ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "
ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "
ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "
ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "
আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "
এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "
এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৩ "
চতুর্থ পর্ব
সুলতানি আমলের মুদ্রা
পৃথিবীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, আরবদেশে
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের আবির্ভাব। তাঁর জন্ম মোটামুটি ৫৭০ সি.ই.-তে
এবং ৬১৩ সি.ই. থেকে তিনি একেশ্বরবাদী ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করেছিলেন। ৬৩২
সি.ই.-তে তিনি যখন দেহরক্ষা করলেন, আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ
মানুষই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গিয়েছিলেন। এই নতুন ধর্ম প্রচারের উদ্দীপনা এবং উদ্দাম
আগ্রাসী উদ্যোগে ইসলাম ধর্মী আরবের মানুষরা দিকে দিকে তাঁদের প্রাধান্য বিস্তার
করতে শুরু করলেন।
প্রথমেই তাঁরা পারস্য সাম্রাজ্য জয় করলেন। প্রায় চার
শতাব্দী (২২৪-৬৫১ সি.ই.) ধরে প্রচণ্ড শক্তিশালী রোমান এবং বাইজ্যান্টাইন
সাম্রাজ্যের পাশাপাশি সগৌরবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল বিশাল পারস্য
সাম্রাজ্য – ইতিহাসে যার নাম সাসানিড (Sassanid) বা সাসানিয়ান (Sasanian
Empire) সাম্রাজ্য। ৬৫১ সি.ই.-তে সেই সাম্রাজ্যের পতন ঘটাল আরবের
দুর্ধর্ষ ইসলামী সৈন্যরা।
ইসলামি সৈন্যরা ৭১২ সি.ই.-তে অধিকার করে নিল ভারতীয়
উপমহাদেশের পশ্চিমতম প্রান্ত – আফগানিস্তান, বালুচিস্তান ও সিন্ধ অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলি
খলিফার অধীনে থাকা আরবের প্রদেশ (province) হিসাবেই গণ্য
করা হত এবং এই প্রদেশগুলির শাসনকর্তা ছিল ইসলামি প্রশাসক (governor)। এইভাবেই শুরু হল ভারতে ইসলামি রাজত্বের পথচলা। যদিও নবম
শতাব্দীর মাঝামাঝি আরবের খলিফার অধীনতা ছেড়ে, এই প্রশাসকরা স্বাধীন সুলতান হয়ে উঠেছিল।
৭১২ সি.ই.তে সিন্ধ অঞ্চল অধিকার করলেও তুর্কিদের হাত ধরে দিল্লীর
সুলতানী আমল শুরু হল আরো ছশ বছর পরে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। দিল্লিকে রাজধানী করে
ভারতবর্ষে শুরু হল সুলতানী আমল। চালু হল নতুন শাসন প্রণালী, নতুন ধরনের সমাজ
ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের বাণিজ্য ও অর্থনীতি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এসে গেল নতুন
শাসকের প্রচলন করা নতুন ধরনের মুদ্রাব্যবস্থাও। এই সুলতানি আমলের সময় কাল মোটামুটি
১২০৬ থেকে ১৫২৬ সি.ই.।
সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার হাজার
বছর ধরে প্রচলিত নানান সংকেত, চিত্র ও লিপি সম্বলিত ভারতীয় মুদ্রাগুলির পরিবর্তে
এসে গেল শুধুমাত্র আরবি ক্যালিগ্রাফি মুদ্রিত নতুন মুদ্রা। কারণ ইসলাম ধর্ম
একেশ্বরবাদী এবং সে ধর্মে কোনরকম চিত্র অঙ্কন হারাম – অর্থাৎ বিষবৎ পরিত্যাজ্য।
অবশ্য সোনা বা রূপোর মুদ্রার নাম আগের মতো ‘টংক’ই রইল, কম মূল্যের
যেমন তামা বা আরও নিরেস ধাতু-মুদ্রার নাম হল ‘জিত্তল’। সুলতানী আমলে সোনা ও রূপোর
দামের অনুপাত ছিল মোটামুটি ১:১০ অর্থাৎ
সম-ওজনের একটি সোনার মুদ্রার মূল্যমান প্রায় দশটি রূপোর মুদ্রার সমান। খিলজি শাসকরা
প্রচুর মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। এবং সেই মুদ্রাগুলিতে প্রায়শঃ সুলতানদের গালভরা
উপাধির বর্ণনা থাকত, যেমন ‘সিকান্দার -আল-সানি’ যার আক্ষরিক অর্থ “দ্বিতীয় আলেক্সাণ্ডার”।
অথবা দিল্লির টাঁকশালের নাম ছিল - ‘হযরত-দার-আল-খিলাফত’ – যার অর্থ হল খলিফা
সাম্রাজ্যের শাসনকেন্দ্র। প্রসঙ্গতঃ মহানবী হযরত মোহাম্মদের উত্তরাধিকারী আরবি মুসলিম
উম্মাহদের শাসনকর্তাদের “খলিফা” বলা হত। মুসলিম উম্মাহ মানে সমগ্র মুসলিম
জনগোষ্ঠী।
[দিল্লির এই সুলতানদের সঙ্গে আধুনিক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়
মনোভাবের আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সুলতানরাও নিজেদের “খলিফা” বা সমগ্র মুসলিম
জনগোষ্ঠীর শাসনকর্তা ভাবতেন, আজ পাকিস্তানও তাই ভাবে।]
গিয়াসু-উ-দিন বলবনের (১২৬৬ – ১২৮৭ সি.ই.) মুদ্রা।
প্রায় সমসাময়িক
কালে বিশ্বে প্রথম কাগজের টাকার ধারণা ও প্রচলন করেছিল চিন। এই প্রসঙ্গে পরের
পর্বে আলোচনা করব। চিনের এই উদ্যোগের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি
হয়েছিল। চিনের সেই উদ্যোগের অনুপ্রেরণায় মহম্মদ বিন তুঘলক দ্বিতীয়বার নতুন পরীক্ষায়
উৎসাহী হলেন। তিনি ১৩২৯ - ১৩৩২ সি.ই.-তে জিমেদারি বা ন্যাসরক্ষা (fiduciary) পদ্ধতিতে
মুদ্রা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালেন। তিনি কাঁসা (brass) এবং তামার ছোট ছোট ধাতুফলকের প্রচলন করলেন। এই ফলকগুলিতে লেখা
হল – “পঞ্চাশ টংকার মান অনুযায়ী চিহ্নিত”। এর সঙ্গে আরও একটি আবেদন লিখে দেওয়া হল –
“যে সুলতানকে মান্য করে, সে করুণাময়(রসুল)-কেই সম্মান করে”। কিন্তু এই আবেদন
সত্ত্বেও ব্যাপক জালিয়াতির কারণে এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়েছিল এবং বিন
তুঘলক সমস্ত ধাতুফলক – আসল এবং নকল নির্বিশেষে – বাজার থেকে তুলে নিয়ে, প্রাপকদের সমস্ত
টাকা ফেরত দিয়েছিলেন।
মহম্মদ বিন তুঘলকের স্বর্ণমুদ্রা।
বিলন সংকর ধাতু
সম্বন্ধে দু চার কথা এখানে বলে রাখি। যে কোন ধাতুমুদ্রা – সে স্বর্ণমুদ্রা হোক বা
রূপোর – ১০০% খাঁটি সোনা বা রূপো দিয়ে বানানো হত না। কারণ সোনা বা রূপো নিত্য
ব্যবহারের জন্যে মোটেই কঠিন ধাতু নয় – সহজেই ক্ষয়ে যায়। অতএব চিরদিনই সোনা বা
রূপোর সঙ্গে তামা বা কখনো কখনো সীসা মেশানো সংকর ধাতু দিয়েই মুদ্রা বানানো হত। গুপ্ত
যুগের স্বর্ণমুদ্রায় সোনার শতকরা পরিমাণ থাকত
৯০% থেকে ৮৩%। পরবর্তী কালে এই পরিমান ৭৫-৭০% পর্যন্তও হতে দেখা গেছে, এর কারণ
স্পষ্টতঃই অর্থনৈতিক।
প্রাচীন গ্রীসে –
ষষ্ঠ -পঞ্চম শতাব্দী বি.সি.ই-তে বিলন সংকর ধাতুর প্রচলন ছিল – সেখানে রূপোর
মুদ্রার ক্ষেত্রে রূপো থাকত ৪০% এবং তামা থাকত ৬০%। অর্থাৎ মূল্যবান ধাতুর তুলনায়
সস্তা ধাতুর পরিমাণ বেশি মিশিয়ে যে সংকর ধাতু বানানো হয় তাকে বিলন বলা হয়।
বর্তমান বিশ্বে
বিলন সংকর ধাতু দিয়েই মুদ্রা বানানো হয়ে থাকে – তাতে বিভিন্ন ধাতুর শতকরা অস্তিত্ব
হল – রূপো ১০%, ৭০% তামা, ১০% নিকেল এবং ১০% জিংক। অবশ্য দেশে দেশে বিভিন্ন ধাতু
এবং তার শতকরা হিসেবের সামান্য তারতম্য হতে পারে।
মূল প্রসঙ্গে
আবার ফিরে আসি। শুধু যে দিল্লির সুলতানরাই মুদ্রা বের করতেন তা কিন্তু নয়, আঞ্চলিক
সুলতান বা নবাবরাও - যেমন বাংলার সুলতান, জৌনপুরের সুলতান, দক্ষিণের বাহমনি,
মালব্যের সুলতান, গুওরাটের সুলতানরাও নিজ নিজ পরিচয়ে মুদ্রা প্রকাশ করেছিলেন।
মালব্য সুলতানের রূপোর মুদ্রা
বিজয়নগরের
মুদ্রা
দিল্লির সুলতানি
আমল এবং পরবর্তী মুঘল জমানার সমসাময়িক দক্ষিণভারতের বিজয়নগর হিন্দু সাম্রাজ্য (১৩৩৬
– ১৬৪৬ সি.ই.) তার নিজস্ব ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও গরিমা অক্ষুণ্ণ
রেখেছিল। কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণে এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা হরিহর এবং
বুক্কা। সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে তখন বিজয়নগরই ছিল এমন রাষ্ট্র যাদের মুদ্রা ব্যবস্থা,
সাম্রাজ্যের অর্থনীতির সঙ্গে সঠিক সাযুজ্যে প্রতিষ্ঠিত। বিজয়নগরে বহু ইউরোপিয় বণিকের
আসা যাওয়া ছিল - বিশেষ করে পর্তুগীজদের। রাজা কৃষ্ণদেবরায় বিদেশীদের বাণিজ্যে
উৎসাহ দিতেন এবং সেই প্রয়োজনেই বিজয়নগরের মুদ্রা ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিত্তিতে
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিজয়নগরের মুদ্রাগুলি প্রধানতঃ সোনা ও তামার হত। বিজয়নগরের
সোনার মুদ্রাগুলির সামনের দিকে একজন দেবতার চিত্র থাকত, এবং পিছনের দিকে থাকত রাজার
পরিচয়। অধিকাংশ স্বর্ণমুদ্রার দেবতা ছিলেন তিরুপতি দেব অর্থাৎ ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর –
কখনো তিনি একলা, আবার কখনো সঙ্গে থাকতেন তাঁর দুই পত্নী শ্রীদেবী ও ভূদেবী।
বিজয়নগরের মুদ্রা ব্যবস্থায় ইউরোপিয়ান বণিকরা এতটাই সন্তুষ্ট ছিল যে, তাদের অনেকগুলি সংস্থা এই মুদ্রাগুলিকে প্রায় অনুকরণ করেছিল। যাদের মধ্যে ডাচ ও ফরাসী কোম্পানিগুলির ‘Single Swami Pagodas‘ মুদ্রা আর ইংরেজদের ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মুদ্রাগুলি ‘Three Swami Pagodas’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। বলা বাহুল্য এখানে “একক স্বামী” মানে তিরুপতিদেব এবং “স্বামী ত্রয়” মানে তিরুপতিদেব ও তাঁর দুই পত্নী।
|
|
|
|
|
|
বিজয়নগরের তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রা
|
|
|
‘Three Swami Pagoda’ মুদ্রা – ইস্ট ইণ্ডিয়া
কোম্পানি।
মুঘল আমলের মুদ্রা
ভারতে মুঘল আমলের শুরু বাবরের হাত
ধরে ১৫২৬ সি.ই.-তে, দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করার
পর। আর মুঘল জমানার সমাপ্তি হয় ১৮৫৭ সি.ই.-তে ব্রিটিশদের হাতে - শেষ মুঘল শাসক বাহাদুর
শা জাফরের পরাজয় এবং বর্মাতে তাঁর (আধুনিক মায়ানমার) আমৃত্যু নির্বাসনে।
মুঘলদের মুদ্রা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হল, সাম্রাজ্যের সর্বত্র একই মুদ্রার প্রচলন এবং কঠোরভাবে মুদ্রা ব্যবস্থার
সংহতি রক্ষা করা। এই ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরেও দীর্ঘদিন টিকে ছিল। যদিও
প্রকৃতপক্ষে এই নিবিড় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোন মুঘল সম্রাট নয়,
বরং শের শা সুরি (১৫৪০ – ১৫৪৫ সি.ই.) একজন আফগান শাসক যিনি হুমায়ুনকে পরাজিত করে
পাঁচ বছরের জন্য দিল্লির মসনদে বসেছিলেন।
শের শা যে রূপোর মুদ্রা প্রচলন
করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন “রুপিয়া”- এই শব্দ থেকেই আধুনিক ভারতে কারেন্সির নাম হয়েছে রুপি (rupee)। এই রৌপ্য মুদ্রাগুলির ওজন ছিল ১৭৮ গ্রেন (১
গ্রেন = ৬৪.৭৯৯ মিলিগ্রাম, ১৭৮ গ্রেন = ১১.৫৩ গ্রাম)। ব্রিটিশ ভারতেও, বিংশ
শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত এই রুপোর মুদ্রার ওজনে কোন পরিবর্তন করা হয়নি – যদিও সেই মুদ্রায়
ব্রিটিশ রাজা বা রাণির ছবি এবং ইংরিজি লিপি থাকত।
শের শা রূপোর মুদ্রা ছাড়াও স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেছিলেন, তার নাম
দিয়েছিলেন “মোহর”, তার ওজন ছিল ১৬৯ গ্রেন = ১০.৯৫ গ্রাম। তাঁর প্রবর্তিত তামার
মুদ্রার নাম ছিল “দাম”। দশটি রুপিয়ার সমান ছিল একটি মোহরের দাম। চল্লিশটি দামের সমান
ছিল একটি রুপিয়া। অর্থাৎ মানের দিক থেকে দামের মূল্য ছিল অত্যন্ত কম।
মজার কথা হল ইংরিজির “ড্যাম”
শব্দটির উৎপত্তি নাকি এই দাম থেকে, “I don’t care a damn” ইংরিজিতে
প্রচলিত বাক্যবন্ধটি আমরা সকলেই শুনেছি। এখানে “ড্যাম”
বা “দাম” শব্দের অর্থ প্রায় মূল্যহীন। এর সঙ্গে তুলনীয় আমাদের বাংলাতেও একটি
প্রচলিত বাক্যবন্ধ “এর মূল্য আমার কাছে এক কানা-কড়িও নয়”! আরেকটি কথাও মনে রাখতে হবে, আজও আমরা জিনিষ
পত্রের দাম নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকি – “কত দাম”? “এত দাম কেন?” ইত্যাদি। এই দাম
শব্দটিও এসেছে শের শার প্রচলিত “দাম” মুদ্রা থেকে। যদিও এখন এই দাম কথার সমার্থক
শব্দ মূল্য।
মুঘল আমলে মুদ্রার গঠন এবং মুদ্রণ এর ব্যাপারে কর্মীদের দক্ষতা ছিল অত্যন্ত উন্নত। এই দক্ষতার চরম উৎকর্ষতা আসে মহান আকবরের সময়। সেই সময়ে মুদ্রায় কিছু কিছু নকশা, কিছু ফুলপাতার আলপনার সূচনা হয়েছিল। জাহাঙ্গির তাঁর প্রচলিত মুদ্রায় চিত্র, যেমন পিতা আকবরের ছবি, রাশিচক্র (Zodiac signs), ছোট ছোট কবিতা, বিচিত্র নকশা, এবং অত্যন্ত সুন্দর লিপিরও প্রচলন করেছিলেন। শাহজাহানও মুদ্রার সৌন্দর্যে কোন কার্পণ্য করেননি। কিন্তু ঔরংজেব সম্রাট হওয়ার পর মুদ্রা থেকে এই সমস্ত সৌন্দর্য বর্জন করে, মুদ্রার সামনের দিকে কলমা অর্থাৎ ইসলামি বিশ্বাসের কথা এবং পিছনের দিকে শাসকের নাম, টাঁকশালের ঠিকানা এবং মুদ্রা প্রচলনের তারিখ লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন।
| হুমায়ুনের মোহর |
| শের শা সুরির রুপিয়া |
| আকবরের মোহর |
| জাহাঙ্গীরের মোহর |
ঔরঙজেবের মোহর
গুপ্ত পরবর্তী যুগে ভারতবর্ষের অজস্র হিন্দু রাজা এবং
রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা তো অনেক দূরের কথা – পরষ্পরের
মধ্যে সর্বদাই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। যে কারণে খণ্ডখণ্ড রাজ্যগুলি হয়ে উঠেছিল
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকটাই দুর্বল। এই কূপমাণ্ডুক্যতার কারণে দেশের
বাইরে থেকে আসা বিপদগুলিকে তার চিনতেও পারেনি – বুঝতেও পারেনি। আরব কিংবা তুর্কের ইসলামি
সৈন্যরা মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে যত সহজে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যকে গ্রাস করতে
পেরেছিল, সে তুলনায় ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলকে আয়ত্তে আনতেই তাদের সময় লেগেছিল
প্রায় ছশ বছর। এটাও হয়তো ঘটত না, যদি তৎকালীন হিন্দু রাজারা কিছুটা দূরদর্শী হয়ে
এবং সাময়িকভাবে হলেও এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারতেন। নন্দবংশের যে প্রবল
রাজশক্তি দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারকে ভারত সীমান্ত থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল,
সেই ভারতকেই প্রায় বারোশ বছর নিমগ্ন থাকতে হল, ধর্মান্ধ, সতত অবিশ্বাস-নির্ভর, বাস্তব-জ্ঞানবিজ্ঞান
চর্চাহীন শাসকদলের অধীনে।
অবশেষে ১৭৫৭ সালে উপস্থিত হল আরেক বিদেশী শক্তি – ইংরেজ। তারা
বুঝতে পেরেছিল, সে সময় একদিকে সংখ্যাগুরু হিন্দু জনগণ ইসলামি শাসনের প্রতি
বীতশ্রদ্ধ এবং অন্যদিকে মুসলমান রাজ-সম্প্রদায়ও একান্তভাবে দুর্বল ও বহুধা বিভক্ত।
পরিস্থিতি বিচারে তারা ভুল করল না, হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সহায়তা
নিয়ে, ঠিক একশ বছর পর ১৮৫৭ সালে দিল্লির মসনদ থেকে মুঘলদের সরিয়ে, তারা অত্যন্ত
সহজে গ্রাস করল আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত সমগ্র ভারতভূমিকে। ভারতবর্ষ হয়ে উঠল ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যের অধীনে অত্যন্ত ধনী এবং অপরিমিত লাভজনক একটি অঙ্গরাজ্য। এই নব-বিজিত
“সোনার খনিটি”-কে শোষণ করে ধনী হয়ে উঠতে লাগল সুদূর ইউরোপের ক্ষুদ্র একটি দ্বীপরাজ্য
– যার নাম ইংল্যাণ্ড।
পরাধীন ভারতে এ হেন নতুন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রর মুদ্রা
ব্যবস্থা কেমন ছিল সে আলোচনা আসবে পরের পর্বে।
কৃতজ্ঞতাঃ
https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx
এবং Wikipedia.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন