শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বুলেট রিকশ

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

এর আগের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "


এক

 

জামা কাপড় ছেড়ে আবার শুয়ে পড়বো ভাবছিলাম। বাইরে থেকে ডাক এল, “ছোড়দা, ও ছোড়দা”। গলা শুনেই বুঝলাম, বাদলদা, আমাদের খুবই পরিচিত রিকশওয়ালা। বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম, পৌনে দুটোর সময় আসতে, দুটো দশের ট্রেনটা ধরতেই হবে। ওটা ধরতে পারলে কলকাতায় সকাল ছটা নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যায়, তার পরে গেলে, আমার কাজ হবে না, কলকাতা যাওয়ার কোন মানেই থাকবে না। আর হতভাগা এল দেখ, এখন বাজছে দুটো পাঁচ। বাদলদার জন্যে আমিই বা হা পিত্যেশ করে বসে ছিলাম, কেন? পাড়ায় আর কী রিকশ নেই? আছে বৈকি, বিস্তর আছে, কিন্তু রাত দুটোর সময় কাকে পাবো? কে আসবে? সেইজন্যেই বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম। বাদলদা এমন করে না, এবারেই এত দেরি করে ফেলল।

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললাম, “এত দেরি করে এলে? ট্রেন কী আমার জন্যে ওয়েট করবে নাকি? আর এখন গিয়ে লাভ নেই, বাদলদা”।

“তুমি বেরিয়ে এসো তোট্রেন আমাদের ছেড়ে কোথায় যায় একবার দেখি”!

“হাতে পাঁচমিনিট সময়, বাদলদা। মানছি এখন রাত, রাস্তাঘাট ফাঁকা তাহলেও কুড়ি মিনিটের রাস্তা পাঁচমিনিটে পৌঁছে দেবে? কী যে বলো না”!

“অযথা বকবক না করে বেরিয়ে এসো দিকি, চেষ্টা করে দেখতে ক্ষেতি আছে?”

তা নেই। আমি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রিকশয় চেপে পড়লাম। দরজায় দাঁড়িয়ে মা বললেন দুগ্‌গা দুগ্‌গা, আর বাবা হাত নাড়লেন। দেখা যাক কী আছে কপালে!

 

ফাঁকা রাস্তায় ভয়ংকর স্পিডে চালিয়েও ট্রেনটা ধরা গেল না। প্রত্যেকবারই ট্রেন আসার শিডিউল্‌ড্ টাইমের আগে এসে দেখেছি, ট্রেনটা প্রায়ই দশ-পনের মিনিট লেট করে! আজ আমিই লেট কী না, তাই আজ ট্রেন লেট করেনি! বাদলদা জিগ্যেস করল, “কী করবে, বাড়ি ফিরে যাবে? নাকি স্টেশনে ওয়েট করে, পরের ট্রেনে যাবে?”

“পরের ট্রেন তো প্রায় আড়াই ঘন্টা পরে। তার ওপর ওটা সব স্টেশনে দাঁড়ায়, এটার মতো গ্যালপিং নয়। কলকাতা পৌঁছোতে দশটা-সাড়ে দশটা বেজে যাবে। অতো দেরি হলে, আজ আমার কলকাতার কাজটাই হবে না। নাঃ, আজকের দিনটাই বরবাদ গেল। চলো, বাড়ি ফিরে যাই, কাল আবার চেষ্টা করবো। আজকের মতো কালও আবার ডুবিও না, বাদলদা, খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।”

বাদলদা আমার কথায় বেশ লজ্জা পেল, মাথা নিচু করে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি রিকশয় বসো দেখি, একটা কোন উপায় ঠিক বের করে ফেলবো।” আমি চটপট রিকশয় উঠে পড়লাম, যা হয়ে গেছে তার জন্যে অনুতাপ করে তো লাভ নেই। বরং ঘরে ফিরে বকেয়া ঘুমটা মিটিয়ে নিলে হয়। আমি উঠে পড়তে বাদলদা রিকশ চালু করল, কিন্তু বাড়ির দিকে নয় উল্টোদিকে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, “এ কী, ওদিকে কোথায় চললে?” বাদলদার রিকশ তখন হাওয়ার বেগে ছুটছে।

“বকবক করে মাথা খারাপ করো না দেখি। সিটবেল্ট বেঁধে চুপটি করে বসো। একটু ঘুমিয়েও নিতে পারো নিশ্চিন্তে। আমাকে আমার মতো চালাতে দাও” রিকশয় সিটবেল্ট! বাদলদার মাথাটা গেছে। তবে রিকশটা চালাচ্ছে খাসা। এত স্পিডে চালাচ্ছে, কিন্তু এতটুকু ঝাঁকুনি নেইদুকানে হাওয়ার শোঁশোঁ ঝাপটা, হাওয়ার দাপটে ঠিকমতো তাকানো যাচ্ছে না। এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের দরজা দিয়ে মুখ বাড়ালে যেমন হয়। কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। যতোই হোক সাইকেল রিকশ, যা স্পিডে চলছে, ছিটকে পড়লে আর দেখতে হবে না! ঘুটঘুটে অন্ধকারে সিটের ডানপাশে হাতড়ে সত্যিই সিটবেল্টটা পেয়ে গেলাম, টেনে নিয়ে লক করে দিলাম, বাঁদিকের পিঠের কাছে। বেশ টাইট, পোক্ত বেল্ট। কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মতো, ল্যাতপেতে পৈতের মতো নয়। বেল্টটা এঁটে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। 

আমাদের শহর ছাড়িয়ে কতদূরে চলে এসেছি কে জানে? দুপাশেই অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। রাস্তার দুপাশে ধানজমি। দিনের বেলা হলে চোখজুড়োনো সবুজ চোখে পড়ে, এখন এই রাত আড়াইটের সময়, কে আর আমার জন্যে মাঠের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে রাখবে! আর চলন্ত গাড়ি থেকে, সে ট্রেনই হোক বা রিকশ, দুপাশে কিছুই দেখা না গেলে, আমার খুব ঘুম পায়। কানের মধ্যে বোঁ বোঁ হাওয়ার প্রবল ঝাপটার মধ্যেও আমার চোখ বুজে এল।

চোখ বুজলেও ঘুমুইনি। একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল। এতো হাওয়ার মধ্যে ঘুম আসে নাকি? তন্দ্রা কেটে গেল, ট্রেনের আওয়াজে! আজকাল ট্রেন আর কুউউউ করে না,  ভোঁওঁওঁওঁ আওয়াজ করে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম, বিশাল একটা কেন্নো যেন দৌড়ে চলেছে অন্ধকার মাঠের মধ্যে দিয়ে। তার মাথায় আলো, সারা গায়ে আলোর চৌখুপি। হেডলাইট আর ট্রেনের জানালাগুলো। কিন্তু ট্রেনটা আমাদের থেকে অনেকটা নিচে দিয়ে দৌড়োচ্ছে! আমরা কী কোন পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি? এই রাস্তা দিয়ে বাসে এবং ওই লাইনের ট্রেনে বহুবার যাতায়াত করেছি, কিন্তু এদিকে কোনো পাহাড় আছে কোনদিন চোখেও পড়েনি!  কী মনে হতে ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিচে তাকালাম, আর শিউরে উঠলাম ভয়ে। হাতপা অবশ হয়ে এল। সিট বেল্ট বাঁধা ছিল, তা না হলে টুপ করে খসে পড়তাম, কালবোশেখীর ঝড়ে, ঝরে পড়া কচি আমের মতো! কী দেখলাম? দেখলাম, আমাদের থেকে অনেকটা নিচে কালো ফিঁতের মতো রাস্তা, আর রাস্তা দিয়ে লাইন দিয়ে হেডলাইট আর টেললাইট জ্বালিয়ে দৌড়ে চলেছে লরি, আর কিছু ছোট গাড়িও!

এসব কী করে সম্ভব! মাটি থেকে এতটা ওপরে, এত স্পিডে একটা সাইকেল রিকশ কী করে উড়ছে? আমি এ কার পাল্লায় পড়েছি? আমার সামনে যে রিকশ চালাচ্ছে, সে কী বাদলদা? আমি যত ভাবতে লাগলাম, ততই আমার হাতপা ঠাণ্ডা হতে লাগল। তার মানে, অনেক গল্পেটল্পে যেমন পড়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করিনি, বাদলদাও এখন সেরকম কিছু! আমি চোখ বন্ধ করে রাম নাম জপতে লাগলাম। আর কিছু করার কথা মাথাতেও এল না।

 

দুই

 

ট্রেনটার শেয়ালদা পৌঁছোনোর শিডিউল্‌ড্ টাইম ছিল পাঁচটা পঞ্চাশে, কিন্তু ঢুকল কুড়ি মিনিট লেটে। তাহলেও আমার কোন অসুবিধে হয়নি। যে কাজের জন্যে এসেছিলাম, সে কাজও মিটে গেল এগারোটার মধ্যে। দেড়টার সময় ফেরার ট্রেন। হাতে কিছুটা সময় ছিল বলে, কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া থেকেও ঘুরে এলাম। বাচ্চুদা দুটো বই কিনতে দিয়েছিল, সে দুটো কিনলাম। আর আমার জন্যে কিনলাম, “অশরীরি অমনিবাস”। বইটা সম্পর্কে আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। তখন গা করিনি। কিন্তু ট্রেন ধরতে গিয়ে আজ রাত্রে যে অভিজ্ঞতা হল, তার পরে বোকার মতো, “ভূত বলে কিছু আছে নাকি?”, বলে হ্যা হ্যা করে হাসার অবস্থা, অন্ততঃ আমার আর নেই।  বরং ওঁনাদের সম্পর্কে খুব সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করা উচিৎ বলেই আমার এখন মনে হচ্ছে!

এই ফাঁকে বলে রাখি, গতকাল রাত্রে চোখ বন্ধ করে কতক্ষণ রামনাম করেছিলাম জানি না। তবে বাদলদার ডাকে চমকে উঠেছিলাম, “ছোড়দা, ও ছোড়দা, স্টেশন চলে এসেছে। তোমার ট্রেন ঢুকতে এখনো মিনিট পাঁচেক দেরি আছে। দৌড়ে যাও”খুব ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে দেখলাম, আমি পরের স্টেশনের রিক্সা স্ট্যাণ্ডে, বাদলদার রিক্সায় বসে আছি! তার মানে আমার বাড়ির স্টেশন ছেড়ে পরের স্টেশন ঝিঙেরদহে ট্রেন এসে পৌঁছোনোর মিনিট পাঁচেক আগেই, বাদলদা আমাকে এখানে এনে পৌঁছে দিয়েছে! আমার অবস্থা তখন ভূতে পাওয়া লোকের মতো। মাথা ঝিমঝিম করছিল

বাদলদা আবার তাড়া দিল, “কী ভাবছো বলো তো? এখানেও ট্রেনটা ফেল করবে নাকি?” একথার পর আমি আর দাঁড়ালাম না, রিকশ থেকে লাফিয়ে নেমে, দৌড়োলাম স্টেশনের দিকে। রাতের ট্রেনের জন্যে লোকজন তেমন নেই। তার থেকে আশেপাশে অনেক বেশি নেড়ি কুকুর রয়েছেতাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। ভাগ্যিস্ ওরা কামড়ায় না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে আমি যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকলাম, তখন দেখলাম ট্রেনও প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে!

 

বেলা দেড়টার ট্রেনে ভিড় একটু কমই হয়। কাজেই সিট পেতে অসুবিধে হল না। ট্রেন যখন ঠিক সময়েই ছাড়ল, গুছিয়ে “অশরীরি অমনিবাস” খুলে বসলাম। প্রথম অধ্যায় “বাঙালী ভূতের উৎপত্তি এবং তাদের ক্রমবিকাশ”, পড়তে শুরু করলাম। যদিও বেশিক্ষণ পড়তে পারলাম না, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। ট্রেন ধরার তাড়ায় রাত দেড়টায় উঠে পড়ার পর, যা যা হল, তাতে ঘুমের আর দোষ কী?

ঘন্টাদুয়েক পর যখন ঘুম ভাঙল, দেখি কামরায় অনেক লোক। সব সিট ভরে গিয়ে, দু একজন লোক সিট না পেয়ে দাঁড়িয়েও আছে। আমার উল্টো দিকের সিটে একটি পরিবার বসেছেন। তাঁদের দুটি ছেলেমেয়ে। বড়োটি ছেলে, সে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি ছোট, সেও বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, আর ভয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরছে! খুব আশ্চর্য হলাম, বাচ্চাদুটোর এমন অবস্থা যেন ভূত দেখছে! মহিলার বয়েস আমার দিদির মতোই, তিনিও আমার ঘুম ভাঙতে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন মনে হল, বললেন, “বাবা, আপনি যা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, আওয়াজে ভূত পালাবে।”

আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, “না মানে, ইয়ে গতকাল রাত্রে দেড়টায় উঠে, দুটো দশের ট্রেনে কলকাতা এসেছিলাম, এই ফিরছি। অনেক দৌড়োদৌড়ি...”  

দিদিটাইপ ওই মহিলার স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, “বুঝেছি, তার মানে মাঝরাত থেকে যাকে বলে “ভূতের কেত্তন” - তাই ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?” আমি লাজুক হেসে ঘাড় নাড়লাম ঠিকই, কিন্তু একটু দমেও গেলাম। আমাকে ঘিরে এতো ভূত কেন রে বাবা! আমার নাকের আওয়াজে “ভূত পালাবে”, মাঝরাত থেকে “ভূতের কেত্তন”। ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, “কতদূর যাওয়া হবে?”

 আমি আমার স্টেশনের নাম বললাম, শুনে মহিলা বললেন, “আমাদের তিনটে স্টেশন আগেই নামবেন, কিন্তু আর ঘুমোবেন না, প্লিজ। আমার মেয়েটা এত ভীতু, ভূতে পাওয়ার মতো আমাকে আঁকড়ে ধরছে বারবার!”

ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “অদ্ভূত আবদার তো তোমার, আমাদের মেয়ে ভয় পাচ্ছে বলে উনি ঘুমোবেন না!”

দিদিভাই মহিলা একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “তা ঠিক, তবে রিকোয়েস্ট করছিলাম আর কি।” এ প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল, কামরায় ঝালমুড়িওয়ালা আসাতে। দিদিভাইয়ের ছেলেটি বায়না ধরল, ঝালমুড়ি খাবে। আমি বললাম, “ঝালমুড়ি খাবেন তো? চারটে মুড়ি বানান তো, কাকু”

দিদিভাই খুব আপত্তি করে উঠলেন, “না না। আপনি খাওয়াবেন কেন?”

আমি  হাসতে হাসতে বললাম, “মাথায় ভূত চেপেছে, দিদিভাই।” বোঝো কাণ্ড, আমিও ভূত বলে ফেললাম!

দিদিভাইও হেসে ফেললেন, বললেন, “তা কেন? আমরা খাওয়াবো আপনাকে। দিবানিদ্রার পর ঝালমুড়ি আর চা না হলে জমবে কেন? আপনি তিনটে বানান কাকু, কিন্তু আমরা দাম দেবো।” শেষ কথাগুলো দিদিভাই ঝালমুড়িওয়ালাকে বললেন। ভদ্রলোক মুড়ির টিনের ঢাকনা খুলে মুঠো করে মুড়ি তুলে গোল স্টিলের ডাব্বায় ভরতে লাগলেন।

“আমারটায় কিন্তু লংকা বেশি দেবেন, আজকাল আপনাদের কাঁচা লংকা আর শসায় একই রকম টেস্ট লাগে।” দিদিভাইয়ের কথায় আমি চমকে উঠলাম, বাপরে এত ঝাল খান! ঝালমুড়িওয়ালা, স্টিলের ডাব্বায় নানান বক্কাল মেলাতে মেলাতে বললেন, “আমার কাছে ওসব লংকা পাবেন না, বৌদি। আমার লংকা মানে লংকাদহন– দাউ দাউ জ্বলবে!” প্লাস্টিক বোতলের ছিপির ফুটো দিয়ে সরষের তেল ঢালতে ঢালতে বললেন, “একবার আমাদের পাশের গাঁয়ের এক বউকে ভূতে ধরেছিল। এই বছর তিন চার আগের কথা। ওঝা এল, ঝাড়ফুঁক চলল। সরষে ছেটানো, হলুদ আর শুকনো লংকা পোড়ানো, সব হল। ঝ্যাঁটাপেটাও চলল বেশ কিছুক্ষণ..” ভদ্রলোক ডাব্বার মধ্যে কাঠের ডাণ্ডা দিয়ে মুড়ি ঘাঁটতে লাগলেন ঘট, ঘট, ঘট... “কিস্স্যু হল না।” ঝালমুড়ি রেডি, এবার কাগজের ঠোঙা নিয়ে তাতে মুড়ি ভরার জন্যে ফুঁ দিয়ে ঠোঙার মুখ খুলতে খুলতে বললেন, “ফু..ফু...আমাদের গাঁয়ের করিমচাচা জামাই বাড়ি যাচ্ছিলেন, ক্ষেতের সব্জিটব্জি নিয়ে...ফু...ফু...তাঁর থলিতে কিছু কাঁচা লংকাও ছিল!  তার থেকে চার পাঁচটা লংকা ওঝাকে দিয়ে করিমচাচা বললেন, ফু..ফু... এই লংকাগুলা বৌমার গায়ে একে একে ছোড়েন তো, দেখি ভূতবাবাজি  কতক্ষণ থাকে....তিরিশ টাকা।”

তিনটে মুড়ির ঠোঙা আমাদের তিনজনের হাতে দিয়ে, মুড়িওয়ালা তার দাম চাইল। দিদিভাই সেটা বুঝতে না পেরে, অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, “ভূতটা তিরিশ টাকা নিয়ে ছেড়ে দিল?”

দিদিভাইয়ের স্বামী পার্স থেকে তিনটে নোট বের করে মুড়িওয়ালার হাতে দিয়ে বললেন, “তিন লংকাতেই ভূত বাছাধন কুপোকাত, ওঝার হাতে পায়ে ধরে পালিয়ে উঠল, শ্যাওড়া গাছের মগ ডালে”“ঝালমুড়িইই”, “মশলামুড়িইই” হাঁকতে হাঁকতে ঝালমুড়িওয়ালা চলে গেল অন্যদিকেদিদিভাই আরো অবাক হয়ে বললেন, “বা রে, তুমি কেমন করে জানলে?”

“আমাদের অফিসের গদাইয়ের বাড়ি ওদিকেই। তার মুখে শুনেছি।” একমুঠো মুড়ি গালে পুরে, আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আরো বললেন, “আর সেই লংকার ঝাঁঝে ওই ওঝার কী হল জানো?”

দিদিভাই জিগ্যেস করলেন, “কী হল?”

“ওঝাগিরি ছেড়ে দিয়ে এখন ট্রেনের কামরায় ঝালমুড়ি বেচে।”

“সে কী? কেন?”

“গায়ে তিনটে লংকা ছুঁড়লেই, যেখানে ভূত পালায়, সে গাঁয়ে ওঝার আর দরকার কী? ওঝা হয়ে ভূতের বেগার খেটে লাভ কী?”

“তা ঠিক। তবে লংকাগুলোয় ভালোই ঝাল আছে”ঝাল লাগা জিভে সি সি আওয়াজ করতে করতে দিদিভাই বললেন।

আমি লংকাগুলো বেছে, জানালার বাইরে ফেলতে ফেলতে খুব ভাবনায় পড়ে গেলাম! গদাই যে ঝালমুড়িওয়ালার পাশের গাঁয়ের লোক, সেটা দিদিভাইয়ের স্বামী জানলেন কী করে? ঝালমুড়িওয়ালা কোন গাঁয়ের নাম তো বলেনি!

 

তিন

 

ট্রেনের মধ্যে আমি আর কথাবার্তা না বলে, বই মুখে নিয়ে পড়তে লাগলাম। কারণ আমার আশেপাশে কেমন একটা যেন ভৌতিক পরিবেশ ঘিরে রয়েছে বুঝতে পারছিলাম। যাই বলছি, যাই করছি, কোথা থেকে যেন বারবার ভূতের প্রসঙ্গ চলে আসছিলআমার স্টেশন চলে আসাতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দিদিভাইদের বিদায় জানিয়ে, আবার দেখা হবে বলে নেমে পড়লাম স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে রিক্সা স্ট্যাণ্ডে অনেক রিকশ, কিন্তু গত রাত্রের কথা ভেবে, কোন রিকশতেই আর উঠতে ভরসা হচ্ছিল না। ঠিক করলাম টোটোয় যাবো। টোটোয় উঠে মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি, বাচ্চুদার চারটে মিসড্ কল রয়েছে। চলন্ত ট্রেনের আওয়াজে শুনতে পাইনি। কল ব্যাক করলাম বাচ্চুদাকে।

বাচ্চুদা কানেক্ট করেই খুব ঝাড়তে লাগল, “কোথায় থাকিস কোথায়, হতভাগা? কল করলে ফোন তুলিস না কেন?”

“ট্রেনে ছিলাম তো। এইমাত্র স্টেশনে নামলাম, টোটোয় উঠে দেখলাম তোমার চারটে মিসড্ কল।”

“অ। কলকাতার কাজ মিটল?”

“হ্যাঁ, ঠিকঠাক মিটে গেছে।”

“বাদলদার মুখে শুনলাম, ওর জন্যে তোর ট্রেন মিস্ হয়েছিল। পরের স্টেশনে গিয়ে তোর ট্রেন ধরিয়ে দিয়েছে”!

“তোমার সঙ্গে বাদলদার দেখা হয়েছে? বাদলদা বলেছে তোমাকে? বাদলদার সঙ্গে বেশি মিশো না, বাচ্চুদা। লোকটা সুবিধের নয় মোটেই।”

“সে কী রে? কেন বলতো?”

“সব কথা ফোনে বলা যায় নাকি! দেখা হলে বলবো।”

তুই এক কাজ কর তাহলে, তোর বাড়ি না গিয়ে, সোজা আমাদের বাড়ি চলে আয়। রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরবিআমি কাকিমাকে বলে দিচ্ছি” বাচ্চুদা আমার মাকে কাকিমা বলে।

“কাল রাত থেকে ভালো ঘুম হয়নি, খুব টায়ার্ড বাচ্চুদা। আজকের প্রোগ্রামটা বাদ দাও।”

“আমি জানি না। মা সামনে আছেন, বলছেন, গজুকে বল, রাত্রে পরোটা আর হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়াবো”

একথার পর আর কিছু বলার নেই, টোটোওয়ালাকে, বাচ্চুদার পাড়ার নাম বললাম। টোটোওয়ালা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল, “দশটা টাকা বেশি দেবেন, ভাই”!

 

যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই রাত্রি হয়। টোটো থেকে নেমে বাচ্চুদার বাড়ির সদর দরজায় ঢুকেই দেখি বাদলদার রিকশটা দাঁড়িয়ে। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। স্বস্তির কথা বাদলদাকে দেখলাম না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। বাদলদা অশরীরি হয়েছে, তার রিকশটা তো আর হয়নি। আবছা অন্ধকারে দাঁড় করানো রিকশটাকে একটু দূর থেকে এড়িয়ে মস্তো উঠোনটা পার হয়ে গেলাম। বাচ্চুদার একতলার বৈঠকখানায় ঢুকে ডাকলাম, “বাচ্চুদা”  

বাচ্চুদা পাশের ঘর থেকে এ ঘরে এসেই কথা শুরু করে দিল, “এসে গেছিস। ভালই হয়েছে। তোর জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। কাকিমাকে বলে দিয়েছি। তুই আমাদের বাড়ি আছিস। রাত্রে একেবারে খেয়েদেয়ে যাবি। কদিন একটা কাজে খুব ব্যস্ত থাকার জন্যে তোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগই হয়নি। তার মধ্যে গত কাল রাত্রের ঘটনাটা হয়ে গেল, তোকে আগে থেকে বলেকয়ে করা উচিৎ ছিল। সে কথা পরে হবে,  আগে তুই এক কাজ কর, বাথরুমে গিয়ে ভাল করে ফ্রেশ হয়ে নে। কাল রাত থেকে অনেক দৌড়োদৌড়ি করেছিস। মা খাবার দাবার আনছেন, শান্তিতে খাওয়াদাওয়া কর, তারপর কাজের কথায় আসবো”

বাচ্চুদা একবার শুরু করলে, আর কাউকে কথা বলতে দেয় না, বকতেই থাকে। সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগছিল, বাচ্চুদার বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অনেকটা আরাম পেলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে আসতেই কাকিমা দুটো প্লেটে নোনতা সুজি নিয়ে এল। কাকিমার দারুণ রান্নার হাত, যা খাবার বানান, খাওয়ার পর মুখে লেগে থাকে। বাচ্চুদা নিজের প্লেট হাতে নিয়ে বলল, “নে চালু কর”

কাকিমা জিগ্যেস করলেন, “চা খাবি না, কফি খাবি, গজু? কাল রাত্রে খুব হয়রান হয়েছিস শুনলাম। বাচ্চুটার মাথায় মাঝে মাঝে কী যে ভূত চাপে বুঝি না বাপু। আদ্যিকালের এই বাড়িটাকেও দিনদিন ভূতুড়ে বাড়ি বানিয়ে তুলছে! গজু কফি খেতে ভালোবাসিস তো! তোরা খা আমি কফি করে আনছি”

কাকিমা ভেতরে চলে যেতেই, বাচ্চুদা একগাল সুজি নিয়ে ভরাট গলায় বলল, “বেশ কিছুদিন ধরে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। দুচারদিনের মধ্যেই তোকে ডেকে নিয়ে একটা ট্রায়াল দেব ভাবছিলাম। কিন্তু বাদলদার...আচ্ছা, বাদলদা সম্পর্কে তুই তখন কী যেন বলছিলি? লোকটা নাকি সুবিধের নয়! কী ব্যাপার বল তো?”

“তোমাকে বললে তুমি শক্ পাবে বাচ্চুদা। বাদলদা আমাদের মধ্যে আর নেই। নেই মানে, আছে তবে ওই না থাকাই, মানে, থাকা না থাকা সমান...”

বাচ্চুদা বিরক্ত হয়ে আমায় ধমকে দিল, “ধ্যাত্তেরি, কী তখন থেকে মানে, মানে করছিস্, যা বলবি ঝেড়ে বল না”

“বলছি তো! বাদলদা ইয়ে, মানে, বাদলদা অশরীরি হয়ে গেছে! কাল রাত্রে যেভাবে গাড়ি চালাল, কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়!” আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাচ্চুদা এমন হেসে উঠল হো হো করে, কাকিমা পর্যন্ত দৌড়ে এলেন কফি বানানো ছেড়ে।

বাচ্চুদাকে ধমকে জিগ্যেস করলেন, “ভূতের মতো, গোটা পাড়া মাথায় করে, ও আবার কী হাসি, বাচ্চু? কী হয়েছে রে, গজু?”

আমি কিছু বলার আগেই বাচ্চুদা বলল, “বলছি মা, বলছি। গজুর কথা শুনলে তুমি আমার থেকেও জোরে হাসবে। গজু বলছে, বাদলদা নাকি অলরেডি পটল তুলেছে! আর ভূত হয়ে ওকে গতকাল রাত্রে ঝিঙেরদা স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছে, ট্রেন পৌঁছোনোর আগেই!”

“খারাপ কী বলেছে শুনি? বলা নেই কওয়া নেই, গজুকে নিয়ে তোদের অমন বাঁদরামি করাটা মোটেই উচিত হয়নি। সেই নিয়ে তুই অমন হ্যা হ্যা করে হাসছিস? কিছু একটা হয়ে গেলে? গজু আমাদের সরল মনের ছেলে, ও কী করে বুঝবে, তোরা দুই ভূত মিলে কী ফন্দি আঁটছিস?”

কাকিমার ধমকানিতে বাচ্চুদা একটু অপ্রতিভ হল, বলল, “তা ঠিক। বাদলদা যে নিজের বুদ্ধিতে হুট করে এমন কাণ্ড করে বসবে, আমি ভাবিইনি মা! তবে আমার এক্সপেরিমেন্টটা সফল হয়েছে, সেটা তো মানবে?”

কাকিমা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, “থাক, আর বাহাদুরি ফলাতে হবে না। টিআইআই থেকে বিটেক, এমটেক করে, তোর মতো ছেলেরা বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে! আর এক তুই হয়েছিস, একপেট বিদ্যে নিয়ে চোদ্দপুরুষের ভিটে আগলে, এক্সপেরিমেন্ট করছিস!” কাকিমা গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। আমরা দুজনেই চুপ করে সুজির বাটি শেষ করতে মন দিলাম।

কাকিমা যা বললেন, সেটা আমাদেরও মনের কথা। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চুদা অদ্ভূত ব্রিলিয়ান্ট। এই গোবিন্দপুরে থেকে মাধ্যমিক, হায়ারসেকেণ্ডারিতে যা রেজাল্ট করেছিল, জাস্ট ভাবা যায় না! জয়েন্ট দিয়ে টিআইআইতে চান্স পেয়ে চলে গেল খড়দাসেখান থেকে পাস করে বীজপুর থেকে এমটেক করল। বাচ্চুদার দুতিনজন বন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ আছে। তারা ছুটিতে বার তিনেক বাচ্চুদার বাড়ি এসেছিল, সেই সময়েই পরিচয়। তাদের কাছে শুনেছি, ক্যাম্পাসিংয়ে পাঁচখানা বাঘা কোম্পানি বাচ্চুদাকে সিলেক্ট করেছিল। তার মধ্যে দুটো ইউএসএ, একটা জার্মানি! সে সব ছেড়ে আমাদের গোবিন্দপুরেই বাচ্চুদা ফিরে এল! কাকিমাকে ফিরে এসে নাকি বলেছিল, যতই মাইনে, গাড়িবাড়ি দিক মা, চাকরি মানে চাকরই! ও আমার পোষাবে না! আমিও কাজ করবো, কিন্তু সে নিজের আনন্দে। নিজের ব্যবসার স্বার্থে কেউ আমার ইচ্ছের ওপর দুরমুশ চালাবে, সেটি হতে দিচ্ছি না। গোবিন্দপুরের লোকজন তার পর থেকেই বাচ্চুদাকে আড়ালে বলে, খ্যাপাটে, ছিটিয়াল, আলসে।

তবে একথাও সত্যি, বাচ্চুদার পক্ষে এই ডিসিশান নেওয়া সহজ হয়েছিল, বাচ্চুদার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির সাপোর্ট ছিল বলে। বাচ্চুদা নিজেই বলে, আমাদের যা আছে, ভদ্রভাবে চললে ছ সাত পুরুষ আরামসে চালিয়ে দেওয়া যাবে! কাজেই দুটো টাকা কামানোর জন্যে খামোখা দৌড়োদৌড়ি করার কোন মানে হয়? এক পুকুর জলে, দশবিশ বালতি জল ঢেলে খুব কিছু লাভ হবে কী?  বাচ্চুদা যাই বলুক, কাকা, কাকিমা এবং আমরাও ফিল করি, বিদেশে চাকরি করলে বাচ্চুদার চালচলন, ঠাটবাট হয়ে একজন কেউকেটা হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে বাচ্চুদা আমাদের একজন হয়েই রয়ে গেল!

 

চার 

কাকিমা কফি নিয়ে ঘরে এলেন, সুজির খালি বাটি নিয়ে চলেও গেলেন। কথা বললেন না কোন, এখনো রেগে আছেন। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বাচ্চুদা বলল, “কালকের ব্যাপারটার জন্যে আমি খুব সরি রে। বাদলদার যে তর সইবে না! গতকাল তোর ট্রেন ধরানোর জন্যে ওরকম ঝুঁকি নিয়ে নেবে, বুঝিনি।”

“আরে না না, আমার কলকাতার কাজটাও তো মিটে গেছে, বাদলদা ট্রেনটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু অত স্পিডে রিকশটা ওড়াল কী করে, সেটা বোঝাও তো।”

বাইরে থেকে এই সময় কেউ একজন ডাকল, “এইটাই কোমলাক্ষবাবুর বাড়ি হল কী?” আমরা দুজনেই বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, নাদুসনুদুস একজন ভদ্রলোক, সঙ্গে একজন টিকটিকির মতো লোককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিকটিকির হাতে একটা ব্রিফ কেস, আর  নাদুসনুদুস লোকটি আট আঙুলে দশ আংটি পরা দু হাত তুলে নমস্কার করল

বাচ্চুদা বলল, “নমস্কার, আমিই কমলাক্ষ বক্সি। আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।”

“আরে ছো ছো হামাকে চিনবেন কী কোরে? আমি তো এমন কিছু ফেমুস হল না! হামার নাম সুরযরাম মিনা”

আমরা সবাই ঘরে এসে বসার পর বাচ্চুদা বলল, “তা সুরযবাবু, হঠাৎ আমার কাছে, কী ব্যাপার বলুন তো?”

“বলবো বোলেই তো আসলাম, দাদা। তার আগে হামার পোরিচোয়ভি জেনে লিন। হামাদের এখানে তিশপয়তিশ সাল হয়ে গেলো। হামার দাদা, মানে গ্র্যাণ্ডফাদার, রাজস্থানসে ইখানে এসে বেওসা শুরু করল। হামার পিতাজী সেই বেওসামে বহুত তরক্কি আনল। ইখন হামাদের জিতনা কারোবার সোব হামি সামলাই। দাদাজী বহুদিন গুজরে গেল। পিতাজী আভি ভি বিজিনেস দেখেন, কিন্তু যো কুছ ডসিশন সো হামিই লিয়ে থাকি। ইখন হামি এসেছি আপনার সঙ্গে একটা বিজিনেস ডিল ফাইন্যাল করতে।”

বাচ্চুদা আকাশ থেকে পড়ল, “কিন্তু আমি তো কোন বিজনেস করি না, সুরযবাবু। আমার দাদু, বাবাও কখনো কোন বিজনেস করেননি”!

“সোতো হামি জানে, কোমোল বাবু। বাঙ্গালীরা লিখাপড়া কোরে, বাঙ্গালীরা ইনটেলিজেন হোয় টাগোর আছেন। সোত্তোজিত রে আছেন। কিন্তু বাঙ্গালীরা বিজিনেস পোছোন্দ কোরলো না। হামি বিজিনেসভি করি, গুণের কদরভি কোরি। হামি টাগোর পড়িয়েছে, রের ফিলম্‌ভি দেখিয়েছে। আপনার মারভিলাস ইনভেনসনভি দেখল। এ যোগেন্দর্, ব্রিফকেস দেকে তু বাহার রুক”সূরযবাবু শেষ কথাটা বলল টিকটিকির মতো সেই লোকটাকে। বাচ্চুদার সঙ্গে যতক্ষণ কথা বলছিল, কি নরম আর মোলায়েম গলা, কিন্তু টিকটিকির মতো দেখতে যোগেন্দরকে যখন বলল, গলা কর্কশ হয়ে উঠল। যোগেন্দর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই, সূরযবাবু ব্রিফকেস খুলে বাচ্চুদার দিকে ঘুরিয়ে ধরল, বলল, “ইখানে দোশলাখ আছে, কোমোলবাবু। আপনার ইনভেনশনটা হামার চাই। না বোলবেন না।”

“তার মানে? কিসের কথা বলছেন বলুন তো?”

“হামি সোব জানে কোমোলবাবু। বাদলদাদার রিকশ জানে। আপনার এই ব্রাদার লাস্ট নাইটে হামাদের স্টিশনে ট্রেন ফেল কোরে নেক্সট স্টিশনে গিয়ে সেই ট্রেনে বোর্ড কোরে নিলো। সোব জানে!”

বাচ্চুদা আরো অবাক হয়ে বলল, “গজুর ট্রেন ধরার সঙ্গে আপনার আমাকে টাকা দেওয়ার কী সম্পর্ক?”

“হামি ওই রিকশর ফেকটোরি বানাবে। আপনি হামার লোককে সোব শিখিয়ে দিবেন।”

“আচ্ছা, এবার বুঝেছি। কিন্তু আপনি এতসব কী করে জানলেন?”

“ইটা আপনি কী করে বোললেন, কোমোলবাবু? আপনি টিআইআই থেকে বিলিরিয়ান্ট রেজাল্ট করলেন, অচ্ছা অচ্ছা নোকরি মিলল, ফিরভি কোরলেন না, বাড়িতে বোসে গেলেন! বাড়িতে আপনি চুপচাপ বোসে থাকবেন? কুছু কোরবেন না? আপনার বেরেনটা আইডিয়াল হইয়ে থাকবে? আপনি বাদলদাদার রিকশ লিয়ে খুটখুট কামে লাগলো। সে কাম সকসেস ভি হোলো। ই খবোর হামি না রাখলে বিজিনেস চালাবো কী করে বোলেন তো?”

“কিন্তু, এ রিকশ কমার্শিয়ালি চালাবার আগে প্রশাসনের অনুমতি লাগবে, পারমিট বের করতে হবে।”

“ওসোব কুছু না। পেপার-উপার, পারমিট-উরমিট সূরযরামের বাঁয়া হাত কা খেল হ্যায়, দাদা। উসব লেকে আপ বেফিকর রহিয়ে। মশাডিহিমে হামার একটা শেড হোলো, ওখানে একদিন আপনাকে লিয়ে যাব। আপনি যেমন বোলবেন, সোব কিছু বানিয়ে লিব। এক-দো মাহিনার অন্দর প্রাডাকশনভি চালু কোরে দেবো।”

বাচ্চুদা কিছু বলল না, চিন্তা করতে লাগল। সূরযবাবু আবার বলল, “আপনি কুছু চিন্তা কোরবেন না, দাদা। দোশলাখ এখোন দিয়েছি। আপনি টাইম লিন, চিন্তা করে বলুন, আপনার কোতো লাগবে। আমি আরো দেবে। আজ বুধবার, নেক্সট সোমবার হামি আবার আসবে। সেইদিন ডিলটা ফাইন্যাল করে লিবে। আমাদের মধ্যে লিখাপড়া যো করার সোব কোরে লিবে। হাঁ, লেকিন একবাত জরুর সোচে লিন, আপনার এহি নয়া রিকশর নাম কী হোবে? ঠিক আছে দাদা, আপনাকে আর বিরক্ত করবো না। আমি এখন চলি। সোমবার হামি আসবে।”

সূরযরাম চলে যেতে আমি লাফিয়ে উঠলাম, “বাচ্চুদা কী করেছো, বাদলদার রিকশ বানিয়ে দশ লাখ!”

“একটি গাঁট্টা খাবি খটাস্ করে। বাদলদার রিকশ? ওটার পেছনে কত দিমাগ আর খাটনি গেছে তুই জানিস? তুই তো ভেবেছিলি, বাদলদার ভূতের পাল্লায় পড়েছিস! মাটি থেকে মোটামুটি কুড়ি মিটার ওপরে রেখে, ওই স্পিডে রিকশ চালানো ছেলেখেলা নয় রে, গজু

“সে তো নয়ই, তা নাহলে সূরয টাকা ঢালতে আসে?”

“দশ লাখ ক্যাশ দিয়ে গেল, কোন রিসিট নিল না। টাকা পয়সা ওর কাছে খোলামকুচি, সেটা কী বুঝতে পারছিস?”

“টাকাটা নিয়ে কী করবে বাচ্চুদা?”

“ভাবছি বাচ্চাদের জন্যে একটা স্কুল খুলবো। ওই “অএ অজগর আসছে তেড়ে” কিংবা “এ ফর অ্যাপল্” টাইপের নয়। আর বাচ্চারাও কোন বড়লোকের বাচ্চা নয়! যাদের জন্ম থেকেই বাবা-মায়েরা, ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার বানানোর জন্যে ঘোড়ার মতো দৌড় করায়!”

“সে আবার কেমন স্কুল গো, বাচ্চুদা!”

“সে তুই বুঝবি না। আমার মাথায় আছে। বেশি লেখাপড়া না শিখলেও চলবে, কিন্তু হাতের কাজ শিখতে হবে। যে যেরকম কাজ করে আনন্দ পাবে, সেই কাজই শিখবে। দাঁড়া মাকে টাকা কটা দিয়ে আসি। সাবধানে রেখে দিক।”

 

রাত্রে হাঁসের ডিমের ডালনা দিয়ে পরোটা খেতে খেতে বাচ্চুদাকে জিগ্যেস করলাম, “তোমার ওই বুলেট রিকশর টেকনোলজিটা কী গো?”

পরোটা মুখে নিয়ে বাচ্চুদা বলল, “বাঃ, বুলেট রিকশ নামটা বেড়ে দিয়েছিস তো! নামটা রেখে দিলাম। এর থেকে ভালো নাম মাথায় না এলে বুলেট রিকশই হয়ে যাবে। টেকনোলজির কথা জিগ্যেস করছিলি, সবটা তো আর খুলে বলা যাবে না। তাহলে তো সবাই বানাতে লেগে যাবে! কয়েকটা সমস্যার কথা মাথায় রেখে সেগুলোর সহজ সমাধানের চেষ্টা করেছিযেমন ধর, মাটি থেকে, রিকশর ওজন, কিছু ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে দুই যাত্রী, প্লাস যে চালাবে, অন্ততঃ আড়াইশ-তিনশ কিলো ওজন, মিটার কুড়ি পঁচিশ ওপরে তুলতে হবে। সেটার জন্যে জোরোলো কিন্তু হাল্কাপ্রপেলার, ইঞ্জিন এসব লাগবে। ইঞ্জিন চলবে কিসে? পাওয়ার লাগবে! হাল্কা ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, প্লাস রিকশর প্যডেল ঘুরিয়ে সেই পাওয়ার জেনারেট করতে হবে। এবার ওপরে উঠে গিয়ে সামনে চলবে কেন? তার জন্যেও টারবো ফ্যান, জেট ইঞ্জিন লাগবে। সেগুলো চালাতেও পাওয়ার চাইব্যাপারগুলো এমন কিছু কঠিন নয়, বরং বেশ সহজ! ইঞ্জিনিয়াররা সবই জানে, কিন্তু অধিকাংশই বাঁধা গতের বাইরে চিন্তাই করে না”

কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে গরম পরোটা দিতে দিতে জিগ্যেস করলেন, “বাদলের রিকশ নিয়ে কী কদিন খুটখুট করলি, তারই দাম হয়ে গেল দশ লাখ! আজকাল টাকা পয়সা এত সস্তা হয়ে গেল, না কি রে?”

বাচ্চুদা হেসে কাকিমাকে বলল, “ওটা এখন বাদলের রিকশ নয় মা, বুলেট রিকশ – গজু নাম দিয়েছে!”

কাকিমা খুব অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, “সে কী রে? বাদল এই বয়সে, তার নাম বদলে নিল? তাও আবার বুলেট? ওর মা জানে?”

বাচ্চুদা বলল, “ওঃ, মা, তুমি না...বাদলদার নাম বুলেট হতে যাবে কেন? আমি যে রিকশর মডেলটা আবিষ্কার করেছি, গজু তার নাম রেখেছে, “বুলেট রিকশ”।

“হ্যাঁ কাকিমা, রিকশটা কাল আমাকে একদম বুলেটের মতো, ঝিঙেরদ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল, বলেই না, ট্রেনটা ধরতে পারলাম!”

কাকিমা মুচকি হাসলেন, বললেন, “তুই যে কাজের ছেলে হয়ে গেলি, বাচ্চু? একেবারে আবিষ্কর্তা হয়ে গেলি? শোন, কাল তোর ওই রিকশতে আমায় কালীবাড়ি নিয়ে যাবি, আমি মায়ের পুজো দেবো। তোর বাবাও বলছিল, আমার সঙ্গে যাবে”

“বাবাকে বলেছো? বাবা কী বললেন?”

“তোর বাবা বলল, আমি জানতাম বাচ্চুটা এমন কিছু একটা করে সবাইকে চমকে দেবে! আমাদের খুব খারাপ লাগতো রে, তোকে নিয়ে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়পরিজন বড্ডো হাসাহাসি করত। এতদিনে আমাদের মনে শান্তি হল, বাবা”

তারপর লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে হাঁসের ডিম দিলেন। আমি খুব একটা আপত্তি করলাম না, এমন আনন্দের দিনে হাসতে হাসতে একটার বেশী হাঁসের ডিম খাওয়াই যায়।

 -০০-

এর পরের গল্প - " বাসা বদল "


"বুলেট রিকশ" গল্পটি আমার "এককুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত -


বইটি ঘরে বসে সংগ্রহ করতে ইচ্ছে হলে এই সূত্রে যোগাযোগ করবেন  

EK KURI KISHOR

                                        

শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৭শ পর্ব

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের ষোড়শ অধ্যায়ঃ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৬শ পর্ব "


সপ্তদশ অধ্যায়ঃ শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ


অর্জুন উবাচ

যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ

তেষাং নিষ্ঠা তুম কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ।।

অর্জুন উবাচ

যে শাস্ত্রবিধিম্‌ উৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়া অন্বিতাঃ।

তেষাং নিষ্ঠা তুম কা কৃষ্ণ সত্ত্বম্‌ আহো রজঃ তমঃ।।

অর্জুন বললেন- হে কৃষ্ণ, যাঁরা শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করলেও নিষ্ঠার সঙ্গে যজ্ঞ উপাসনা করেন, তাঁদের সেই নিষ্ঠা কেমন, সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক?

 

শ্রীভগবানুবাচ

ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।

সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।

সাত্ত্বিকী রাজসী চ এব তামসী চ ইতি তাং শৃণু।।

শ্রীভগবান বললেন- মানুষের স্বাভাবিক শ্রদ্ধা তিন ধরনের, সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এই তিন শ্রদ্ধার কথা তোমাকে এখন বলছি, শোনো।

 

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।

শ্রদ্ধাময়োঽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ।।

সত্ত্ব অনুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।

শ্রদ্ধাময় অয়ং পুরুষঃ যঃ যৎ শ্রদ্ধঃ স এব সঃ।।

হে অর্জুন, মানুষের স্বভাব সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন প্রকারের হওয়ায়, সকল মানুষের শ্রদ্ধাও সেই অনুসারে তিন প্রকারের হয়। শ্রদ্ধাবান মানুষ, যিনি যেরূপ শ্রদ্ধাযুক্ত, তিনি সেই রূপই হন।

   

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্‌ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।

প্রেতান্‌ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্‌ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।

প্রেতান্‌ ভূতগণাং চ অন্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।

সাত্ত্বিক মানুষ দেবতাদের পূজা করেন, রাজসিক ব্যক্তি যক্ষ ও রাক্ষসগণকে পূজা করেন। এবং তামসিক মানুষ ভূত, প্রেত ও অন্যান্যদের পূজা করেন।

 

৫,৬

অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।       অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।

দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তা কামরাগবলান্বিতাঃ।।               দম্ভ-অহঙ্কার-সংযুক্তা কাম-রাগ-বল-অন্বিতাঃ।।

কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ।                কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামম্‌ অচেতসঃ।

মাঞ্চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্‌ বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্‌।।          মাং চ এব অন্তঃশরীরস্থং তান্‌ বিদ্ধি                                                               অসুরনিশ্চয়ান্‌।।

যে দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তিরা এবং কামনা, আসক্তি ও শক্তির মোহে আচ্ছন্ন বিবেকহীন ব্যক্তিরা শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে এবং দেহের ভিতর আত্মস্বরূপ আমাকে অমান্য ক’রে শাস্ত্রবিরুদ্ধ তপস্যার ভয়ানক অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে নিশ্চিতভাবে আসু্রিকবুদ্ধি বলে জানবে।

  

আহারস্ত্বপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ।

যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু।।

আহারঃ তু অপি সর্বস্য ত্রিবিধঃ ভবতি প্রিয়ঃ।

যজ্ঞঃ-তপঃ-তথা দানং তেষাং ভেদম্‌ ইমং শৃণু।।

এই তিন স্বভাবের মানুষের আহার তিন প্রকারের হয়, প্রিয় বস্তুও তিন প্রকারের হয়। যজ্ঞ, তপস্যা, দান এই সমস্তই তিন প্রকারের হয়। এই তিনের প্রভেদ তোমাকে এখন আমি বলব। 

 

আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।

আয়ুঃ-সত্ত্ব-বল-আরোগ্য-সুখ-প্রীতি-বিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।

যে আহার মানুষের আয়ু, উদ্যম, প্রাণশক্তি, সুস্বাস্থ্য, সুখ ও প্রীতি বৃদ্ধি করে; সরস, স্নিগ্ধ, পুষ্টিকর ও তৃপ্তিকর সেই আহারই সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের প্রিয় আহার।

  

কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ।

আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।

কটু-অম্ল-লবণা-অত্যুষ্ণ-তীক্ষ্ণ-রুক্ষ-বিদাহিনঃ।

আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।

অত্যন্ত তিক্ত ও টক, তীব্র লবণাক্ত, অতি উষ্ণ ও অত্যন্ত ঝাল, অতি শুষ্ক ও তীক্ষ্ণ জ্বালাকর আহার দুঃখ, শোক ও অসুখের কারণ হয়, এই প্রকারের আহার রাজসিক ব্যক্তিদের প্রিয়।

 

১০

যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুসিতঞ্চ যৎ।

উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্‌

যাত-যামং গতরসং পূতি পর্যুসিতং চ যৎ।

উচ্ছিষ্টম্‌ অপি চ অমেধ্যং ভোজনং তামস-প্রিয়ম্‌

অর্ধ সিদ্ধ, রসহীন, দুর্গন্ধময়, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও নিষিদ্ধ খাদ্য তামসিক ব্যক্তিদের প্রিয় হয়।

 

১১

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যজ্ঞো বিধিদিষ্টো য ইজ্যতে।

যষ্টব্যমেবেতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ।।

অফল-আকাঙ্ক্ষিভিঃ যজ্ঞঃ বিধিদিষ্টঃ য ইজ্যতে।

যষ্টব্যম্‌ এব ইতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ।।

ফলের প্রত্যাশা না রেখে, ‘যজ্ঞ অনুষ্ঠানই একান্ত কর্তব্য’, মনে এই প্রত্যয় নিয়ে, সনিষ্ঠা শাস্ত্রবিধি পালন করে যজ্ঞের যে অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞই সাত্ত্বিক।

 

১২

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভার্থমপি চৈব যৎ।

ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভ-অর্থম্‌ অপি চ এব যৎ।

ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

কিন্তু হে অর্জুন, ফলের একান্ত অভিসন্ধিতে, নিজের দম্ভপ্রকাশের জন্যে যে যজ্ঞের অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞকে রাজসিক যজ্ঞ বলেই জানবে।

 

১৩

বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম্‌।

শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে।।

বিধিহীনম্‌ অসৃষ্ট-অন্নং মন্ত্রহীনম্‌ অদক্ষিণম্‌।

শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে।।

শাস্ত্রের নিয়ম না মেনে, অন্নদান না করে, মন্ত্রের উচ্চারণ ছাড়া, দক্ষিণাহীন ও শ্রদ্ধাহীন যজ্ঞকে তামসিক যজ্ঞ বলা হয়।

 

১৪

দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচমার্জবম্‌।

ব্রহ্মচর্যমহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে।।

দেব-দ্বিজ-গুরু-প্রাজ্ঞ-পূজনং শৌচম্‌ আর্জবম্‌।

ব্রহ্মচর্যম্‌-অহিংসা চ শারীরং তপঃ উচ্যতে।।

দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরুজন ও প্রাজ্ঞগণের পূজা, চিত্তের পবিত্রতা, সরলতা, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসা – এইগুলিকে শারীরক বা কায়িক তপস্যা বলে।

 

১৫

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতঞ্চ যৎ।

স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে।।

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ।

স্বাধ্যায়-অভ্যসনং চ এব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে।।

যে বাক্য কারো মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে না, যে বাক্য সত্য, প্রিয় ও মঙ্গলকর এবং বেদ পাঠ ও শাস্ত্র আলোচনাকে বাঙ্ময় বা বাচিক তপস্যা বলে।

 

১৬

মনঃপ্রসাদঃ সৌমত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ।

ভাবসংশুদ্ধিরিত্যেতৎ তপো মানসমুচ্যতে।।

মনঃপ্রসাদঃ সৌমত্বং মৌনম্‌ আত্মবিনিগ্রহঃ।

ভাবসংশুদ্ধিঃ ইতি এতৎ তপঃ মানসম্‌ উচ্যতে।।

মনের প্রসন্নতা, সৌম্যভাব, বাক্‌সংযম, আত্ম নিয়ন্ত্রণ, চিত্তের ভাবশুদ্ধি – এই সকলকে মানসিক তপস্যা বলা হয়।

 

১৭

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপস্তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপঃ তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।

অফলাকাঙ্ক্ষিভিঃ যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।

ফলের কামনা শূণ্য, একনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে, কায়িক, বাচিক ও মানসিক এই তিন প্রকারে যে তপস্যা করেন, তাকেই সাত্ত্বিক তপস্যা বলে।

 

১৮

সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ।

ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্‌।।

সৎকার-মান-পূজা-অর্থং তপঃ দম্ভেন চ এব যৎ।

ক্রিয়তে তৎ ইহ প্রোক্তং রাজসং চলম্‌ অধ্রুবম্‌।।

প্রশংসা, প্রতিপত্তি, পূজা ও অর্থ লাভের কামনায়, অহংকারের সঙ্গে যে তপস্যা করা হয়, তাকে রাজসিক তপস্যা বলে, এই তপস্যা ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত।

 

১৯

মূঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ।

পরস্যোৎসাদনার্থং বা তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

মূঢ়গ্রাহেণ আত্মনঃ যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ।

পরস্য উৎসাদনার্থং বা তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

অসম্ভব বিষয়ের কামনায় এবং অপরের ক্ষতিসাধনের জন্যে নিজের শরীরের পক্ষেও একান্ত কষ্টকর যে তপস্যা করা হয়, তাকে তামসিক তপস্যা বলা হয়। 

 

২০

দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে।

দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্‌।।

দাতব্যম্‌ ইতি যৎ দানং দীয়তে অনুপকারিণে।

দেশে কালে চ পাত্রে চ তৎ দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্‌।।

দানের পরিবর্তে কিছু পাবার আশা না করে, উপযুক্ত স্থানে, উপযুক্ত সময়ে এবং উপযুক্ত পাত্রে, ‘দান করা কর্তব্য’ এই চিন্তায় যে দান করা হয়, তাকেই সাত্ত্বিক দান বলা হয়।

 

২১

যৎ তু প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ।

দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্‌।।

যৎ তু প্রতি-উপকারার্থং ফলম্‌-উদ্দিশ্য বা পুনঃ।

দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তৎ দানং রাজসং স্মৃতম্‌।।

দানের পরিবর্তে কিছু পাবার আশায় অথবা পুণ্য ফলের প্রত্যাশায়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে দান করা হয়, সেই দানকে রাজসিক দান বলে।

 

২২

অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে।

অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

অদেশকালে যৎ দানম্‌ অপাত্রেভ্যঃ চ দীয়তে।

অসৎকৃতম্‌ অবজ্ঞাতং তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

অযোগ্য স্থানে, অসময়ে এবং অযোগ্য পাত্রে, দুর্ব্যবহার এবং অবজ্ঞার সঙ্গে যে দান করা হয়, সেই দানকে তামসিক দান বলে।

 


২৩

ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।

ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।।

ওঁ তৎ সৎ ইতি নির্দেশঃ ব্রহ্মণঃ ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।

ব্রাহ্মণাঃ তেন বেদাঃ চ যজ্ঞাঃ চ বিহিতাঃ পুরা।।

ওঁ, তৎ, সৎ - ব্রহ্মের এই তিনটি নাম নির্দেশ করা হয়ে থাকে। এই তিন নির্দেশ অনুসরণ ক’রেই পুরাকালে যজ্ঞের কর্তা ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের কারণ বেদ এবং যজ্ঞের ক্রিয়া স্থির করা হয়েছে।

 

২৪

তস্মাদোমিত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ।

প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্‌।।

তস্মাৎ ওম্‌ ইতি উদাহৃত্য যজ্ঞ-দান-তপঃ-ক্রিয়াঃ।

প্রবর্তন্তে বিধান উক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্‌।।

সেই কারণেই ‘ওঁ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে ও শাস্ত্রবিধি অনুসরণ ক’রে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ সর্বদা যজ্ঞ, দান ও তপস্যার অনুষ্ঠান করেন।

 

২৫

তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ।

দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।

তৎ ইতি অনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞ-তপঃ-ক্রিয়াঃ।

দান-ক্রিয়াঃ চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।

 ‘তৎ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে এবং কোন ফলের প্রত্যাশা না ক’রে, পরম মুক্তি লাভের জন্য জ্ঞানীব্যক্তিগণ নানান যজ্ঞ অনুষ্ঠান, দান ও তপস্যা করেন।

 

২৬

সদ্ভাবে সাধুভাবে চ সদিত্যেতৎ প্রযুজ্যতে।

প্রশস্তে কর্মণি তথা সচ্ছব্দঃ পার্থ যুজ্যতে।।

সৎ-ভাবে সাধু-ভাবে চ সৎ ইতি এতৎ প্রযুজ্যতে।

প্রশস্তে কর্মণি তথা স-শব্দঃ পার্থ যুজ্যতে।।

হে পার্থ, ‘সৎ’ এই শব্দ দিয়ে অস্তিত্ব ও সাধুতা বোঝানো হয়। আবার যে কোন মঙ্গলকর শুভ কর্মেও এই ‘সৎ’ শব্দ প্রয়োগ করা যায়।

 

২৭

যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সদিতি চোচ্যতে।

কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদিত্যেবাভিধীয়তে।।

যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সৎ ইতি চ উচ্যতে।

কর্ম চ এব তৎ-অর্থীয়ং সৎ ইতি এব অভিধীয়তে।।

যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানে যে পরম নিষ্ঠা তাকেও ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে, ‘তৎ’ অর্থাৎ পরমেশ্বরে নিবেদিত সমস্ত কর্মকেই ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে।

 

২৮

অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতঞ্চ যৎ।

অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।

অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপঃ তপ্তং কৃতং চ যৎ।

অসৎ ইতি উচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।

হে পার্থ, যজ্ঞ, দান, তপস্যা কিংবা যে কোন কর্ম, অশ্রদ্ধায় অনুষ্ঠিত হলে, তাকে অসৎ বলা হয়ে থাকে। এই সমস্ত কর্ম থেকে না পরলোকে কোন ফললাভ হয়, না ইহলোকে। 


শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ সমাপ্ত

এর পরের পর্ব  - " গীতা - ১৮শ পর্ব "

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...