এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
সপ্তদশ অধ্যায়ঃ শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ
|
১ |
অর্জুন বললেন- হে কৃষ্ণ, যাঁরা শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করলেও নিষ্ঠার সঙ্গে
যজ্ঞ উপাসনা করেন, তাঁদের সেই নিষ্ঠা কেমন, সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক? |
||
|
২ |
শ্রীভগবান বললেন- মানুষের স্বাভাবিক শ্রদ্ধা তিন
ধরনের, সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এই তিন শ্রদ্ধার কথা তোমাকে এখন বলছি, শোনো। |
||
|
৩ |
হে
অর্জুন, মানুষের স্বভাব সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন প্রকারের হওয়ায়, সকল মানুষের
শ্রদ্ধাও সেই অনুসারে তিন প্রকারের হয়। শ্রদ্ধাবান মানুষ, যিনি যেরূপ
শ্রদ্ধাযুক্ত, তিনি সেই রূপই হন। |
||
|
৪ |
সাত্ত্বিক
মানুষ দেবতাদের পূজা করেন, রাজসিক ব্যক্তি যক্ষ ও রাক্ষসগণকে পূজা করেন। এবং
তামসিক মানুষ ভূত, প্রেত ও অন্যান্যদের পূজা করেন। |
||
|
৫,৬ |
অশাস্ত্রবিহিতং
ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ। অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ। দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তা
কামরাগবলান্বিতাঃ।। দম্ভ-অহঙ্কার-সংযুক্তা
কাম-রাগ-বল-অন্বিতাঃ।। কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ। কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামম্ অচেতসঃ। মাঞ্চৈবান্তঃশরীরস্থং
তান্ বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্।। মাং চ এব অন্তঃশরীরস্থং তান্ বিদ্ধি
অসুরনিশ্চয়ান্।। যে দাম্ভিক
ও অহংকারী ব্যক্তিরা এবং কামনা, আসক্তি ও শক্তির মোহে আচ্ছন্ন বিবেকহীন
ব্যক্তিরা শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে এবং দেহের ভিতর আত্মস্বরূপ আমাকে অমান্য ক’রে
শাস্ত্রবিরুদ্ধ তপস্যার ভয়ানক অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে নিশ্চিতভাবে আসু্রিকবুদ্ধি
বলে জানবে। |
||
|
৭ |
এই তিন
স্বভাবের মানুষের আহার তিন প্রকারের হয়, প্রিয় বস্তুও তিন প্রকারের হয়। যজ্ঞ,
তপস্যা, দান এই সমস্তই তিন প্রকারের হয়। এই তিনের প্রভেদ তোমাকে এখন আমি বলব। |
||
|
৮ |
যে আহার
মানুষের আয়ু, উদ্যম, প্রাণশক্তি, সুস্বাস্থ্য, সুখ ও প্রীতি বৃদ্ধি করে; সরস,
স্নিগ্ধ, পুষ্টিকর ও তৃপ্তিকর সেই আহারই সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের প্রিয় আহার। |
||
৯ |
অত্যন্ত
তিক্ত ও টক, তীব্র লবণাক্ত, অতি উষ্ণ ও অত্যন্ত ঝাল, অতি শুষ্ক ও তীক্ষ্ণ
জ্বালাকর আহার দুঃখ, শোক ও অসুখের কারণ হয়, এই প্রকারের আহার রাজসিক ব্যক্তিদের
প্রিয়। |
||
১০ |
অর্ধ
সিদ্ধ, রসহীন, দুর্গন্ধময়, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও নিষিদ্ধ খাদ্য তামসিক ব্যক্তিদের
প্রিয় হয়। |
||
|
১১ |
ফলের
প্রত্যাশা না রেখে, ‘যজ্ঞ অনুষ্ঠানই একান্ত কর্তব্য’, মনে এই প্রত্যয় নিয়ে, সনিষ্ঠা
শাস্ত্রবিধি পালন করে যজ্ঞের যে অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞই সাত্ত্বিক। |
||
|
১২ |
কিন্তু
হে অর্জুন, ফলের একান্ত অভিসন্ধিতে, নিজের দম্ভপ্রকাশের জন্যে যে যজ্ঞের
অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞকে রাজসিক যজ্ঞ বলেই জানবে। |
||
|
১৩ |
শাস্ত্রের
নিয়ম না মেনে, অন্নদান না করে, মন্ত্রের উচ্চারণ ছাড়া, দক্ষিণাহীন ও শ্রদ্ধাহীন
যজ্ঞকে তামসিক যজ্ঞ বলা হয়। |
||
|
১৪ |
দেবতা,
ব্রাহ্মণ, গুরুজন ও প্রাজ্ঞগণের পূজা, চিত্তের পবিত্রতা, সরলতা, ব্রহ্মচর্য ও
অহিংসা – এইগুলিকে শারীরক বা কায়িক তপস্যা বলে। |
||
|
১৫ |
যে বাক্য
কারো মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে না, যে বাক্য সত্য, প্রিয় ও মঙ্গলকর এবং বেদ পাঠ ও
শাস্ত্র আলোচনাকে বাঙ্ময় বা বাচিক তপস্যা বলে। |
||
|
১৬ |
মনের
প্রসন্নতা, সৌম্যভাব, বাক্সংযম, আত্ম নিয়ন্ত্রণ, চিত্তের ভাবশুদ্ধি – এই সকলকে
মানসিক তপস্যা বলা হয়। |
||
|
১৭ |
ফলের
কামনা শূণ্য, একনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে, কায়িক, বাচিক ও মানসিক এই তিন
প্রকারে যে তপস্যা করেন, তাকেই সাত্ত্বিক তপস্যা বলে। |
||
|
১৮ |
প্রশংসা,
প্রতিপত্তি, পূজা ও অর্থ লাভের কামনায়, অহংকারের সঙ্গে যে তপস্যা করা হয়, তাকে
রাজসিক তপস্যা বলে, এই তপস্যা ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত। |
||
|
১৯ |
অসম্ভব
বিষয়ের কামনায় এবং অপরের ক্ষতিসাধনের জন্যে নিজের শরীরের পক্ষেও একান্ত কষ্টকর
যে তপস্যা করা হয়, তাকে তামসিক তপস্যা বলা হয়।
|
||
|
২০ |
দানের
পরিবর্তে কিছু পাবার আশা না করে, উপযুক্ত স্থানে, উপযুক্ত সময়ে এবং উপযুক্ত
পাত্রে, ‘দান করা কর্তব্য’ এই চিন্তায় যে দান করা হয়, তাকেই সাত্ত্বিক দান বলা
হয়। |
||
|
২১ |
দানের
পরিবর্তে কিছু পাবার আশায় অথবা পুণ্য ফলের প্রত্যাশায়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে দান
করা হয়, সেই দানকে রাজসিক দান বলে। |
||
|
২২ |
অযোগ্য
স্থানে, অসময়ে এবং অযোগ্য পাত্রে, দুর্ব্যবহার এবং অবজ্ঞার সঙ্গে যে দান করা হয়,
সেই দানকে তামসিক দান বলে। |
||
২৩ |
ওঁ, তৎ,
সৎ - ব্রহ্মের এই তিনটি নাম নির্দেশ করা হয়ে থাকে। এই তিন নির্দেশ অনুসরণ ক’রেই
পুরাকালে যজ্ঞের কর্তা ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের কারণ বেদ এবং যজ্ঞের ক্রিয়া স্থির করা
হয়েছে। |
||
|
২৪ |
সেই
কারণেই ‘ওঁ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে ও শাস্ত্রবিধি অনুসরণ ক’রে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ
সর্বদা যজ্ঞ, দান ও তপস্যার অনুষ্ঠান করেন। |
||
|
২৫ |
‘তৎ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে এবং কোন ফলের
প্রত্যাশা না ক’রে, পরম মুক্তি লাভের জন্য জ্ঞানীব্যক্তিগণ নানান যজ্ঞ অনুষ্ঠান,
দান ও তপস্যা করেন। |
||
|
২৬ |
হে
পার্থ, ‘সৎ’ এই শব্দ দিয়ে অস্তিত্ব ও সাধুতা বোঝানো হয়। আবার যে কোন মঙ্গলকর শুভ
কর্মেও এই ‘সৎ’ শব্দ প্রয়োগ করা যায়। |
||
|
২৭ |
যজ্ঞ,
তপস্যা এবং দানে যে পরম নিষ্ঠা তাকেও ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে, ‘তৎ’ অর্থাৎ পরমেশ্বরে
নিবেদিত সমস্ত কর্মকেই ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে। |
||
|
২৮ |
হে
পার্থ, যজ্ঞ, দান, তপস্যা কিংবা যে কোন কর্ম, অশ্রদ্ধায় অনুষ্ঠিত হলে, তাকে অসৎ
বলা হয়ে থাকে। এই সমস্ত কর্ম থেকে না পরলোকে কোন ফললাভ হয়, না ইহলোকে। |
শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ সমাপ্ত
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন