বুধবার, ২ জুলাই, ২০২৫

ভূতের ভরসা (ভৌতিক)

এর আগের ছোটদের গল্প - " ভূতডাঙার গল্প (ভৌতিক)  "





 

 ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা দিয়ে কলেজে এখন ছুটি। সর্বজিৎ প্রফুল্লনগরে এসেছে মাসী্মার বাড়ি বেড়াতে। এই জায়গাটা সর্বজিতের খুব পছন্দের জায়গা। ছোট্ট শহর বলেই, শহরের সব সুযোগসুবিধে যেমন মেলে, তেমনি মেলে দেদার গাছপালাওয়ালা, নিরিবিলি ফাঁকা মাঠঘাট। মনটা হালকা হয়ে যায়, ভালো হয়ে যায়।

এর সঙ্গে অবশ্য আছে মাসিমার দারুণ রান্না। নানান পদ রান্না করে সর্বজিৎকে খাওয়াতে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। মেয়েরা তাঁর পেছনে লাগার জন্যে কিছু বললে, তিনি বলেন, “তোরা তো আমার হাতে সারা বছর খাস, তা সত্ত্বেও তোদের মন পাই না। আর ও বেচারা সারাটি সময় হস্টেলে ছাইপাঁশ কী খায়, না খায় তার ঠিক নেই; দুদিন বাড়ি এলে খাওয়াবো না? একশ বার খাওয়াবো, সে তোরা হিংসে কর, আর যাই কর

তাদের তিনবোনের কেউই সর্বজিৎকে হিংসে করে না। বরং সর্বজিৎকে খুব ভালোবাসে। সর্বজিতের ডাক নাম, সরু। সরুদা এলে বরং খুব মজা হয়। এই কটাদিন মা কিংবা বাবা লেখাপড়া নিয়ে খুব চাপ-টাপ দেন না। রোজই বিকেলের দিকে পাহাড়-চূড়ায় বেড়াতে যাওয়া হয়, নেমে এসে বাজারের সামনে ফুচকাওয়ালার থেকে ফুচকা, চুরমুর খাওয়া হয়। আর সারা দিন গল্পতো আছেই। সরুদার কাছে গল্প শোনাও দারুণ মজা, নানান জায়গার নানান ঘটনার কথা এমন করে বলবে, হাসতে হাসতে চোখে জল চলে আসে। মাও থাকেন সে সব সময়, তিনিও খুব হাসেন।

সেদিন সন্ধেবেলা বারান্দায় বসে সবাই মিলে গল্প হচ্ছিল, বাবা-মাও ছিলেন; হঠাৎ সরুদা বলল, রুন্টুঝুন্টু, তোদের সেই বেস্ট ফ্রেন্ড রুকু-সুকু কোথায়, দেখছি না যে!

সামনের পেয়ারা গাছের আড়াল থেকে রুকুসুকু, হালকা ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে এল। তাদের মুখে একগাল হাসি। মৃদু হাওয়ায় দুলতে থাকা ভারি পর্দার মতো দুলতে দুলতে রুকু বলল, আজ্ঞে, এখানেই আছি, দাদা। আপনি সকালে এলেন, সারাটাদিন মজার মজার কথা বলছেন, শুনছি। তারপরে আপনারা বিকেলে পাহাড়চূড়ায় বেড়াতে গেলেন, আমরাও সঙ্গী হলাম। আপনি এলে বাড়িটা খুব জমজমাট লাগে। এবারে কিন্তু বেশ কটাদিন থাকতে হবে, দাদা। সেই কবে এসেছিলেন, আপনাকে তো প্রায় ভুলেই গেছিলাম। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সকালে হুট করে দরজা খুলে যেভাবে ঢুকলেন, আমি তো ভাবছিলাম আপনাকে ঠেলে বের করে দেব। সুকু, চিনতে পেরে বলল, আরে ইনি তো সরুদাদা! তা না হলে কি যে অসৈরণ কাণ্ডটা ঘটে যেত!লজ্জায় মাথা নিচু করে দুলতে লাগল রুকু।

সরুদা মুচকি হেসে বলল, বোঝো কাণ্ড, রুন্টুঝুন্টু তোর বন্ধুরা আমাকে ঠেলে ফেলে দিতে আসছিল

ঠিকই তো বলেছে। ওদের কি দোষ, বছরে এক আধবার এলে, ওরকমই হবেরুন্টু হেসে উত্তর দিল। রুন্টুর খোঁচাটা সরুদা গায়ে মাখল না। গম্ভীরমুখে সরুদা জিগ্‌গেস করল, সে না হয় হল। কিন্তু রুকু, প্রমোটার প্রমথবাবু আর জ্যোতিষী কাত্যায়ন শাস্ত্রী কী করছে এখন”?

দুজনেই বড়ো কষ্টে আছে, দাদা। প্রথমবাবুর ফ্ল্যাট যারা বুক করেছিল তারা রোজ এসে সকাল থেকে রাত অব্দি প্রথমবাবুর ঘরে ধর্না দিয়ে বসে থাকে। প্রথমবাবু ভোরে বেরিয়ে যায়, মাঝ রাত্রে ঘরে ফেরে। আর নাত্যায়ন শাস্ত্রী কলকাতায় কার্জন পার্কের সামনে টিয়াপাখির খাঁচা নিয়ে বসে, হপ্তায় পঞ্চাশ ষাট টাকার বেশি রোজগার হয় না। দুজনের দুর্গতি দেখলে, আপনার চোখে জল চলে আসবে, দাদা

তোরা প্রমথকে প্রথম আরা কাত্যায়নকে নাত্যায়ন বলছিস কেন, রে”? সরুদা বিরক্ত হয়ে জিগ্‌গেস করল।

ওরা তো অশরীরি, ঠাকুর দেবতার নাম নিতে পারে না, তাই ওরকম বলেরুন্টু ওদের হয়ে উত্তরটা দিয়ে দিল। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সরুদা, তারপর বলল, অ। এতসব নিয়ম কানুন তোদেরও মানতে হয়, বুঝি? বুঝলাম। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, ওরা আমাদের সর্বনাশ করতে এসেছিল, তাই আমরা ওদের শাস্তি দিয়েছি, রুকু, কিন্তু ওদের সর্বনাশ তো আমরা চাইনি

একদম ঠিক বলেছেন, দাদা। এই নিয়ে আমাদের সমাজে খুব কথা শুনতে হচ্ছে। বলছে আমাদের জন্যেই নাকি মানুষরা ভুল বোঝেসুকু খুব উত্তেজিত হয়ে বলল।

তোদের সমাজ? সেটা কিরকম বস্তু?” সরুদা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

রুকু বলল, “আমাদের সমাজকে নিরাকার সমাজ বলে। আমাদের সমাজেও নেতা আছে মন্ত্রী আছে, প্যাঁচ পয়জার আছে, দলবল আছে। পুলিশ আছে, আইন আদালত আছে। একদমই মানুষদের মতো। তবে কিনা মানুষরা যেমন নিজেদের মধ্যে মারদাঙ্গা, লুটপাট করে; খুনোখুনি করে, আমাদের তেমন হয় না। আগে ভূতেরা খুব হিংস্র হতো, মানুষের ঘাড় মটকাতো, ভয় দেখাতো। বেশ কবছর হল সে সব একদম বন্ধ

হঠাৎ তোদের এই সুবুদ্ধির কারণ?” সরুদা জিগ্‌গেস করল।

রুকু তার উত্তরে বলল, দাদা, মানুষ অপঘাতে মরেই তো ভূত হয়। মানুষ যে হারে মরছে, ভূতেদের সংখ্যাও তো বেড়ে চলেছে। আজকাল মানুষরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করেই এত মরছে, তার ওপর আমরা ঘাড় মটকালে ভূতেদের আর পা ফেলার জায়গা থাকবে না। সেই কারণেই আমাদের নেতারা সকলে মিলে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, আর কোন নরহত্যা নয়। বরং মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো, পারলে উপকার করো

সুকু এতক্ষণ চুপ করে বসে শুনছিল, এখন বলল, একটা কিছু ভাবুন দাদা, যাতে প্রথমবাবু, নাত্যায়ন শাস্ত্রী আর ওই ফ্ল্যাট বুকিং করা আটষট্টি জন লোক দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারে, আগের মতো আবার সব যেন ঠিকঠাক চলতে থাকে

সরুদা গম্ভীরভাবে বলল, “হুম, সেটাই তো ভাবছি, কি ভাবে কী করা যায়। আমার মনে হচ্ছে, তোদের নাত্যায়ন শাস্ত্রীই আমাদের হয়ে পুরো কাজটা সামলে দিতে পারবে, যদি তোরা দুজনে তাকে একটু সাহায্য করতে পারিস

আমরা সাহায্য করার জন্যেই তো বসে আছি, দাদা। আপনি শুধু হদিশটা বাৎলে দিনরুকু-সুকু একসঙ্গে বলে উঠল।

 

 

 

কাত্যায়ন শাস্ত্রী ফুটপাথের একধারে সকাল নটার মধ্যেই গুছিয়ে বসে পড়ে। তার সামনে প্লাস্টিকের চাদরের ওপর টিয়াপাখির খাঁচা, খাঁচার সামনে সাজানো ভাগ্যফল লেখা সারি সারি কার্ড। দুটো টাকা দিলে, কাত্যায়ন খাঁচার দরজা খুলে দেয়। পোষা টিয়াপাখি, বাইরে বেরিয়ে এসে একটা কার্ড ঠোঁটে নিয়ে কাত্যায়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, আবার খাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়ে। খাঁচার দরজা বন্ধ করে কাত্যায়ন, ভাগ্য বিচার করতে আসা গরিব-গুর্বো মানুষগুলোকে, সেই কার্ডের লেখা পড়ে শোনায়। সে সব কার্ডের কোনটায় লেখা থাকে –”আপনার শুদীন আসতে আর দেরী নেই। আর মাত্র কয়েকটা দীনের প্রতিক্‌খা  কোনটায় – “আপনার দূঃখের দীন শেষ হয়ে এসেছে, আর কটা দীন পরেই আপনি যা চাইছেন সব পেয়ে যাবেন

সেদিনও কাত্যায়ন শাস্ত্রী সকাল নটার আগেই গুছিয়ে বসেছিল, কার্জন পার্কের উলটোদিকের ফুটপাথে। সকলের অলক্ষ্যে, তার দুপাশে এসে বসল রুকু আর সুকু। কাতারে কাতারে অফিসের বাবুরা দৌড়চ্ছে তাদের অফিসের দিকে। কাত্যায়ন তাদের দেখছিল আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিল। রোজ বাড়িতে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে অফিস করা এই বাবুরা কত কত টাকা মাইনে পায়, আর দুটো টাকা দিয়ে নিজের ভাগ্যটা জানতেও এদের কোন ইচ্ছে হয় না? মাত্র দুটোই তো টাকা!

রুকু খুব চাপা স্বরে বলল, “ও টাকায় টিয়ার জন্যে ভিজে ছোলা কিংবা পাকা লংকারও দাম তো ওঠে না, শাস্ত্রীজি। আপনার কি হবে”?

ঘাড় ঘুরিয়ে কাত্যায়ন শাস্ত্রী চারদিকে তাকালো, আশেপাশে কাউকেই দেখতে পেল না। তাহলে কে বলল কথাটা? কথাটা তার একদম মনের কথা, কিন্তু মনের কথা এমন স্পষ্ট করে কানেও শোনা যায় নাকি? একটু চমকে গেলেও কাত্যায়ন শাস্ত্রী ঘাবড়ালো না। তার মনে আছে প্রফুল্লনগরের সেই দিনের ঘটনার কথা, কিন্তু এটা তো আর প্রফুল্লনগর নয়। কলকাতা শহর। পিছনদিকে রাজভবন, সামনে কার্জন পার্ক। মাঝখানের চওড়া রাস্তা দিয়ে দৌড়ে চলেছে অজস্র বাস আর গাড়ি। দৌড়ে চলেছে হাজার হাজার চাকুরে লোক। এ হচ্ছে সরকারি খাস জায়গা। প্রকাশ্য দিনের বেলা এখানে কোন ভূতের বাপের ক্ষমতা হবে না, তার কোন ক্ষতি করার।

রুকু আবারও বলল, “আমরা এখানে এসেছি আপনার কোন ক্ষতি করতে নয়, শাস্ত্রীজি, বরং উপকার করতেই এসেছি এই কথা শুনে, কাত্যায়ন শাস্ত্রীর ঘাড় একদম শক্ত হয়ে গেল, ঘাড় বেয়ে নেমে আসতে লাগল বরফ শীতল ভয়ের স্রোত। কোনরকমে, তিনবার ঢোঁক গিলে বলল, “যা ক্ষতি করেছ, ভূতভাইরা, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, এখন আবার উপকার?”

হুঁ। উপকার। ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁরুকু হাসল প্রমথবাবুর মতো। অপকার যারা করে, তারা উপকারও করতে পারেরুকুর হাসি শুনে, আরো চমকে গেল কাত্যায়ন শাস্ত্রী, ভাবল প্রমথবাবুও এসেছেন বুঝি সঙ্গে, বলল, প্রমথদাও এসেছেন নাকি? তিনি কবে অশরীরি হয়ে গেলেন, জানতে পারি নি তো!

বালাই ষাট! তিনি কোন দুঃখে অশরীরি হবেন? তবে হ্যাঁ, তিনি খুব মনোকষ্টে আর দুশ্চিন্তায় আছেন, তাঁকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন, একমাত্র আপনি!সুকু কাত্যায়ন শাস্ত্রীকে বলল।

এত দুঃখেও কাত্যায়ন শাস্ত্রীর হাসি পেল, বিষণ্ণ হাসিমাখা মুখে বলল, “আমাকে এই দুর্গতি থেকে কে উদ্ধার করে, তার ঠিক নেই, আমি উদ্ধার করবো, প্রমথদাকে?”

ঠিক তাই। আপনি এই টিয়াপাখির খাঁচা যার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন, তাকে ফেরত দিয়ে চলে যান প্রথমবাবুর হিমঘরে। সেখানেই তিনি সারাটাদিন বসেন। বাড়ি ফেরেন প্রায় মাঝরাত্রে, বাড়ি থেকে বেরিয়েও পড়েন ভোর রাত্রে

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর ভয়টা এবার একটু কেটে যেতে লাগল। বুকে যেন একটু বল পাচ্ছে, মুচকি হেসে বলল, ভূতেরাও যে পাগল হয় জানা ছিল না, ভাই! প্রমথদার সামনে দাঁড়ালে আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন। আমার কোন কথাই শুনবেন না

 রুকু বলল, শুনবেন, শুনবেন। ঠিক মতো বলতে পারলে সব কথা শুনবেন, এমন কি মেনেও নেবেন। মেনে নেওয়া ছাড়া তাঁর আর অন্য রাস্তা নেই কিনা!

আচ্ছা। শুনিই তাহলে কি করতে হবেকাত্যায়ন শাস্ত্রীর মনে ভয়টা প্রায় আর নেই বললেই চলে।

খুব ভালো। আপনি যে আমাদের ভরসা করেছেন, আর ভয় পাচ্ছেন না, ধরে নিন এতেই আপনার আদ্দেক কাজ হয়ে গেছে। এবার কী করতে হবে শুনুন। ছেঁড়াখোঁড়া এই জামাপ্যান্ট ছেড়ে লাল কাপড় পড়তে হবে, যাকে বলে রক্তাম্বর। ঘাগু তান্ত্রিকেরা যেমন পড়েন আর কি! এমন মিন মিন করে কথা বললেও হবে না, বেশ রোখ টোখ নিয়ে ডেকে হেঁকে কথা বলতে হবে। আপনি-আজ্ঞে না বলে, তুই বলতে হবে, এক ধাক্কায়

প্রমথদাকে আমি তুইবলবো, আমাকে কি ভূতে পেয়েছে, নাকি?” কাত্যায়ন শাস্ত্রী খুব বিরক্তমুখে বলল।

রুকু ধৈর্য হারালো না, বলল, “ভূতে তো আপনাকে পেয়েইছে, আমরাই কি ভূত নই? রাজভবনের ফুটপাথে বসে, এই যে আপনি আপনমনে বক বক করে চলেছেন; অনেকেই কিন্তু আপনাকে দেখে অবাক হচ্ছে, ভাবছে আপনাকে ভূতে পেয়েছে, নয়তো আপনার মাথাটা গেছে!

কাত্যায়ন শাস্ত্রী আশেপাশে লোকজনের দিকে তাকালো। উল্টোদিকে একজন কচি শসা ছাড়িয়ে, বিটনুন মাখিয়ে বিক্রি করছে, সে সত্যি সত্যি তার দিকে বার বার দেখছে। ডানদিকে একটু তফাতে এক বুড়ি পা ছড়িয়ে বসে ভিক্ষে করছে, সেও তার দিকে বার বার তাকাচ্ছে। এতক্ষণ কাত্যায়ন শাস্ত্রী লক্ষ্য করেনি, এখন লক্ষ্য করে বেশ ভড়কে গেল।

রুকু বলল, “আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন তো? কথা কম বলে, আমাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। যেমন বলছি, সেভাবে কাজ করলে, প্রথমে প্রথমবাবুর ভালো হবে, তারপর আপনারও উপকার হবে। আপনার হারিয়ে যাওয়া সুনাম, চাই কি আগের থেকে অনেক বেড়েও যেতে পারে। কি ঠিক করলেন বলুন, আমাদের কথামতো কাজ করবেন? হ্যাঁ কিংবা না তে উত্তর দিন, বেশী কথা বলবেন না

ভাববার জন্যে কিছুক্ষণ সময় নিল কাত্যায়ন শাস্ত্রী, টিয়াপাখির ভরসায় তার যে দিন চলবে না, সে ব্যাপারে তার চেয়ে ভালো আর কে জানে? তবে ভূতের ওপর ভরসা করাটাও উচিৎ হবে কিনা, কে জানে? কিন্তু এখন তো আর কোন উপায়ও নেই। বিশেষ করে, এই দুই ভূত যখন তার পিছনে পড়ে আছে, তার থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায়ও তো তার জানা নেই। কাত্যায়ন শাস্ত্রী ঘাড় ঝুঁকিয়ে বলল, “হুঁ

ভেরি গুড। টিয়াপাখির ঝাঁপ গুটিয়ে তুলে, এখন তাড়াতাড়ি চলুন হাওড়ার ট্রেন ধরতে হবে

 

তালতলার বিহারি মজনুর আলির হরেক ব্যবসা। তার কাছে ম্যাজিকের সরঞ্জাম, টিয়াপাখির খাঁচা সমেত ভাগ্য গোনার বাক্স, মানুষের ওজন মাপার ঘড়ি আর ঘন্টা, বীণ সমেত তিন সাপের ঝাঁপি, একখানা এয়ার গান, সিসের গুলি, আর বেলুন চিপকানো বোর্ডে টিপ প্র্যাকটিস করার সরঞ্জাম, আরও অনেক জিনিষ পাওয়া যায়। সে সকালবেলা টাকা জমা নিয়ে এইসব সরঞ্জাম ভাড়া দেয়, আর রাত্রে ভাড়ার টাকা নিয়ে জিনিষ ফেরত নেয়। কাত্যায়ন শাস্ত্রী অসময়ে হাজির হয়ে, খাঁচা জমা দিতে, খুব অবাক হল মজনুর আলি, বলল, কা, কাত্যায়ন ভাই, আভি আভি লিয়ে গেলে, আভি আভি ওয়াপসভি লিয়ে এলে, বেওসাটা ভালো লাগল না?”

তা নয়, মজনুর ভাই, অন্য একটা ব্যবসা মাথায় এসেছে, তুমি একটু হেল্প করলে, ভালো হয়।

লতুন বেওসা? সে কি রকম আছে, একটু বোলেন তো?”

লাল ধুতি আর চাদর আছে, মজনুর ভাই? সঙ্গে রুদ্রাক্ষের মালা, টালা হলে, ভালো হয়।

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর এই কথায়, খুব একচোট হো হো করে হাসল মজনুর আলি, বলল, কাপালিক বাবার বেওসা। এতো বহোত পুরানা বেওসা হল। তুমি কাপালিক বনবে, ব্যোমকালী কলকাত্তাওয়ালি? হা হা হা হা। কাপালিকের সোব তামঝাম হামার কাছে মিলবে - হে রতনোয়া, কাত্যায়ন ভাইকো ও কাপালিকওয়ালা ড্রেস দিখাও

মজনুর আলির শাগরেদ রতন, ঘরের ভেতর থেকে খুঁজে পেতে কাপালিকের ড্রেস নিয়ে এল। রক্তাম্বর, সঙ্গে লাল কাপড়ের ঝোলা। রুদ্রাক্ষের মালা তিন সেট গলায় পড়ার জন্যে একটা বড়ো, হাতে পড়ার জন্যে একজোড়া ছোটো। একটা লাউয়ের খোলায় বানানো কমণ্ডলু আর একটা খুব ব্যাঁকাত্যারা পাকানো অদ্ভূত দেখতে লাঠি। আর একজোড়া খড়ম। কাপালিক সাজার মোক্ষম ড্রেস দেখে কাত্যায়ন শাস্ত্রী নিশ্চিন্ত হল।

মজনুর আলি বলল, পসন্দ হলো তো, কাত্যায়ন ভাই? তোবে রেট একটু বেশি পড়বে। জোমা একশ টাকা, আর ভাড়া রোজ তিরিশ টাকা!

একশ টাকা জমা! অত টাকা কোথায় পাবো মজনুর ভাই, টিয়াপাখির পঞ্চাশটাকা সকালে জমা দিয়ে গেলাম, ওটাতেই কাজ চালিয়ে দিন, মজনুর ভাই

বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে মজনুর আলি বলল, ঠিক আছে, কাত্যায়ন ভাই, লেকিন ভাড়া চালিশ টাকা রোজ দিতে হোবে! কোতোদিনের জন্যে লিবেন?”

চার-পাঁচদিন তো বটেই, দু একদিন বেশিও হতে পারে। চল্লিশটাকা রোজ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? মজনুর ভাই, পঁইত্রিশ হলে, ভালো হতো

চালিশ বোলে দিলোম বাস, চালিশ। লিতে হয় লিন, না লিবেন তো না লিন। এক পয়সা কোম হোবে না

 

 স্টেসন থেকে প্রমথবাবুর হিমঘর শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে বড়ো রাস্তার ধারে। ট্রেন থেকে নেমে কাত্যায়ন শাস্ত্রী, হাঁটা লাগাল হিমঘরের দিকে। যদিও সে এর আগে কোনদিন যায়নি, তবে চিনতে অসুবিধে হবে না, কারণ সারাক্ষণ রুকু-সুকু তার সঙ্গেই রয়েছে। ছোট্ট শহর ছাড়িয়ে ফাঁকা মাঠের ধার দিয়ে যাবার সময়, একটা বড়ো গাছতলার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাত্যায়ন শাস্ত্রী জামা-প্যান্ট বদলে, কাপালিকের রক্তাম্বর পড়ে নিল। তারপর রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে, হাতে কমণ্ডলু আর সেই ব্যাঁকা লাঠি নিয়ে, যখন দাঁড়াল, কে বলবে এ সেই কার্তিক চন্দ্র হাতি, ওরফে কাত্যায়ন শাস্ত্রী। কাঁধের লাল ঝোলার মধ্যে ভাঁজ করে ঢুকিয়ে নিল পুরোনো জামা-প্যান্ট। তার এই বেশ বদলের সাক্ষী রইল, রুকু-সুকু দুই ভাই, মাঠে চড়তে থাকা একটি গরু আর তিনটে ছাগল।

বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কাত্যায়ন শাস্ত্রীর বুকটা কিন্তু কেঁপে উঠল। রুকুসুকু পাশে থেকে বলল, “কাউকে ‘আপনি’ বা ‘তুমি’ বলবেন না, শাস্ত্রীজী, ‘তুই’ বলবেন। আর যতো জোরে আর ধমকে কথা বলবেন, লোকে ততই আপনাকে ভক্তি করবে, এ কথাটা মোটেই ভুলবেন না যেন

ভয়ে যে আমার পা কাঁপছে, ভূত ভাইকাত্যায়ন শাস্ত্রীর গলাও কেঁপে উঠল।

পা কাঁপছে, কাঁপতে দিন। গলা যেন না কাঁপে। খুব জোরে শ্বাস নিয়ে গলাটা সাফ করে নিন

কাত্যায়ন শাস্ত্রী তাই করল, তারপর বন্ধ লোহার গেটে ঠকঠক আওয়াজ তুলল। একজন দারোয়ান গেটের সামনে কাপালিককে দেখেই নিচু হয়ে নমস্কার করল, বলল, গোড় লাগি, মহারাজ। ইধার কুছ ভিখ নেহি মিলেগা, আগে যাইয়ে

ভিক্ষে চাওয়ার কথাটা কাত্যায়ন শাস্ত্রীর ভীষণ গায়ে লাগল। প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠল তার শরীর, বলল, চোপরাও, বেয়াদব। সাধু সন্তকো ভিখারি বোলতা হ্যায়, মূরখ? যা যাকে আপনা মালিক, প্রমথ্‌কে বুলা। বোল সাধু মহারাজ আয়ে হ্যাঁয়।

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর বলার দাপটে দারোয়ানজি তো বটেই রুকু-সুকুও রীতিমত চমকে উঠল। রুকু-সুকু একটু দূরে সরে দাঁড়াল। দারোয়ানজি আর কথা না বাড়িয়ে, আরেক বার নিচু হয়ে নমস্কার করল, তারপর দৌড়ে চলে গেল অফিসের দিকে। কাত্যায়ন শাস্ত্রী চুপিচুপি জিগ্‌গেস করল, “ঠিক আছে তো, ভূত ভাই?”

একদম, মোক্ষম দিয়েছেন, শাস্ত্রীজী। ব্যস, এই দাপটটা ধরে রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে। আপনার সুদিন ফিরে আসবে

দারোয়ানজির কথায় প্রমথবাবু অফিসের থেকে বাইরে এসে দেখলেন, গেটের বাইরে কে একজন লাল কাপড় পড়া সাধু মহারাজ এসে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে অদ্ভূত লাঠি, আর কমণ্ডলু। এমনিতেই তাঁর এখন মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়, প্রমোটারি করতে গিয়ে এমন ডুবেছেন, সেখান থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন তার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। মাদুলি, গাছের শেকড়, নানান ধরনের রত্ন, যাগ-যজ্ঞ, স্বস্ত্যয়ন, ঝাড়-ফুঁক - কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এই সাধু মহারাজ নিজে নিজেই এসে যখন দেখা দিয়েছেন, কথা বলতে দোষ কি? কার মধ্যে কী আছে কিছু বলা যায়? তিনি দারোয়ানজিকে বললেন, “জলদি যাকে গেট খোল দো, মহারাজকো আনে দো

দারোয়ান দৌড়ে এল, পিছনে প্রমথবাবুও এগিয়ে গেলেন গেটের দিকে। কাত্যায়ন শাস্ত্রী খোলা গেট দিয়ে ঢুকে, প্রমথবাবুর সামনে দাঁড়াল, বুক ভরে শ্বাস নিয়ে জোর গলায় বলল, চিনতে পারছিস”?

প্রমথবাবু চিনতে ভুল করেননি। এতো সেই কার্তিক, কাত্যায়ন শাস্ত্রী। তাঁরা একসঙ্গেই ভূতের তাড়া খেয়ে পালিয়েছিলেন। সে ব্যাটার এতো সাহস, আজ তাঁকে তুইবলছে? রাগও হচ্ছিল, আবার অবাকও হচ্ছিলেন মনে মনে। কোন কথা না বলে তিনি তাকিয়ে রইলেন কার্তিকের দিকে।

কাত্যায়ন শাস্ত্রী, মৃদু হেসে বললেন, “মূর্খ, চিনতে পারলি না তো? আমি কাত্যায়ন শাস্ত্রী। ভূতের তাড়া খেয়ে ভয়ে তুই পালিয়ে এসে বাসা বেঁধেছিস এই হিমঘরে! আর আমি সেই অপমানের শোধ তুলবো বলে চলে গেছিলাম হিমালয়ে। গুরুদেবের কাছে মন্ত্র নিয়ে তিনমাস তপস্যা করে গত পরশু সিদ্ধিলাভ করেছি। গুরুদেব বললেন, যা বেটা, আভি যাকে লড় যা ভূতোঁকে সাথ। সমঝা দে উনকো, তু কোন গুরুকা চেলা হ্যায়। আজই ফিরলাম, সোজা চলে এলাম তোর এখানে। রাজি থাকিস তো চল, আমার সঙ্গে। কাল বাদে পরশু শনিবার রাত্রে বোঝাপড়া হয়ে যাক সেই ভূতেদের সঙ্গে। ভূতেদের বাবার নাম না ভূলিয়ে দিয়েছি, তো আমার নাম, কাত্যায়ন শাস্ত্রী নয়

এই কথায়, রুকু-সুকু একটু বিরক্ত হয়ে কাত্যায়ন শাস্ত্রীর কানে কানে বলল, “আপনার এতটা উপকার করতে চলেছি আমরা, শাস্ত্রীজী, তার পরেও আমাদের বাবার নাম ভুলিয়ে দেওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”

খুব আস্তে কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল, “স্যরি, ভূতভাই। ওটা ফ্লোতে মুখ ফক্সে বেরিয়ে গেছে

রুকু বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনি চালিয়ে যান, প্রথমবাবু মোটামুটি ঘায়েল হয়ে এসেছেন

 

প্রথমদিকে প্রমথবাবুর যে একটু রাগ হচ্ছিল না তা নয়, বেজায় হচ্ছিল। ব্যাটা কাত্তিক চন্দ্র হাতি, কাত্যায়ন শাস্ত্রী হয়েও তাঁর সামনে বিনয়ের অবতারটি হয়ে থাকত। তার আজকের এই চেহারা আর ব্যবহার দেখে ঠিক কী করা উচিৎ, তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবে এটা বুঝতে পারলেন, সেই মিনিমিনে কার্তিক আর মিনমিনে নেই, যেন বাঘ হয়ে উঠেছে। এদিকে তাঁর সময়টাও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না, প্রমোটারির জমিটা নিয়ে আর অনেক লোকের থেকে ফ্ল্যাটের অ্যাডভান্স বুকিং নিয়ে তিনি অথৈ জলে পড়ে আছেন। সেক্ষেত্রে এই নতুন কাত্যায়ন যদি আবার সব ঠিকঠাক করে দিতে পারে, মন্দ কী? তাতে যদি কাত্যায়ন তাঁকে তুই-তোকারি করে, কিংবা তাঁকে যদি কাত্যায়নকে আপনি-আজ্ঞে করতে হয়, তাতেই বা ক্ষতি কি? জমির ব্যাপারটা মিটে গেলে তাঁরই লাভ, আর না মেটাতে পারলে ব্যাটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশছাড়া করতে তাঁর কতক্ষণ সময় লাগবে?

কি ভাবছিস, রে, বেটা? মনে কোন দ্বিধা রয়েছে, কোন সংশয়?” তারপর কাত্যায়ন শাস্ত্রী একটু মোলায়েম স্বরে ঠাট্টার সুরে বলল। তোদের কি এখানে অতিথি এলে বসতে বলার রেওয়াজ নেই? চা-জলখাবারেরও কোন ব্যবস্থা নেই? এই করে তুই ব্যবসা চালাস রে, প্রমথ?”

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর এই কথায় প্রমথবাবু থতমত খেয়ে  বললেন, আসুন আসুন কাত্যায়নজী, ছি ছি, কী অন্যায় বলুন দিকি। সেই থেকে আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছি। আসুন আসুন, ভেতরে আসুন। অ্যাই কানাই, বাইকটা নিয়ে চট করে সিঙাড়া, জিলিপি, মিষ্টি-টিষ্টি কি পাস নিয়ে আয় তো। সিঙাড়া যেন গরম হয়। আসুন, আপনি এখানটায় আরাম করে বসুন

তক্তপোশের উপর বিছানো গদিতে আরাম করে বসল কাত্যায়ন শাস্ত্রী, ঘরে এসি চলছে, মাথার উপরে হাল্কা স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। আরামে কাত্যায়ন শাস্ত্রীর শরীরটা জুড়িয়ে গেল। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে স্বস্তিতে। এতক্ষণ সব ঠিক ঠাক চলছে, এবার পরশু রাতের যজ্ঞটা যদি ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে ফেলতে পারে, তাহলেই তার পাথর চাপা কপাল আবার খুলে যাবে! ভূতভাইয়েরা যখন তাকে এতটাই সাহায্য করছে, তখন বাকিটাও ভালোয় ভালোয় মিটবে বলেই তার আশা।

আরামটা একটু ধাতস্থ হতে বলল, “বেটা প্রমথ, এখন ওদিকের কি অবস্থা বলতো?”

মেঝেয় পাতা কার্পেটে প্রমথবাবু বসে পড়ে বললেন, “সেই যে, ভূতের অত্যাচারে আপনি আর আমি পালিয়ে এসেছিলাম, সে কথায় তো চারদিকে ঢিঢি পড়ে গেল, আমার সেই জমিটার নামই হয়ে গেল ভূতডাঙা। কেউ আর সেখানে কাজ করতে যেতে চায় না। আটষট্টিজন ফ্ল্যাট বুক করে অগ্রিম টাকা দিয়েছিল, তারা একে একে আসতে লাগল, টাকা ফেরত নেবার জন্যে। এক-আধ টাকা নাকি? প্রত্যেকের দু লাখ করে হলে, কত টাকা বুঝে দেখুন, বাবা, সে কি আর হুট করে ফেরত দেওয়া সম্ভব?”

ঠিক কথা! তারপর?” চোখ বন্ধ করে, হাল্কা পা নাচাতে নাচাতে কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল।

তারপর আর কী, বাবা? প্রথমদিকে তারা একজন দুজন করে আসত। তারপর তারা সবাই মিলে প্রতারিত ফ্ল্যাট ওনার্স সমিতিখুলে ফেলেছে। এখন সেই সমিতির পাঁচ থেকে ছজন প্রতিনিধি রোজ সকাল ছটায় আমার বাড়ি এসে রাত দশটা অব্দি বসে থাকে। দুটো শিফট। সকাল ছটা থেকে দুপুর দুটো, আবার দুটো থেকে রাত দশটা। কত বুঝিয়েছি। কত অনুরোধ করেছি, কটা মাস সময় দেওয়ার জন্যে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? এখন আমিই বাড়িছাড়া, ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, রাত এগারোটার পরে বাড়ি ঢুকি

বুঝতে পারছি, খুবই কষ্টের মধ্যে রয়েছিস রে, প্রমথ। যাকগে, আর মাত্র দুটো দিন। তোর দুঃখের দিন শেষ হয়ে গেছে। আমি যখন এসে গেছি তোর আর কোন চিন্তা নেই। শনিবার মাঝরাতে আমার কাজ আমি করে দেব। রবিবার সকাল থেকে জমিতে লোকজন লাগিয়ে তোর কাজ শুরু করে দে। ঝোপঝাড় কেটে জমি সাফ করা আর মাটি কাটার কাজ, আমি দাঁড়িয়ে থেকে শুরু করিয়ে দিতে চাই। ব্যস, তাহলেই তোর ফ্ল্যাট কেনা লোকেরাও স্বস্তি পাবে, তোকে আর জ্বালাবে না। কি রে ব্যাটা, ঠিক আছে তো?”

হ্যাঁ বাবা, ঠিক তো আছে, কিন্তু –”

কিন্তু কী? কাত্যায়ন শাস্ত্রী যা বলছে, তা করে দেখাতে পারবে কি না? তাইতো”?

না, মানে, ওই ইয়ে আর কি! মনে খুব ভয় ধরে গেছে বাবা

ভয়? কিসের ভয়? হা হা হা হাকাত্যায়ন শাস্ত্রীর দমফাটা হাসিতে রুকু-সুকুও চমকে উঠল।

তা মানে, আপনি যখন ইয়ে, ভরসা দিচ্ছেন, তখন আর কিসের ভয়, ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁবহুদিন পরে প্রমথবাবু তাঁর হারানো হাসিটা আবার ফিরে পেলেন।

কাত্যায়ন শাস্ত্রী সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “তোর হাসিটা, কতদিন পরে ফিরে পেলি, বল? ওই সঙ্গে দ্যাখ তোর কানাই, সিঙাড়া-জিলিপিও নিয়ে এলো

সত্যি সত্যি কানাই ঘরে ঢুকল সিঙাড়া আর জিলিপির মস্তো ঠোঙা নিয়ে, কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল, “আমাকে দেওয়ার আগে একটা প্লেটে চারটে সিঙাড়া আর চারটে জিলিপি দে, আমার সঙ্গে দুজন আছে, তাদেরও খাওয়াতে হবে!

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর সঙ্গে দুজন? কোথায়? কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না তো? প্রমথবাবু, কানাই এবং ঘরে আরো তিনজন ছোকরা ভয়ে ভয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। কানাই একটা প্লেটে চারটে সিঙাড়া, চারটে জিলিপি সাজিয়ে ভীষণ ভয়ে ভয়ে বলল, “বাবা, এগুলো কাকে দিতে হবে বললেন”?

হা হা হা হা, আমার বন্ধুদের! তারাও তো আমারই মতো অনেকক্ষণ না খেয়ে রয়েছে, রে ব্যাটাতারপর পাশের ঘরটা দেখিয়ে বলল, “ওঘরে কে আছে?”

আজ্ঞে, ওটাই আমাদের অফিস ঘর, এখন কেউ নেই

খুব ভালো, ওই ঘরে টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে দিয়ে, বেরিয়ে আয়। দরজাটা ভেজিয়ে দিবি। আর দেখিস কেউ যেন ওঘরে এখন না যায়

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর এই কথায় সকলেরই ভয়ে প্রাণ উড়ে যাবার যোগাড়। কানাই কোনমতে প্লেটটা অফিস ঘরের টেবিলে রেখে বেরিয়ে এল দৌড়ে, তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিল ধড়াম করে।

ভয় কি রে পাগলা, আমি তো আছিমুচকি হেসে কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল, “আয়, এবার আমরা সবাই মিলে ভাগ করে খাই –”

প্রমথবাবু এতক্ষণ ফ্যালফ্যাল চোখে দেখছিলেন সব কিছু, এবার মেঝে থেকে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কাত্যায়ন শাস্ত্রীর পায়ের ওপর, যদি কোন দোষ ত্রুটি হয়ে থাকে তো ক্ষমা করে দেবেন, বাবা। অবোধ শিশু আমরা কি বুঝবো, আপনার লীলা”?

কাত্যায়ন শাস্ত্রীর সিঙাড়ার গন্ধে খিদেটা চনমন করে উঠেছিল, প্রমথবাবুর এই আদিখ্যেতায় খুব বিরক্ত হল, আঃ ছাড়, ছাড়। আমি কেউ নেই রে, পাগল। এ আমার গুরুর লীলা, এ আমার তারামায়ের লীলা। ছাড়, খিদে পেয়েছে, অ্যাই কানাই প্লেটে সিঙাড়া দে

 

গরম সিঙাড়ায় কামড় দিয়ে কাত্যায়ন শাস্ত্রী খুব আনন্দ পেল। এমন মজা আর আনন্দ সে জীবনে কোনদিন পায়নি। প্রমথবাবুর মতো জাঁদরেল লোক, তার পায়ের ওপর মেঝেয় বসে আছেন। সে কথা বলে চলেছে, আর প্রমথবাবু জোড় হাতে সে কথা ভক্তিভরে শুনছেনএ জিনিষ সে কোনদিন কল্পনাও করেনি। তার পাথর চাপা কপাল যে খুলে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না। একটা সিঙাড়া শেষ করে দ্বিতীয়টা খাবার সময় দেখল, প্রমথবাবু কিছু খাচ্ছেন না। কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল, “খুব ভালো গরম সিঙাড়া, খেলে চিত্তশুদ্ধি হয়। কি রে, তুই খাবি না?”

না, বাবা, আপনি খান। আপনার সেবা মানে, আমারও সেবাপ্রমথবাবু গদ্গদ হয়ে বললেন।

এই নে, তবে তুই আমার প্রসাদ পাআধ-খাওয়া দ্বিতীয় সিঙাড়াটা প্রমথবাবুর হাতে তুলে দিল কাত্যায়ন শাস্ত্রী। দুহাতে সেই এঁটো সিঙাড়া মাথায় ঠেকিয়ে প্রমথবাবু বললেন, জয়, বাবা কাত্যায়নের জয়। জয় তারা মায়ের জয়

তারপর সেই সিঙাড়ার টুকরো ভেঙে ভেঙে সকলে মিলে ভাগ করে নিলেন নিজেদের মধ্যে।

 

সিঙাড়া জিলিপি চা খেয়ে খুব তৃপ্তি পেল কাত্যায়ন শাস্ত্রী। বলল, “, এবার বাড়ি যাবি না? সন্ধে হয়ে এল, তো! এ কটা দিন তোর বাড়িতেই এক কোণায় থাকতে দিবি তো রে, ব্যাটা?”

প্রমথবাবু আঁতকে ওঠার মতো বললেন, “আজ্ঞে, কাত্যায়নবাবা, সে তো আমার সৌভাগ্য। কিন্তু এখন বাড়ি ফিরলেই যে সেই সমিতির লোকেরা চেপে ধরবে। আমি তো এগারোটার আগে বাড়ি ফিরতে পারি না, বাবা!

কাত্যায়ন শাস্ত্রী খুব বিরক্ত হয়ে ধমকে বলল, ধুর ব্যাটা, সেই থেকে বলছি, তোর কোন ভয় নেই। কথা কানে যাচ্ছে না, নাকি? বাড়ি চল। কতদিন এইভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবি, অ্যাঁ? তোর নামে কদিন আগেও বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত, সে সব কথা ভুলে গেলি কী করে?” তারপর একটু নরম সুরে বলল, “রাত্রে কী খাওয়াবি বল? পাঁঠার মাংস যেন থাকে। তাছাড়া তোর যা প্রাণ চায়

কাত্যায়ন শাস্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে এল। পিছনে প্রমথবাবু, ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি বের করতে। কানাই খুব ভয়ে আর নিচু হয়ে জিগ্‌গেস করল, “বাবা, আপনার বন্ধুরাও যাবে তো? অফিস ঘরে ঢুকবো”?

কাত্যায়ন শাস্ত্রী কানাইয়ের পিঠে আদর করে একটা হালকা চাপড় মারল, বলল, বোকা ছেলে! আমার বন্ধুদের কোথাও যাবার জন্যে গাড়িঘোড়া লাগে না রে, ব্যাটা। তেনারা সব অশরীরি। যা যা ব্যাটা, আর ভয় নেই, অফিস ঘর থেকে প্লেটটা বের করে নিয়ে আয়  

অফিস ঘরে ঢুকে কানাইদের চক্ষু চড়কগাছ! টেবিলের ওপর প্লেটটা খালি, জিলিপির দু এক ফোঁটা রস ছাড়া কিচ্ছু পড়ে নেই প্লেটে!

 

 শনিবারের মাঝরাতে যজ্ঞ শুরু করে শেষ হল যখন তখন সকাল হয়ে গেছে। সকালে হাঁটতে বেরোনো লোকজন অনেকেই এসে জড়ো হতে থাকল একে একে। কয়েকমাস আগে, এই মাঠেই ভূতেদের তাণ্ডবের কথা সকলেরই মনে ছিল। আজ প্রমথবাবুকে তাঁর দলবল নিয়ে মাঠের মধ্যে জাঁকিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখে সকলেই খুব অবাক হল। প্রমথবাবুর পাশেই দাঁড়িয়েছিল কাত্যায়ন শাস্ত্রী। আজ কাত্যায়ন শাস্ত্রীর ভয়ংকর চেহারা। পরনে রক্তাম্বর। পায়ে খড়ম। গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। কপালে টুকটুকে সিঁদুরের বিশাল তিলক। সারা গায়ে মুখে ছাইভস্ম মেখে ভয়ংকর।

প্রমথবাবুর আজ বড়ো আনন্দের দিন। তাঁর জমিতে এমন নির্বিঘ্নে যজ্ঞ সম্পন্ন হয়ে যাবে, তিনি ভাবতেও পারেননি। কোন লোকই এখানে কাজ করতে আসতে চাইছিল না। হাতে-পায়ে ধরে, অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে কিছু লোককে আনা গিয়েছে। সকাল থেকেই তারা লেগে পড়েছে ঝোপঝাড় কেটে জমি সাফ করার কাজে। কিছু লোক লেগে পড়েছে বাড়ির ভিতের জন্যে মাটি কাটার কাজে। প্রথমে সকলেরই মনে একটু ভয় ভয় ছিল, এখন আর নেই। অনেকেই এসে মহাতান্ত্রিক কাত্যায়ন শাস্ত্রীর পায়ে এসে প্রণাম করে গিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে চলেছে।

ভালোয় ভালোয় সব কিছু মিটে যাবার পর, কাত্যায়ন শাস্ত্রীকে নিয়ে প্রমথবাবু বাড়ি ফিরলেন। স্নান সেরে, কাত্যায়ন শাস্ত্রী লুচি, আলুরদম, একগাদা মিষ্টি দিয়ে জলখাবার খেয়ে বড়ো আরামে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল।  কাত্যায়ন শাস্ত্রীর পায়ের কাছে মেঝেয় বসে প্রমথবাবু বললেন, “কাত্যায়নবাবা, এরপর আপনার কি প্ল্যান?” সারা রাত জেগে যজ্ঞ করে ক্লান্ত কাত্যায়ন শাস্ত্রীর চোখে ঘুম আসছিল আরামে, বলল, কাল ভোর বেলায় বেরিয়ে যাবো। হিমালয়ে। গুরুদেবের সঙ্গে বাকি জীবনটা সাধন ভজনেই কাটিয়ে দেব ভাবছি

হিমালয়ে? না, না, বাবা, তা কী করে হয়? আমাদের কে রক্ষা করবে? আপনাকে যখন এই রূপে আবার ফিরে পেয়েছি আর ছাড়ছি না।

তোদের রক্ষা করবেন মা তারা, আমি তো নিমিত্তমাত্র রে, পাগল!

আমরা বাবা, পাপীতাপী মানুষ, আমাদের ডাকে মা তারা মোটেই সাড়া দেন না। আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন আপনি! আপনাকে কিছুতেই ছাড়ছি না। আপনাকে এই প্রফুল্লনগরেই থাকার বাসা দেব। আপনি এখানেই থেকে, আমাদের মতো সংসারের মায়ায় বাঁধা-পড়া মানুষদের বিপদে আপদে একটু উদ্ধার করে দেবেন, ব্যস। আর কিচ্ছু চাই না। গতরাত্রের যজ্ঞের জন্যে আপনার সেবায়, তিরিশহাজার- না না তিরিশ বড্ডো কম হয়ে যাচ্ছে, পুরো পঞ্চাশ দেবো, বাবা। দয়া করে, আপনি আর না করবেন না, বাবা

আচ্ছা, আচ্ছা, এখন যা, আমি ভেবে দেখবো না হয়। আমার এখন বিশ্রামের সময় হল। যাবার সময় দরজাটা চেপে দিয়ে যাস। আর দেখিস কেউ যেন বিরক্ত না করে। দুপুরে সেবার আগে আমাকে আর ডাকবি না, এখন যা

প্রমথবাবু কাত্যায়ন শাস্ত্রীকে গড় হয়ে প্রণাম করলেন। তারপর পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা চেপে বন্ধ করে দিলেন। কাত্যায়ন শাস্ত্রী চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, তারপর নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমিয়ে পড়ল।

 

***

 

সন্ধের পর রুকু-সুকুর কাছে সব ঘটনা শুনে সরুদা বললতার মানে যেমন যেমন বলেছিলাম, ঠিক তেমনই সব করে ফেলেছিস তোরা?”

আজ্ঞে হ্যাঁ দাদা, কোথাও কোন গণ্ডগোল হয় নি

এই ব্যাপারে আমার এই দুই বোনের রুন্টুঝুন্টুর কথা কেউ জানবে না তো”?

ঘুণাক্ষরেও না। আমরা এই কজন ছাড়া, কেউ না

প্রমথবাবু তাঁর প্রমোটারির সঙ্গে আবার শপিংমল বানানোর কথাও আর ভাববেন কি?”

একদম না, মলের কথা তিনি নোংরা মলের মতোই ত্যাগ করেছেনরুকুর এই কথায় সুকু হাসল ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ।

যাক মনের মধ্যে একটা কাঁটা বিঁধে ছিল, সেটা দূর হল। এবার প্রমথবাবু তাঁর ক্ষতিটুকু সামলে নেবেন। আর কাত্যায়ন শাস্ত্রীও তার পুরোনো চেম্বার আর তন্ত্রচর্চার ঠিকানা পেয়ে গেল, আগের মতোই।

সরুদা বলল, অন্যায় কাজ করলে শাস্তি পাওয়া উচিৎ। কিন্তু তাই বলে কারো সর্বনাশ করাটা কোন কাজের কথা নয়, বুঝলি, রুন্টুঝুন্টু। এ যা হলো, বেশ হলো।

 -০-

এর পরের ছোটদের গল্প - " তপু ও হেডস্যার "



আমার "তেঁনারা" গল্প সংকলন গ্রন্থ থেকে নেওয়া - বইটি ঘরে বসে পেতে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করে বুক করতে হবে - 

তেঁনারা

    

মঙ্গলবার, ১ জুলাই, ২০২৫

জঙ্গী ব্যবসা (রাজনৈতিক)

এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রতিবাদের আলো



 

 ভারতে কবে কবে কোথায় কোথায় সন্ত্রাসবাদী হানা হয়েছিল তার একটা লিস্ট নিয়ে নিজের দপ্তরে বসে সুলতান মামুদ রাগে ফুঁসছিল। আর মনে মনে ঘোরির মুণ্ডপাত করছিল। আজকাল আর তলোয়ারের চল নেই, থাকলে হালাল করে পাঁচরাস্তার মোড়ে ঝুলিয়ে রাখা যেত হতভাগার কাটা মুণ্ডুটা। অকর্মার ঢেঁকি একটা। কতদিন হয়ে গেল বেশ জুতসই খবর তৈরি করতে পারছে না। এমন একটা খবর যা শুনে গোটা হিন্দুস্থান তো বটেই – গোটা কাফের দুনিয়া চমকে উঠবে। রাত্রে ঘুমের মধ্যেও শিউরে উঠবে বারবার। আর গোটা ইসলাম দুনিয়া আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠবে – আহা কিছু ইসলাম ধর্মে এখনও কিছু মুজাহিদ আছে, যারা জেহাদ ভুলে যায়নি।      

বড়োসড়ো ঘটনা বলতে ১১/০৭/২০০৬-এ মুম্বইতে লোকাল ট্রেনের সিরিজ ব্লাস্ট – লোক মরেছিল ২০৯ জন। তাছাড়া মুম্বাইতেই তাজ হোটেল আক্রমণ – ২৬/১১/২০০৮ – ১৭৫ জন মানুষের মৃত্যু।  এছাড়াও অনেক আছে বিগত বছরগুলোতে। কিন্তু সেসব পাতে দেওয়ার যোগ্য নয় – কোথাও ৭০ জন, কোথাও ৪০ জন, কোথাও মোটে চার-পাঁচজন। ছ্যাঃ জলের মতো টাকা যাচ্ছে। বন্দুক, গুলি, আরডিএক্স কেনা হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু  আসল কাজের বেলা লবডঙ্কা। মামুদ ঘোরিকে জরুরি তলব করেছে। হয়তো এসে পড়বে এখনই। এলে আচ্ছা করে তুলোধোনা করবে।

এর মধ্যেই ফোনটা বেজে উঠল আজানের সুরে। মামুদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠে চেয়ারে সোজা হয়ে বসল এবং কানেক্ট করেই বলল, “জি স্যার”।

কী হচ্ছেটা কি, মামুদ। তুমি আর তোমার লোকজন কি মরে গেছ? নাকি আমার টাকা হাতিয়ে আয়েস করে দিন কাটাচ্ছো”?

“কেন, স্যার? একথা কেন বলছেন? আপনার পবিত্র টাকার প্রতিটি পাই-পয়সা আমরা জিহাদের জন্যে খরচ করছি। আপনার টাকা নিয়ে আয়েস করলে আমাদের যে দোজখেও স্থান হবে না, স্যার?”

“ঘোড়ার ডিম করছো? করলে আজ দেড় বছরের ওপর হয়ে গেল হিন্দুস্থানের গায়ে একটা আঁচড়ও কাটতে পারলে না?”

“ইয়ে, মানে হয়েছে কি স্যার, এলওসির এপারে আর বালোকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে হিন্দুস্থান আমাদের বড্ডো ক্ষতি করে দিয়েছে, স্যার। আমাদের ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছে। নতুন ক্যাম্প গড়ে, নতুন ছেলে যোগাড় করে, তাদের ট্রেনিং দিয়ে। অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করে- মানে সবদিক আবার গুছিয়ে তুলতে একটু সময় লাগছে আর কি?”

“তোমার বেফিজুল বাহানায় চিঁড়ে ভিজবে না, মামুদ। কড়ি যখন গুনেছি, তেলও আমি মাখবো। তা না হলে মনে রেখো – তোমাদের প্রত্যেকের তেল আমি নিংড়ে নেব। মনে করো না, আমার পয়সা হজম করে তুমি পার পেয়ে যাবে। দুনিয়ার যেখানে তুমি ঘাঁটি গাড়বে – সেখান থেকে বের করে তোমাকে কুকুর দিয়ে খাওয়াবো”।

“আজ্ঞে সে কথা তো একশবার। আপনি আমাদের পয়গম্বরের মতোই...আপনার নজর এড়িয়ে আমাদের একপাও কোথাও নড়বার জো আছে? তবে বিশ্বাস করুন, স্যার, আমরা সত্যিই বসে নেই...দিন-রাত এক করে তৈরি হচ্ছি হিন্দুস্থানের বুকে মোক্ষম আঘাত দেওয়ার জন্যে...”।

“আরে বাঃ। ২০০৬এর জুলাই মাসের মতো আরেকটা ধামাকা লাগিয়ে দাও দেখি, মামুদ। ওফ্‌ সেবার যা মজা পেয়েছিলাম। টিভিতে হিন্দুস্থানের লোকদের হাহাকার যত শুনেছি – ততই তোমাদের জন্যে আমার গর্বে বুক ফুলে উঠেছে। মনে হয়েছিল হিন্দুস্থানের বরবাদ হতে আর বাকি নেই...হা হা হা হা হা। তারপর তোমরাই করলে তাজ হোটেলের সেই গণহত্যা। সে সব দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। আহা কী আনন্দ, কি আনন্দ...হিন্দুস্থানের মুম্বাই শহর – সারা বিশ্বে তার কম গুরুত্ব? আর সেই শহরের সেরা হোটেল – কি তার শান, শওকত – সেখানে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলে, হে তোমরা! ওই দেখ আমি আবার গঙ্গা বলে ফেললাম – বলা উচিৎ ছিল রক্তসিন্ধু...”।

“যা বলেছেন স্যার। সবই আল্লা আর আপনার রহমত...”।

“ভেবেছিলাম ওরকম একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে তুমি হিন্দুস্থানের দফারফা করে দেবে...ও মা কোথায় কি? তারপর থেকেই তোমরা কেমন যেন মিইয়ে গেলে...ভেজা বেড়ালের মতো... আঁচড়ে কোন ধার নেই...ছ্যাঃ ছ্যাঃ - এর জন্যে আমি তোমাদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছি?”

“একটু ধৈর্য ধরুন, স্যার। আবার হবে। আসলে কী জানেন, স্যার? হিন্দুস্থানের লোকগুলো আর আগের মতো ন্যালাভোলা নেই। সেয়ানা হয়ে উঠেছে খুব। ওদের জালে প্রায়ই আমাদের লোকজন ধরা পড়ে যাচ্ছে...তার মধ্যেও ঘটনা ঘটাইনি তা নয় – যেমন ধরুন ২০০৮-এর জয়পুরের সিরিজ ব্লাস্ট – ৭১ জন মরেছিল, স্যার। আমার সামনে পুরো লিস্ট রয়েছে স্যার। তারপর ধরুন, ওই ২০০৮এই আমদাবাদের সিরিজ ব্লাস্ট – লোক মরেছিল ৫৬ জন। ছোটখাটো ব্লাস্টিংগুলো বাদ দিলেও ২০১৯-এ উরি, পুলওয়ামা, কিংবা তারও আগে সেই ২০০১-এর পার্লামেন্ট হাউস...”।

ফোনের ওপাশ থেকে প্রচণ্ড চিৎকারে উত্তর এল, “রাখো তোমার ওই ছুটকো পটকা ফাটানোর হিসেব...। মিলিটারি, জওয়ান কিংবা পুলিশের লোক মেরে লাভটা কী হয়েছে? হিন্দুস্থানের সাধারণ হিন্দুদের মনে ভয় ঢুকেছে? হিন্দুস্থানের মুসলিমরা প্রকাশ্যে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হতে পেরেছে? গলাবাজি করে এমন বলছো মনে হচ্ছে হিন্দুস্থানের আধখানা জয় করে ফেলেছো? উরি আর পুলওয়ামা কাণ্ডের পর হিন্দুস্থান এমন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করল – একটু আগেই তো বালাকোটে তোমাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে নাকে কাঁদছিলে! লজ্জা করে না, বেশরম? আর বুক বাজিয়ে পার্লামেন্টের কথা বলছ – তোমার সব কটা লোককেই তো কুকুরের মতো গুলি করে মেরে দিয়েছিল, মনে নেই? ওদের মরেছিল, পাঁচজন পুলিশ, একজন নিরাপত্তা কর্মী আর একজন মালী – বেচারা বাগানে কাজ করছিল”।

মামুদ কোন উত্তর দিল না, ওপাশের ঝাড় শুনতে শুনতে তার কান এবং মাথা গরম হয়ে উঠল। বিদেশের এই ব্যক্তিটির সঙ্গে তার যোগাযোগ হট-লাইনে, যখন তখন ফোন করে আর ঝাড়ে। এতদিনে মামুদ টের পেল এ লাইনটাকে কেন হট-লাইন বলা হয় – হারামিটা চেঁচিয়ে মাথা-কান গরম করে তুলল। উপায় নেই, হতভাগার প্রচুর টাকা, ঝাড় শুনতেই হবে। তবে এটাও ঠিক ব্যাটা হাত ঝেড়ে কোটি কোটি টাকাও বের করে দেয়।  

“কী হল? বোবা মেরে গেলে কেন? কানে কথা ঢুকছে না?” ওপাশ থেকে আবার কড়া প্রশ্ন আসাতে সুলতান মামুদ বলল, “না স্যার...মানে হ্যাঁ স্যার – শুনছি স্যার”।

“হুঁ। কী ভাবছো কি? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিছু একটা করবে- নাকি বসে বসে হিন্দুস্থানের দিকে তাকিয়ে কুকুরের মতো শুধু লেজ নেড়ে ঘেউ ঘেউ করবে?”

“করছি তো স্যার, আমরা কি ছেড়ে দেওয়ার লোক, স্যার? এবার এমন প্ল্যান করেছি না, স্যার, হিন্দুস্থানের সাধারণ হিন্দুরা ভয়ে, আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠবে – আর ভাববে মুসলমান ঘরে জন্ম না হয়ে কেন ওদের জন্ম হিন্দু ঘরে হল...দেখে নেবেন স্যার”।

“আচ্ছা?” ফোনের ওপাশ থেকে খ্যাঁ খ্যাঁ হাসির শব্দ শোনা গেল – অনেকটা হায়নার ডাকের মতো... “তা প্ল্যানটা কী শুনি”?

“না স্যার, প্ল্যানটা এখনই বলব না। তবে কাশ্মীরের বিখ্যাত কোন টুরিস্ট স্পটে হামলা করার একটা প্ল্যান করেছি – ঠিকঠাক লেগে গেলে স্যার – শুধু হিন্দুরা নয় – কাশ্মীরের মুসলমানরাও জব্দ হয়ে যাবে। কাশ্মীরী এই মুসলমানগুলো হিন্দু টুরিস্টদের থেকে ভালই পয়সা কামায় স্যার। সেই জন্যে জিহাদ-টিহাদ ভুলে এখন দু হাত তুলে আনন্দে নাচছে...। ওদের এই ভালো থাকার আনন্দও ফাটা বেলুনের মতো একেবারে ফুস হয়ে যাবে”।

“সত্যি? মাইরি বলছো? আহা তোমার প্ল্যানের কথা শুনেই কী আনন্দ যে হচ্ছে...। ঠিকঠাক করতে পারলে না জানি কী হবে। একটা ব্যাপার মনে রাখবে সব সময় – আমাদের প্রধান লক্ষ্য হিন্দুরা হলেও – হিন্দুস্থানে থাকা মুসলিমরা – যারা জিহাদ ভুলে হিন্দুস্থানি হয়ে উঠছে দিনকে দিন – তাদেরও চমকাতে হবে। তাদেরও বোঝাতে হবে...মুসলমান হয়েছ যখন, আমাদের সঙ্গে বেরাদরি কর। তা না হলে মৃত্যুর পর ওদের ঠাঁই হবে দোজখে। শুধু মুসলমান বলেই মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে বাহাত্তর হুরি-পরি নিয়ে ঢালাও ফুর্তির আসরে যোগ দেওয়া যাবে না। যাগ্‌গে কবে নাগাদ করছো হামলাটা?”

“খুব শিগ্‌গিরি স্যার, কাশ্মীরে এখন বেড়াতে আসার ভরপুর মরশুম কিনা, তাই এমাসের শেষ দিকে কিংবা সামনের মাসের মাঝামাঝি”।

“আরে এমাসেই সেরে দাও, ওমাসের জন্যে অপেক্ষা করতে যেও না”।

“অপেক্ষা করতে চাইছি না, স্যার – আটকে যাচ্ছি অন্য একটা ব্যাপারে”।

“কী ব্যাপারে”?

“কী আর বলব স্যার। আপনার মতো মহান ইসলাম দরদী মানুষের কাছে বারবার বলতে লজ্জা করছে স্যার”।

“ন্যাকামি রেখে, কী বলতে চাইছ, বল না ছাই”।

“আজ্ঞে কিছু টাকার খুব দরকার ছিল -  আপাততঃ কোটি দশেক যদি দেন...কাজটা চটপট শুরু করে দিতে পারি”।

“দ-অ-অ-শ কোটি? টাকা কি খোলামকুচি নাকি – কী ভাবো বলো তো?”

“সত্যি বলছি, স্যার। এভাবে আপনার কাছে চাইতে খুব লজ্জা করে। কিন্তু কী করবো স্যার, উপায় নেই। বছর দশ পনের আগেও ছেলেপিলের দল – ছমাসের ট্রেনিং নিয়ে, হাতে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ত জিহাদিতে। নগদ টাকা-পয়সার দিকে কোন খাঁই ছিল না। ফ্রিতে থাকা খাওয়া টুকটাক হাত খরচা দিলেই চলে যেত। এখন সেই ছেলেদের বাড়ি থেকে বের করতেই, তাদের বাপ-মাকে পনের-বিশ লাখ টাকা গুনে দিতে হয়। তারা বলে, এ ছেলে তো আর ফিরবে কিনা ঠিক নেই – হিন্দুস্থানের জওয়ানদের গুলিতে হয়তো বেঘোরে মরবে। ছেলে যদি ঘরে থাকত – পনের-বিশ লাখ টাকা তো তারা তিন চার বছরেই কামাই করে নিতে পারত – হিন্দুস্থানী টুরিস্টদের সার্ভিস দিয়ে। তারপর ধরুন হিন্দুস্থানে ঢুকে যাদের বাড়িতে কদিন থাকবে, খাবে – তারাও আগে পয়সা নিত না। এখন পারহেড পারডে এক লাখ থেকে দেড় লাখ করে চাইছে – তাদের শেল্টার দেওয়ার জন্যে। বলছে সন্ত্রাসী হানার পর হিন্দুস্থানি মিলিটারিরা খোঁজখবর নিয়ে ঠিক পৌঁছে যায় বাড়িতে – বাড়ির ছেলেদের ধরে নিয়ে জেলে ভরে দেয়, বাড়ির অন্য লোকদেরও জিজ্ঞাসাবাদের নামে বড্ডো হয়রানি করে, স্যার। তাছাড়া বন্দুক আর গোলাগুলির দামও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। চার মাস আগেও আমেরিকান কিংবা চিনের বন্দুকের দাম যা ছিল, এখন তা বেড়েছে দুগুণ, তিনগুণ করে। দালালরা বলছে, বিশ্বের সব দেশই এখন সন্ত্রাসবিরোধী এবং শান্তিকামী হয়ে উঠছে, তাই ওই সব দেশের ভালো বন্দুক যোগাড় করতে আমরা নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি, স্যার”।

ফোনের ওপাশ থেকে অশ্রাব্য একটা গালাগাল উড়ে এল, তারপর উত্তর এল, “আচ্ছা, মুসলমানদের মধ্যে ধর্মভাব কি কমে যাচ্ছে? এমন একটা মহৎ কাজের জন্যে নিজেকে কুরবানি দেওয়ার এমন একটা সুযোগ পাচ্ছিস, তার জন্যে কোথায় কৃতজ্ঞ থাকবি, তা নয় শুধু টাকা-টাকা করছিস? ছিঃ। টাকা কি সঙ্গে যাবে? তোমার অবস্থাটা বুঝতে পারছি মামুদ। ঠিক আছে – তোমাকে দশ কোটিই দেব। কিন্তু এখন দেব সাত কোটি। পরে ঠিকঠাক কাজ হলে বাকি তিন দেব। আর সেরকম মোক্ষম কিছু করে যদি আমাকে খুশি করতে পারো...তাহলে হয়তো আরো বেশি। কি খুশি তো?”

“সে কথা আর বলতে, স্যার। আপনাকে খুশি রাখাই আমার জীবনের লক্ষ্য। তা টাকাটা কখন পাবো, স্যার?”

“ধরো, ট্রান্সফার হয়ে গেছে তোমার অ্যাকাউন্টে...ও নিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, মামুদ। তুমি কাজে মন দাও”।

“জি স্যার”।

 

 

ফোনটা রেখে টেবিলের ওপর তবলার ঠেকা দিয়ে সুলতান মামুদ একটা গজলের সুর ভাঁজল কিছুক্ষণ। তারপর ল্যাপটপ খুলতে খুলতে ভাবল, এমন সব বুরবক জিহাদিরা আছে বলেই, ওদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে তার বাপ-ঠাকুরদারা আমীর হয়েছিল। এভাবে চলতে থাকলে তার নাতি-পুতিরাও স্বচ্ছন্দে পায়ের ওপর পা তুলে, রাজার হালে থাকতে পারবে। পাসওয়ার্ড এবং ফেস আইডেন্টিফিকেশন করে, লগইন করে খুলল, ইংল্যাণ্ডের একটি বিখ্যাত ব্যাংকের হোমপেজ। সেখানে লগইন করা মাত্র – একটা নোটিফিকেশন এল সাত কোটি টাকা ক্রেডিট হয়েছে তার অ্যাকাউন্টে। এবং তার অ্যাকাউন্টের প্রেজেন্ট ব্যালান্স সাড়ে পাঁচহাজার কোটির কিছু বেশি। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে – সুলতান মামুদ লগ আউট করল ব্যাংকের সাইট থেকে। তার মুখে মুচকি হাসি।

চেয়ার থেকে উঠে আট তলায় তার এই চেম্বারের কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে ধূসর রঙের আকাশ। অনেক নীচেয় শহরের ঘিঞ্জি রাস্তায় এখন বিশাল জ্যাম। কয়েকশ গাড়ি জ্যামে আটকে আছে। তার ফাঁকে ফাঁকে গোঁজা আছে টাঙ্গা, অটো, স্কুটার, বাইক...আর সেই সব এড়িয়ে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে পিঁপড়ের মতো অজস্র মানুষ। ওদের মধ্যে কত যে বেকার ছোকরা আছে – যারা প্রত্যেকেই ভবিষ্যতের সফল জিহাদি হয়ে উঠতে পারে। আর বয়স্ক মানুষগুলোর মধ্যেই হয়তো কারো ছেলে এখন আজাদ কাশ্মীরের জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে চলেছে হিন্দুস্থান সীমান্তের দিকে। সাত-দশ দিনের মধ্যে হামলা করবে হিন্দুস্থানের সাধারণ মানুষের ওপর – বিশেষ করে যারা হিন্দু। তাদের পড়ে থাকা লাশ ঘিরে হিন্দুস্থানী মহিলাদের হাহাকার সে যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে...।

দরজায় খুট করে আওয়াজ হতে ঘুরে তাকাল সুলতান মামুদ, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তার পিএ, বলল, “স্যার, মহম্মদ ঘোরি স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে, পাঠাবো”?

একটু চিন্তা করে সুলতান মামুদ বলল, “হুঁ পাঠাবে – কিন্তু তার আগে বলো তো রাজিয়া, তোমার কাছে ক্যাশ কত আছে”?

“বারো”।

“গুড। হতভাগা ঘোরি তো এসেছেই টাকা চাইতে। ওখান থেকে সাত নিয়ে এসো তো। অর্থ দপ্তরে এই খরচের হিসেব পাঠিয়ে, ইমিডিয়েট ক্যাশের জন্যে রিকুইজিসন পাঠাও”।

““কন্টিনজেন্সিস ফর মিলিট্যান্ট অ্যাকশনস” হেডেই খরচটা দেখাবো তো, স্যার?”

“তুমি কি এখানে নতুন নাকি রাজিয়া?” একটু বিরক্ত হয়ে সুলতান মামুদ বলল, “আমরা যে এতিমখানার জন্যে দানত্র খুলিনি, সে কথা কি তুমি জানো না?”  

“জানি, স্যার, কিন্তু তাও একবার কনফার্ম করে নিলাম। কত টাকার জন্যে রিকুইজিসন পাঠাবো স্যার?”

“আপাততঃ কুড়ির জন্যে পাঠাও – তারপর দেখছি...”।

“ওকে স্যার”।

 

সুলতান মামুদ নিজের চেয়ারে বসার একটু পরেই রাজিয়া এল – হাতে বেশ বড়ো একটা সুটকেশ। বেশ ভারি, বয়ে আনতে তার কষ্ট হচ্ছিল। দরজা বন্ধ করে সামনে এসে বলল, “সাত কোটি আছে, স্যার”।

“গুড, মিনিট দশেক পরে ঘোরিকে পাঠিয়ে দিও। আর দেখ এ সময় কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে”।

“ঠিক আছে, স্যার”।

রাজিয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সুলতান মামুদ হাল্কা দ্রুত পায়ে দরজাটা লক করে এল নিঃশব্দে। তার সিটের ডানদিকের ক্যাবিনেট থেকে বের করল বেশ বড়ো একটা সবুজ রঙের সুটকেশ। দ্রুত হাতে সেটা খুলল, খুলে ফেলল রাজিয়ার রেখে যাওয়া সুটকেশটাও। তারপর রাজিয়ার সুটকেশ থেকে সাড়ে ছ কোটির নোট গুণে ভরে নিল সবুজ রঙের সুটকেশে। সেটাকে লক করে রেখে এল আগের ক্যাবিনেটে। তারপর বাকি টাকা সমেত রাজিয়ার সুটকেশটা বন্ধ করে চেয়ারের পাশে বাঁদিকে রাখল। আগের মতোই হাল্কা পায়ে হেঁটে নিঃশব্দে খুলে দিল তার চেম্বারের লক।

ফিরে এসে স্লিপ মোডে চলে যাওয়া ল্যাপটপের ঘুম ভাঙাল। তারপর চেয়ারে বসে ইন্টারকমে বলল, “রাজিয়া, ঘোরিকে পাঠিয়ে দাও”। এরপর সবুজ রঙের একটা ফোনের রিসিভার নিয়ে গম্ভীর মুখে কিছু শুনতে লাগল, আর মাঝে মাঝে, “হুঁ”, “জি স্যার”... বলতে লাগল। এই সময়েই চেম্বারের দরজা খুলে মুণ্ডু দেখাল ঘোরি। সুলতান মামুদ গম্ভীর চালে তাকে হাতের ইশারায় ভেতরে আসতে বলল।

ঘোরি টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। সুলতান মামুদ চেয়ার ঘুরিয়ে ফোনের কাল্পনিক কথা শুনতেই লাগল আর আগের মতোই মাঝে মাঝে “হুঁ”, “জি স্যার” বলতে লাগল। মিনিট পাঁচেক পর ফোন রেখে খুব জোরে নিঃশ্বাস ফেলে, টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে টেবিলে রাখা গেলাস থেকে জল খেল অনেকটা। তারপর হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁটের জল মুছে বলল, “আরেঃ দাঁড়িয়ে কেন, বসো”।

ঘোরি উল্টোদিকের চেয়ারে বসতেই সুলতান মামুদ খুব শ্লেষের সঙ্গে বলল, “অবশ্য বসেই তো আছো সারাদিন – নিশ্চিন্তে, দিব্য আরামে...। এদিকে আমার যে কী অবস্থা – এই মাত্র বিদেশ থেকে ফোন এসেছিল, বলছে, হিন্দুস্থানে ভালো মতো কোন কাণ্ড ঘটাতে না পারলে, আর একটা টাকাও দেবে না। যাচ্ছেতাই কথা শোনালো। বলল, আমরা টাকা দিই কাজের জন্যে – আমাদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়া আর ফূর্তি করার জন্যে নয়...”।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সুলতান মামুদ, আড় চোখে দেখল ঘোরি মাথা নীচু করে গোমড়া মুখে তার কথা শুনছে। তারপর আবার বলল, “বসে বসে শুনতে হল, বুঝেছ? বুক বাজিয়ে উত্তর দেওয়ার মতো কোন কাজ, আমরা করতেই পারলাম না বহুদিন। যাই হোক, তোমার কী বলার আছে বলো, তবে আগেই বলে রাখছি তোমার শুকনো কথায় আর কিন্তু চিঁড়ে ভিজবে না...”।

ঘোরি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, “এবার এমন কাণ্ড ঘটাবো গোটা হিন্দুস্থান চমকে উঠবে!”

“আচ্ছা? বলো কি?” বিদ্রূপের সুরে সুলতান মামুদ বলল, “তোমার কথা শুনে আমিই তো চমকে উঠছি”।

“ঠাট্টা করছেন স্যার? আমাদের পরিকল্পনা শুনলে আপনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন, বলবেন এমন সহজ বুদ্ধিটা আমাদের মাথায় আগে আসেনি কেন?” সুলতান মামুদ কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল ঘোরির মুখের দিকে। ঘোরি আবার বলল, “পহলগামে এই সময়ে হিন্দুস্থানের নানান প্রান্ত থেকে অনেক টুরিস্ট আসে স্যার – তাদের প্রায় সবাই হিন্দু। এবার ওদের টার্গেট করছি। একথা আপনাকে আগেই বলেছিলাম স্যার। জেহাদিদের ছোট্ট একটা দল অলরেডি ভারতে ঢুকিয়ে দিয়েছি। তার মধ্যে দুজন আমাদের এদিকের, অন্য দুজন হিন্দুস্থানের লোকাল ছেলে - কাশ্মীরী। দু-তিন দিনের মধ্যেই তারা অ্যাকশনে নামবে...”।

মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বিরক্তমুখে সুলতান মামুদ বলল, “ফুঃ মোটে চারজন জিহাদি? এতদিন ধরে তোমার পিছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললাম, এখন তুমি মোটে চারজন জিহাদির গল্প শোনাচ্ছো?”

“পুরোটা শুনুন না স্যার – বড়ো দল নিয়ে কাজ করার অনেক ঝামেলা – বর্ডার পার করা, ও পাশের গ্রামে ঢুকিয়ে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা...। আজকাল হিন্দুস্থানের মিলিটারিরা খুব সতর্ক হয়ে গেছে স্যার – বড় দলের কয়েকজন ধরা পড়লে পুরো অভিযানটাই ভেস্তে যায়। ওদের মধ্যে দু একজন জিহাদি হিন্দুস্থানের মিলিটারিদের মারের ঠ্যালায় প্রায় সব কথাই বলে দেয়। হিন্দুস্থানি মিলিটারি বড়ো নিষ্ঠুর হয় স্যার, আমাদের মতো থোড়ি তাদের প্রাণে দয়ামায়া আছে!

এবারে তাই চারজনের ছোট্ট দল। বন্দুক নিয়ে টুকটুক করে টুরিস্ট স্পটে যাবে। টুরিস্টদের পরিবারগুলোকে ধরে জিজ্ঞাসা করবে, তুই হিন্দু না মুসলিম। হিন্দু বললেই গুলি...শেষ...। মুসলিম বললেও রেহাই দেওয়া হবে না, বলবে কলমা পড় – না পারলে সেও খতম। তবে সবাই নয়, মরবে শুধু পরিবারের পুরুষটা - মানে স্বামীরা। তাদের বিবিরা চোখের সামনে দেখবে তাদের সোহরের মৃত্যু। ছেলেমেয়েরা দেখবে তাদের বাপ এক গুলিতেই কেমন লটকে পড়ে!”

সুলতান মামুদ অবাক হয়ে বলল, “পরিবারের সবাই নয় কেন? তাতে তো আমাদের লাভ – মরার সংখ্যাটা বেড়ে দুগুণ-তিনগুণ হয়ে যাবে...”।

“তা যাবে স্যার কিন্তু বেঁচে থাকা বউ আর ছেলে-মেয়েদের অবস্থাটা কী হবে চিন্তা করুন, স্যার। রাগ, দুঃখ, শোক, ঘৃণা, হতাশা...হিন্দুস্থানের জনগণ এই দৃশ্য যখন মিডিয়ায় দেখবে স্যার - হিন্দুস্থানের নানান প্রদেশের লোকের মনেও একই প্রভাব পড়বে... ব্যস্‌, হিন্দুরা ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদেশের মুসলমানদের ওপর। আর হিন্দুরা মারলে আমাদের কওমের লোকেরাও কী ছেড়ে দেবে স্যার, শুরু হয়ে যাবে দাঙ্গা। আগুন জ্বলে যাবে ভারতের সব প্রান্তে...। আমাদের কিচ্ছু করতে হবে না, স্যার, নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করেই হিন্দুস্থানের কোমর ভেঙে যাবে...। এপার থেকে আমাদের শুধু চিৎকার করে বিশ্বকে জানাতে হবে – হিন্দুস্থানে সংখ্যালঘুদের নিধনযজ্ঞ চলছে...হিউম্যান রাইট্‌স, ইউএন, আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি, ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া – সর্বত্র ঢিঢি পড়ে যাবে হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে...ঘরে বাইরে, হিন্দুস্থানের দফারফা”।

প্ল্যানটা সুলতান মামুদের মন্দ লাগল না। খরচ কম, হ্যাপা কম, কিন্তু মুনাফা বিস্তর। ঘোরিব্যাটা ভালই ধুরন্ধর তো! কিন্তু মুখে বলল, “আমি কিন্তু অত কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তুমি স্বপ্ন দেখালেই আমিও সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে যাবো, এত বোকা আমি নই, ঘোরি। তবে ব্যাপারটার মধ্যে নতুনত্ব আছে – দেখ কী হয়। কবে করছো – কী করছো, তারপর কী কী ঘটছে সব কিন্তু লক্ষ্য রাখব আমি। এখন এস, আমার এখন অনেক কাজ। তোমার এই প্ল্যানের কথা, আমাদের বিদেশী বন্ধুদের এখনই জানাতে হবে, নইলে টাকা-পয়সা পাবো না। তুমি তো কাজ হলেই টাকার জন্যে আমার কাছে হত্যে দিয়ে পড়বে”।

“কিন্তু আজকে কিছু টাকা তো আমাকে দিতেই হবে, স্যার – আজকে সন্ধের মধ্যে হাওলায় পাঠালে – পরশু সকালের মধ্যে ওরা কাজে নামবে”।

“আমার কাছে সামান্য কয়েক লাখ পড়ে আছে সেটাই তোমাকে দিতে পারি – ওতেই  আপাতত কাজ চালাও। তারপর তো আমি আছিই”।

“লাখ? লাখে কী হবে স্যার? আমার এক কোটি চাইই চাই। না হলে খুব বিপদে পড়ে যাবো। তীরে এসে তরী ডুববে, স্যার। আর একথা চাউর হয়ে গেলে – একটা ছেলেকেও আর জিহাদে নামাতে পারবো না... কেউ আসবে না”।

“টাকা কি গাছে ফলে ঘোরি, যে নাড়া দেব আর ঝর ঝর করে এক কোটি নেমে আসবে? দশ টাকা যোগাড় করতে কত হেনস্থা আমাকে সহ্য করতে হয় কোন ধারণা আছে, তোমার? বললাম তো আমি দেখছি কী করা যায় – এক কোটি তো কোন প্রশ্নই নেই। আচ্ছা একটা কথা বলো তো, জিহাদ তো আমাদের ধর্মে একটা পবিত্র কর্তব্য – তার জন্যে ছেলেরা এত টাকা চায় কেন? বোঝাতে পারো না, টাকার থেকে জন্নত অনেক বড়ো?”

তেঁতো খাওয়া মুখে ঘোরি বলল, “আপনাকে আগেই তো বললাম, সে সব দিন আর নেই স্যার – এখন সবার মুখেই শুধু টাকা আর টাকা। কোটি না হোক, কমসেকম পঞ্চাশ লাখ স্যার দিতেই হবে, না হলে খুব বিপদে পড়ে যাবো, স্যার”।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মামুদ বলল, “টাকা থাকলে কি আমি তোমাকে দিই না, বলো? কোনদিন না করেছি? কিন্তু এখন অবস্থা আগের মতো নেই – আমাদের দেশের অবস্থা তো জানোই – দাল আনতে রুটি ফুরোয়। ফরেন থেকেও আগে যেমন ফান্ডিং হত – আজকাল তেমন আর হচ্ছে না। দেখছ না, পয়সাওয়ালা মুসলিম দেশগুলোও আজকাল হিন্দুস্থানের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। তারা এই জিহাদি-টিহাদি নিয়ে তেমন আর ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে না। তোমার অবস্থাটা আমি বুঝছি, ঘোরি, কিন্তু বিশ্বাস করো আমি নাচার। আপাততঃ বিশ লাখ নিয়ে যাও। তবে তোমাকে কথা দিচ্ছি – হিন্দুস্থানের বুকে একটা জমাটি ঘা মারতে পারলে, তোমাকে এক কোটিই দেব। তেমন তেমন হলে বেশিই দেব”।

ঘোরি হতাশ মুখে বলল, “বিশ নয়, স্যার, ওটা পঁচিশ করুন – নয়তো একদম মারা পড়ে যাবো”।

মামুদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ঘোরির মুখের দিকে, তারপর চেয়ারের বাঁদিকে রাখা রাজিয়ার সুটকেশটা তুলে টেবিলের ওপর রাখল। সুটকেশ খুলে পঁচিশ লাখ বের করে ঘোরির সামনে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার কথা আমি যথাসাধ্য রাখলাম, ঘোরি, কিন্তু তুমি যদি তোমার কথা না রাখো...”।

ঘোরি টাকার বাণ্ডিলগুলো চটপট তুলে নিজের ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার হিন্দুস্থানে আগুন জ্বলবে...আর আপনিও আমায় দু হাত ভরে ইনাম দেবেন। তাহলে আসি, স্যার – টাকাটা এখনই পাঠাতে হবে সীমান্তে”।

“এসো”।

 ঘোরি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে মামুদ ফোনে ডেকে নিল রাজিয়াকে। রাজিয়া ঘরে আসতে তার হাতে সুটকেশ তুলে দিয়ে বলল, “এতে পঁচিশ আছে রাজিয়া – অনেক দরদাম করে ছয়–পঁচাত্তরে রাজি করালাম ঘোরিটাকে...। নিয়ে যাও। আর শোনো, লাঞ্চ পর্যন্ত কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে”।

রাজিয়া মুচকি হেসে উত্তর দিল, “থ্যাংকিউ স্যার” এবং সুটকেশ নিয়ে বেরিয়ে গেল। সে জানে এই পঁচিশ লাখের কোন হিসেব নেই এবং স্যার জেনেশুনেই এই টাকাটা তার হাতে তুলে দিল। ছপ্পর ফেঁড়ে এমন উপরি টাকা মাঝে মাঝেই তার হাতে চলে আসে। স্যার এখান থেকে কত সরাল সে জানে না, জানার দরকারই বা কি? এটুকু সে জেনে গেছে স্যারের সঙ্গে কাজ করার মজাই আলাদা।

 

 রাজিয়া চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতেই মামুদ উঠে গিয়ে আবার জানালার সামনে দাঁড়াল। নীচের শহরের দিকে তাকিয়ে ঘোরির নতুন পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাবতে লাগল। মুখে স্বীকার না করলেও, হতভাগা যে বেড়ে প্ল্যান করেছে – এ বিষয়ে তার সন্দেহ নেই। পহলাগামে বেছে বেছে হিন্দুদের কোতল করতে পারলে, হিন্দুস্থান যে উত্তাল হয়ে উঠবে, সেটাও নিশ্চিত। তবে ঘোরি যেটা বলল, হিন্দুস্থান জুড়ে দাঙ্গা-ফাসাদ শুরু হয়ে যাবে – তেমনটা তার মনে হয় না। ওদেশের সাধারণ হিন্দুগুলোও তাদের দেশের জনগণের তুলনায় অনেক বুদ্ধিমান। এমনকি ওখানকার মুসলমানগুলোও। হিন্দুরা গুচ্ছের মূর্তি-দেব-দেবীর পুজো-টুজো করে ঠিকই – কিন্তু তাদের কেউই বিশ্বাস করে না – মরার পরে তারা স্বর্গে যাবে। স্বর্গে ঊর্বশী-টুর্বশী নামের কারা যেন হুরিপরি আছে – তাদের কোলে বসে ফূর্তি করবে, একথা কেউ স্বপ্নেও ভাবে না। আর দীর্ঘদিন হিন্দুদের সঙ্গে থেকে, ওদেশের মুসলমানদের মধ্যেও ক্বচিৎ কেউ বিশ্বাস করে – এন্তেকালের পর জন্নতে গেলেই হুরি-পরিরা লুফে নেবে আমাদের। সেই জন্যে হিন্দুস্থানে জিহাদিতে বিশ্বাস করে চট করে কেউ জঙ্গী হয় না, তারা জঙ্গী হয় শুধুমাত্র প্রচুর টাকার লোভে। এদেশে জিহাদিদের টাকার লোভ নেই, তা নয় - আছে, তবে কম। তাদের বেশি আগ্রহ একটা দুটো জিহাদ নামিয়ে শহীদ হতে পারলেই – জন্নতে গিয়ে হুরিদের সঙ্গে হৈহুল্লোড়ের মজা।        

কাজেই ছোটখাটো দু একটা দাঙ্গা হয়তো বাধবে – কিন্তু অত বড়ো দেশের কাছে সেটা নস্যি। বরং বিপদ আসতে পারে অন্য দিকে। বেছে বেছে সাধারণ হিন্দু নাগরিককে মারলে, ওদেশের জনগণ ক্ষেপে উঠবে – রেগে যাবে ওদেশের প্রশাসন। এর আগেও ওরা দুবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে – কিছু জঙ্গী আস্তানা ধ্বংস করেছে। এবারেও হয়তো তাই করবে। হয়তো একটু বেশিই করবে। কিন্তু তাতে মামুদদের কত আর ক্ষতি হবে? বরং লাভ হবে অনেক বেশি। হিন্দুস্থানের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে, প্রত্যাঘাত হানার জন্যে বিদেশী মুসলমানেরা দুহাত ভরে টাকা ঢালবে, মামুদের পকেটে। মুচকি হেসে মামুদ ভাবল, ইংল্যাণ্ডের কান্ট্রি সাইডে অলরেডি তার বিশাল এক বাংলো রয়েছে। হিন্দুস্থান সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করলে, সস্তায় ভালো দ্বীপ কোথায় পাওয়া যায়...তার জন্যে তাকে আবার মাথা ঘামাতে হবে।

জ্ঞান হওয়া থেকে, হিন্দুস্থানের নাম শুনলেই মামুদের গাত্রদাহ হয়। ব্যাটারা একই বছর, আমাদের কয়েক ঘণ্টা পরে স্বাধীন হল। অথচ এই ক বছরে সবদিকেই এমন এগিয়ে গেল – অথচ আমরা রয়ে গেলাম কয়েক শতক পিছনে। হতভাগারা কাফের – কোন ধর্ম নেই – ধর্মের থেকে বেশি মন দেয় লেখাপড়ায়, গবেষণায়, কাজেকর্মে। মামুদরা মুখে স্বীকার না করলেও, মনে মনে জানে – হিন্দুস্থানের লোকগুলো সর্বদা শান্তি-শান্তি করলেও – প্রয়োজনে ভালো যুদ্ধও করে। তিনবার যুদ্ধে তাদের যা নাকানি চোবানি খাইয়েছিল – একাত্তরের যুদ্ধে তো মামুদদের ল্যাজে-গোবরে করে ছেড়েছিল হিন্দুস্থান। তখন মামুদ অবশ্য ছোট ছিল – কিন্তু বড় হতে হতে সে কাহিনী যত শুনেছে মামুদ – তত বেড়েছে তার মনের জ্বালা।

এই সব নানান ভাবনা চিন্তা করতে করতে হঠাৎ একটা কথা মামুদের মনে হল। আজকাল সারা বিশ্বে যা দেখা যাচ্ছে – ট্যাংক আর কামান নিয়ে সরাসরি সেনাযুদ্ধ তেমন আর হচ্ছে না। সবই হচ্ছে দূর থেকে। নিজেদের সীমান্তে বসেই ফাইটার বিমান থেকে কিংবা মাটি থেকে মিসাইল ছুঁড়ছে – ড্রোন পাঠাচ্ছে। সেগুলো উড়ে গিয়ে আঘাত হানছে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। হিন্দুস্থান যদি সেভাবেই যুদ্ধে নামে? জঙ্গীঘাঁটিগুলো এবং আমাদের সেনাঘাঁটিতে যদি অমন মিসাইল বা ড্রোন হামলা চালায়? আমাদের কাছেও অমন যুদ্ধ অস্ত্র অনেক আছে। আমরা কিনেছি আমেরিকা, চিন, তুর্কি এবং আরও কয়েকটা দেশ থেকে। অবশ্য সে সব অস্ত্র বেশ কয়েক বছরের পুরোনো। কারণ কোন দেশ কি আর তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম অন্য দেশে বিক্রি করে? তাই হয় নাকি? বাঙ্কারে পড়ে জং ধরতে থাকা বেশ কবছরের পুরোনো সেই সব অস্ত্র, তারা আমাদের মতো দেশকে বেচে বাঙ্কার খালি করার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছেতাই মুনাফাও করে।

মামুদ জানে হিন্দুস্থানও সেরকম কিছু কিনেছে – ফ্রান্স থেকে, রাশিয়া থেকে। কিন্তু সেগুলো কি আমেরিকা বা চিনের অস্ত্রগুলোর থেকেও সরেস নাকি নিরেস? কে জানে? তবে একথাও ঠিক বিগত কয়েক বছরে হিন্দুস্থান যে পরিমাণে রকেট ওড়াচ্ছে – চাঁদে, মঙ্গলে, মহাকাশে। যেভাবে হিন্দুস্থানের সস্তার রকেট বহুদেশের উপগ্রহগুচ্ছ   বগলে নিয়ে ঠিকঠাক পৌঁছে দিচ্ছে তাদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে! সে সব কথা সারা বিশ্বই জানে। সেই টেকনোলজিরই একটু এদিক-ওদিক করে কিছু মিসাইল-টিসাইল বানিয়ে ফেলেনি তো? কিছু কিছু খবর যে কানে আসে – আকাশ, ব্রহ্মস, অগ্নি, পৃথ্বী – সেগুলো কি সত্যি? যদি সত্যিও হয়, সেগুলো কাজের সময় কাজ দেবে কিনা কে জানে? আমেরিকা বা চিনের টেকনোলজির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো বিদ্যে-বুদ্ধি কাফেরগুলোর মাথায় আছে বলে, মামুদের মনে হয় না। তবে আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, হিন্দুস্থানের এই উন্নতির পিছনে রয়েছেন একজন মুসলমান, ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম। ইসলামিক দেশের কথা এতটুকু চিন্তা না করে, কাফেরের দেশের জন্যেই তিনি কেন যে সারা জীবনটা উৎসর্গ করলেন, খোদায় মালুম।

হিন্দুস্থানের প্রতি তীব্র ঈর্ষার কারণে, তাদের উন্নতির কথা যদিও মামুদের মনে খুব বেশি দাগ কাটল না। সে চিন্তা করল, এসব তেমন কিছু নয় – অধিকাংশই মিথ্যা প্রচার। ও নিয়ে খুব বেশি ভাববার কোন কারণ এখনও ঘটেনি। তবে এটাও ঠিক হিন্দুস্থান যে দুটো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছে – সেখানে ওদের নীতি ছিল অসামরিক কোন মানুষকে অথবা প্রতিষ্ঠানকে ওরা আঘাত হানবে না। শুধু বলা নয় – করেও ছিল তাই। ঠিকঠাক জঙ্গীঘাঁটিগুলোই ধ্বংস করেছিল। যদিও মামুদরা তীব্র গলা ফাটিয়ে মিথ্যে প্রচার করেছিল – ওই দুই হামলায় প্রচুর সাধারণ জনতা, মহিলা ও শিশু মারা গিয়েছে।

মিথ্যে কথা বারবার প্রচার করে সেটাকে সত্য করে তোলা মামুদদের বাঁ হাতের খেলা। সে জানে ওই মিথ্যে প্রচারই তার দেশবাসী বিশ্বাস করেছে এবং গোগ্রাসে গিলেছে। কিন্তু মনে মনে মামুদ জানে, হিন্দুস্থানের কথাগুলো মোটেই মিথ্যে নয়। এবং সেটাই খুব চিন্তার বিষয়। কারণ এই নীতি ঠিকঠাক অনুসরণ করলে, হিন্দুস্থান কোনদিনই হয়তো আর ট্যাংক, কামান নিয়ে স্থলযুদ্ধ কিংবা বিমান যুদ্ধ করবে না। কারণ তাতে বহু গ্রাম, জনপদ ও শহরের সাধারণ মানুষের প্রাণ যাবে। তার মানে দাঁড়ায়, মিসাইল-ড্রোন নিয়ে আধুনিক যুদ্ধের চাবিকাঠি হিন্দুস্থানের পকেটে যথেষ্ট পরিমাণে আছে। যা দিয়ে তারা, সাধারণ গ্রাম-শহর ডিঙিয়ে জঙ্গীঘাঁটি, সেনাঘাঁটি এমনকি এই সেনা সদর-দপ্তর – যেখানে সে দাঁড়িয়ে নতুন একটা দ্বীপ কেনার স্বপ্ন দেখছে – সেখানেও অনায়াসে আঘাত হানতে পারে!

এই ভাবনাটা শীতল স্রোত হয়ে নেমে এল মামুদের শিরদাঁড়া বেয়ে। সে দ্রুত টেবিলে ফিরে গিয়ে ফোন করল বিবিকে।

“হ্যালো, মমতাজ”?

“বলো, তোমার মিটিং-টিটিং হয়ে গেল? কখন আসছ লাঞ্চ করতে?”

“এই একটু পরেই বেরোব। একটা কথা বলো তো – আজ রাত্রেই যদি তুমি-আমি লণ্ডনে রওনা হই, রেডি হতে পারবে?”

“কত দিনের জন্যে”?

একটু চিন্তা করে মামুদ বলল, “ধরো অনেকদিনের জন্যে। হয়তো বছর খানেক, কিংবা তারও বেশি – হয়তো চিরকালের জন্যে”।

“কী বলছো? অতদিনের জন্যে হলে – সব মালপত্র গুছিয়ে, আজকের মধ্যে রেডি হওয়া সম্ভব নাকি?”

“ঠিক আছে, আজ না হলে কাল রাত্রে?”

“তা হয়তো হয়ে যাবে – কোন ফার্নিচার বা গ্যাজেট, কিচেনের ইউটেন্‌সিল কিচ্ছু নেবে না তো? শুধু টাকা-পয়সা, গয়নাগাঁটি, জামাকাপড় এই সব - তাই তো?”

“এক্স্যাক্টলি, গুলি মারো, বাকি জিনিষপত্রে, – ইউকের বাংলোতে আমাদের কোন কিছুর অভাব আছে?”

“কিন্তু কী ব্যাপার বলো তো? দেশ ছেড়ে পালাতে চাইছ কেন?”

“পালাচ্ছি না, তোমাকে রেখে আমি ফিরে আসব। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তুমি ইংল্যাণ্ডেই থেকে যাবে – ওরা ওখনেই লেখাপড়া করবে”।

“কেন? হিন্দুস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাচ্ছো নাকি?”

“মমতাজ, আমাদের ঘরে বাইরে সর্বত্রই এখন শত্রু – একদিকে বালুচ, সিন্ধ, পাখতুনখোওয়া, সেই দেখে আমাদের হাতিয়ে নেওয়া কাশ্মীরও আজকাল ছটফট করছে...। আর হিন্দুস্থান তো আছেই – চিরকালের শত্রু”।

“হিন্দুস্থানকে শত্রু বলছ বটে, কিন্তু ওরা কোনদিন গায়ে পড়ে যুদ্ধ করতে আসেনি – তোমরাই বরং পায়ে পা দিয়ে বারবার যুদ্ধ বাধিয়েছ, এবং প্রতিবারই হেরেছো। এখন আবার লাগাতার জঙ্গী ঢুকিয়ে ওদের জ্বালিয়ে মারছো...”।

মামুদ একটু মজা করে বলল, “সামনাসামনি জঙ্গে হেরে যাই বলেই তো জঙ্গী ঢুকিয়ে ওদের উত্যক্ত করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, জানেমন। আমাদের লোক মরছে কম, ওদের মরছে বেশি। তার ওপর যুদ্ধের থেকে অনেক কম খরচ”।

“কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতি কোথায় নিয়ে গেছ, সেটা ভেবেছো? সাধারণ মানুষের কাজ নেই, ব্যবসা নেই, দুবেলা দুটো রুটি জোটাতে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়েছো...এরপর দেশের লোক তোমাদের ছেড়ে দেবে?”

“আমাদের ছেলেমেয়েরা ইংল্যাণ্ডে্র সেরা স্কুলে-কলেজে পড়ছে। আমরা রাজার হালে নিশ্চিন্তে থাকবো ইংল্যান্ডের বাংলোতে। সাধারণের জন্যে চিন্তা করব পরে। তার আগে ভারতকে যে করে হোক নাকাল করতে হবে, নিজেদের নাক কেটে হলেও”।

“কিন্তু আমাদের চলবে কী করে? আমেরিকা, চিন, তুর্কিদের থেকে ঋণ করে আর ভিক্ষে করে তোমরা দেশ চালাচ্ছো, কিন্তু কতদিন – একদিন তো সবাই মুখ ফেরাবে, তখন?”

“সে গুড়ে বালি, জানেমন। যাদের কথা বললে তারা সবাই জানে আমরা জঙ্গী তৈরী করি, আমাদের দেশে সন্ত্রাসের চাষ হয়। কিন্তু সে কথা জেনেও ওরা আমাদের ঋণ কেন দেয় জানো? ভারত যেন বেশি বাড়তে না পারে। আসল কথাটা কি জানো, ইসলামিক দেশগুলো চায় না, একটা হিন্দু দেশ হুহু করে উন্নতি করুক। আবার আমেরিকা, ইওরোপের মতো সাদা চামড়ার দেশগুলোও চায় না, ভারতের মতো বাদামি চামড়ার দেশ তাদের সঙ্গে টেক্কা দিক। চিন চায় না, তার প্রতিবেশী দেশ ভারত তাকে ডিঙিয়ে যাক।

কাজেই মুখে তারা যতই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলুক, শান্তির বাণী দিক, তারা সবাই চায় ভারতকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখতে। আর সেই কাজটাই আমরা করছি। তার জন্যেই তারা আমাদের ঋণ দেয় – আর সেই ঋণের টাকাতেই আমরা ওদের থেকে পুরোন- জংধরা অস্ত্র প্রচুর দাম দিয়ে কিনি। ওদের দুদিকেই লাভ – আর আমাদের লাভ দুনম্বরি করে প্রচুর কালো টাকা উপার্জন। একটা জঙ্গীর পেছনে আমাদের কত খরচা হয় বলো তো? খুব জোর হলে দশ-পনের লাখ, কিন্তু তার বদলে আমাদের পকেটে আসে কোটি। আমাদের দেশের লোকের কাজ নেই বলছিলে না? প্রচুর জঙ্গীর কাজ রয়েছে। হাতে পেয়ে যাবে পাঁচ-দশ লাখ টাকা, থাকা-খাওয়া ফ্রি...মরে গেলে শহীদের সম্মান। জিহাদে মারা গেলে, হাতের মুঠোয় তারা পেয়ে যাবে জন্নতের সুখ। দেশের যুবকদের আমরা কত বোঝাচ্ছি – আমাদের ডাকে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে না কেন?          

রাজনীতির এত সব মারপ্যাঁচ তুমি বুঝবে না, জানেমন। আমরা বুঝি, তাই আমাদের মতো সেনাপ্রধানদের আছে অগাধ টাকা। ইউকেতে সম্পত্তি। ইউকের নিরাপত্তা”।

“আচ্ছা, ইউকের ব্যাংকাররা তো নিশ্চয়ই বোঝে তোমাদের যে টাকা ওদের ব্যাংকে রয়েছে – সেটা দুর্নীতির টাকা। এর বিরুদ্ধে ওদেশে কোন আইন নেই?”

হো হো করে হাসল মামুদ, তারপর বলল, “আমাদের মতো লোককে ওরা মাথায় করে রাখে জানেমন। বললাম না, সাদা চামড়াদের যত বাণী সব মুখে, আদতে ওরা চিরকালের ধুরন্ধর স্বার্থপর আর ধান্দাবাজ। আমার সম্পদের লোভে ওরা চোখ বন্ধ করে থাকবে – আর আমাদের কঠোর নিরাপত্তা দেবে। যাই হোক তুমি গোছগাছ করে রেডি হও। আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যে আসছি”।

“আগামী কাল যাবে বলছো, এত কম সময়ে ফ্লাইটের বুকিং পাবে?”

হাল্কা হেসে মামুদ বলল, “তুমি সাধারণ নও জানেমন, তুমি এদেশের অসাধারণ এক ভিআইপির বিবি। তোমার জন্যে থাকবে চার্টার্ড প্লেনের ব্যবস্থা। আমরা ছাড়া সে প্লেনে আর কেউ থাকবে না। সাধারণ লোকের চোখের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে তোমায় নিয়ে আমি উড়ে যাবো সব পেয়েছির দেশে। উচ্ছন্নে যাক না,  অন্ধকার অভাগা এই দেশ...বেঁচে থাক আমাদের জঙ্গী বাণিজ্য”।                 

      -০-০-

    [সব চরিত্রই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই।]                   

                    

 এর পরে বড়োদের নাটুকে গল্প  - চ্যালেঞ্জ " 


নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...