২
জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্কুল শুরু। এরমধ্যে অচ্যুত একদিন গিয়ে
স্কুলের নিয়ম কানুন, ফর্ম ফিল-আপ, টাকা-পয়সা জমা দেওয়া সব করে এসেছেন। তার সঙ্গে
ক্লাসের রুটিন, বুকলিস্ট, কেমন জামাপ্যান্ট পরতে হবে সব জেনে এসেছেন, পাছে কোন কথা
ভুলে যান তাই লিখেও এনেছেন। সেদিন পান্নাও স্কুলে গিয়েছিল বাবার সঙ্গে। তার বয়সি আরো কিছু ছেলে
ছিল সেখানে। তাদেরও সঙ্গে ছিল বাবা, কিংবা বাবা-মা দুজনেই। নিজের নিজের ছেলেদের
সঙ্গে বাবা-মায়েরা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁরা খুশি খুশি মুখে বললেন, “তোরা সব একই
ক্লাশে পড়বি। বন্ধু হবি, এখন থেকেই পরিচয় করে নে”! কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তো বন্ধুত্ব
হয় না। অচেনা সমবয়সীদের সামনেও কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগে, বাধো বাধো ঠেকে!
বাবা যতক্ষণ স্কুলের কাজকর্ম সারছিলেন, পান্না স্কুলের সিমেন্ট বাঁধানো
উঠোনে ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। এই আমার স্কুল! বিরাট চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে, সে
অবাক হয়ে গেল। এই স্কুল আমার! উঠোনের দু ধারে বেশ কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ সার দিয়ে
দাঁড়িয়ে। তাদের পাতায় ভরা মাথাগুলো স্কুলের চারতলা বাড়ির প্রায় সমান। উঠোনের
ওপারে, বিশাল মোটা মোটা থামওয়ালা উঁচু ছাদের বাড়ি। অবাক হয়ে পান্না সেই বাড়ির দিকে
তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাদের স্কুলের একতলায় এখন খুব ব্যস্ততা। কিন্তু বিশাল এই
বাড়িটা একদম নির্জন। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে সিমেন্টের বিরাট চাতাল, চাতালের পরে
বিরাট দরজা। সে দরজা কত্তো উঁচু – হাতিও যেন ঢুকে যাবে সেই দরজা দিয়ে। পান্না
সিঁড়ি দিয়ে উঠে চাতালে পা দিল, তারপর ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল!
ভীষণ কৌতূহল - কী আছে ভেতরে?
“উঁহুহুঁহুঁ...ওপটে যিবে না, ওপটে যিবে না”। পান্না পেছন ফিরে দেখল,
একজন লোক তাকেই বলছে কথাটা। তার গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি আর পরনে ফুলপ্যান্ট। কিন্তু
পেটের কাছে গেঞ্জিটা খুব ফুলে আছে, বেশ বড়োসড়ো ভুঁড়ির জন্যে। পান্না লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে
কোন রাগ বা বিরক্তি দেখতে পেল না, কিন্তু ভেতরের দিকেও আর গেল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে
এল স্কুলের উঠোনে। নিচেয় নেমে আসতে লোকটা তার কাঁধে হাত রাখল, বলল, “কী নাম তোমার?
আজ ভর্তি হচ্ছ স্কুলে?” পান্না ঘাড় নাড়ল। কিন্তু নিজের নাম বলতে বেশ বেগ পেল।
অপরিচিত লোক তার নাম জিগ্যেস করলেই, তার এমন হয়। কথা আটকে যায়। লোকটা ধৈর্য ধরে
শুনল, তারপর হেসে বলল, “মোরঅ নাম দুর্যোধন অছি। দুর্যোধনদা কহিবা, কেমন? মু তম
সবকু দেখিবি, আউ। আউ দুষ্টুমি করিলে কঁড়
হব দেখিবা ...।” কথা শেষ করল না, কিন্তু চোখ বড় বড় করে হাসল, বলল, “সঙ্গরে কউ
অছন্তি, বাপঅ, না মা?”
“ব্-বাবা” দুর্যোধনদা তার হাত ধরে বলল, “চলো তোমাকে স্কুলটা দেখাই”।
৩
পান্নার স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত মর্নিং সেশন। অতএব তাকে এখন রোজ সকালবেলা বাবার হাত ধরে,
স্কুলে যেতে হয়। তার পরনে স্কুলের ড্রেস, সাদা হাফ-প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পায়ে
নটিবয় শু। জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন স্কুল
শুরু হল, তখন গায়ে ছিল শীতের সোয়েটার, তার রং বট্ল্ গ্রিন। আর হাতে স্টিলের
চারচৌকো স্যুটকেশ। তার মধ্যে স্কুলের রুটিন অনুযায়ী ভরে নেয় বই খাতা, পেন্সিল
বক্স, রবার, পেন্সিল ছোলার কল, একফুট লম্বা কাঠের স্কেল।
শ্রী গোপাল মল্লিকের গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তা মির্জাপুর স্ট্রিটের
ওপারে আছে বিহারি দেবলালকাকুর মনিহারি দোকান। বাবা স্কুল যাবার পথে, সে দোকান থেকে
রোজ কিনে দেন, চারটে বিস্কুট আর রাংতায় মোড়া দুটো লজেঞ্চুস বা চকোলেট, কোনদিন বাপুজি
কেক। দেবলালকাকু কাগজের ঠোঙায়
টিফিন ভরতে ভরতে মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন, “এতেই হয়ে যায়, খোখাবাবা? ভুখ লাগে না?”
স্টিলের বাক্সের মধ্যে ঠোঙাটা নিতে নিতে পান্নার রোজই মনে হয়, স্কুলের টিফিন হতে এখনও
অনেক দেরি, তিনটে পিরিয়ড শেষ হলে তারপর। তার তো এখনই খিদে পাচ্ছে, বিস্কুট আর
লজেঞ্চুসের খিদে!
কিন্তু সে উপায় তো নেই, বাড়ি থেকে সেদ্ধ চিঁড়ে, চিনি আর লেবু মেখে খেয়ে
এসেছে। কারণ সে বড্ডো পেটরোগা, কালমেঘ দেওয়া “কুমারেশ” সিরাপ কিংবা থানকুনি পাতার
রস এখন তার নিত্য সেব্য। তার সঙ্গে ওই চিঁড়ে! অতএব এখনই বিস্কুটে কামড় দিলে, বাবার
হাতে তার কানটা আর আস্ত থাকবে না।
বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রিট ধরে এগিয়ে, মহাবোধি সোসাইটির উল্টোদিকের গেট
দিয়ে ঢুকে, কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে, স্কুলের রাস্তাটা বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে
যেত। সোজা গিয়ে ইউনিভার্সিটি ইন্স্টিটিউটের কাছে মোড় নিয়ে, বাঁদিকে সোজা গেলেও
কফি হাউসের উল্টোদিকের গেট দিয়ে স্কুলে যাওয়া যায়, কিন্তু সে পথটা কিছুটা ঘুরপথ।
তাছাড়া সকাল-সকাল কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে বিস্তর মজা পাওয়া যায়। কত
মোটা-সোটা মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন হাঁস-ফাঁস করতে করতে। বেঞ্চে বসে বৃদ্ধরা
গল্প করছেন। সাঁতারের ক্লাবের বাগানের ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে সাজি ভরে তুলছেন দু
একজন বয়স্কা মহিলা। বড়রা ঝুপুস ঝুপুস ঝাঁপ মারছেন গোলদীঘির জলে, জলছিটিয়ে সাঁতার
কাটছে অনেকে। সে সব সাঁতারের নানান স্টাইল – চিৎসাঁতার, বাটারফ্লাই, ফ্রিহ্যান্ড -
পান্না এসব নাম অবিশ্যি শিখেছে অনেক পরে। কিন্তু তার স্কুল যাওয়ার পথে – এমন দৃশ্য
দেখে অবাক হয়ে যায় পান্না। কোন কোন দিন স্কুল পৌঁছতে দেরি হবার আশঙ্কায়, বাবা
ধমকান, “কী দেখছিস কি হাঁ করে, স্কুলের ঘন্টা পড়ে গেলে আর ঢুকতে দেবে না যে!
তাড়াতাড়ি পা চালা”!
প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়েছিল। একতলাতেই বাবার হাত ছেড়ে দিতে হল,
প্রভাকরদা হাত ধরল। বলল, চল তোমাকে ক্লাশে পৌঁছে দিই। বাবা নিচেয় দাঁড়িয়ে রইলেন, পান্না
চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে বার বার দেখছিল বাবার দিকে, তার বুকের
মধ্যে এখন জমে উঠছে ভয় আর কেমন এক কান্না-কান্না অনুভূতি। বাবা স্মিতমুখে হাত
নাড়লেন বার দুয়েক। শক্ত হাতে পান্নার হাত ধরে প্রভাকরদা বলতে বলতে চলল, “ভয় পাচ্ছো
কেন? কেলাসে গিয়ে দেখবে তোমার বয়সি কত্তো বন্ধু ... লেখাপড়া করে বাবার মতো হতে হবে
না...”? সিঁড়ির ল্যাণ্ডিংয়ে উঠে দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠতে বাবাকে আর দেখতে পেল না
পান্না, দোতলার দীর্ঘ করিডরে উঠে, ডানদিকের প্রথম ঘরটাতেই ক্লাস ওয়ানের ঘর, পান্নাকে
দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল প্রভাকরদা। ক্লাসের ছেলেরা নিজের নিজের ডেস্কের সামনে
দাঁড়িয়ে আছে। বেঁটেখাটো সুদর্শন মাস্টারমশাইও দাঁড়িয়ে দুই চোখ বন্ধ করে, জোড়হাতে
গান করছেন, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্যসুন্দর”। প্রভাকরদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায়
পান্নাকে চুপ করে দাঁড়াতে বলল। এ গানটা পান্নার বেশ পছন্দের গান, বহুবার তার মাকে এই গান
গাইতে শুনেছে। কিন্তু আজ স্কুলের প্রথম দিনে,
শীতের সুন্দর এই সকালে, তারই সমবয়সি একঘর ছেলেদের সঙ্গে তন্ময় মাষ্টারমশাইয়ের
গাওয়া সমবেত গান, পান্না মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। তার খুবই পরিচিত গানটিই আজ যেন নতুন
মহিমা নিয়ে পান্নার জীবনকে উদ্ভাসিত করে তুলল।
একটু পরেই গান শেষ হলে, প্রভাকরদা পান্নাকে মাস্টারমশাইয়ের হাতে সমর্পণ
করে চলে গেল, আর পান্না নিজের অজান্তেই তার সমস্ত শৈশব সমর্পণ করে দিল, এই স্কুলের
মাতৃক্রোড়ে। পান্নাকে তার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আর ডেস্ক দেখিয়ে দিলেন, মাস্টারমশাই।
প্রথম দিন স্কুলে এসেই, নিজের অধিকারে একটি ডেস্কের অর্ধেক আর বসার বেঞ্চের অর্ধেক
পেয়ে, পান্না আনন্দ ও উত্তেজনায়, খুব কষ্ট করে বলল, “গুডমর্নিং, স্যার”। মাস্টারমশাই সস্নেহে তার
মাথায় হাত রাখলেন, মৃদু হেসে বললেন, “বসো”।
প্রথম কটাদিন কেটে গেল স্কুল এবং তার নিয়ম কানুন বুঝতে। মাস্টারমশাই
এবং দিদিমণিদের চিনতে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারি ভালো, পড়া না পারলে বা হোমটাস্ক
করে না আনলে বকা দেন, কিন্তু সে বকার মধ্যে কোন ভয় লাগে না। বরং তাঁরা যখন মাথায়
হাত রেখে জিগ্যেস করেন, “কেন পড়িসনি রে?”, অথবা “হোমটাস্ক করতে ভালো লাগে না?” তখন
পান্নার বেশ লজ্জাই লাগে। আর যাঁরা খুব বকাবকি করেন, চেঁচামেচি করে বলেন, “তোদের
বাবা-মায়েরা কেমন রে? ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত, তার লেখাপড়ার কোন
খোঁজখবর রাখে না?” তাঁদের অনেকেই কষ কষ করে কান মলে দেন, ক্লাসের বাইরে কানধরে
নিল-ডাউন করিয়ে রাখেন, দুই আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল রেখে চিপে ধরেন পান্নাদের ছোট্ট
ছোট্ট আঙুল। একজন বয়স্ক মাস্টারমশাই আবার জুলপির চুল ধরে, এমন টেনে দেন, ব্যথায়
ঝনঝন করে ওঠে মাথা!
প্রথমদিন এবং প্রত্যেকদিন যে মাস্টারমশাই “আনন্দলোকে...” প্রার্থনা
গেয়ে ক্লাস শুরু করেন, তাঁর নাম পান্না জেনেছে, পূর্ণেন্দুবাবু। পূর্ণেন্দুবাবু
পান্নার খুব প্রিয় মাস্টারমশাই, শান্ত-ধীর-স্থির মানুষটি যেমন সুন্দর পড়ান, তেমন
ভালোবাসেন প্রত্যেক ছেলেকে। হোমওয়ার্ক হোক বা ক্লাসের খাতা, সুন্দর নির্ভুল উত্তর
লিখলে তিনি “ভেরি গুড” লিখে দেন খাতার পাতায়। তাছাড়াও খাতা বিচার করে, তিনি “গুড”,
“ফেয়ার”, “ব্যাড”ও লিখে দিতেন। পান্না আপ্রাণ চেষ্টা করত রোজ, “ভেরি গুড” বা “গুড”
অর্জন করতে, যেদিন বড়সড় ভুলচুক করে “ব্যাড” জুটত, সেদিন তার মনটাই খারাপ হয়ে থাকত
সারাটা দিন। ছেলেদের খাতায় “ব্যাড” লিখতে পূর্ণেন্দুবাবুও যে খুব কষ্ট পেতেন, সেটা
বোঝা যেতে তাঁর মুখের দিকে তাকালে আর তাঁর চোখের চাউনিতে।
যে দুজন দিদিমণি পান্নার খুব প্রিয়, তাঁরা হলেন, কনকদিদি আর
ইন্দিরাদিদি। ইন্দিরাদিদি তাও মাঝে মধ্যে একটু রেগে যেতেন, কিন্তু সে ছেলেরা যখন
দুষ্টুমি করত তখন। পড়ানোর সময় কাটাকুটি খেললে, কিংবা তাঁর পড়ানোর সময় পাশের বন্ধুর
সঙ্গে নিচু গলায় গল্প করলে, কিংবা পাশের বন্ধুকে ঢিসুম করে ঘুঁষি মারলে,
ইন্দিরাদিদি খুব রেগে যেতেন। বলতেন, “সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক, হনুমান”। আর কনকদিদি ছিলেন পরম মমতাময়ী, পড়ানোর ফাঁকে
ফাঁকে সুন্দর গল্প করতেন, কাউকে কক্খনো উঁচু গলায় ধমকাতেন না, কিন্তু তাঁর ক্লাশে
সব্বাই চুপ করে পড়া শুনত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত তাঁর মুখের দিকে। তিনি কখনো নিজের
চেয়ার-টেবিলে বসতেন না, পড়ানোর সময় সারাক্ষণ পায়চারি করতেন, ঘরের এধার থেকে ওধার।
৪
স্কুল কী শুধু লেখাপড়া শেখায়? নানারকম খেলাধুলো, ড্রিল-পিটি শেখায়। ছবি আঁকতে শেখায়। গান গাইতেও শেখায়। ক্লাস-টু থেকে নাচ-গানের ক্লাশ ছিল সপ্তাহে দুদিন। সে দুটো দিন বড়ো মজার। মীনাদিদি গান শেখাতেন, শেখাতে চেষ্টা করতেন নাচের নানান অঙ্গভঙ্গি। ক্লাশের সব ছেলে মিলে ধুপধাপ শব্দে “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে...”, “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে...” অথবা “আজি ধানের ক্ষেতে...” গান গাইতে গাইতে যখন নাচের প্রচেষ্টায় হাত-পা নাড়ত, সে এক আশ্চর্য অনুভব। বসে বসে গান না গেয়ে নাচের চেষ্টা করতে করতে গানগাওয়ার মধ্যে সে বিস্তর ফারাক টের পেত। মজা লাগত বেশ। ওই নাচ-গানের ক্লাশ থেকে, মীনাদিদি গান গাওয়ার জন্যে দুজনকে বেছে নিলেন, একজন পিনাকী আর অন্যজন পান্না। পিনাকী বড়ো ভালো গাইত, আর পান্নার কাজ ছিল পিনাকীর গলায় গলা মেলানো। ওইভাবেই ক্লাস টু থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, প্রাইমারি সেশনের, যে কোন অনুষ্ঠানে – বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী বা পুজোর ছুটির আগে শারদোৎসবে - পিনাকী আর পান্নার দু-চারটে যৌথগান অবধারিত ছিল।
পনেরই আগষ্টের দিন স্কুলে ফ্ল্যাগ তোলা হত, পতাকার নিচেয় দাঁড়িয়ে
হেডস্যার ওজস্বিনী ভাষায় দেশভক্তি, স্বাধীনতা আর ছাত্রদের কর্তব্য নিয়ে সেদিন
বক্তৃতা দিতেন। সেদিন সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হত, বন্দে মাতরম আর জোড়হাতে
একসঙ্গে গাইতে হত “জনগণমন অধিনায়ক...” জাতীয় সঙ্গীত। তারপরেই হুটোপুটি করে লাইনে
দাঁড়াতে হত পুঁটিরামের সিঙাড়া আর দরবেশের বাদামী প্যাকেট সংগ্রহের জন্যে।
এর কিছুদিন আগেই কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার কাছে পাহাড়ের মতো জমে উঠত ইয়া মোটা মোটা শালের খুঁটি আর অজস্র বাঁশ। স্কুলে যাওয়ার পথে বাবা, আর ফেরার পথে মাকে জিগ্যেস করে জেনেছিল ওগুলো দিয়ে মা দুগ্গার প্যাণ্ডেল হবে। শালের খুঁটি আর বাঁশের ধাঁচা বানিয়ে তার ওপর ত্রিপল আর রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি হবে ওই প্যান্ডেল। তার মানে পুজো আসতে আর দেরি নেই? মা বলতেন, “এই তো আর মাস দেড়েক পরেই পুজো, এসেই তো গেল, দেখতে দেখতে কেটে যাবে দিনগুলো”।
তারপর থেকে রোজ স্কুলে যাওয়া আসার পথে চোখের সামনে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে
লাগল মা দুগ্গার বিশাল প্যাণ্ডেল। বেশ কিছুদিন ধরে গড়ে উঠল অজস্র বাঁশের হাড়গোড়
বের করা কঙ্কালের মতো খাঁচার কাঠামো। তারপর একদিন সে কাঠামো ঢাকা পড়ে যেত ত্রিপলের
আস্তরে। এরপর শুরু হত কাপড়ের কাজ।
স্কুলে যাওয়ার তাড়ায়, সকালে না হলেও, ফেরার সময় মাকে বায়না করে প্যাণ্ডেলের ভেতর
ঢুকত এক একদিন। অজস্র রঙিন আর সাদা কাপড় আর কাপড়ের ফালি ঝুলছে চারদিকে, তার সঙ্গে
সুতো আর দড়ি। অনেক অনেক লোক একসঙ্গে বসে কাপড় কুঁচিয়ে তুলছেন, অন্য অনেকে সেই
কুঁচি দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন প্যাণ্ডেল। সেই কাপড়ের সাজে অপরূপ হয়ে উঠতে লাগল দিনের
পর দিন, ঠিক পান্নার স্বপ্নের মতো। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত পান্না, ওখান থেকে পা সরত
না, কিন্তু মায়ের তাড়া থাকত, ঘরে ফিরে তাঁর কাজের শেষ নেই যে!
পান্না বড় হয়ে উঠতে উঠতে স্কুলের সঙ্গে ওই কলেজ স্কোয়ারটাও তার জীবনের
অঙ্গ হয়ে উঠল। বাল্য থেকে কৈশোর, কৈশোর পার হয়ে তারুণ্য পর্যন্ত তার বেড়ে ওঠার
সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে রইল তার স্কুল আর কলেজ স্কোয়ার।
-০০-
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন