বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

পয়লা বৈশাখ

 

এর আগের রম্যকথা - " বিচিত্র ঐক্য " 


পয়লা বৈশাখ, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ

    সেই কালে মোকাম কলকেতার নানান অঞ্চলে চড়কের মেলা বসিত। আমাদের শৈশবে কিংবা বাল্যে দেখা আমাদের গেরামের মেলার সহিত তাহার বিস্তর ফারাক। কলকেতার মেলায় অনেক বেশি জাঁকজমক। কাঠের নাগরদোলা। কাঠের হাতিঘোড়ায় বসিয়া বন বন করিয়া ঘুরিবার মেরি-গো-রাউণ্ড। চোখধাঁধানো মনোহারি পসরা কিংবা খাদ্যসামগ্রী, সব ব্যাপারেই কলকেতার মেলা বিশিষ্ট। কাঁচের ও চিনামাটির তৈরি সায়েব-মেম পুতুল। রূপার তবক দেওয়া মিঠা পান। নানান রঙের সিরাপ দেওয়া, বরফ শীতল রঙিন সরবৎ। মালাই কুলফি। যুবা বয়েসে বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়িয়া কলকেতার মেলা বেশ কয়েকবার দেখিয়া অবাক হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহাতে প্রাণের সাড়া পাই নাই। বরং মজা পাইয়াছিলাম অন্যত্র।

    কলকেতার চেতলার হাট মশারি আর মাছের জালের জন্যে বহুদিন হইতেই বিখ্যাত। কিন্তু আমি চেতলার যে মোহজালে মুগ্ধ হইলাম তাহা সংয়ের সাজ। পয়লা বোশেখের আগে ও পয়লা বোশেখের দিন চেতলার সং দেখিতে জন সমাগম হইত বিস্তর। কার্বাইড গ্যাসের চোখধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় বিচিত্র বেশে বেশ কিছু লোক সাজিয়া উঠিত কলকেতার বাবুদের নষ্টামি, আখড়ার মহারাজদের ধ্যাষ্টামি, কূলবধুদের গোপন ভ্রষ্টামি, মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ; এসব নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ তো ছিলই। তাহার উপর আরো থাকিত নির্ভেজাল হাসির উপস্থাপন। বুকফাটা কান্না, দমফাটা হাসি, আহ্লাদে আটখানা, কাজের ভারে কুঁজো। সন্ধ্যার পর জেলেপাড়ার সঙদের সেই মিছিল সমাবেশ, উপস্থিত জনগণের সহিত আমরাও অত্যন্ত উপভোগ করিতাম।

    পয়লা বোশেখের দিন সকালে ভৃত্যের মাথায় বেতের ধামায় লাল শালুমোড়া জাব্দা খাতা, শ্রীগণেশ ও শ্রীলক্ষ্মীর মূর্তি, লক্ষ্মীদেবীর ঝাঁপি লইয়া বাবুদের কেরানীরা দলে দলে আসিতেন কালীঘাটের কালী মন্দিরে। মন্দিরে পুজার ভিড়ে রীতিমতো হট্টগোল উপস্থিত হইত। দাপুটে বাবুদের কেরানীরা অর্থের দাপট দেখাইতে কসুর করিতেন না, তাঁহাদের উৎকোচে মন্দিরের পুরোহিতগণের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যাইত। এই পুরোহিতগণ মাকালীর সহিত সরাসরি যোগাযোগ ঘটাইয়া সম্বৎসরের ব্যবসার সুবন্দোবস্ত করিয়া দিবার আশ্বাস দিতেন। পুজার পর তাঁহারা জাব্দা খাতায় আলতাকালিতে উপরে ‘ওঁমা’, তাহার নিচে ‘শ্রীশ্রীকালিমাতা সহায়’ লিখাইয়া লইতেন। তাহার নিচে স্বস্তিকা চিহ্ন আর একদম নিচের দুই কোণায় আলতায় ডোবানো রৌপ্যমুদ্রার দুই পিঠের মোহর।

    কলকেতা শহরে সে সব মেলা আজিকালি আর তেমন দেখি না। লোকে আজিকালি অন্ধকার ঘরে টিকিট কাটিয়া বায়োস্কোপ দেখে। তাহারা নায়ক নায়িকাদের গান আর মেকি হাসিকান্নায় মজিয়া থাকে। শুনিয়াছি কলকাতার নব্য বাবুরা এখন চড়কের মেলা, সং ইত্যাদির আনন্দকে “ছোটলোকি” বলে। বলে এসব সেকেলে ফক্কুড়ি দেখিয়া সময় নষ্ট করিবার মতো সময় তাহাদের নাই। হবে হয়তো। আমাদের যৌবনে আমরা তো এসব খুবই উপভোগ করিতাম। আজিকালি বয়স হইয়াছে, এ যুগের ছোকরাদের মতিগতি আর বোধগম্য হয় না।  

    আমার গিন্নি পয়লা বোশেকের ছুটির দুপুরে বড়োই তরিবতে রন্ধন করেন। সজনে ডাঁটার শুক্ত, রুই মাছের মুড়ো দেওয়া ভাজা মুগের ডাল, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, পটল-আলুর মাখোমাখো তরকারি, রক্তরাঙা ঝোলের মধ্যে দুইখানি অর্ধগোলক আলু সহ অনেকটা কচিপাঁঠা, কাঁচা আমের পাতলা অম্বল। সবার শেষে মিঠে দধি। এইরূপ আকণ্ঠ মধ্যাহ্ন ভোজের পর, গালে গিন্নির হাতের পান লইয়া, পয়লা বোশেখের দুপুরটি দিবানিদ্রায় অতিবাহিত করি, জানালা দরোজা বন্ধ প্রায় অন্ধকার ঘরে।

    দিবানিদ্রা সারিয়া বারান্দায় যখন বসি, পথের আলো জ্বালাইবার জন্য পুরসভার কর্মচারিরা লম্বা আঁকশি হাতে দৌড়াইয়া চলে। পাড়ার যতো বাড়ির দরোজায় দরোজায় বেলফুলের মালা লইয়া ফিরিওয়ালা ডাক পাড়ে “বেইলফুউউল”। তাহার চিকন কণ্ঠের সুরে ও বেলফুলের সৌরভে প্রথম বৈশাখের সন্ধ্যাটি বড়ো মধুর হইয়া উঠে। তাহার পশ্চাতে আসে মালাইবরফ এবং কুলফি মালাইয়ের ফিরিওয়ালা। পাড়ার বখাটে ছোকরার দল তাহাকে আড়ালে ডাকিয়া সিদ্ধি মিশ্রিত কুলফি মালাই খাইয়া অকারণ হাসিতে পাড়া মাতায় তোলে।

    সন্ধ্যা একটু গড়াইলে, পাটভাঙা ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পড়িয়া রাশভারি মুখে বাহির হই। পায়ের পাম্পশুতে মচ মচ ধ্বনি তুলিয়া যখন হাঁটি নিজের ভারিক্কি চালে নিজেই অবাক হই। গেরামে থাকিতে যাহারা আমাকে ‘আত্তাঁ’ বলিয়া চিনিত, তাহারা আমার এই ‘আত্মারামবাবু’ মার্কা চেহারা দেখিলে কিরূপ ভিমরি খাইত কল্পনা করিয়া, বড়ো আল্লাদ পাই।

    কালেজ স্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজের বিপরীতে কল পাইপের বিপণিগুলির অধিকাংশই আমাদের দেশজ সুহৃদদের মালিকানা। হালখাতা উপলক্ষে এই সব বিপণির উদার হৃদয় মালিকেরা অতিথি আপ্যায়নের বিপুল আয়োজন করিয়া থাকে।

    দোকানের প্রবেশ পথেই একজন কর্মচারী পিচকারি হইতে মাথায় মুখে গায়ে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করিয়া গোলাপজল ছিটাইয়া দেয়। সদ্য গ্রাম হইতে আসিয়া কলকেতা নিবাসী হইবার পর যেবার প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠানে আসিয়াছিলাম, এই ঘটনায় অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছিলাম। বলা নাই কওয়া নাই, খামোখা আমার গাত্রে জল ছিটাইয়া দেওয়া, এ কী ধরনের রসিকতা? সৌভাগ্যক্রমে সেই ক্ষণে বিপণির মালিকপুত্র “আসুন খুড়ামহাশয়” বলিয়া আমার হাতে ঝাউপাতায় মোড়া গোলাপকলি উপহার দিয়া ভিতরে বসাইয়াছিল। নচেৎ সেদিন হয়তো কুরুক্ষেত্র বাধাইয়া নিজেকেই হাস্যাস্পদ করিতাম। বসিবার পর দেখিয়াছিলাম ওই কর্মচারি সকলকেই ওই জল ছিটাইতেছে, ও তাহাতে গোলাপের সুবাস। ক্রোধ প্রশমিত হইলে, নিজ গাত্রেও ওই গোলাপজলের সুবাস উপলব্ধি করিয়া চমকিত হইয়াছিলাম।

    বিপণির ভিতরের প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক পরিবেশ আজ নাই উজ্জ্বল আলোর নিচে ফরাস পাতা, তাহাতে ধবধবে চাদর বিছানো। ফরাসে বসিয়া অশীতিপর এক মুসলিম বৃদ্ধ সানাই বাজাইতেছেন। তাঁহার সহিত তবলায় একজন সঙ্গত করিতেছেন। সেই সানাইয়ের মাঙ্গলিক সুর যেন নতুন বর্ষের শুভদিনের সূচনা করিতেছে। কিন্তু আশ্চর্য, সেই সুরের প্রতি উপস্থিত কাহারো মনোযোগ নাই। সকলেই নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপে ব্যস্ত। সকলের হাতেই কি এক পানীয়ের বোতল, তাহাতে সরু পাইপ বসানো। সেই পাইপে ঠোঁট লাগাইয়া হাল্কা চুমুকে সকলে পানীয়ের মজা লইতেছে। এই পানীয় কি সুরা জাতীয় কিছু? কলকেতার বাবুরা কি প্রকাশ্য সন্ধ্যালোকে নির্লজ্জের মতো মদ্যপান করিয়া থাকে?

    এই সব ভাবিতে ভাবিতে বিপণির মালিক অমিয়ভূষণ মহাশয়, আমার কাছে আসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন, ‘সব ভালো তো আত্তাঁ, কোন রকম সংকোচ করবা না। আরে একি, তোমাকে কোল্ডিংক দেয় নি? অ্যাই ব্যাচা, এদিকে একটা কোল্ডিংক নে আয়। বাড়ির সব খপর ভালো? বাচ্চা পরিবার, সবাই? হে হে হে, খুব ভালো। আরে আসুন আসুন বিপত্তারণবাবু, আজকাল আপনার আর দ্যাকাই পাওয়া যায় না, আমি ওদিকটা একবার দেকে আসি, যেদিকটা না দেকবো, সেকানেই ...বোয়লে না?” অমিয়ভূষণবাবু অন্যদিকে যাইবার পরেই ব্যাচা নামের ছোকরাটি আমার হাতে এক বোতল শীতল পানীয়ের মধ্যে সরু পাইপ ডুবাইয়া দিয়া গেল। অন্যদের দেখাদেখি কায়দা করিয়া আমিও পাইপে অধর চাপিয়া পানীয় টানিয়া লইলাম। স্বাদ মন্দ নয়। স্বাদ ও গন্ধে মদ বলিয়াও মনে হইল না, কারণ ইহার পূর্বে ছোকরাকালে কুসঙ্গে পড়িয়া দু একদিন ব্রান্ডির স্বাদ লইয়াছিলাম।    

    কিন্তু ও কী ও, আমার এ কী হইল? পানীয় গলাধঃকরণের পরই পেটের মধ্যে বিশাল উদ্গারের উদ্গম হইল। আমি রোধ করিতে পারিলাম না, আমার কণ্ঠ হইতে অদ্ভূত এক শব্দ নির্গত হইল। মনে হইল আমার উদরের অজ বালক পুনর্জীবন পাইয়া তাহার মাতার সন্ধানে ডাকিতেছে। আমার আশেপাশে উপবিষ্ট, বিশিষ্ট জনের দুই চারিজন আমার বাণীতে চমকিত হইলেন, ঘাড় ফিরাইয়া আমার আপাদমস্তক মাপিয়া লইলেন। ইহার পর ওই ভুল আর করি নাই, পাইপে হাল্কা টানে অল্প পানীয় পান করিতে লাগিলাম। তাহাতেও ছোট ছোট উদ্গার উঠিতেছিল, কিন্তু আমি সেগুলিকে নাসিকা পথে ছাড়িতে লাগিলাম। তাহাতে নাসিকা জ্বলিতে লাগিল, কিন্তু সম্মান রক্ষা হইল। এমন পানীয় মনুষ্যজাতির সভ্যতায় কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করিবে, বলিতে পারি না।

    অমিয়ভূষণবাবুর বিপণি হইতে দুইখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই বাস্কো মিষ্টান্ন লইয়া বিদায় লইলাম। তাহার পর আরো ছয়খানি পরিচিত বিপণিতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া টানা রিকশয় গৃহে ফিরিলাম। আমার বগলে তখন পাঁচখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই হাতে নয় বাস্কো মিষ্টান্ন। আরো দুইখানি হাত থাকিলে, আরো কয়েকটি বিপণিতে যাইতে পারিতাম ভাবিয়া আক্ষেপ হইল। কিন্তু বিধির বিধানে হাত মাত্র দুইখানি!

    রাত্রের রন্ধন হইতে মুক্তি পাইয়া আমার গৃহিণী আনন্দিতা হইলেন। দুই পুত্র ও দুই কন্যা সহ আমরা সকলে নয়খানি বাস্কো উদরসাৎ করিয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। গৃহিণীর বানানো একখানি পান গালে লইয়া বাহিরের বারান্দায় দাঁড়াইলাম। ভাবিলাম পয়লা বোশেখের মঙ্গলরাত্রি বড়ো আনন্দে যাপিত হইল।

    জানি না কেন এই সময় মনে পড়িল সেই শীর্ণ বৃদ্ধ সানাইশিল্পীর কথা। তাঁহার সানাইবাদনের প্রতি আমাদের কাহারো বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। একদল শূকরের সম্মুখে ছড়ানো মুকুতার মতো তাঁহার শিল্প প্রয়াস তিনি বিতরণ করিতেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁহার নিজের ও পরিবারের উদরপূর্তির প্রত্যাশায়। একজন শিল্পীর, নামজাদা নাই বা হইলেন, এ হেন অবহেলা আমরা না করিলেও পারিতাম।

    পয়লা বৈশাখে নববর্ষের এই শুভ দিনটিতে তাঁহার সানাইয়ের সেই মাঙ্গলিক সুর কলকেতার স্বার্থ সন্ধানী মানুষের অন্তরে এতটুকুও দাগ রাখিতে পারিল না। আগামী কল্য দোসরা বৈশাখ, আর পাঁচটা সাধারণ কর্মব্যস্ত দিনের সহিত এতটুকুও ফারাক থাকিবে না। সকালে গৃহিণীর প্রস্তুত মৎস্যের ঝোল-ভাত নাকে মুখে গুঁজিয়া দপ্তরে যাইব। দিনগত পাপক্ষয় করিতে করিতে আরও একটি বৎসর পার হইয়া জীবনে আরও এক পয়লা বৈশাখ আসিবে, ভাবিতে ভাবিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িলাম মনেও নাই।

-   ০০ –


[আত্মারাম বাগচি মহাশয়ের স্মৃতিকথার আংশিক পরিমার্জিত রূপ “পয়লা বৈশাখ"; বানান ও শব্দ ব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাগচি মহাশয়ের জন্ম প্রাক-স্বাধীনতা যুগে, কর্ম উত্তর-স্বাধীনতার দিনগুলিতে।] 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...