এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ
মোক্ষযোগ
|
১ |
অর্জুন
বললেন- হে হৃষীকেশ, হে মহাবীর কেশিনিষূদন, আমি সন্ন্যাস এবং ত্যাগ - এই দুই
তত্ত্ব আলাদাভাবে জানতে চাই। [হৃষীক
শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয় বা ঈন্দ্রিয়সমূহ, ঈশ মানে ঈশ্বর। অর্থাৎ সকল ঈন্দ্রিয়কে
যিনি জয় করেছেন, বা সকল ইন্দ্রিয়ের যিনি নিয়ামক - তিনি শ্রেষ্ঠ তাপস, তিনিই
হৃষীকেশ। অন্যদিকে
তিনি মহাবীরও বটেন, কারণ মথুরায় গিয়ে কংসের সামনাসামনি হওয়ার আগে, কংসের অনুচর প্রবল
পরাক্রম মল্লবীর কেশীকে তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন। প্রকৃত
সন্ন্যাসীরা অলৌকিক তেজস্বী হতেও পারেন কিন্তু তাঁরা সাধারণতঃ শীর্ণদেহ
দুর্বলকায় হয়ে থাকেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সর্বেন্দ্রিয়জয়ী সন্ন্যাসী হয়েও মহাবীর –
সে কথাটিই স্মরণ করে অর্জুন প্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণকে দুটি নামে সম্বোধন করে –
সন্ন্যাস ও ত্যাগ - এই দুই তত্ত্ব জানতে চাইলেন। অর্থাৎ অপার্থিব এবং পার্থিব সর্ব শক্তিতেই অমিতশৌর্যবান শ্রীকৃষ্ণের মতো মহাচার্য কে আর
হতে পারেন?] |
||
|
২ |
শ্রীভগবান
বললেন- পণ্ডিতগণ ফলের প্রত্যাশী সকল কর্মের ত্যাগকে সন্ন্যাস বলেন এবং বিচক্ষণ
ব্যক্তিগণ সমস্ত কর্মের ফল ত্যাগ করাকেই ত্যাগ বলেন। |
||
|
৩ |
কোন কোন
মনীষি বলেন কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ, কারণ কর্ম দোষের হেতু। আবার কোন মনীষি বলেন
যজ্ঞ, দান এবং তপস্যার মতো কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়। |
||
|
৪ |
হে
ভরতকুল শ্রেষ্ঠ, এই ত্যাগ বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত আমি তোমাকে বলছি, শোন। হে
পুরুষশ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রে বলা আছে যে ত্যাগও তিন প্রকারের হয়। |
||
|
৫ |
যজ্ঞ,
দান ও তপস্যা কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়, এই সকল কর্ম কর্তব্য। কারণ যজ্ঞ, দান এবং
তপস্যার অভ্যাসেই মনীষিগণের চিত্তশুদ্ধি হয়। |
||
|
৬ |
হে
পার্থ, এই সমস্ত কর্ম কিন্তু ফলের আশা ত্যাগ ক’রে নিরাসক্ত মনে করা উচিৎ। এই
আমার নিশ্চিত ও উত্তম সিদ্ধান্ত। |
||
|
৭ |
নিত্যকর্ম
ত্যাগ করাও কিন্তু উচিৎ নয়। অজ্ঞানতার কারণে নিত্যকর্ম ত্যাগকে তামসিক ত্যাগ বলা
হয়ে থাকে। |
||
|
৮ |
যে
ব্যক্তি কর্মে দেহের কষ্ট, এই ভয়ে কর্মত্যাগ করেন, তিনি রাজসিক ত্যাগ করে
ত্যাগের ফলস্বরূপ পরমমুক্তি লাভ করতে পারেন না। |
||
|
৯ |
হে
অর্জুন, নিরাসক্ত চিত্তে, ফলের কামনা না করে যে সকল নিত্য কর্মের অনুষ্ঠান করা
হয়, সেই আসক্তি ও ফলের কামনা ত্যাগই সাত্ত্বিক ত্যাগ – এই আমার অভিমত। |
||
|
১০ |
সত্ত্বগুণ
সম্পন্ন, মেধাবী ও নিঃসংশয় ত্যাগীগণ না কষ্টকর কর্মে বিরক্ত হন, না সহজ কর্মে
আসক্ত হন। |
||
|
১১ |
যেহেতু দেহ
বিশিষ্ট জীবের নিঃশেষে সমস্ত কর্ম ত্যাগ সম্ভব নয়, সেহেতু যিনি কর্ম থেকে কোন
ফলের প্রত্যাশা করেন না, তিনিই ত্যাগীরূপে অভিহিত হন। |
||
|
১২ |
যাঁরা
অত্যাগী তাঁরা মৃত্যুর পর ইষ্ট, অনিষ্ট এবং মিশ্র এই তিন ধরনের কর্মফল লাভ করে
থাকেন, সন্ন্যাসীদের কোনভাবেই কোন ফললাভ করতে হয় না। [ইষ্ট
মানে পুণ্যফল – দেবলোক প্রাপ্তি, অনিষ্ট মানে পাপফল- নীচলোক প্রাপ্তি, মিশ্র
মানে মধ্যফল – মনুষ্যলোক প্রাপ্তি] |
||
|
১৩ |
হে
মহাবীর অর্জুন, সর্বকর্মের অন্তস্বরূপ সাংখ্যে সকল কর্মের সিদ্ধিলাভের পাঁচটি
কারণ বর্ণনা করা আছে, সেই কারণগুলি তুমি আমার থেকে জান। |
||
|
১৪ |
জীবের
দেহ, তার কর্তারূপ অহংকার, ইন্দ্রিয়রূপ বিভিন্ন করণ, জীবের নানাবিধ কর্ম
প্রচেষ্টা আর এদের মধ্যে পঞ্চম দৈব। |
||
|
১৫ |
শরীর,
বাক্য ও মন দিয়ে মানুষ যে ন্যায় এবং অন্যায় কর্ম করে, সেই সমস্ত কর্মেরই কারণ এই
পাঁচটি। |
||
|
১৬ |
এই পঞ্চ
কারণ থাকলেও যে মোহান্ধ বুদ্ধিহীন ব্যক্তি শুদ্ধ আত্মাকে সকল কর্মের কর্তারূপে
দেখে, দুর্বুদ্ধির কারণে সে সম্যক দেখতে পায় না। |
||
|
১৭ |
যাঁর
অহংকার ও আমিই কর্তা এমন ভাব নেই, যাঁর কর্মফলে বুদ্ধি সংলিপ্ত নয়, তিনি এই
জগতের সমস্ত জীবকে হত্যা করেও হত্যা করেন না, এবং এই হত্যাক্রিয়ার ফলে তিনি
অধর্মে আবদ্ধ হন না। |
||
|
১৮ |
জ্ঞান,
জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা - কর্মে প্রবৃত্তির হেতু এই তিন প্রকার। করণ, ক্রিয়া এবং
কর্তা – এই তিনটি কর্মের আশ্রয়। [অর্থাৎ
আত্মা কর্ম প্রবৃত্তির হেতুও নন, কর্মের আশ্রয়ও নন] |
||
|
১৯ |
সাংখ্যশাস্ত্রে
জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণভেদে তিনি প্রকারের বলা হয়েছে।
সেই তিন ভেদের তত্ত্বটি যথাযথ শোন। |
||
|
২০ |
যে
জ্ঞানে বহু বিভক্ত সমস্ত ভূতকে একটি অবিভক্ত অব্যয় ভাবে উপলব্ধি করা যায়, সেই
জ্ঞানকে সাত্ত্বিক জ্ঞান বলেই জানবে। [এই
জ্ঞান অদ্বৈত আত্মদর্শনের জ্ঞান] |
||
|
২১ |
কিন্তু
যে জ্ঞান সর্ব ভূতের প্রত্যেক দেহ স্থিত আত্মাকে, পৃথক পৃথক ভাবলক্ষণের আত্মা
বলে জানে, সেই জ্ঞানকে রাজসিক জ্ঞান বলেই জেনে রাখো। |
||
|
২২ |
আর যে
জ্ঞান কোন একটি বিশেষ কার্য অনুষ্ঠানে, সমগ্রভাবে আসক্ত হয়; যুক্তিহীন, ভ্রান্ততত্ত্ব
এবং তুচ্ছ সেই জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলেই জানবে। |
||
|
২৩ |
রাগ-দ্বেষহীন,
ফলের প্রত্যাশাহীন, আসক্তিশূণ্য কর্তব্যের যে নিত্যকর্ম অনুষ্ঠান - তাকেই
সাত্ত্বিক কর্ম বলে। |
||
|
২৪ |
আবার
ফলের প্রত্যাশায়, মনে অহংকার নিয়ে, বহু কষ্টসাধ্য কোন কর্ম অনুষ্ঠান করলেও তাকে
রাজসিক কর্ম বলা হয়। |
||
|
২৫ |
আর শুভ
বা অশুভ পরিণাম বিচার না করে, ক্ষতি, হিংসা এবং সামর্থ্য বিবেচনা না করে, মোহে
আচ্ছন্ন হয়ে যে কর্ম অনুষ্ঠান, তাকে তামসিক কর্ম বলা হয়। |
||
|
২৬ |
আসক্তিহীন,
অহংকারশূণ্য, ধৈর্য ও উদ্যমী, সাফল্যে এবং ব্যর্থতায় নির্বিকার হয়ে যিনি কর্ম
করেন, তাঁকে সাত্ত্বিক কর্তা বলা হয়। |
||
|
২৭ |
বিষয়
অনুরাগী, কর্মফলের প্রত্যাশী, লোভী, হিংসাযুক্ত, অশুচি মন নিয়ে এবং আনন্দে
বিহ্বল ও দুঃখে কাতর হয়ে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে রাজসিক কর্তা বলে। |
||
|
২৮ |
নিষ্ঠাহীন,
অস্থিরমতি, দুর্বিনীত, প্রতারক, স্বার্থসন্ধানী, উদ্যমহীন, বিষণ্ণ মানসিকতায়,
আলস্যের সঙ্গে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে তামসিক কর্তা বলে। |
||
|
২৯ |
হে
ধনঞ্জয়, এইবার তিনগুণ অনুসারে বুদ্ধি ও ধৃতির তিন প্রকারভেদের কথাও পৃথক পৃথক
ভাবে তোমাকে সম্পূর্ণ বর্ণনা করছি, শোনো। |
||
|
৩০ |
হে
পার্থ, যে বুদ্ধিতে, প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, কর্তব্য ও অকর্তব্য, ভয় ও অভয়, বন্ধন
ও মুক্তি, সম্যক উপলব্ধি করা যায়, সেই বুদ্ধি সাত্ত্বিকী। |
||
|
৩১ |
হে
পার্থ, যে বুদ্ধিতে ধর্ম ও অধর্ম, কর্তব্য ও অকর্তব্য, নিঃসংশয়ে জানা যায় না,
সেই বুদ্ধিকে রাজসিক বুদ্ধি বলে। |
||
|
৩২ |
হে
পার্থ, তমোভাবে আচ্ছন্ন যে বুদ্ধিতে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে হয়, যে বুদ্ধি সকল
বিষয়কে বিপরীত ভাবে গ্রহণ করে, সেই বুদ্ধিকে তামসিক বুদ্ধি বলে। |
||
|
৩৩ |
হে
পার্থ, যে ধৃতি মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয়ের সকল ক্রিয়াকে সংহত করে, চিত্তকে একনিষ্ঠ
যোগে, ব্রহ্মে নিত্যসমাহিত রাখে, সেই ধৃতিই সাত্ত্বিকী ধৃতি। |
||
|
৩৪ |
হে
অর্জুন, কিন্তু যে ধৃতি কামনার জন্যেই ধর্ম, এই ধারণা সৃষ্টি করে এবং সেই
প্রসঙ্গে মনকে ফলের প্রত্যাশী করে তোলে, সেই ধৃতি রাজসিক ধৃতি। |
||
|
৩৫ |
হে
পার্থ, দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি যে ধৃতির প্রভাবে অবাস্তব কল্পনা, ভয়, শোক, বিষাদ এবং
বিষয়ভোগ লালসা থেকে বিমুক্ত হতে পারে না, সেই ধৃতিকে তামসিক ধৃতি বলে। |
||
|
৩৬ |
হে
ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, এখন তুমি আমার থেকে তিন রকম সুখের তত্ত্ব শোনো, যে সুখের একনিষ্ঠ
অভ্যাসে পরম আনন্দ লাভ করা যায় এবং সকল দুঃখের অবসান হয়। |
||
|
৩৭ |
যে সুখ
প্রথমে বিষের মতো কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমৃতের সমান, যে সুখ আত্মজ্ঞানের প্রসাদে
নিঃসৃত হয়, সেই সুখকেই সাত্ত্বিক সুখ বলে। |
||
|
৩৮ |
বিষয় ও
ইন্দ্রিয়ের সংযোগে যে সুখ প্রথমে অমৃতের মতো মনে হয়, কিন্তু পরিণামে বিষতুল্য
হয়ে ওঠে, সেই সুখকে রাজসিক সুখ বলে। |
||
|
৩৯ |
এবং যে
সুখ শুরুতে এবং পরিণামেও আত্মাকে মোহে আচ্ছন্ন রাখে, যে সুখ নিদ্রা, আলস্য ও
ভ্রান্তি থেকে উৎপন্ন হয়, সেই সুখকে তামসিক সুখ বলে। |
||
|
৪০ |
পৃথিবীতে
বা স্বর্গে, মানুষ হোক কিংবা দেবতা - এমন কোন জীব নেই, যে প্রকৃতির মায়াতে সকল
বন্ধনের কারণ এই ত্রিগুণ থেকে বিমুক্ত হয়। |
||
|
৪১ |
হে
অরিন্দম, প্রকৃতির এই ত্রিগুণের প্রভাবেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের
কর্মসকল, পৃথক পৃথক বিভাগে বিভক্ত হয়েছে। |
||
|
৪২ |
অন্তরে
ইন্দ্রিয়ের সংযম, বাহিরে ইন্দ্রিয়ের দমন, তপস্যা, শুচিতা, ক্ষমা, সারল্য,
শাস্ত্রজ্ঞান, তত্ত্বের উপলব্ধি এবং আস্তিক্য বুদ্ধি – এই সমস্ত ব্রাহ্মণের
স্বভাবজাত কর্ম। [যার
ঈশ্বরে এবং শাস্ত্র বিধানে বিশ্বাস আছে সে আস্তিক, যার বিশ্বাস নেই সে নাস্তিক] |
||
|
৪৩ |
পরাক্রম,
তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা এবং যুদ্ধ থেকে পালিয়ে না যাওয়ার প্রবৃত্তি, দান, ঈশ্বরের
মতো শাসন ক্ষমতা – এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের স্বাভাবিক কর্ম। |
||
|
৪৪ |
বৈশ্যের
স্বাভাবিক কর্ম - কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য আর সেবামূলক কাজই শূদ্রের পক্ষে
স্বাভাবিক। |
||
|
৪৫ |
বর্ণ ও
আশ্রম অনুযায়ী নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত থেকেই মানুষ সিদ্ধি লাভ করতে পারে,
স্বকর্মে নিরত ব্যক্তি কিভাবে সিদ্ধিলাভ করে, সেই কথাই এখন শোনো। |
||
|
৪৬ |
যিনি এই
জগতের সমস্ত জীবের স্রষ্টা, যিনি এই বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র ব্যাপ্ত রয়েছেন।
মানুষ নিজ নিজ স্বভাব কর্ম অনুষ্ঠান ক’রে তাঁকেই অর্চনা করে ও সিদ্ধি লাভ করে। |
||
|
৪৭ |
স্বধর্ম
পালনে কোন ত্রুটিও হলেও, তা পরধর্মের সুষ্ঠু অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভাল। কারণ
স্বভাবজাত কর্ম অনুষ্ঠানে কোন পাপ অর্শায় না। |
||
|
৪৮ |
হে
কুন্তীপুত্র, দোষযুক্ত হলেও স্বভাব কর্ম কখনো পরিত্যাগ করবে না কারণ সমস্ত কর্মই
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন অগ্নির মতো, ত্রিগুণের দোষে দুষ্ট। |
||
|
৪৯ |
সকল
বিষয়েই নিরাসক্তি ভাব, সংযত চিত্ত, ভোগের আকাঙ্খামুক্ত সন্ন্যাস অভ্যাস করলে,
নিষ্ক্রিয় আত্মস্বরূপে সিদ্ধি লাভ করা যায়। |
||
|
৫০ |
হে
কুন্তীপুত্র, এই সিদ্ধ পুরুষ যে জ্ঞান ও নিষ্ঠায় পরমাত্মা ব্রহ্মকে লাভ করেন, যে
জ্ঞান সকল জ্ঞানের শেষ কথা, সেই জ্ঞানের কথাই এখন সংক্ষেপে তোমাকে বলব। |
||
|
৫১-৫৩ |
বিশুদ্ধ
বুদ্ধি ও ধৈর্য, আত্মার সংযম, ধ্বনি ইত্যাদি সমস্ত বিষয় ত্যাগ, অনুরাগ, বিরাগ ও বিদ্বেষ
ত্যাগ, নির্জন স্থানে বাস, পরিমিত আহার, বাক্য, মন ও শরীরের নিয়ন্ত্রণ, সর্বদা
ধ্যানযোগে একনিষ্ঠতা, অনাসক্ত বৈরাগ্য ভাব, অহংকার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ ও
পরিগ্রহ থেকে নিজেকে বিমুক্ত রেখে, সকল বিষয়ে মমত্বহীন প্রশান্ত চিত্ত পুরুষ পরম
ব্রহ্মজ্ঞান লাভে সমর্থ হন। |
||
|
৫৪ |
ব্রহ্মভাব
লাভ করার পর, প্রসন্ন চিত্ত সদানন্দ পুরুষ কোন বিষয়ে শোক করেন না, কোন বিষয়
কামনাও করেন না, সর্বভূতে সমদর্শী এই পুরুষ আমাতে পরম ভক্তি উপলব্ধি করেন। |
||
|
৫৫ |
স্বরূপতঃ
আমিই যে জগতের বিভিন্ন রূপভেদে অবস্থান করি, এই তত্ত্বটি একনিষ্ঠ ভক্তগণ জানতে
পারেন, আমার স্বরূপ তত্ত্বটি এই ভাবে সঠিক উপলব্ধি করতে পারলে, ভক্তগণ আমাতেই
প্রবেশ করেন। |
||
|
৫৬ |
যে ভক্ত
সর্বদা আমার শরণাগত হয়ে তার সকল কর্মব্যস্ততা আমাকে সমর্পণ করে, আমার অনুগ্রহে
সেই ভক্ত, শাশ্বত ও অব্যয় পরমপদ লাভ করেন। |
||
|
৫৭ |
সর্বদা
আমার শরণাপন্ন হও, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সমস্ত কর্মের অনুষ্ঠান আমাকে সমর্পণ করো।
বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে সর্বদা আমাতেই চিত্তসংযুক্ত থাকো। |
||
|
৫৮ |
সর্বদা
আমাতে চিত্ত সংযুক্ত হলে আমার অনুগ্রহে সংসারের সকল দুঃখ তুমি অতিক্রম করতে
পারবে। আর যদি আত্ম অহংকারে তুমি আমার কথা অমান্য করো, তাহলে বিনষ্ট হবে। |
||
|
৫৯ |
অহংকারের
প্রভাবে তুমি মনে করছ, যুদ্ধ করবে না, কিন্তু তোমার এই সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত। কারণ তোমার
স্বভাব ধর্মই তোমাকে যুদ্ধে নিয়োগ করবে। |
||
|
৬০ |
হে
কুন্তীপুত্র, যদিও মোহে আচ্ছন্ন থাকার জন্যে এই কর্ম অনুষ্ঠানে তোমার ইচ্ছা
হচ্ছে না, কিন্তু স্বভাবতঃ তুমি নিজের ক্ষত্রিয় ধর্মে আবদ্ধ, কাজেই
অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই কর্ম তুমি করবে। |
||
|
৬১ |
হে
অর্জুন, ঈশ্বর পরমাত্মারূপে জগতের সমস্ত জীবের হৃদয়ে বাস করেন আর মায়ার প্রভাবে,
তিনিই সর্ব জীবকে যন্ত্রের মতো নিয়ন্ত্রণ করেন।
|
||
|
৬২ |
হে
ভরতকুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জীবনের সর্ব বিষয়ে তাঁর শরণাগত হও, তাঁর অনুগ্রহে পরম
শান্তি ও শাশ্বত পরম ব্রহ্মপদ লাভ করবে। |
||
|
৬৩ |
গোপনের
থেকেও মহাগোপন এই জ্ঞান আমি তোমার কাছে ব্যাখ্যা করলাম, এই তত্ত্ব বিশেষভাবে
উপলব্ধি করে তোমার যা ইচ্ছা হয় তুমি করো। |
||
|
৬৪ |
যেহেতু
তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই সমস্ত রহস্যের সেরা রহস্যতত্ত্বের পরম ব্যাখ্যা
আমি আরো একবার বলছি, শোন। এই তত্ত্ব তোমার পক্ষে একান্ত মঙ্গলকর। |
||
|
৬৫ |
আমাতে
তোমার মন সংযুক্ত করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো। যেহেতু
তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই আমি তোমার কাছে সত্য প্রতিজ্ঞা করছি, আমাকে তুমি
এই স্বরূপেই লাভ করবে। |
||
|
৬৬ |
সমস্ত
ধর্ম ও অধর্ম ত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার শরণাগত হও। অনুতাপ ক’রো না, কারণ আমিই
তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে বিমুক্ত করব। |
||
|
৬৭ |
এই
শাস্ত্রতত্ত্ব তপস্যাহীন কোন ব্যক্তিকে কখনোই তোমার বলা উচিৎ নয়। যার অন্তরে
ভক্তি নেই, যে শাস্ত্র কিংবা গুরুর উপদেশ শুনতে চায় না, যে আমাকে ঈশ্বর না জেনে,
সাধারণ মানুষ মনে করে ঈর্ষা করে, তাদেরকেও বলবে না। |
||
|
৬৮ |
যিনি এই
পরম গোপন তত্ত্ব আমার একান্ত ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করবেন, কোন সন্দেহ নেই, তিনি
আমার প্রতি পরম ভক্তিতে আমাকেই লাভ করবেন। |
||
|
৬৯ |
এই জগতে
সমস্ত মানুষের মধ্যে, তাঁর থেকে বেশী প্রিয় আমার আর কেউ নেই এবং ভবিষ্যতেও অন্য
আর কেউ হবে না। |
||
|
৭০ |
এবং যিনি
আমাদের দুজনের এই ধর্মতত্ত্ব আলোচনা নিষ্ঠা নিয়ে পাঠ করবেন, আমি নিশ্চিত বলছি,
তাঁর সেই জ্ঞানযজ্ঞে আমিই পূজিত হবো। |
||
|
৭১ |
যে
ব্যক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে ও পূর্ণ বিশ্বাসে এই ধর্মতত্ত্ব শুনবেন, সম্যক উপলব্ধি
না হলেও তিনি পাপমুক্ত হয়ে, পুণ্যবান ব্যক্তি্র মত পুণ্যলোক লাভ করবেন। |
||
|
৭২ |
হে পার্থ,
তুমি কি একনিষ্ঠ চিত্তে এই ধর্মশাস্ত্র শুনেছ? অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন মোহ বন্ধন
থেকে, হে ধনঞ্জয়, তুমি মুক্ত হতে পারলে কি? |
||
|
৭৩ |
অর্জুন
বললেন – হে অচ্যুত কৃষ্ণ, তোমার প্রসাদে আমার মোহ দূর হয়েছে, আত্মতত্ত্বের
স্মৃতি লাভ করেছি, আর আমি নিঃসংশয় হয়েছি; এখন আমি তোমার উপদেশই পালন করব। |
||
|
৭৪ |
সঞ্জয়
বললেন – আমি মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত রোমাঞ্চকর তত্ত্বের আলাপ
শুনলাম। |
||
|
৭৫ |
আমি
মহর্ষি ব্যাসের অনুগ্রহে দিব্য দৃষ্টিতে ও দিব্য শ্রবণে এই অত্যন্ত গোপন
পরমজ্ঞানের পরমতত্ত্ব প্রত্যক্ষ শুনলাম, যার বক্তা স্বয়ং যোগেশ্বর কৃষ্ণ! |
||
|
৭৬ |
হে
মহারাজ, ভগবান কেশব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত পবিত্র তত্ত্ব আলোচনার কথা, আমার বার
বার মনে পড়ছে এবং প্রতিক্ষণে আমি পরম আনন্দ অনুভব করছি। |
||
|
৭৭ |
হে
মহারাজ, ভগবান শ্রীহরির সেই অত্যন্ত অদ্ভূত বিশ্বরূপের কথা আমার বার বার মনে
পড়ছে, চরম বিস্ময়ের আনন্দে আমি বার বার শিহরিত হচ্ছি। |
||
|
৭৮ |
যে পক্ষে
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ও পরমভক্ত পার্থ রয়েছেন, সেই পক্ষেই
রাজ্যলক্ষ্মী, বিজয়, উন্নতি ও ধর্মনীতিও অবিচল থাকবেন – এ আমার নিশ্চিত
অভিমত। |
মোক্ষযোগ সমাপ্ত
ওঁ তৎ সৎ
গীতা সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন