এর আগের রম্যকথা - " একটি শিশিরবিন্দু.... "
দুবেলা কিছু করে পেট চালানোর মতো একটা ডিগ্রি আর ধুয়ে জল
খাবার মতো একটা মার্কশীট যোগাড় হয়ে গেল চার বছরের শেষে। এইবার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী
ছাপিয়ে ফেললাম, যেখানে হদিস ছিল আমার ভিতরকার ছাইচাপা আগুনের – ফুঁ দিয়ে কোন
কোম্পানী সেই আগুনটাকে উসকে নেবে ...চলল তারই সন্ধান। ষাট-সত্তর দশকের বাংলা
সিনেমায় চাকরির সন্ধানে ঘোরা নায়কদের মতোই বহু জায়গা থেকেই শোনা গেল “নো ভেকেন্সি”। হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোন
খানে করতে করতে, অবশেষে দিন কুড়ির উদ্যমে মিলে গেল একখান। তখনকার হিসেবে মাইনে পত্র
চলে যায়, খাওয়া থাকা ফ্রি, বছরে দু’বার বাড়ি আসার জন্যে উড়োজাহাজের ভাড়া।
উড়োজাহাজ! জীবনের চাকরির শুরু ফ্লাইটে ট্রাভেল দিয়ে!
বন্ধু-বান্ধব মহলে সাড়া পড়ে গেল। আসলে আমার কর্মস্থলটি এমনই জায়গায় – যেখানে
ট্রেনে যাওয়াই যায়, কিন্তু পৌঁছতে সময় লাগত প্রায় আড়াই দিন। জায়গাটি আসামের কাছাড়
জেলায় পাঁচগ্রাম পেপার মিল। আর আমাদের বাসস্থান করিমগঞ্জ জেলার বদরপুর। কলকাতা
থেকে দূরত্ব প্রায় সতেরশ কিমি। কাজেই ট্রেনে যাওয়ার রুট ছিল হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে
গৌহাটি, সেখানে ট্রেন বদলে বরাক-ভ্যালি এক্সপ্রেস। ট্রেনের জার্নি, ট্রেনের অদল
বদলে প্রায় আড়াই দিন পার হয়ে যেত অবহেলে।
দমদম বিমানবন্দরে সকাল বেলা পৌঁছে গেলাম মধ্যবিত্তের
বিলাসী ট্যাক্সিতে, এবার মধ্যবিত্তের স্বপ্ন - উড়ানযাত্রা। বাবার বেশ কয়েকবার
উড়ানযাত্রার অভিজ্ঞতা ছিল, কাজেই বেশ কদিন ধরেই তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যাবতীয়
করণীয় আর অকরণীয় ব্যাপার স্যাপার।
আমার সঙ্গে কোম্পানির বড়ো সায়েব ছিলেন আর ছিল কোম্পানীর
ঠিকাদার - মাইতিবাবু, কাজেই আমার প্রথম প্লেনে চড়ার চাপটা অনেকটাই হাল্কা হয়ে
গিয়েছিল। তারওপর সেসময় সন্ত্রাসের আশায় সদাসন্ত্রস্তভাব দেখাতেও হত না, আর নানান
ভাড়ার নানান উড়ানের হাটও ছিল না, ছিল এক এবং অদ্বিতীয় আইএ আর তার রাজামশাই। কাজেই
প্লেনে চড়ে পড়াটা বেশ সহজ সরল ব্যাপারই মনে হয়েছিল।
আমার সিট মাঝখানে, বাঁদিকে জানালার পাশে মাইতিবাবু, আর
ডানদিকে প্যাসেজের পাশে – যার উড়ানী নাম “আইল” সেখানে বসলেন বড়োসায়েব। খুব মন দিয়ে
লক্ষ্য করছিলাম ভেতরটা। মাথার ওপরে হাওয়ার ঘূর্ণি-নব, সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার
দিকে করার অনেক চেষ্টা করলাম, হাওয়াটা আমার নাক বরাবর এসে ঝরতে লাগল, তার চেয়ে
কাছে আর এল না কিছুতেই। তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সিটবেল্ট বাঁধা আর সে সম্পর্কিত নির্দেশাবলী। ভারতবর্ষে মহাভারত পড়ার
সেই ট্র্যাডিশন আজ আর নেই বললেই চলে, কিন্তু সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশাবলী, গত চল্লিশ
বছরে একবর্ণও পালটায়নি।
১৯২৯ সালে ভারতবর্ষে প্রথম এয়ারলাইন কোম্পানি চালু
করেছিলেন জে আর ডি টাটা – নাম দিয়েছিলেন টাটা এয়ারলাইন্স্। টাটাসাহেব নিজে করাচি
টু আমেদাবাদ ভায়া বোম্বাই ফ্লাই করেছিলেন – ১৯৩২ সালে। ১৯৪৬ সালে টাটা এয়ারলাইন্স্
পাব্লিক কোম্পানি হয়ে গেল – নাম হল, এয়ার ইণ্ডিয়া। স্বাধীন হওয়ার ছ বছর পর,
১৯৫৩ সালে এয়ার ইণ্ডিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে দুটি স্বয়ংশাসিত কোম্পানি হিসেবে গড়ে উঠল
- এয়ার ইণ্ডিয়া আর ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্স্। ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্স্ মূলতঃ দেশের
ভিতরের বিমান পরিষেবার জন্যে আর এয়ার ইণ্ডিয়া আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবার জন্যে।
১৯৭০ সালে ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্স্ প্রথম বোয়িং ৭৩৭ বিমান আমদানি করে। আমাদের এই
বিমানটিও ৭৩৭ – একটু বাড়িয়ে নম্বরটা ৭৮৬ করলেও মন্দ হতো না, নিরাপত্তা হয়তো একটু
বাড়ত। কারণ “দীওয়ার” সিনেমার দৌলতে বুঝে গিয়েছি ৭৮৬-র মাহাত্ম্য।
“বিল্লা নাম্বার সাতশ ছিয়াশি”।
ঝাঁপ পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নড়ে চড়ে উঠল উড়ানটা। সুন্দরী
বিমানসেবিকারা ট্রেতে করে বয়ে আনলেন লজেঞ্চুস, প্লাস্টিক পাউচে কানে গোঁজার তুলো
আর মুখ মোছার জন্যে হিমায়িত ওডিকোলনসিক্ত সফেদ টাওয়েল। বাবার পাঠ অনুযায়ী দুটো
একটা একটা করে পাউচ তুললাম আর হাত নিসপিস করলেও মাত্র দুটো লজেঞ্চুস তুললাম ট্রে
থেকে। অথচ আমার পাশে মাইতিবাবু যখন একমুঠি লজেঞ্চুস আর সঙ্গে চার পাঁচটা করে পাউচ
তুলে নিল ট্রে থেকে, আমি লজ্জায় রাঙা হয়ে তাকালাম বিমানসেবিকার দিকে, কিন্তু তাঁর
মুখ ভাবলেশহীন।
উড়ান এসে দাঁড়াল রানওয়ের প্রান্তে, ইঞ্জিনে শব্দ উঠতে লাগল
গোঁ গোঁ করে। এইবার শুরু হবে উড়াল দেওয়ার পালা। প্রচণ্ড বেগে দৌড় শুরু
করে একটা সময় যখন হালকা হয়ে গেল আমার শরীরটা – বুঝলাম উড়ানটা মাটির মায়া ত্যাগ করল। ইঞ্জিনের চাপা গোঁ গোঁ
আওয়াজের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছিল উড়ানের গোটা শরীরটা। অথচ আমাদের
বাড়ির বারান্দায় শালিক পাখিটা যখন সুরেলা শিস তুলে উড়াল দেয়, কি হাল্কা আর সাবলীল!
ওদিকে ভিজিটার্স লাউঞ্জের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মা দুর্গা নাম জপলেন দুবার, তাঁর জোড়া
হাত ঠেকালেন কপালে। দেখতে পেলাম না, কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করলাম।
নিশ্চিন্ত উচ্চতায় উঠে উড়ান যখন ভাসতে লাগল, নিভে গেল সিট
বেল্টের আলো। ক্লিক ক্লিক শব্দে সকলে খুলে ফেলল সিট বেল্টের বাক্ল্স। আর সমবেত
আনন্দে ধূমপায়ীরা ধারিয়ে ফেলল সিগারেট। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল – কিন্তু যেহেতু পাশে
বসে রয়েছেন জীবনের প্রথম বস, কাজেই সংযত রইলাম। আমার পকেটে ছিল স্বল্প দৈর্ঘের
সস্তা সিগারেটের প্যাকেট, আর উড়ানে সকলের হাতেই রাজকীয় আকারের দামি সিগারেট জ্বলতে
দেখলাম। ঠিক করে ফেললাম, এরপর যখন একা একা যাওয়া আসা করব, আমিও ওই প্যাকেটই কিনব
আর ফস ফস করে ধরাতে থাকব দামি সিগারেট!
প্রথমেই এসে গেল অরেঞ্জ জুস। উৎকট স্বাদের এক অদ্ভূত
পানীয়। খুব হাল্কা চুমুকে, যাকে সিপ নেওয়া বলে, নিঃশব্দে পান করতে লাগলাম। কিন্তু
আমার পাশে মাইতিবাবু ওসবের ধার মাড়াল না, চোঁক চোঁক শব্দে নিমেষে গ্লাস খালি করে
তৃপ্তির আওয়াজ তুলল “আআআঃ”। আমাকে জিগ্যেস করল -”আরেকটু নেবেন নাকি, পান্নাবাবু”?
“নাঃ”।
শিউরে উঠে আমি উত্তর দিলাম।
“আমি
আরেকটু নেব। দাঁড়ান, ডাকি- দিদিভাই, ও দিদিভাই, এদিকে আরেকবার জুসটা আনুন না”।
আশে পাশের সকলে মাইতিবাবুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
ভাবলেশহীন মুখে দিদিভাই এসে জগ থেকে ভরে দিয়ে গেল মাইতিবাবুর গ্লাস। কিন্তু আমি যে
কেন লজ্জায় সিঁটিয়ে রইলাম কে জানে? সেদিন উড়ান এটিকেটকে চুলোর দুয়োরে পাঠিয়ে,
মাইতিবাবুর চূড়ান্ত স্মার্টনেসের পরাকাষ্ঠা দেখে মনে মনে ঈর্ষান্বিত হয়েছিলাম।
কিন্তু নিজে আজও পারিনি অমন স্মার্ট হতে – আজও উড়ানের নিশ্ছিদ্র এটিকেটের বাঁধা
পথেই চলছে আমার উড়ান যাত্রা - “এক্সকিউজ মি” আর “থ্যাংকু”-র বাইরে বের হতে পারলাম
না একবারও।
শিলচর তখন ছোট্ট ছোট্ট সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বিমান বন্দর।
ছিমছাম সাজগোজ করা পাহাড়ি কিশোরীর মতো। ভাল লেগে গেল বেশ। মালপত্র হস্তগত করে
বাইরে বের হতেই ছেঁকে ধরল ট্যাক্সিওয়ালারা, “খোই যাইতা”? –“ভদরফুর, হায়লাকান্দি,
খরিমগন্জো...।”
মাইতিবাবু একজনকে জিগ্যেস করল – “ভদরপুর যাইতে নি রে বা...”
“অয়, অয়...”।
দরদস্তুর শেষে আমরা ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। ট্যাক্সি
বিমানবন্দরের চৌহদ্দি পার হয়ে রাস্তায় পড়তে মাইতিবাবুকে জিগ্যেস করলাম, “এটা কি
ভাষা, আপনি মেদিনীপুরের লোক – এত ভালো শিখলেন কি করে”?
“সে কি বাংলা ভাষাই তো – সিলেটি টান আছে একটু এই যা।
বছরখানেক হতে চলল এখানে আমার যাওয়া আসা – শিখে ফেললাম – কিতা মাতরে বা
ড্রাইভারবাই, বালা কইতাম নি”?
“অয় অয় বালা, বালা”। একগাল হেসে ড্রাইভারভাই উত্তর দিল।
মাইতিবাবু আমাকে বলল, “কদিন থাকুন, আপনিও শিখে নেবেন, কোন ব্যাপার নয় – এখানকার
মাটির এমনই গুণ। এখানে একটা মজার কথা চালু আছে – শুনবেন? “কি বা দ্যাশে আইলাম বা,
কি বা মাটির গুণ, একোই গাসে পানহুপারি, একোই গাসে সুন”।
“তার মানে”?
“এখানে দেখবেন লোকজন খুব পান খায় – বলে তাম্বুল।
গ্রামেরদিকে প্রায় সকলের বাড়িতেই সুপুরি গাছ আছে আর আছে তাম্বুলের লতা। এ পান
কিন্তু আমাদের বাংলা পানের মতো চিকন নয় – অনেক মোটা আর খুব ঝাল। এরকমই কোন এক
বাড়িতে সুপুরি গাছ বেয়েই উঠেছিল তাম্বুলের লতা। আর সেই তাম্বুলের পাতায় এক কাক -
যা করে আর কি - সাদা চুনের মতো হেগে রেখেছিল। তাই দেখে কোন বোকাসোকা লোক ওই কথাটা
বলেছিল – কি দেশেই বা এলাম, কি বা মাটির গুণ, একই গাছে পানসুপারি, একই গাছে চুন”!
জানালার বাইরে চোখ রাখলাম – গাড়ি ছুটে চলেছে এক নতুন দেশের
পথ ধরে। এ দেশও আমারই দেশ এবং সেই থেকে শুরু হল সুবিশাল ভারতবর্ষের হাজার বৈচিত্র্যের
মধ্যেও ঐক্যের সন্ধান।
এর পরের রম্যকথা - " পয়লা বৈশাখ "