এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
৬
শৌনক
জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সূত, দেবর্ষি চলে যাবার পর, মহামুনি বেদব্যাস তাঁর ইচ্ছার কথা
যা শুনলেন, সে বিষয়ে কী করলেন?”
সূত বললেন, “সরস্বতী
নদীর পশ্চিমতীরে ঋষিদের যজ্ঞ অনুষ্ঠানের অনুকূল শম্যাপ্রাস নামে এক বিখ্যাত আশ্রম
আছে। সেই আশ্রমে অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আসনে উপবেশন করে, মহামুনি বেদব্যাস
আচমন করে সমাধিযোগে চিত্তকে স্থির করলেন। ভক্তিযোগে তাঁর নির্মল চিত্ত নিশ্চল
হওয়ার পর তিনি পূর্ণপুরুষ ভগবান ও তাঁর অধীন মায়াকে উপলব্ধি করলেন। এই মায়ায় মুগ্ধ
জীব ত্রিগুণের অতীত নিজের স্বরূপ বুঝতে না পেরে, “আমিই কর্তা, আমিই ভোক্তা”
ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনর্থ লাভ করে। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন,
অধোক্ষজে ভক্তি হলে, সমস্ত অনর্থের নিষ্পত্তি হয়। এই কারণেই তিনি অজ্ঞ লোকের হিত
কামনায় শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করলেন। এই ভাগবত শুনতে শুনতেই শ্রীকৃষ্ণের চরণে
ভক্তির উদয় হয় এবং জীবের শোক, মোহ ও ভয় দূর হয়ে যায়। তিনি ভক্তি প্রধান
শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করে, নিজের পুত্র যোগীশ্রেষ্ঠ শুকদেবকে এই গ্রন্থ পাঠ করালেন”।
শৌণক
জিজ্ঞাসা করলেন, “মহাযোগী শুকদেব সর্বদাই নিবৃত্তিমার্গে বিচরণ করে থাকেন; কোন
বিষয়েই তাঁর প্রবৃত্তি বা আসক্তি ছিল না, সুতরাং তিনি কিসের হেতু এই গ্রন্থ পাঠ
করলেন”?
সূত বললেন, “এও
শ্রীহরির অলৌকিক গুণমাধুর্য। হরিভক্তগণ শ্রীশুকদেবের অত্যন্ত প্রিয়, তিনি শাস্ত্র
ইত্যাদির ব্যাখ্যা উপলক্ষে তাঁদের সঙ্গে শ্রীহরির গুণকীর্তন করতে ভালবাসেন। এই
কারণেই তিনি শ্রীহরির গুণ কীর্তন মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে, এই সুবৃহৎ ভাগবতসংহিতা পাঠ
করেছিলেন।
এখন আমি
আপনাদের রাজর্ষি পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মুক্তি, যার থেকে কৃষ্ণকথার প্রসঙ্গও
আসবে এবং পাণ্ডুপুত্রদের মহাপ্রস্থানের আখ্যান বর্ণনা করব, শুনুন।
অশ্বত্থামার শাস্তিবিধান
কুরুক্ষেত্রের
ধর্মযুদ্ধ তখন প্রায় শেষ। কুরু এবং পাণ্ডব পক্ষের অনেক বীর এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ
দিয়েছেন। মহাবীর ভীমের গদার আঘাতে, দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হয়েছে। বহু প্রিয়জন, আপনজন
হারিয়ে পঙ্গু দুর্যোধন এখন বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত। তাঁকে খুশী করার জন্যে আচার্য
দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা একটি বীভৎস কাণ্ড করে ফেললেন। দ্রৌপদীর ঘুমিয়ে থাকা পাঁচ
শিশু পুত্রের মাথা কেটে নিয়ে এলেন দুর্যোধনের সামনে, তাঁর আশা শত্রুপক্ষের এই নিদারুণ
ক্ষতি দেখে দুর্যোধন যদি একটু শান্তি পান। কিন্তু দুর্যোধন মোটেই খুশী হলেন না বরং
আরো হতাশার মধ্যে ডুবে গেলেন। অশ্বত্থামার মতো বীর তাঁর পক্ষে আছে ভেবে, একসময়
তিনি গর্ব বোধ করতেন। আজ সেই অশ্বত্থামার এই উৎকট দুর্মতি দেখে তিনি নিজেকেই
ধিক্কার দিলেন বারবার। তীব্র ঘৃণায় তিনি মুখ
ফিরিয়ে রইলেন।
[মহাভারতেও আছে দ্রৌপদীর পাঁচ শিশু বা বালক পুত্রকে হত্যা করার জন্যে দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন, ধিক্কার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এই কাজ সনাতনী যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধ। অর্থাৎ পরমশত্রুর শিশুপুত্রদেরও হত্যা করে, তাদের নির্বংশ করাটা ভারতের যুদ্ধনীতি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীযুগে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধকালে এই নীতির কারণে সনাতনী যোদ্ধাদের বারবার মাশুল গুনতে হয়েছে।]
এদিকে জননী
দ্রৌপদী, তাঁর নিরীহ পাঁচপুত্রের হত্যার সংবাদে ভেঙে পড়লেন। শোকে, দুঃখে পাগলিনীর
মতো তিনি বিলাপ করতে লাগলেন। তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে অর্জুন প্রতিজ্ঞা করলেন,
অশ্বত্থামাকে তিনি হত্যা করে, তিনি এর প্রতিশোধ নেবেন। বললেন, হে কৃষ্ণা, যেদিন
আমি ঐ অশ্বত্থামার কাটা মাথা নিয়ে আসব, সেদিন ওই মাথার ওপর বসে তুমি স্নান করো,
সেই দিন তোমার পুত্রশোকের জ্বালা কমবে। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আর দ্রৌপদীকে বারবার
সান্ত্বনা দিয়ে, অর্জুন আবার যুদ্ধ সাজে সাজলেন, চড়ে বসলেন তাঁর কপিধ্বজ রথে। এবারেও
সেই রথের সারথি হলেন, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।
দূর থেকে কপিধ্বজ
রথ আসতে দেখেই, শিশু হত্যাকারী অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ
আসছেন, তাঁকেই হত্যা করতে। ভয়ে তিনি পালাতে লাগলেন, প্রাণপণে ছুটিয়ে দিলেন, তাঁর
রথের ঘোড়া। অনেকক্ষণ এই ভাবে দৌড়তে দৌড়তে, অশ্বত্থামার ঘোড়াগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ল,
তাদের গতি কমে আসতে লাগল। অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, পালিয়ে বাঁচা যাবে না, যদি
কোনভাবে অর্জুনকে আটকে রাখা যায়, অথবা হত্যা করা যায়, তবেই প্রাণ রক্ষা সম্ভব।
বাঁচার একমাত্র রাস্তা প্রতি-আক্রমণ। অশ্বত্থামা ঘুরে দাঁড়ালেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে
ভয়ংকর যে তির ছিল, তার নাম ব্রহ্মশির। এই ব্রহ্মশিরের প্রয়োগ করার নিয়ম তাঁর জানা
থাকলেও, এর নিবারণের নিয়ম তাঁর জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর তখন এতসব ভাবনার অবকাশ
নেই, বাঁচার একমাত্র আশায় তিনি অর্জুনের প্রতি ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলেন।
ব্রহ্মশিরের
তেজে চারদিক ঝলসে উঠল। মহাবীর অর্জুনও চমকে উঠলেন এই অস্ত্রের তেজে। তিনি ভগবান
শ্রীকৃষ্ণকে জিগ্যেস করলেন, “হে কৃষ্ণ, চারিদিকে এই যে প্রচণ্ড তেজ, সবদিক মনে
হচ্ছে যেন গ্রাস করে ফেলবে, এ সব কী, কোথা থেকে হল”?
শ্রীকৃষ্ণ
খুব শান্তভাবে, বললেন, “হে পার্থ, এ হচ্ছে ব্রহ্মশির, ব্রহ্মাস্ত্র। আচার্য
দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা এই তির আমাদের দিকে নিক্ষেপ করেছেন। অশ্বত্থামা
এই তির শুধু ছুঁড়তেই জানেন, একে নিরস্ত করতে শেখেননি। তোমার কাছেও ব্রহ্মাস্ত্র
রয়েছে, অর্জুন, এবং তুমি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ ও নিবারণ দুটোই জানো। কাজেই তুমি
তোমার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে, ওই ব্রহ্মাস্ত্রের তেজ নিবারণ করো। কারণ, এই
অস্ত্রে এই জগতের বহু নিরীহ জীবের অকারণ বিনাশ আমি চাই না”।
[তখনকার যুগে প্রকৃত বীরদের ভয়ানক অস্ত্র প্রয়োগ এবং নিবারণ অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের বিধিও জানতে হত। আজকের যুগে নিউক্লিয়ার অস্ত্র প্রয়োগের টেকনোলজি বিশ্বে অনেকেই জানে, কিন্তু তাকে নিবারণ করার উপায় কি কারো জানা আছে?]
অর্জুন তাই
করলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রদক্ষিণ করে, তাঁর নিজের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়োগ করলেন,
অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ নিবারণের জন্যে।
ব্রহ্মাস্ত্র
নিবারণের পর অর্জুন, ভীত, পরাস্ত অশ্বত্থামাকে বলির পশুর মতো, দড়ি দিয়ে
আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন। তারপর রথে
চাপিয়ে ফিরে চললেন হস্তিনাপুরের দিকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে
প্রিয়সখা অর্জুন, তুমি অশ্বত্থামাকে হত্যা করছো না কেন? ধরিত্রীর বোঝা স্বরূপ এই
পাপিষ্ঠকে রথে চড়িয়ে তুমি কোথায় নিয়ে চললে”?
অর্জুন
বললেন, “হে কৃষ্ণ, ওকে হত্যা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। কারণ ওর পিতা ছিলেন আমার গুরু”।
শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “কিন্তু
তুমি তো পাঞ্চালীর কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছ, যে তুমি ওর কাটা মুণ্ড নিয়ে আসবে। যে
নীচ, ঘুমন্ত শিশু এবং বালককে হত্যা করতে পারে, তাকে ক্ষমা করতে চাও কোন ধর্মের
নীতিতে? এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণের কলঙ্ক। এই ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে কোন পাপ হয় না।
কারণ অশ্বত্থামা যে পাপ করেছে, তার শাস্তি মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না”।
ভগবান
শ্রীকৃষ্ণ বারবার অর্জুনকে এই কথা বলে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু অর্জুন
অশ্বত্থামাকে হত্যা করলেন না।
শোকবিহ্বলা দ্রৌপদী যে শিবিরে ছিলেন, অর্জুন বন্দী অশ্বত্থামাকে সেইখানে নিয়ে গিয়ে দ্রৌপদীর সামনে নিক্ষেপ করলেন। দড়িতে আবদ্ধ পশুর মতো নির্জীব এই অশ্বত্থামাকে দেখে দ্রৌপদীর মনে মায়া হল। তিনি অর্জুনকে প্রণাম করে বললেন, “হে স্বামী, অশ্বত্থামাকে, মুক্ত করো, ওঁকে ছেড়ে দাও। এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণ, তোমার গুরুর পুত্র। আচার্য দ্রোণ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই আচার্যই তো আমাদের সামনে রয়েছেন তাঁর এই পুত্রের রূপে। এঁকে হত্যা করলে এঁর বৃদ্ধা মা গৌতমী, আমার মতোই শোকে পাগল হয়ে যাবেন। সে আমি আদৌ চাই না। এই অশ্বত্থামার জঘন্য একটা পাপের শাস্তি বিধান করতে গিয়ে, আরো একটা পাপ কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত নয়, হে বীরশ্রেষ্ঠ”।
[এও এক আশ্চর্য ক্ষতিকারক ভারতীয় ধর্মনীতি - পুত্রহন্তারকের প্রতিও এত মমত্ববোধ!]
অর্জুন ও
দ্রৌপদীর এই ধর্ম ও ন্যায় বিচারকে উপস্থিত সকলেই সমর্থন করলেও, ভীম সম্মত হলেন না।
তিনি বললেন, “নিদ্রিত পাঁচটি নিষ্পাপ শিশুকে যে হত্যা করতে পারে, তাকে হত্যা করাই
একমাত্র বিচার এবং আমিই এই অশ্বত্থামাকে হত্যা করব”। এই বলে তিনি অশ্বত্থামাকে হত্যা করতে
উদ্যত হলে, দ্রৌপদী তাঁকে নিরস্ত করতে গেলেন। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভীমকেও নিরস্ত
করে, অর্জুন এবং উপস্থিত সকলের প্রতি মৃদু হেসে বললেন, “ব্রাহ্মণ অধম হলেও তাঁকে বধ করা যায় না এবং স্বজন হত্যাকারীর শাস্তি
মৃত্যু – এই দুটি বিধিই আমার তৈরি। হে
পার্থ, তুমি আবার অশ্বত্থামাকে বধ করবে বলে দ্রৌপদীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব সবার সব দিক যাতে রক্ষা হয়, সে ব্যবস্থা এখন তোমাকেই করতে হবে”।
ভগবানের
পরমভক্ত অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণের এই ইঙ্গিত বুঝতে পেরে খড়্গ দিয়ে অশ্বত্থামার মাথার
চুল এবং চুলের সঙ্গে তাঁর মাথার মণি কেটে নিলেন। তারপর তাঁকে শিবির থেকে বের করে
দিয়ে, রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সর্বহারা ব্রাহ্মণের জনসমক্ষে এই
অসম্মান ও নির্বাসন, তাঁর মৃত্যুর সমান”।
[অশ্বত্থামার মাথার মণি ব্যাপারটা ঠিক কি বোঝা যায় না। জন্ম থেকেই তাঁর মাথায় বা কপালে কি কোন টিউমার ছিল? শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে অর্জুন সেই টিউমার কেটে ফেললেন, তাতে অশ্বত্থামার মৃত্যু হল না - কিন্তু মৃত্যু-তুল্য অভিঘাতই বা হল কী করে?
মহাভারতে কর্ণের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনার কথা আছে। সূর্য-তনয় কর্ণ নাকি জন্ম থেকেই (রক্ষা) কবচধারী ছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে দেবরাজ ইন্দ্র সেই কবচ কর্ণের থেকে দান হিসাবে গ্রহণ করে নেওয়ার ফলে কর্ণের (সূর্যের থেকে পাওয়া) দৈবী-রক্ষণশক্তি বিনষ্ট হয়। এই কবচ ব্যাপারটাই বা কি, সেটাও বোঝা যায় না।]
পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন