মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬  


 

খট খট আওয়াজে ভল্লার কাকনিদ্রা টুটে গেল। উপুড় হয়ে মাচার কিনারা থেকে দেখল, ব্যাপারটা কি? রামালি রণপা চড়ে ফিরল। তার কাঁধে ছোট্ট একটা ঝোলা। ভল্লা খুশি হল, হতভাগা ভালই রপ্ত করেছে। এরপর ওকে রণপা নিয়ে ছোটাতে হবে। ভল্লা কোন সাড়া না দিয়ে চুপ করে দেখতে লাগল।

রামালি তার কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। ছোট্ট লাফ দিয়ে মাটিতে নামল রণপা থেকে। রণপাজোড়া তার দেখানো ঝোপের মধ্যেই লুকিয়ে রাখল। তারপর তার ঘরের মধ্যে উঁকি দিল। তারপর পুকুরের দিকে গেল। একটু পরে আবার ফিরে এল। ফিরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। বকের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল। ভল্লাকেই খুঁজছে, হতভাগা। পাখির মতো রামালির কার্যকলাপ দেখতে ভল্লার বেশ মজা লাগছিল। শুধু যে মজা লাগছিল তাই নয়, নিজেকে ভগবান বলে মনে হচ্ছিল।

বহুদিন আগে দূরের কোন এক গ্রামের একটি মন্দিরে তাকে রাত কাটাতে হয়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত তাকে মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি। কারণ সে শূদ্র। ভল্লা মিথ্যে করে নিজেকে ক্ষত্রিয় বলতেই পারত। বলেনি। পুরোহিতের দেওয়া প্রসাদ খেয়ে মন্দিরের বাইরে চাতালে শুয়ে রাত কাটিয়েছিল। সেই পুরোহিত তাকে বলেছিল, “জাত-পাত নিয়ে দুঃখ করিসনি, বাপু। এসব তো আর আমরা বানাইনি, বানিয়েছেন ভগমান। তোকে যদি মন্দিরে থাকতে দিই, ভগমান ঠিক দেখতে পাবেন। তিনি ওপর থেকে সবার দিকে সবসময়ই লক্ষ্য রাখেন কিনা? তাঁর বিচারে আমাদের যে নরকে ঠাঁই হবে, বাপু”। দুঃখ করার লোক ভল্লা নয়। সে দুঃখ পায়ওনি।

পরেরদিন সূর্যোদয়ের আগেই তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, এবং দৈবাৎ তার চোখে পড়েছিল মন্দিরের দরজা ফাঁক করে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসছে একটি মেয়ে। মেয়েটির চটকদার চেহারা, চালচলন, পোষাক-টোষাক দেখে, তাকে পতিতা গোত্রের রমণী বলেই মনে হয়েছিল ভল্লার। ব্রাহ্মণী হতেই পারে না নিশ্চয়ই কোন অন্ত্যজবাসিনী।  দেখে হাসি চাপতে পারেনি, হো হো করে হেসে উঠেছিল। তার হাসির শব্দ শুনে বেরিয়ে এসেছিল পুরোহিত ব্যাটাও। ভ্রূকুটি করে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এই সাতভোরে হ্যা হ্যা করে হাসছিস কেন রে, শূদ্দুরের পো?” ভল্লা হাসতে হাসতেই বলেছিল, “আপনার ব্রাহ্মণীটি কিন্তু বেশ পুরুতমশাই। আপনার ভগমান দেখেছেন। চিন্তা করবেন না, আপনার জন্যে নরকে নয়, স্বর্গেই পাকা বাসা তৈরি হচ্ছে...”। পুরুতটা দাঁতে দাঁত চেপে তার বাপান্ত করেছিল, বেশি চেঁচামেচি করতে পারেনি - লোক জানাজানি হওয়ার ভয়ে।          

সেই ভগবানের মতোই দেখছিল ভল্লা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রামালি ঘরে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এল, বড়ো কলসিটা হাতে নিয়ে। ভল্লা জানে ওটা খালি। খালি কলসি নিয়ে রামালি পুকুরের দিকে গেল। এবার নীচেয় নেমে এল ভল্লা। পুকুর থেকে ফেরার আগেই ভল্লা তার কুটিরের সামনে গিয়ে বসল। রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরল। তার একহাতে ভরা কলসি আর অন্য কাঁধে বেশ কিছু শুকনো ডালপালা।

রামালি জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় গেছিলে, ভল্লাদাদা?”

“ঘুমোচ্ছিলাম। তোর রণপার আওয়াজে ঘুম ভাঙল”।

“ঘরে ঘুমোও না? কোথায় ঘুমোও তাহলে?”

“না রে, ঘরে ঘুমোনোর কপাল কী আর আমাদের?”। রামালি উনুনের সামনে ডালপালাগুলো ঢেলে দিয়ে ঘরে গেল কলসিটা রাখতে। বেরিয়ে এসে উনুনের সামনে বসে কাঠকুটোয় আগুন ধরিয়ে, উনুনে গুঁজে দিল। কিছু ডালপালাও গুঁজে দিল তার মধ্যে। ভল্লা বলল, “তুই রান্না চাপাবি নাকি”?

মালসায় জল ভরে ঘরের বাইরে এল রামালি, মালসাটা উনুনের ওপর চাপিয়ে বলল, “কী খাবে? গ্রাম থেকে কিছু আনাজ এনেছি। লওকি, মেটেকন্দ আর কুঁদরি”।

“কোথা থেকে আনলি?”

“কেন আমাদের বাড়ি থেকে? আমাদের বাড়ির পেছনে অনেকটা জায়গা, সেখানে ভালই আনাজ-টানাজ হয়।”

“বলিস কী? তোর কাকি কিছু বলেনি?”

“বলেনি আবার? আমিও বললাম, এ বাড়ি-জমির অর্ধেক ভাগ তো ছেড়েই দিলাম, দুটো আনাজ নিয়েছি...উরে বাব্বা...”, রামালি হাসতে লাগল খুব, হাসির বেগ কিছুটা কমিয়ে বলল, “যা বুলি ছোটাল না, ভল্লাদাদা...যত গাল দেয় আমিও হাসি...”, আবারও হাসতে হাসতে বলল রামালি।

ভল্লা বেশ অবাক হল, রামালির সঙ্গে যেদিন থেকে তার পরিচয়, কোনদিন ওকে হাসতে দেখেনি। সেই ছেলেটা এক রাত্তিরে এমন বদলে গেল কী করে? এই ছেলেটাই সেদিন গভীর শীতলতায় এতদিনের বন্ধুকে নির্দ্বিধায় হত্যা করেছে। তার মুখে চোখে আচরণে কোথাও সে ঘটনার জন্যে কোন গ্লানি নেই। এই যে হাসছে ও, ভল্লার মতো মানুষও আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে...এত সুন্দর সরল হাসি হাসতে পারে ছেলেটা? সাংঘাতিক তো!

“যাগ্‌গে কী খাবে বলো। খিচড়ি বানাবো? তোমার ঘরে দেখলাম, চাল-ডাল আছে। তার সঙ্গে মেটেকন্দ আর কুঁদরি ভাজা...”

ভল্লা উদাস সুরে বলল, “বানা, আজকে তুই যা খাওয়াবি, সব খাবো। এমনিতেই আমি তো হেরে ভূত হয়ে গেছি”।

“কার কাছে”? অবাক হয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল।

“তোর কাছে রে হতভাগা। রণপা জোড়াও গেল, চকচকে একটা বল্লমও গেল”।

“সত্যি, ভল্লাদাদা”? উচ্ছ্বসিত আনন্দে রামালি চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল ভল্লাকে।

ভল্লা তার পিঠে চাপড় মেরে বলল, “এ তো সবে শুরু রে রামালি, এর থেকেও অনেক বড়ো বড়ো কাজ তোকে করতে হবে...। কিন্তু শল্কুরা কখন আসবে”?

“আসছে। ওরা ছজন আসছে। দুপুরের খাওয়ার পর ওদের আসতে বলেছি...” একটু ইতস্ততঃ করে আবার বলল, “তোমার এদিককার অবস্থা তো জানি, ওরা সবাই না খেয়ে এলে, তুমি সামলাতে কী করে?”

ভল্লা হাসল, কিছু বলল না।

রান্না করতে করতে, তাঁতের মাকুর মতো রামালি ঘর-বার করছিল, সে সময় হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে - কেমন করে জানলে আমি রণপায়ে হাঁটা শিখে গেছি?”

ভল্লা বলল, “ঘুম ভাঙল তোর রণপায়ের খট খট আওয়াজে… তারপর ভগবানের মতো ওপর থেকে সব দেখলাম…”।

“ভগবানের মতো? তার মানে”?

ভল্লা তার সেই মন্দিরের পুরোহিত আর তার ভগবানের গল্পটা রামালিকে শোনালো। রামালি হাসতে হাসতে বলল, “তুমি খুব বেঁচে গেছ ভল্লাদাদা। আমাদের এদিককার পুরোহিতরা, রেগে গিয়ে পৈতে ছিঁড়ে কাউকে অভিশাপ দিলে, সে নাকি সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। চিন্তা করো, লোকটা অভিশাপে মরল বটে, কিন্তু বেঁচে গেল তার যাবতীয় শ্মশান-খরচ!”।

রামালি হাসল না, কিন্তু তার কথার ভঙ্গীতে ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে। কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “অনেকদিন পর এমন হাসলাম, বুঝলি রামালি। সারাদিন নানান কূটকচালি চিন্তা, লোকজনের বজ্জাতি সামলাতে সামলাতে হাসি উপে গিয়েছিল। পুকুরে জল খেতে গিয়ে দেখতাম, মুখখানা দিন-কে-দিন হাঁসের পোঁদের মতো হয়ে উঠছে”।

অনেক হাসাহাসি হল, ফচকেমি হল। ভল্লা এবার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল,”গ্রামের পরিস্থিতি কেমন?”

রামালি খিচড়ির মালসা নামিয়ে, উনুনে একটা সরা চাপিয়ে একটু তেল ঢালল, বলল, “আমি তো তেমন কিছু বুঝলাম না, ভল্লাদাদা। আমাদের দলের ছেলেরা ছাড়াও বড়দের সঙ্গেও দেখা হল। কারও মনে তোমার ওপরে কিংবা আমাদের ওপরে কোন রাগ আছে বলে মনে তো হল না। বরং জিজ্ঞাসা করল, শুনলাম তোর কাকি তোকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে? তা এখন রয়েছিস কোথায়?” গরম তেলে, জিরে আর শুকনো লংকা ছেড়ে কাঠের হাতা দিয়ে নাড়তে নাড়তে রামালি বলল, “বললাম, বাড়ি থেকে কাকি তো আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে – অতএব রয়েছি আরেকজন নির্বাসনের সাজা পাওয়া অপরাধীর সঙ্গে”। ভাজা হয়ে যেতে রামালি সরা থেকে গরম তেলটা ঢেলে দিল খিচড়ির মালসায় – ফোড়নের দেওয়ার শব্দে আর রুচিকর গন্ধে ভরে উঠল বনস্থলী।

“এতদিনে আমাদের এই জঙ্গলের বাসাটাকে গেরস্থ বানিয়ে তুললি রে, রামালি। খিচড়িতে আবার ফোড়ন!”

রামালি কোন উত্তর দিল না, সরাটাকে আবার উনুনে বসিয়ে আরো তেল দিল, উনুনে গুঁজে দিল আরও কিছু কাঠ। তেল গরম হতেই তাতে ছেড়ে দিল কুঁদুরির ফালিগুলো। একটু নুন, আর হলুদগুঁড়ো দিয়ে, বার কয়েক নাড়াচাড়া করে, মাটির থালা চাপা দিয়ে দিল সরার ওপর। তারপর বলল, “গ্রামের বয়স্কদের মধ্যে দু-তিনজন অনেক কথাই বলছে, তোমার নামে, আমাদের নামে। কিন্তু বাকি সবাই, আমার মনে হয়, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। ওরা হয় ওদের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারেনি। নয়তো কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারেনি”।

“কিন্তু খুব শিগ্‌গির বুঝতে পারবে। আজকে না হলেও, কালকে রক্ষীদের দলবল গাঁয়ে আসবে, জঙ্গলের ঢোলের মতো

“ঢোলটা কী বস্তু ভল্লাদাদা?”

“ওরে বাপরে, বস্তু না রে, জন্তু। আমাদের রাজ্যের মাঝের বিষয়গুলোতে গভীর জঙ্গল তো! সেখানে তারা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। এক একটা দলে পঁচিশ- তিরিশটা – ওদের সামনে পড়লে কেঁদো বাঘও লেজ গুটিয়ে পালায়”।

“আচ্ছা? বাঘও তাদের ভয় পায়? তবুও বলব, রাজার রক্ষীদল ঢোল হোক বা হায়না, আমার মনে হয় গ্রামের মানুষ মনে মনে প্রস্তুত হয়ে উঠছে। বললে বলবে, আমি তোমার আমড়াগাছি করছি... কিন্তু একথা সত্যি যে, তুমি এই গ্রামের নির্জীব মানুষগুলোর মনে কম-বেশি একটা আলোড়ন তুলে দিয়েছ। আগে রক্ষীরা এসে ক্যাঁৎক্যাঁৎ করে লাথি মারলেও, এরা যেন কৃতার্থ হয়ে যেত। তারা বিশ্বাস করত আমাদের পালন করতে ভগবান, রাজা বানান। সেই রাজার রক্ষী মানে তারাও ভগবানেরই অংশ। অতএব রক্ষীদের লাথি ছিল, প্রকৃতপক্ষে ভগবানের আশীর্বাদ – বাপ-মা যেমন ছেলেমেয়েদের পেটায়।  কিন্তু কিছুদিন দেখছি, বয়স্ক মানুষদের মনে সেই বিশ্বাস কিছুটা টুটেছে – তাদের মনেও কেমন যেন ধন্দ জাগছে”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে রামালির কথা শুনছিল। আজ শেষরাত থেকে তার যত পরিচয় সে পাচ্ছে, তার মতামতের গুরুত্ব ভল্লার কাছে ততই বাড়ছে। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজবুড়োর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“নাঃ। বোধহয় বাড়িতেই ছিল। ভাগ্যে দেখা হয়নি, হলেই এক ঝুড়ি উপদেশ ঝাড়ত”।

“কবিরাজবুড়ো আর তোদের গ্রামপ্রধান জুজাক। তারা তো আমার বিরুদ্ধেই সবাইকে তাতাচ্ছে!”

ভল্লার কথায় রামালি হাসল। সরার ঢাকা সরিয়ে কুঁদরিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে সামান্য জলের ছিটে দিল।  সরার মুখ আবার ঢেকে দিয়ে বলল, “তাতাবে না? এতদিন গ্রামপ্রধান আর কবিরাজের কথা সকলে বেদবাক্যের মতো মানত। এখন তারা তোমার কথা শুনছে। আমরা – গ্রামের ছেলেপুলেরা - তোমার কথায় উঠছি বসছি। তাদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে... এত সহজে তারা ছেড়ে দেবে? রাখালের হাত থেকে পাঁচন-বাড়ি কেড়ে নিলে – তার আর থাকল কি?”

ভল্লা আবারও অবাক হল। এভাবে তো সেভাবেনি! এভাবে চিন্তা করলে, জুজাক এবং কবিরাজের আচরণের যুক্তি মেলে বৈকি! আরেকটু স্পষ্ট করার জন্যে ভল্লা বলল, “তার মানে?”

“এতদিন আমরা ছিলাম, ছাগল-ভেড়ার পাল। ওরা দুজন ছিল আমাদের রাখাল। আমরা ভাবতাম, ওরাই বুঝি আমাদের রক্ষাকর্তা। তুমি এসে বোঝালে আমাদের এবং ওই রাখালদেরও প্রকৃত প্রভু হল রাজার আধিকারিক আর তার রক্ষীরা। ওদের হাতে কিস্‌সু নেই। তোমার বিরুদ্ধে ওরা আমাদেরকে তাতাবে না তো, কী করবে?”

রামালি কুঁদরির সরা নামিয়ে, অন্য এক সরায় জল নিয়ে উনুনে চাপাল। তার মধ্যে ছেড়ে দিল মেটেকন্দর বেশ কিছু টুকরো। উনুনের গর্তে বেশ কিছু শুকনো পাতা আর ডালপালা গুঁজে, আগুনটা উস্কে দিয়ে বলল, “কখন খাবে ভল্লাদাদা? আমার রান্না কিন্তু শেষের দিকে। চান করে খেতে বসলেই হল”।

রামালির কথাগুলোই চিন্তা করতে করতে ভল্লা বলল, “তুই যা, চান করে আয়”।

“ঠিক আছে, তাই যাই। তাহলে তোমাকে একটু লক্ষ্য রাখতে হবে, সরার জল যেন শুকিয়ে না যায়, আর উনুনের আগুন যেন ঝিমিয়ে না যায়”।

খালি কলসি এবং আরও কিছু বাসনকোসন নিয়ে রামালি পুকুরে গেল। ভল্লা গাছের ছায়ায় বসে এক মনে উনুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তলায় তলায় আগুন জ্বলছে। সেই তাপে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হচ্ছে মানুষজনের মন। 

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...