বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "


   ৩

সৃষ্টি তত্ত্ব

শ্রীসূত বললেন, “সৃষ্টির আদিতে ভগবান লোক সৃষ্টি করার জন্যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক), পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (মস্তিষ্ক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ), মন ও পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম), এই ষোলটি অংশে রচিত পুরুষ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। যিনি কারণসমুদ্রে যোগনিদ্রায় শয়ান ছিলেন এবং যাঁর নাভিরূপ হ্রদে উৎপন্ন পদ্ম থেকে প্রজাপতিগণের পিতা ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল, ইনিই সেই নারায়ণ। বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ উদ্গত হয়, তেমনি অক্ষয় বীজস্বরূপ আদি নারায়ণ মূর্তি থেকেই নিখিল অবতার মূর্তি আবির্ভূত হয়ে থাকে। অবতারগণের লীলা অবসান হলে, তাঁরা আবার ওই মূর্তির মধ্যেই লীন হয়ে যান। শ্রীনারায়ণের নাভি পদ্ম থেকে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে মরীচি প্রমুখ প্রজাপতিগণের সৃষ্টি করেন এবং সেই প্রজাপতিগণ দেবতা, নর ও পশু প্রভৃতি ইতর জীবের সৃষ্টি করেছিলেন।

এই পদ্মনাভ নারায়ণ প্রথম অবতারে সনৎকুমার প্রমুখ ব্রাহ্মণরূপে দুষ্কর ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেছিলেন। দ্বিতীয় অবতারে যজ্ঞপতি শ্রীহরি বরাহরূপে, রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, সৃষ্টির অবস্থানের জন্য। দেবর্ষি নারদ তাঁর তৃতীয় অবতার। এই অবতারে ভগবান পঞ্চরাত্র নামে বৈষ্ণবতন্ত্র প্রকাশ করেছিলেন। মানুষ কর্ম করেও কিভাবে কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে এই তন্ত্রে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। চতুর্থ অবতারে ইনি ধর্মের পুত্র নর ও নারায়ণ দুই ঋষি* রূপে আত্মার শান্তির জন্য দুশ্চর তপস্যা করেছিলেন। সিদ্ধ মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কপিল তাঁর পঞ্চম অবতার। এই মূর্তিতে আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে কাল প্রভাবে লুপ্ত হতে যাওয়া সাংখ্যশাস্ত্র উপদেশ দিয়েছিলেন। সাংখ্য সমস্ত তত্ত্বের নির্ণায়ক তত্ত্ব। ষষ্ঠ অবতারে অত্রিপত্নী অনসূয়ার পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং অলর্ক ও প্রহ্লাদকে আত্মবিদ্যা উপদেশ দিয়েছিলেন। তারপর সপ্তম অবতারে রুচি ও আকূতির পুত্র যজ্ঞ নামে জন্মগ্রহণ করে, স্বায়ম্ভূব মন্বন্তর পালন করেছিলেন। অষ্টম অবতারে নাভি ও মেরুদেবীর পুত্র ঋষভ নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শান্ত গুণের অনুসরণে চার আশ্রমের কর্তব্য পরমহংসগণের পথ প্রকাশ করেছিলেন।

[*এই নর ও নারায়ণ দুই ঋষিকে শাস্ত্রমতে  আমরা আরও দু বার পেয়েছি, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন রূপে আর এই কলি যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ রূপে]  

হে বিপ্রগণ, নবম অবতারে শ্রীহরি ঋষিদের প্রার্থনায় পৃথু* নরপতি রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পৃথিবীতে ওষধির সৃষ্টি করেছিলেন। এই অবতার অত্যন্ত রমণীয় বলে কথিত আছে। চাক্ষুষ মন্বন্তরের অবসানে, যখন মহাপ্লাবন ঘটেছিল, তখন বৈবস্বত মনুকে একটি নৌকায় বসিয়ে তিনি মৎস্য অবতার রূপে জগতের জীবকে রক্ষা করেছিলেন। এই অবতার তাঁর দশম অবতার রূপ। একবার দেবতা ও অসুরেরা মন্দর পর্বত দিয়ে সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, একাদশ অবতারে তিনি কূর্মরূপ ধারণ করে ওই মন্দর পর্বতের আধার স্বরূপ হয়েছিলেন। দ্বাদশ অবতারে ধন্বন্তরি ও ত্রয়োদশ অবতারে মোহিনী রূপ ধারণ করেছিলেন এবং অসুরদের মুগ্ধ করে দেবতাদের সুধা পান করিয়েছিলেন। চতুর্দশ অবতারে শ্রীনারায়ণ ভয়ংকর নৃসিংহমূর্তি ধারণ করে, মহা শক্তিধর হিরণ্যকশিপুকে নিজের উরুদেশে রেখে, নখের সাহায্য তার বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন। পঞ্চদশ অবতারে শ্রী হরি বামনরূপে বলিরাজের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে স্বর্গ থেকে বিচ্যুত করার জন্যে তিন পদ পরিমাপ ভূমি যাঞ্চা করেছিলেন।

[* পৃথু নরপতি রূপে শ্রীহরির  অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটিকেই আমি উপন্যাস রূপে এই ব্লগে উপস্থাপিত করেছি - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "] 

ষোড়শ অবতারে ক্ষত্রিয় নৃপতিগণকে ব্রাহ্মণ বিদ্বেষী দেখে অতি উগ্র পরশুরাম রূপে, পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। সপ্তদশ অবতারে পরাশর ও সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব রূপে অবতীর্ণ হয়ে, অল্পবুদ্ধি মানবদের কল্যাণের জন্য সমস্ত বেদকে ভিন্ন ভিন্ন শাখায় বিভক্ত করেছিলেন। অষ্টাদশ অবতারে দেবকার্যে রঘুকুলে শ্রীরামচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়ে সমুদ্রবন্ধন ও লঙ্কাবিজয় ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রদর্শন করেছিলেন। একোনবিংশ ও বিংশ অবতারে ভগবান নারায়ণ, যদুবংশে বলরাম ও কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হয়ে ধরণী থেকে পাপের ভার হরণ করেছিলেন। এরপর একবিংশ অবতারে, কলিযুগের শুরুতে দেব বিদ্বেষীদের মোহ সৃষ্টির জন্যে কীকট প্রদেশে অজনের পুত্র বুদ্ধ নামে খ্যাত হবেন। কলিযুগের অবসানে রাজগণ দস্যুর মতো আচরণ করলে, ব্রাহ্মণের পুত্র হয়ে কল্কি নাম ধারণ করবেন, এবং সেটিই হবে তাঁর দ্বাবিংশ অবতার।

[এখানে শ্রীহরির বাইশটি অবতারের কথা বলা হল - যার মধ্যে শেষ অবতার - কল্কি ভূভার হরণ করতে কবে আসবেন কে জানে? প্রসঙ্গতঃ বিষ্ণুর দশাবতার হল পূর্ণ-অবতার এবং বাকি বারোটি অংশ-অবতার।]

হে দ্বিজগণ, ক্ষয়শূণ্য সরোবর থেকে যেমন সহস্র সহস্র জলধারা নির্গত হয়, তেমনই নিখিল আবির্ভাবের মূলাধার শ্রীহরির থেকে অসংখ্য অবতার আবির্ভূত হন। মহাতেজ ঋষিগণ, মনুসমূহ, সকল দেবতা ও প্রজাপতি, সকলেই শ্রীভগবানের কলা অর্থাৎ বিভূতি। যে অবতারের কথা আগে বললাম, তাঁদের কেউ কেউ শ্রী নারায়ণের অংশ, কেউ কেউ তাঁর কলা। মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ এবং সনৎকুমার, কপিল, নারদ প্রমুখ তাঁর কলা। কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। অসুরেরা যখন জগতে নানান উৎপীড়ন করে, অবতারগণ যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে জগতের শান্তি ও মঙ্গল বিধান করেন। যে ব্যক্তি শুদ্ধচিত্তে সকালে ও সন্ধ্যায় ভগবানের এই জন্ম রহস্য কীর্তন করেন কিংবা শোনেন, তিনি সংসারের অশেষ দুঃখ থেকে নিস্তার পান।

[এখানে আবার বলা হচ্ছে "মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ" অর্থাৎ অংশ-অবতার, পূর্ণ-অবতার নয়। শ্রীকৃষ্ণ আবার অবতার নন, তিনি সাক্ষাৎ ভগবান।] 

এইবার বলি, দেহ সম্বন্ধ থাকলেও কিভাবে জীবের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জীবের আত্মা চৈতন্যস্বরূপ, কিন্তু স্থূলদেহ ভগবানের মায়ায় বিরচিত। এই দেহকেই যখন আত্মা বলে বোধ হয়, তখনই জীব মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে। অজ্ঞব্যক্তি হাওয়ার বেগে ভেসে চলা মেঘকে দেখে আকাশ ভেসে চলেছে মনে করে কিংবা ধুলিঝড়ের ধূসর বর্ণ বায়ুতে আরোপ করে, বায়ুকেই ধূসর বর্ণ মনে করে। তেমনই অবিবেকী জীব সর্বসাক্ষী চেতনে, জড় ও দৃশ্য দেহকে আরোপ করে, দেহই আত্মা এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন হয়। এই স্থূল দেহ ছাড়াও আরেকটি সূক্ষ্ম দেহ আছে, সেই দেহকে লিঙ্গ দেহ বলে। ওই দেহকে দেখা যায় না কিংবা শোনাও যায় না, ওই দেহে হাত, পা ইত্যাদি কোন অবয়বও নেই। এই কারণে লিঙ্গ দেহকে অব্যক্তও বলা যায়। স্থূলদেহের বিনাশে, এই লিঙ্গদেহই জন্ম ও মরণের বশে বার বার সংসার দশা ভোগ করে। যতদিন অবিদ্যা বা অজ্ঞান, আত্মার স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে, মনে নানান বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কিন্তু যখন বিদ্যা অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়, তখন তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ পরমানন্দে বিরাজ করেন।

পরমেশ্বর ও জীবে প্রভেদ এই যে, পরমেশ্বর স্বতন্ত্র পুরুষ, কিন্তু জীব মায়ার অধীন। তিনি নির্লিপ্তভাবে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করছেন। মানুষ যেমন দূর থেকে ফুলের গন্ধ উপভোগ করে, সর্বভূতের অন্তর্যামী ছয় ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা পরমেশ্বর, সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয় ঠিক তেমন ভাবেই গ্রহণ করে থাকেন। ভক্তিহীন জ্ঞানীরা তর্ক বিতর্ক ও কৌশলে তাঁর নাম, রূপ ও লীলার তত্ত্ব কখনোই বুঝতে পারে না। যিনি এই চক্রপাণি পরমপুরুষের চরণপদ্মের সৌরভে সর্বদা অকপট আনন্দ অনুভব করেন, তিনিই এই বিশ্ববিধাতার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন। এই জগতে আপনারা ধন্য, কারণ অখিল লোকপতি বাসুদেবে আপনাদের ঐকান্তিকী রতি উৎপন্ন হয়েছে।

এই শ্রীমৎভাগবত পুরাণ সকল বেদের সমান। ভগবান বেদব্যাস লোকহিতের জন্য সকল বেদ ও ইতিহাসের সার সংগ্রহ করে হরিলীলাপূর্ণ এই মহাপুরাণ রচনা করেছিলেন। জিতেন্দ্রিয় যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিজের পুত্র শুকদেবকে, ভুবনমঙ্গল এই গ্রন্থ রচনা করে পাঠ করতে দিয়েছিলেন। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মহারাজ পরীক্ষিৎ আমৃত্যু অনশনে যখন গঙ্গাতীরে বসেছিলেন, সেই সময় অন্যান্য মহর্ষিদের সঙ্গে মহারাজ পরীক্ষিৎকেও শ্রী শুকদেব এই গ্রন্থের বর্ণনা শুনিয়েছিলেন। হে বিপ্রগণ, যখন মহাতেজা ব্রহ্মর্ষি শুকদেব এই পুরাণ সকলকে শোনাচ্ছিলেন, সেই মহৎ সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমার বুদ্ধি অনুসারে, এই পুরাণের অর্থ আমি যতদূর অবধারণ করতে পেরেছি, আপনাদের কাছে তাই আমি বর্ণনা করবো”। 

 

সুদীর্ঘ যজ্ঞে দীক্ষিত ঋক বেদজ্ঞ বৃদ্ধ শৌনক বললেন, “হে সূত, ভগবান শুকদেব যে ভাগবত পুরাণের কথা কীর্তন করেছিলেন, সেই পুরাণ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। শুনেছি, ব্যাসদেব মহাভারত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন, তিনি আবার কোন সময়ে, কোথায় এবং কী উদ্দেশে এই পুরাণ রচনা করলেন? আপনি বললেন, তাঁর পুত্র শুকদেব এই পুরাণ কীর্তন করেছেন, কিন্তু তা কী করে সম্ভব? কারণ তিনি মহাযোগী, সর্বভূতে সমদর্শী, শত্রুমিত্র ভেদজ্ঞান রহিত। মোহবন্ধনের অতীত এবং ব্রহ্মে একনিষ্ঠ থেকে তিনি গোপনে বিচরণ করেন। তাঁকে দেখলে হিতাহিত বোধশূণ্য এক বালকের মতো মনে হয়। একবার প্রব্রজ্যা নিয়ে, তিনি নগ্ন দেহেই বেরিয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাসদেব ছুটেছিলেন পুত্রের পিছনে। পথের পাশে থাকা একটি সরোবরের জলে একদল সুন্দরী অপ্সরা স্নান করছিল, তারা মহাযোগী কিন্তু যুবক শুকদেবকে দেখে লজ্জা পেল না, কিন্তু বৃদ্ধ ব্যাসদেবকে দেখে তারা লজ্জায় বস্ত্র পরে ফেললএই ঘটনায় অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে, ব্যাসদেব ওই অপ্সরাদের এর কারণ জিগ্যেস করলে, অপ্সরা রমণীরা বলেছিল, আপনার পুত্রের দৃষ্টি পবিত্র, তিনি যুবক হলেও তাঁর দৃষ্টিতে নারীপুরুষ ভেদ নেই, কিন্তু আপনার সেই ভেদজ্ঞান রয়েছে।

তিনি উন্মত্ত ও মূকের মতো ঘুরতে ঘুরতে, কুরুজাঙ্গাল অতিক্রম করে হস্তিনাপুরে যখন পৌঁছলেন, তাঁকে নগরবাসীরা চিনতে পারল কী করে? তাঁর সঙ্গে রাজর্ষি পরীক্ষিতের আলোচনাই বা কিভাবে সম্ভব হল? তিনি গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য গৃহস্থবাড়িতে গোদোহন কালের বেশী থাকেন না, সেই যোগী শুকদেব সুদীর্ঘ সময় ধরে এই পুরাণ কীর্তন ও ব্যাখ্যা কী করে করলেন? হে সূত, অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ ভক্তদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁর অতি আশ্চর্য জন্ম ও কর্ম বৃত্তান্ত আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। পাণ্ডুবংশতিলক মহাবীর সম্রাট পরীক্ষিৎ তাঁর যৌবনেই রাজ্যলক্ষ্মী ত্যাগ করে, কিসের কারণে অনশনে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প করেছিলেন? যাঁরা ভগবানের চরণে আত্ম সমর্পণ করেন, তাঁরা নিজের জন্য কিছুই করেন না, লোকহিতের জন্যেই তাঁরা প্রাণধারণ করেন। অতএব, মহারাজ কিসের জন্য পরমবৈরাগ্য অবলম্বন করে নিজের দেহও পরিত্যাগ করলেন? আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী, অতএব আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাদের তৃপ্তি দান করুন”

[গোদোহন কাল - অর্থাৎ একটি গাই দুইতে যতটা সময় লাগে - এখনকার হিসেবে মিনিট পাঁচ-দশ বড় জোর।]

[বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী", অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই।]  

সূত বললেন, “দ্বাপর যুগের অবসানকাল আসন্ন হলে, ঋষি পরাশর ও বসুকন্যা সত্যবতীর পুত্র হয়ে, যোগী ব্যাসদেব শ্রীহরির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন সূর্যোদয়কালে সরস্বতীর পবিত্র জলে স্নান আহ্নিক সেরে, ব্যাসদেব তাঁর বদরিকা আশ্রমে ধ্যানে বসলেন। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি দিব্যনেত্রে অনুভব করলেন, কালের অমোঘ প্রভাবে যুগধর্মের বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। তিনি দেখলেন, জীবের স্থূলদেহ শক্তিহীন এবং মানুষ শ্রদ্ধাহীন, সত্ত্বগুণরহিত, মন্দমতি, অল্পায়ু ও ভাগ্যহীন হতে চলেছে। সর্বজ্ঞ মুনি বেদব্যাস মানুষের এই অবস্থা দেখে চতুর্বর্ণ ও চার আশ্রমের কিসে মঙ্গল হয়, এই চিন্তা করলেন। তিনি চিন্তা করলেন, বৈদিক যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মানুষের চিত্তশুদ্ধি হয়, অতএব যজ্ঞ ক্রিয়া অনুষ্ঠান যাতে লুপ্ত না হয়ে যায়, সেই ইচ্ছাতে বেদকে ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব এই চার ভাগে বিভক্ত করলেন এবং ইতিহাস ও পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসাবে গ্রন্থিত করলেন।

মহর্ষি হৈল ঋকবেদজ্ঞ, মহর্ষি জৈমিনি সামবেদজ্ঞ এবং বৈশম্পায়ন যজুঃ বেদে পারদর্শী ছিলেন। মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। আমার পিতা রোমহর্ষণ ইতিহাস ও পুরাণে বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। ঋষিরা নিজ নিজ শিষ্যদের মধ্যে নিজ নিজ বেদের বহুল প্রচার করতে শুরু করলেন। অত্যন্ত অজ্ঞান ব্যক্তিও যাতে বেদের তত্ত্ব বুঝতে পারে, ব্যাসদেব সেই ভাবেই বেদের বিভাগ করেছিলেন। স্ত্রীলোক, শূদ্র ও পতিত জাতির বেদ চর্চায় অধিকার না থাকায়, তাদের সকলের চিত্তশুদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য ঋষি বেদব্যাস মহাভারত নামে বিশাল আখ্যায়িকা রচনা করলেন।

[মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। মুনি সুমন্ত অথর্ব বেদে সুনিপুণ - অর্থাৎ শাস্ত্রমতে তিনি চতুর্বেদী - (আধুনিক মতে) চৌবে - অর্থাৎ বৈদ্য। এই বৈদ্যরাও আদিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু তাঁরা আভিচারিক কর্মে সুদক্ষ হওয়ায়, পরবর্তী কালে এবং আজও উত্তরভারতের বহু স্থানে সমাজ তাঁদের পতিত বা ভ্রষ্ট - ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য করে। ব্রিটিশ যুগে ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের আগে, সারা ভারতে বৈদ্যরাই ছিলেন মানুষ ও গৃহপালিত পশুর চিকিৎসক - কিন্তু হলে কি হবে, তাঁরা সমাজের শীর্ষস্থানীয় হিসাবে পরগণিত হতেন না। ]     

একদিন ধর্মবিৎ ঋষি বেদব্যাস অপ্রসন্ন চিত্তে নির্জন সরস্বতীর তীরে বসে, চিন্তা করলেন, “আমি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রতধারণ করে দেব, অগ্নি ও গুরুজনের সমুচিত পূজা ও তাঁদের আজ্ঞা প্রতিপালন করেছি। শূদ্ররাও যাতে ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারে, সেই উদ্দেশে মহাভারতের ছলে সকল বেদের সারাংশ প্রকাশ করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য, আত্মায় ব্রহ্মতেজ ও পূর্ণতা উপলব্ধি করেও, মনে হচ্ছে আমার স্বরূপ লাভ হয়নি। যে ভক্তিধর্ম অচ্যুত ও ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়, আমি সেই ভক্তিধর্মের বিস্তারিত রূপ কীর্তন করিনি বলেই কী আমার আত্মাকে বিচ্ছিন্ন এবং অপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে?”

ঋষি যখন নির্জনে বসে, এই রকম চিন্তা করছেন, সেই সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলে দেবর্ষি নারদ। 

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১১

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম...