এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব "
৩১
যজ্ঞস্থলে বেণপুত্র পৃথুর রাজ্যাভিষেক ও বিবাহের অনুষ্ঠান
সুসম্পন্ন হল। অনুষ্ঠানের শেষে তাঁরা যুগলে রাজপুরোহিত এবং আশ্রমের আচার্যদের
প্রণাম করলেন; মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলের সঙ্গে পরিচিত হলেন, আন্তরিক সম্ভাষণ করলেন।
তারপর প্রকাশ্য রাজসভায় মহারাজ পৃথুর বন্দনাগীত শুরু করলেন রাজভট্ট। বন্দনা শেষ হতেই তিনি ঘোষণা করলেন, মহারাজা পৃথুর আগমন বার্তা, “ত্রিলোকের পিতা ভগবান ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভূব মনু হইতে প্রাচীন কালে যে পূত রাজবংশের উদ্গম হইয়াছিল - সেই মহান্ স্বায়ম্ভূব এবং তৎপত্নী রত্নগর্ভা শতরূপার দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ ভগবান বাসুদেবের অংশে ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন - মহারাজা উত্তানপাদ ও তাঁর পুণ্যব্রতা পত্নী সুনীতির মহাপুণ্যবান বালক পুত্র ধ্রুব, কঠোর তপস্যায় ভগবান বিষ্ণুর সাক্ষাৎলাভ করিয়া, স্বয়ং ভগবান শ্রীহরির আশীর্বাদ ও অনুগ্রহ লাভ করতঃ সসাগরা ধরিত্রীকে স্বীয় সন্তানের ন্যায় সুদীর্ঘকাল প্রতিপালন করিয়া অক্ষয় বৈকুণ্ঠলাভ করিয়াছিলেন – এই অনুপমবংশললাম ছিলেন মহারাজ অঙ্গ - তাঁহার তুল্য ধর্মপরায়ণ, প্রজারঞ্জক নৃপতি ভূভারতে কদাপি দৃষ্টিগোচর হয় নাই – প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। আজ কার্তিক মাসের পুণ্য পূর্ণিমা তিথিতে প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিদেব, শ্রীশ্রীব্রহ্মা, শ্রীশ্রীবিষ্ণু, ভগবান ভব, দেবরাজ শ্রীইন্দ্রাদি সকল দেবতাদের সম্যক উপস্থিতিতে কীর্তিমান শ্রীপৃথুর রাজ্যাভিষেক যজ্ঞ সুসম্পন্ন হইল। ঐ যজ্ঞানুষ্ঠানেই মহারাজ শ্রীপৃথু ও শ্রীমতী অর্চ্চি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই রাজ্যেই বৈকুণ্ঠলোকের প্রতিষ্ঠা করিলেন। স্বায়ম্ভূবকূলতিলক দেবোপম দম্পতি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃমাতৃতুল্য মহারাজা ও মহারাণীকে রাজসভায় পদার্পণ করতঃ আমাদিগকে কৃতার্থ করিবার নিবেদন করিতেছি...”।
সভার বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা একসঙ্গে বারবার জয়ধ্বনি করে
উঠল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”!
রাজভট্টের ঘোষণা
ও আবাহন সমাপ্ত হতেই, প্রশস্ত সুসজ্জিত দ্বারপথে প্রথমেই প্রবেশ করল সুশৃঙ্খল
নিরাপত্তাবাহিনী। নিরাপত্তারক্ষীরা পূর্ব নির্দিষ্ট স্ব স্ব স্থানে স্থিত হওয়ার পর
দ্বারপথে দেখা দিলেন রাজপুরোহিত। বামহস্তে সরস্বতীর পূতবারি পূর্ণ তাম্রঘট,
দক্ষিণহস্তে পঞ্চপত্রমঞ্জরী দিয়ে ঘটের মন্ত্রঃপূত বারি সিঞ্চন করতে করতে তিনি সভাস্থলে
প্রবেশ করলেন। তাঁর অনুবর্তী হলেন
রাজদম্পতি, তাঁদের অনুবর্তী হলেন মহামন্ত্রী বিমোহন, সকল মন্ত্রীমণ্ডলী এবং
সর্বশেষে আশ্রমের পঞ্চ আচার্য এবং দুই আশ্রমকন্যা।
রাজ সিংহাসনে উপবেশন করলেন, মহারাজা পৃথু, তাঁর বাম দিকে
বসলেন, মহারাণি অর্চ্চি।
সিংহাসনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন মহামন্ত্রী বিমোহন এবং রাজপুরোহিত। সিংহাসনের
পিছনে দাঁড়ালেন, মন্ত্রীমণ্ডলী ও আশ্রমের আচার্যগণ ও দুই আশ্রমকন্যা। সকলের
অবস্থান স্থিত হলে, রাজভট্ট সভামধ্যে উপস্থিত বৈদেশিক রাজন্যবর্গ, রাষ্ট্রদূত ও
মন্ত্রীদের গুরুত্ব ও প্রভাব অনুযায়ী একে একে পরিচয় ঘোষণা করতে লাগলেন। এই পদ্ধতি
অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর কিন্তু বিদেশনীতির বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ!
সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজদম্পতি করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা অনুধাবণ করছিলেন। প্রত্যেক
পরিচয়ের সমাপ্তিতে, সভাসদবৃন্দ “সাধু, সাধু” ধ্বনিতে স্বাগত জানাচ্ছিলেন
রাজদম্পতিকে এবং ক্রমে ক্রমে অধৈর্য হতে থাকা জনতা অধিকতর উৎসাহে গর্জন করে উঠছিল,
“জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারারাণি অর্চ্চির জয়”!
জনতার সম্মিলিত জয়ধ্বনি, ভয়ংকর মেঘগর্জনের মতো কাঁপিয়ে
তুলছিল সেই সভাগৃহ। বারবার জলদগম্ভীর জয়ধ্বনিতে কল্যাণী, যিনি বর্তমানে মহারাণি অর্চ্চি,
অসহায় হরিণীর মতো কেঁপে উঠছিলেন। মহারাণি অর্চ্চি কনুইয়ের চাপে মহারাজ পৃথুর
দৃষ্টি আকর্ষণ করে অস্ফুটস্বরে বললেন, “আর্যপুত্র, আমার ভয় করছে”।
মহারাজা পৃথু প্রশ্রয়ের হাসি চোখে নিয়ে, প্রিয়তমা রাণিকে
অস্ফুটে বললেন, “ভয় কী, আমি তো আছি!” মহারাজ পৃথুর চোখে চোখ রেখে মহারাণি অর্চ্চি অত্যন্ত
আশ্চর্য হয়ে গেলেন, তিনি স্বামীর দুই চোখে দেখতে পেলেন অদ্ভূত এক শক্তি – এ দৃষ্টি
কদাপি অর্চনের নয়, এ দৃষ্টি মহারাজা পৃথুর!
কারণ বিগত সন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে নির্জন সাক্ষাতেও অর্চন
কল্যাণীর দুটি হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল, “এ আমি কিছুতেই পারবো না, কল্যাণী,
পারবো না। আমার চোখে এখনো ভাসছে আমাদের গ্রাম, মাঠ-ঘাট, দীঘির নিবিড় পার, নদীর নিরালা
স্রোত। আমাদের হৃদয়ে রয়েছে পিতামাতার স্নেহময়শাসন, ভ্রাতা ও ভগিনীদের কপটকলহমাখা শ্রদ্ধা
- সেই সব কিছু ছেড়ে রাজা সাজতে আমি পারবো
না। আমি আজ রাত্রেই মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্য সুনীতিকুমারকে বলব, আমার অক্ষমতার কথা,
বলব, গুরুদেব, আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে মুক্তি দিন! আমাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন,
আমাদের সেই গ্রামে, আমাদের পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায়”!
সে সময় কুমারী কল্যাণীই সান্ত্বনা দিয়েছিল অর্চনকে,
বলেছিল, “তা আর হয় না, অর্চন। মহর্ষি এবং আচার্যদের এই পরিস্থিতিতে ফেলে তুমি পালিয়ে
যাবে? আবেগের বশে এখন হয়তো তুমি একথা বলছো, কিন্তু তুমি চলে গেলে, আচার্যগণ যে
অসহ্য অপমানিত হবেন, সে কথা তোমার যখনই মনে পড়বে তুমি অনুশোচনায় দগ্ধ হবে -
সারাজীবন, অহরহ। আমার মুখের দিকে তাকাও অর্চন, আমি বিশ্বাস করি, তুমি পারবে।
মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্যগণও বিশ্বাস করেন তুমিই পারবে! হে প্রিয়, তুমি নিজেকে
বিশ্বাস করো, শান্ত হও, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করো নিজেকে”!
মহারাজ পৃথু করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা শুনতে
শুনতেও অনুভব করলেন, কল্যাণী অবাক নয়নে তাকিয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে। কল্যাণীর এই
বিস্ময়ের কারণ তিনি জানেন। গতকাল সন্ধ্যাতেও অর্চন নামের সেই তরুণ দ্বিধাগ্রস্ত
ছিল, তার পিছনে ফেলে আসা জীবনের সারল্যে ফিরে যাবে, নাকি আলিঙ্গন করে নেবে রাজকীয়
জীবনের এই জটিল আবর্তকে? কিন্তু আজ প্রভাতে অভিষেকের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে,
তাঁকে ঘিরে ঘটতে থাকা সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান, তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য
নিয়োজিত অজস্র মানুষের শ্রদ্ধা, তাঁকে ধীরে ধীরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তুলছে। এই
সভাস্থলে উপস্থিত ভিন্নদেশের রাজন্যবর্গ, মহামান্য অতিথিবৃন্দ, এঁদের মধ্যে বেশ
কয়েকজন এই রাজ্যের বিপক্ষীয়, তাঁরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন নবীন রাজার ব্যক্তিত্ব
বিচার করতে। আচার্য সুনীতিকুমার এই বোধ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, দীর্ঘ
কয়েকমাসে। আজ সিংহাসনে উপবেশনের পর তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী - বিপক্ষীয়দের সামনে তাঁকে শিষ্ট অথচ বলিষ্ঠ এক
নৃপতির ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতেই হবে।
উপরন্তু সভাগৃহের বাইরে, উপস্থিত ওই যে জনতা, যাঁদের
নির্দিষ্ট কাউকেই তিনি চেনেন না। একদিন তিনি নিজেও ওদের মধ্যেই জনৈক ছিলেন, অথচ ভাগ্যক্রমে
আজ তিনি রাজা! এখনও পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কোন কীর্তিই নেই, তবুও ওই জনতা
সম্পূর্ণ আস্থায় তাঁর জয়ধ্বনি দিয়ে চলেছে বারংবার। প্রতিবার জয়ধ্বনির গর্জনে তাঁর
মনে হচ্ছে তিনি আর সাধারণ অর্চন নন, তিনিই মহারাজ পৃথু, এই বিশ্বাস – তাঁর প্রতি
ন্যস্ত এই দায়িত্বের প্রতিদান তাঁকে করতেই হবে! চারণকবিদের গানে যে মহারাজ পৃথুর
কীর্তির কথা পল্লবিত হয়ে চলেছে এতদিন, তিনিই সেই মহারাজ পৃথু, তাঁকে অতিক্রম করতেই
হবে ওইসকল কীর্তির চূড়া!
কিছুক্ষণ আগেও এই মহারাজ পৃথুকে অর্চন নিজেই চিনতেন না,
চিনছেন প্রতি পলে, অতএব আজকে তাঁকে দেখে কল্যাণী, প্রিয়তমা মহারাণি অর্চ্চি যে
বিস্মিত হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?
পরিচয় ও সৌজন্য পর্ব শেষ হল, রাজভট্ট সমাপ্তি ঘোষণায় বললেন, “উপস্থিত সম্মানীয় রাজন্যবর্গ এবং সম্মানীয় অতিথিবর্গ এই অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের নব রাজদম্পতির পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ এই অনুষ্ঠান এখানেই সমাপ্ত হোক। আপনারা নিজ নিজ স্কন্ধাবারে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সন্ধ্যার পর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে থাকবে নৃত্য ও গীতের অনুষ্ঠান। সেখানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের রাজদম্পতি আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আপনারা আশীর্বাদ করুন আমাদের রাজদম্পতিকে – তাঁদের জয় হোক, শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক তাঁদের নতুন জীবন – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের সকল রাজ্যবাসীর”।
করজোড়ে রাজা পৃথু ও রাণি অর্চ্চি সকলকে বিদায় অভিবাদন করলেন, তারপর উপস্থিত সকলের সঙ্গে ধীরপায়ে সভাস্থলের বাইরে এলেন। দ্বারের সম্মুখে অপেক্ষারত সুসজ্জিত অশ্বশকটে তাঁরা উঠে বসলেন। অশ্বশকট মৃদু গতিতে রাজপ্রাসাদের দিকে চলতে শুরু করল। নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে অপেক্ষারত সহস্র জনগণ আবার গর্জন করে উঠল, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাজা পৃথু বামহাতে রাণি অর্চ্চির ডানহাতটি চেপে ধরলেন, হাস্যমুখে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন জনগণের উদ্দেশে। দুপাশের হর্ম্যরাজির অলিন্দ থেকে বর্ষিত হতে লাগল পুষ্পরাশি।
পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - শেষ পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন