ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১০ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
একাদশ পর্বাংশ
৪.৫.৮ বিজ্ঞান
৪.৫.৮.১ মহাকাশ ও পৃথিবী
বৈদিক বিশ্ব ছিল খুবই সহজ সরল, উপরে স্বর্গ, নিচেয় এই
পৃথ্বী, আর
এই দুইয়ের মাঝে আছে অন্তরীক্ষ বা বায়ু। স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররা
ঘুরে বেড়ায় এবং অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায় যত পাখি, মেঘ এবং উপদেবতারা। বৈদিক সাহিত্যের
ঋষিরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁরা সরল কিন্তু গভীর মননশীল
প্রজ্ঞার দর্শন নিয়েই বড়ো প্রশান্তির জীবন যাপন করতেন।
কিন্তু পরবর্তী কালে, বৈদিক দর্শন
থেকে অনেকটাই সরে আসা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা যখন বৌদ্ধ, জৈন এবং
সুপ্রাচীন অনার্য ধর্মীয় শাখাগুলির কাছে যথেষ্ট শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন, তখন বৈদিক
প্রজ্ঞার সীমায় বন্দি না থেকে, তাঁরা সুপ্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব
নিয়ে জটিল সব তত্ত্ব ও কাহিনি রচনা শুরু করলেন। এই কাহিনি রচনার শুরু খ্রিস্টপূর্ব
মোটামুটি দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন এক সময় থেকে।
প্রথমতঃ তাঁরা এই মহাবিশ্বকে কল্পনা করলেন
ব্রহ্মাণ্ড – যার স্থূল অর্থ ব্রহ্মের অণ্ড। এই ব্রহ্মাণ্ড একুশটি অঞ্চল বা বিভাগে
বিভক্ত। উপর থেকে ধরলে পৃথিবী বা মর্ত্যের স্থান সপ্তম। পৃথিবীর উপরের ছয়টি স্তরে
আছে ঊর্ধলোক। পৃথিবীকে বলা হয় ভূলোক এবং এর ঊর্ধের ছ’টি লোক হল, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ এবং
সত্য বা ব্রহ্মলোক। এগুলিকে স্বর্গও বলা হয়। বিভিন্ন স্বর্গের সুখের মাত্রা আলাদা
এবং মর্ত্যলোকের পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন স্বর্গলাভ হয়ে থাকে। ভূলোক
এবং ছটি স্বর্গলোকের কথা অবিশ্যি বেদেও উল্লেখ আছে। পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরে আছে
সপ্ত পাতাল, যেমন, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও
পাতাল। পাতালের পরেও আছে সাতটি স্তর, সেগুলি নরক, যেমন
তমিস্রা, অন্ধতমিস্রা, রৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, শূকরমুখ, অন্ধকূপ।
পুণ্য সঞ্চয়ের মতো পাপ সঞ্চয়েরও মাত্রা আছে, সেই মাত্রা অনুসারে, মৃত্যুর পর
মৃদু থেকে ভয়ংকর কষ্টদায়ক নরকে যেতে হত।
সে যাই হোক, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ও
নরকের ধারণা যে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সমসাময়িক
প্রচলিত ধর্মগুলির থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। তাঁরা সাধারণ মানুষকে
বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন,
পুণ্য ও পাপ এবং তার ফলে প্রাপ্য পুরষ্কার ও তিরষ্কারের ধারণা। তাঁদের
উচ্চারিত প্রত্যয়ী মন্ত্রের ব্যাখ্যায়, কথকতায়, ধর্মকথায়
কল্পনার জগতের দুয়ার খুলে গেছিল সাধারণ মানুষের মনে। তাঁরা আশ্চর্য হয়েছিলেন, অভিভূত
হয়েছিলেন, এবং
বিশ্বস্ত হয়েছিলেন। আমাদের ছোটবেলাতেও গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, বাঁধানো ফ্রেমে
আঁকা নরকভোগের রঙিন চিত্রপট। সেখানে যমদূতেরা চোরদের হাত কাটে, পরকীয়া
প্রেমিক-প্রেমিকাদের লোহার কাঁটাওয়ালা স্তম্ভ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়, ফুটন্ত তেলে
পাপীদের ভাজতে ভাজতে (deep
fry) যমদূতরা মাথায় ড্যাঙস মারে, ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণ মানুষ যখনই
বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে লাগল,
বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রশান্ত অধরে ফুটে উঠল সাফল্যের মৃদু হাসি এবং
তাঁরা আরও নিবিড় কল্পকাহিনি রচনায় মগ্ন হতে লাগলেন – সেই সব কাহিনিই পুরাণ।
এই তত্ত্বও কিছু বছরের মধ্যে অনেকটাই বদলে গেল, খ্রিস্টপূর্ব
প্রথম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে খ্রিস্টাব্দ প্রথম দুই শতাব্দীতে। তখন এই
বিশ্ব-পৃথিবী হয়ে উঠল মোটামুটি সমতল বিশাল থালা বা রেকাবির মতো। যার কেন্দ্রে আছে
মেরুপর্বত, যাকে
ঘিরে ঘুরে চলেছে সূর্য,
চন্দ্র, গ্রহ
এবং সকল নক্ষত্র। দশদিকে আছে দশ দিকপাল। এই মেরুপর্বতকে ঘিরে আছে জম্বুদ্বীপ। তার
চারদিকে ঘিরে রয়েছে লবণ-সমুদ্র। দক্ষিণের এই দ্বীপ-মহাদেশের নাম জম্বুদ্বীপ। জম্বু
মানে জাম গাছ, এই
অঞ্চলে জামগাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। লবণ সমুদ্রকে ঘিরে
রয়েছে যে স্থলভূমি তার নাম প্লক্ষদ্বীপ। সেই দ্বীপের নাম প্লক্ষ নামের এক স্বর্ণময়
বৃক্ষের নামে। প্লক্ষদ্বীপকে ঘিরে আছে ইক্ষুরস(ঝোলা-গুড়)-সমুদ্র। এই সমুদ্রকে ঘিরে
আছে শাল্মলদ্বীপ – এই নাম ওই দ্বীপে একটি শাল্মলী গাছ থাকার কারণে। শাল্মলীদ্বীপকে
ঘিরে আছে সুরা-সমুদ্রের বলয়। এভাবেই একের পর এক দ্বীপ ও সমুদ্র আছে যথাক্রমে
কুশদ্বীপ-ঘৃতসমুদ্র,
ক্রৌঞ্চদ্বীপ-ক্ষীরসমুদ্র, শাকদ্বীপ-দধিমণ্ডসমুদ্র, পুষ্করদ্বীপ-শুদ্ধোদকসমুদ্র।
শুদ্ধোদক সমুদ্রের পরে আছে লোকালোক (লোক+অলোক) পর্বত। যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো
পৌঁছায় তার নাম লোক,
তার বাইরের দেশগুলি যারা সূর্যালোক বঞ্চিত – তাদের নাম অলোক। (শ্রীমদ্ভাগবত/৫ম
স্কন্ধ/ অধ্যায় ২০)
বিশ্ব-তত্ত্বের শেষ দুটি ধারণা পুরাণ থেকে নেওয়া
হয়েছে, যে
পুরাণগুলি, বিশেষজ্ঞরা
বলেন, মোটামুটি
খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এবং সর্বশেষ পুরাণ লেখা হয়েছে, খ্রিস্টীয়
প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে। অতএব সহজেই অনুমান করা যায় পুরাণের এই
তত্ত্বগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এর কয়েকশ বছর আগে থেকেই। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা দেখেছি, মৌর্য যুগের
আগে থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্য সূত্রে পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিসের মতো
দেশগুলির সঙ্গে ভারতের নিবিড় পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিচয় না থাকলে বীর আলেকজাণ্ডার
ভারতজয়ের স্বপ্ন কেন দেখেছিলেন? মৌর্যযুগ
থেকে এই বৈদেশিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং খ্রিস্টপূর্ব শেষ দুটি শতাব্দী
থেকে এদেশে রাজত্ব বিস্তার করেছেন, গ্রিক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব
প্রভৃতি জাতি। তা সত্ত্বেও,
ব্রাহ্মণ্য এবং হিন্দু পণ্ডিতেরা বিশ্বতত্ত্বের এমন হাস্যকর ধারণা করলেন কেন, সেকথা তাঁরা এবং তাঁদের ভগবান
ছাড়া আর কে বলতে পারবেন?
পৌরাণিক গ্রন্থে বিশ্বতত্ত্বের ধারণা যাই হোক, এর পাশাপাশি
ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্ব ও মহাকাশের ধারণা ছিল বিস্ময়কর – এবং সে ধারণার
শুরু হয়েছিল বৈদিক এমনকি প্রাক-বৈদিক যুগেও।
৪.৫.৮.২ গণিত
ভারতীয় অংক, বিশেষ করে জ্যামিতি, পরিমিতি, কৌণিক মাপ, সূক্ষ্ম
থেকে স্থূল ওজন পরিমাপের নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে আমরা দেখেছি। অতএব
যজ্ঞবেদী নির্মাণের থেকে ভারতীয় জ্যামিতি ও পরিমিতির সূচনা এমন ধারণা যে আমাদের
মধ্যে প্রচলিত রয়েছে,
তার সঙ্গে আমি অন্ততঃ কোন ভাবেই সহমত হতে পারি না। বরং আর্যরা বৈদিক যজ্ঞবেদী
নির্মাণের নানান মাপ-জোক শিখেছে অনার্য মানুষদের থেকেই।
কিন্তু এরপর এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খুব
স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও,
যখন থেকে লিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে, সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা ও
সাফল্য চমকপ্রদ। লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ তৃতীয় এবং চতুর্থ
শতাব্দীর মধ্যেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যামিতি ও পরিমিতিতে প্রভূত উন্নতি করে
ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিরপেক্ষ সংখ্যা (Abstract Number) এবং
বীজগণিত।
নিরপেক্ষ সংখ্যা হল বিশেষ একধরনের লিপি, যা দিয়ে
শুধু মাত্র সংখ্যাই বোঝানো যায়। যেমন, ৩, ৪, ৯ – এগুলি নিরপেক্ষ সংখ্যা, কিন্তু যখনই
৩ দিন, ৪
কি.মি. বা ৯ জন বলা হবে তখন সেগুলি নানান বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিমাপ বোঝাবে। এই
নিরপেক্ষ সংখ্যা আবিষ্কার,
ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনন্য সৃষ্টি, যার ওপরে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাই
দাঁড়িয়ে আছে। উপরন্তু,
এই নিরপেক্ষ সংখ্যার বৈশিষ্ট্য হল দশটি মাত্র লিপি - ১ থেকে ৯ এবং ০ দিয়ে
পৃথিবীর বৃহত্তম সংখ্যা অতি সহজে এবং সংক্ষেপে লিখে ফেলা যায়। এই সংখ্যার জাদু ধরা
পড়বে একটি উদাহরণ দিলে,
১২৩৪ সংখ্যাটি সমসাময়িক রোমান ভাষায় লিখতে গেলে, MCCXXXIV দাঁড়াবে। ১২৩৪ সংখ্যাটিকে যদি
আমরা ভাঙি – তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় – ১০০০+২০০+৩০+৪, এই অনুযায়ী M(১০০০), CC(২০০), XXX(৩০), IV(৪)। এভাবেই আমরা তিরিশ কোটি সংখ্যাটি, অংকের নিয়মে
লিখে ফেলতে পারি, ৩ x ১০৮। কিন্তু
রোমান ভাষায় তিরিশ কোটি লেখার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম।
এই লিপির মধ্যে ০ (শূন্য) সংখ্যাটির গুরুত্ব
সীমাহীন, সীমাহীন
সংখ্যা লিখতে। এই লিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় গুজরাটের ৫৯৫ সি.ই.-র একটি
শিলালিপি থেকে, অতএব
অনুমান করা যায় এর শিলালিপি লেখার অনেক আগে থেকেই শূন্য সংখ্যার ব্যবহার জনপ্রিয়
হয়ে উঠেছিল। এই শিলালিপির প্রায় সমসময়ে, এই সংখ্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া
গেছে, সিরিয়া
এবং সুদূর ভিয়েতনামে! এইসংখ্যা-লিপির আবিষ্কার কে করেছিলেন সঠিক জানা যায় না, খ্রিস্টীয়
চতুর্থ শতাব্দীর একটি পাণ্ডুলিপিতেও – “বকশালী পাণ্ডুলিপি” -এই সংখ্যা-লিপির
ব্যবহার দেখা গেছে। ৪৯৯ সি.ই.তে লেখা বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট, তাঁর
গ্রন্থে এই সংখ্যালিপি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট সংখ্যা বা
শূণ্যের আবিষ্কর্তা নন,
তাঁর আগেই এগুলির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।
গণিতবিদ আর্যভট্টের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে
অবদান অবিশ্বাস্য। জ্যামিতিতে, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল – ভূমির অর্ধেক এবং লম্ব উচ্চতার গুণফল, বৃত্তের
ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে – পাই (π)-এর দশমিকের পর চার সংখ্যা পর্যন্ত
অভ্রান্ত মান নির্ণয় – ৩.১৪১৬। প্রসঙ্গতঃ
তিনি প্রথম সংখ্যার দশমিক হিসেব আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের
প্রচলিত চান্দ্র-বছরের জটিল হিসাবের পরিবর্তে তিনি সৌর-বছরের প্রচলনের প্রস্তাব
দেন এবং তাঁর সৌর বছরের হিসেব আধুনিক হিসেবের তুলনায় প্রায় নিখুঁত – ৩৬৫.৩৫৮৬৮০৫
দিন! তিনিই বিশ্বে প্রথম পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করেছিলেন এবং মত দিয়েছিলেন
পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। তিনিই প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পৃথিবীর
ছায়া পড়ে চাঁদে গ্রহণ হয় এবং চাঁদ সামনে চলে আসে বলে সূর্যগ্রহণ হয়। তার আগে
পর্যন্ত পৌরাণিক ধারণা ছিল রাহু নামের এক রাক্ষসের অমর মুণ্ড চাঁদকে এবং সূর্যকে
গ্রাস করে। ইংরেজদের হাত ধরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত ভারতীয়
পণ্ডিত বা অশিক্ষিত সমাজের এই বিশ্বাসকে আর্যভট্ট এতটুকুও প্রভাবিত করতে পারেননি।
বরং তাঁর অনেকগুলি সিদ্ধান্ত প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনঃপূত না হওয়াতে, সম্ভবতঃ
তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সেগুলিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
আর্যভট্টের সামান্য পরে বরাহমিহির
জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy)
সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা (Astrology)
এবং রাশিফল বা কোষ্ঠী বিচারকেও যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট জীবিত থাকলে
নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতেন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চার সিদ্ধান্ত অনেক
ক্ষেত্রেই মেলে না, এমনকি
বিপরীত কথা বলে। বরাহমিহিরের “পঞ্চসিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থে সমসময়ের জ্যোতির্বিদ্যার
পাঁচটি ঘরানার সংকলন এবং আলোচনা করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি সিদ্ধান্তের কথা আগেই
বলেছি, “রোমক”
এবং “পৌলিশ” সিদ্ধান্ত।
এই সময়ে আরবের প্রজ্ঞাবান মানুষদের সঙ্গে ভারতের
বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরবের পণ্ডিত মহলে ভারতের আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা
এবং গণিতের খুবই সমাদর ছিল। একসময় বাগদাদ সম্রাটের (খলিফা) রাজসভায় অনেক ভারতীয়
পণ্ডিত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁরা বসবাস করতেন। এই বাগদাদ আরবি
পণ্ডিতদের মাধ্যমেই পরবর্তী কালে, ভারতীয় গণিত ইউরোপের বিদ্বান সমাজে পৌঁছেছিল।
৪.৫.৯ ধর্ম
এই সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত
হয়ে গেছে। নতুন ধর্মের ধর্মশাস্ত্রগুলি নতুন করে রচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনা, নতুন আদর্শ
এবং দর্শনে। এই হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই বৌদ্ধধর্মও অনেকটা হীনবল
হয়ে উঠল। ভারত থেকে হীনযানী মত প্রায় দুষ্প্রাপ্য হতে বসল, মহাযানী মতও
দুর্বল হয়ে গেল, কারণ
মহাযানী শাখা ভেঙে উদ্ভব হল নতুন শাখা বজ্রযানী মত। বিপুল এই পরিবর্তনের কথা
সবিস্তারে আসবে পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে। তার আগে দেখা নেওয়া যাক হর্ষ পরবর্তী
ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন