বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " তারকা "


মালতী কাল সারারাত একদমই ঘুমোতে পারেনি,  অসহ্য বেদনায় তার শরীর টনটন করছে এখনওকিন্তু তাও সকাল থেকেই পাড়ায় হৈচৈ শুনে সে বাইরে এসে দাঁড়ালতার কোলে কেঁদে ককিয়ে চলেছে দেড়মাসের মেয়েটা, নাম ফুলকি। ওর বাপেরই দেওয়া সোহাগী নাম। মুখ ফুটে কিছুই তো বলতে পারে না, কিন্তু কাঁদে। খুব খিদে পায় নিশ্চ, বড্ডো কাঁদে।

দিনের পর দিন অভুক্ত শরীরে দুধই বা মালতী পায় কোথায়? কতদিন – কতদিন সে পেট পুরে খেতেই পায় না। একমুঠি শুকনো চিঁড়ে কিংবা দু’মুঠি মুড়ি চিবিয়ে কর্পোরেশনের কল থেকে বিনাপয়সার জল ভরে নেয় তার উদরের গহ্বরে। গত দিন দশেক এমনই চলছে। এই খাদ্যে কতখানি পুষ্টি সঞ্চিত হবে, তার জীর্ণ-শীর্ণ শরীরে সে জানে না। সে জানে না, তার শরীরের কতটা পুষ্টি হলে তার দুই স্তনে সঞ্চারিত হতে পারে, তার কন্যার জীবন সুধা। তবু সে চেষ্টা করে বারবার। খুব কান্নাকাটি করলে ফুলকির ঠোঁটে তুলে দেয় তার শুকনো স্তনের বোঁটা – কিছুক্ষণ চুষে মেয়ে আবার কান্না জোড়ে। তখন তুলে দেয় অন্য স্তন। মায়ের এই ফাঁকিটা ঠিক ধরেও ফেলে একরত্তি ওই প্রাণ – সে নীরস দুই স্তনের আশা ছেড়ে আবার কাঁদতে শুরু করে। যে কান্না যেন শুধু ক্ষিদের জ্বালায় নয়, তার প্রতি তার মায়ের প্রতারণার প্রতিবাদেও হয়তো বা।

অসহায় মালতী মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলায়, ভোলায়, কাতুকুতু দেয় – ক্ষণিকের জন্যে হলেও এক আধবার ফুলকি হাসে খল খল করেমেয়ের সেই হাসি দেখতে দেখতে চোখে জল আসে মালতীর, তার নির্দুধ বুকের মধ্যেও জমে ওঠে কান্না। অভুক্ত ফুলকি আবারও কাঁদে।

কাল সকালেই মালতীর লুকোনো শেষ টাকাগুলোও হাত মুচড়ে নিয়ে গিয়েছিল নোটন। কোথায় বড়ো কাজের সন্ধান পেয়েছে – অনেকটা দূর যেতে হবে – বাসভাড়া লাগবে। কথা দিয়েছিল বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবে, চাল কিনে আনবে, রান্না হবে। আসেনি। বিকেল গেল, সাঁঝ গড়িয়ে, রাত এল। নোটন যখন ঘরে ঢুকল – বাবুদের টিভির সিরিয়ালে সালংকারা, সুবেশা সুন্দরী নায়িকাদের এবং ঝকঝকে সুন্দর সুপুরুষ নায়কদের     যাবতীয় প্রেম-প্রীতি, হিংসা-দ্বেষ, খলতা-ভালোমানুষীর স্থগিত হয়ে গেছে। বাবুরা অধীর আগ্রহে আজ সারারাত অপেক্ষায় থাকবে আগামীকাল কী হবে? প্রেমের জয় হবে? নাকি হিংস্রতা গ্রাস করবে ভালোমানুষীকে? হয়তো সেই ভাবনায় বিঘ্নিত হবে বাবুদের নিশ্চিন্ত ঘুম।  

ঠিক তখনই মালতীর ঘরে চলছে অন্য দৃশ্য। প্রচণ্ড খিদেয় ঝিম ঝিম করা মালতীর মাথায় আগুন ধরে গেল নোটনকে দেখে নোটনের ধরন ধারণ দেখে। হাতে চাল নেই। চুলো নেই, বাবু এত রাতে এসেছে এক পেট মদ গিলে! সারা গায়ে তার উৎকট নেশার গন্ধ।

দাঁতে দাঁত চেপে, খসখসে গলায় মালতী বলল, চাল কোতায়?

কিয়ের চাল? তোর বাপের চালের আড়ত আচে নাকি, যে যাবো আর নে আসব?

আমার টাকা ফেরত দে তবে!

কিয়ের টাকা?

সকালে আমার থেকে টাকা লে গেলি, বললি চাল আনবি।

সে টাকা কি আর আচে নাকি, কবে খরচ হয়ে গেচে।

কোতায় খরচা হল শুনি, মদের ঠেকে? ঘরে মেয়ে আছে, মাগ আছে মনে পড়ে না? তারা পেট শুকিয়ে ঘরে পড়ে আছে, কি খাবে মনে পড়ে না বুজি?

অ্যাই শ্যালা, মেলা জ্ঞান ঝাড়বি না তো। সারাদিন তেতেপুড়ে ঘরে ফিরেচি, তাড়াতাড়ি করে ভাত দে – বহোত খিদে পেয়েচে।

কেন মদ গিলে পেট ভরেনি আবার ভাতও চাই – তোর বাপের বুজি ভাতের হোটেল খোলা আছে, আমি যাব আর নে আসব?

তুই আমার বাপ তুললি রে, হারামজাদি মাগি – এতবড়ো তোর আস্পদ্দা...?

নোটনের বিশাল চড়ে মালতী চোখে অন্ধকার দেখল। মেয়েকে কোলে নিয়েই পড়ে গেল ঘরের মেঝেয়। তাতেও পরিত্রাণ নেই – কোমরে পেটে বারবার লাথি মারতে লাগল নোটন। দেয়ালে পিঠ চেপে উঠে বসে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল মালতী, পারল না। চোখের নীচে প্রচণ্ড এক ঘুঁষিতে সে শুয়েই পড়ল। জ্ঞান হারাল বোধ হয়। না জ্ঞান হারায়নি, কারণ এর পরেও সে নোটনের কথা শুনতে পাচ্ছিল – মরে গেলি নাকি, শালী। চুলোয় যা। জাহান্নমে যা, শ্যালো সংসারে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি। বলতে বলতে নোটনও মেঝেয় শুয়ে পড়ল। নোটনের তেজ স্তিমিত হতে থাকল ধীরে ধীরে – এক একবার সে কথা বলে উঠছিল – শ্যালো কোতাও একটু শান্তি নেই মাইরি...। শেষমেষ ঘুমিয়েই পড়ল - মদের নেশায় আর আকস্মিক উত্তেজনার প্রশমনে।

 ও বাসন্তীদি সকাল সকাল কোতায় চললে গো, দরজা থেকেই জিগ্যেস করল মালতী।

অ মা, তুই কি লা? কিচুই জানিস না। কাল বিকেলে ঠিকেদার আলি এসেচিল পাড়ায় – আজকে ঢালাই হবে যে। তিনতলার বিশাল ছাদ। সকাল থেকে চালু – সেই সন্দে অব্দি চলবে – দেড়শ টাকা হাজ্‌রি আর দুপুরে মাংসের ঝোল ভাত। আমাদের পাড়ার মেয়েরা সবাই যাচ্চে

 দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌...দুপুরে মাংস ভাত?

 মালতীর চোখের নীচে কালশিটের দাগ, কণ্ঠার হাড় বের করা শীর্ণ শরীরের কোথাও একবিন্দুও শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তার কোলে একঘেয়ে কেঁদে চলা দেড়মাসের মেয়ে কিন্তু দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌ আর দুপুরে মাংস ভাত? এই সংবাদ মালতীর শরীরের কোষে কোষে তীব্র শিহরণ সঞ্চার করল। এতটুকুও দ্বিধা করল না মালতী। শুধু একবার পিছন ফিরে দেখল নেশার ঘোরে তখনও ঘুমোচ্ছে নোটন। তার হাঁ করা মুখে ভন ভন করছে দু তিনটে মাছি। দরজাটা চেপে দিয়ে মালতী রওনা হল বাসন্তীদির সঙ্গে।

 

 

ছ’থাক সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠতেই মালতীর হাঁফ ধরে গেল বুকে। বাপরে কি উঁচু! এর পাশেই আরেকখানা বাড়ি বানানো চলছে সেটা গুনে দেখল সাততলা। তার পরেও কাজ চলছে। বাপরে এতো উঁচুতে মানুষগুলো যে থাকে, ভয় করে না? সিঁড়ি ভেঙে ওঠে কী করে মানুষগুলো? মালতী আরও অবাক হল কত যে পুরুষ ও মেয়ে নানান কাজে হাত লাগিয়েছে! ওই দেড়শটা টাকা আর মাংসভাতের আকাঙ্ক্ষায়!

নতুন পরিবেশ, অচেনা জায়গা, অনেক লোকজন দেখে মেয়েটা একটু চুপ করেছিল – কিন্তু একটু জিরিয়ে নেবার সময় দিল না মালতীকে, আবার কান্না শুরু করলমেয়েটা শুধু কাঁদেই এখন। চোখ থেকে একবিন্দুও জল গড়ায় না আর। মুখে শুধু আওয়াজ করে অ্যা অ্যা ...কর্কশ আওয়াজ।

 

বাসন্তীদি ঠিকাদার আলির কাছে নিয়ে গেল মালতীকে, বলল – ও আলি ভাই, এই লাও এই মেয়েটাও কাজ করবে...।

আলি মিয়ার মুখ ভর্তি গুটখার লালা। আকাশপানে মুখ তুলে কী যে বলল – ঠাহর করা গেল না। বাসন্তীদি বললে, আ মোলো যা, মুখের ওই কাচড়া ফেলো দিকি, কি যে কতা বলো বো বো বো করে - কিচুই বোঝা যায় না।

আলি মিয়া মুখের ভেতর জমানো, বালতি খানেক লালা উগরে দিয়ে খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসলে। তারপর খুব রসিক চোখে বাসন্তীদির দিকে তাকিয়ে, মিচকে হেসে বললে, কি কতা শুনবি রে, বাসন্তী – মনের কতা না প্রাণের কতা?

মরণ আর কি, কত ঢং...লাও, লাও ওর সংগে কতা কয়ে লাও।

আলি মিয়া এবার চোখ ফেরাল মালতীর দিকে। হাড়গিলের মতো শুঁটকে চেহারা। বগলে আবার একখান ভূতের মতো ছানা। মাথাটা হেঁড়ে। পেটটা ড্যাগরা। হাত পা গুলো কাটি কাটি। সেই থেকে নাগাড়ে ককিয়ে চলেছে কাগের ছানার মতো। দেখেই আলি মিয়ার মেজাজটা বিগড়ে গেল। এ দিয়ে তার কোন কাজই চলবে না। ও পারবেই না মাথায় ঢালাইয়ের তাগাড়ি বইতে দু তাগাড়ি মাল তুলেই হ্যা হ্যা করে হাঁপাবে।

ওর মধ্যে আর জোয়ানি নেই রে, বাসন্তী।

বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ বন্ধ করে আবার খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসল।

সে না পারুক, অন্য কত কাজ তো রয়েছে, ও মিয়া। লাগিয়ে দাও না কিচু একটাতে।

আলি উঠে দাঁড়াল – জোর হাঁক পাড়ল – সকলের উদ্দেশে, সাতটা বেজে গেচে কখন, একনো সব গুলতানি করছিস, গুয়োর ব্যাটারা? কখন শুরু হবে রে ঢালাই? এই কাশেম বেলচা ধর – বাসন্তী তোর মেয়েছেলেদের বল তাগাড়ি ধরতে।

 

উইঞ্চ মেসিনে গুড় গুড় করে উঠে আসছে ঢালাই। রডের জালির ওপর কাঠের তক্তা পেতে প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে দু জায়গায়। উইঞ্চ থেকে তরল ঢালাই হড়হড় করে নেমে আসছে প্ল্যাটফর্মে। দুপাশে বেলচা ধরে আছে দুটো লোক। এক তাগাড়িতে এক বেলচা মাল তুলে দিচ্ছে, আর সেটা মাথায় নিয়ে মেয়েগুলো চলে যাচ্ছে ছাদের অন্য প্রান্তে। ঝড়াস করে ঢেলে তাগাড়ি খালি করে দিচ্ছে ঠিক জায়গায়। ও প্রান্তে আছে মিস্তিরি – সে দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় কখন ঢালতে হবে – এই কাজ। কিছুই না। এক ঘেয়ে। এক টানা। পিঁপড়ের সারির মতো অবিরাম বয়ে চলা ঢালাই ভরা তাগাড়ি। এক সারি চলছে তাগাড়ি ভরা ঢালাই নিয়ে, আরেক সারি খালি তাগাড়ি নিয়ে আসছে ঢালাই ভরে নেওয়ার জন্যে। পায়ের তলায় রডের জালি, তার ওপর দিয়ে চপ্পল পায়ে হাঁটাটাই যা একটু শক্ত। জালি গুলো হাঁটার সময় বসে যায়। জালির ফাঁকে পা আটকে গেলে তাগাড়ি সমেত মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মালতী। মেয়েকে কোলে নিয়ে মালতী দাঁড়িয়েই ছিল, তাকে আলি মিয়া হ্যাঁ ও বলে নি, না ও বলে নি। বাসন্তীদি কাজে লাগার আগে বলে গেছে দাঁড়াতে – একটা কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 শুরুটা করতে যা একটু ঝকমারি, শুরু হয়ে গেলে ঠিক চলতে থাকে। আধা ঘন্টার মধ্যেই ঢালাইয়ের প্রক্রিয়া চলে এল বাঁধা ধরা ছন্দে, নিশ্চিন্ত মনে একধারে এসে দাঁড়াল আলি মিয়া – এক প্যাকেট গুটখা আর সঙ্গে জর্দার একটা প্যাকেট উপুড় করে দিল মুখের ভেতর – তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল – কাজের ধরনধারণ। মালতী পায়ে পায়ে আলি মিয়ার কাছে গেল। কিচু কাজ দেন না, অ বাবু?

আলি মিয়া এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল, মালতীকে দেখে মনে পড়ল – কি কাজ তরে দি বল দিকি। এক কাজ কর নীচে যা আজ সব মিলে শ’ দেড়েক লোক খাবে তাদের রান্নার যোগাড়ে তুই যা। ধোয়া মোচা। বাঁটা বাঁটি, কাটা কুটি – পারবি তো? রশিদ আছে তারে গিয়ে বল – আমি পেটিয়েচি। সে দেকিয়ে দেবে।

কত দেবে বাবু?

অ্যাঃ কত আর দেব তোকে – পঞ্চাশ দেব যাঃ, আর দুপুরের খাওয়া...যাঃ।

 মালতী নীচে নেমে এলরশিদকে খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হল না। মোবাইলে বলেই দিয়েছিল আলি মিয়া। রশিদ তাকে বসিয়ে দিল আলু পেঁয়াজ আদা রসুন ছাড়ানোর কাজে। দুটো উনোন জ্বলছে দাউদাউ করে, বিশাল হাঁড়িতে ভাত চড়ে গেছে। ভাতের গন্ধ নাকে আসতেই অদ্ভূত চনমন করে উঠল মালতীর শরীর কি সুবাস ভাতফোটার গন্ধে, সে আবেশে মালতীর নেশা হয়ে আসছিল যেন। সে বঁটি নিয়ে বসে পড়ল আলুর বস্তার সামনে। মেয়েটা এখন আর কাঁদছে না, কাঁদতে কাঁদতে সেও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলেই। অভুক্ত, অপুষ্ট শিশুর শরীরে কান্নার মতো শক্তিও এখন আর অবশিষ্ট নেই।

 সাড়ে বারোটার মধ্যে রান্না হয়ে গেল। বিশাল গামলা ভরা দেড়শ লোকের জন্যে সাত কিলো মাংসের টকটকে লাল ঝোল। বড়ো বড়ো আলুর টুকরো। মাংস দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে – তলার দিকে। এক এক দল আসছে, খেয়ে চলে যাচ্ছে, আরেক দল আসছে। ঢালাই বন্ধ হবার নয়। দেড়টা নাগাদ রশিদ বলল – যা ঐ থালটা নিয়ে আয় – তুইও খেয়ে নে মালতী।

কানা উঁচু বড়ো থালা ভর্তি ভাত আর তার মাঝখানে অনেক - অনেকটা ঝোল, তিন পিস আলু আর এক কুচি মাংস নিয়ে একধারে বসল মালতী। মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু মেয়েটা কাঁদছিল না, কোলে শুয়ে টালুক-টালুক চোখ মেলে দেখছিল মাকে। গরম ভাতের মধ্যে আলুগুলো ভেঙে মাখতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা লাগল মালতীর – আউ করে উঠল একবার। মায়ের মুখে অদ্ভূত আওয়াজ শুনে খল খল করে হেসে উঠল শিশু। সামনে ক্ষুধার লোভনীয় অন্ন, কোলে শুয়ে থাকা সন্তানের হাসি। মালতী ভুলেই গেল গত কাল ঘটে যাওয়া সমস্ত দিন ও রাত্রের গ্লানি। বড়ো এক গ্রাস মাখাভাত মুখে তুলল মালতী, জিভ থেকে সমস্ত শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভূত তৃপ্তির সমাচার। মায়ের খাওয়া দেখতে দেখতে শিশু কী বুঝল কে জানে, আবার কান্না জুড়ল।

 মালতীর মনে হল ফুলকিও চাইছে, দুটো ভাত থেতে। খেতে পারবে কি ওইটুকু শিশু? মাত্র দেড় মাস বয়েস! মালতী জানে তার স্তনে এক বিন্দু দুধও জমা হয়নি। তার উদরপূর্তির পর কতক্ষণে ভরে উঠতে পারে তার দুই স্তন, সে জানে না। নাকি বিকেলে আলি মিয়া তাকে যে পঞ্চাশটাকা দেবে, সেই টাকাতে দুধ কিনে দেবে? ততক্ষণ অভুক্ত থাকবে তার সন্তান? মাথা ঝাঁকিয়ে মাথা দুলিয়ে মালতী তার মেয়েকে জিগ্যেস করল - তুই ভাত খাবি, সোনা, ভাত খাবি? খেতে পারবি?

 মালতী ভাতের একটা দানা আঙুলে ভেঙে ফুলকির কচি ঠোঁটে ঠেকালো, ছোট্ট জিভ দিয়ে মুখের ভেতর টেনে নিল মেয়েটা। মুখটা সামান্য বিকৃত করে মুখ নাড়াতে লাগল মেয়েটা। কী বুঝল কে জানে, আবার তাকাল মায়ের মুখের দিকে। মালতী বেশ মজা পেল। মালতী নিজেও গ্রাস তুলতে লাগল, আর এক এক দানা ভাত তুলে দিতে লাগল মেয়ের মুখে। মেয়ের কৃতিত্বে খুশি মালতী এবার আলু দিয়ে মাখা চার-পাঁচটা ভাতের দানার একটা গ্রাস তুলে দিল মেয়ের মুখে। বেচারা ফুলকি এবার আর পারল না। বিষম খেল, শ্বাসনালীতে বিশ্রীভাবে আটকে গেল খাবারের দলা। মালতী প্রথমটা বোঝেনি। মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সে গ্রাস তুলছিল নিজের মুখে। যখন বুঝল, ততক্ষণে ফুলকির শ্বাসরুদ্ধ! মেয়ের যে চোখের মায়ায় মালতীর অন্তর মাতৃত্বে ভরে উঠত, সে চোখ বিস্ফারিত স্থির! শীর্ণ দুই হাত আর পা ছটফট করছে অব্যক্ত যন্ত্রণায়!

 ফুলি, অ ফুলি, কি হয়েছে মা? কি হয়েছে? এই তো আমি। হাহাকার করে উঠল মালতী। ফুলির পিঠ বার বার চাপড়ে দিতে দিতে মালতী ভুলেই গেল তার নিজের খাবার কথা। মালতীর আশেপাশে জড়ো হতে থাকল লোকজন। কেউ একজন বলল – ঐটুকু দুধের বাচ্চাকে ভাত খাওয়াচ্ছিল, আমি নিজের চোখে দেকেচি, তখনই জানি কিচু একটা অঘটন ঘটবে। ঐটুকু বাচ্চাকে কেউ ভাত খাওয়ায় – মা, না ডাইনী? আরেকজন বলল – ওরে ডাক্তারের কাচে নে যাও।

ভিড়ের থেকে রশিদ টেনে বের করে আনল বাচ্চা সমেত মালতীকে। চল ডাক্তারের কাছে চল।

 

 

রিকশা নিয়ে মালতীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল রশিদ। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললে্ন বাচ্চা মারা গেছে অনেকক্ষণ। এ তো পুলিশ কেস। কী করে হল? কেন হল? বাচ্চার পোস্টমর্টেম করতে হবে। হাসপাতাল থেকে পুলিশে খবর দেওয়া হল নিয়মমাফিক। এতক্ষণ রশিদ ছিল পাশে, মালতীর যেন ভরসা ছিল। পুলিশের নাম শুনে রশিদ সরে পড়ল পুলিশ এল। জেরা করে মালতীর থেকে জেনে নিল সমস্ত ঘটনা। দণ্ডবিধানে মালতীর নামে কেস তৈরি হয়ে গেল, মালতী শিশু হত্যার অপরাধে অপরাধী! মালতীকে নিয়ে যাওয়া হল থানার লক আপে। মালতীর মেয়ে ফুলকির ছোট্ট শরীরটা চলে গেল পোস্টমর্টেমের জন্য। ফুলকির ছোট্ট দুর্বল অপুষ্ট শরীরটা কেটেকুটে তার শীর্ণ শ্বাসনালীতে খুঁজে পাওয়া যাবে তার মৃত্যুর কারণ – কি নিষ্ঠুরভাবেই না তার মুখে তুলে দেওয়া হয়েছিল ক্ষুধার অন্ন! নিজের গর্ভের সন্তানের প্রতি কোন মা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে?    অন্ধ আইনের প্রবল ধারার প্রয়োগে বানানো হবে অমোঘ রিপোর্ট। সেই রিপোর্ট থেকে স্থির সিদ্ধান্তে গড়ে নেওয়া যাবে, তার অপরাধী মায়ের চরম নিষ্ঠুরতার কাহিনীকোন ফাঁক থাকবে না তার স্তন্যদায়িনী ডাইনী মায়ের গণতান্ত্রিক শাস্তিবিধানে! 

 

কেসটার নির্বিঘ্নে নিষ্পত্তি হয়ে গেল নিম্ন আদালতে। খুব সহজ সরল শুনানির শেষে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন মাননীয় বিচারক।

 

কারাগারে মালতীর পরনে এখন পরিচ্ছন্ন বস্ত্র। সে এখন নিয়মিত তিনবেলা খেতে পায়সকালে জলখাবার। দুপুরে ডাল ভাত তরকারি। রাত্রে রুটি ডাল সব্জি। হপ্তায় দুয়েকদিন মাছ ডিমও তার বরাদ্দ। তার শরীরে এখন পুষ্টি, তার দুই স্তনেও এখন সদা সঞ্চিত সন্তানের পুষ্টি! ফুলকির কচি অধরে তার স্তনবৃন্ত তুলে না দিতে পারার যন্ত্রণায় সে এখন ছটফট করে নিজের হাতে মাতৃধারায় সিক্ত করে তোলে কারাগার কক্ষের নিভৃত দেওয়াল। মালতী অন্ধকার ঘরের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় সেই চোখদুটি – যে চোখের টালুক-টালুক দৃষ্টিতে চোখ রেখে সে খুঁজে পেত মাতৃত্বের তৃপ্তি!

 -০০-

      

                    

         

          


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...