বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৮

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের সপ্তম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

অষ্টম পর্বাংশ 


৪.৪.৯ সামাজিক পরিস্থিতি

বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সমাজের শাস্ত্রীয় মতে যদিও মূলমন্ত্র ছিল অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগ, কিন্তু বাস্তব সমাজে তার প্রচলন ছিল বলে মনে হয় না। আড়ম্বর করার মতো অর্থনৈতিক সাধ্য যাদের ছিল না, তারাই বাধ্য হয়েই অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগের মন্ত্র মেনে চলত, অর্থাৎ সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা। শাস্ত্র রচয়িতা ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণী যজ্ঞের আয়োজন করে, রাজাদের থেকে দানগ্রহণ করে প্রভূত সম্পদের অধিকারী এবং রীতিমতো বিত্তশালী হয়ে উঠতেন। তাছাড়াও ব্রাহ্মণশ্রেণি রাজকর্মচারী পদে এমনকি বাণিজ্য করেও যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে উঠতেন। অতএব, ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা পরবর্তী হিন্দু ধর্মে যে চতুর্বর্গ অর্থাৎ জীবনের চারটি লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – তাদের মধ্যে অর্থ উপার্জনেই বেশি নজর ছিল।

প্রাথমিক ব্রাহ্মণ্য সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি। কিন্তু পরবর্তী কালে অক্ষত্রিয় এবং শূদ্র রাজাদের আমলে সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের প্রভাব এবং সম্মান যথেষ্ট বেড়ে উঠেছিল। তার কারণ অবশ্য নিবিড় বৈদেশিক এবং আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য। বিশেষ করে মৌর্য আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষ যখন একই প্রশাসনিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, সেসময় বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ কারিগর ও শিল্পী এমনকি কৃষকরাও তাদের পরিশ্রম বা দক্ষতার যোগ্য মূল্য পেতে শুরু করেছিল। যার ফলে সৃষ্টি হল দক্ষ শূদ্র কারিগরদের বিভিন্ন জাতি। যেমন, স্বর্ণকার, মণিকার, তন্তুকার, তৈলকার, কর্মকার, সূত্রধর, স্থপতি, ভাস্কর, এমন বহু জাতি। গোপ ও আহির - যারা গোপালন করত এবং দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত দ্রব্যের বাণিজ্য করত। সম্পন্ন কৃষিজীবিরা আগেই বৈশ্য ছিলেন এখন তাঁদের মধ্যেও নানান বিশেষজ্ঞ (Specialist) জাতির উদ্ভব হল, যেমন যাঁরা রেশমের গুটি কিংবা সুপুরি বা পানের চাষ করতেন। এই চাষের উৎপাদন ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক (cash crop)সমাজে আরেকটি জাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন – তাঁরা হলেন নাপিত। হিন্দু সমাজের নানান অনুষ্ঠানে নাপিতের গুরুত্ব তখন এবং আজও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

মৌর্যদের সময় থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের কাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সেই বাণিজ্যের ফলে, দেশে প্রভূত সম্পদের আমদানি হচ্ছিল, রাজ্য এবং সাম্রাজ্যগুলির রাজস্ব আয়ের বড়ো অংশ আসত এই বাণিজ্য থেকে। আগেই বলেছি, এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত বণিক সম্প্রদায় এবং শ্রেষ্ঠী সমিতিগুলি। রাজ্যের রাজনীতি এবং প্রশাসনেও তাঁদের প্রভাব কিছু কম ছিল না। অতএব তাঁদের বর্ণ বৈশ্য হলেও, সামাজিক অবস্থানে তাঁরা ক্ষত্রিয়ের সমতুল্যই হয়ে উঠলেন।

অতএব চতুর্বর্ণের একমাত্রিক বর্ণের সমাজ এখন হয়ে উঠল বহুমাত্রিক জটিল সামাজিক বিন্যাস। এর সঙ্গে মানানসই করে সামাজিক বিধি-বিধানেও অনেক আপোষ করতে হল, নতুন নিয়ম বানিয়ে তুলতে হল বারবার।

সমাজে মহিলাদের অবস্থান সম্পর্কে খুব প্রত্যক্ষ আভাস তেমন পাওয়া যায় না। যদিও ব্রাহ্মণ্যধর্মে বা স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, মহিলারা সর্বদাই পুরুষ-নির্ভর। বাল্যাবস্থা পর্যন্ত তাঁরা পিতার অধীন, বিবাহের পর স্বামীর এবং বার্ধক্যে তাঁদের পুত্রের অধীন থাকতে হবে। তবে মহিলারা অন্তঃপুরবাসিনী পর্দানশীন ছিলেন এমনও মনে হয় না। নানান সাহিত্যে, চিত্রকলায় মহিলাদের যে বর্ণনা বা চিত্র পাওয়া যায়, আচরণে বা জীবনযাত্রায় তাঁরা হয়তো মোটামুটি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। বহু উচ্চবংশীয় মহিলাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দিয়েছিলেন, একথা আমরা আগেই দেখেছি। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলনও ছিল বোঝা যায়। অনেক উচ্চশিক্ষিতা ব্রাহ্মণ্য মহিলাদেরও নাম পাওয়া যায়, তার মধ্যে বৃহদারণ্যক উপনিষদের “গার্গী”ই হয়তো ছিলেন অন্যতমা। তিনি ঋষি গর্গবংশীয়া, তাঁর পিতার নাম বাচক্‌নু। ব্রহ্ম প্রসঙ্গে তাঁর ও যাজ্ঞবল্ক্যের তর্কের ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহদারণ্যকের তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতি থেকে দেখে নেওয়া যাক, -

তারপর গার্গী, বচক্‌নুর কন্যা, জিজ্ঞাসা করলেন, “যাজ্ঞবল্ক্য, জগতের সবকিছুই যদি জলের সঙ্গে ওতপ্রোত[1] জড়িত থাকে, তাহলে জল কার সঙ্গে জড়িত?”

বায়ুর সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বায়ু কার সঙ্গে জড়িত?”         আকাশের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে আকাশ কার সঙ্গে জড়িত?”       গন্ধর্বলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু গন্ধর্বদের জগত কার সঙ্গে জড়িত?” “সূর্যের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে সূর্য কার সঙ্গে জড়িত?”          চন্দ্রের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু চন্দ্র কার সঙ্গে জড়িত?”            নক্ষত্রদের সঙ্গে, গার্গি”।

নক্ষত্ররা কার সঙ্গে জড়িত?”             দেবলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে দেবলোক কার সঙ্গে জড়িত?”     ইন্দ্রলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

ইন্দ্রলোক কার সঙ্গে জড়িত?”            বিরাজলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বিরাজলোক কার সঙ্গে জড়িত?”   হিরণ্যগর্ভলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

হিরণ্যগর্ভলোক তাহলে কার সঙ্গে জড়িত?”

যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “আর না, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না, যাতে তোমার মাথা দেহচ্যুত হয়। তুমি এমন এক দেবতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছ, যাঁর বিষয়ে কোন প্রশ্ন চলতে পারে না। অতএব, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না”। এই কথা শুনে বচক্‌নু-কন্যা গার্গী চুপ করে গেলেন”। (স্বামী মাধবানন্দ কৃত বৃহদারণ্যক উপনিষদের ইংরিজি অনুবাদ থেকে – বাংলা অনুবাদ লেখক।)

হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মের আরেক নাম। জগতের যাবতীয় বিষয়ের আদি হলেন ব্রহ্ম, কিন্তু তিনি নিজে অনাদি ও অনন্ত, অতএব তাঁর আগে এবং পরে আর কিছুই নেই, কোন প্রশ্নও নেই, কোন উত্তরও নেই। এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের রাজসভায়। এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্য নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞ বলে দাবি করেছিলেন, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাবড় তাবড় বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে জরৎকারু বংশের আর্তভাগ, লাহ্যায়নি ভুজ্যু, উষস্ত, কহোল কৌষীতকেয়, গার্গী, উদ্দালক আরুণি, বাচরুবী এবং আরও অনেকে। সেই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা জনক, যিনি নিজেও ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞ এবং রাজর্ষি। ভারতের বৈদিক রাজাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ব্রহ্মজ্ঞ রাজার মধ্যে রাজা জনক ছিলেন অন্যতম। এই রাজা জনকই সীতাদেবীর পালকপিতা এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশুর।

এই সভায় গার্গী কি অব্যয়, অনির্বচনীয়, অপ্রশ্ননীয় ব্রহ্মতত্ত্বকে খোঁচা দেওয়ার জন্যেই শেষ প্রশ্নটি রেখেছিলেন?  কারণ রাজর্ষি জনকের নক্ষত্র সভায় আমন্ত্রিত একজন ব্রহ্মজ্ঞ বিদূষী হয়ে - ব্রহ্মের পরে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না - এ তত্ত্ব তাঁর অজানা থাকার তো কথা নয়! উত্তরে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সাধারণ ভাবে বলতেই পারতেন, ব্রহ্মের পরে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে না। তা না বলে “মাথা দেহচ্যুত” হওয়ার (নাকি করার?) ধমক দিতে হল কেন? তিনি কি বিদূষী গার্গীর প্রশ্নে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতি সন্দেহের আভাস পেয়েই এমন কঠোর উত্তরে, প্রকাশ্য সভায় সম্ভাব্য সকল বিরোধী প্রশ্নকে সমূলে বিনাশ করলেন? কে জানে?  

মহিলাদের প্রচুর দানের স্বীকৃতি পাওয়া যায় বৌদ্ধ শাস্ত্র থেকে। সাঁচী, ভারহুতের শিলালিপিতে অনেক মহিলার দানের কথা লেখা আছে। তবে মহিলারা এই অর্থ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তাঁদের নিজস্ব আয়, নাকি পৈতৃক বা স্বামীর সম্পত্তি ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্রাট অশোকের পত্নী কারুবাকীও বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়েছেন এবং প্রচুর দান করেছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি।

৪.৪.১০ শিল্প-দক্ষতা                          

৪.৪.১০.১ পাথরের স্তম্ভ

সম্রাট অশোকের স্তম্ভ-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার এই স্তম্ভগুলির বিশেষত্ব নিয়ে দুচার কথা বলা প্রয়োজন। এই স্তম্ভের পাথরগুলির অধিকাংশই বেনারস থেকে প্রায় চল্লিশ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমের চুনার অঞ্চল থেকে, কিছু মথুরা অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় তিরিশটি স্তম্ভ বা তার ধ্বংসাবশেষ এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অতএব চুনার কিংবা মথুরা থেকে এই পাথরগুলি, উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি নেপালের তরাই অঞ্চলেও বহন করে নিয়ে যাওয়া, আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয়। কারণ, স্তম্ভের পাথরগুলিতে কোন জোড় (joint) ছিল না, দৈর্ঘে প্রায় চল্লিশ ফুট (প্রায় বারো মিটার) মনোলিথিক (monolithic) পাথর। প্রত্যেকটির ওজন প্রায় পঞ্চাশ টন। কোন হাইওয়ে ছিল না, বারো বা ষোল চাকার লো-বেড (Low bed) ট্রেলার ছিল না, ক্রেনও ছিল না। তবুও এই পাথরগুলি কয়েকশ কিলোমিটার বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলদ বা মোষে টানা গাড়িতে – অসমান পাথর কিংবা ইঁট বিছানো রাস্তা দিয়ে। সেতু ছাড়াই পার করতে হয়েছিল বেশ কিছু বড়ো এবং ছোট ছোট অজস্র নদী! তারপরেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে, ভারি এই পাথরগুলিকে স্থাপনা (erection) করা হয়েছিল নিখুঁত। এই কারিগরি দক্ষতা মিশরের পিরামিড বানানোর থেকে খুব কম কী?

 

৪.৪.১০.২ লৌহ স্তম্ভ

দিল্লির কাছেই মেহেরোলিতে কুতুব মিনারের সামনে একটি লৌহ স্তম্ভ স্থাপনা করিয়েছিলেন, খুব সম্ভবতঃ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য। এর কথাও আগেই বলেছি। এই স্তম্ভটি শিল্পের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য না হলেও, কারগরি দক্ষতায় অবশ্যই অনন্য। এটির উচ্চতা প্রায় তেইশ ফুট (প্রায় সাত মিটার) এবং এটির মধ্যেও কোন জোড় নেই। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রায় ষোলশ বছরের রোদ-বৃষ্টি উপভোগ করে এই লোহার স্তম্ভ আজও অটুট দাঁড়িয়ে আছে এবং তার গায়ে জং বা মর্চের (rust) চিহ্নমাত্র নেই! এমন নয় যে ভারতীয় কারিগররা তখন স্টেনলেস স্টিল বানানো আবিষ্কার করে ফেলেছিল। কিন্তু প্রায় একশভাগ বিশুদ্ধ লোহা বানানোর দক্ষতা যে তাঁরা অর্জন করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আধুনিক লৌহ শিল্পে যাঁরা আছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, লৌহ-আকর (iron ore) থেকে বিশুদ্ধ লোহা বানাতে কতখানি দক্ষতা এবং কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

 

৪.৪.১১ স্থাপত্য

আগেই বলেছি হরপ্পা সভ্যতা এবং মৌর্যযুগের মধ্যে ভারতবর্ষে উল্লেখযোগ্য কোন স্থাপত্য নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সে রাজা যুধিষ্ঠিরের চোখ ধাঁধানো ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাসাদ হোক, কিংবা শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যার প্রাসাদ বা লঙ্কেশ্বর রাবণের প্রাসাদ এবং তাঁর স্বর্ণপুরীই হোক। পরবর্তীকালে এই ধরনের বর্ণময় প্রাসাদগুলির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেলে, ভারতের ইতিহাস হয়তো আরেকটু ঋদ্ধ হবে।

 

৪.৪.১১.১ স্তূপ

আদিম যুগ থেকেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃতদেহ সমাধি দেওয়া হত। সম্ভবতঃ অনার্যদের মধ্যে মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার প্রচলন ছিল, এবং মৃতদেহ দাহ-সংস্কারের প্রচলন শুরু হয়েছিল আর্য সমাজে।  এই সমাধিগুলি মাটি দিয়ে ছোট আকারের অর্ধ-গোলকাকৃতি ঢিবি[2] বা স্তূপের মত বানানো হত। পরবর্তীকালে সমাধির পাশে পাথরের বড় ফলক (Menhir) খাড়া করে রাখা হত মৃতের স্মৃতির ও তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার উদ্দেশে। বৌদ্ধরা সম্ভবতঃ প্রাচীন ভারতের এই রীতিটাই গ্রহণ করেছিলেন, তবে অনেক শিল্পসম্মতভাবে। ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম অনেকগুলি রাজ্যই নিয়ে গিয়েছিল, এবং সকলেই তাঁদের রাজ্যে স্তূপ বানিয়েছিল। সেই স্তূপগুলির অস্তিত্ব এখন আর নেই এবং পরবর্তী কালে ভগবান বুদ্ধের অস্থি বৃহত্তর স্তূপগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

সম্রাট অশোকের সময়ে বানিয়ে তোলা সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং কৃষ্ণা উপত্যকার অমরাবতীর স্তূপগুলিকে পরবর্তী কালে অনেক বড়ো করে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। মোটামুটি ২০০ বি.সি.ই-তে সাঁচীস্তূপ, অশোকের স্তূপের আকারের প্রায় দ্বিগুণ করে বানানো হয়েছিল। স্তূপের অর্ধগোলকের ব্যাস প্রায় একশ কুড়ি ফিট। এই স্তূপের চারদিকে পুরোনো কাঠের রেলিং সরিয়ে পাথরের রেলিং বানানো হয়েছিল, যার উচ্চতা প্রায় ন ফিট। পাথরের গায়ের অলংকরণে বুদ্ধের জীবনের নানান ঘটনা ও সমসাময়িক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনেক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তারও পরে মোটামুটি ১০০ বি.সি.ই-তে বানিয়ে তোলা হয়েছিল সাঁচীস্তূপের চার দিকের চারটি তোরণ দ্বার। পাথরে বানানো দ্বারগুলি সারা বিশ্বেই বিখ্যাত, তাদের অদ্ভূত সুন্দর অলংকরণ এবং পাথরে খোদিত অনবদ্য চিত্রগুলির জন্য। পাথরের কাজে ভারতীয় ভাস্করদের দক্ষতা এবং সূক্ষ্ম শিল্পবোধের সূচনা হয়তো এই সময় থেকেই। একই কথা প্রযোজ্য মোটামুটি একই সময়ে অনেক বড়ো করে বানানো ভারহুত স্তূপের ক্ষেত্রেও। অমরাবতী স্তূপ ২০০-৩০০ সি.ই.তে সম্পূর্ণ হয়েছিল, এই স্তূপের আকার সাঁচি স্তূপের থেকেও বড়ো এবং আরও বিশদে অলংকৃত। সারনাথের প্রথম বানানো স্তূপের ওপর বারবার নির্মাণ হয়ে, শেষ নির্মাণ হয়েছিল গুপ্তদের সময়ে। অন্যগুলির তুলনায়, এই স্তূপের উচ্চতা অনেক বেশি, এবং নিচের অর্ধগোলক ডোমের (dome) ওপরে একটি বেলনাকার (cylindrical) ডোম এই স্তূপের বিশেষত্ব।

চলবে...



[1] ওতপ্রোত শব্দের অর্থ সমস্ত দিক দিয়েই পরষ্পর জড়িয়ে থাকা। যে কোন বস্ত্রের প্রত্যেকটি সুতো অন্য প্রত্যেকটি সুতোর সঙ্গে যেমন ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে, তেমনই পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমের সঙ্গে জগতের যাবতীয় বস্তু ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে।

[2] ঢিবি” শব্দটি অবশ্যই অনার্য শব্দ। বাংলার রাঢ় অঞ্চলের পরিত্যক্ত জনপদের ধ্বংসস্তূপের প্রচলিত নাম “পাণ্ডুরাজার ঢিবি”। এই শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ স্তূপ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৮

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...