক”?

বাসি ছোট্ট রুমালে হাসি মুছল। আমি বললাম, “সম্পর্ক নেই কাকিমা? দুটোই তো বাজে। ঘন্টাটা আর দূরের ছেলেগুলোও...” আমার কথা শেষ হবার আগেই ঝালমুড়ির টিন নিয়ে, “ঝালমুড়ি-ই-ই-ই” এলেন আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম, “কাকিমা, ঝালমুড়ি খাবেন? বাসি নয়, টাটকা, বেশ ভালো ঝালমুড়ি। পাঁচটা দিন তো, দাদা”।

শেষ কথাটা আমি মুড়িওয়ালাকে বললাম। মহিলা খুব অবাক হলেন, আমার সাহস দেখে; রেগেও গেলেন খুব, বললেন, “ঝালমুড়ি বাসি কি ভালো সে আমি খুব জানি। তোমাকে আর ডেঁপোমি করতে হবে না”

বাসি এবার হাসতে হাসতে বলল, “আমি কিন্তু ঝালমুড়ি খাবো, মা। সকালে তাড়াহুড়ো করে বের করে আনলে, খিদে পেয়েছে”।

বাসির সমর্থন পেয়ে ঝালমুড়িওয়ালা নারকেল তেলের সাজানো ডাব্বাগুলো থেকে, দড়িতে বাঁধা ঢাকনাগুলো খুলে ফেলল চটপট। তারপর মাঝের বড়ো টিনের ডাব্বার ঢাকনা খুলে, স্টেনলেস স্টিলের মুড়িমাখা ডাব্বার মধ্যে মুঠো মুঠো মুড়ি তুলতে লাগল। এর পর শুরু হল, নানান ডাব্বা আর চামচের জলতরঙ্গ, তার সঙ্গে লাগাতার প্রশ্নমালা! পেঁয়াজ দেবো? হুঁ। ধনেপাতা? হুঁ। শসাকুচি? না। কাঁচালংকা? কম। আচারতেল? হুঁ। ঝালমুড়িওয়ালা আর বাসির এই আলাপ আমি মন দিয়েই শুনছিলাম, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। সব বক্কাল দেওয়ার পর, মুড়িমাখা ডাব্বার মধ্যে চামচ আর হাতের বিপুল ঠনঠন মিশ্রণের আওয়াজ যখন চলতে লাগল, আমি অভ্রকে বলতে বাধ্য হলাম, “মুড়িমাখার এই ডাব্বাটা আর চামচেটাও তো দেখছি বাজে”!

পকেট থেকে পঞ্চাশটাকা বের করতেই, মহিলা বলে উঠলেন, “অ্যাই, তুমি টাকা দেবে না!”

“কাকিমা, আমরা বাজে, কিন্তু আমাদের নোট কাগজের, ওগুলো বাজে নাঝালমুড়ির কথা আমি বলেছিলাম, দাম আমিই দেবো”।

 

উত্তরপাড়া অব্দি আর কথা হল না, মুড়ির ঠোঙা শেষ হলমহিলা ভালোছেলে এবং বাসিমেয়েকে নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমরাও। মহিলা মেয়েকে বললেন, “বাসি, ব্যাগট্যাগ সব নিয়েছিস তো”?

“নিয়েছি মা”।

“কটা বাজছে রে?”

“নটা বিয়াল্লিশ”

“সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছে যাবো, বল? এখন একটা রিকশা পেলে হয়!”।

“উত্তরপাড়ায় রিকশা পাওয়া যাবে না, মা? স্টেশনের বাইরে গেলেই দেখবে কয়েকশ রিকশ। তুমি এমন কথা বলো না?”

“বলা যায় না, রে। কপাল মন্দ হলে...এ কী? তোমরাও উত্তরপাড়ায় নাকি? দূরে নামবে বললে?” হঠাৎ পিছন ফিরে আমাদের দেখতে পেয়ে মহিলা জিগ্যেস করলেন। আমি একটু হাসলাম, কোন উত্তর দিলাম না। উত্তরপাড়ায় সবই তো উত্তর, কিছু প্রশ্ন আপাতত নিরুত্তরই থাক!

 

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে, স্পিড কমে আসছে। বাসি মেয়ে আমার পাশে। সামনে কাকিমা আর ভালো ছেলে। আমার পিছনে অভ্র। বাসি মুখ তুলে খুব মৃদুস্বরে যা বলল, শুনে আমি মৃদু হাসলামআমি বাসির ব্যাগ ধরা হাতটা আলতো ধরে, একটু চাপ দিলাম। বাসি মুখ তুলে তাকিয়ে, মুচকি হাসল।

 

ট্রেন থেকে নামা-ওঠার ভিড়ে আমি আর অভ্র প্ল্যাটফর্মে নেমেই, প্রায় দৌড়ে রিকশাস্ট্যাণ্ডে চলে এলামরিকশায় উঠে বিধানজেঠুর বাড়ির ঠিকানা বলতেই, রিকশা ভেঁপু হাঁকিয়ে দৌড়ে চলল। অভ্র এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেল, বলল, “তুই যে এত ধুরন্ধর জানতাম না, শালা। এই ক মিনিটের মধ্যে মেয়েটাকে পটিয়ে ফেললি? তাও শুধু ঝালমুড়ি খাইয়ে?”

আমি মুচকি হেসে বললাম, “দেখিস, জেঠু যেন জানতে না পারেন”!

“সে ঠিক আছে, জানতে পারবেন না। কিন্তু তুই তো শুধু নামটাই জানলি, ফোন নম্বর, ঠিকানা কিছুই জানলি না!”

“সে হবে খন, ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? দাঁড়া, জেঠুরবাড়ি খালি হাতে যাবো নাকি? ভাই, ভালো মিষ্টির দোকান দেখে একটু দাঁড়াবেন তো, মিষ্টি কিনবো”! শেষ কথাটা রিকশওয়ালাকে বললাম।

রিকশওয়ালা প্যাডেল করতে করতে বলল, “সামনেই রাধাগোবিন্দ সুইটস পড়বে। ওতোরপাড়ায় ওরাই নাম করা মিষ্টি বানায়”।

“সেই ভালো, কিন্তু বাসি হবে না নিশ্চয়ই”

 

জেঠুর বাড়িতে ঘন্টাখানেক বসলাম। চা জলখাবার আর কিছু কথাবার্তার পর জেঠু বললেন, “চল তাহলে, ব্যাপারটা মিটিয়েই আসি। বাকি কথা দুপুরে খাওয়ার সময়ও সেরে ফেলা যাবে”।

বেরোনোর সময় জেঠিমাকে আরেকবার প্রণাম করলাম, আমার চিবুক ছুঁয়ে চুমো খেয়ে জ্যেঠিমা বললেন, “আমাদের ছেলেকে যে মেয়ে অপছন্দ করবে, তার কপালে অনেক দুঃখ আছে। তবে নবস্মিতাও খুব ভালো মেয়ে, বাবা আমি বলছি দেখিস, তোদের জুড়ি খুব মানাবে!” আমি লজ্জা লজ্জা মুখে হাসলাম।

 

বড়োরাস্তা পার হয়ে, গলিতে ঢুকে প্রথমবার বাঁদিকে, তারপর একটু এগিয়ে ডানদিকে ভাঁজ নিয়ে, বেশ খানিকটা গিয়ে জ্যেঠু একটা বাড়ির দরজায় বেল টিপলেন। দরজায় নেমপ্লেট সাঁটানো, অমিয় চট্টোপাধ্যায়প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বললেন, “আরে আসুন, আসুন বিধানদা। এসো বাবা, ভেতরে এসো। শুনছো, ওঁরা সব এসে গেছেন”। শেষের কথাটা উনি চেঁচিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে বললেন।  

আমরা তিনজন বাইরের ঘরের বড়ো সোফাটায় বসলাম। ভদ্রলোক বসলেন উল্টোদিকের সোফায়। অমায়িক হেসে জিগ্যেস করলেন, “আসতে কোন অসুবিধে হয়নি তো, বাবা?”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “জ্যেঠুর বাড়ি থেকে আপনাদের বাড়িতো হাঁটা পথে দশ মিনিট, জ্যেঠুর সঙ্গেই এলাম, অসুবিধে হবে কেন?”

“না, না তা নয়। আমি বলছিলাম কলকাতা থেকে আসার কথা। অনেকটাই তো দূর”।  এই সময়েই ট্রেনের সেই মহিলা আর ভালোছেলে ঢুকল। আমি অবাক হইনি, কিন্তু ওঁরা হলেন, আর আমার পাশে বসা অভ্রও। অভ্র সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল, “আপনি?”

কাকিমা বললেন, “তোমরা? এই অব্দি হানা দিয়েছ? বিধানদা ওরা আপনার সঙ্গে এসেছে?”

জেঠু অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ কথাই তো ছিল, ওরা তোমাদের সঙ্গে, নবস্মিতার সঙ্গে আলাপ করতে আসবে! তুমি চিনতে পারো নি?”

কাকিমা বললেন, “না। ইয়ে হ্যাঁ, চিনি মানে...কলকাতা থেকে সকালে আমরা একইসঙ্গে এলাম। কিন্তু ফটোতে তো অন্যরকম দেখতে ছিল।”

জেঠু হোহো করে হেসে উঠে বললেন, “ছবিতে ওর গালে দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছিল, এখন মরুভূমি। বাজের ওইরকমই আজে বাজে কাণ্ডকারখানা”।

“বাজে? এই ছোঁড়া আমাকে সারা রাস্তা বাজে কথা শুনিয়ে এসেছে, এখন আপনিও বাজে বলছেন?”

“আরে ওর নাম বজ্রপাণি, আমরা বাজে বলে ডাকি”। জেঠু বললেন।

আমিও চুপ করে থাকতে পারলাম না, বললাম, “নবস্মিতা যদি বাসি হতে পারে, তাহলে আমি বাজে হতে পারি না, কাকিমা?”

এই কথায় কাকিমা হইহই করে হেসে উঠলেন, সঙ্গে বাকি সবাই, আর তখনই বাসি চায়ের ট্রে আর বিস্কিট নিয়ে ঢুকল। সকলকে চা দিয়ে বাসি বসল উল্টোদিকে, বাবার সোফার হাতলে।

কাকিমা বললেন, “তুই কি ওকে ট্রেনে চিনতে পেরেছিলি, বাসি?” বাসি লাজুক মুখে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

“আমাকে বললি না, কেন?”

উত্তরটা আমিই দিলাম, “আপনি বলতে দিলে তো? আপনার চুকঃ-র ঠেলায় সুযোগ পেলো কখন”?

“ও বাবা, এখন থেকেই এত আণ্ডারস্ট্যান্ডিং?” কাকিমা মুচকি হাসলেন

অভ্র এবার মুখ খুলল, “তাই তোদের দুজনের মধ্যে এত চোখাচোখি...ইশারা...”?

আমি বললাম, “চুকঃ, হাটে হাঁড়ি ভাঙছিস! তোর আর বুদ্ধিশুদ্ধি হল না”এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এখন করলাম, চুকঃ কথাটা মন্দ না, বেশ পাওয়ারফুল এবং এফেক্টিভ!

আমি বাইরে থাকি, দুদিন হল বাড়ি এসেছিজেঠিমার ঘটকালিতে আমাদের বিয়েটা মোটামুটি পাকাকিন্তু আমার মা-জেঠিমার নির্দেশ, বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর নিজেদের মধ্যেও চাক্ষুষ পরিচয়টা জরুরি। আর সেই উদ্দেশেই আজ আমাদের উত্তরপাড়ায় আসা।

আমাদের ট্রেনযাত্রার সব কথা শুনে জেঠু হাসতে হাসতে বললেন, “আমদের বাজেটা আসার পথেই বাসি আর বাজে একটা ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছে দেখছি। মনে হচ্ছে এ একেবারে প্রজাপতির নির্বন্ধকী বল অমিয়?”

“এই বাজে ঘটনাটা যাতে কিছুতেই বাসি না হয়ে যায়, সেটা দেখা এখন আমাদের কর্তব্য। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, আমি কিন্তু আপনাকে আর কোনমতেই বিধানদা বলতে পারবো না...সে আপনি যাই মনে করুন”।

জ্যেঠু অবাক হয়ে বললেন, “সে কী? কেন?”

অমিয়বাবু গম্ভীরভাবে আমাদের এবং জ্যেঠুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, কোন উত্তর দিলেন না। একটু পরে আমাদের আশ্চর্য হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসতে হাসতে বললেন, “আপনাকে আর কোনমতেই রেহাই দেবো না, বিধানদা, আপনাকে এখন থেকে বেহাইদা বলব”!

জ্যেঠু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, “তাই বলো, আমি ভাবছি কী না কী!” তারপর তিনজনেই খুব হাসতে লাগলেন।       

আমি বাসির দিকে তাকালাম, ও আমার দিকেই তাকিয়েছিল, চোখাচোখি হতে লাজুক চোখ নামাল।  

 -০০-

এর পরের ছোটদের গল্প - " ছোট্ট হওয়া

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...