এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩ "
২০
নোনাপুর গ্রামের সীমানার বাইরেই ঘন একটা ঝোপের আড়ালে মারুলা রয়ে গেল। ভল্লা তার কাছেই রণপাজোড়া রেখে পায়ে হেঁটে গ্রামের ভেতরে ঢুকল। ঘন গাছপালার আড়ালে, বিড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে দৌড়ে চলল গ্রামপ্রধানের বাড়ির পিছনদিকে। জ্যোৎস্না রাত, ঝিঁঝিঁর একটানা শব্দ আর গাছের পাতায় পাতায় হাওয়ার মর্মর-রব ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই। পাড়ার কুকুরগুলোও আজ রাত্রে চুপচাপ। তারাও হয়তো বোঝে এ গ্রামে আজ শোকের পরিবেশ। সারাদিন ঘরে ঘরে আজ একটাই আলোচনা – হানোর মৃত্যু। সারাদিনের পর এই চাঁদনি রাতও আজ যেন সকলের কাছে অশুভ। কোথাও একটা পেঁচা দুবার ডেকে উঠল গম্ভীর সুরে। তারপরেই হঠাৎ ডেকে উঠল একটা দাঁড় কাক। সে শব্দে অবাক হল গাছের ডালে বসে ঘুমিয়ে থাকা কাকগুলো। পেঁচাটাও যেন ভয় পেয়ে নিঃশব্দে উড়ে গেল দূরের পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের দিকে।
কমলিমা ঘরের দরজা খুলে নিঃশব্দে
বেরিয়ে এলেন। ঘরের পিছনে এসে দেখতে পেলেন বড়ো একটা গাছের ছায়ায় ভল্লা দাঁড়িয়ে আছে।
দ্রুত পায়ে ভল্লার কাছে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কমলিমা, ভল্লা ইশারা করল চুপ। তারপর
কমলিমায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল, একটু দূরে। ছায়াময় বিশাল এক বটগাছের তলায় নিয়ে গিয়ে
মোটা একটা শিকড় দেখিয়ে বলল, “এই খানে বস মা, কেমন আছিস বল”? তারপর নিজে বসল কমলিমায়ের
পায়ের কাছে।
“আমার কথা ছাড়, তুই কেমন
আছিস বল? এতদিন পর তোর কমলিমাকে মনে পড়ল?”
মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ
করে বসে রইল ভল্লা, তারপর মুখ তুলে বলল, “ভাল আছি তো বলতে পারবো না, মা। সে কথা বললে
মিথ্যে বলা হবে। তোর কাছে যে কদিন ছিলাম, বড়ো নিশ্চিন্তে আর স্বস্তিতে ছিলাম। এখন চলে
যাচ্ছে, কোন মতে। নির্বাসনে থাকা একজন অপরাধীকে তো এভাবেই থাকতে হবে, মা”। কমলিমা ভল্লার
মাথায় হাত রাখলেন। তার চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাঁর বড়
পুত্রকেই যেন অনুভব করলেন। অন্ধকারে দেখতে না পেলেও ভল্লা বুঝতে পারল, কমলিমায়ের দুচোখ
এখন জলে ভরে উঠেছে।
“প্রধানমশাই ভাল আছেন তো?”
“হুঁ। ভালোই আছে”।
“প্রধানমশাই যে আস্থানের
আধিকারিককে কিছু কর ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, সেটার কী হল, কিছু জানিস, মা?”
“দেয়নি। গ্রামের লোক তোকে
আশ্রয় দিয়েছে। চিকিৎসা করে তোকে সারিয়ে তুলেছে। এসব শুনে রাজা নাকি বলেছে এই গ্রামের
জন্যে কোনরকম দয়া বা অনুগ্রহ
দেখানো যাবে না”।
ভল্লা কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস
ফেলে চুপ করে রইল।
কমলিমা হঠাৎ ক্ষুব্ধ স্বরে
বলে উঠলেন, “সেই জন্যেই তো তোর ওপরে ওদের খুব রাগ”।
“কাদের, মা?”
“প্রধান আর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা”!
ভল্লা হেসে ফেলে বলল,
“তুই বড্ডো বাড়িয়ে বলিস মা। রাগ কেন করতে যাবেন? হ্যাঁ বিরক্ত হতেই পারেন। একটা
মরণাপন্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাষ্ট্রের রোষদৃষ্টিতে পড়া...। একদিকে বিবেক বলছে যা
করেছি ঠিক করেছি, আর অন্যদিকে বাস্তববুদ্ধি বলছে, বিবেক দেখিয়ে পোঁদপাকামি করার কী
দরকার ছিল? এখন তার ফল ভোগ করো...”।
কমলিমা অবাক হয়ে গেলেন
ভল্লার কথায়, তিনি আলো-আঁধারিতে ভল্লার মুখের দিকে তাকালেন। ভাবলেন ছোঁড়ার আশ্চর্য
চিন্তাশক্তি তো! তিনি এভাবে কখনো ভাবতে পারেননি। তিনি ঘরে থাকেন, কাজকর্ম করেন,
গ্রামের মধ্যেই তাঁর সীমানা। তাঁর চিন্তা একমুখী। কিন্তু প্রধান বা কবিরাজদাদার তো
তা নয় – তাঁদের চাষবাস করতে হয়, বাইরের লোকজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় রাখতে হয়। এই
গ্রামের সকল মানুষের স্বার্থ চিন্তা করে, গ্রামবাসীদের হয়ে রাজাধিকারিকদের সামনে গিয়েও তাঁদের দাঁড়াতে হয়। তাঁদের বিবেক
এবং বাস্তব বিবেচনা – দুই কূলই সামলে চলতে হয় বৈকি।
“চুপ করে কেন, মা? কি
ভাবছিস, বল তো? যাগ্গে ওসব কথা ছাড়, হানোর বাড়ির কী পরিস্থিতি? শুনলাম হানো নাকি
সাপের কামড়ে মারা গেছে?”
ভল্লার আগের কথায় কমলিমায়ের
মনটা একটু নরম হয়েছিল, এখন এই প্রশ্নে তিনি আবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বললেন, “সে কথাই
তো বলছি, আজ সন্ধের সময় কবিরাজদাদা এসেছিল, প্রধানের সঙ্গে অনেক কথা বলল। কিন্তু
দুজনের কেউই হানোকে নিয়ে একটা কথাও বলল না। অমন একটা জলজ্যান্ত তরতাজা ছেলে চোখের
সামনে মরে গেল – দুজনের কারো মনেই যেন হেলদোল নেই”!
ভল্লা হেসে ফেলল, বলল,
“আজ দেখছি খুব রেগে আছিস মা? কী ব্যাপার বল তো? কী বলল
কবিরাজবুড়ো?”
ভল্লার কথাটা কমলিমায়ের
বেশ মনঃপূত হল, বললেন, “যা বলেছিস। বুড়ো তো বুড়োই – মনে হয় ভীমরতি ধরেছে। যতসব
মনগড়া কথা বলে প্রধানের আর আমার মনে বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। আমাকে বোঝাতে পারেনি, তবে
প্রধানের মাথাটি মনে হয় চিবিয়ে ফেলেছে”।
ভল্লা একটু জোরে হেসে
উঠেই সতর্ক হয়ে গলা নামিয়ে বলল, “বলিস কী মা? কবিরাজবুড়ো ওষুধ না দিয়ে এখন সাপের
মতো বিষও ঢালছে নাকি? তা সে বিষ কেমন একটু শুনি”।
“তুই হাসছিস? কী বলেছে
শুনলে তুই চমকে যাবি। বলে কিনা আমাদের গ্রামের কোন ছেলেই নাকি কাল পাশের রাজ্যে
রামকথা শুনতে যায়নি? তারা আস্থানে গিয়েছিল ডাকাতি করতে। গতকাল রাত্রে আস্থানে
ডাকাতি হয়েছে শুনেছিস তো? কবিরাজদাদা বলল, ডাকাতের দল সেখানকার তিনরক্ষীকে নাকি মেরে
ফেলেছে! হরে দরে যা বোঝাতে চাইল, সে সব নাকি
আমাদের এই গ্রামের ছেলেদেরই কাজ”।
ভল্লা খুব সতর্ক
দৃষ্টিতে কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এবং অবাক হল
কবিরাজবুড়োর আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতায়। তবু খুব হাল্কা চালে বলল, “আচ্ছা? ছেলেরা
রামকথা শুনতে না গিয়ে, আস্থানে গেছিল ডাকাতি করতে – এ সংবাদটা তোর কবিরাজদাদা কী
করে টের পেল বল তো? কবিরাজবুড়ো কী আজকাল জ্যোতিষচর্চাও শুরু করছে নাকি?”
“কে জানে? বুড়োর মাথায় যত রাজ্যের কুচুটে
চিন্তা দিনরাত কিলবিল করছে। পুঁইয়ে সাপের মতো। প্রধানকে বললে, ছোকরাদের অত বড়ো দলকে
একসঙ্গে কোনদিন রামকথার আসরে যেতে দেখেছ? সে আমাদের গ্রামেই হোক বা পড়শি গ্রামে?
তারা কিনা ঠিক কালকেই দল বেঁধে জঙ্গল পার হয়ে এতটা পথ হেঁটে পাশের রাজ্যে গেল
রামকথা শুনতে? আচ্ছা, ছেলে ছোকরাদের মতিগতি কি আমাদের মতো বুড়ো-বুড়ীদের ভাবনা-চিন্তার মতো হবে? তাদের মাথায় কখন কোন বাই চাপে কে বলতে পারে?” ভল্লা
নিঃশব্দে শুনতে লাগল কমলিমায়ের কথা। তার দৃষ্টি এখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে।
কবিরাজবুড়ো অত্যন্ত বুদ্ধিমান – সন্দেহ
নেই। কিন্তু এত সব বুঝে ফেলে তিনি যে নিজের সমূহ বিপদই ডেকে আনছেন
– সেই কথাটা বুড়ো বুঝছেন না কেন?
কমলিমা কিছুটা উত্তেজিত
সুরে আরও বললেন, “কত কি আবোল-তাবোল যে বকে গেল – শুনলে তোরও মাথা গরম
হয়ে যেত ভল্লা! বলে কিনা রাজধানীতে মারধোর
খেয়ে, তুই যে রাত্রে রওনা হয়েছিলি – আর
এখানে এসে তুই যেদিন ভোরে পৌঁছলি – হেঁটে
এলে ওই সময়ের মধ্যে পৌঁছনো নাকি কক্খনো সম্ভব নয়”।
ভল্লা মনে মনে চমকে উঠল। কবিরাজবুড়ো যে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে দৌড়ে চলেছেন, এখন
তার মনে আর কোন সন্দেহ নেই। তবু চোখেমুখে
মুচকি হাসির রেশ ধরে রেখে বলল, “তোর কবিরাজদাদা, শুধু চিকিৎসার কবিরাজ নয় মা,
কবিরাজ – মানে কল্পনা দিয়ে কাব্য রচনার কবিরাজও বটে”!
কমলিমা সে কথায় কান না
দিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ আরও বলল, ডাকাতি মানে আমরা জানি ডাকতরা টাকা-পয়সা,
শস্য-টস্য, অস্ত্র-শস্ত্র যা পায় সবই লুঠ করে। কিন্তু আস্থান থেকে নাকি শুধু
অস্ত্র-শস্ত্রই ডাকাতি হয়েছে? সত্যি? তুই
জানিস?”
নিরীহ গলায় ভল্লা বলল, “আমি
কী করে জানব বল তো, মা?”
কমলিমা কেমন এক ঘোরের মধ্যে
বলে চললেন, “এ কেমন ডাকাতি কবিরাজদাদা বুঝতে
পারছেন না। আমি একবার ঝেঁজে উঠেছিলাম। বললাম, ছেলেটা গাঁয়ের আলসে আর ঝিমোনো ছেলেদের
নিয়ে দল বানিয়ে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করে তুলছে। মাথা খাটিয়ে নালায় বাঁধ দিয়ে
চাষের নতুন জমি বানিয়ে তুলল। সেই ছেলেকে নিয়ে তোমরা এভাবে বদনাম করছ?”
ভল্লা কিছু বলল না, অনেকক্ষণ
তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের মুখের দিকে। কমলিমায়ের থেকে যতটুকু জানার সে জেনে গেছে, বুঝে
গেছে। এবার তাকে ফিরতে হবে।
ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুই এবার ঘরে যা, মা। অনেকক্ষণ বাড়ির বাইরে আছিস। আমিও পালাই। কেউ দেখে ফেললে আরও
অনেক কথা উঠবে। তুই এবং প্রধান দুজনেই বিপদে পড়বি”।
কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন, ধরা
গলায় বললেন, “তোর জন্যে কত রাত যে জেগে কাটিয়েছি...এতদিনে তোর মায়ের কথা মনে পড়ল? কোথায়
আছিস, কী খাচ্ছিস কিছুই তো জানা হল না। কী সব আজেবাজে কথায় সময়টা পার হয়ে গেল। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, তোর নিজের বাড়ি কোনদিকে রে?”
ভল্লা খুবই সতর্ক হয়ে উঠল
কমলিমায়ের এই প্রশ্নে, বলল, “কেন বল তো? রাজধানী থেকে পূবে”।
“বুড়োটা তার মানে ঠিকই বলেছে”।
ভল্লা উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা
করল, “কী ঠিক বলেছে, রে মা?”
একটু আনমনা হয়ে কমলিমা বললেন,
“বলল, তোর নির্বাসন দণ্ড যদি হয়ে থাকে, তাহলে রাজধানী থেকে রাজ্যের পূর্বসীমান্ত তো কাছে – সেদিকে না গিয়ে এত দূরে
পশ্চিমসীমান্তে তুই এলি কেন? আমার সামনে আর কিছু বলতে সাহস পায়নি। বুড়োর বাড়ি ফেরার সময়
প্রধান তার সঙ্গে গিয়েছিল একটু এগিয়ে দিতে। তাকে নাকি বলেছে – তোর এই নির্বাসন-টির্বাসন
একদম মিথ্যা কথা, তুই এসেছিস প্রশাসনেরই কোন কাজে…”।
ভল্লা এবার রীতিমত বিভ্রান্ত
বোধ করতে লাগল। কমলিমা এসব নিয়ে তাকে সরাসরি কোন প্রশ্ন করলে, তার পক্ষে সব কিছু ঢেকেঢুকে,
সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যে বলা এখনই তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। অতএব সে হাসতে হাসতে কমলিমাকে থামিয়ে দিল, বলল,
“তোর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা হয় গাঁজা খায় নয়তো আফিং। কবিরাজ তো, ওরা ভালই জানে কোন
গাছ-গাছড়ায় নেশা জমে ওঠে – সন্ধের মুখে এসেছিল বললি না, মা? তার আগেই চড়িয়ে এসেছে…”
আবার খানিক হাসল ভল্লা, তারপর বলল, “তোর থেকে এমন মজার গল্প আরও শুনব মা, তবে
আজ নয়, পরে আরেকদিন। আজ চলি রে, মা, তুইও ঘরে যা, প্রধান টের পেলে খুব রেগে যাবে”।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা উঠে
দাঁড়ালেন, বললেন, “আবার কবে আসবি?”
ভল্লা হাসল, বলল, “যত
শিগ্গির পারি আসব, মা। তুই ভাবিস না। এখন যা। আরেকটা কথা আমার সঙ্গে তোর যে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে – একথা
কাউকে বলবি না, মা। প্রধানকেও না। আমার দিব্ব্যি দিলাম”।
“এই মাঝরাতে ওভাবে কেউ দিব্ব্যি দেয়, তাও মায়ের কাছে…হতভাগা, মুখপোড়া…?” বলতে বলতে বিরক্ত মুখে কমলিমা ত্রস্ত পায়ে ঘরের আড়ালে চলে গেলেন। ভল্লা নিঃশব্দ দ্রুততায় দৌড়ে চলল, গ্রামের সীমানায় – যেখানে মারুলা তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন