বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - শেষ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব "



৩২

রাজপ্রাসাদে দ্বিতলের প্রশস্ত অলিন্দে মহারাণি সুনীথার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষি ভৃগু এবং তাঁদের কিছুটা পিছনে দাসী পদ্মবালা। সেখান থেকে প্রাসাদে আসার প্রশস্ত রাজপথটি সম্পূর্ণ দেখা যায়। মহারাণি সুনীথা দেখছিলেন, সুসজ্জিত অশ্বশকটে রাজদম্পতির আগমন। পথের দুপাশে সশস্ত্র নিরাপত্তাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র মানবপ্রাচীর। তার দুপাশে পরিখার সীমানা পর্যন্ত জনতার কালো মাথার সারি। তাঁরা শুনছিলেন, তাদের সমবেত ও স্বতঃস্ফূর্ত জয়ধ্বনির গর্জন, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাণি নিজের আবেগকে সংযত করার চেষ্টা করছিলেন, তবু তাঁর দুই চোখে ভরে উঠল অশ্রু! মহর্ষি ভৃগু, লক্ষ্য করলেন, কিছু বললেন না।

দাসী পদ্মবালা পিছন থেকে বলে উঠল, “যাই বলো রাজকুমারী, রাজকোষের অর্থ এভাবে জলের মতো ব্যয়, মহারাজ অঙ্গ কোনদিন করেননি, বেণের অভিষেকে তুমিও করোনি। আমাদের বেণ কিন্তু সেদিক থেকে খুব মিতব্যয়ী ছিল। সেও কী পারতো না, এরকম জাঁকজমক করতে? তার অভিষেকের সময় এত জনসমাগমও হয়নি, তাই না রাজকুমারী?”

রুদ্ধকণ্ঠে মহারাণি সুনীথা বললেন, “চুপ কর পদ্ম, চুপ কর। সে অভিষেকের সঙ্গে এ অভিষেকের বিস্তর পার্থক্য, তুই কী বুঝিস রাজনীতির?”

“তা বুঝিনা, আমার আর এ বয়সে বুঝে কাজও নেই। যা মনে হল, বললাম, সে তুমি যাই মনে করো রাজকুমারী”।

সেকথার কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথা, তিনি নিজের মনেই যেন বললেন, “রাজা অঙ্গের অন্তর্ধানের পর থেকে এই রাজ্য যেন রাহুগ্রস্ত ছিল। বেণের জোরাজুরিতে আমিই তাকে তার পিতার সিংহাসনে বসার অনুমতি দিয়ে অভিষেকের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের কেউই সেটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, না মন্ত্রীমণ্ডলী, না জনগণ। এমনকি আমিও!”

“কী বলছো, রাজকুমারী, তুমি বেণের মা, তুমিও মন থেকে চাওনি?”

“মহারাজ অঙ্গের মতো অজাতশত্রু প্রজাপিতা এক রাজা কেন অন্তর্ধান করলেন? তাঁর এমন পরিণতি আদৌ প্রাপ্য ছিল না। তাঁর এই আকস্মিক অন্তর্ধানের রহস্য আমার কাছে আজও স্পষ্ট হল না। হয়তো হবেও না কোনদিন। তিনি যদি আমার এবং পুত্রের প্রতি ক্ষোভে, অভিমানে সত্যিই বাণপ্রস্থে গিয়ে থাকেন, আমার কাছে সে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। মহর্ষি ঠাকুর, শুনেছি, পত্নীকে সঙ্গী করেই বাণপ্রস্থে যাওয়ার বিধান আছে আপনাদের শাস্ত্রে! মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থে গিয়েই থাকেন, তিনি আমাকে একবার বলারও প্রয়োজন মনে করলেন না? আমি অধর্মের কন্যা, কিন্তু আমাদের দীর্ঘ দাম্পত্যে তাঁর সেবায় কোনদিন কোন ত্রুটি করেছি, কিংবা তাঁকে অসম্মান করেছি এমন তো স্মরণে আসছে না! আমার প্রতি তাঁর আচরণেও কোনদিন কোন দ্বেষ বা বিরক্তি তো অনুভব করিনি। তাহলে? তিনি কী বাণপ্রস্থে আদৌ যাননি? কী হল তাঁর? কোথায় গেলেন? ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পুত্র বেণ একবার যে কথার ইঙ্গিত দিয়েছিল, সেই কী তবে তাঁর শেষ পরিণতি...কিন্তু সে কথা...?”

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন একটু অধৈর্যের সঙ্গেই বললেন, “মহারাণি, আপনি শান্ত হোন, অনর্থক অস্পষ্ট অতীতের কথা চিন্তা করে, নিজেকে পরিতপ্ত করবেন না। আজকের মতো এক মঙ্গললময় দিনে আপনার এই শোকবিলাপ মানায় না। আপনার একমাত্র পুত্র বেণের মানসপুত্র, পৃথুর আজ রাজ্যাভিষেক এবং বিবাহ। মহারাজা অঙ্গের কৃতজ্ঞ প্রজারা আজ আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তারা দুহাত ভরে অভিষিক্ত রাজদম্পতিকে উপহার দিয়েছে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজকরে, কোষভাণ্ডার পূর্ণ, উদ্বৃত্ত। তাদের আন্তরিক আশীর্বাদের ধ্বনি আপনি শুনতে পাচ্ছেন, মহারাণি”। মহারাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুর এই কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন।

কিছুক্ষণ পর মহর্ষি ভৃগুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “এই আয়োজন ও অনুষ্ঠানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, মহর্ষিঠাকুর। এমন রাজসিক আয়োজন মহারাজ অঙ্গের প্রাসাদের উপযুক্ত। কিন্তু মহর্ষিঠাকুর, আমি জানি পৃথু ও অর্চ্চি কোন অবতার নয়, ওরা আমার পুত্র বেণের মানসপুত্রও নয়। এ সমস্তই আপনার বানিয়ে তোলা, সাজানো ঘটনা”। মহর্ষি ভৃগু কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একটু থেমে মহারাণি আবার বললেন, “আপনিও জানেন না, মহর্ষি ঠাকুর, আমিও জানি না – রাজা পৃথু মহারাজ অঙ্গের যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে পারবে কি না! যদি না হয় আপনার এই প্রয়াস ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে”।

মহর্ষি ভৃগু মহারাণি সুনীথার চোখে চোখ রেখে বললেন, “আপনি তো জানেন, মহারাণি, আপনার পুত্র বেণ, মহারাজা অঙ্গের অত্যন্ত অযোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন, তাঁর মাত্র ঊণিশ মাসের শাসনকালেই রাজ্যের সর্বত্র হাহাকার শুরু হয়ে গিয়েছিল”।

ক্রোধে মহারাণি সুনীথার দুই চোখ ঝলসে উঠল, তিনি রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন, “আপনি, একজন মাতার সামনে পুত্রের নিন্দা করছেন, মহর্ষিঠাকুর, আপনার এত ঔদ্ধত্য?”

মহর্ষি ভৃগু অত্যন্ত শান্তস্বরে বললেন, “না, মহারাণি, আমি এই রাজ্যবাসীর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মাতার কাছে, এক দুর্ধর্ষ অত্যাচারী রাজার সমালোচনা করছি। যে রাজার কারণে মহারাণি নিজেও অত্যন্ত মনঃকষ্টে ছিলেন”।

মহারাণি অনেকক্ষণ কোন কথা না বলে মহর্ষি ভৃগুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর শান্তস্বরে বললেন, “হে মহর্ষিঠাকুর, আপনি আমার স্বামী মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রিয়সখা ও মন্ত্রণাদাতা। অনেক দুঃখে-কষ্টে বিপদে-আপদে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। সেকথা ভুলিনি মহর্ষিঠাকুর! এবারেও অনুপস্থিত প্রিয়সখা মহারাজ অঙ্গের বংশমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে আপনি অজস্র ষড়যন্ত্র এবং ছলনার আশ্রয় নিলেন। একমাত্র পুত্র বেণের মাতা হয়ে, আপনাকে অভিশাপ দেওয়াই আমার উচিৎ ছিল, কিন্তু আমার এই পুত্রের মাতা হওয়ার পিছনেও ছিল, আপনার ছলনা। আপনি ধর্ম পথের পথিক হয়েও বারবার এত ছলনার আশ্রয় নেন, কোন ধর্মমতে?” মহারাণি সুনীথার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল আবেগে!

মহর্ষি ভৃগু অস্ফুট স্বরে বললেন, “মহারাণি, রাজদম্পতি নীচেয় এসে গেছে, আপনার আশীর্বাদের জন্য অপেক্ষা করছে, আপনি বরণ করবেন না?”

“বরণ? আমি বরণ করবো? কোন সম্পর্কে মহর্ষি ঠাকুর?”

“পিতামহী”।

“পিতামহী?” মহারাণি সুনীথা মাথা নত করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর চেঁচিয়ে বললেন, “পদ্ম, বরণডালা কোথায়, এখনই নীচেয় যা, বরণডালা সাজা, দীপ জ্বালা...আমি আসছি। ছেলেমেয়ে দুটোকে বরণ করতে হবে না?” দাসী পদ্মবালা আকস্মিক এই আদেশে দৌড়ে নীচেয় চলে গেল। পদ্মবালা চলে যাওয়ার পর মহারাণি সুনীথা মেঝেয় বসে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন মহর্ষি ভৃগুকে।

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “আপনাদের ভগবান বিষ্ণুকে আমি জানি না, শুনেছি তাঁকে প্রত্যক্ষ করা দুঃসাধ্য! মহর্ষিঠাকুর, আপনার মহাপুণ্যময় প্রবোধিনী একাদশী তিথির কপট যজ্ঞ অনুষ্ঠানকালেও, আমি মনকে এই বলে প্রবোধ দিয়েছি, আপনি যা কিছু করছেন, সব কিছুই মহারাজ অঙ্গ এবং তাঁর আপামর রাজ্যবাসীর কল্যাণের জন্যই করছেন। অতএব আমার উপলব্ধিতে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু না থাকুন, আমার কাছে আপনিই তাঁর অবতার – কপট, লীলাময়, অপ্রতিরোধ্য - কিন্তু আশ্চর্য মঙ্গলময়। আপনি যা কিছু করেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন”।

একটু বিরতি দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহারাণি সুনীথা আবার বললেন, “আমায় অনুমতি দিন, মহর্ষি ঠাকুর, আমি নীচেয় গিয়ে ছেলেমেয়েদুটিকে বরণ করি। আপনার অনুগ্রহে আমিই তো এখন এ রাজ্যের রাজপিতামহী...!” এই কথা বলে মহারাণি ধীর পদক্ষেপে চলে গেলেন নিম্নগামী সোপানের দিকে।  

 

তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মহর্ষি ভৃগু বরাভয় মুদ্রায় ডান হাত তুলে, অস্ফুট স্বরে আশীর্বাদ করলেন মহারাণি সুনীথাকে। দ্বিতলের এই প্রশস্ত অঙ্গন এখন দ্বাদশীর জোৎস্নায় প্লাবিত। মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন – নিঃসঙ্গ দ্বাদশীর চাঁদ এখন আকাশে বিরাজমান এবং এখন এই রাজ্যে, এই প্রাসাদে তিনিও একা এবং নিঃসঙ্গ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কলঙ্কযুক্ত কিন্তু প্রায়-পূর্ণ চন্দ্রের দিকে।   

 

সমাপ্ত

 

[গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগের পঞ্চবিংশতি শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

“মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ”।।

অর্থাৎ, মহর্ষিদের মধ্যে আমিই ভৃগু, সমস্ত বাক্যের মধ্যে আমিই একাক্ষর প্রণব, সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে আমিই জপযজ্ঞ, সমস্ত স্থাবরের মধ্যে আমিই হিমালয়।

গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতি যোগ – পড়ে নিতে পারেন - গীতা - ১০ম পর্ব ]


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

মাফিয়া

  এর আগের অণুগল্প - "  বড়ো মাথা  "      ক্লাস নাইনের বাংলা ক্লাসে বরদাস্যার ছেলেদের শুধোলেন, “বড়ো হয়ে তোমরা কী হতে চাও?” ছেলেদের অ...