শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দ্বাদশ পর্বাংশ 


৪.৬ সম্রাট হর্ষ পরবর্তী উত্তর ভারত

এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী অধ্যায়গুলি পড়তে বিরক্তি আসতেই পারে। যাঁরা ইতিহাস নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন কিংবা ঐতিহাসিক হয়েছেন, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু এত রাজবংশ, রাজাদের নাম এবং তাঁদের অজস্র সালতামামি মনে রাখার ভয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলজীবনে ইতিহাস বই ছুঁলেই দু চোখ জড়িয়ে আসত গভীর ঘুমে। তা সত্ত্বেও, ইতিহাস-বিরক্ত সাধারণ পাঠকদের জন্যে খুব সংক্ষেপে এই পর্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করবলক্ষ্য রাখুন, ৬৪৭ সি.ই.-তে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত – দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছ-শো বছরের ভারতীয় রাজনীতির পরিস্থিতির দিকে। সে সময় আমাদের এই ভারতবর্ষ কতগুলি টুকরো ছিল। এবং সেই টুকরোগুলির অধিকার নিয়ে কতগুলি রাজবংশ সৃষ্টি হয়েছে, আর কতগুলি ধ্বংস হয়েছে। প্রত্যেকটি টুকরো রাজ্য কীভাবে প্রতি নিয়ত ব্যস্ত ছিল লাগাতার যুদ্ধে। শুধু সেইটুকুই লক্ষ্য রাখুন।

তা নাহলে কী করে বুঝবেন, আমাদের আধুনিক ভারতবর্ষের চেহারাটা কেন এমন হল? উত্তরভারতের সঙ্গে কেন বনে না দক্ষিণভারতের? বঙ্গ–বিহার-উড়িষ্যার মতো প্রতিবেশী রাজ্যবাসীদের মনে কেন সুপ্ত হয়ে রয়েছে বিদ্বেষ? একটু ফুলকির স্পর্শেই কেন ঘটে যায় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাসমূহ? আমরা যতই আশ্চর্য ও অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিময় যুগে জীবনযাপন করি না কেন, আমাদের মানসিকতার সিংহভাগ পড়ে আছে সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর আশেপাশেই!    

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে” - কবিগুরু যখন এই কথাগুলি লিখেছিলেন, তখন কি তিনি ভারতের এই ইতিহাস জানতেন না? আমি নিশ্চিত, অন্ততঃ আমার থেকে সহস্রগুণ ভালোভাবে জানতেন। তবুও তিনি লিখেছিলেন, হতে পারে, তার একটিই কারণ – ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সাধারণ ভারতীয়দের ঐক্য দেখে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন ভারত বুঝি বা এমনই থাকবে। কিন্তু কই, আমরা তেমন তো রইলাম না? কিন্তু কেন থাকতে পারলাম না? এই সাড়ে ছ-শ বছরের রাজতন্ত্র এবং প্রশাসনিক উচ্চমহলের আত্মক্ষয়ী নির্বোধ অহংকার ও বিবেকহীন দুর্নীতি আমাদের জীবন এবং ভাবনা- চিন্তায় যে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, সেই অভিশাপই যে আমরা আজও বহন করে চলেছি। 

 

৪.৬.১ উত্তরভারতের কনৌজ

আলোচ্য সময়ে উত্তর ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য ছিল কনৌজ – তার রাজধানী কান্যকুব্জ বা কনৌজ শহরের আধুনিক অবস্থান – আধুনিক উত্তরপ্রদেশের প্রায় মধ্যস্থলে। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার কোন কোন সময়ে, দক্ষিণে নর্মদা নদীর উত্তর তীর, পশ্চিমে গুজরাট-সৌরাষ্ট্রের অধিকাংশ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের বেশ কিছু অংশ, উত্তরে কাশ্মীরের কিছুটা এবং নেপালের অধিকাংশ, আর পূর্বে বঙ্গ সাম্রাজ্যের সীমানা

আমরা আগেই দেখেছি কনৌজ সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সম্রাট হর্ষবর্ধন। অতএব তাঁর মৃত্যুর পর দক্ষ ও পরাক্রমী সম্রাটের অভাবে কনৌজকে বারবার প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। এই দুই প্রতিবেশী সাম্রাজ্য হল দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট ও পূর্বের পাল রাজারা।

প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কনৌজ অধিকারের পিছনে রাজনৈতিক অনেকগুলি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধানতম ছিল, পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে সহজ বাণিজ্যপথগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। পাশের মানচিত্রটি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, পূর্ব এবং দক্ষিণের থেকে পশ্চিমের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থলপথটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কনৌজ সাম্রাজ্যের হাতেউপরন্তু, সমগ্র উত্তরভারতের বৈদেশিক নৌবাণিজ্যের প্রধান সমুদ্র বন্দর - গুজরাটের বন্দর শহরগুলিও ছিল কনৌজের আয়ত্ত্বেঅতএব প্রতিবেশী দুই শক্তির স্বপ্ন ছিল কনৌজ সাম্রাজ্য অধিকার করে উত্তরভারতে তাদের সম্পূর্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এই তিন সাম্রাজ্যের অধিপতিদের মধ্যে কেউই এমন কিছু (মৌর্য বা গুপ্ত রাজাদের মতো) প্রতিভাধর পরাক্রমী কিংবা সুদক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, যাতে করে তাঁদের স্বপ্নপূরণ ঘটতে পারত। বরং প্রায় ২৫০ বছর ধরে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করে, একটানা খুব জোর দু-তিন দশকের জন্য কনৌজকে নিজেদের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। তার ফলে তিনটি সাম্রাজ্যই দুর্বল হতে হতে, নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং পরবর্তীকালে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল।  

ওপরের মানচিত্রে দেখানো তিনটি সাম্রাজ্য যেমন নিজেদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে থাকতেন, পরবর্তী কালে টুকরো রাজ্যগুলির রাজবংশসমূহও সেই পরম্পরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছিলেন, মোটামুটি ১৩০০ সিই পর্যন্ত। সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করা যাক। 

সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করব, কিন্তু সব রাজ্য বা রাজার প্রসঙ্গ আনব না – কারণ সে ইতিহাস লিখতে গেলে এই গ্রন্থের আয়তন হয়ে উঠবে মহাভারত-তুল্য। তার থেকে সমসাময়িক ভারতের মুখ্য অঞ্চলগুলি ধরে সেখানকার রাজবংশের কীর্তির কথা সংক্ষেপে বলব – এবং দেখাতে চেষ্টা করব নিজেদের চরণযুগলে কীভাবে তাঁরা কুড়ুল মেরেছিলেন – আগ্রাসী ইসলামিক আক্রমণের সময়।     

 ৪.৭ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি (৬৪৭-১৩০০ সিই)

৪.৭.১ কনৌজ

৪.৭.১.১ রাজা যশোবর্মন

৬৪৭ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে রাজা হর্ষের মৃত্যুর পর প্রায় পঁচাত্তর বছর কনৌজের ইতিহাস তেমন কিছু জানা যায় না। তারপরে মোটামুটি ৭২৫ – ৭৫২ সি.ই. পর্যন্ত যশোবর্মন কনৌজের রাজা ছিলেন। যথারীতি তাঁর বংশ পরিচয় স্পষ্টভাবে জানা যায় না, অনেকে মনে করেন, তিনি মৌখরি বংশের রাজা। তাঁর সময়ে কাশ্মীরের রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় এবং চীনের এক লেখা থেকে জানা যায় রাজা যশোবর্মন মধ্যভারতের রাজা ছিলেন এবং চীনের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন।

যশোবর্মনের রাজ্য বিস্তারে, তিনি যে মগধের রাজা “মগহনাহ”কে পরাজিত করেছিলেন এবং বঙ্গের অনেকটা জয় করেছিলেন, সে বিষয়ে হয়তো সন্দেহ নেই। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য ৭৩৩ সি.ই.তে তাঁর কাশ্মীর জয়ের আশা পূর্ণ হতে দেননি। এই রাজা যশোবর্মনেরই সমসাময়িক ছিলেন, কবি ভবভূতি, যাঁর কথা আগেই বলেছি, তাঁর সভায় আরেক কবির নাম পাওয়া যায়, “বাকপতি”, তাঁর গ্রন্থের নাম “গৌড়ারোহ”। যশোবর্মনের পরে তাঁর উত্তরসূরি আরও তিনজন রাজা হয়েছিলেন, তবে তাঁরা সকলেই ছিলেন গুরুত্বহীন অস্পষ্ট - প্রায় কিছুই জানা যায় না।

৪.৭.১.২ আয়ুধ রাজবংশ

এই বংশের তিনজন রাজা কয়েক বছরের জন্য রাজত্ব করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম রাজার নাম ছিল বজ্রায়ুধ। তাঁর রাজত্বকালের শুরু হয়তো ৭৭০ সি.ই.-তে। তিনি হয়তো কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্যকে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন কিন্তু পরে কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড় বিনয়াদিত্যের (৭৭৯-৮১০সি.ই.) হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন ইন্দ্রায়ুধ এবং তাঁর সমসাময়িক কালেই বঙ্গের পাল রাজাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রকূট বংশের ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৪ সি.ই.) গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজা ধর্মপালের কাছে ইন্দ্রায়ুধ পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর পুত্র চক্রায়ুধকেই রাজা ধর্মপাল কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রথম অমোঘবর্ষ*-এর শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুবর পুত্র তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৪-৮১৪ সি.ই.), ধর্মপাল এবং চক্রায়ুধ দুজনকেই রাষ্ট্রকূট রাজাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলা গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল করে তুলেছিল এবং সেই সুযোগে প্রতিহার বংশের দ্বিতীয় নাগভট্ট চক্রায়ুধকে পরাস্ত করে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন।

[*অমোঘবর্ষ ছিলেন রাষ্ট্রকূট সম্রাট - যাঁর কথা পরে দক্ষিণ ভারত প্রসঙ্গে আসবে।]

৪.৭.১.৩ গুর্জর-প্রতিহার

রজোরার (আলোয়ার) শিলালিপিতে প্রতিহারদের “গুর্জর-প্রতিহারানবায়” অর্থাৎ গুর্জরদের এক শাখা গোষ্ঠী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গুর্জররা ছিলেন, মধ্য এশিয়ার এক উপজাতি, যাঁরা গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর, হুণদের কিছু পরেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।

প্রতিহারদের প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া যায় মধ্য রাজস্থানের মান্দোর (যোধপুরের কাছে) অঞ্চলে এবং রাজত্ব করতেন হরিচন্দ্র। তাঁদের একটি শাখা দক্ষিণে এগিয়ে উজ্জয়িনী অধিকার করেছিলেন। প্রতিহারদের এই শাখার রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, নাগাবালোক অথবা প্রথম নাগভট, শোনা যায় তিনি শক্তিশালী ম্লেচ্ছদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং ভারুকচ্ছ (ভারুচ) পর্যন্ত নিজের আয়ত্তে এনেছিলেন। এই ম্লেচ্ছ সম্ভবতঃ আরবের যোদ্ধা কোন উপজাতি। প্রথম নাগভটের পরবর্তী দুই রাজা গুরুত্বহীন কিন্তু তাঁদের পরবর্তী বৎসরাজা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মধ্য রাজস্থানের ভান্ডি বা ভাট্টি উপজাতিদের পরাস্ত করেছিলেন, প্রায় সম্পূর্ণ রাজপুতানা অধিকারে এনেছিলেন। তিনি গৌড়ের রাজা ধর্মপালকেও পরাজিত করেছিলেন। যদিও এর কিছুদিন পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব তাঁকে উৎখাত করে দেন এবং শোনা যায় তিনি মরু অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বৎসরাজার পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় নাগভট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। তিনি পিতৃরাজ্য আবার অধিকারের জন্যে খুবই চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের কাছে চূড়ান্ত পরাজিত হয়েছিলেন এবং দুর্বল কনৌজ অধিকার করেছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দর ৮১৪ সি.ই.-তে মৃত্যু হওয়াতে দ্বিতীয় নাগভট কিছুটা স্বস্তি পেলেও, গৌড়ের রাজা ধর্মপাল এইসময় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি ভয়ংকর লড়ে মুদ্‌গগিরি (মুঙ্গের) জয় করেন এবং পরবর্তী কালে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলে অন্ধ্র, সিন্ধু, বিদর্ভ এবং কলিঙ্গের রাজারা তাঁর সঙ্গে মৈত্রী করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গোয়ালিয়র শিলালিপি থেকে জানা যায়, এরপর দ্বিতীয় নাগভট একে একে আনর্ত্ত (উত্তর কাথিয়াবাড়), মালব (মধ্য ভারত), মৎস (পূর্ব রাজপুতানা), কিরাত (হিমালয় অঞ্চলে), তুরুস্ক ( পশ্চিম ভারতের আরবি সম্প্রদায়) এবং বৎস রাজাদের অধীন কোশাম্বি (উত্তরপ্রদেশের একটি জেলা) জয় করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় নাগভটের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র রামভদ্র, তিনি খুবই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যে নানান বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছিল। তাঁর পুত্র মিহির ভোজ(৮৩৬-৮৫ সি.ই.) সিংহাসনে বসেই কঠোর হাতে সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন এবং মধ্যদেশের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। প্রথমেই তিনি পূর্বদিকে বঙ্গ ও গৌড় জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গের তৎকালীন রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, পূর্বের আশা ছেড়ে দক্ষিণে মন দিলেন। তিনি নর্মদা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করতে পারলেও রাষ্ট্রকূটরাজ দ্বিতীয় ধ্রুব ধারাবর্ষের কাছে পরাস্ত হলেন, হয়তো ৮৬৭ সি.ই.-তে। যদিও তাঁর বিভিন্ন প্রত্ন-নিদর্শন থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর রাজ্য পশ্চিমে পেহোয়া (কারনাল) এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। একজন আরবি ভ্রমণকারী, সুলেইমানের ৮৫১ সি.ই.-র লেখা থেকে জানা যায়, ভোজ একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর সমৃদ্ধ রাজত্ব ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং রাজ্যে কোথাও চুরি-ডাকাতির ঘটনা ছিল না। তবে তিনি “আরবিদের পছন্দ করতেন না” এবং “মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন”।

মিহিরভোজের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র প্রথম মহেন্দ্রপাল (৮৮৫-৯১০ এ.ডি)। তিনি পূর্বদিকে মগধ এবং উত্তরবঙ্গ অধিকার করলেও, তাঁর সাম্রাজ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রথম মহেন্দ্রপাল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন রাজশেখর, তাঁর গ্রন্থগুলির নাম “কর্পূরমঞ্জরী”, “বাল-রামায়ণ”, “বালভারত”, “কাব্যমীমাংসা” ইত্যাদি। প্রথম মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে কিছুটা বিবাদ হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ সিংহাসনে বসেছিলেন মহীপাল (৯১২ – ৪৪ সি.ই.)। মহীপাল রাজা হওয়ার পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের ভয়ংকর আক্রমণে কনৌজ এবং পূর্বদিকের রাজ্যগুলিও প্রতিহারদের হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রকূটরা ফিরে যাওয়ার পর, প্রতিহারদের দুর্বলতার সুযোগে, বঙ্গের পাল রাজারা ৯১৬-১৭ সি.ই.-তে তাঁদের অধিকৃত রাজ্যগুলির অনেকটাই জয় করতে পেরেছিলেন।

মহীপালের পরে রাজা হয়েছিলেন দেবপাল, তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ৯৪৮ সি.ই.-র কিছুদিন আগেই, কিন্তু তাঁর দুর্বলতার সুযোগে, প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল চান্দেলরা এবং প্রতিহার সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল। প্রতিহার বংশের পরবর্তী রাজা বিজয়পালের সময়ে, প্রতিহার সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেল, যেমন, যোজকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল, অনহিলওয়াড়ার (পাতান, গুজরাট) চালুক্য, গোয়ালিয়রের কচপঘাত, দাহলের চেদি, মালবের পরমার, দক্ষিণ রাজপুতানার গুহিল এবং শাকম্ভরির (রাজস্থান) চাহমানরা। যাই হোক, দশম শতাব্দীর শেষ দশকে পরবর্তী রাজা রাজ্যপাল যখন সিংহাসনে বসলেন, প্রতিহার সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তাচলে। এই সময়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মুসলিম রাজ্য থেকে ভারতজয়ের অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাজ্যপাল উদ্‌ভাণ্ডপুরের (ভাটিণ্ডা) শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৯১ সি.ই.তে সুলতান সবুক্তিগিন এবং ১০০৮ সি.ই.-তে জয়পালের পুত্র আনন্দপালের সঙ্গে সুলতান মামুদকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই যৌথ প্রচেষ্টা দুবারই ব্যর্থ হয়েছিল, এবং ১০১৮ সি.ই.তে রাজ্যপাল গঙ্গা পার হয়ে বারিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরেও ১০৩৬ সি.ই. পর্যন্ত প্রতিহার রাজাদের কথা শোনা যায়, শেষ রাজার নাম ছিল যশপাল।

৪.৭.১.৪ গাড়োয়াল

গাড়োয়াল রাজাদের বংশপরিচয় জানা যায় না। তবে ১০৮০ বা ১০৮৫ সি.ই.-র মধ্যে কোন এক সময় গাড়োয়াল বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রদেব, কোন এক গোষ্ঠী প্রধান গোপালকে পরাস্ত করে, কনৌজ অধিকার করেছিলেন। চন্দ্রদেবের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি কাশী, উত্তর কোশল (ফৈজাবাদ জেলা), কুশিকা (কনৌজ) এবং ইন্দ্রপ্রস্থ (দিল্লি)-র রক্ষাকর্তা। চন্দ্রদেব সম্ভবতঃ ১১০০ সি.ই.তে মারা যান। চন্দ্রদেবের পর রাজা হন মদনপাল, তারপর ১১১৪ সি.ই.-তে রাজা হন মদনপালের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র। রাজা হওয়ার আগেই যখন তিনি যুবরাজ ছিলেন ১১০৯ সি.ই.-তে, মুসলিম রাজা তৃতীয় মাসুদের (১০৯৮-১১১৫ এ.ডি) সেনাপতি হাজিব তুঘাতিগিনের অভিযান প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। রাজা হবার পর তিনি বঙ্গের দুর্বল পালরাজাদের থেকে মগধ এবং মুঙ্গের অধিকার করে নিয়েছিলেন, আরও জয় করেছিলেন মালবের পূর্বাংশ। এছাড়া কাশ্মীরের জয়সিংহ (১১২৮-৪৯ সি.ই.), গুজরাটের সিদ্ধারাজ জয়সিংহ (১০৯৫ -১১৪৩ সি.ই.) এবং সম্ভবতঃ দক্ষিণের চোলদের সঙ্গেও তাঁর মৈত্রী সম্পর্ক ছিল।

গোবিন্দচন্দ্রের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিজয়চন্দ্র ১১৫৪ সি.ই.-তে। সেসময় গজনির আলাউদ্দিন ঘোরির কাছে পরাস্ত হয়ে লাহোর অধিকার করেছিলেন আমির খুসরু*। বিজয়চন্দ্রকে এই আমির খুসরু বা তাঁর পুত্র খুসরু মালিকের ভারত অভিযান প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। বিজয়চন্দ্রের সময় চাহমান (চৌহান) এবং চান্দেলরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলে এবং সম্ভবতঃ তাঁর রাজত্ব থেকে দিল্লি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

[*এই আমির খুসরু কিন্তু বিখ্যাত সুফি কবি ও গায়ক আমির খুসরু (১২৫৩-১৩২৫) নন।] 

বিজয়চন্দ্রের পুত্র জয়চন্দ্র রাজা হয়েছিলেন, ১১৭০ সি.ই.-তে। তাঁর রাজত্বকালের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরির ভারত আক্রমণ। ১১৯১ সি.ই.-তে চাহমান বা চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ সুলতান ঘোরিকে তারৌরির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ে সুলতান ঘোরি এতই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, পরের বছর ফিরে এসে তিনি রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করেন। এই ঘটনায় জয়চন্দ্র সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং কিছুটা স্বস্তিও পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, সুলতান ঘোরি যুদ্ধজয়ের পর স্বদেশে ফিরে যাবেন এবং পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর ফলে উত্তর ভারতে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি হবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি, কারণ ১১৯৪ সি.ই.-তে সুলতান সিহাবুদ্দিন কনৌজ আক্রমণ করেন এবং চন্দোয়ার ও এটাওয়ার যুদ্ধে জয়চন্দ্র পরাজিত এবং নিহত হন। যদিও সুলতান সিহাবুদ্দিন জয়চন্দ্রের পুত্র হরিশচন্দ্রকে কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর মোটামুটি ১২২৬ সি.ই.-তে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অধিকারে চলে গিয়েছিল।

৪.৭.১.৫ চাহমান বা চৌহান

চাহমান বা চৌহানরাও সম্ভবতঃ মধ্য এশিয়ার কোন উপজাতি এবং অগ্নির উপাসক বা অগ্নিবংশ বলে পরিচিত ছিলেন। অগ্নির পবিত্রতায় তাঁরা ভারতীয় সমাজে খুবই সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের বেশ কয়েকটি শাখা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সাকম্ভরি বা সাম্ভর গোষ্ঠী। তাঁদের কথা প্রথম জানা যায়, ৯৭৩ সি.ই.-র শিলালিপি থেকে এবং তাঁদের রাজা প্রথম গুবক, প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভটের সমসাময়িক ছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই বংশের রাজা অজয়রাজ, রাজস্থানে অজয়মেরু নামে এক নগরের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের আজমির। আরেকজন রাজার নাম জানা যায় চতুর্থ বিগ্রহরাজ বিশালদেব (১১৫৩-৬৪ সি.ই.), তিনি নাকি দিল্লি জয় করেছিলেন এবং গাড়োয়াল রাজ বিজয়চন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন। এই বংশের সব থেকে বিখ্যাত রাজা তৃতীয় পৃথ্বীরাজ (১১৭৯-৯২ সি.ই.), যাঁকে মুসলিম ঐতিহাসিকরা রাই পিথৌরা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক নায়কোচিত কাহিনি শোনা যায়। সমসাময়িক কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। রাজা জয়চন্দ্র নিজের কন্যা সংযুক্তা বা সংযোগিতার বিবাহের জন্যে যে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে রাজা পৃথ্বীরাজকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। কিন্তু পৃথ্বীরাজ সভার মাঝখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে বীরের মতো সংযুক্তাকে হরণ করেছিলেন, শোনা যায় কন্যা সংযুক্তারও এতে সম্মতি ছিল, তিনি রাজা পৃথ্বীরাজের গুণমুগ্ধা ছিলেন। এই পৃথ্বীরাজ চান্দেল রাজ পরমারদি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.)-কে পরাস্ত করে বুন্দেলখণ্ড জয় করেছিলেন এবং গুজরাটের চালুক্যরাজ দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গেও তাঁর যুদ্ধ বেধেছিল।  তাঁর শেষ পরিণতি এবং মৃত্যুর কথা আগেই বলেছি।

এভাবেই কনৌজ অঞ্চলে শুরু হল মুসলিম শাসকের আধিপত্য। 

চলবে... 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...