মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫  


২২ 

ভোর হতে আর দণ্ড তিনেক দেরি আছে হয়তো বা। ভল্লার ইচ্ছে ছিল এটুকু সময় সে একটু ঘুমিয়ে নেবে। সে আর হবে না। রামালির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মায়া হল। ছেলেটা কখন এসেছিল তার কাছে? তার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়েই পড়েছে বেচারা। রামালির পাশেই মাটিতে বসল ভল্লা। ছেলেটির বাহুতে হাত রেখে মৃদু স্বরে ডাকল, “রামালি, এই রামালি”।

রামালি ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসল। ভল্লার দিকে তাকিয়ে দেখল, দেখল তার চারপাশ। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই রামালি বলল, “এঃ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!”

ভল্লা হাসল, “এসেছিস কখন?”

“অনেকক্ষণ। দেখলাম তোমার ঘর খালি। তুমি নেই। ভাবলাম গেছ কোথাও, চলে আসবে এখনই। তাই বসে পড়লাম তোমার অপেক্ষায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি...”।

ভল্লা বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিস, বেশ করেছিস। কিন্ত এই মাঝরাতে আমার কাছে কেন? কোন সমস্যা হয়েছে?”

মাথা নীচু করে রামালি বলল, “আমার সমস্যা তো তুমি জানই, ভল্লাদাদা। কাকিমা। হানোর মৃত্যু। আমাদের রামকথা শুনতে যাওয়া। আস্থানের ডাকাতি। কাল সারাদিনই গ্রামের বয়স্করা ব্যতিব্যস্ত ছিল নানান জল্পনায়। সন্ধের পর বাড়ি ফিরতে দেখি তুলকালাম কাণ্ড। দেখি কাকিমা কাকাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করছে আর শাপশাপান্ত করছে। কাকা বাইরের দাওয়ায় ভিজে বেড়ালের মতো বসে আছে। তার দুপাশে বসে আছে কাকার তিন ছেলেমেয়ে। আমি বাড়িতে পা দিতেই মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, “মা, মা, রামালিদাদা এসেছে”। ব্যস, আর যায় কোথায়? কাকিমা ভেতর থেকে বেরিয়ে এল হাতে ঝ্যাঁটা নিয়ে। প্রথমেই অশ্রাব্য কিছু গালাগাল দিল, তারপর দাওয়া থেকে তাড়াহুড়োয় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে, আছড়ে পড়ল মাটিতে। মাথার পিছনটা ঠুকে গেল সিঁড়ির নীচের ধাপিতে। অজ্ঞান হয়ে উঠোনে পড়ে রইল হাত-পা ছড়িয়ে। আমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কাকা আর তার তিন ছেলেমেয়ে হাহাকার করে দৌড়ে গেল কাকিমার দিকে। তাদের চেঁচামেচি শুনে পাশের বাড়ির লোকজনও দৌড়ে এল। অনেকে মিলে কাকিমাকে তুলে নিয়ে গেল দাওয়ায়। মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ তার মুখে মাথায় জলের ছিটে দিতে লাগল, কেউ পাখার হাওয়া করতে লাগল। আমি কী করব, কী করা উচিৎ না বুঝে, একইভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। একফাঁকে কাকা এসে কানে কানে, তুই এখন যা রামালি। অশথ তলায় অপেক্ষা করিস। তোর কাকিমা একটু সুস্থ হলেই আমি যাবো। তুই এখন যা”।

এতক্ষণ ভল্লা চুপ করে শুনছিল। রামালি থামতেই ভল্লা উঠে গিয়ে চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালল। উনুনের মধ্যে আগুনটা গুঁজে দিয়ে আরো কিছু কাঠকুটো রাখলো উনুনের মধ্যে। তারপর ঘর থেকে গতকালের মালসাতে জল নিয়ে বসিয়ে দিল উনুনের ওপর। পাঁচ মুঠি চাল ফেলে দিল মালসায়। তারপর উনুনের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা এসেছিল?”

“এসেছিল। বলল, তুই আর বাড়িতে আসিস না, রামালি। দেখতে পাচ্ছিস তো, তোর কাকিমার অবস্থা? আমাকেও স্বস্তিতে বসতে দিচ্ছে না এক দণ্ড। এতদিন এসব সহ্য করেও চলছিলাম। কিন্তু আজ গ্রামে একটা কথা উঠেছে। কাল রাত্রে নাকি তোরা রামকথা শুনতে যাসনি? আস্থানে গিয়েছিলি ডাকাতি করতে! সে কথা তোর কাকিমার কানেও গেছে। সে কথা শোনার পর থেকেই উন্মত্ত হয়ে গেছে তোর কাকিমা”।

তার মানে কাকার অন্ন তোর ঘুঁচল। তোদের জমিজমা কত আছে?”

“তা আছে – ওই সাত-আট বিঘে মতো”।

“তাতে তোর মানে তোর বাবার অংশ নেই?”

“আছে বৈকি। যা জমি তার অর্ধেকটা তো বটেই। সেটাই তো কাকিমার আক্রোশ, ভল্লাদাদা। বড় হচ্ছি, আমি যদি বাবার অংশের ভাগ চাই? সংসারে ভাইপো পোষা আর দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা একই ব্যাপার”। রামালি বিষণ্ণ হাসল, তারপর বলল, “কী হবে ওই ভাগের জমি নিয়ে? আমারও পেট ভরবে না, কাকারও নয়। মাঝের থেকে উঠতে-বসতে কাকিমা বাপান্ত করবে আমার এবং কাকারও”।

“হুঁ। তাহলে? এখন কোথায় থাকবি? খাবি কি?”

একটু ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “তুমিও নির্বাসিত, আমিও তাই। তোমাকে নির্বাসন দিয়েছে রাষ্ট্র, আমাকে আমার পরিজন। তোমার কাছেই থাকব। তুমিই খাওয়াবে!”

ভল্লা উনুনের মুখে আরো কিছু কাঠকুটো গুঁজে দিয়ে, ফুটন্ত জলের থেকে দু-চারদানা ভাত তুলে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “বাঃ বেড়ে বুদ্ধি খাটিয়েছিস, তো? কাকাকে ছেড়ে দিয়ে এখন আমার ঘাড়ে এসে চড়বি?”

রামালি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভল্লার চোখের দিকে। তারপর মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর আবার মাথা তুলে, চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি শক্তি চাই। আমি দক্ষতা চাই। তোমার মতোই জীবন-মৃত্যুকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চাই। এতদিন যে মরার মতো বেঁচে রয়েছি, তার থেকে মুক্তি চাই। মাথা তুলে বুক চিতিয়ে লড়তে চাই। বাঁচতে গিয়ে যদি মরতেও হয় – তাতেও আমি রাজি। তুমি আমাকে গড়ে তোল, ভল্লাদাদা”। তীব্র জেদ আর ক্রোধে রামালির দুই চোখ এখন আগুনের মতো জ্বলছে।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরে ঢুকে বাঁদিকের কোনায় দেখবি একটা ঝুড়িতে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা আছে, নিয়ে আয়। ওই সঙ্গে একটা সরাও আনবি আর নুনের পাত্রটা…” রামালি উঠে ঘরের দিকে যেতে ভল্লা বলল, “তুই তো আর নরম কাদার তাল নোস, রামালি, আর আমিও কুমোর নইগড়তে হলে, তোকে নিজেকেই গড়তে হবে – আমি পাশে থাকব – মাঝেসাঝে দেখিয়ে দেব, ব্যস্‌ ওইটুকুই”।

ভাতটা হয়ে এসেছিল। উনুনের গর্ত থেকে জ্বলন্ত কাঠ-কুটো সরিয়ে নিয়ে ভল্লা বলল, “সরাটা নিয়ে বস, গরমগরম দুটো ফ্যানভাত খা। পেঁয়াজ-লঙ্কা যা নেবার নিয়ে নে”। কাঠের হাতা দিয়ে মাটির সরায় ভাত তুলতে তুলতে ভল্লা আরও বলল, “কাল নিশ্চয়ই সারাদিন-রাত পেটে কিছু পড়েনি? খিদে পেলে না, আমারও মাথা গরম হয়ে যায়। মনে হয় সব শালাকে দেখে নেবওই তাদের – যাদের দুবেলা দুমুঠো খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও, দেয় না। যেমন তোর কাকা-কাকিমা, তোর পৈতৃক জমির ভাগও দেবে না, আবার তোকে খেতে না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে…। নে, শুরু কর”।

ভল্লা যে তার কথা ভেবেই এই শেষ রাত্রে ভাত রান্না করল, এই সামান্য আন্তরিকতায় রামালি অভিভূত হয়ে পড়ল। বলল, “ভল্লাদাদা, তুমি শুধু আমার জন্যেই…”?

ভল্লা হাসল, বলল, “তা নয়তো কি, আমার জন্যে? শেষ রাতে কেউ, নিজের জন্যে রাঁধতে বসে? কিন্তু এতক্ষণ তো তোর চোখে দিব্যি আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম, সামান্য ফানভাত আর পেঁয়াজেই চোখে জল এসে গেল? চোখে জল নিয়েই কি তুই বুক চিতিয়ে লড়বি, রামালি?”

রামালি বাঁহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেলল, গরমভাত মুখে তুলে পেঁয়াজে কামড় দিয়ে বলল, “না ভল্লাদাদা, বেশ কিছু দিন ধরেই মনে হচ্ছিল এভাবে সারাক্ষণ লাথি-ঝ্যাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকার মানে হয় না। হয় লড়তে হবে নয় মরতে হবে। এসময়েই তুমি আমাদের গ্রামে এলে…”।

ভল্লা রামালির সরায় আরও দুহাতা ভাত দিয়ে বলল, “গ্রামের কী পরিস্থিতি বল তো? শালু আর আহোক ঠিক আছে?”

“হানোর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ পাওয়া ছাড়া গ্রামের মানুষদের তেমন কোন হেলদোল নেই, ভল্লাদাদা। দুপুরের পরে গ্রামে বার্তা এল, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে, তিনজন রক্ষী মারা গেছে। তাতেও গ্রামের লোক তেমন উৎসাহ দেখাল না। বিকেলের দিকে শুনলাম, কেউ নাকি বলেছে, সে রাত্রে রামকথা দেখতে যাওয়ার নাম করে, আমরাই নাকি আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম”।

“কে ছড়ালো কথাটা, জানিস? আমাদের মধ্যেই কেউ বলে দেয়নি তো? শালু বা আহোক, বা অন্য কেউ?”

“মনে হয় না। আমরা তো প্রায় সারাক্ষণই হানোকে নিয়ে ছিলাম। একটু বেলা হলে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করা হল। ওর বাবা চিতাগ্নি করল। আমাদের মধ্যে কেউ বলেছে বলে মন হয় না, ভল্লাদাদা”।

“সারা দিনে কেউ বাড়ি যায়নি? দুপুরে খেতেও যায়নি”।

“না, ভল্লাদাদা। একবার মড়া ছুঁয়ে ফেললে, সে দেহের দাহ সৎকার না করলে, বাড়ির লোকেরা আমাদের ঢুকতেই দেয় না। হানোর সৎকার করতে করতে সন্ধে হয়ে গেল, তারপরেই দীঘির জলে স্নান সেরে আমরা যে যার বাড়ি ফিরেছিলাম”।

“খাওয়া হয়ে গেছে? যা মুখ হাত ধুয়ে আয়। ওই সঙ্গে এই মালসা, সরাগুলোও ধুয়ে আনবি। বাড়ির বাইরে যখন বেরিয়েছিস, নিজের কাজ এখন থেকে নিজেকেই করতে হবে”।

ভল্লার কথায় রামালি উজ্জ্বল চোখে হাসল, “করবো, ভল্লাদাদা। আমি এ সবই করেছি। ছোটবেলায় বাপ-মা মরা ছেলেদের এ সব করতেই হয়”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে যা। সব কথাতেই এমন নাকে কান্না শোনাস না তো! জগতে তোর নাকে কান্না শোনার জন্যে কেউ বসে নেই। কথাটা মনে রাখিস”। রামালি পুকুর থেকে ফিরতে ফিরতে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। ধোয়া পাত্রগুলো ভল্লার ঘরে সাজিয়ে রেখে  রামালি বাইরে আসতেই ভল্লা বলল, “চ তোকে একটা যন্ত্র দেখাই”। ঝোপের আড়াল থেকে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করে ভল্লা এক জোড়া রামালির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এ দুটো কি জানিস”?

রামালি বলল, “বাঁশ, আমাদের এখানে হয়না। শুনেছি পূবের জঙ্গলে হয়। খুব কাজের জিনিষ”।

ভল্লা মুখ ভেটকে বলল, “ব্যাঁশ...বাঁশ তো সবাই জানে...বাড়িতে তুই যে কাঠের পিঁড়িতে বসিস, সেটা কি শুধুই কাঠ? চাষের সময় যে লাঙল ঠেলিস, সেটাকেও কি কাঠ বলিস?” রামালি কিছু বলতে পারল না। বাঁশের গায়ে হাত বুলিয়ে সে ভাবতে লাগল।

“বুঝতে পারলি না তো? এটাকে রণপা বলে”।

“রণপা? তাই? শুনেছি, এতে চড়ে লোকেরা নাকি খুব দৌড়তে পারে। দেখিনি কোনদিন”। রামালি এবার বাঁশের খুঁটি দুটোকে অন্য চোখে দেখতে লাগল।

“এই দ্যাখ” বলে, দুহাতে বাঁশ দুটো ধরে, ভল্লা তুড়ুক লাফে উঠে পড়ল বাঁশের গায়ে বেরিয়ে থাকা দুটো ফেঁকড়ি কঞ্চির ওপর। তারপর চারপাশে কিছুক্ষণ হেঁটে চলে দেখাল। রামালি অবাক হয়ে দেখছিল, আর ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। মানুষের পাদুটোকে যদি আরও হাত দেড়-দুয়েক লম্বা করে ফেলা যায় – তাহলে হাঁটার গতি তো বাড়বেই। আর দৌড়তে পারলে তো কথাই নেই।

রামালি দুহাতে চেপে ধরল বাঁশদুটোকে, তারপর লাফ দিয়ে উঠে পড়ল কঞ্চির ওপর। টলমল করছিল, কিন্তু চেষ্টা করতে লাগল দুই রণপায়ে সমান ভর দিয়ে দাঁড়াতে। এবার ভল্লাই বেশ অবাক হল, বলল, “বাঃ, তোর বেশ এলেম আছে তো? প্রথম বারেই দিব্যি চেপে পড়লি। আমি বাবার কাছে শিখেছিলাম, প্রথমবার চড়তে গিয়ে কতবার যে আছাড় খেয়েছিলাম...। এই দ্যাখ, এইভাবে সোজা হয়ে দাঁড়া। ও দুটো যে বাঁশের লাঠি, ভুলে যা। মনে কর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস, সোজা। চেষ্টা কর পারবি...”।

রামালি পারছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্যে...তারপরেই টলমল করছিল আবার। ভল্লা বলল, “বাচ্চারা যখন প্রথম হাঁটতে শেখে দেখিসনি? তোকেও কি এখন হাঁটতে শেখাতে হবে? বলছি না, ওদুটো যে তোরই পা, সেটা মনে গেঁথে ফ্যাল। হাতের টানে আর পায়ের ঠেলায় হাঁটতে চেষ্টা কর। ভল্লা বার কয়েক হেঁটে দেখাল। রামালি পারল না, হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে খুলে গেল লাঠি দুটো।

ভল্লা কোন গুরুত্বই দিল না, বলল, “ঠিক আছে, আবার চেষ্টা কর, হয়ে যাবে...মনে রাখিস সকাল হলেই তুই রণপা চড়ে এই জঙ্গলের সীমানায় যাবি। রণপা চড়ে গ্রামে ঢুকবি না। সেখানে রণপা রেখে, শল্কু, আহোক এবং আমাদের দলের আরও কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসবি। বলবি ভল্লাদাদা ডাকছে। তারপর আবার রণপা চড়েই আমার কাছে ফিরে আসবি। রাত জেগে তোকে ভাত রেঁধে খাওয়ালাম, কি অমনি অমনি? ও হ্যাঁ, গ্রামের লোকদের বলে দিস, আজ বা কাল আস্থান থেকে রক্ষীদের দল আসতে পারে...ডাকাতির সূত্র-সন্ধান খুঁজতে। আমাদের ছেলেদের মানা করে দিবি, ওদের সামনে যেন না যায়। কোন তর্কাতর্কি, ঝগড়া-ঝাঁটিতে জড়াতে নিষেধ করবি। .গ্রামের বয়স্ক মানুষরাই যেন ঠাণ্ডা মাথায় ওদের মুখোমুখি হয়। মনে থাকবে? এখন কিছুক্ষণ অভ্যাস করে নে, তারপর রণপায় চড়ে ঘুরে আয়”।

টলমল করে রামালি একটু একটু এগোচ্ছিল, আর উলটে পড়ছিল ধপ ধপ করে। জঙ্গলের সরু পথে দুপাশেই রয়েছে ছোটছোট ঝোপঝাড়। পড়ে গেলে খোঁচা-টোঁচা লাগবে, ছড়ে-টড়ে যাবে – তবে বড়ো কোন আঘাত লাগবে না। ভল্লা সেদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে মৃদু হাসল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, “আমার চোখের আড়াল হলেই, তুই যে রণপা ছেড়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে যাবি আর ফিরে এসে আমাকে ফাঁকি দিবি, সে কথা মনেও ঠাঁই দিস না, রামালি। বুঝতে পারলে তোর ঠ্যাং ভেঙে আমিই গিয়ে তোর কাকি কাছে আবার ফেলে আসব। বলব, আমার কাছে যাতে আর না আসতে পারে, তাই ওকে রেখে গেলাম। মনে থাকে যেন”।

রামালি চেঁচিয়ে উত্তর দিল, “আর যদি পারি?”

“তাহলে ওই রণপাজোড়া তোর – আর ওই সঙ্গে পাবি নতুন একটা বল্লম”।

“আমি আসছি ভল্লাদাদা, বল্লমটা এনে রাখো”।

রামালি দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে ভল্লা রণপা থেকে নেমে কিছুক্ষণ বসে রইল। এখন তার তেমন কিছু করার নেই। বসে থাকলে নানান চিন্তায় মাথাটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে – কিছু কাজ হবে না। ভল্লা উঠে দাঁড়াল, রণপা দুটো আগের জায়গাতেই লুকিয়ে রেখে উঠে পড়ল সামান্য দূরের একটা বড়ো গাছে। ওই গাছের ওপরেই রয়েছে তার ঘুমোনোর ঠেক। ভল্লা নিজের কুটিরে কখনোই ঘুমোয় না, বেশিক্ষণ থাকেও না। তার কাজটা এমনই, নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু তারই। সে প্রশাসনের গোপন কাজ করছে বলেই, প্রশাসন তার জীবনের দায় নিয়ে নিয়েছে এমন নয়।  কোন শত্রু বা গুপ্ত ঘাতকের হাতে তার প্রাণ গেলে, প্রশাসন বিন্দুমাত্র দায় নেবে না। কিংবা বলবে না, আমাদের কাজ করতে গিয়ে মহান ভল্লা তার প্রাণটাকে উৎসর্গ করেছে!

এই কুটিরের আশেপাশের চারটে গাছে তার শোয়ার জায়গা বানানো আছে। কবে কোথায় সে শোবে, সে নিজেও জানে না। ভল্লা সেরকমই একটা গাছে উঠে পড়ল। অনেকটা উঁচুতে দুই ডালের মধ্যে বানানো কাঠের মাচায় উঠে সে এলিয়ে দিল শরীরটাকে। রামালির ফিরতে প্রহরখানেক তো লাগবেই। অতএব এখন কোন কাজ যখন নেই, শরীরটাকে কিছুক্ষণ আরাম দেওয়া যাক। 

চলবে...     

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...