শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৫ 


ষষ্ঠ পর্ব   


কাগজের নোট 

ভারত ইতিহাসে কাগজের নোট  

সাধারণ মানুষের হাতে সোনা, রূপোর মুদ্রা কটাই বা থাকত, দু-চারটে বড়ো জোর। কিন্তু অসুবিধে হত ধনী আর বড়ো বড়ো বণিকদের। যাদের সঞ্চয়ে প্রচুর সোনা-রূপোর মুদ্রা থাকত। সাধারণতঃ পঁচিশটা মুদ্রা নিয়ে সে সময় এক-একটা কাপড়ের বটুয়া হত। এরকম অনেকগুলি বটুয়া নিয়ে তীর্থ কিংবা বাণিজ্য করতে দেশ-দেশান্তরে যাওয়ায় একদিকে যেমন ঝামেলা ছিল তেমনি ছিল বিস্তর বিপদ। এগুলো ওজনে ভারি হত – আবার ভয় থাকত চুরি বা ডাকাতি হওয়ার। আজকের যুগে হ্যাকাররা যেমন আমাদের ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নিমেষে ফাঁকা করে দেয়, সে যুগেও দেশে দেশে ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে বা কুখ্যাত ডাকাত দলের অভাব ছিল না। অতএব মুদ্রা ব্যবহারের এই বিপজ্জনক ঝক্কি এড়ানোর চিন্তাভাবনা ধনী-বণিকদের মাথায় সর্বদাই ছিল। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই মিলল মুদ্রার বিকল্প – কাগজের নোট। ব্যাপারটা কেমন একটু বুঝিয়ে বলি।

ধরা যাক সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্ত থেকে কোন বণিক পশ্চিমে গেল তার বাণিজ্যের পসরা নিয়ে। সেখানে নির্বিঘ্নে বিক্রিবাটা করে, সে প্রচুর অর্থ উপার্জন করল। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় তার দুশ্চিন্তা – এতগুলি সোনার মুদ্রা নিয়ে পথে যদি কোন বিপদ হয় – সে তো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে! সে তখন কী করল - পশ্চিম প্রদেশের কোন শেঠের কোষাগারে মোহরগুলি জমা করে – সেখান থেকে নিজের নামে একটি নির্দেশ বা প্রতিজ্ঞা পত্র লিখিয়ে নিল, অনেকটা এরকম “পূর্ব প্রদেশের অমুক শহরের অমুক বণিক আমাদের কাছে এত টাকা জমা করেছে, সে নিজের শহরে ফিরে, অমুক শেঠের কার্যালয়ে এই নির্দেশপত্র দেখালে, তাকে যেন সমপরিমাণ টাকা দিয়ে দেওয়া হয়”। ব্যস্‌, লিখিত সেই দলিল নিয়ে বণিক নিশ্চিন্তে নিজের শহরে ফিরে এল এবং পূর্ব প্রদেশের বিখ্যাত ওই নির্দিষ্ট শেঠের কাছে সেই নথি দেখিয়ে টাকাও পেয়ে গেল।

আমাদের দেশে কোন কোন সময় শক্তিশালী সাম্রাজ্যে, যেমন মৌর্য বা গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো সুশাসিত কঠোর প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে, বণিকদের বাণিজ্য করতে তেমন অসুবিধে হত না। কিন্তু ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত এই দেশের ক্ষুদ্র রাজারা নিজেদের মধ্যে লড়াই-যুদ্ধে এতই ব্যস্ত থাকত যে, তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা হত অত্যন্ত দুর্বল। অতএব নানান রাজ্যের বিচিত্র প্রশাসন সামলে বণিকদের বাণিজ্য করাটাই হয়ে উঠত যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ। এই বিঘ্ন এড়াতে দেশ জুড়ে এক নিবিড় বাণিজ্যিক অন্তর্জাল গড়ে তুলে এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী বা পুগা (পালি ভাষায় পুগার অর্থ সমিতি বা সমবায়) (guilds)এই বণিক-সংঘ বা সমবায়ের পক্ষ থেকেই প্রয়োজন বুঝে সংঘের নির্দিষ্ট প্রতীক বা মোহর (Stamp) সম্বলিত “প্রতিজ্ঞা পত্র” (promissory note) দেওয়া হত বিশেষ প্রার্থীকে। ভারতে এই ব্যবস্থা চালু ছিল আজ থেকে অন্ততঃ দেড়-দুহাজার বছর আগে থেকে।         

প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু ধনী শেঠের নাম পাওয়া যায়, যাদের পরিচিতি এবং খ্যাতি ছিল ভারতজোড়া। এর আগে দ্বিতীয় পর্বে বণিক অনাথপিণ্ডদের কথা বলেছি – এমন আরও অনেক বিখ্যত বণিকের নাম পাওয়া যায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মশাস্ত্রগুলিতে। আমাদের ঘরের কাছে মুর্শিদাবাদ শহরের এমনই একজন শেঠের নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনে থাকবে, মানিকচাঁদ - যাঁকে মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ার “জগৎ শেঠ” উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন। শেঠ (সংস্কৃত শ্রেষ্ঠী শব্দের চলিত রূপ) কথার অর্থ Banker এবং জগৎ শেঠ কথাটির অর্থ Banker of the World। সেই সময় এই জগৎ শেঠ পরিবারের সম্পদের পরিমাণ এতই বিপুল ছিল যে, তার প্রভাবে বাংলার সিংহাসন তো বটেই, এমনকি দিল্লির সিংহাসনও টলমল করত!    

সে যাই হোক, ভারতের বণিকমহলে এভাবে টাকার আদান-প্রদান করার ব্যবস্থা আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই প্রচলিত ছিল আগেই বলেছি। এই ব্যবস্থার চলতি নাম ছিল “হুণ্ডি” এবং “হাওয়ালা”। প্রাচীন ভারতের হুণ্ডির কোন নমুনা পাওয়া যায়নি, তবে ব্রিটিশ ভারতের একটি নমুনা থেকে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।  

British India

ব্রিটিশ ভারতে হুণ্ডির নমুনা 

এই ব্যবস্থায় উভয়পক্ষই – অর্থাৎ যে টাকা রেখে নথি লিখে দিচ্ছে এবং যে নথি নিয়ে টাকা ফেরত দিচ্ছে – জমা টাকার কিছু শতাংশ কেটে নিত – এই পরিষেবার ব্যয় হিসেবে। হাওয়ালা ব্যবস্থায় কাগজের নোট ছিল ঠিকই – কিন্তু আসলে এটি ছিল নির্দেশনামা এবং এটির প্রচলন ছিল খুব সীমিত ও পরিচিত বণিকমহলের মধ্যে – সাধারণের জন্য নয়। বলা বাহুল্য, এই নির্দেশনামার সঙ্গে রাজা, সম্রাট, কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না কোন দায়।

স্বাধীনতার পর, ভারতে হুণ্ডি এবং হাওয়ালার মাধ্যমে টাকার আদান-প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধরা পড়লে কঠিন শাস্তিরও বিধান আছে।

    চিনের ইতিহাসে কাগজের নোট   

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বিশ্বে প্রথম কাগজের নোট প্রচলন হয়েছিল চিনদেশে। সপ্তম শতাব্দীতে চিন তখন তাং সাম্রাজ্যের অধীন। যদিও আজকের টাকার নোট বলতে আমরা যা বুঝি, সেটির প্রচলন হয়েছিল আরও পরে, একাদশ শতাব্দীতে সোং সাম্রাজ্যের আমলে।

বিশ্বের প্রথম কাগজের নোট, জিয়াওজি, সোং সাম্রাজ্য, চিন

    ওপরের যে যে কারণের জন্যে ভারতীয় বণিকদের মধ্যে “হাওয়ালা” ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, বলাবাহুল্য চিনেও সেই একই কারণে কাগজের নোট চালু হয়েছিল। এই নোটগুলিও প্রকৃতপক্ষে ছিল জমা রাখা অর্থের বিনিময়ে, আমনাতকারীকে তার প্রয়োজনমতো অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাপত্র (Promissory Note)। চৈনিক ভাষায় এই নোটের নাম ছিল জিয়াওজি (jiaozi)। যদিও সোং রাজত্বে ধাতুমুদ্রা কখনোই বাতিল হয়ে যায়নি – জিয়াওজির পাশাপাশি মুদ্রারও বহুল প্রচলন ছিল। 

    কিছুদিনের মধ্যেই, ১১২০ সিই নাগাদ ধনী বণিকদের হাত থেকে রাষ্ট্র নিজেই এই ব্যবস্থা অধিগ্রহণ করে এবং সরকারিভাবে কাঠের ব্লকে ছাপা কাগজের টাকার প্রচলন শুরু করে দেয়। এক্ষেত্রেও এই নোটগুলি ছিল প্রকৃতপক্ষে জমা রাখা টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিজ্ঞাপত্রই – কিন্তু যেহেতু সম্রাট বা রাষ্ট্র ছিল এই নোটের দায়িত্বে – অতএব এর বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি - বলাই বাহুল্য।

চৈনিক ও মোঙ্গল ভাষায় লেখা একটি কাগজের নোট
 ও নোট ছাপানোর ব্লক 

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভেনিসের বিখ্যাত বণিক এবং অভিযাত্রী মার্কো পোলো ১২৭৮ থেকে ১২৯৫ – প্রায় সতের বছর চিনদেশে বাস করেছিলেন। সে সময় চিনের সম্রাট ছিলেন ইউয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কুবলাই খাঁ – তাঁর রাজত্বকাল ১২৭১ থেকে ১২৯৪ সিই। কুবলাই খাঁ মার্কো ও তাঁর পরিবারকে এতটাই সম্মান করতেন, যে সাম্রাজ্যের অনেকগুলি প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।  

সেই সময়েই মার্কো ওদেশে প্রচলিত কাগজের নোটের সঙ্গে পরিচিত হন এবং এর সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।  সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগে এই কাগজের নোট প্রচলনের বিষয়টি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং ব্যবস্থাটি তাঁর খুব মনে ধরেছিল। পরবর্তীকালে দেশে ফিরে তিনি তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত (The Travels of Marco Polo) লিখেছিলেন। বিখ্যাত সেই গ্রন্থে কাগজের নোট নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন এবং  সেখান থেকেই ইওরোপের মানুষ প্রথম কাগজের নোট সম্বন্ধে অবহিত হয়

প্রসঙ্গতঃ এই লেখার পঞ্চম পর্বে উল্লেখ করেছি মহম্মদ বিন তুঘলক চিনের এই অর্থ ব্যবস্থার অনুপ্রেরণায় ভারতেও মুদ্রার বিকল্প কিছু করার প্রচলন শুরু করেছিলেন – কিন্তু সে প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।


ইওরোপের ব্যাংক নোট বা কাগজের টাকা

সতেরশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইওরোপের বাজারে প্রথম প্রাপ্তি-স্বীকার পত্র (receipts) চালু হয়েছিল। তার কারণ  সে সময় অন্যান্য পণ্যের তুলনায় সোনার অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল এবং যার ফলে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রাগুলির নতুন করে মূল্যমান নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে লণ্ডনের সুবর্ণবণিক সংঘগুলি (goldsmith-bankers), যে কোন ধনী ব্যক্তির জমা রাখা স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে প্রাপ্তি-স্বীকার পত্র দেওয়া শুরু করেছিল। এর ফলে, বণিক সংঘের সঙ্গে কোন সম্পর্কহীন ধনী ব্যক্তিও এই স্বীকার পত্রগুলি মুদ্রার বদলে ব্যবহার করতে পারত, কারণ এই পত্রগুলিতে লিখিত অর্থের পরিমাণ পাওনাদারকে দিতে সংঘগুলি দায়বদ্ধ ছিল।

এই নির্ধঞ্ঝাট প্রক্রিয়া যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ফলে, ধনবান ব্যক্তিরা ছোট-ছোট মূল্যের স্বীকার-পত্রের জন্যে দাবি তুলল। সহজ করে বললে, ধরা যাক মিঃ এ পাঁচ হাজার টাকার স্বর্ণ মুদ্রা জমা রেখে বলল, আমাকে সমমূল্যের একটিমাত্র স্বীকার-পত্র না দিয়ে, পঞ্চাশ টাকা মূল্যের একশটি স্বীকার-পত্র দেওয়া হোক। তাতে তার ছোট-বড়ো যে কোন ধরনের কেনাকাটা বা ব্যবসা বাণিজ্য করতে সুবিধে হবে। এবং এইখান থেকেই সূত্রপাত হল আধুনিক ব্যাংক-নোটের (Bank notes)।

এই ব্যবস্থাটা শুরু হয়েছিল সুবর্ণ-বণিক সংঘ এবং ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে – অর্থাৎ পুরোটাই ছিল বণিক-সভার সঙ্গে ধনীদের ব্যক্তিগত ব্যবস্থা – রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই ব্যাপারে কোন দায়িত্ব ছিল না। সরকারি ভাবে প্রথম ব্যাংক নোট চালু হয়েছিল ১৬৬১ সালে – সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – স্টকহোমস্‌ ব্যাংকো (Stockholms Banco) থেকে – পরবর্তী কালে যার নাম হয় ব্যাংক অফ সুইডেন (Bank of Sweden)।

 https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/7/7e/Sweden-Credityf-Zedels.jpg/220px-Sweden-Credityf-Zedels.jpg  

 যদিও ব্যাংকের অবিমৃষ্যকারীতায় এই ব্যবস্থা বেশিদিন চলতে পারেনি। কেন চলতে পারেনি সে কথাটা জানলে,  তখনকার দিনে ইওরোপের ব্যাংকগুলি (পরবর্তী কালে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের ব্যাংকগুলিও) কেন বার বার দেউলিয়া (Bankrupt) হয়ে যেত, তার প্রধান কয়েকটি কারণ বোঝা যাবে।

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই ইওরোপে তামার দাম দ্রুত হারে কমতে থাকে। তার জন্যে সোনা ও রূপোর মুদ্রার প্রেক্ষীতে তামার মুদ্রার মূল্যমান সমানুপাতিক রাখতে তামার মুদ্রার ওজন বার বার বাড়াতে হচ্ছিল। উদাহরণে ধরা যাক আজকে একটি তামার মুদ্রা দিয়ে দশ কেজি চাল কেনা যাচ্ছে – চালের দাম বৃদ্ধি না পেলেও – কয়েকমাস পরে দশ কেজি চাল কিনতে – পাঁচটি তামার মুদ্রা অথবা আগের তুলনায় পাঁচগুণ ভারি একটি তামার মুদ্রা দিতে হচ্ছে। কারণ ততদিনে তামার দাম অনেকটাই কমে গেছে । এই পরিস্থিতি সামল দিতেই ব্যাংক নোট ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।

এই ব্যাংক নোট ছাপানোর ক্ষেত্রেও একটা নিয়ম আছে, সে নিয়মটা খুব জটিল। খুব সহজ করে বলি, ধরা যাক কোন ব্যাংকের কাছে দশ লাখ টাকা মূল্যের সোনা বা রূপো জমা আছে। ব্যাংকটি জমা মূল্যের সমানসমান ব্যাংক নোট ছাপিয়ে, জনগণের প্রয়োজনমতো যদি বিলি করে, সেক্ষেত্রে ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু তা না করে, ব্যাংকগুলি – জমা-মূল্যের দু-গুণ বা তিনগুণ মূল্যের ব্যাংক-নোট ছেপে জনগণকে বিলি করে থাকে। তার কারণ ব্যাংকিং পণ্ডিতদের তত্ত্ব হল – তিরিশ লাখ টাকার ব্যাংক-নোট কয়েকমাস ধরে যদি দশ-পনের হাজার লোকের মধ্যে বিলি করা যায় – জনগণের কেনাকাটা করার ক্ষমতা বাড়বে, তাতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। সেই তত্ত্বে এটাও ধরে নেওয়া হয় – সকল জনগণ একই দিনে বা একই সপ্তাহে তাদের জমারাখা সব টাকা ব্যাংক থেকে তুলতে আসবে না।  

এ গেল একটা দিক। আরেকটা দিক হল, ওই গচ্ছিত দশ লাখ টাকা থেকেই, ব্যাংক বেশ কিছু বণিক-ব্যবসাদারকে কিছু টাকা (ধরা যাক পাঁচ লাখ) নির্দিষ্ট সময়-সীমায় ঋণ দিল – বার্ষিক ১৫% বা ২০% সুদে। তত্ত্ব বলছে – ঠিকঠাক সময়ে ওই টাকার পুরোটাই ব্যাংকে ফিরে আসবে, উপরন্তু সুদ থেকে ব্যাংকের বেশ কিছুটা  উপার্জনও হবে।

কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাস্তবে তেমনটা হয় না। বহু ঋণ আদায় হয় না, ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে বহু বণিক দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ঋণ ফেরত দেওয়ার অবস্থাতেই থাকে না। উপরন্তু দেশে কোন বড়ো বিপদ উপস্থিত হলে, যেমন যুদ্ধ, ভয়ংকর দুর্যোগ, এমনকি বড়োসড়ো কোন উৎসবের মরশুমে জনগণের মধ্যে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। ঠিক এরকম সময়েই গচ্ছিত মূলধনের তুলনায়, বহুগুণ বেশি ব্যাংক নোট বিলি করা ব্যাংকগুলি দেউলিয়া হয়ে পড়ে – ব্যর্থ হয় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করতে।

এই ধরনের ঘটনা সারা বিশ্বের বহু দেশেই বারবার ঘটেছে – এবং গত আড়াইশ-তিনশ বছরে কয়েকশ ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে – কিন্তু তাই বলে ব্যাংকিং পরিষেবা বন্ধ হয়নি, বরং আধুনিক সমাজ জীবনে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বহুগুণ।

এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক।

সামাজিক এবং আইনসিদ্ধ ঐক্যমত্যর ওপর আধুনিক ব্যাংক নোট বা টাকার মূল্যমান সম্পূর্ণ নির্ভর করে। অর্থাৎ সামাজিক মুক্ত বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং চাহিদার সঙ্গে স্বর্ণ-মুদ্রার মূল্যমান সম্পূর্ণ নির্ভর করে, সোনার ধাতব গুণাগুণের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক থাকে না। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে এই ধারণা থেকেই বাজারে প্রয়োজনীয় ব্যাংকনোট প্রচলন শুরু হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলেন, “টাকা হল একটি কাল্পনিক মূল্যমান যুক্ত কাগজের টুকরো, বিনিময়-প্রথার সুবিধার্থে যার মূল্য নির্ধারিত হয় আইনি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী”।

১৬৯৪ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের টাকা যোগাড় করার জন্যে ইংরেজরা ব্যাংক অফ ইংল্যাণ্ড (Bank of England) গড়ে তোলে এবং ১৬৯৫ সালে এই ব্যাংক থেকে কাগজের নোট ছাড়া শুরু হয় – যার ওপর ব্যাংকের পক্ষ থেকে ছেপে দেওয়া হত “I promise to pay the bearer the value of the note on demand” -  “নোট-বাহকের দাবি অনুযায়ী এই নোটের মূল্য প্রদান করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ”। এইভাবেই অনেক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইওরোপের ব্যাংক নোটের প্রচলন শুরু হল। 

চলবে...

কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬

   ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - "  হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প)   " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - "  পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস...