১
‘স্স্স্স্শিল
কুট্ঔ’
স-এ তীক্ষ্ণ সিটি দিয়ে শুরু করে,
কণ্ঠের অদ্ভূত ইয়ডলিংয়ে ‘ঔ’ হেঁকে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় বিহারি শিল
কুটোনোওয়ালা। তার ডাক শুনে দৌড়ে বারান্দায়
গেল পান্না।
ওই লোকটি তার চেনা, কয়েকদিন আগেই
মা ওর থেকে শিল নোড়া কুটিয়েছিল। শিলকুটোনোর সময় পান্না বসেছিল তার সামনে। ছোট্ট
ছেনিতে হাতুড়ির ঠুকঠুক ঘায়ে সে খড়খড়ে করে তুলেছিল শিল আর নোড়ার মসৃণ হয়ে যাওয়া গা।
হাতুড়ির আঘাতে ছেনির আগায় মাঝে মাঝেই ছিটকে উঠছিল ছোট্ট ছোট্ট ফুলকি আর পাথরের
মিহিন কুচি। বিহারী শিলকুট্নেওয়ালা তাকে সতর্ক করেছিল, “হঠ যাও খোখাবাবু, আঁখমে
পাত্থর গিরবা করেগা, তো বহোত দরদ হোবে”।
মাও ঘরের ভেতর থেকে বলেছিলেন, “ওখান
থেকে সরে আয় ভুট্কু, চোখে লাগবে”। পান্না তার ডাকনাম হলেও, সোনা ছোটপুত্রকে আদর
করে ডাকেন ভুট্কু। পান্না একটু সরে এসে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আর অবাক হয়ে দেখেছিল
ছেনির ঘায়ে ছোট্ট ছোট্ট গর্তে বুনে ওঠা মাছের নকশা, আর তার পাশে যেন অজস্র বৃষ্টির
ধারা। শিল
কুটোনো হয়ে গেলে বিহারী ডাক দিয়েছিল, “লিয়ে যান, মাজী, হোইয়ে গেলো”।
মায়ের সাহায্য হবে ভেবে, পান্না
শিল তুলে ঘরের ভেতরে আনতে যাওয়াতে, শিলকুটোনোওয়ালা বলেছিল, “বহোৎ ভারি, তুমি শকবে
না, খোখাবাবু, ছোড় দো, মাজি লিয়ে যাবে”। এবং পিছন থেকে মা হাঁ হাঁ করে
উঠেছিলেন, “তুই কখনো শিল তুলতে পারিস ভুট্কু? পায়ে পড়লে আঙুল থেঁতলে যাবে, সর সর,
আমি দেখছি”।
তুলে নেওয়ার আগে শিল আর নোড়ার
গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন মা, ঠিকঠাক খসখসে হল কি না, বিহারী কুটনোওয়ালা
বলল, “দিখা লাগবে না, মাজি, ছোমাস কুছু করতে হোবে না, দেখে লিবেন”।
“ছমাস যাবে, না ছাই যাবে, একমাসেই
পাথরের গা তেলা হয়ে যায়”। সোনার কথায় টেনে টেনে হেসেছিল বিহারী কুটনেওয়ালা, “ওইসান
না হলে, হামাদের ভি চলবে কী করে, মাজি?”
সোনা আর কথা বাড়াননি, শিল-নোড়া
তুলে ঘরে এনে, পান্নার হাতে দশপয়সা দিয়ে বলেছিলেন, “যা তো গিয়ে দিয়ে আয়”। একটা দায়িত্ব পেয়ে
উত্তেজিত পান্না দৌড়ে গিয়ে পয়সাটা তুলে দিল কুটনোওয়ালার হাতে। উপার্জিত অর্থ পেয়ে
খুশী কুটনোওয়ালা পান্নার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর কোমরে বাঁধা ময়লা বটুয়া বের করে,
তার মধ্যে রাখল পয়সাটা। তারপর বেরিয়ে গেল ছেনি-হাতুড়িওয়ালা ছোট্ট চটের ব্যাগ নিয়ে।
রাস্তায় নেমে, হাঁক দিল, “স্স্স্স্শিল কুটঔ”।
ঘরে এসে শিশু পান্না জিজ্ঞাসা
করেছিল, “শিল কোটালে কেন গো, মা?”
“শিল-নোড়ার
গা তেলতেলে মসৃণ
হয়ে গেলে, মশলা বাঁটতে অসুবিধে হয় যে! আদা, পেঁয়াজ তাও বাঁটা যায়, কিন্তু শিল-নোড়া
খসখসে না হলে পোস্ত, সরষে, ধনে, জিরে বাঁটাই যায় না!”
আজ পান্নাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে
থাকতে দেখে, সেই কুটনোওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, “মাজিকো বোলো, শিল কুটতে হোবে?” তার
কথায় পান্না ঘরে ঢুকে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “মা, মা, সেই শিলকুটোনোওয়ালা আজ আবার এসেছে,
আজও শিল কোটাবে?”
সোনা বালতিতে বাসি জামাকাপড়
ভেজাচ্ছিলেন, ভুরু কুঁচকে তাকিয়েও হেসে ফেললেন, বললেন, “বলেছিল ছমাস যাবে, সাতদিন
না হতেই আজ আবার এসেছে? বলে দাও, দরকার হলে, তুমিই ওকে ডাকবে”। এরকম একটা দায়িত্ব পেয়ে
পান্না অভিভূত হয়ে গেল, অবাক আনন্দে বলল, “আমি ডাকবো, মা?”
সোনা স্মিতমুখে বললেন, “হুঁ,
তুমিই তো ডাকবে...কত্তো বড়ো হয়ে গেছো তুমি, আমার আর চিন্তা কী? এখন থেকে তুমিই তো
ডাকবে!” পান্না আবার দৌড়ে গেল
বারান্দায়, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিলকুটোনোওয়ালাকে, ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “আজ নয়,
দরকার হলে, আমিই তোমায় ডাকবো, কেমন?”
২
এ সময় এজমালির বাথরুমটাও খালি থাকে। দোতলার ভাড়াটেরা স্বামী
স্ত্রী দুজনেই অফিসে বেরিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে, একরাশ ভেজানো জামাকাপড় মেঝেয় ফেলে,
তাতে বার সাবান ঘষতে বসলেন সোনা। বাইরে দাঁড়িয়ে পান্না ব্যস্ত মায়ের দিকে চুপ করে তাকিয়ে
রইল অনেকক্ষণ। ঘাড়ের
কাছে এলিয়ে পড়েছে আলগাবাঁধা খোঁপা। কপালের ওপর দু একটা আলগা চুলের গুছি। কপালে,
নাকের ডগায়, চিবুকে জমে উঠেছে, বিন্দুবিন্দু ঘাম। সাবান ঘষা, থুবি দিয়ে কাচার
সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠছে মায়ের হাতের শাঁখা, নোয়া, পলা আর সোনার চুরি।
পান্না ঘুম থেকে ওঠার আগে থেকে
সোনার কাজ শুরু হয়ে যায়। উনুন ধরানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কুটনোকোটা, বাঁটনা বাঁটা, রান্না-বান্না,
এঁটো থালাবাসন ধোয়ার পর, এই জামাকাপড় কাচতে বসা...মায়ের কাজের যেন অন্ত নেই! বাবা অফিসে, দাদা স্কুলে। এখন কে হবে তার
সঙ্গী? কিছুক্ষণ মায়ের কাজ দেখে, সে আবার চুপচাপ বারান্দায় গেল। এই সময় মায়ের কাছে
ঘ্যানঘ্যান করলে, বকুনি জুটবে, হয়তো পিঠে দু একটা চড়-চাপড়ও।
প্রাক দ্বিপ্রহরে সামনের
রাস্তাটাও একটু ফাঁকা, পথচারীর সংখ্যা কম। পাড়ার বড়োরা সবাই অফিসে, ছোটরা, যারা তার মতো ছোটও নয়,
তারাও সবাই স্কুলে। বিহারি টানা-রিকশাওয়ালারা সকাল থেকে বেরিয়েছিল, এখন এক এক করে ফিরছে।
রিকশাগুলো রাস্তার ধারে, পান্নাদের বারান্দা ঘেষে দাঁড় করিয়ে, এখন একটু বিশ্রাম
নেবে। উল্টোদিকের টিউবওয়েল থেকে জল ভরে আনবে ঘটিতে। তারপর কাগজের ঠোঙা থেকে কিনে
আনা ছাতু ঢালবে কানা উঁচু কাঁসার থালায়। সেই ঠোঙাতেই থাকে দুটুকরো
পেঁয়াজ, দুটো কাঁচা লংকা, একটু তেঁতুলের আচার। থালার ওপর চূড়ো করা ছাতুর কোল ভেঙে
থালাতেই একটু জল নিয়ে ছাতু ভিজিয়ে গোল্লা পাকিয়ে মুখে তুলবে। কখনো পেঁয়াজ, কখনো
লংকায় কামড় দেবে, কখনো জিভের ডগায় ঠেকাবে তেঁতুলের আচার। খাওয়া সেরে তারা
টিউবওয়েলে গিয়ে থালা এবং ঘটি সুন্দর করে মেজে নেবে। রাস্তার বাঁদিকে বিশাল পুরোনো
বাড়িটার একতলায়, ওদের একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে। সেই ঘরে থাকে না কেউ। সেই ঘরে থাকে ওদের
ওই থালা-বাটি-ঘটি। এক আধটা ধুতি। চটের বস্তায় জড়ানো ওদের বিছানা। একপাশে থাকে কয়লা,
ঘুঁটে, কেরাসিন তেলের শিশি, তোলা উনুন। ওদের ওই ঘরের সামনের বারান্দাতে, রাত্রে ওরা
রুটি আর সবজি বানিয়ে খায়। তারপর গরমের সময়, অনেক রাত অব্দি নিজেদের মধ্যে গল্প
করে, তাদের গ্রামের খেতি-জমিন, গায়-ভ্যাঁয়েস, গেঁহু, চানা...। তারপর অনেক রাতে ওই
বাড়ির রোয়াকে বিছানা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মতিহারি, ছাপরা থেকে আসা বিশ-পঁচিশ জন
দেহাতি মানুষের বৈচিত্র্যহীন দিনযাপনের এই চিত্রগুলি মুখস্থ হয়ে গেছে পান্নার।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের
ফিরে আসা দেখতে দেখতে, পান্নার মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই রথের মেলা থেকে সে একটা
বাঁশি কিনে এনেছিল। মেলায় দেখা সেই বাঁশিওয়ালার ঝুড়িতে ছিল একগাদা বাঁশি, আর একটা
বাঁশি হাতে নিয়ে সে খুব সুন্দর সুর তুলছিল বাঁশিতে। সেই সুরে মুগ্ধ পান্না বাঁশি
কেনার জন্য বায়না ধরল। অবশেষে বাবার একটা হাত ধরে ঝুলে পড়ে, দুপয়সা দিয়ে একটা
বাঁশি কিনতে বাধ্য করিয়েছিল বাবাকে । বাড়িতে এনে সে বাঁশিটা বাজাতে চেষ্টা করেছে অনেক। কিন্তু যতবার
ফুঁ দিয়েছে কিছুতেই সুর বেরোয় নি। বরং বিদঘুটে ভাঙাগলা এক আওয়াজ বেরোচ্ছিল।
সেই বাঁশিটা নিয়েই এখন সে ক্যাঁ
ক্যাঁ বাজাতে লাগল। সোনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন ছেলেকে। বাঁশির বিচ্ছিরি আওয়াজটা তাঁর
কানে লাগছিল, বিরক্তির সৃষ্টি করছিল। কিন্তু তাও কিছু বললেন না, ছেলেটাই বা করে কী? এই বয়সের
বালক চঞ্চল ও অস্থির তো হবেই, গ্রামের বাড়িতে থাকলে, সমবয়সী পড়শী ছেলেমেয়েদের
সঙ্গে হুটোপুটি, দৌড়োদৌড়ি করলে, একটু আনন্দ পেত, মজা পেত। কিন্তু কলকাতার এই
একখানা ঘরের বাসায় সেই উপায় কই? তাছাড়া, তিনি নিজেও চান না, এই পাড়ার ছেলেপিলেদের
সঙ্গে ছাড়তে। কলকাতার লোকজন সম্বন্ধে তাঁর একটা ভীতি মনের মধ্যে কাজ করে। এখানে
ছেলে-ধরা কিংবা ছেলেকে বখাটে বানিয়ে তোলার হরেক আয়োজন এবং কে জানে তাঁর ছেলের
জন্যেই ওই সব লোকেরা উদ্গ্রীব হয়ে আছে হয়তো বা!
৩
“ভুটকু আয়, ছাদে কাপড় মেলতে যাবো”। সোনার কাপড়-চোপড় কাচা হয়ে
গেছিল। বালতিতে আধভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে তিনি দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে পান্নাকে
ডাকলেন। পান্না বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছিল। দৌড়ে এসে মায়ের সামনের
সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠল।
সোনা বললেন, “ওকি, ঘরের দোরটা
ভেজিয়ে দিলি না?”
পান্না বলল, “আমরা এখনই নেমে আসবো
তো”। সোনা
একটু অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, “তা হলেই বা, বেড়াল-টেড়াল আছে। উটকো লোকজনও ঢুকে পড়তে
পারে। যা চেপে দিয়ে আয় দরজাটা”। পান্না আবার দৌড়ে নেমে দরজাটা চেপে দিল, তারপর
মুখে কু-উ-উ-উ আওয়াজ তুলে একছুট্টে উঠে গেল সিঁড়ির মাথায়। সেখানে দাঁড়িয়ে বলল, “কই
এসো?”। সোনা হাসলেন, তাঁর ডানহাতের বালতিতে ভেজা কাপড়ের যথেষ্ট ওজন, এক এক ধাপ
উঠতে উঠতে বললেন, “অত তাড়াতাড়ি পারি? দেখছিস না, আমার হাতে বালতি”!
“আমায় দাও না, বালতিটা”। সিঁড়ির
মাথায় উঠে সোনা বালতিটা নামালেন। হাতটা ভেড়ে গিয়েছিল, একটু জিরিয়ে নিতে থামলেন।
পান্না বালতিটা তোলার চেষ্টা করছিল, পারল না, বলল, “বাব্বাঃ কী ভারি? তুললে কী
করে, মা?”
বালতি তুলে দোতলা থেকে ছাদের
সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সোনা বললেন, “চল, ছাদে চল”। এবারে পান্না আর তাড়তাড়ি উঠল
না, মায়ের আগে আগে সিঁড়ির একধাপ একধাপ উঠতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, ওই ভারি
বালতিটা নিয়ে এতগুলো সিঁড়ি ভেঙে ছাদে ওঠা মোটেই মজার ব্যাপার নয়।
ছাদের দরজা খুলে খোলা আকাশের নীচে
দাঁড়িয়ে পান্না আবার আনন্দে দৌড়ে নিল খানিক। বাঁশি বাজাতে বাজাতে ছুটোছুটি করতে লাগল ছোট্ট ছাদের এ কোণ
থেকে সে কোণে। তার
মাথার থেকেও উঁচু প্যারাপেটের আড়ালে আশেপাশের বাড়ি তেমন দেখা না গেলেও, মাথার ওপর
উন্মুক্ত আকাশ তাকে অদ্ভূত মুক্তির স্বাদ এনে দিল।
সোনা ছাদের কাপড় মেলা দড়ির নীচে
বালতি রেখে, ভেজা কাপড়গুলো চেপে নিংড়ে দড়িতে টাঙাতে শুরু করলেন। অধিকাংশ কাপড়
দড়িতে মেলে দেওয়ার পর, নিংড়োনো জলটা জমে ছিল বালতিতে। বাঁশির একঘেয়ে বেসুর ডাকে
বিরক্ত হয়ে পান্না, নতুন কিছু করার উৎসাহে, বালতির জলে ডুবিয়ে দিল বাঁশিটা। তারপর
অন্যপ্রান্তে ফুঁ দিতেই এবার আর শব্দ হল না, জলের মধ্যে গুলগুল করে উঠল বুদবুদ।
ক্ষণস্থায়ী সেই বুদবুদের গায়ে সূর্যের আলোয় খেলতে লাগল সপ্তবর্ণ। কী আশ্চর্য, অবাক
করা কাণ্ড। বাঁশিতে ফুঁ দিলে শুধু আওয়াজই নয়, সাতরঙা রংও ফুটে ওঠে স্বচ্ছ জলে!
অবাক পান্না চিৎকার করে উঠল, “মা, মা, দেখ, কী সুন্দর রঙ...”।
শ্রান্ত সোনা শেষ কাপড়টা নিঙড়ে
দড়িতে শুকোতে দিতে দিতে দেখলেন ছেলের কীর্তি, ক্লান্ত স্বরে বললেন, “বাঃ, ভারি
সুন্দর তো, আমার ভু্ট্কুটা কত কী শিখে ফেলল!”
সব জামা কাপড় শুকোতে দেওয়ার পর
সামান্য অবসর। সোনা ছাদের আলসেতে ভর দিয়ে একটু দাঁড়ালেন, রাস্তার ওপারের মাসিমাও
ছাদে এসেছিলেন গুল দিতে। সোনাকে দেখে মাসিমা হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কাপড়
শুকোতে দেওয়া হল, বৌমা?”
শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে সোনা বললেন,
“হ্যাঁ, মাসিমা। আপনি এই দুপুর রোদ্দুরে ছাদে কী করছেন”?
“গুল দিতে এসেছিলাম। আমারও হয়ে
গেল, এবার নীচেয় যাবো, চান-টান করবো”।
“কয়লার গুল?”
“হ্যাঁ, কয়লার গুঁড়ো জমা হয়েছিল,
একগাদা। আজ দিয়ে ফেললাম”।
“তাই? আমাদের কয়লার চৌবাচ্চাটাও
গুঁড়োয় আদ্দেক ভরে গেছে। একমণের বস্তা ঢাললে উপচে পড়ে, চৌবাচ্চায় পুরোটা ধরে না।
ভাবছিলাম, কয়লার গুঁড়ো ফেলে দেব, কিন্তু...”।
“ফেলে দেবে কী গো, বৌমা, দুদিন
সময় করে, গুল দিয়ে ফেল, পনেরদিনের জ্বালানি হয়ে যাবে”!
“তাই তো! কিন্তু কী করে গুল দেব
মাসিমা?”
“ও মা, তাও জানো না। কয়লার গুঁড়োর
সঙ্গে একটু মাটি আর ভাতের ফ্যান মিশিয়ে, গুল বানিয়ে রোদ্দুরে শুকিয়ে নাও, বাস্
গুল তৈরি! গাঁয়ে থাকতে তোমরা গুল বানাতে না?”
শহরের আদব-কায়দা না জানা সোনা,
একটু যেন লজ্জা পেলেন, বললেন, “তা না মাসিমা, আমাদের ওদিকে ঘুঁটে, ধানের তূষ আর
কাঠকুটোতেই রান্না-বান্না হয়ে যায়। কয়লা ব্যবহার হয়, তবে কম। তাতে যেটুকু গুঁড়ো
হয়, তার ধিকিধিকি জ্বালনে ধানসেদ্দ কিংবা রোজকার দুধের জ্বাল দিতেই খরচা হয়ে যায়”।
“তোমাদের বাড়ি বদ্দোমানে, না? কতায়
বলে “জেলার সেরা বদ্দোমান, আর কলার সেরা মত্তোমান”। তার মানে তোমরা ঘটি। তোমরা তো
তাও ভালো, তোমাদের ওপরে যে বাঙালরা ভাড়া থাকে, তাদের রীতকরণ দেখেছো? যেমন কতাবাত্তা,
তেমন আচার-আচরণ। খাইসে, ইসে, পোলা, মাইয়া – শুঁটকি মাছও খায়, তোমরা গন্ধ পাও না?
ছ্যা, ছ্যা, আমার তো নাকে কাপড় দিলেও গা গুলোয়!”
সোনা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে
একটু হাসলেন, তিনি জানেন বাড়িওয়ালি মাসিমা, আড়ালে তাঁদের সম্বন্ধেও অনেক কথা বলে
থাকেন। তাঁরাও ভাড়াটে, কিন্তু ঘটি – অতএব বাঙাল ভাড়াটেদের তুলনায় তাঁরা মন্দের
ভালো! কিন্তু শুধু ভাড়াটে বলেই নয়, বাড়িওয়ালী মাসিমা একবার শুরু করলে, এ পাড়ার সকল
প্রতিবেশী – বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে নির্বিশেষে – সকল পরিবারের দোষ, ত্রুটির হাঁড়ির
খবর সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনা নেই। কার বাড়ির কর্তার
চরিত্র দোষ আছে। ওপাশের কোন বাড়িতে ভর দুপুরবেলা প্রায়ই এক উটকো পুরুষ ঢোকে, বিকেল
হলেই বেরিয়ে যায়! বৌটাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, পিসতুতো দাদা! চোখে অদ্ভূত ইশারা এবং
মুখে রহস্যের হাসি নিয়ে, মাসিমা বলেন, “অ বৌমা, কেমন পিসতুতো দাদা গো, দুপুর ছাড়া
অন্য সময়ে তার আসার সময় হয় না?”
যে মহিলার সম্পর্কে মাসিমা এই
গোপন সংবাদ দিলেন, সে মহিলাকে সোনা চেনেন। অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখের নির্বিকার
নিঃসন্তান এক মহিলা! পাড়ার কারো সঙ্গে তেমন মেশেন না। মুখরোচক এই সংবাদে সোনা
এতটুকুও কৌতূহলী না হওয়ায়, মাসিমা মোটেই হতাশ হলেন না, বরং আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন,
“ওই বউয়ের আরো কিত্তি শুনলে, তুমি আঁতকে উঠবে বৌমা! শুধু পিসতুতো দাদাই নয়, আরো
একজন আসে, হ্যাঁ গো! বলে, ওর দেওর, সে নাকি ওর বরের খুড়তুতো ভাই! সেও আসে ওই
দুপুরেই! ভদ্দোরনোকের পাড়ায় এ সব কী বলো তো, বউমা? ছি ছি ছি”। তারপর চোখের অদ্ভূত
এক ইঙ্গিত করে, মাসিমা গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “আমি কী ভাবি জানো তো বৌমা,
যদি দুজনে একই দিনে একই সময়ে এসে উপস্থিত হয়? তখন ওই মাগি কী করবে, বল দেকি? হি হি
হি হি...”!
মাসিমাকে আর বাড়তে না দিয়ে, সোনা
বললেন, “আমি আসি মাসিমা, নীচেয় রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, ছেলেটাকেও চান করাতে হবে। ভুটকু নীচেয় চ। আসছি, মাসিমা”।
৪
পান্না একমনে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে, বালতির
জলের মধ্যে বুদবুদ তৈরি করছিল, বুদবুদের গায়ে নানা রঙের রামধনু সৃষ্টি করছিল! সোনা
সে বালতিটা টেনে নিয়ে ঝাঁঝরির মুখে ঢেলে দিলেন জলটা। তারপর খালি বালতি হাতে নিয়ে
পান্নার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চঃ, নীচেয় যাই। নাওয়া খাওয়া সেরে একটু শুই। সেই ভোর
থেকে যা চলছে”।
সোনা ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন,
দেখলেন পান্না আসছে না, মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের মাঝখানে। “কী রে, আয়! নীচেয়
যাবি না?” পান্না নিরুত্তর। তার মনের মধ্যে তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং অভিমান। মা বিনা
বাক্যে ঝাঁঝরির মুখে জলটা ঢেলে দিলেন? একবারের জন্যেও তাঁর মনে হল না, পান্নার
কথা, পান্নার নতুন আবিষ্কারের কথা! এমন নিষ্ঠুর মায়ের সঙ্গে সে আর কোন কথা বলবে
না!
সোনা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা
আন্দাজ করলেন, বললেন, “সোনু তোমার সেই রামধনুর জলটা ফেলে দিয়েছি বলে, মায়ের ওপর
রাগ করেছো? আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, আমার ঘাট হয়েছে, এর পরের দিন, তোমার জন্যে অনেকটা
সাবান জল রেখে দেব। কেমন? এখন চলো, নীচেয় যাই”। পান্না এতটুকুও বিচলিত হল না,
মায়ের এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সে একই ভাবে ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
সোনা এবার বললেন, “বেশ, থাকো তুমি
দাঁড়িয়ে, আমি নীচেয় চললাম”। সোনা তিন চার
ধাপ নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে, তারপর একটু অপেক্ষা করে আবার উঠে এলেন, দেখলেন, পান্না
একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ টুটল, বললেন, “পান্না, সোজা কথায় নীচেয়
আসবি, নাকি পিঠটা ফাটাবো?”
মায়ের কণ্ঠস্বর এবং ওই “পান্না”
ডাক, পান্নাকে ভয় পাইয়ে দিল, সে বুঝল, মা রেগে গেছেন। মায়ের হাতের দু একটা চড়
চাপড়ের স্বাদ, এর আগে সে দু একবার পেয়েছে! সেই স্মৃতি মনে করে, সে আস্তে আস্তে নীচেয়
নেমে এল।
নীচেয় নেমে সোনা হাতের বালতি
রেখে, পান্নার হাতে গামছা দিয়ে বললেন, “যাও, সোনু মাথায় তেল দিয়ে ঝপ করে চান সেরে
এসো। তোমার হলে, আমি যাবো। ততক্ষণ আমি ঘর দোর একটু গুছিয়ে নিই”।
মায়ের কণ্ঠের স্বাভাবিক সুরে,
পান্না তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে পেল, ঘরের এক কোণে সে চুপ করে
দাঁড়িয়ে রইল, মেঝের দিকে তাকিয়ে। সোনা কাজ সারছিলেন, পান্নাকে লক্ষ্য করেননি।
কিছুক্ষণ পরে তিনি খেয়াল করলেন, পান্না মুখভার করে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে...একটু
মায়া হল, আবার বিরক্তও হলেন, “আর ভাল লাগছে না, সোনু, যা না তেল মেখে চানটা করে
আয়, না”। পান্না আড়চোখে মায়ের মুখটা দেখল এবং একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
আর সেই সময়েই রাস্তা থেকে হাঁক
শোনা গেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”।
বৃদ্ধা এক পৃথুলা মহিলা, পরনে
সাদা থান আর সাদা ব্লাউজ, হাতে মাঝারি সাইজের পেটমোটা একটা কাপড়ের থলি। মাথার
পেছনদিকে বড়ি করে বাঁধা সাদা-কালো চুলের খোঁপা। এই সময়েই সে রোজ আসে, দাঁতের পোকা
বের করতে। এ পাড়ার মেয়ে-বউদের দাঁতে ব্যথা হলে, তারা ডেন্টিস্টের চেম্বারে গিয়ে
দাঁত বের করে বসে পড়ার কথা কেউ চিন্তাও করে না। পুরুষহীন নির্ঝঞ্ঝাট দুপুরে এই
বৃদ্ধা তাদের দাঁতের ‘চিকিচ্ছে করে’। তার হাতের কারসাজিতে ব্যথা হওয়া
দাঁত থেকে বের হয়ে আসে মুড়ির মতো দেখতে জ্যান্ত বড়ো পোকা! পোকা বের করে দেওয়ার পর
দাঁতের গোড়ায় ঘষে দেওয়া কোন ওষুধের গুণে, ব্যাথা সেরে যায় বেশ কদিনের জন্যে।
আশ্চর্য তার হাত যশ। পাড়ার মেয়েরা বৃদ্ধা ওই মহিলাকে বলে “বেদে বুড়ি”!
সোনা ওই বেদে বুড়ির ডাক শুনেই বলে
উঠলেন, “দাঁড়া তো, ওই বেদে বুড়িকে ডাকি, আমার ছেলের মাথার পোকাগুলোকে সব বের করে
দিক। সেদিন হারুর মা, ওকে ডেকে হারুর মাথার সব পোকা বের করে নিয়েছে”!
পান্না এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল,
মাথার ভেতরে পোকা থাকা এবং সেই পোকা বের করা ব্যাপারটা তার বুদ্ধির বাইরে! সে ভয়ে
ভয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “তারপর, হারুর কী হল, মরে গেল?”
সোনা মুখ টিপে হেসে বললেন, “বালাই
ষাট মরবে কেন? পোকাগুলো বের করে দেওয়াতে হারু একদম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে গেল, ওর মা
যখন যা বলত, সব শুনত। কক্খনো দুষ্টুমি করত না! ডাকবো বেদে বুড়িকে?”
পান্না হারু বা হারুর মা কাউকেই
চেনে না, কিন্তু মায়ের ওপর রাগ করে আর অবাধ্য হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, সে দৌড়ে গেল
বাথরুমে। চৌবাচ্চার মধ্যে মগ ডুবিয়ে সে জল ঢালতে লাগল মাথায়। জল ঢালার আওয়াজের
মধ্যেও, সে বেদে বুড়ির ডাক শুনতে পেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”। তবে
শব্দটা বেশ দূরের শব্দ, মা এখন ডাকলেও বেদে বুড়ির সে ডাক শোনার সম্ভাবনা কম।
পান্না নিশ্চিন্তে মাথায় জল ঢালতে ঢালতে হৈ হৈ করে গান ধরল, “এ গানে প্রজাপতি পাখায়
পাখায় রঙ ছড়ায়,
এ গানে
রামধনু তার সাতটি রঙ ঝরায়...”।
সোনার মুখে প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “পাগল, সত্যি সত্যিই আমার এ ছেলেটার মাথায় পোকা আছে!”
..০০..
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন