শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৫

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৪ 


পঞ্চম পর্ব   


১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজকে পরাস্ত করে ভারত শাসনের সূচনা করেছিল, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি নামক ব্রিটিশ বণিক সংস্থা। অর্থাৎ সে সময় ভারতের কিছু অঞ্চলে শুরু হয়েছিল কোম্পানি রাজ। এই সময়ের প্রধান তিনটি অঞ্চল হল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, বম্বে প্রেসিডেন্সি এবং ম্যাড্রাস প্রেসিডেন্সি। এই প্রত্যেকটি প্রেসিডেন্সিতে ছিল আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা। কোম্পানি আমলে ব্রিটিশ বণিকরা মুঘল সম্রাটদের অনুমতি সাপেক্ষে মুদ্রা প্রকাশের ক্ষমতা পায়। যেমন বেঙ্গল রেসিডেন্সির মুদ্রা ছাপানো হত কলকাতার টাঁকশালে, মুঘল বাদশা দ্বিতীয় আলমগির (১৭৫৪ - ১৭৫৯) এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় শাহ আলমের (১৭৬০-১৮০৬) নামে।

১৭৫৭ সালে কলকাতার প্রথম টাঁকশাল স্থাপিত হয়েছিল যে জায়গায় – সেটি এখনকার বিবাদি বাগের জিপিও-র কাছাকাছি। সে সময় বাংলায় প্রচলিত “টাকা-আনা-পাই” মুদ্রা-মূল্য অনুযায়ী এই মুদ্রাগুলি ছাপা হয়েছিল। সেই হিসাবটি ছিল এইরকম – 

এক মোহর ছিল প্রায় ১৫ টাকার সমান  

এক টাকা = ১৬ আনা = ৬৪ পয়সা = ১৯২ পাই।  

এক আনা = ৪ পয়সা (Pice)

এক পয়সা = ৩ পাই।

সেকালে সাধারণ মানুষ মোহরের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না, তাদের কাছে একটি টাকা অর্থাৎ ষোল আনাই ছিল পূর্ণ-প্রাপ্তির প্রতীক। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত নাট্যকার গিরিশ ঘোষকে “ষোল আনা কৃপা” দান করেছিলেন, গিরিশ ঘোষ সেই প্রাপ্তিতে ঠাকুরের চরণ-বন্দনা করেছিলেন আনন্দাশ্রু দিয়ে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পাই-পয়সা-আনার মূল্যমান বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। তবে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা কিছুটা স্পষ্ট হবে। আজও উত্তর কলকাতায় বেশ কিছু “পাইস-হোটেল” চালু আছে – এই হোটেলগুলিতে সে সময় এক পয়সায় ভরপেট ভাত-ডাল-তরকারি খাওয়া যেত বলেই এই হোটেলগুলির নাম হয়েছিল পাইস হোটেল। বলাবাহুল্য, আজকের দিনে পাইস হোটেলগুলির মালিকরা একপয়সায় ভাত খাওয়াতে পারেন না – আধুনিক মূল্যমান অনুযায়ীই তাঁরা দাম নির্ধারণ করেন।    

অথবা, ১৯৫৩ সালের পয়লা জুলাই কলকাতা শহরে ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম কোম্পানি, তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের অনুমতি নিয়ে। তার প্রতিবাদে সিপিআইয়ের ডাকে সাধারণ জনগণ এবং বিশেষ করে ছাত্র সমাজ উত্তাল হয়ে উঠেছিল, স্তব্ধ করে দিয়েছিল শহরের জীবনযাত্রা।

অতএব এক পয়সার মূল্যমান ১৯৫৩ সালেই যদি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এর থেকে একশ-দেড়শ বছর আগে তার মূল্যমান কেমন ছিল কিছুটা অনুমান করা যায়।

 মূল প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। ভারতে কোম্পানি-রাজের সমাপ্তি হয়েছিল ১৮৫৭ সালে – ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের ঠিক পরে পরেই - অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে ভারত শাসনের দায়িত্ব নিয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট।

শাসন ব্যবস্থা হাতে নিয়েই ১৮৬২ সালে, ব্রিটিশ-রাজের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যে সোনার মোহর এবং অন্যান্য মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল – সেটি নীচের ছবিগুলিতে দেখা যাবে –

রাণি ভিক্টোরিয়ার ছবি সহ মোহর

 

এর পর যেমন যেমন ব্রিটিশ সিংহাসনে রাজা বদল হয়েছে, বদল হয়েছে মুদ্রাগুলিও –

 

রাজা সপ্তম এডোয়ার্ডের (১৯০১-১৯১০) নামাঙ্কিত মুদ্রা।  

 

 রাজা পঞ্চম জর্জের (১৯১০ - ১৯৩৬) নামাঙ্কিত মুদ্রা।

 ১৯৩৯ সালে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ – শেষ হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধের কারণে রূপোর সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেওয়ায় - মুদ্রায় রূপোর শতকরা পরিমাণ হ্রাস করে সকল মূল্যমানের নতুন মুদ্রা চালু করতে হয়েছিল। এই সময়কার এক পয়সার মুদ্রাগুলি ছিল অভিনব এবং সুদর্শন –

     

১৯৪৫/ ১৯৪৭ সালের এক পয়সার ব্রিটিশ মুদ্রা

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে রাখি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সৈন্য দল (Indian National Army - INA) উত্তরপূর্ব ভারতের মিজোরাম, মণিপুর ও নাগাল্যাণ্ডের কিছু অংশ ব্রিটিশদের থেকে অধিকার করে নিয়েছিলেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সেই স্বাধীন আংশিক-ভারতে ব্রিটিশ মুদ্রার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়ে, তিনি চালু করেছিলেন জাপানি টাকা ও মুদ্রা ব্যবস্থা।

 ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পরেও তিন বছর ভারতে ব্রিটিশ মুদ্রা ব্যবস্থাই চালু ছিল। ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি আমাদের সংবিধান রচিত হওয়ার পর, ওই বছর ১৫ই আগষ্ট তারিখে ভারতের নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। বদলে দেওয়া হয় মুদ্রার মূল্যমান ব্যবস্থাও – আগের টাকা-আনা-পয়সা-পাইয়ের হিসাব বাতিল করে, শুরু হয় দশমিক পদ্ধতির মুদ্রা ব্যবস্থা। অর্থাৎ এখন আর ১৬ আনা বা ৬৪ পয়সার টাকা নয় – এক টাকার মূল্যমান হল একশ নয়া পয়সা – অর্থাৎ এই পয়সাও আর আগের পয়সা নয় – নয়া (নতুন) পয়সা।  

 

Rupee One

Nickel
10gms
Circular
28 mm

Fifty Naye Paise

Nickel
5 gms
Circular
24 mm


Twenty Five Naye Paise

Nickel
2.5 gms
Circular
19 mm



Ten Naye Paise

Cupro-Nickel
5 gms
Eight Scalloped
23 mm (across scallops)

Five Naye Paise

Cupro-Nickel
4 gms
Square
22 mm (across corners)



Two Naye Paise

Cupro-Nickel
3 gms
Eight Scalloped
18 mm (across scallops)



One Naya Paisa

Bronze
1.5 gms
Circular
16 mm



আধুনিক ভারতীয় মুদ্রা – ২০১৯

20
Twenty Rupees

Center: Nickel-brass

Ring: Nickel silver

Dia – 27 mm

10

Ten Rupees

Center: Copper-Nickel

Ring: Aluminium-Bronze

Dia – 27 mm

5

Five Rupees

Nickel-brass

Dia – 25 mm

2

Two Rupees

Stainless steel

Dia - 23 mm

1

One Rupee

Stainless steel

Dia – 20 mm

 

সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকে ধরলে, ভারতের মুদ্রার ইতিহাস প্রায় সাড়ে-চার/পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। প্রকৃতপক্ষে এই মুদ্রা চর্চা থেকে সমকালের অনেক না বলা ইতিহাস বেশ স্পষ্টভাবে ধরা দেয় আমাদের কাছে। কোন সম্রাট বা রাজা কিংবা বণিক সংঘের প্রচলন করা মুদ্রার গুণমান দেখে বোঝা যায় সে সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যবস্থা কেমন ছিল। তাঁদের রাজকোষে মোটামুটি কত পরিমাণ সোনা বা রূপো সঞ্চিত ছিল। কারণ খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজকোষে সোনা ও রূপোর সঞ্চয়ের ওপরেই নির্ভর করে কোন সাম্রাজ্যের বা রাজ্যের কিংবা আধুনিক কোন দেশের স্বচ্ছলতা অথবা অর্থ সংকট।

বোঝা যায় অন্তর্দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্য কেমন ছিল সে তথ্যও। বিশ্বের নানান দেশে খুঁজে পাওয়া আমাদের মুদ্রা অথবা আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া বিদেশী মুদ্রার সম্ভার থেকে সহজেই আন্দাজ করে নেওয়া যায় - বিশ্বের কোন কোন দেশের সঙ্গে কোন কোন সময়ে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন ছিল। সে সম্পর্ক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, কবে শেষ হয়েছিল এবং কেনই বা সে সম্পর্ক টুটে গেল? একই ভাবে, বাংলার পাল যুগের মুদ্রা যদি পাওয়া যায় তক্ষশিলা অথবা কেরালার বন্দরে। কিংবা চোল রাজাদের মুদ্রা যদি পাওয়া যায় কনৌজ বা ত্রিপুরায় – তার থেকেও জানা যায় সেকালের আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের রূপরেখাও।

আবার অনেক মুদ্রা থেকে জানা যায় সম্রাট বা রাজা কোন ধর্মে বিশ্বাসী, কোন দেবদেবীর ভক্ত। সে রাজার চেহারা কেমন, যুদ্ধ জয় আর রাজ্য শাসন ছাড়াও সে রাজার আর কি কি গুণ ছিল – এসব তথ্যও।

এমনকি কোন কোন যুগে কোন কোন ধাতু কত পরিমাণে মিশিয়ে মুদ্রা বানানো হয়েছিল – তার থেকে সাক্ষাৎ টের পাওয়া যায় সেই যুগের ধাতুবিজ্ঞান এবং শিল্পীদের ধাতুবিদ্যার দৌড়।

অর্থাৎ কোন এক যুগের কয়েকটি মুদ্রা পেলেই, একালের বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রত্নবিদ, ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি অপরাধ-বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান অজস্র তথ্য ও তত্ত্বের ভাণ্ডার। অপরাধ-বিজ্ঞানীদের কথা বললাম, কারণ সে যুগেও নকল মুদ্রার প্রচলন কি কম ছিল?

সভ্যতার হাত ধরে, সারা বিশ্বেই আজকাল মুদ্রার ব্যবহার কমছে। মুদ্রা না থাকলে শেষ হয়ে যাবে কত না গল্প ও কাহিনীর মায়াজাল। হারিয়ে যাবে গুপ্তধনের সন্ধানে, রবিঠাকুরের দেওয়া সংকেত “তেঁতুল বটের কোলে/দক্ষিণে যাও চলে/ঈশান কোণে ঈশানী/কহে দিলাম নিশানী" অথবা সত্যজিতের "মুড়ো হয় বুড়ো গাছ হাত গোন ভাত পাঁচ দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে। ফাল্গুন তাল জোড় দুই মাঝে ভুঁই ফোড় সন্ধানে ধন্দায় নবাবে।"

আগে মুদ্রা বহনের জন্যে মোটা কাপড়ের তৈরি বটুয়া ব্যবহৃত হত। দরিদ্ররা চুরি-ডাকাতির ভয়ে ময়লা, তেলচিটে বটুয়া লুকিয়ে বেঁধে রাখত কোমরে ধুতির আড়ালে। ধনীদের সুদৃশ্য মখমলি কাপড়ের বটুয়া বহন করত বিশ্বাসী দেহরক্ষীরা। মুদ্রার পরিবর্তে যখন থেকে এল এক টুকরো কাগজ, যাকে বলে নোট। সেই নোটও লুকিয়ে রাখার জন্যে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জামা বা প্যাণ্টে বানানো হত চোরা-পকেট। স্বচ্ছলদের জন্যে বানানো হল সুদৃশ্য পার্স বা ওয়ালেট।     

কিন্তু সে নোটও এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। টাকাকে এখন ছোঁয়া যায় না, দেখাও যায় না, নিছক সংখ্যা হিসেবে দেখা যায়, এক নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের যোগসাজশে মোবাইল ফোন অথবা ল্যাপটপের পর্দায় “ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন”।     

সেই সব নোট আর অধরা টাকার গল্প আসবে পরের পর্বে।

চলবে...

কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৫

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - "  হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প)   " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - "  পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্...