বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৭

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের ষষ্ঠ পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৬ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)


৪.৪.৩ গুপ্তবংশের অন্যান্য রাজা

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত (৪১৫–৪৫৫ সি.ই.)। তাঁর উপাধি ছিল মহেন্দ্রাদিত্য। কুমারগুপ্ত ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় রানি ধ্রুবদেবীর পুত্র। তিনি দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অতএব ধরে নেওয়া যায় তাঁর সময় বড়োসড়ো যুদ্ধ-বিগ্রহ তেমন কিছু ঘটেনি, যদিও তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই, মধ্য এশিয়ায় ঘনিয়ে উঠল গুপ্তসাম্রাজ্যের বিপদের মেঘ।

হুন নামে এক যাযাবর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়ার ব্যাকট্রিয়া অধিকার করে ফেলল। এই হুনদের দুটি গোষ্ঠীর কথা ইতিহাসে শোনা যায়, শ্বেতহুন এবং পীতহুন। শ্বেতহুনদের আক্রমণে রোম শহর এবং সাম্রাজ্যের পতন এবং ধ্বংস হয়েছিল। এই শ্বেতহুনদের নেতা বা রাজা ছিল অ্যাটিলা। অন্যদিকে পীতহুনরা ভয়ংকর বন্যার মতো এগিয়ে আসতে লাগল উত্তরপশ্চিম ভারতের গিরিপথে। এই হুনজাতি ছিল দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার এবং যোদ্ধা, তাদের নৃশংসতার কথা বিশ্বের ইতিহাস মনে রেখেছে।

কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত রাজা হলেন ৪৫৫ সি.ই.-তে এবং রাজা হয়েই তাঁকে হুনদের সম্মুখীন হতে হল। প্রথমদিকে স্কন্দগুপ্ত হুনদের আক্রমণ শক্ত হাতেই প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু হুনদের ঘনঘন এবং বারবার আক্রমণে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তাঁর রাজত্বের অধিকাংশ সময়ই কাটতে লাগল সীমান্ত অঞ্চলে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হুণদের সামলাতে। রাজধানীতে তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে, দুর্বল হতে লাগল গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বেড়ে উঠতে লাগল রাজধানী এবং রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ল, যার প্রমাণ পাওয়া যায় এই সময়ের তাঁদের মুদ্রার অবনতি দেখে। ৪৬৭ সি.ই. পর্যন্ত তিনি হুনদের ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু ওই সময় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন শুরু হল দ্রুতগতিতে। স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী গুপ্তরাজাদের কথা তেমন স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে হুনদের ভয়ংকর আক্রমণে গুপ্তরাজাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল এবং হুনরা ঢুকে পড়ল উত্তরভারতে। এর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই গুপ্তসাম্রাজ্য মুছে গিয়ে, দেশজুড়ে গড়ে উঠল ছোট ছোট রাজ্য।

প্রথম যে হুন রাজার নাম ভারতের ইতিহাসে পাওয়া যায় তাঁর নাম তোরমান, তাঁর রাজ্য ছিল পশ্চিমে পারস্য থেকে খোটান এবং তাঁর রাজধানী ছিল আফগানিস্তানের বামিয়ানে। এই তোরমান উত্তরভারতে এবং মধ্য ভারতের এরান (মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার প্রাচীন শহর) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তোরমানের পুত্র মিহিরকুলও (৫২০ সি.ই.) হুনদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। সমসাময়িক এক চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, মিহিরকুল ছিলেন অভদ্র এবং বদমেজাজী। তিনি মূর্তিপূজা বিরোধী এবং তীব্র বৌদ্ধ বিরোধী ছিলেন। তিনি অনেক বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কলহন তাঁর “রাজতরঙ্গিণী” গ্রন্থে লিখেছেন, লোভী ব্রাহ্মণরা নাকি হুনদের থেকে প্রচুর জমি দান হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।

যাই হোক, মধ্য ভারতের সমসাময়িক শিলালেখ থেকে জানা যায় পরবর্তী গুপ্ত রাজারা কিন্তু তখনও হুনদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে, আবার আক্রমণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আক্রমণে মিহিরকুল পরাস্ত হন এবং ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলের অধিকার ছেড়ে, কাশ্মীরের ছোট এক রাজ্যে স্থিতু হয়েছিলেন, এবং সেখানেই ৫৪২ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই হুনদের দাপট অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হুনদের নতুন নতুন গোষ্ঠী ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে একটানা অশান্তির সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। এই সময়েই হুণদের ব্যাকট্রিয়া থেকে উৎখাত করল তুর্কি এবং পারস্যের সাসানিয়ানরা। পরবর্তী কালে তুর্কিরা পারস্যও জয় করে নিল। এর ফলে উত্তরভারত হুনদের থেকে পরিত্রাণ পেল ঠিকই, কিন্তু আক্রমণের নতুন মেঘ আবার ঘনিয়ে উঠতে লাগল উত্তর-পশ্চিম আকাশে। এর কয়েকশ বছর পর থেকে ভারত টের পাবে, তুর্কিদের প্রবল আক্রমণের ক্রমাগত ধাক্কা। 

 

৪.৪.৪ গুপ্ত রাজাদের ধর্ম

গুপ্তবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম চন্দ্রগুপ্তর মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবী মূর্তির চিত্র মুদ্রিত ছিল। হতে পারে তিনি হয়তো লিচ্ছবি-রাণি কুমারদেবীর প্রভাবে সিংবাহিনীদেবীর ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। অতএব মাতৃকা দেবী হিসেবে “সিংহবাহিনী দেবী” ততদিনে পূজিত হচ্ছেন। সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে “পরমভাগবত” বলে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন “পরমভাগবত”। তবে গুপ্তরাজাদের কেউই পরধর্মে বিদ্বেষী ছিলেন না। শিলালিপিগুলি থেকে জানা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের দুই উচ্চপর্যায়ের আধিকারিক সাব-বীরসেনা শৈব ছিলেন এবং আম্রকারদাব ছিলেন বৌদ্ধ। রাজা কুমারগুপ্ত ছিলেন কার্তিকেয়র উপাসক। অনুমান করা যায় এই কারণেই তাঁর প্রিয় পুত্রেরও নাম রেখেছিলেন স্কন্দ, কার্তিকেয়র আরেকটি নাম। তাঁর রাজত্বকালে তিনি বেশ কিছু বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, সূর্য, শিব, বিষ্ণু এবং কার্তিকেয়র মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। অতএব তিনিও গুপ্ত পরম্পরা অনুযায়ী ধর্ম-সহিষ্ণু ছিলেন। অর্থাৎ সমসাময়িক সব কটি ধর্মীয় বিশ্বাসকেই তিনি যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট স্কন্দগুপ্ত বৈষ্ণব ছিলেন।

 

৪.৪.৫ গুপ্ত পরবর্তী পর্যায় ও হর্ষবর্ধন

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত উত্তর ভারতে চারটি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব ছিল। তাঁরা হলেন, মগধের গুপ্ত (অনেক ঐতিহাসিক এই গুপ্তদের গুপ্তবংশেরই উত্তরসূরি বলেন, অনেকে বলেন এঁরা আলাদা বংশ), কনৌজের মৌখরি, থানেশ্বরের পূষ্যভূতি এবং বল্লভির মৈত্রক। পূষ্যভূতি বংশের থানেশ্বর ছিল দিল্লির উত্তরে, এখনকার হরিয়ানা অঞ্চলে। মৌখরি বংশের সঙ্গে পূষ্যভূতিদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল এবং দুই বংশের বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। যার ফলে মৌখরি বংশের শেষ রাজার মৃত্যুর পর মৌখরিদের রাজ্য কনৌজ পূষ্যভূতিদের অধিকারে চলে এসেছিল। অন্যদিকে মৈত্রকরা ছিলেন সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের গুপ্তরাজাদের প্রশাসনিক প্রধান। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর তাঁরা স্বাধীন হয়ে ওই অঞ্চলেই নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল বল্লভিতে (আধুনিক ভাবনগর শহরের কাছাকাছি)। একসময় এই বল্লভি নগর বাণিজ্য এবং শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি রাজ্য ছাড়াও উড়িষ্যা, আসাম এবং আরো অনেক অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্যও গড়ে উঠেছিল। এই সব রাজ্যগুলির মধ্যে একমাত্র মৈত্রক বংশই দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরব উপজাতিদের আক্রমণের ফলে, বল্লভি রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছিল।

পূষ্যভূতি বংশের প্রথম শক্তিশালী রাজার নাম পাওয়া যায় প্রভাকরবর্ধন। বাণভট্টের হর্ষচরিতে, তাঁর বীরত্বের অতিরঞ্জিত বর্ণনা পাওয়া গেলেও, তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন, তাঁর ছেলে হর্ষবর্ধন। সাধারণতঃ তিনি হর্ষ নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত।

 

৪.৪.৬ সম্রাট হর্ষবর্ধন

হর্ষের রাজত্বকালের শুরু ৬০৬ সি.ই.-তে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কবি বাণভট্ট “হর্ষ-চরিত” নামে তাঁর জীবনী রচনা করেছিলেন। ভারতের ইতিহাসে কোন রাজার জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থই প্রথম। এর পরের রাজাদের মধ্যে এরকম জীবন-চরিত রচনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বললেও কম বলা হয়। কিন্তু তাদের তুলনায়, ঐতিহাসিক অতিরঞ্জন থাকলেও, কাব্য গুণে “হর্ষচরিত” সবার উপরে।

হর্ষ একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং এই পর্যায়ে তিনি অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য জয় করে নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে পেরেছিলেন। যেমন, জলন্ধর (পাঞ্জাব), কাশ্মীর, নেপাল এবং বল্লভি রাজ্যেরও কিছুটা। পূর্বদিকে বঙ্গের রাজা শশাঙ্ক তাঁর চিরশত্রু ছিল এবং দক্ষিণেও তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি। দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমে চালুক্যবংশীয় দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং এর পর দক্ষিণ জয়ের চেষ্টা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজধানী থানেশ্বর থেকে সরিয়ে কনৌজে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর কারণ হয়তো অনেকগুলি, প্রথমতঃ উত্তর-পশ্চিমের উপজাতিগোষ্ঠীগুলির বারবার আক্রমণ এড়ানো। দ্বিতীয়তঃ কনৌজ থানেশ্বরের তুলনায় কৃষি উৎপাদনে অনেক বেশি উর্বর। এবং হয়তো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল - কনৌজ থেকে তাঁর সাম্রাজ্যের চারদিকেই স্থলপথে এবং জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনেক প্রাচীন এবং উন্নত।

যুদ্ধ-বিগ্রহ না থাকলে হর্ষ তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় এবং কর আদায়ের ব্যাপারেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তিনি অনেকসময় সরাসরি সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের অভিযোগ মন দিয়ে শুনতেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতেন, কখনো কখনো তিনি দুঃস্থ প্রজাদের দানও করতেন। শোনা যায় পাঁচ বছর অন্তর তিনি একটি ধর্ম-উৎসবের আয়োজন করতেন, এবং সেখানে অজস্র দান করতেন। তাঁর রাজত্বকালে (৬৪৩ সি.ই.-তে) কনৌজ শহরে একটি বৌদ্ধ সম্মেলনের তিনিই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।  

এত ব্যস্ততার মধ্যেও শোনা যায় তিনি নাকি তিনটি নাটকের রচয়িতা। তার মধ্যে দুটি নাটক প্রথাগত মিলনান্ত নাটক এবং একটি বুদ্ধের তত্ত্ব নিয়ে চিন্তামূলক নাটক। যদিও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, তাঁরা বলেন এই নাটকগুলি হয়তো তাঁর লেখা নয়, তাঁর নামে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর কোন ভক্ত নাট্যকার। যাই হোক, এর থেকে এটুকু স্পষ্ট ধারণা করা যায়, তিনি সাহিত্য এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং উৎসাহীও ছিলেন।

হর্ষের রাজত্বের অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, বাণভট্ট রচিত “হর্ষচরিত” থেকে। হর্ষচরিতে বেশ কিছুটা কাব্যিক অতিরঞ্জন থাকলেও, সমসাময়িক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার হদিশ পাওয়া যায়। হর্ষচরিতের থেকেও সমসাময়িক ঘটনার নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত এক চৈনিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে। তিনি হলেন হুয়েনসাং বা জুয়ানজুয়াং। হুয়েনসাং অত্যন্ত পণ্ডিত এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে জানা যায়, তিনি চীনের এক মান্দারিন পরিবারের ছেলে এবং প্রথম জীবনে কনফুসিয়াসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন শুধুমাত্র তীর্থ ভ্রমণের জন্য নয়, বরং বৌদ্ধ শাস্ত্র পড়তে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করতে। তাঁর লিখিত বিবরণ, তাঁর পূর্ববর্তী চৈনিক সন্ন্যাসী ফাহিয়েনের মতো, একপেশে বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা নয়।

হর্ষের রাজত্বের শেষ দিকের ঘটনাগুলিও চৈনিক বিবরণ থেকেই জানা যায়। হর্ষের সমসাময়িক চীনের তাং সাম্রাজ্যের সম্রাট তাই সুং, হর্ষের রাজসভায় দুবার রাজদূত পাঠিয়েছিলেন - একবার ৬৪৩ সি.ই.তে আরেকবার ৬৪৭ সি.ই.তে। কিন্তু দ্বিতীয় রাজদূত কনৌজে এসে পৌঁছোনোর কিছুদিন আগেই হর্ষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় তাঁর সিংহাসন অধিকার করেছিলেন কোন এক অযোগ্য এবং অপদার্থ রাজা। হর্ষের গুণমুগ্ধ সেই চৈনিক রাজদূত এই অনাচার সহ্য করতে না পেরে, নেপাল এবং আসামে গিয়েছিলেন, সামরিক সাহায্য এবং সৈন্যসংগ্রহ করতে। নেপাল ও আসাম ছিল হর্ষের মিত্র রাজ্য। এই মিলিত শক্তি দিয়ে তিনি সেই অপদার্থ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে পেরেছিলেন এবং রাজাকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিলেন চীনে।

যাই হোক হর্ষের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এবং অষ্টম শতাব্দীতে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন রাজা ললিতাদিত্য।

 

৪.৪.৬.১ হর্ষের ধর্ম

শোনা যায় হর্ষের পিতা ও পূর্বপুরুষেরা সূর্যের উপাসক ছিলেন, কিন্তু হর্ষ ছিলেন পরম শৈব। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর ভগ্নী রাজ্যশ্রীর প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষার পর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সাম্রাজ্য জুড়ে অনেক বৌদ্ধ বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন।

৪.৪.৭ সামাজিক পরিবর্তন - সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা

এর আগে মৌর্য যুগের পর থেকে খ্রিষ্টিয় প্রথম দুই-তিন শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা করেছিলাম। ভারত ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ে যাবার আগে, ভারতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও একবার আলোচনা করে নেওয়া যাক। কারণ গুপ্ত যুগের শুরু থেকে হর্ষ-যুগের শেষ পর্যন্ত – প্রায় চারশ বছর মূল ভারত ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চলই সুশাসনে বেশ স্থিতাবস্থার মধ্যেই ছিল। তাছাড়া এই পর্যায়ে ইতিহাস রচনার উপাদানের এতই প্রাচুর্য যে তার থেকে সমসাময়িক ভারতের সামগ্রিক রূপটি বেশ সহজেই ধারণা করা যায়।  

 ৪.৪.৮.১ পোষাক আশাক ও ফ্যাসান

সেকালের পুরুষেরা নিম্নাঙ্গে পরতেন ধুতি এবং গায়ে উত্তরীয়। ধুতি পরার নানান ধরণ ছিল, উত্তর ভারতে ধুতির কাছা ছিল আবশ্যিক এবং দক্ষিণে কোমরে জড়িয়ে রাখার নিয়ম। দরিদ্র বা সাধারণ গ্রাম্য মানুষের সাদা ধুতি হাঁটু অব্দি লম্বা হত, ধনী, সম্পন্ন এবং রাজা-রাজড়াদের হত গোড়ালি পর্যন্ত। ধনী ব্যক্তিরা নানান রঙের ধুতি পরতেন, যেমন নন্দ রাজপুত্র শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই পীতাম্বর পরতেন। স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ মানুষের ধুতি সুতির হলেও, ধনীদের রেশম, মসলিন বা উত্তম সূতির বস্ত্রই পরিধেয় ছিল। পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস পরার প্রচলন ছিল না। শীতকালে পুরুষেরা গায়ে জড়াত পশমের বা মোটা সুতোর চাদর। তবে হিমালয়ের কাছাকাছি এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে, পশমের জ্যাকেট যার নাম ছিল “প্রাবার”-এর প্রচলন ছিল। পুরুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও সন্ন্যাসীরা মাথা মুড়িয়ে ফেলতেন, অবিশ্যি ব্রাহ্মণদের মাথার পিছনে একগুচ্ছ টিকি বা শিখা থাকত। তবে সাধারণ সম্পন্ন গৃহস্থ যুবকেরা তৈলাক্ত ও পরিপাটি লম্বা চুল রাখতেই পছন্দ করত। সম্পন্ন পুরুষদের মধ্যে সোনার অলংকার পরারও যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কানে কুণ্ডল, আঙুলে আংটি বা উর্ধবাহুতে অঙ্গদ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অলংকার সাধারণতঃ সোনা বা রূপোর এবং সঙ্গে থাকত নানান ধরণের দামি পাথর বা রত্ন।


যক্ষিণী মূর্তি, ১৪৫০ সি.ই. রাজস্থান 

    মেয়েদের প্রধান পোশাক ছিল শাড়ি। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী মোটা সুতি, দুকূল, রেশম বা মসলিনের শাড়ির প্রচলন ছিল সর্বাধিক। তবে পশ্চিম এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের সীমিত অঞ্চলে, মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের প্রভাবে মেয়েরা ঘাঘরা এবং চোলি ব্যবহার করত। শহরের উচ্চবিত্ত মহিলাদের মধ্যে অন্তর্বাসের প্রচলন ছিল।   নর্তকী এবং বারাঙ্গনারা দামি রেশম বা মসলিনের অর্ধস্বচ্ছ শাড়ি পরত এবং বক্ষে বাঁধত কঞ্চুক বা কাঁচুলি। সাধারণ জনসমাজে মহিলাদের অন্তর্বাস পরার কোন প্রচলন ছিল না। সাধ্য অনুযায়ী সুতি বা পশমের চাদরই ছিল মহিলাদের শীত নিবারণের উপায়।

মেয়েদের অলংকারের কোন সীমা ছিল না। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী অলংকারের বহুল প্রচলন ছিল।  মাথার খোঁপায়, সিঁথিতে, অথবা চুলের বেণীতে সোনা এবং রূপার বিচিত্র অলংকারের ব্যবহার ছিল। তেমনি ছিল, নাকে, কানে, আঙুলের আংটি, হাতের বালা, বাজুবন্ধ, বাহুবন্ধ, অজস্র ধরনের কণ্ঠহার, কোমরের অলংকার এবং নিতম্বসজ্জার অলংকার, তাছাড়া পায়েরও নানান অলংকার। তবে সাধারণতঃ পায়ের পাতা বা গোছে সোনার অলংকার ব্যবহার হত না, রূপো বা পেতলের নূপুর, মল, চুটকি ব্যবহার হত। অত্যন্ত মহার্ঘ এবং মর্যাদার ধাতু হিসেবে সোনার সম্মান ছিল রূপোর অনেক উপরে। সোনার অলংকারের সঙ্গে বহুল ব্যবহৃত হত নানা ধরনের দামি পাথর, মণি এবং মুক্তা। সোনার অলংকার ছাড়াও ফুলের মালা দিয়ে অঙ্গসজ্জার প্রচলন ছিল, ফুলের মালা জড়িয়ে রাখা হত, মাথার খোঁপায় বা মুক্ত বেণীতে।

মেয়েদের অঙ্গরাগ বা প্রসাধনের মধ্যে ছিল চন্দন, সিঁদুর, কাজল বা অঞ্জন, কুমকুম, গোরোচনা, পুষ্পরেণু। চন্দনের প্রলেপ সারা গায়েই মাখা হত, তার সুগন্ধের জন্যে এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শরীরকে শীতল রাখতে। সিঁদুর ও কুমকুমের টিপ কপালে পরা হত। পূর্বভারতীয় মেয়েদের মধ্যে কাঁচপোকা[1]-র টিপ পরারও বহুল প্রচলন ছিল।  চোখের পল্লবে এবং কোলে গভীর কাজলরেখায় অঙ্কিত কটাক্ষ-বাণ পুরুষ-হৃদয় ভেদ করার মোক্ষম উপায় ছিল। হলুদ গোরোচনা[2] কণিকার বিন্দু দিয়ে সাজিয়ে তোলা হত চিবুক এবং দুই গাল। ফুলের সৌরভময় পরাগ-রেণুতেও মহিলারা রাঙিয়ে তুলতেন চিবুক, গাল, ও গ্রীবা। হাত ও পায়ের আঙুলগুলি অলক্তক বা আলতার রঙে রাঙিয়ে তুলত মেয়েরা। এই আলতা ছিল এক ধরনের গাছের লালরস। ঠোঁট রাঙিয়ে তুলত তাম্বুল অর্থাৎ পান-খয়েরের রসে। নর্তকী এবং বারাঙ্গনা সুন্দরীরা দুধের সঙ্গে আলতা মিশিয়ে, গোলাপি আভায় সাজিয়ে তুলতেন তাঁদের পীন পয়োধর এবং গুরু নিতম্ব।

৪.৪.৮.২ খাদ্য ও পানীয়

প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বৈদিক যুগ পর্যন্ত মাংস খাওয়ার বহুল প্রচলন ছিল। এই মাংসের মধ্যে গৃহপালিত সকল পশু, এমনকি জঙ্গলের পশু, নানা ধরনের পাখি এবং মাছেরও প্রচলন ছিল। নিরামিষ আহারের প্রবণতা বেড়েছে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে এবং অবশ্যই সম্রাট অশোকের সময়ে। তিনি প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। যদিও “অর্থশাস্ত্র”-এ প্রাণীহত্যা এবং নগরের কসাইখানাগুলির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যে নিয়মিত নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। মহাযানীয় বৌদ্ধ ধর্ম এবং পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম প্রচলনের সময় থেকে নিরামিষ আহারের প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

প্রধান খাদ্যে আজকের ভারতীয় খাবারের থেকে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। ভাত এবং গম, যব কিংবা জোয়ারের রুটি, নানান ধরনের ডাল, সব্জিই প্রধান খাদ্য ছিল। তার সঙ্গে ছিল নানা ধরনের তেল এবং অবশ্যই ঘি, দুধ, দই, মাখন। ফল এবং মিষ্টান্নও ছিল বহুবিধ। যে যে মশলা প্রধানতঃ বিদেশে রপ্তানি হত, যেমন গোলমরিচ, তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জয়িত্রি, জায়ফল ছাড়াও হলুদ, ধনে, জিরে, সরষে, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। যদিও বৌদ্ধ মহাযানী এবং হিন্দু ধর্মের সময় পেঁয়াজ, রসুন ব্যবহারে কিছুটা লাগাম পড়েছিল।   

প্রাচীন এবং বৈদিক যুগে মদ্যপানের বহুল প্রচলন ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞের আয়োজনে সোমরস পানের রীতি আবশ্যিক ছিল এবং দেবরাজ ইন্দ্র যে মাত্রাতিরিক্ত সোম পান করতেন, সে কথাও জানা যাবে এই গ্রন্থের পঞ্চম ও শেষ পর্বে। বৌদ্ধধর্মে মদ্যপানকে পাপ বলা হয়েছে। তবে অর্থশাস্ত্র বিভিন্ন ধরনের মদ্যের বিবরণ দিয়ে বলেছেন, সরকারি পরিশ্রুতাগারেই মদ্য প্রস্তুত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার কারণ তিনটি – মদ্যের শুদ্ধতা রক্ষা, মদ্যপানের নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি রাজস্ব আদায়। এই মদ্যের মধ্যে ছিল চাল থেকে বানানো মদ্য “মেদক”, ময়দা থেকে বানানো, “প্রসন্না”, বেল থেকে বানানো “আসব”, গুড় থেকে বানানো “মৈরেয়” এবং আম থেকে বানানো “সহকারসুরা”। পূর্ব ভারতে মধু থেকে বানানো হত “মাধ্বী”, ঝোলাগুড় থেকে “গৌড়ী” এবং চাল থেকে বানানো হত “পৈষ্টি”। দক্ষিণ ভারতে তাল ও নারকেলের রস থেকে “তড্ডি” বা “তাড্ডি” (তাড়ি) মদ্য বানানো হত।

যাঁরা মনে করেন ব্র্যাণ্ডি, হুইস্কির মতো বিলিতি মদ্য ভারতে এনে ব্রিটিশরা আমাদের দেশকে উচ্ছন্ন পাঠানোর সুব্যবস্থা করেছিল - তাঁরা আংশিক সত্য। বহু ধরনের মদ্য-রসে ভারতবাসী বহু যুগ ধরেই সিক্ত ছিল - তফাৎটা হল প্যাকেজিং আর কোয়ালিটি কন্ট্রোলে। মাটির পোড়া হাঁড়ি থেকে শৌণ্ডিকের হাতে পরিবেশিত দেশী মদ্য (কান্ট্রি লিকার) - দাঁড়াতে পারল না কাঁচের দৃষ্টি-নন্দন বোতলে সাজানো বিলিতি মদ্যের (ফরেন লিকার) সামনে। অবশ্য স্বাদে-গন্ধেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। যদিচ আজকের নাগরিক সমাজের বাইরে বৃহত্তর দরিদ্র কিন্তু রসিক ভারতীয় সমাজ আজও প্রাচীন রসেই মজে থাকে।          

চলবে... 



[1] কাচপোকা  (Jewel bug)– Beetle  জাতীয় এক ধরনের পতঙ্গ, তার ডানার রঙ হত উজ্জ্বল সবুজ বা নীল। পতঙ্গের এই ডানাই টিপ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।  

[2] গোরোচনা - গরুর শুকনো পিত্ত – হলুদ রঙের কণিকা।

চিত্রঋণ - উইকিপিডিয়া  

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব "


২৭

 অনেকক্ষণ নির্বাক অপেক্ষার পর মহামন্ত্রী বিমোহন অস্ফুট স্বরে বললেন, “আমার ধারণা আমরা সকলেই এখন তাঁর আবাহনের জন্য প্রস্তুত। আমাদের মনে যেটুকু দ্বিধার কুয়াশা ছিল, সে সব কেটে গেছে! আপনি আমাদের এখন কী নির্দেশ করবেন, মহর্ষি?”

মন্ত্রীসভার বাকি মন্ত্রীমণ্ডলীও একবাক্যে বলে উঠল, “আমরা প্রস্তুত, মহর্ষি। আপনি আদেশ করুন আমাদের এখন কী কর্তব্য!”

মহর্ষি ভৃগু গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করলেন, “চারমাস নিদ্রার পর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জাগরণ হয় যে তিথিতে, সেই প্রবোধিনী একাদশী তিথিতে আমরা তাঁকে এবং মাতা লক্ষ্মীকে বরণ করবো। তার চারদিন পর, পুণ্য কার্তিকী পূর্ণিমায় হবে তাঁর রাজ্য অভিষেক। কার্তিকী পূর্ণিমার মতো শুভ তিথি, সম্বৎসরে স্বল্পই আছে, কিন্তু এই বর্ষে পূর্ণিমার চন্দ্রক্ষেত্রে রোহিণী নক্ষত্রের অবস্থানের জন্য, ওই তিথির মহিমা আরও শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীবিষ্ণু ভগবানেরও ওই দিনটিতেই প্রকট হবার বাসনা!”

মহামন্ত্রী বিমোহন জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার এই বিশ্বাসের কারণ কী, মহর্ষি?”

মহর্ষি ভৃগু অদ্ভূত এক আবেগ নিয়ে বললেন, “তাই যদি না হবে, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, এই সময়েই কেন একের পর তাঁর অবতরণের অনুকূল ঘটনা ঘটে চলেছে! রাজাবেণের অসুস্থ হওয়া! অজানা সেই তপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী, তাঁর প্রভাবে রাজ্যময় চারণদলের গান! মহারাণি সুনীথার রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি চাওয়া! আমার ধারণা... না, না ধারণা নয়, বিশ্বাস – তিনি এইভাবেই তাঁর আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন!”

মন্ত্রীমণ্ডলী সকলেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, করজোড়ে সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

তাঁদের উচ্ছ্বাস দেখে মহামন্ত্রী বিমোহন মনে মনে বিরক্ত হলেন, কিন্তু বিরক্তি গোপন করে বললেন, “তিনি স্বয়ং যখন আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আমাদের আর কী করণীয় আছে? তাঁর নির্দিষ্ট সময়েই তিনি নিজেই অবতীর্ণ হবেন”!

মহর্ষি ভৃগু কখনো বিরক্ত হন না, অথবা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করেন না। কিন্তু এখন তিনি স্পষ্টতঃই বিরক্তির স্বরে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, আপনার মুখে এ কথা শোভা পায় না!  আপনিও কি রাজা বেণের প্রভাবে অধর্মে বিশ্বাসী হলেন? আপনি বৃদ্ধ, আপনি প্রজ্ঞাবান্‌ - আপনি কি জানেন না, ঈশ্বরের অবতারকেও আবাহন করে আনতে হয়?  আর্তজনের আগ্রহেই তিনি ধরিত্রীতে অবতীর্ণ হন। ভক্তদের আন্তরিক ও একনিষ্ঠ আরাধনায় বিচলিত হয়েই তিনি এর আগেও  এসেছেন, - চরম বিপন্ন সাহায্যপ্রার্থী দেবতা এবং নরকুলকে রক্ষা করতে! মৎস্য, বরাহ, নৃসিংহ ও কূর্মরূপে এসেছেন, এর পরেও বারবার আসবেন! কিন্তু আমাদের তো তাঁর কাছে আকুল প্রার্থনা জানাতেই হবে!”

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে সন্দেহের দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁরা আবারও সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

মন্ত্রীমণ্ডলীতে সকলের মনোভাব এবং মহর্ষি ভৃগুর বিরক্তি উপলব্ধি করে, মহামন্ত্রী বিমোহন নিজেকে সমর্পণ করে বললেন, “হে মহর্ষি, বিজ্ঞজনেরা বলেন, যে কোন তত্ত্ব বিশ্বাস করার আগে, অন্তর থেকে সকল সংশয় দূর হওয়া উচিৎ! আমার কৌতূহলে যদি আপনার বিরক্তির উদ্রেক হয়ে থাকে, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। কিন্তু, এখন আমার মনে আর কোন দ্বিধা নেই, আপনি নির্দেশ করুন, এখন আমাদের কী করণীয়!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাণি সুনীথাকে অবিলম্বে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। মন্ত্রীমণ্ডলীর এই সিদ্ধান্তের কথা আমি আজই মহারাণিকে অবহিত করাব। মহারাণি এই প্রাসাদ-পরিসরের মধ্যে থাকলে, রাজ্যের সমস্যার কথা তাঁর কর্ণগোচর হতেই থাকবে। অতএব আমার প্রস্তাব, মহারাণি সুনীথা সপুত্র নবনির্মিত উদ্যান বাটিকায় গিয়ে অবস্থান করুন। তাঁদের নিরাপত্তা, যাবতীয় সুখসুবিধা এবং সুচিকিৎসার এতটুকু অবহেলাও, সেখানে যেন না হয়, সেদিকে আপনাদের দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করবো”।

মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “কিন্তু মহারাণি প্রাসাদ ছাড়তে সম্মত হবেন কি?”

জলদগম্ভীর স্বরে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সে দায়িত্ব আমার, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! উদ্যান বাটিকাকে মহারাণি ও রাজার বাসযোগ্য করে তুলতে আপনাদের কতদিন লাগবে, বৎস বৃষভান্‌?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “তিন থেকে চারদিনের মধ্যে সকল আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফেলতে পারবো, মহর্ষি”।

“অতি উত্তম। মহারাণি সুনীথা এবং অসুস্থ রাজা বেণকে বহন করার মতো অশ্বশকটের আয়োজন করতেও ভুলবেন না। আচ্ছা, ওখানে রাজবৈদ্য এবং সেবিকাদের বাসের উপযুক্ত কক্ষ রয়েছে তো?”

“কক্ষের কোন অভাব নেই, মহর্ষি, কোন আয়োজনেরই কোন ত্রুটি হবে না”।

“নিশ্চিন্ত হলাম, বৎস। এদিকে এই প্রাসাদে রাজ অভিষেকের আয়োজন শুরু করুন। বন্ধু এবং শত্রু নির্বিশেষে ভারতভূমির সকল রাজাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। এই নগরের সকল ব্রাহ্মণ, বণিক ও সম্ভ্রান্ত প্রজাদের আমন্ত্রণ করবেন। রাজা বেণের অভিষেক আয়োজনের থেকেও এই অনুষ্ঠানকে অনেক বেশি আড়ম্বরপূর্ণ করে তুলতে হবে, এ কথা সর্বদা মনে রাখবেন। অর্থীদের দানের জন্য পর্যাপ্ত সবৎসা গাভী, সুবর্ণমুদ্রা, শস্য সংগ্রহ শুরু করুন”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই মহর্ষি ভৃগুর নির্দেশে সম্মত হয়ে বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত হোন, মহর্ষি, মহারাজ পৃথুর অভিষেক আয়োজনে কোন ত্রুটি হবে না। কিন্তু প্রবোধিনী একাদশীর অনুষ্ঠান? ওইদিনই তো মহারাজ পৃথু ও তাঁর পত্নী মহারাণি অর্চ্চির আবির্ভাব হবে!”

“সে আয়োজনের সকল দায়িত্ব আমার! কতিপয় ঘনিষ্ঠ পুণ্যাত্মা ছাড়া ওই যজ্ঞ অনুষ্ঠানে কেউ উপস্থিত থাকবেন না। যেই যজ্ঞে কারা উপস্থিত থাকবেন সে আমি আপনাদের জানিয়ে দেবো। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আবির্ভাব হবে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর আড়ালে, সেখানে কোন অবহেলা যেন না হয়!”

“হবে না, মহর্ষি!”

“অতি উত্তম। আমি নিশ্চিন্ত হলাম”। একটু বিরতির পর, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভোজনের কোন আয়োজন নেই?”

“অবশ্যই থাকবে, মহর্ষি”!

মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে বললেন, “ওঃ। আমি অভিষেকের ভোজনের কথা বলছি না, বৎসগণ, আজকের কথা বলছি। মধ্যাহ্ন বহুক্ষণ অতিক্রান্ত, আপনারা কি ক্ষুধামান্দ্যে ভুগছেন? এখনো ভোজনের আয়োজন করছেন না!”

মহর্ষির কথায় প্রথমে সকলেই হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন, তারপর সকলেই হাসতে হাসতে বললেন, “এতক্ষণ আপনারই অনুমতির অপেক্ষা করছিলাম, মহর্ষি। সে আয়োজনও প্রস্তুত”! 


চলবে...







মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পরিবর্তিনি সংসারে...

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পাখির চোখ "

 

নন্টু আসছেন, নিভাননী সংবাদ পেয়েছিলেন। নন্টু অচ্যুতের ডাকনাম, মা নিভাননী ওই নামেই ডাকেন, ডাকে গাঁয়েঘরের লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাওনন্টুর আসার সংবাদে তিনি আদৌ খুশী হননি। বরং তীব্র রাগ হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলেই মাগ-ছেলে নিয়ে নন্টু কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেল!  সেখানে বড় নাতি হীরুকে কোন একটা স্কুলে যেন ভর্তিও করে দিয়েছে! কলকাতার স্কুলে ছেলেকে পড়িয়ে, নাকি ‘জজ ব্যারিষ্টর’ করে তুলবে! কেন পাড়াগাঁয়ে থেকে কেউ কী বড়ো মানুষ হয় না?  গাঁয়ের স্কুলেই পড়া শেষ করে, বর্ধমানের কলেজে পড়ে মনা হাজরা, গোপাল চাটুজ্জ্যে, বিশু সামন্তরা বড়ো মানুষ হয়নি? হাজরাদের মনা কলকাতা হাইকোর্টের দুঁদে উকিল। গোপাল চাটুজ্জে “ম্যাজিস্টর”, তার হুকুমে সবাই হুজুরে হাজির থাকে। বিশু সামন্ত বায়স্কোপ বানায়, দেশে-বিদেশে তার নাকি খুব “সুখ্যাৎ”এঁদো গাঁয়ের স্কুলের জন্যে ওদের কী কিছু আটকেছে? যার হবার তার হবেই, আর যার হবার নয়, তার কোথাও হবে না। কলকাতার স্কুলে পড়লেই বুঝি সবাই ডাক্তার-মোক্তার হয়?

 বিয়ের আগে নিভাননী কলকাতা না হলেও, কাশীপুরে অনেকদিন থেকেছেন বড়োদাদার বাসায়। তাঁর বড়োদাদা থানার ছোটবাবু ছিলেন। কলকাতার মতো ইল্লুতে জায়গা আর দুটো নেই। বড়োদাদার বাসার কাছেই একটা পাঁউরুটির কারখানা ছিল। সেখানে তিনি দেখেছেন, কারখানার লোকেরা পায়ে দলিয়ে পাঁউরুটির ময়দা মাখছে। সেই পাঁউরুটি নাকি কলকাতার বাবুরা মাখন মাখিয়ে খায়। ঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার – জাত ধম্মো আর কিছু বাকি আছে কলকাতায়? তাছাড়া বখাটে, বাউন্ডুলে, মাতাল, ঘর পালানে “মিন্‌সে” চারদিকে কিলবিল করছে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই বুক কাঁপে! বউ বগলে করে, সেই শহরেই গিয়ে বাসা বাঁধল নন্টু? এই বাড়ির বড়বৌ, ঘরের লক্ষ্মী - একটা অসৈরণ-সৈরণ নেই? বামুনের ঘরের বউ, সেজেগুজে নচ্ছার মাগীর মতো বাজার-হাট করবে? ট্রামে-বাসে ব্যাটাছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাওয়া আসা করবে? আজ থাকতেন নন্টুর বাবা, খড়মপেটা করে ছেলের এই বারটান আর বাউন্ডুলেপনা, শায়েস্তা করে দিতেন

নন্টুর বাবা যখন মারা গেলেন, নন্টু তখন কলকাতার কলেজে পড়ে। সে আজ বেশ কবছর হল। নিভাননীর ছোট ছেলে শান্টুর বয়েস তখন বছর পাঁচেকতার ওপরের দিদি চিত্রার বয়েস ষোলো। বাবার মৃত্যুর পর, নন্টু যোগ্য বড়ো ছেলের মতোই সংসারের হাল ধরেছিল। কলেজের পড়ায় পাশ দিয়েই, মেজঠাকুরপোর সুপারিশে  সরকারি চাকরিটাও সে পেয়ে গিয়েছিল। মেজ ঠাকুরপোও সেই দুর্দিনে নন্টুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সত্যিকারের অভিভাবকের মতো। নন্টু চাকরিটা পাওয়ার পরেই, সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে, বেশ ধুমধাম করেই ছোটবোনের বিয়ে দিয়েছিল।

চিত্রার বিয়ে মিটে যাওয়ার পর, নিভাননী  বলেছিলেন, এবার বিয়ে থা করে, তুইও সংসারী হ, নন্টু। তোর বিয়ে হয়ে গেলে, আমি ঝাড়া হাত পা হবো, বেরিয়ে পড়বো তীর্থ দর্শনে। সংসারের এই টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না, রে

সে কথায় নন্টু খুব উৎসাহ দেখিয়েছিল, বলেছিল,সেই ভালো, মা। শান্টুকে ভালো কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দিই দাঁড়াও, তারপর তোমাকে নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়বে তীর্থ যাত্রায়। বিয়ে থা করে আর কাজ নেই। সারা বছর ঘুরে বেড়াবো, সব ঠিকঠাক চলছে কিনা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো

বড়ছেলের ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলেছিলেন, নিভাননী, বলেছিলেন,তাই কী হয় নাকি? চাকরি বাকরি শিকেয় তুলে, তুই কোথায় যাবি, বাবা? আর মায়ের চোখের সামনে সোমত্ত ছেলে আইবুড়ো বসে থাকবে, এ আবার একটা কথা হল? আমি খোঁজখবর করছি। তোর একটা গতি না করে, আমি তীর্থে গিয়েও যে শান্তি পাবো না, বাবা!

না, না, মা, এই বেশ আছিতুমি আমাকে আর ওসবের মধ্যে জড়িও না। ছেলের এই আপত্তি যে কথার কথা সেটা বুঝতে ভুল করেননি নিভাননী। তিনি খোঁজখবর করেছেন। মেয়ে দেখতে, মেয়ের ঘরদোর বুঝতে, কথাবার্তা বলতে মেজঠাকুরপোকে পাঠিয়েছেন। নন্টু সবই শুনেছে, বুঝেছে, মেয়ে পছন্দ করে বিয়েও করেছে – কোন আপত্তি করেনি। তারপর দুটি ছেলেও হয়েছে। তিনি নিজেও সংসারে আর জড়াবেন না ভাবলেও, জড়িয়ে পড়েছেনতিনি বিধবা, ছোটছেলে শান্টুর লেখাপড়াও শেষ হয়নি এখনো নাবালক। তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত, তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। মেজছেলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে বহুদূরে। বছরে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে আসে। কোন খোঁজখবর নেয় না, সংসারের কোন দায়দৈবে মাথাও ঘামায় না। সেজছেলে একটা চাকরি নিয়ে কলকাতার মেসে থাকে। সেও কমাস আগেই বিয়ে করেছে। সেজবৌ বাড়িতেই থাকে

বড়ছেলে নন্টু ছাড়া তিনি আর কাউকেই তেমন ভরসা করতে পারেন না! কিন্তু পরের ঘরের মেয়ে যদি কান ভাঙানি দেয়, পর করে দেয় তাঁর নন্টুকে? প্রত্যক্ষ কোন কারণ না ঘটলেও, সেই আতঙ্কে তিনি তটস্থ থেকেছেন অহরহ। আজ সেটাই সত্যি হল, নন্টু পরই হয়ে গেল? মা-ভাইকে ভুলে বাসা নিয়ে ফেলল কলকাতায়! তাও তাঁর বিনা অনুমতিতে?

স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে সোনা, এ বাড়ির বৌ হয়ে এসে, অনটনের সংসারে মানিয়ে নিয়েছেন বিস্তর। তাঁর আচরণে কাজে কর্মে কোথাও তেমন কোন ত্রুটি ধরা পড়ে নি কোনদিন। কিন্তু এই অত্যধিক মেনে নেওয়াটাও যে মেনে নেওয়া যায় না! কোন প্রতিবাদ না করে, সব অভাব, সব অনটন যদি কেউ মুখ বুজে, হাসি মুখে সহ্য করে নেয়, সেটাই বা কেমনতর! এও তো একধরনের স্পর্ধাই। আমি কত ভালো, আমার বাপের ঘরের শিক্ষা কতো ভালো, এ যেন তার দেখনদারি!

পুত্রবধূর অস্পষ্ট অথচ অসহ্য এই গুমোর কল্পনা করে নিভাননীর গাত্রদাহ হয়পাড়া প্রতিবেশী যত তাঁর বড়োবউয়ের প্রশংসা করে, সোনা তত তাঁর চোখের বালি হতে থাকেন পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েবউদের সঙ্গে স্নান থেকে ফিরতে দেরি হলে বিরক্ত হন, মুখ ঝামটা দেন। ঘরের সব কাজ সেরে প্রতিবেশী-জ্ঞাতি মেয়েবউদের সঙ্গে বসে দুপুরে বিন্তি বা রঙ মেলান্তি খেললেও বিরক্ত হন। নন্টুর বাবা ছিলেন কট্টর শুদ্ধাচারী নীতিবাগীশ ব্রাহ্মণ। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর ব্রাহ্মণ্যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে এবং ভক্তিতে তটস্থ থাকত।

স্বামীর জীবদ্দশায় তিনি নিজেও সর্বদা আতঙ্কে থাকতেন, ঘরভরা ছেলেমেয়ের সংসারে সর্বদা সব বিধান কী আর মেনে চলা যায়? পান থেকে চূণ খসলেই স্বামীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হতেন এবং আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। অথচ বিধবা হয়ে, সেই তিনিই পালা-পার্বণ, তিথি-নক্ষত্র, বার-ব্রত, আমিষ-নিরামিষ, ছ্যুৎ-অছ্যুৎ, কাচা-আকাচা, আচার-বিচারের মোড়কে নিজেকে মুড়ে ফেলেছেন। একাদশীর দিন তিনি নির্জলা উপবাস করেন। সমস্ত বার-ব্রত-তিথি-নক্ষত্র পালনে তিনি স্বয়ং মনুর থেকেও নিষ্ঠুর এবং অমোঘ।

সেই সব তিথির পালনীতে সামান্য চ্যুতি হলে, তিনি পুত্রবধূকে ছেড়ে কথা বলেন না, “তুমি আর এসব জানবে কী করে মা, তোমরা বড়োমানুষের মেয়ে। তোমাদের বাড়িতে শুনেছি কত জাতের কত কাজের লোক। তোমাদের বাপের ঘরে অমন চলতে পারে, কিন্তু এখানে তো ওসব চলবে না, বৌমা। তোমার শ্বশুরঠাকুর ছিলেন এই দিগড়ের বিধান দাতা। তাঁর নির্দেশ ছাড়া এই গাঁয়ের লোকের একপাও চলার ক্ষমতা ছিল? বাপরে, কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে তুলতেন! কেউ কিছু অনাচার করে ফেললে, তার প্রায়শ্চিত্তের যা বিধান দিতেন, সে সব শুনলে তোমরা ভিরমি খাবে!”

প্রখর গ্রীষ্মে, একাদশীর নির্জলা উপবাসের দিন, মেঝেয় আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকা নির্জীব শ্বশ্রুমাতাকে, সোনা একবার এক গেলাস লেবুমিছরির সরবৎ খাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তাতে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “ছি, ছি, বৌমা, এ তুমি কী করলে? এ যে পাপ। বামুনের ঘরের বেধবাকে একাদশীর ব্রতভঙ্গ করাতে এলে? তোমার কি একবারও মনে হল না, এ অনাচার?”

“ভোর থেকে এত বেলা হল, এই প্রচণ্ড গরমে আপনি একবিন্দু জলও মুখে দিলেন না। আমরা এবার ভাত খেতে যাবো, আর আপনি এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, মা, তাই...”।

তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “রক্ষে করো, বৌমা, আমার জন্যে তোমার অত দরদে আর কাজ নেই! ওসব তুমি বুঝবে না, মা। উপোসে শরীর-মন শুদ্ধ হয়, কষ্ট হয় না, তোমার বড়লোক বাপ-মা এই শিক্ষাটুকুও দেননি, বাছা? যাও যাও, বেলা অনেক হল, খেয়ে নেবে যাও। আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও”।

সোনা, মাথা নীচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, গেলাসের সরবত উঠোনের মাটিতে ফেলে দিয়ে, নিজের ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কেঁদেছিলেন খুব। ছোট্ট হীরু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, জিগ্যেস করেছিল, “ও মা, কাঁদছো কেন? খেতে দেবে না? ও মা, চলো না খিদে পেয়েছে”। সেজজা এসে সোনাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, “ও দিদি, মন খারাপ করো না তো! কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে, চলো খেতে দাও”।   

 

 

অচ্যুত যখন বাড়িতে ঢুকলেন, নিভাননী খুঁটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দাওয়ায়। ছোট করে ছাঁটা সাদা-কালো কদমফুলি চুল। পরনে পাড়হীন সাদা থান, সাদা ব্লাউজ। সমস্ত শরীর পাথরের মতো কঠোর আবেগহীন।   

“কেমন আছো, মা?” নীচু হয়ে চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন অচ্যুত। নির্বিকার স্বরে নিভাননী উত্তর দিলেন, “যেমন তোমরা, রেখেছো, বাছা! আমাদের আর থাকা না থাকা, শেষের প্রহর গোনা বৈ আর কাজ কী?”

মায়ের অনুমতি ছাড়া পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া নিয়ে অচ্যুতের মনে অপরাধবোধ ছিলই, কুণ্ঠিত স্বরে বললেন, “ওভাবে বলছো কেন, মা? তড়িঘড়ি সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, তোমাকে জানাতে পারিনি। অন্যায় যে হয়েছে, সেটা কী আমি বুঝতে পারছি না, মা?”

ঠাকুরঘরের দিকে যেতে যেতে নিভাননী বললেন, “অন্যায় হবে কেন, বাবা? যা করেছো ঠিকই করেছ। সেই কোন ভোরে রওনা হয়েছো, হাতমুখ ধুয়ে এসো। একটু জিরিয়ে নাও। বৌমা, নন্টু এসেছে সরবৎ দাও, জল দাও”।

নিভাননী যদি দুটো কথা কটকট করে শুনিয়ে দিতেন, কিংবা অভিযোগ করে কান্নাকাটি করতেন, অচ্যুতের পক্ষে পরিস্থিতি সামলাতে সুবিধে হত। কিন্তু উদাসীনতার এমন নিরেট দেওয়াল তিনি তুলে দিলেন, তার মধ্যে প্রবেশের আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না। মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে, অচ্যুত দাওয়াতে হাতের ব্যাগটা রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, ছোটভাই শান্টু, তার হাতে কাচের গেলাসে শরবৎ। তার হাত থেকে গেলাস নিতে নিতে তিনি রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকালেন, দরজার আড়ালে সেজবৌমার শাড়ির প্রান্ত দেখতে পেলেন।

শরবৎ শেষ করে, শান্টুর মাথায় হাত রেখে অচ্যুত বললেন, “কেমন আছিস রে, শান্টু?”

একগাল লাজুক হেসে শান্টু অচ্যুতকে প্রণাম করে বলল, “ভালো আছি, বড়দা। তোমাদের বাসায় আমাকে নিয়ে যাবে না, দাদা?”

ছোটভাইয়ের কথায় অচ্যুত আবেগে আপ্লুত হলেন, “দেখ বোকা ছেলে কেমন প্রশ্ন করে! নিয়ে যাবো না, কেন? আমার বাসা তো তোদেরও বাসা। যাবি, থাকবি, ওখানে থেকেই লেখাপড়া করবিহীরু তোর কথা খুব বলে, তোর বৌদিও বলে, শান্টুটা কী করছে কে জানে!”

যে অপরাধবোধের জন্যে অচ্যুত মায়ের সামনে আড়ষ্ট হয়ে ছিলেন, ভাইয়ের আন্তরিক কথায় তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করলেন, গলা তুলে বললেন, “বৌমা, তোমাদের খবর সব ভালো তো মা? তোমার বড়দি তোমাদের কথা খুব বলে। তোমরা দুজনে সারাদিন একসঙ্গেই তো থাকতে; বলে, মালতী আমার আর জন্মের বোন ছিল”

“সঙের মতো দাঁড়িয়ে কী শুনছিস, শান্টু? দাদার হাত থেকে খালি গেলাসটা নে। কলকাতা যাওয়ার জন্যে তোর এত আদেখলামোই বা কেন রে? কলকাতা কী পালিয়ে যাচ্ছে? দাদা-বৌদি কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেছে, তোদের মতো অপোগণ্ড পোষবার জন্যে? বৌমা, দরজায় দাঁড়িয়ে আর আদিখ্যেতা করো না, বাছা। কত বেলা হল, সে খেয়াল আছে? নন্টু এতদিন পরে এল, শুধু ডালভাত বেড়ে দেবে নাকি”? ঠাকুরঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলা, নিভাননীর কর্কশ কথাগুলো, হাল্কা হওয়া পরিস্থিতিকে আবার বিষাক্ত করে তুলল। কথাগুলি বলে তিনি ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ করে জপে বসলেন। কম্বলের আসনে বসে, ইষ্টদেবতার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন বহুক্ষণ, পারলেন না। চোখ বন্ধ করলে, একটাই মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সুন্দর অথচ কুটিল সেই মুখটি তাঁর বড়পুত্রবধূর। জপের আসনে বসেও তিনি শান্ত হলেন না, বরং ক্রোধের নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তিনি তাকিয়ে রইলেন, রাধা-কৃষ্ণের স্মিত যুগলমুখের দিকে।


 

জলখাবার সেরে কাঁধে গামছা ফেলে অচ্যুত গ্রামে বেরিয়েছিলেন, পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করতে। উদ্দেশ্য সকলের সংবাদ নেওয়া এবং তাঁর কলকাতায় বাস নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া জানা। তিনি ভেবেছিলেন, গ্রামের সকলেই হয়তো ছি ছি করবে! কিন্তু যতটা ভেবেছিলেন, ততটা হয়নি।

দুয়েকজন বয়স্ক বললেন, “এ তোমার উচিৎ হল না, নন্টু। তুমি বাড়ির বড়ো ছেলে হয়ে, সব দায় ঝেড়ে ফেলে পরিবার নিয়ে একেবারে কলকাতায় বাসা করে ফেললে! বিধবা মা, নাবালক ভাইয়ের প্রতি যে কর্তব্য, তোমার মতো উপযুক্ত শিক্ষিত ছেলেরাও যদি এড়িয়ে যায়, তাহলে গাঁয়ে ঘরে আর রইল কী? এমন চললে কদিনেই, দেশ, সমাজ, এ সবই তো উচ্ছন্নে যাবে, হে! পরিবার মানে কী শুধুই মাগ-ভাতার আর ছেলেপুলে? বাপ-মা, ভাই-বোন, খুড়ো, খুড়ি তাঁরা কী পরিবারের কেউ নয়”?

কিন্তু অধিকাংশই সমর্থন করল, “বেশ করেছো। এই এঁদো গাঁয়ে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না। আমাদের উপায় নেই, তাই পড়ে পড়ে মার খাওয়া! একটা স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, বিজলি নেই। বর্ষায় পথে ঘাটে এক হাঁটু কাদা। এখানে মানুষ থাকে, পোকার মতো কিলবিল করা! একবার যখন বেরিয়ে পড়েছো, ভায়া, ভুলেও আর এমুখো হয়ো না!”

পুকুর থেকে একেবারে চান করে মাঝদুপুরে বাড়ি ফিরলেন অচ্যুত। ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে শুকোতে দিলেন, উঠোনের দড়িতে, তারপর দোতলার ঘরে গিয়ে শুলেন নিজের বিছানায়। মাথার নিচে হাত রেখে চিত হয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন নানান কথা। আশৈশব তিনি যে মাকে দেখেছেন, চিনেছেন, সেই মা এখন যেন অচেনা। বাবার অত্যধিক নিয়মনিষ্ঠায় তাঁরা সকলেই অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন। বিশেষ করে তাঁর এই মা, ধর্মপালনের নামে বাবার কত যে অদ্ভূত বায়না, তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, তার সাক্ষী আর কেউ না থাক, তিনি তো আছেন! রান্নাঘরে গোপনে চোখের জল ফেলা মাকে, তখন সান্ত্বনা দেবার কে ছিল আর, নন্টু ছাড়া?

অথচ বাবার মৃত্যুর পর বাবার ছেড়ে যাওয়া খড়মেই যেন মা পা রাখলেন। কলেজে পড়ার থেকেই তিনি বাইরে বাইরে থাকতেন, অতটা বুঝতে পারেননি। বিয়ের পর স্ত্রীর মুখে অজস্র অভিযোগের কথা শুনে আশ্চর্য হতেন খুব, বিরক্তও হতেন। একজন মানুষ যে যন্ত্রণায় সারা জীবন জ্বলেছেন, সেই যন্ত্রণা তিনি কী ভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে পারেন? কিন্তু আজ প্রায় মাস চারেক অদেখার পর, মায়ের সকালের আচরণে তিনি নিশ্চিত হলেন, এই মানুষটি তাঁর সেই শৈশবের-বাল্যের স্নেহময়ী মা নন। তিনি এখন নীতি ও ধর্ম আচরণের নিষ্ঠুর প্রতিষ্ঠান, জেদী এবং অহংকারী। এ সময় হঠাৎ তাঁর আর একটা কথা মনে এল, তিনি কী এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যেতেই কলকাতায় বাসা করলেন? ছেলেদের লেখাপড়াটা একটা বাড়তি অজুহাত!

বন্ধুবান্ধব ও কিছু প্রতিবেশী তাঁকে সমর্থন করে এই যে কথাগুলো বলল, সেটা কী তাদের শুভেচ্ছা? নাকি ঈর্ষা? নাকি তাঁর এই পালিয়ে যাওয়ার প্রতি বিদ্রূপ? মনের অবচেতনে তিনিও কী মুক্তিই খুঁজছিলেন? দীর্ঘদিন কলকাতাবাসী হওয়ার দৌলতে তিনি কী শহরের পরিবেশ, শহরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন? আসলে তিনিও কী এই বদ্ধ গ্রামজীবনকে এড়িয়ে সহজ স্বস্তির জীবনে উত্তরণ চাইছেন? তাঁর এই পলায়নপর মনোভাব কী ধরা পড়ে গেল, মায়ের কাছে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে?

“বড়দা, খাবে চলো। নিচেয় খাবার বেড়েছে”। শান্টুর কথায় অচ্যুতের চিন্তা থমকে গেল। মেঝেয় পা দিয়ে অচ্যুত ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন, “তুইও খাসনি তো”? লাজুক হেসে শান্টু ঘাড় নাড়ল। না। “চ, একসঙ্গে খাবো”।

খাবার সময় মা সামনে বসে থাকলে বেশ লাগে। এই বয়সেও তিনি যেন বাল্যের দিনে ফিরে যান। এতক্ষণে মা নিশ্চয়ই শান্ত হয়েছেন, আগের মতোই হয়তো স্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন। নিচেয় এসে শান্টু তাঁকে সেজভাইয়ের ঘরে নিয়ে যেতে, তিনি বেশ অবাক হলেন। দেখলেন ঘরের মেঝেয় দুটি আসন পাতা, আসনের সামনে ঢাকা দেওয়া কাঁসার গেলাসে জল। এতদিন তিনি এবং তাঁর ভাইয়েরা একত্র হলে, মায়ের ঘরেই খাবার ব্যবস্থা হয়, আজ তার ব্যত্যয় কেন?

শান্টুকে তিনি জিগ্যেস করলেন, “মা কোথায়?”

শান্টু উত্তর দিল, “মা ছোটকাকীমার সঙ্গে দেখা করতে গেছে”। অচ্যুতের বাবারা তিনভাই, মেজকাকা থাকেন হাওড়ায়, ছোটকাকা-কাকীমা খুড়তুতো ভাইবোনেরা থাকেন, পাশের বাড়ীতে। বাড়ি আলাদা হলেও দুই পরিবারে হৃদ্যতার অভাব নেই।

অচ্যুত খুব বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমি তো একটু আগেই ওবাড়ি ঘুরে, দেখা করে এলাম!” এইসময় অচ্যুতের খুড়তুতো বোন বিশাখা ভাতের থালা সাজিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পিছনে আরেকটা থালা নিয়ে এক গলা ঘোমটা দিয়ে আড়ালে রইলেন সেজবৌমা।

অচ্যুতের আসনের সামনে থালা রেখে বিশাখা বললেন, “বড়দা, শুরু করো। অনেক বেলা হয়ে গেল”

সমস্ত ব্যাপারটাতে অচ্যুতর মন বিরূপ হয়ে উঠল। মায়ের এই আচরণ তাঁর অত্যন্ত বাড়াবাড়ি মনে হল। তাঁর মনে অপরাধবোধের যে কাঁটা এতদিন খচখচ করছিল, সেটা যেন সরে গেল। তিনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। বিশাখা শান্টুর ভাতের থালাও আসনের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর, অচ্যুত গেলাসের জল নিয়ে গণ্ডূষ করে বললেন, “তোদেরও তো খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। তুই কী এখানেই খাবি? নাকি আবার ও বাড়ি যাবি?”

“না গো। আজ সেজবৌদির সঙ্গে খাবো”।

“মা হঠাৎ এই ভরদুপুরে তোদের বাড়ি গেলেন কেন?”

বিশাখা হাসলেন, “বড়মা, ওইরকম হয়ে গেছেন আজকাল। কোন কিছুই ওঁর পছন্দ হয় না। সবার সঙ্গেই খিটিমিটি করেন।  মায়ের সঙ্গে ওঁর রোজ ঝামেলা হয়। গতকাল পর্যন্ত মুখ দেখাদেখি ছিল না। আজ তুমি এলে, আর আজই উনি মায়ের সঙ্গে গল্প করতে গেলেন! বড়দা, সেজবৌদি জিগ্যেস করছে, পান্নার আঙুলটা সেরেছে কিনা?”

অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়াতে অচ্যুত কিছুটা স্বস্তি পেলেন। হেসে বললেন, “হ্যাঁ বৌমা, ওর মামার বাড়িতে মাসীরা সবাই মিলে সারিয়ে দিয়েছে। এখন ভালই আছে”।

বিশাখা বললেন, “বৌদির বাবাও তো হঠাৎ মারা গেলেন, শুনেছি। এরপরেও একা একা কলকাতার বাসায় নতুন সংসার  সামলানো- বৌদির কিন্তু খুব মনের জোর, না বড়দা? বৌদির বোনেদের কেউ সঙ্গে গেল না কেন? মাস কয়েক থেকে একটু গুছিয়ে দিয়ে আসত!”

“কথা সেরকমই ছিল। কিন্তু শ্বশুরমশাই মারা যাওয়াতে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল”।

“তা ঠিক। বাপ-মা মানে বটগাছ, মাথার ওপর থেকে তাঁদের ছায়া চলে যাওয়া কী চাট্টিখানি কথা? হীরু আমাদের কথা বলে, বড়দা? নাকি ভুলে গেছে?”

“দ্যাখো, ভুলে যাবে কেন? হীরু এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, স্কুলে যাচ্ছে। তার আগে দুপুরবেলা হলেই মন খারাপ করত। সারা দুপুর নাকি ওবাড়িতে তোদের সঙ্গে দৌরাত্ম্য করত!”

“দৌরাত্ম্য কী বলছো, বড়দা? ছেলেমানুষ চঞ্চল হবে না? মাঝে মাঝে বড়োমা হীরুকে আটকে রাখতেন, আমাদের বাড়ি যেতে দিতেন না, আমি এসে তুলে নিয়ে যেতাম। বড়োমা আমাকে কিছু বলতেন না, জানেন তো বিশাখাও কম মুখরা নয়”।

অচ্যুত বোনের একথায় খুব হাসলেন হা হা করে, বললেন, “বাবা। সেই বিশাখা, এত্তোটুকুন মেয়ে, তুই এখন এত পাকা হয়েছিস? আমার মায়ের সঙ্গেও ঝগড়া করিস?”

মুখ টিপে হেসে বিশাখা বললেন, “করবো না? আরেকটু ভাত দিই, বড়দা?”

“না রে, একটুও না। যা দিয়েছিস, এই পুরোটা খেতে পারলে হয়”।

মুচকি হেসে বিশাখা বলল, “তোমার খাওয়া অনেক কমে গেছে, বড়দাসেজবৌদি বলছে”

“না গো বৌমা, শুরুতেই অনেক ভাত দিয়ে ফেলেছো যে!” হাসতে হাসতে বললেন অচ্যুত। 

 

 

খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরের বিছানায় একটু গড়িয়ে নিয়েই অচ্যুত আবার পাড়ায় বেরিয়ে পড়েছিলেন।  ফিরলেন সন্ধের বেশ কিছুটা পরে। বাড়ি এসে হাতপা ধুয়ে দাওয়ায় বসতেই, ছোটভাই শান্টু এসে জিগ্যেস করল, “বড়দা, চা খাবে? সেজবৌদি জিগ্যেস করতে বলল”।

“নাঃ রে। আমি তো চা খাই না। মা কোথায় রে?”

“ঠাকুর ঘরে, আহ্নিক করছে”।

“ও আচ্ছা”। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এখনও সন্ধ্যা আহ্নিক!

শান্টুকে বললেন, “ভেতর থেকে একটা মাদুর নিয়ে আয় তো, দাওয়ায় বসি, আর তোর বই খাতাও নিয়ে আয়, কেমন লেখাপড়া করছিস দেখি?” শান্টু দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর থেকে একটা মাদুর এনে বিছিয়ে দিল দাওয়ায়। অচ্যুত দাওয়ায় উঠে বসলেন। শান্টু দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে হ্যারিকেনটাও এনে দাওয়াতে রাখল। হ্যারিকেনের পলতে নামানো ছিল, সেটাকে বাড়িয়ে দিতে আলোটা বাড়ল কিছুটা।  তারপর আবার ঘরের ভেতরে গেল বই-খাতা আনতে।

অচ্যুত বললেন, “আরে, অন্ধকার ঘরের মধ্যে কোথায় হাঁটকাবি, হ্যারিকেনটা নিয়ে যা”।

“তুমি অন্ধকারে থাকবে, বড়দা?”

“কেন? আমি অন্ধকারে বসলে, আমায় ভূতে ধরবে বুঝি? যাঃ যাঃ মেলা পাকামি করিস না, আমি তোর বড়দা, না তুই আমার? আলোটা নিয়ে অংক, ইংরিজি আর সংস্কৃত বইটা নিয়ে আয়, দেখি কেমন পড়েছিস”? শান্টু হ্যারিকেন নিয়ে ঘরের ভেতরে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যে বইগুলো সঙ্গে নিয়ে, দাদার সামনে এসে বসল

অচ্যুত হ্যারিকেনের পলতেটা একটু কমিয়ে দিলেন, পলতের আগুন ব্যাঁকা হয়ে জ্বলছিল, বললেন, “পলতেটা ঠিক করে কাটা হয়নি রে, ব্যাঁকা হয়ে গেছে। এভাবে জ্বললে কাচের একদিকে কালি পরে ভূতুষি হয়ে যাবে একটু পরেই। অনেক সময় কাচ ফেটেও যায়। শব্দরূপ ধাতুরূপ মুখস্থ করিস? লতা শব্দের পঞ্চমীর দ্বিবচনে কী হয়?” শান্টু খুব অস্বস্তিতে পড়লতার মেজকাকা আর বড়দার লেখাপড়া নিয়ে গাঁয়ে এখনো চর্চা হয়, সংস্কৃতে আর ইংরিজিতে দুজনেরই এখনও খুব নাম আছে এ অঞ্চলে। সেই বড়দা অনেকদিন পর হঠাৎ এসে পড়া ধরতে বসলে ভয় পাওয়ারই কথা।

শান্টু শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলল, “ল--লতাভ্যাম্‌”

“বাঃ ভেরি গুড। তোৎলাচ্ছিস কেন? ঠিকই তো বলেছিস। শ্রী শব্দের সপ্তমীর বহুবচন?”

“স্‌-স্‌ শ্রীণাম্‌”।

“এঃ পারলি না? শ্রীণাম ষষ্ঠীর বহুবচন। সপ্তমীর বহুবচনে শ্রীষু। “পুষ্পিতৌ লতে” কথাটা ঠিক না ভুল?”

“ভুল”।

“ঠিকটা কী হবে?”

অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে পায়ের নখ খোঁটার পর শান্টু বলল, “পুষ্পিতৌ লতৌ”।

অচ্যুত জিভে আক্ষেপের চিক শব্দ করলেন, বললেন, “এখানে বিশেষ্য কোনটা আর বিশেষণ কোনটা?”

শান্টু খুব ভয়ে ভয়ে বলল, “লতা বিশেষ্য আর পুষ্পিতা বিশেষণ”।

“তাহলে? বিশেষ্যর যে লিঙ্গ, বিভক্তি এবং বচন হবে, বিশেষণেরও তাই হবে। লতা স্ত্রীলিঙ্গ, তার প্রথমার দ্বিবচনে লতে। তার বিশেষণ পুষ্পিতারও তাই হবে। কী হবে তাহলে?”

“পুষ্পিতে লতে”।

“গুড। বুঝতে পেরেছিস? সংস্কৃত অনেকটা অংকের মতো, নিয়মটা একবার বুঝতে পারলে আর কোনদিন ভুল হবে না...”।

নিজের পড়া হোক কিংবা অন্যকে পড়ানো – দুটো ব্যাপারেই অচ্যুতের ভীষণ ঝোঁক। লেখাপড়ার চর্চায় অবগাহন করতে তিনি বড়ো আনন্দ পান। ছোট ভাইকে পড়াতে পড়াতে তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন, নিভাননী কখন এসে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়েছেন তিনি লক্ষ্যও করেননি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিভাননী বললেন, “নন্টু, সেই কোন ভোর কলকাতার বাসা থেকে বেরিয়ে এতদূর পাড়াগাঁয়ে এলি! কোথায় একটু বিশ্রাম করবি তা না, এখন আবার শান্টুকে নিয়ে পড়লি?” লেখাপড়ার রাজ্যে অচ্যুত ডুবে ছিলেন, কলকাতায় বাসা নিয়ে তাঁর চলে যাওয়া আর সেই নিয়ে তাঁর মায়ের বিদ্বিষ্ট আচরণের কথা তিনি ভুলেই গেছিলেন।

মায়ের হঠাৎ এই উদ্বিগ্ন কথার শ্লেষ তিনি ধরতে পারলেন না, তিনি বললেন, “না, না, মা, আমার কিচ্‌ছু কষ্ট নেই! শান্টু লেখাপড়ায় খুব অবহেলা করছে!”

“এতদিন পরে একবেলা পড়িয়ে তুমি ভাইকে কী দিগ্‌গজ পণ্ডিত বানিয়ে তুলবে, বাবা? শান্টু, বইপত্তর নিয়ে ঘরে যা, নিজে নিজে যা পারিস পড়। দাদাকে বিরক্ত করিস না”।

নিভাননীর এই কথায় অচ্যুত আবার বাস্তবে ফিরলেন। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন। শান্টু ম্লানমুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিল, চোখাচোখি হতে মুখ নামাল। সামনে খুলে রাখা ব্যাকরণ কৌমুদী বন্ধ করে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে সব বই তুলে নিয়ে চলে গেল ঘরের ভিতর। অচ্যুতর মনে ভীষণ এক বিরোধ বিদ্রোহের মতো ঝলসে উঠল। ইচ্ছা হল মায়ের এই নিষ্ঠুর আচরণের জবাব দেওয়ার। শান্টু ঘরে চলে যাবার পর, নিভাননী পিছন ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।

অচ্যুত পিছন থেকে একটু উদ্ধত স্বরে বললেন, “মা, কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাবো। তোমার বৌমার একটা ট্রাংক আছে, সেটাও নিয়ে যাবো। তাছাড়া আমাদের যা টুকটাক জিনিষ পত্র রয়ে গেছে, সেসবই আমি কাল নিয়ে যাচ্ছি”

নিভাননী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বড়ো ছেলের মুখের দিকে, চোখে চোখ রেখে বললেন, “যেও”। তারপর  ধীর পায়ে উঠে গেলেন পাশের ঘরে দাওয়ায়।

অচ্যুত মাথা নীচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ, হ্যারিকেনের কল ঘুরিয়ে পলতে কমিয়ে দিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললেন,

“পরিবর্তিনি সংসারে মৃতঃ কো বা ন জায়তে।

স জাতো যেন জাতেন যাতি বংশঃ সমুন্নতিম্‌”।।

পরিবর্তনের এই সংসারে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম কার না হয় ?

কিন্তু যে জন্মে বংশের সম্যক উন্নতি হয় সেই জন্মই (সার্থক)

..০০..

চলবে...




নতুন পোস্টগুলি

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২

     ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - "  হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প)   " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - "  পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক র...