ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দ্বাদশ পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১২ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
ত্রয়োদশ পর্বাংশ
৪.৭.২ কাশ্মীর
কাশ্মীরের ইতিহাসের সব থেকে নির্ভরযোগ্য নথি
কলহনের “রাজতরঙ্গিণী”। কিন্তু কলহনের এই অমূল্য গ্রন্থের রচনাকাল ১১৫০ সি.ই., অতএব খুব
স্বাভাবিক ভাবেই সপ্তম শতাব্দী বা তারও আগেকার ঘটনার ব্যাপারে রাজতরঙ্গিণী আমাদের
খুব একটা সাহায্য করতে পারে না। সম্রাট অশোকের সময় কাশ্মীর মৌর্য সাম্রাজ্যেরই অংশ
ছিল, সে
বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, কারণ সম্রাট অশোক কাশ্মীরে অনেকগুলি বৌদ্ধবিহার ও স্তূপ
নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং শ্রীনগর শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অশোকের মৃত্যুর পর, শোনা যায়, তাঁর এক
পুত্র জালুক বা জলোকা স্বাধীন কাশ্মীর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কয়েক
শতাব্দী পরে কণিষ্ক এবং তাঁর পরবর্তী কুষাণ রাজারা কাশ্মীর শাসন করেছিলেন। গুপ্ত
সাম্রাজ্যের আমলে কাশ্মীর স্বাধীন রাজ্য থাকলেও, হুণরাজ মিহিরকুল কাশ্মীরেই তাঁর
রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রাজা হর্ষবর্ধনের সঙ্গে কাশ্মীরের রাজা
দুর্লভবর্ধনের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ছিল। এই রাজা দুর্লভ ছিলেন নাগ-করকোটক বংশের রাজা, এবং শোনা
যায় তাঁরা নাকি পৌরাণিক গো-নন্দ বংশের বংশধর। রাজা দুর্লভ রাজা হর্ষকে ভগবান
বুদ্ধের একটি “দাঁত”-এর অবশেষ উপহার দিয়েছিলেন, যেটি কনৌজের স্তূপে রাজা হর্ষ
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেই হুয়ান সাং কাশ্মীরে ৬৩১-৬৩৩ সি.ই. দু বছর
ছিলেন।
এই বংশের সব থেকে শক্তিশালী এবং উদ্যোগী রাজা
ছিলেন, ললিতাদিত্য
মুক্তাপীড় (৭২৪-৭৬০ সি.ই.)। ললিতাদিত্য পাঞ্জাবের বেশ বড়ো একটা অংশ জয় করেছিলেন
এবং তাঁর দিগ্বিজয়ের মধ্যে গৌড় এবং তিব্বতও ছিল। যদিও তিনি গৌড় অথবা তিব্বতে রাজ্য
বিস্তার করেননি। মুক্তাপীড় চীনের সম্রাটের সভায় রাজদূত পাঠিয়েছিলেন। জানা যায়
কাশ্মীরের সঙ্গে চীনের তার আগে থেকেই সুসম্পর্ক ছিল, কারণ মুক্তাপীড়ের পূর্ববর্তী রাজা
চন্দ্রাপীড়কে সমসাময়িক চীন সম্রাট বিভূষিত করে সম্মান জানিয়েছিলেন। ললিতাদিত্য
অনেকগুলি হিন্দু এবং বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মধ্যে
সূর্যদেবের–মার্তণ্ড মন্দির বিখ্যাত।
ললিতাদিত্যর নাতি জয়াপীড় বিনয়াদিত্য (৭৭৯-৮১০
সি.ই.) ককোটক বংশের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা। জয়াপীড় নেপাল এবং পৌণ্ড্রবর্ধন
(উত্তরবঙ্গ) পর্যন্ত অভিযান করেছিলেন। তিনি বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায়
বেশ কয়েকজন বিদ্বান ও পণ্ডিত মনীষীর নাম জানা যায়, যেমন উদ্ভাট, বামন এবং
দামোদরগুপ্ত। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাকি অর্থলিপ্সু এবং প্রজাপীড়ক রাজা হয়ে
উঠেছিলেন, তার
কারণ হয়তো বিভিন্ন অভিযানের জন্যে বিপুল অর্থব্যয় এবং রাজকোষ শূন্য হয়ে ওঠা!
জয়াপীড়ের পরের রাজারা গুরুত্বহীন এবং দুর্বল হয়ে উঠেছিলেন এবং যার ফলে কিছুদিনের
মধ্যে করকোটক বংশের পর নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি উৎপল বংশের সৃষ্টি হয়েছিল।
উৎপল বংশের প্রথম রাজা অবন্তিবর্মন ৮৫৫ সি.ই.-তে
রাজত্ব শুরু করেছিলেন। করকোটকদের রেখে যাওয়া শূন্যগর্ভ রাজকোষের জন্যে তিনি
রাজ্যবিস্তার ছেড়ে, মন
দিয়েছিলেন রাজ্যের আর্থিক উন্নতিতে। তিনি কাশ্মীরের সেচ ব্যবস্থার বিপুল উন্নতি
করেছিলেন। এমনকি বাঁধ দিয়ে বিতস্তা (ঝিলাম) নদীর বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জলও
সেচের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রাজা অবন্তিবর্মনের নাম কাশ্মীরের মানুষ আজও মনে
রেখেছেন, তাঁদের
শহর অবন্তিপুরের নামে। অবন্তিবর্মনের পর কাশ্মীরের রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র
শংকরবর্মন– ৮৮৩ সি.ই.-তে। শংকরবর্মন পিতার পথ অনুসরণ না করে রাজ্য জয় এবং অভিযানে
মন দিয়েছিলেন। শংকরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল ৯০২ সি.ই.-তে। শংকরবর্মনের পুত্র
গোপালবর্মন রাজা হলেও তিনি একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ৯০৪ সি.ই.-তে নিহত হন, তারপরেও ৯৩৯
সি.ই. পর্যন্ত উৎপল বংশের গুরুত্বহীন অস্তিত্বটুকুই অবশিষ্ট ছিল।
৯৩৯ সি.ই.-তে ব্রাহ্মণেরা রাজা গোপালবর্মনের
মন্ত্রীর পুত্র প্রভাকরদেবকে রাজা নির্বাচিত করেছিলেন। তাঁর ৯৪৮ সি.ই. পর্যন্ত
রাজত্বে রাজ্যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ৯৪৯ সি.ই.-তে তাঁর
পুত্র সংগ্রাম এবং অন্যান্য বংশধরকে হত্যা করে, নিজেই সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর
মন্ত্রী পর্বগুপ্ত। এই বংশের সব থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব একজন মহিলা, নাম দিদ্দা।
দিদ্দা ছিলেন ভীমশাহির নাতনি এবং পুঞ্চের রাজা লোহার রাজসিংহর কন্যা। তিনি রাজা
ক্ষেমগুপ্তর রানি হিসেবে (৯৫০-৯৫৮ সি.ই.), তারপর পুত্রের অভিভাবিকা হিসেবে এবং
পরে নিজের হাতেই (৯৮০-১০০৩ সি.ই.) রাজ্যের শাসনভার তুলে নিয়েছিলেন।
রানি দিদ্দা মৃত্যুর আগেই, তাঁর ভাইয়ের
পুত্র সংগ্রামরাজাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং ১০০৩ সি.ই.-তে রাণির
মৃত্যুর পর কাশ্মীরের রাজা হলেন লোহার বংশের সংগ্রামরাজ (১০০৩-২৮ সি.ই.)।
সংগ্রামরাজ খুব সফল রাজা হয়ে উঠতে পারেননি, যার ফলে কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা এবং
অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই রাজা হয়ে কিছুদিনের জন্যে সিংহাসনে বসেছেন, আবার কেউ না
কেউ এসে তাঁদের সরিয়েও দিয়েছেন। যাই হোক এই ভাবে ১৩৩৯ সি.ই. পর্যন্ত কাশ্মীরে যে
হিন্দু রাজত্ব কোনরকমে চলছিল, তার সমাপ্তি হল মুসলিম অভিযানকারী শাহ্ মিরের হাতে, তিনি
শামসুদ্দিন রাজ বংশের সূচনা করলেন।
নানান প্রত্ন-নিদর্শন থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, চতুর্থ এবং
পঞ্চম শতাব্দীতে বঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের
পর থেকে বঙ্গ কয়েকটি (সম্ভবতঃ চারটি) স্বাধীন রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। অন্ততঃ তিনজন
রাজার নাম জানা যায়,
যাঁরা দুর্বল গুপ্তদের বশ্যতা অস্বীকার করেছিলেন, যেমন
ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র
এবং সমাচারদেব। ষষ্ঠ শতাব্দীতে বঙ্গের গৌড় অঞ্চল (পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব বঙ্গ)
মৌখরিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল।
গৌড়ের সব থেকে বিতর্কিত রাজার নাম শশাঙ্ক। তাঁর
সঙ্গে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি এবং কনৌজের মৌখরিদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা ছিল। রাজা
শশাঙ্কের পূর্বপুরুষ কিংবা তাঁর পরবর্তী কোন রাজাদের নামও শোনা যায় না। তবে অনুমান
করা হয়, গুপ্ত
রাজত্বের শেষ দিক থেকেই গৌড়ের সঙ্গে মৌখরিদের বিবাদের সূত্রপাত। সে সময়
শশাঙ্ক সম্ভবতঃ গুপ্তদের সামন্তরাজা
ছিলেন। পরবর্তী সময়ে গুপ্তদের শক্তি হ্রাস হওয়াতে, শশাঙ্ক স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন
এবং গুপ্ত এবং মৌখরিদের শত্রুতা কাজে লাগিয়ে, গৌড়ের সীমা পশ্চিমে বাড়াতে সক্রিয়
হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমেই তিনি মালবের গুপ্ত-রাজ দেবগুপ্তর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করলেন
এবং যৌথভাবে মৌখরি রাজ্য আক্রমণ করলেন। এই যুদ্ধে মৌখরি রাজ গ্রহবর্মন নিহত হলেন, এবং তাঁর
স্ত্রী রাজ্যশ্রীকে,
যিনি থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের কন্যা ছিলেন, কনৌজের
কারাগারে বন্দিনি করে রাখলেন।
প্রভাকর বর্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্ধন বিশাল
সৈন্য নিয়ে কনৌজ আক্রমণ করলেন, তাঁর বোনকে উদ্ধার করতে। রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তকে পরাজিত
করলেন, কিন্তু
৬০৬ সি.ই.-তে নিজেই নিহত হলেন শশাঙ্কের হাতে। পূষ্যভূতি বংশের ঘনিষ্ঠ মিত্র, কবি বাণভট্ট
এবং হুয়েনসাং–এর লেখা থেকে জানা যায়, শশাঙ্ক নাকি রাজ্যবর্ধনকে
বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিলেন। যাই হোক শশাঙ্ক খুব বেশি দিন কনৌজ অধিকারে
রাখতে পারেননি।
রাজ্যবর্ধনের ভাই হর্ষবর্ধন নিশ্চয়ই তাঁর দাদা
এবং বোনের প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু
শশাঙ্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা স্পষ্ট করে কিছুই জানা যায় না। এটুকু জানা যায়, হর্ষের
সঙ্গে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল
কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ জেলা, পঃবঙ্গ)। শশাঙ্কর রাজ্য গঞ্জাম (উড়িষ্যা) পর্যন্ত বিস্তৃত
ছিল। শশাঙ্ক মারা যান হয় ৬১৯ অথবা ৬৩৭ সি.ই.-তে। সম্ভবতঃ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর
ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেছিলেন, এবং শশাঙ্কের উত্তরসূরিকে সিংহাসন
চ্যুত করেছিলেন।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বঙ্গে অরাজক অবস্থা চলেছিল
বহুদিন, সংস্কৃতে
যাকে “মাৎস্যন্যায়” যুগ বলা হয়ে থাকে। শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুদিন পরে হুয়েন সাং
বঙ্গে এসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, বঙ্গে তখন প্রধান রাজ্য ছিল চারটি
পুণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ),
কর্ণসুবর্ণ (পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগ), সমতট (দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ) এবং
তাম্রলিপ্তি (তমলুক–মেদিনিপুর এবং উড়িষ্যার পূর্বাংশ)। ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ
অধিকার করলেও, কর্ণসুবর্ণের
প্রশাসনিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করেছিলেন বলে মনে হয় না, তিনি করদ
রাজ্য থেকে কর আদায়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। ভাস্করবর্মনের পরে কনৌজের যশোবর্মন সম্পূর্ণ
বঙ্গ অধিকার করেছিলেন বলে শোনা যায়, এমনকি কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য
জয়াপীড়ও কিছুদিনের জন্যে বঙ্গ অধিকার করেছিলেন।
এইরকম অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে অষ্টম শতাব্দীর
মাঝামাঝি কোন সময়ে “জনগণ এই অরাজক (মাৎস্যন্যায়) পরিস্থিতি - প্রত্যেকেই যেন তার
প্রতিবেশীর সহজ শিকার – থেকে মুক্তির জন্যে গোপালকে রাজা করলেন”! কোন দিক থেকেই
গোপালের বংশ বা তাঁর পারিবারিক পটভূমি নিয়ে কোন কথাই শোনা যায় না। এমনকি গোপাল
রাজা হয়েও, কোন
পৌরাণিক কিংবা প্রাচীন রাজবংশের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেননি। যদিও অনেক পরবর্তীকালের
লিপিতে পালবংশকে সৌরবংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করা হয়েছে। গোপালকে বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ)
এবং গৌড়ের (পশ্চিমবঙ্গের) প্রভু বলা হলেও, তাঁর রাজনৈতিক কৃতিত্বের কোন তথ্য
পাওয়া যায় না এবং অনুমান করা হয়, তাঁর রাজত্বকাল ৭৫০-৭৭০ সি.ই.।
গোপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল
(৭৭০-৮১০ সি.ই.)। তাঁর সময়েই পালরাজ্য প্রায় সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর সমসাময়িক
প্রতিহার রাজারা ছিলেন,
বৎসরাজা (৭৩৮-৭৮৪ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় নাগভাট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। দাক্ষিণাত্যের
রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজা ছিলেন ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৩ সি.ই.) এবং তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৩ – ৮১৪
সি.ই.)। উত্তর ভারতের সার্বভৌম অধিকার পাওয়ার জন্যে এই রাজারা দীর্ঘদিন নিজেদের
মধ্যে বারবার যুদ্ধ করেছেন,
কিন্তু শেষ অব্দি প্রতিহাররাই আয়ত্ত্বে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে কিছুদিনের
জন্যে ধর্মপাল কনৌজ অধিকার করে চক্রায়ুধকে সামন্তরাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে বিষয়ে
কোন সন্দেহ নেই। এবং কখনো কখনো সমগ্র উত্তরভারত অধিকার করলেও স্থায়ীভাবে এবং
স্বস্তিতে সাম্রাজ্য ভোগ করতে পারেননি।
ধর্মপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র দেবপাল
(৮১০ -৮৫০ সি.ই.), কিছু
লিপি থেকে জানা যায়,
তিনি উড়িষ্যা, প্রাগজ্যোতিষ
বা কামরূপ, হুণ, গুর্জর এবং
দ্রাবিড়দের পরাজিত করেছিলেন। তবে লিপি যাই বলুক, কামরূপ এবং উড়িষ্যা ছাড়া, তাঁর
সম্পূর্ণ রাজত্বকাল ধরেই তাঁকে গুর্জর-প্রতিহার, রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে
হয়েছে। দেবপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্য বা সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে সংকীর্ণ ছোট এবং
দুর্বল হয়ে পড়েছিল। দেবপালের পর পালবংশের রাজারা হলেন, প্রথম
বিগ্রহপাল (৮৫০–৮৫৪ সি.ই.) এবং নারায়ণপাল (৮৫৪-৯০৮ সি.ই.)। নারায়ণপালের পর কামরূপ
এবং উড়িষ্যা স্বাধীন রাজ্য হয়ে উঠেছিল। নারায়ণপালের পর রাজা হয়েছিলেন রাজ্যপাল
(৯০৮-৯৪০ সি.ই.) এবং তারপর দ্বিতীয় গোপালের (৯৪০-৯৬০ সি.ই.) সময় পালরাজ্যের
অন্তর্ভুক্ত ছিল মগধ এবং উত্তরবঙ্গ। রাজ্যপালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূট রাজকুমারীর
সম্ভবতঃ বিবাহ হয়েছিল,
হয়তো এই বৈবাহিক সম্পর্ক পালরাজাদের কিছুদিন স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু
প্রতিহারদের পতনের পর অনেকগুলি নতুন রাজবংশ উত্তরভারতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, যেমন
বুন্দেলখণ্ডের চান্দেল,
চেদির (মধ্যপ্রদেশের) কলচুরি, মালবের পরমার, গুজরাটের চালুক্য এবং শাকম্ভরির
(রাজপুতানা) চাহমান বা চৌহান। এই রাজবংশগুলির মধ্যে চান্দেল এবং কলচুরি বঙ্গ
আক্রমণ করেছিলেন দ্বিতীয় গোপাল এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের (৯৬০-৯৮৮ সি.ই.) রাজত্বে।
সে সময় পালরাজাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত হয়ে পড়েছিল। এরপর প্রথম মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮
সি.ই.) পালরাজ্যের কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু বারবার চোল এবং কলচুরিদের
আক্রমণের বিরুদ্ধে খুব একটা কিছু করতে পারেননি। তাঁর পরবর্তী পালরাজারা হলেন, নয়পাল
(১০৩৮-১০৫৫ সি.ই.), তৃতীয়
বিগ্রহপাল (১০৫৫-১০৭০ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭০-১০৭৫ সি.ই.)। উত্তরবঙ্গের
একটি বিদ্রোহ সামলাতে গিয়ে সেখানেই দ্বিতীয় মহীপালের পরাজয় এবং মৃত্যু ঘটে, উত্তরবঙ্গের
রাজা হন এক কৈবর্ত, দিব্য।
এরপর পালরাজারা বাংলার ইতিহাসেও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন।
পালরাজারা সকলেই বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এবং
বৌদ্ধধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রধানতঃ পাল রাজাদের সময়েই বিহার ও বঙ্গে
বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বাকি ভারতবর্ষের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিল। পালরাজাদের পতনের
পরপরই বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য ভারতবর্ষ থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। পালরাজাদের আমলে
বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়েছিল, যেমন বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরি, রক্তমৃত্তিকা, সোমপুরা
ইত্যাদি। এ সময়েই বাংলার সঙ্গে তিব্বত, নেপাল এবং বার্মার নিবিড় যোগাযোগ গড়ে
উঠেছিল।
পালরাজাদের সময়ে বাংলায় সংস্কৃতের গুরুত্ব বেড়ে
উঠেছিল, যদিও
মাগধী প্রাকৃত, অপভ্রংশ
এবং বাংলাও প্রচলিত ছিল। এই সময়েই বাংলা ভাষার নিজস্ব লিপির প্রচলন হয়েছিল। প্রথম
বাংলা ভাষার গ্রন্থ “চর্যাপদ” এই সময়কালেই রচিত।
বঙ্গ থেকে পালবংশকে মুছে দিয়ে নতুন সেনবংশের
সূত্রপাত করেছিলেন সামন্তসেন। যতদূর জানা যায় সেনরা দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটপ্রদেশ
থেকে বঙ্গের রাঢ় অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁরা নিজেদের কর্ণাট-ক্ষত্রিয় এবং
ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় নামে পরিচয় দিতেন এবং বলতেন সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীরসেন ছিলেন
চন্দ্রবংশের বংশধর। সামন্তসেনের পৌত্র বিজয়সেন দীর্ঘ বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন, (১০৯৫ -১১৫৮
সি.ই.)। তাঁর সময়েই সেনরাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল এবং সম্পূর্ণ বঙ্গ সেন রাজত্বের
অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তিনি একসময় গঙ্গার তীর ধরে যুদ্ধ অভিযানে বেরিয়েছিলেন এবং পশ্চিমের
বহু রাজ্যই নাকি তাঁর অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিল। অন্যদিকে তিনি হয়তো কামরূপ এবং কলিঙ্গও অধিকার করেছিলেন।
বিজয়সেনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র
বল্লাল সেন, তাঁর
মাতা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শূর বংশের রাজকুমারী বিলাসদেবী। বল্লাল সেন কোন নতুন
রাজ্য জয় করেননি, কিন্তু
পিতার রাজ্য অক্ষত রাখতে পেরেছিলেন। পিতা বিজয়সেনের মতোই বল্লালসেনও শৈব ছিলেন।
কথিত আছে বল্লালসেন বঙ্গের বর্ণ প্রথার সংস্কার করেছিলেন এবং তিনিই কৌলিন্য প্রথার
প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এই প্রবাদের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। বল্লালসেন
পণ্ডিত এবং বিদ্বান রাজা ছিলেন বলে শোনা যায়। তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে তিনি দুটি
গ্রন্থ সংকলন শুরু করেছিলেন - “দানসাগর” এবং “অদ্ভুতসাগর” - কিন্তু শেষ করতে
পারেননি।
বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণসেনের যুদ্ধ জয়ে আগ্রহ
ছিল। তিনি অভিযানে বেরিয়ে যে যে অঞ্চল জয় করেছিলেন, সেখানে বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা
করিয়েছিলেন। এরকম বিজয়স্তম্ভের নিদর্শন পাওয়া গেছে, বেনারস এবং এলাহাবাদে। সমসময়ে ওই দুই
অঞ্চলের রাজা ছিলেন গাড়োয়াল বংশীয় শক্তিশালী রাজা জয়চন্দ্র। অতএব বেনারস ও
এলাহাবাদ বিজয়ের কথা সত্যি হলে, তাঁকে বীর একথা মানতেই হয়। কিন্তু মুসলিম সেনাপতি মহম্মদ
ইব্ন্ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করে, যখন নদিয়া আক্রমণ করেছিলেন, সেসময় রাজা
লক্ষ্মণসেন নাকি প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গঙ্গা পথে পূর্ববঙ্গে
পালিয়েছিলেন! ১১৯৯ সি.ই.-তে নদিয়ার এই ঘটনায় রাজা লক্ষ্মণসেনের বীরত্বের কোন
নিদর্শন পাওয়া যায়নি।
যদিও সম্পূর্ণ ঘটনাটি চিন্তা করলে পুরোটাই
অবিশ্বাস্য মনে হয়। কারণ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করেছিলেন ১১৯৭ সি.ই.-তে, শোনা যায়, তিনি সেখানে
“মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের গণহত্যা করিয়েছিলেন”। তারপর তিনি নদিয়ার –
লক্ষ্মণ সেনের তৎকালীন রাজধানী - দিকে এগিয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহারের সীমান্ত থেকে
রাজধানী নদিয়া পর্যন্ত বখতিয়ার খিলজি (শোনা যায় তাঁর সঙ্গে মাত্র আঠারোজন
অশ্বারোহী সৈন্য ছিল) কোথাও কোন বাধা পেলেন না, সরাসরি রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করতে সক্ষম
হলেন! এই বিষয়েই মনে ঘোরতর সন্দেহ আসে। সেনরাজাদের প্রশাসনিক এবং সামরিক ও নিরাপত্তা
আধিকারিকদের চরম দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্র ছাড়া এমন ঘটনা কী করে সম্ভব?
সে যাই হোক, লক্ষ্মণসেন এর পরেও ১২০৬ পর্যন্ত
পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরেও সেনবংশ পূর্ববঙ্গে আরও প্রায় পঞ্চাশ বছর
রাজত্ব করার পর, সমগ্র
বঙ্গ মুসলিম অধীনে চলে গিয়েছিল। সম্প্রতি কিছু সূত্র থেকে জানা যায় লক্ষ্মণসেনের
এক পুত্র রূপসেন ভাগ্যান্বেষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং পাঞ্জাবে
ছোট্ট একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার রাজধানী ছিল রূপনগর (রোপার)।
পরবর্তীকালে, তাঁর
বংশধরেরা আরও উত্তরে মান্ডি (হিমাচল প্রদেশ) অঞ্চলে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন[1]।
পিতা বল্লাল সেনের মতো লক্ষ্মণসেনও সাহিত্যের
পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর
সভাকবি ছিলেন বিখ্যাত কবি জয়দেব এবং ধোয়ি। জয়দেবের কাব্য “গীতগোবিন্দ”-এর কথা আগেই
বলেছি। ধোয়ির কাব্য “পবন-দূত”, মহাকবি কালিদাসের লেখা “মেঘদূত”-এর অক্ষম অনুসরণ।
লক্ষ্মণসেন তাঁর পিতার অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ “অদ্ভুতসাগর” সম্পূর্ণ করেছিলেন।
[1] কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন হিমাচলের
কুলু ও মাণ্ডি অঞ্চলে আমাকে বাস করতে হয়েছিল এবং সেই সময়েই বেশ কয়েকজন স্থানীয়
“সেন-মহাশয়”-এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তাঁদের কেউই বাংলার সঙ্গে তাঁদের কোনরকম
যোগসূত্রের কথা কোনদিনই শোনেননি, বরং আমার কৌতূহলে
তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ বিরক্তই হয়েছিলেন। কিন্তু আমার কৌতূহল তাতে নিবৃত্ত হয়নি, মাণ্ডি অঞ্চলের অনেক তথ্য ঘেঁটে রূপসেনের ঘটনাটি জানতে
পারি। এই ঘটনার সঙ্গে হয়তো অনেক মিথ জড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু রোপার ও মাণ্ডির সঙ্গে বাংলার সেনবংশের কোন একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র যে
ছিল, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
তার সমর্থনে একটি লিংক এখানে শেয়ার করলাম - https://hpmandi.nic.in/history/
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন