শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


"@শুধু _তুই .কম" উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১


২য় পর্ব 

ছোটবেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুনেত্রদের বিরাট পরিবারের একত্র জমায়েত হতো তাদের দেশের বাড়িতেইকাজেকর্মে, পুজোপার্বণের অনুষ্ঠানে তাদের দেশের বাড়িটা জমজমাট হয়ে উঠত পিসতুতো মামাতো খুড়তুতো অনেক ভাইবোনদের হৈ চৈ হট্টগোলে। সুনেত্ররা দুভাই – বোন নেই আর ওদিকে সুকন্যারা দু বোন – কোন ভাই নেই। কাজেই সুনেত্র আর সুকন্যার বাড়তি ঘনিষ্ঠতা সকলেরই চোখে পড়ত। একটু বাড়তি খুনসুটি, একটু আলাদা রকমের পিছনে লাগা। এরকম হতেই পারে, অনেক ভাইবোনের মধ্যে এমন একটু পক্ষপাতিত্বের ভালো লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেভাবে কিছু মনেও হয়নি কোনদিন।

সেবার ছোটকার বিয়ের সময় তাদের পরিবারের জমায়েতটা খুব জমে উঠেছিল। ওরকম আনন্দ আর হুল্লোড়ময় জমায়েত আর কোনদিন হয়নি তাদের পরিবারে। এরপরেও আরেকবার জমায়েত হয়েছিল ঠিকই – কিন্তু সেটা সুনেত্রর ঠাকুমার মৃত্যুর পর তাঁর কাজে। সেটা তো কোন আনন্দ অনুষ্ঠান নয়। কাজেই ছোটকার বিয়েটাই তাদের দেশের বাড়ির সর্বশেষ আনন্দ সম্মিলন বললে ভুল বলা হয় না।  সুনেত্র তখন উণিশের কোঠায়। স্কুলের গণ্ডি ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছে - মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ার। সে তখন কৃতী ছাত্র আর হবু ডাক্তার হিসেবে পরিবারের সকলেরই চোখের মণি। আগে থেকেই পুত্রহীনা পিসিমার তার প্রতি আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল, সেটা আরো বেড়ে গিয়েছিল সুনেত্রর এই সাফল্যে।

সেবার সুকন্যার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তার দুই আঁখিতে সুনেত্র হদিস পেয়েছিল অদ্ভূত এক অনুভবের। সুকন্যার সঙ্গে ছেলেমানুষী খুনসুটি করতে এবারে আর তার একটুও ইচ্ছে হচ্ছিল না। তার মনে হয়েছিল সুকন্যা অন্ততঃ তার সঙ্গে একটু ধীর স্থির হোক, বাচালতা কম করুক আর তার চোখের তারায় নেমে আসুক গভীর আলোর উদ্ভাস। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি, সুকন্যা আগের মতোই চঞ্চল আর হাল্কা হাসির পিছনে লাগাতেই ব্যস্ত ছিল সারাটাক্ষণ

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতে সকলেই ফিরে গিয়েছিল নিজের নিজের জায়গায়। সুনেত্রও তার হস্টেলে ফিরে গিয়েছিল। সারাটাদিন ক্লাসের ব্যস্ততার পর হস্টেলে ফিরে গ্রে”জ অ্যানাটমির বিশাল বইয়ের পৃষ্ঠায় সে চোখ রাখত ঠিকই, কিন্তু পড়া হত না এক লাইনওতার মনে আসত সুকন্যাকে।  অবুঝ এক রাগ হত তার মনে, সুকন্যা কেন বুঝল না, সুকন্যা কেন সাড়া দিল না তার অনুভবে। সুকন্যা এতটা অবুঝ কেন? কেন সে বুঝতে পারল না, সুনেত্র তাকে বিশেষভাবে পেতে চেয়েছিল! এরকম ভাবনা তার যেমন হত, তেমনই আবার এক পাপবোধও উঠে আসত তার মনে। পিসিমা কী ভাববেন, সুনেত্রর মা কী ভাববেন? একথা যদি তাঁরা জানতে পারেন তাঁরা কি “ছিঃ” বলবেন না। বলবেন না, “সুনু, তোকে যে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, বাবা, শেষ অব্দি তুই এমন করলি”? দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র ভাবত – “এই ভালবাসা গোপনই থাক তার অন্তরে, সুকন্যা বোঝেনি সে এক দিক থেকে ভালই হয়েছে”। মা ও পিসিমার বিশ্বাস নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার মানে হয় না কোন।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। সুকন্যার প্রতি অস্ফুট ভালোবাসার সঙ্গে মাখামাখি সুপ্ত এক পাপবোধ - দুটোই জিইয়ে নিয়ে সুনেত্র কাটিয়ে দিতে পেরেছিল বছর দুয়েক। সেবার সুকন্যা হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় তাদের বাড়িতে এসে ছিল বেশ কদিন। সুনেত্র তখন হস্টেলে। বাড়ি থেকে মা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন, তার মধ্যেই সুকন্যাও লিখেছিল। চিটিটা এরকম,   

 

“কল্যাণীয়েষু,

স্নেহের সুনু,

পত্রপাঠ কেমন আছিস জানাবিঈশ্বরের নিকট তোর সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস

তোর লেখাপড়ার চাপ কেমন জানাবিলেখাপড়ায় একদম ফাঁকি দিবি না। মনে রাখিস এখন তুই আর বাড়িতে নেই। কাজেই পড়তে বসার জন্যে আমি আর নিত্য তাগিদ তোকে দিতে পারব না। এখন তোকেই নিজের ভালো মন্দ বুঝে চলতে হবে। মন দিয়ে নিয়মিত লেখাপড়া করিসতাই বলে বেশি রাত্রি জাগিস না। রাত্রি এগারোটার পর আর পড়বার প্রয়োজন নেই। পরেরদিন কলেজের ক্লাস করাও একান্ত জরুরি মনে রাখিস

খাওয়াদাওয়া সময়মতো নিয়মিত করবিহস্টেলের রান্না তোর মনঃপূত হয় না নিজের কাছে বাটার, পাঁউরুটি এনে রাখবি। গতবার যে আমের জেলি নিয়ে গেছিলি সেটা কি ফুরিয়ে গেছে? এবার বাড়ি এলে আবার দেব, চিন্তা করিস না।

কদিন হল সুকু এসে আমাদের কাছে রয়েছে। বলছে ওর পরীক্ষা মোটামুটি হয়েছে। রেজাল্ট বের হলেই বোঝা যাবে – কেমন হয়েছে। দিনরাত পায়ে পায়ে ঘুরছে, আর বক বক করছে - তোর কথা খুব হয়।

যদি লেখাপড়ার খুব ক্ষতি না হয়, সুকু থাকতে থাকতে একবার আসতে চেষ্টা করিস। দু” একদিন থেকেই চলে যাবি। মেয়েটা সারাদিন আমার সঙ্গে একঘেয়ে কাটায় – তুই এলে খুশি হবে।

আজ আর বেশি লিখব না, সুকুর জন্যে জায়গা রাখতে হবে, ও কিছু লিখবে বলছে।

ভালোবাসা নিস, আদর নিস। সাবধানে থাকিস।

ইতি

আশীর্বাদিকা মা।

 

কি ডাকবাবু,

এখনও তো পুরো ডাক্তার হও নি, তাই ডাকবাবু ডাকলাম। পুরো হলেই তারটা জুড়ে দেব। সে তার, বিনার তার না ইলেকট্রিকের তার সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু এই যে আমি হায়ার সেকেণ্ডারির মতো কঠিন এক পরীক্ষা দিয়ে তোমাদের বাড়ি থানা গেড়েছি আজ প্রায় দিন চারেক হতে চলল, তোমার টিকি দেখা যাচ্ছে না কেন? দেশে কি আর কেউ ডাক্তার হচ্ছে না নাকি? নাকি ওখানে কোন ডাক্তারনির কুনজরে পড়েছ। বাড়ির কথা মনেই পড়ছে না? আমার মতো পচা মেয়ের কথা না হয় নাই শুনলে, মামীমার কথাটা তো ভাবতে হয় নাকি? চটপট চলে এসো দেখি কদিনের জন্যে, তোমার চুলের মুঠি আর কানের জন্যে আমার হাত একদম নিসপিস করছে। তাই বলে আবার ভয় পেয়ো না যেন। “ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না, সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব নামনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই, তোমায় আমি চিবিয়ে খাব, এমন আমার সাধ্যি নেই”

তোমাকে অবিশ্যি কচমচিয়ে চিবিয়ে খাওয়াই যেত, যদি তুমি অখাদ্য না হতে,

ইতি তোমার সুকু”।

শুক্রবার দুপুরে বাস ধরে ধর্মতলা, সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে সুনেত্রর রাত হয়ে গেল। শনিবারটা থেকে রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বাস ধরে হস্টেলে ফিরে এসেছিল সুনেত্র। কিসের জন্যে গিয়েছিল সুনেত্র শুধুমাত্র মায়ের ডাকে? নাকি দোলাচলে থাকা তার মনের মধ্যে, ভালোবাসার পাল্লাটাই ভারি কিনা সেটা পরখ করতে গিয়েছিল? নাকি খুঁজতে চেয়েছিল সুকুর মধ্যেও কোন নতুন ভাবনার সঞ্চার?

শুক্রবার রাত্রে বাবা, মা, দাদা সকলেই ছিলেন।  হস্টেলে থাকা এবং খাওয়া নিয়ে মায়ের জেরার জবাব দিতেই জেরবার সুনেত্র। সেদিন তাই কথাবার্তা হল না। কিন্তু সুকন্যার চোখে এবার অদ্ভূত এক আলো আবিষ্কার করেছিল সুনেত্র। যে আলোর সন্ধান সে করেছিল সেই ছোটকার বিয়ের সময়, সেদিন ছিল না - আজ আছে। কিসের যেন সংকোচ - সরাসরি কথা বলতে পারছিল না তারাব্যাপারটা  মায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি, মা বলেছিলেন, “কি ব্যাপার রে তোদের? এই এত ভাব, এত ঝগড়া, এখন আবার কোন কথাবার্তা বলছিস না”?

“মামীমা, ডাক্তার হলে না, ছেলেদের লেজ গজায়, তাই কথাবার্তাও কম বলে”মা আর বাবা খুব হাসলেন। তার দাদা সুমিত্রও।

সুনেত্র অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কী কথা বলব? কী চিঠি লিখেছে দেখনি, মা? আমাকে বলেছে ডাকবাবু, পুরো ডাক্তার হলে নাকি আমার তারটা ও জুড়ে দেবে। সে তার বীণার না ইলেকট্রিকের সে পরে দেখা যাবে। বীণার বানানটা কি জানো – লিখেছে বএ হ্রস্বই, দন্ত্য নএ আকার...”। সুনেত্র ছাড়া সকলেই খুব হাসল।

সুকন্যা লাজুক হেসে বলেছিল, “এঃমা। বীণা বানানটা ভুল হয়েছিল বুঝি, তাহলে ঠিক বানানটা কি”? সুনেত্রর দাদা সুকন্যার মাথায় হালকা টোকা মেরে বলেছিল, “বএ দীর্ঘঈ মূর্ধ্য ণএ আকার – হ্যারে, হায়ার সেকেণ্ডারিতে পাস করতে পারবি তো”?

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


ভীষ্মের কৃষ্ণবন্দনা ও দেহত্যাগ

সূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরার উদ্যোগে ভেঙে পড়লেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁর মন ধর্ম থেকে বিচলিত হয়ে গেল।

তিনি স্নেহ ও মোহের বশে বিলাপ করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না। আমি ভীষণ পাপ করেছি। এই যুদ্ধে আমি কত ব্রাহ্মণ, বন্ধু, জ্ঞাতি, ভাই, গুরু এবং পিতৃতুল্য ব্যক্তিকেও হত্যা করেছি। হাজার হাজার বছর নরকবাসেও আমার এই পাপমুক্তি হবে না। আমি তো কোনদিনই রাজা ছিলাম না, হে কৃষ্ণ। অতএব, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে এই যুদ্ধ করেছি, তাও বলা চলে না। আমি এই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র রাজ্যলোভে। এই যুদ্ধে আমি বহু নারীর স্বামী, পুত্র, ভ্রাতা কিংবা পিতাকে হত্যা করে, তাদের গৃহস্থ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন শাস্ত্রকথায় আমার আর বিশ্বাস নেই। কাদা দিয়ে যেমন দূষিতজলকে শুদ্ধ করা যায় না, তেমনি অশ্বমেধের যজ্ঞে ঘোড়াকে আহুতি দিলেই, এতগুলি নরহত্যার পাপ খণ্ডন হতে পারে না

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে, কুরুক্ষেত্রে দেবব্রত ভীষ্ম যেখানে শরশয্যায় শুয়ে আছেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন সমবেত মুনি, ঋষি ও পাণ্ডবদের চার ভাই। ভরতবংশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখার জন্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, বৃহদশ্ব, ভরদ্বাজ, অনেক শিষ্য নিয়ে পরশুরাম, বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম, অত্রি, কৌশিক, সুদর্শন, শুকদেব, কশ্যপ, আঙ্গিরস। সেখানে আমিও সেদিন উপস্থিত ছিলাম। সকল মুনি ঋষিদের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে ভীষ্মের চোখে জল চলে এলতিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সকলকে প্রণাম জানালেন। বন্দনা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই মহামতি ভীষ্মকে প্রণাম করে তাঁর পাশে বিষণ্ণ মুখে বসলেন।

তাঁদের ম্লানমুখে বসে থাকতে দেখে, মহামতি ভীষ্ম স্নেহস্বরে বললেন, হে পাণ্ডুর পুত্রেরা, সারা জীবন তোমরা ব্রাহ্মণ, ধর্ম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেও, এমন বিষাদগ্রস্ত কেন? মহাবীর পাণ্ডু যখন মারা যান, তোমরা তখন শিশুমাত্র। বধূমাতা পৃথা তোমাদের মানুষ করার জন্যে কি কষ্টই না সহ্য করেছেন! এসবই ঘটেছে কালের নিয়মে। কালের নিয়মেই জীবের সুখদুঃখের দিন আসে আবার চলেও যায়। তোমাদের সঙ্গে আছে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবল, ভীমের বাহুবল, অর্জুনের অস্ত্রবল আর সবার উপরে আছেন সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণের মিত্রবল। এর চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে?

হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমাদের বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমিই যোগ্য রাজা এবং রাজ্য চালনায় তুমি যথেষ্ট দক্ষ। এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন, মনে এই বিশ্বাস রেখে তুমি প্রজাপালন করো। তোমাদের একান্ত মিত্র এই শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম ঈশ্বর, তাঁর প্রতি ভক্তি রেখে তোমরা নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করো। এই শ্রীকৃষ্ণের মনের কী ইচ্ছে, সে কথা তিনলোকের কেউই বুঝতে পারেন না, তোমরা কী করে বুঝবে? ইনি যে এখন যাদবদের মধ্যে যাদব হয়েই রয়েছেন, এ কথা খুব কম লোকেই জানেন। একথা জানেন দেবর্ষি নারদ এবং কপিলমুনি, আর কয়েকজন। ইনি সকলের আত্মা, ইনি সকলকে সমান ভাবে দেখেন। এঁনার মনে অহংকার নেই, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তাঁকে তোমরা সাধারণ মামাতো ভাই মনে করেছ। ভালোবেসেছ, বিশ্বাস করেছ, ভরসা করেছ। যখন যে কাজে তোমরা ওঁনাকে নিয়োগ করেছ, উনি বিনা দ্বিধায় সে কাজ করেছেন। কখনো তোমরা সম্মানীয় মন্ত্রী হিসেবে ওঁনার মন্ত্রণা নিয়েছ। কখনো রাজদূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঠিয়েছ। আবার রথের সামান্য সারথিপদেও তোমরা ওঁনাকে নিযুক্ত করেছ! লক্ষ্য করে দেখ, ওঁনার মনে উঁচু কাজ, নীচু কাজ এমন কোন দ্বিধা নেইওঁনার দৃষ্টিতে সবাই সমান; আপন-পর, শত্রু-মিত্র, উঁচু-নীচু কোন ভেদ নেই”

[এইখানে মহামতি ভীষ্ম ভারতের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। ভারতের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়রূপে বিরাজও করেন।]              

মহামতি ভীষ্ম সামান্য বিরামের পর, শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আবার বললেন, “হে পাণ্ডুর পুত্রগণ, তোমরা ওঁনার মহিমা উপলব্ধি করো যদিও আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের, তাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছে এসেছেন। উনি জানেন আমি ওঁনার একান্ত ভক্ত এবং আমি আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছিতাই ভক্তের প্রতি একান্ত করুণায়, উনি নিজে এসেছেন আমায় দেখা দিতে! আমি তোমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল জেনে উনি তোমাদেরকেও এখানে নিয়ে এসেছেন। এই যুদ্ধের কারণে তোমরা যে মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছ, আমার সান্নিধ্যে সে সব মুছে যাক, এও ওঁনার মনের ইচ্ছা। 

হে কৃষ্ণ, তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আর তোমার ঐ করুণাঘন দৃষ্টিতে আমি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম হে কৃষ্ণ, আমি ধন্য, আমি কৃতার্থ, পরম আনন্দে আমি আপ্লুতআমার একটাই নিবেদন, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু আসে, তুমি আমার এই শরশয্যার পাশে প্রতীক্ষা করো, আমি দু চোখ ভরে তোমায় যেন দেখতে পাই”

এরপর মহামতি ভীষ্ম মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম, স্ত্রীধর্ম, ভগবৎ ধর্ম এবং আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিলেন। এই সব আলোচনা হতে হতেই মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর সময় উত্তরায়ণের কাল ঘনিয়ে এল। কথাবার্তা শেষ করে মহামতি ভীষ্ম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে এবং সমস্ত মন প্রাণ তাঁকেই সমর্পণ করলেন।

কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর তিনি আবার বললেন, “হে যাদব শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান পরমানন্দ স্বরূপ। আমি তোমাতে আমার কামনাহীন মতি সমর্পণ করলাম। হে অর্জুনের সারথি, তোমার তমালকান্তি অপরূপ দেহে নতুন সূর্যের মতো উজ্জ্বল পীত বসন অপূর্ব মানিয়েছে। তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। হে কৃষ্ণ, তোমার প্রতি আমার অহৈতুকি ভক্তি যেন সর্বদা অচল থাকে, এই প্রার্থনা করি।

হে কৃষ্ণ, যুদ্ধের সময় তুমি অর্জুনের রথে ছিলে। আমার ছোঁড়া তিরে তোমার গায়ের কবচ বার বার ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তোমার চুলের থেকে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো মিশে তোমার মুখে অদ্ভূত আলপনা সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার।

হে কৃষ্ণ, বন্ধু অর্জুনের কথায়, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের দুই পক্ষের মাঝখানে তুমি রথ স্থাপনা করেছিলে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রোণ আর আমাকে দেখে, বিষণ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধে বিরত হয়েছিল, তুমি ওকে পরমাত্মা তত্ত্ব উপদেশ দিয়ে ওর মোহ দূর করেছিলে। আর উপদেশ দেওয়ার সময়, তোমার নিষ্ঠুর কালদৃষ্টি দিয়ে আমাদের আয়ু নাশ করেছিলে।

হে মধুসূদন, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এই যুদ্ধে তুমি নিজে অস্ত্র ধরবে না। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আমি অস্ত্র ধরাবোই। আমার তিরের আঘাতে অর্জুন যখন ব্যতিব্যস্ত, অস্থির। তুমি হঠাৎ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে এলে মাটিতে, তারপর দুই হাতে রথের চাকা তুলে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো দৌড়ে আসছিলে আমাকে হত্যা করতে। আমার তিরের আঘাতে তোমার কবচ ছিন্নভিন্ন হল, তোমার শরীর হল রক্তাক্ত। তবু তোমার কি ক্রোধ! তোমার পায়ের চাপে তখন মাটি কাঁপছে থর থর করে, তোমার গায়ের উড়নি উড়ে গেল কোথায়। লোকে বলে তুমি অর্জুনের পক্ষ নিয়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে। আমি জানি হে নাথ, তুমি তোমার ভক্তের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যেই নিজের প্রতিজ্ঞাও বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেভক্তের প্রতি তোমার এই করুণার কোন তুলনা হয় না, হে মধুসূদন।

হে কৃষ্ণ, অর্জুনের রথে ঘোড়ার লাগাম আর চাবুক হাতে তোমার সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি, এখনো আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। সীমাহীন তোমার ঐশ্বর্য, অনন্ত তোমার লীলা। হে জনার্দন, আমার শেষের সময় ঘনিয়ে এল, এখন দয়া করে তোমার চরণ কমলে স্থান দাও  বর দাও, তোমাতে আমার যেন অবিচল ভক্তি থাকে চিরদিন”

মহামতি ভীষ্ম এইভাবে, তাঁর মন, বাক্য, কর্ম ও বৃত্তির সমাপ্তি করলেন। তারপর নিজের আত্মাকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় পড়ে রইল তাঁর নশ্বর দেহ।  যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই এবং উপস্থিত ঋষি মুনিরা সমবেত ভাবে পবিত্র সেই মরদেহের সৎকার করলেন।

মহামতি ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টির পর সকলে হস্তিনাপুর নগরে ফিরে এলেন। সেখান থেকে সমবেত ঋষি, মুনিরা ফিরে গেলেন তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে। যুধিষ্টির জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র ও পুত্রশোকে দুঃখিনী গান্ধারীকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, তারপর ধৃতরাষ্ট্র ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করে, যথা বিধি রাজসিংহাসনে বসে প্রজাপালন শুরু করলেন”    


শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরা

শৌনক বললেন, “হে সূত, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শত্রুদের বধ করে অনুজদের সঙ্গে কিভাবে রাজ্যপালন করলেন, সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “জ্ঞাতিবিরোধের আগুনে কুরুবংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার পর, লোকপালক শ্রীহরি পরীক্ষিতের প্রাণ রক্ষা করে সেই কুরুবংশকেই আবার অঙ্কুরিত করলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে আবার প্রতিষ্ঠা করে পরমপ্রীতি লাভ করলেন। মহামতি ভীষ্ম ও শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠিরের চিত্তে আবার দিব্যজ্ঞানের উদয় হল এবং তাঁর মন থেকে “আমিই এই যুদ্ধের কর্তা”, “আমিই সকল জ্ঞাতিহত্যার জন্য দায়ী” এই ভ্রান্ত মোহ দূর হয়ে গেল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করে, সকল ভ্রাতাদের সঙ্গে সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তাঁর রাজ্যে মেঘ সুষ্ঠু বৃষ্টি উপহার দিল, পৃথিবী প্রচুর শস্যশালিনী হয়ে উঠল এবং গাভীরা প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করল। নদী, সমুদ্র ও পর্বত সকলেই সুস্থ জীবনের অনুকূল হয়ে উঠল। অরণ্যের বনষ্পতি, লতা ও ওষধি প্রচুর ফল ও পুষ্পে সুশোভন হয়ে উঠল। দেশের রাজা অজাতশত্রু হওয়ার কারণে, জীবের মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ত্রিতাপ দূর হয়ে গেল।          

অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়সখা পাণ্ডব ও ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থেকে, সকলকে পরিতুষ্ট করে, যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। তিনি যেদিন দ্বারকার উদ্দেশে রওনা হলেন, হস্তিনাপুরের সকল নর নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠল। মহারাজ যুধিষ্ঠির ও চার ভাই তাঁকে বিদায়কালে আলিঙ্গন করলেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা, গান্ধারী, সত্যবতী সকলেই তাঁর আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে ব্যাকুল হলেন। ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, আচার্য ধৌম্য সকলেই অশ্রুসজল চোখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শ্রীকৃষ্ণকথা ভক্তিভরে একবার মাত্র শুনলে তাঁকে আর ভোলা যায় না। সেই শ্রীকৃষ্ণকে হস্তিনাপুরবাসী এতদিন দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তাঁর স্পর্শও পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের এই বিদায়ক্ষণটিকে সহ্য করা কীভাবে সম্ভব?

শ্রীকৃষ্ণ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পদব্রজে চললেন নগরের রাজপথে। পথের দুপাশের সুন্দর বাড়িগুলির ছাদ থেকে পুরনারীগণ তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি নিবেদন করতে লাগলেন। পথের দুপাশে জোড়হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, সব বয়সের শহরবাসী। বিদায়কালে চোখের জলে যদি তাঁর কোন অমঙ্গল হয়, সেই ভয়ে পুরনারীরা কষ্ট হলেও চোখের জল সংবরণ করলেন।

তারপর তিনি তাঁর  রথে উঠলেন। তাঁর মাথায় সাদা ছাতা ধরলেন তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন। সে ছাতার দণ্ড মণিময়, ছাউনি মুক্তামালায় সাজানো। উদ্ধব আর সাত্যকি তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করতে লাগলেন। শুভক্ষণে চারদিকে বেজে উঠল শাঁখ, মৃদঙ্গ, ভেরী, ঘন্টা, দুন্দুভি।  শ্রীকৃষ্ণের রথ চলতে লাগল, কিন্তু গতি খুব ধীর। তাঁকে বিদায় দিতে, শহরের রাজপথ জনাকীর্ণতাঁর মুখে মোহন হাসি, সকলের দিকে তাঁর করুণাঘন দৃষ্টিসুন্দর রথের ওপর তাঁর অপরূপ মনোহর রূপের দিকে, নারী পুরুষ সকলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

তাঁর কানে এলো, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুরুনারীদের আলাপ, “ওলো, ইনি কে জানিস, ইনিই সেই কৃষ্ণভগবান। সৃষ্টির আগে, জগতে একা ইনিই স্বরূপে থাকেন। এঁনার থেকেই সমস্ত বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি। আবার প্রলয়ের কালে, জগৎ যখন ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত জীবের আত্মা এঁনার মধ্যেই মিশে যায়। ইনিই সেই সনাতন পরমপুরুষ। যাঁর শুরু নেই, শেষও নেই। সামনে থেকে প্রণাম করার এমন সু্যোগ আর পাব কিনা জানি না আয় লো, আয়, এঁনাকে আমরা প্রণাম করি।

প্রিয়সখি, এঁনার ওই করুণা দৃষ্টিতে আমাদের মনের সব ময়লা মুছে যাচ্ছে। সাধু-মুনিরা যুগ যুগ তপস্যা করে, যোগসাধনা করে, ওঁনার পদ্মের মতো পা দুটোই শুধু দেখতে পান। অথচ আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি ওঁর ওই মোহন রূপ, ওই মধুর হাসি আর করুণাসিন্ধু ওই দুই চোখের দৃষ্টি। আমরা কি কম ভাগ্যবতী, বল?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি, বেদমন্ত্রে জীবকে ধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কর্ম কর্তব্য, কোন কর্ম অন্যায় তাও তিনি নির্দেশ করেছেনএই সবই তিনি জীব পালনের জন্যেই করেছেন। তমোগুণে আচ্ছন্ন রাজারা যখন প্রজাদের অমঙ্গল করে, ক্ষতি করে, ধর্মনাশ করে; তাঁদের বিনাশের জন্যে এই কৃষ্ণভগবানই বারবার জগতে জন্ম নেনসত্ত্বমূর্তিতে তিনি নিজে আসেন সকলের সামনে, জগতে ঐশ্বর্য আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে।  করুণাময় ভক্তবৎসল ভগবান, সাধারণ ভক্তদের মনে সঞ্চার করেন ভক্তি, ভরসা, বিশ্বাস আর ধর্ম।

ওলো, আমার খুব হিংসে হয় যদুবংশের ওপর, মধুবন আর দ্বারকাপুরীর ওপর। কেন জানিস। ওই বংশেই যে উনি জন্ম নিয়েছেন! ধন্য হয়ে গেছে যাদবরা, তাঁর লীলায় ধন্য হয়েছে মধুবন, ধন্য হচ্ছে দ্বারকাপুরী। কি ভাগ্য বলতো দ্বারকার প্রজাদের? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ তারা সকাল সন্ধ্যে রোজ দেখে। প্রত্যেকদিন তারা সামনে থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনার সুযোগ পায়।

আরো ভাবতো, সখি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসব পত্নীদের কথা! কত যুগের কঠিন তপস্যা করে, তবেই না তাঁরা পরমপুরুষকে স্বামীরূপে পেয়েছেন! নিজের হাতে শিশুপালদের মতো নৃশংস রাজাকে হত্যা করে, তিনিই উদ্ধার করেছিলেন, রুক্মিণী, জাম্ববতী, নাগ্নজিতীকে। তাঁরা এখন প্রদ্যুম্ন, শাম্ব ও আম্বের মতো গুণবান পুত্রের জননী। নরকাসুরকে হত্যা করেও তিনি উদ্ধার করেছিলেন সহস্র রমণী। তাঁরা নরকাসুরের অধীনে কি দুঃখের জীবন কাটিয়েছে, বল। তাঁদের সকলের হারানো সম্মান, যোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

সই, এমন ভাবিস না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু ভক্তবৎসল করুণাসাগর। ভগবান ভালোবাসা ও প্রেমেরও রাজা। এই কৃষ্ণভগবান প্রেমেরও পারাবার। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে স্বর্গ থেকে পারিজাত এনেছিলেন, কার জন্যে জানিস? আমি জানি লো, আমি জানি, পরমপ্রিয়া রুক্মিণীর জন্যে...”

(সূত বললেন,) "নগরের মহাতোরণের কাছে এসে পড়ায়, কুরুললনাদের সেই আলাপ আর তিনি শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে মৃদুহাস্যে তাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর রওনা হলেন দ্বারকার পথে। তাঁর সঙ্গে রইল উদ্ধব আর সাত্যকি। সামনে আর পিছনে রইল চতুরঙ্গ সেনার দুটি দল। মহারাজা যুধিষ্ঠির, তাঁর পথের নির্বিঘ্ন নিরাপত্তার জন্যে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন”

[মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায় সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে।] 

চলবে... 

                  

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

পয়লা বৈশাখ

 

এর আগের রম্যকথা - " বিচিত্র ঐক্য " 


পয়লা বৈশাখ, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ

    সেই কালে মোকাম কলকেতার নানান অঞ্চলে চড়কের মেলা বসিত। আমাদের শৈশবে কিংবা বাল্যে দেখা আমাদের গেরামের মেলার সহিত তাহার বিস্তর ফারাক। কলকেতার মেলায় অনেক বেশি জাঁকজমক। কাঠের নাগরদোলা। কাঠের হাতিঘোড়ায় বসিয়া বন বন করিয়া ঘুরিবার মেরি-গো-রাউণ্ড। চোখধাঁধানো মনোহারি পসরা কিংবা খাদ্যসামগ্রী, সব ব্যাপারেই কলকেতার মেলা বিশিষ্ট। কাঁচের ও চিনামাটির তৈরি সায়েব-মেম পুতুল। রূপার তবক দেওয়া মিঠা পান। নানান রঙের সিরাপ দেওয়া, বরফ শীতল রঙিন সরবৎ। মালাই কুলফি। যুবা বয়েসে বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়িয়া কলকেতার মেলা বেশ কয়েকবার দেখিয়া অবাক হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহাতে প্রাণের সাড়া পাই নাই। বরং মজা পাইয়াছিলাম অন্যত্র।

    কলকেতার চেতলার হাট মশারি আর মাছের জালের জন্যে বহুদিন হইতেই বিখ্যাত। কিন্তু আমি চেতলার যে মোহজালে মুগ্ধ হইলাম তাহা সংয়ের সাজ। পয়লা বোশেখের আগে ও পয়লা বোশেখের দিন চেতলার সং দেখিতে জন সমাগম হইত বিস্তর। কার্বাইড গ্যাসের চোখধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় বিচিত্র বেশে বেশ কিছু লোক সাজিয়া উঠিত কলকেতার বাবুদের নষ্টামি, আখড়ার মহারাজদের ধ্যাষ্টামি, কূলবধুদের গোপন ভ্রষ্টামি, মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ; এসব নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ তো ছিলই। তাহার উপর আরো থাকিত নির্ভেজাল হাসির উপস্থাপন। বুকফাটা কান্না, দমফাটা হাসি, আহ্লাদে আটখানা, কাজের ভারে কুঁজো। সন্ধ্যার পর জেলেপাড়ার সঙদের সেই মিছিল সমাবেশ, উপস্থিত জনগণের সহিত আমরাও অত্যন্ত উপভোগ করিতাম।

    পয়লা বোশেখের দিন সকালে ভৃত্যের মাথায় বেতের ধামায় লাল শালুমোড়া জাব্দা খাতা, শ্রীগণেশ ও শ্রীলক্ষ্মীর মূর্তি, লক্ষ্মীদেবীর ঝাঁপি লইয়া বাবুদের কেরানীরা দলে দলে আসিতেন কালীঘাটের কালী মন্দিরে। মন্দিরে পুজার ভিড়ে রীতিমতো হট্টগোল উপস্থিত হইত। দাপুটে বাবুদের কেরানীরা অর্থের দাপট দেখাইতে কসুর করিতেন না, তাঁহাদের উৎকোচে মন্দিরের পুরোহিতগণের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যাইত। এই পুরোহিতগণ মাকালীর সহিত সরাসরি যোগাযোগ ঘটাইয়া সম্বৎসরের ব্যবসার সুবন্দোবস্ত করিয়া দিবার আশ্বাস দিতেন। পুজার পর তাঁহারা জাব্দা খাতায় আলতাকালিতে উপরে ‘ওঁমা’, তাহার নিচে ‘শ্রীশ্রীকালিমাতা সহায়’ লিখাইয়া লইতেন। তাহার নিচে স্বস্তিকা চিহ্ন আর একদম নিচের দুই কোণায় আলতায় ডোবানো রৌপ্যমুদ্রার দুই পিঠের মোহর।

    কলকেতা শহরে সে সব মেলা আজিকালি আর তেমন দেখি না। লোকে আজিকালি অন্ধকার ঘরে টিকিট কাটিয়া বায়োস্কোপ দেখে। তাহারা নায়ক নায়িকাদের গান আর মেকি হাসিকান্নায় মজিয়া থাকে। শুনিয়াছি কলকাতার নব্য বাবুরা এখন চড়কের মেলা, সং ইত্যাদির আনন্দকে “ছোটলোকি” বলে। বলে এসব সেকেলে ফক্কুড়ি দেখিয়া সময় নষ্ট করিবার মতো সময় তাহাদের নাই। হবে হয়তো। আমাদের যৌবনে আমরা তো এসব খুবই উপভোগ করিতাম। আজিকালি বয়স হইয়াছে, এ যুগের ছোকরাদের মতিগতি আর বোধগম্য হয় না।  

    আমার গিন্নি পয়লা বোশেকের ছুটির দুপুরে বড়োই তরিবতে রন্ধন করেন। সজনে ডাঁটার শুক্ত, রুই মাছের মুড়ো দেওয়া ভাজা মুগের ডাল, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, পটল-আলুর মাখোমাখো তরকারি, রক্তরাঙা ঝোলের মধ্যে দুইখানি অর্ধগোলক আলু সহ অনেকটা কচিপাঁঠা, কাঁচা আমের পাতলা অম্বল। সবার শেষে মিঠে দধি। এইরূপ আকণ্ঠ মধ্যাহ্ন ভোজের পর, গালে গিন্নির হাতের পান লইয়া, পয়লা বোশেখের দুপুরটি দিবানিদ্রায় অতিবাহিত করি, জানালা দরোজা বন্ধ প্রায় অন্ধকার ঘরে।

    দিবানিদ্রা সারিয়া বারান্দায় যখন বসি, পথের আলো জ্বালাইবার জন্য পুরসভার কর্মচারিরা লম্বা আঁকশি হাতে দৌড়াইয়া চলে। পাড়ার যতো বাড়ির দরোজায় দরোজায় বেলফুলের মালা লইয়া ফিরিওয়ালা ডাক পাড়ে “বেইলফুউউল”। তাহার চিকন কণ্ঠের সুরে ও বেলফুলের সৌরভে প্রথম বৈশাখের সন্ধ্যাটি বড়ো মধুর হইয়া উঠে। তাহার পশ্চাতে আসে মালাইবরফ এবং কুলফি মালাইয়ের ফিরিওয়ালা। পাড়ার বখাটে ছোকরার দল তাহাকে আড়ালে ডাকিয়া সিদ্ধি মিশ্রিত কুলফি মালাই খাইয়া অকারণ হাসিতে পাড়া মাতায় তোলে।

    সন্ধ্যা একটু গড়াইলে, পাটভাঙা ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পড়িয়া রাশভারি মুখে বাহির হই। পায়ের পাম্পশুতে মচ মচ ধ্বনি তুলিয়া যখন হাঁটি নিজের ভারিক্কি চালে নিজেই অবাক হই। গেরামে থাকিতে যাহারা আমাকে ‘আত্তাঁ’ বলিয়া চিনিত, তাহারা আমার এই ‘আত্মারামবাবু’ মার্কা চেহারা দেখিলে কিরূপ ভিমরি খাইত কল্পনা করিয়া, বড়ো আল্লাদ পাই।

    কালেজ স্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজের বিপরীতে কল পাইপের বিপণিগুলির অধিকাংশই আমাদের দেশজ সুহৃদদের মালিকানা। হালখাতা উপলক্ষে এই সব বিপণির উদার হৃদয় মালিকেরা অতিথি আপ্যায়নের বিপুল আয়োজন করিয়া থাকে।

    দোকানের প্রবেশ পথেই একজন কর্মচারী পিচকারি হইতে মাথায় মুখে গায়ে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করিয়া গোলাপজল ছিটাইয়া দেয়। সদ্য গ্রাম হইতে আসিয়া কলকেতা নিবাসী হইবার পর যেবার প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠানে আসিয়াছিলাম, এই ঘটনায় অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছিলাম। বলা নাই কওয়া নাই, খামোখা আমার গাত্রে জল ছিটাইয়া দেওয়া, এ কী ধরনের রসিকতা? সৌভাগ্যক্রমে সেই ক্ষণে বিপণির মালিকপুত্র “আসুন খুড়ামহাশয়” বলিয়া আমার হাতে ঝাউপাতায় মোড়া গোলাপকলি উপহার দিয়া ভিতরে বসাইয়াছিল। নচেৎ সেদিন হয়তো কুরুক্ষেত্র বাধাইয়া নিজেকেই হাস্যাস্পদ করিতাম। বসিবার পর দেখিয়াছিলাম ওই কর্মচারি সকলকেই ওই জল ছিটাইতেছে, ও তাহাতে গোলাপের সুবাস। ক্রোধ প্রশমিত হইলে, নিজ গাত্রেও ওই গোলাপজলের সুবাস উপলব্ধি করিয়া চমকিত হইয়াছিলাম।

    বিপণির ভিতরের প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক পরিবেশ আজ নাই উজ্জ্বল আলোর নিচে ফরাস পাতা, তাহাতে ধবধবে চাদর বিছানো। ফরাসে বসিয়া অশীতিপর এক মুসলিম বৃদ্ধ সানাই বাজাইতেছেন। তাঁহার সহিত তবলায় একজন সঙ্গত করিতেছেন। সেই সানাইয়ের মাঙ্গলিক সুর যেন নতুন বর্ষের শুভদিনের সূচনা করিতেছে। কিন্তু আশ্চর্য, সেই সুরের প্রতি উপস্থিত কাহারো মনোযোগ নাই। সকলেই নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপে ব্যস্ত। সকলের হাতেই কি এক পানীয়ের বোতল, তাহাতে সরু পাইপ বসানো। সেই পাইপে ঠোঁট লাগাইয়া হাল্কা চুমুকে সকলে পানীয়ের মজা লইতেছে। এই পানীয় কি সুরা জাতীয় কিছু? কলকেতার বাবুরা কি প্রকাশ্য সন্ধ্যালোকে নির্লজ্জের মতো মদ্যপান করিয়া থাকে?

    এই সব ভাবিতে ভাবিতে বিপণির মালিক অমিয়ভূষণ মহাশয়, আমার কাছে আসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন, ‘সব ভালো তো আত্তাঁ, কোন রকম সংকোচ করবা না। আরে একি, তোমাকে কোল্ডিংক দেয় নি? অ্যাই ব্যাচা, এদিকে একটা কোল্ডিংক নে আয়। বাড়ির সব খপর ভালো? বাচ্চা পরিবার, সবাই? হে হে হে, খুব ভালো। আরে আসুন আসুন বিপত্তারণবাবু, আজকাল আপনার আর দ্যাকাই পাওয়া যায় না, আমি ওদিকটা একবার দেকে আসি, যেদিকটা না দেকবো, সেকানেই ...বোয়লে না?” অমিয়ভূষণবাবু অন্যদিকে যাইবার পরেই ব্যাচা নামের ছোকরাটি আমার হাতে এক বোতল শীতল পানীয়ের মধ্যে সরু পাইপ ডুবাইয়া দিয়া গেল। অন্যদের দেখাদেখি কায়দা করিয়া আমিও পাইপে অধর চাপিয়া পানীয় টানিয়া লইলাম। স্বাদ মন্দ নয়। স্বাদ ও গন্ধে মদ বলিয়াও মনে হইল না, কারণ ইহার পূর্বে ছোকরাকালে কুসঙ্গে পড়িয়া দু একদিন ব্রান্ডির স্বাদ লইয়াছিলাম।    

    কিন্তু ও কী ও, আমার এ কী হইল? পানীয় গলাধঃকরণের পরই পেটের মধ্যে বিশাল উদ্গারের উদ্গম হইল। আমি রোধ করিতে পারিলাম না, আমার কণ্ঠ হইতে অদ্ভূত এক শব্দ নির্গত হইল। মনে হইল আমার উদরের অজ বালক পুনর্জীবন পাইয়া তাহার মাতার সন্ধানে ডাকিতেছে। আমার আশেপাশে উপবিষ্ট, বিশিষ্ট জনের দুই চারিজন আমার বাণীতে চমকিত হইলেন, ঘাড় ফিরাইয়া আমার আপাদমস্তক মাপিয়া লইলেন। ইহার পর ওই ভুল আর করি নাই, পাইপে হাল্কা টানে অল্প পানীয় পান করিতে লাগিলাম। তাহাতেও ছোট ছোট উদ্গার উঠিতেছিল, কিন্তু আমি সেগুলিকে নাসিকা পথে ছাড়িতে লাগিলাম। তাহাতে নাসিকা জ্বলিতে লাগিল, কিন্তু সম্মান রক্ষা হইল। এমন পানীয় মনুষ্যজাতির সভ্যতায় কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করিবে, বলিতে পারি না।

    অমিয়ভূষণবাবুর বিপণি হইতে দুইখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই বাস্কো মিষ্টান্ন লইয়া বিদায় লইলাম। তাহার পর আরো ছয়খানি পরিচিত বিপণিতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া টানা রিকশয় গৃহে ফিরিলাম। আমার বগলে তখন পাঁচখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই হাতে নয় বাস্কো মিষ্টান্ন। আরো দুইখানি হাত থাকিলে, আরো কয়েকটি বিপণিতে যাইতে পারিতাম ভাবিয়া আক্ষেপ হইল। কিন্তু বিধির বিধানে হাত মাত্র দুইখানি!

    রাত্রের রন্ধন হইতে মুক্তি পাইয়া আমার গৃহিণী আনন্দিতা হইলেন। দুই পুত্র ও দুই কন্যা সহ আমরা সকলে নয়খানি বাস্কো উদরসাৎ করিয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। গৃহিণীর বানানো একখানি পান গালে লইয়া বাহিরের বারান্দায় দাঁড়াইলাম। ভাবিলাম পয়লা বোশেখের মঙ্গলরাত্রি বড়ো আনন্দে যাপিত হইল।

    জানি না কেন এই সময় মনে পড়িল সেই শীর্ণ বৃদ্ধ সানাইশিল্পীর কথা। তাঁহার সানাইবাদনের প্রতি আমাদের কাহারো বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। একদল শূকরের সম্মুখে ছড়ানো মুকুতার মতো তাঁহার শিল্প প্রয়াস তিনি বিতরণ করিতেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁহার নিজের ও পরিবারের উদরপূর্তির প্রত্যাশায়। একজন শিল্পীর, নামজাদা নাই বা হইলেন, এ হেন অবহেলা আমরা না করিলেও পারিতাম।

    পয়লা বৈশাখে নববর্ষের এই শুভ দিনটিতে তাঁহার সানাইয়ের সেই মাঙ্গলিক সুর কলকেতার স্বার্থ সন্ধানী মানুষের অন্তরে এতটুকুও দাগ রাখিতে পারিল না। আগামী কল্য দোসরা বৈশাখ, আর পাঁচটা সাধারণ কর্মব্যস্ত দিনের সহিত এতটুকুও ফারাক থাকিবে না। সকালে গৃহিণীর প্রস্তুত মৎস্যের ঝোল-ভাত নাকে মুখে গুঁজিয়া দপ্তরে যাইব। দিনগত পাপক্ষয় করিতে করিতে আরও একটি বৎসর পার হইয়া জীবনে আরও এক পয়লা বৈশাখ আসিবে, ভাবিতে ভাবিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িলাম মনেও নাই।

-   ০০ –


[আত্মারাম বাগচি মহাশয়ের স্মৃতিকথার আংশিক পরিমার্জিত রূপ “পয়লা বৈশাখ"; বানান ও শব্দ ব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাগচি মহাশয়ের জন্ম প্রাক-স্বাধীনতা যুগে, কর্ম উত্তর-স্বাধীনতার দিনগুলিতে।] 

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬  


 

খট খট আওয়াজে ভল্লার কাকনিদ্রা টুটে গেল। উপুড় হয়ে মাচার কিনারা থেকে দেখল, ব্যাপারটা কি? রামালি রণপা চড়ে ফিরল। তার কাঁধে ছোট্ট একটা ঝোলা। ভল্লা খুশি হল, হতভাগা ভালই রপ্ত করেছে। এরপর ওকে রণপা নিয়ে ছোটাতে হবে। ভল্লা কোন সাড়া না দিয়ে চুপ করে দেখতে লাগল।

রামালি তার কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। ছোট্ট লাফ দিয়ে মাটিতে নামল রণপা থেকে। রণপাজোড়া তার দেখানো ঝোপের মধ্যেই লুকিয়ে রাখল। তারপর তার ঘরের মধ্যে উঁকি দিল। তারপর পুকুরের দিকে গেল। একটু পরে আবার ফিরে এল। ফিরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। বকের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল। ভল্লাকেই খুঁজছে, হতভাগা। পাখির মতো রামালির কার্যকলাপ দেখতে ভল্লার বেশ মজা লাগছিল। শুধু যে মজা লাগছিল তাই নয়, নিজেকে ভগবান বলে মনে হচ্ছিল।

বহুদিন আগে দূরের কোন এক গ্রামের একটি মন্দিরে তাকে রাত কাটাতে হয়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত তাকে মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি। কারণ সে শূদ্র। ভল্লা মিথ্যে করে নিজেকে ক্ষত্রিয় বলতেই পারত। বলেনি। পুরোহিতের দেওয়া প্রসাদ খেয়ে মন্দিরের বাইরে চাতালে শুয়ে রাত কাটিয়েছিল। সেই পুরোহিত তাকে বলেছিল, “জাত-পাত নিয়ে দুঃখ করিসনি, বাপু। এসব তো আর আমরা বানাইনি, বানিয়েছেন ভগমান। তোকে যদি মন্দিরে থাকতে দিই, ভগমান ঠিক দেখতে পাবেন। তিনি ওপর থেকে সবার দিকে সবসময়ই লক্ষ্য রাখেন কিনা? তাঁর বিচারে আমাদের যে নরকে ঠাঁই হবে, বাপু”। দুঃখ করার লোক ভল্লা নয়। সে দুঃখ পায়ওনি।

পরেরদিন সূর্যোদয়ের আগেই তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, এবং দৈবাৎ তার চোখে পড়েছিল মন্দিরের দরজা ফাঁক করে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসছে একটি মেয়ে। মেয়েটির চটকদার চেহারা, চালচলন, পোষাক-টোষাক দেখে, তাকে পতিতা গোত্রের রমণী বলেই মনে হয়েছিল ভল্লার। ব্রাহ্মণী হতেই পারে না নিশ্চয়ই কোন অন্ত্যজবাসিনী।  দেখে হাসি চাপতে পারেনি, হো হো করে হেসে উঠেছিল। তার হাসির শব্দ শুনে বেরিয়ে এসেছিল পুরোহিত ব্যাটাও। ভ্রূকুটি করে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এই সাতভোরে হ্যা হ্যা করে হাসছিস কেন রে, শূদ্দুরের পো?” ভল্লা হাসতে হাসতেই বলেছিল, “আপনার ব্রাহ্মণীটি কিন্তু বেশ পুরুতমশাই। আপনার ভগমান দেখেছেন। চিন্তা করবেন না, আপনার জন্যে নরকে নয়, স্বর্গেই পাকা বাসা তৈরি হচ্ছে...”। পুরুতটা দাঁতে দাঁত চেপে তার বাপান্ত করেছিল, বেশি চেঁচামেচি করতে পারেনি - লোক জানাজানি হওয়ার ভয়ে।          

সেই ভগবানের মতোই দেখছিল ভল্লা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রামালি ঘরে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এল, বড়ো কলসিটা হাতে নিয়ে। ভল্লা জানে ওটা খালি। খালি কলসি নিয়ে রামালি পুকুরের দিকে গেল। এবার নীচেয় নেমে এল ভল্লা। পুকুর থেকে ফেরার আগেই ভল্লা তার কুটিরের সামনে গিয়ে বসল। রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরল। তার একহাতে ভরা কলসি আর অন্য কাঁধে বেশ কিছু শুকনো ডালপালা।

রামালি জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় গেছিলে, ভল্লাদাদা?”

“ঘুমোচ্ছিলাম। তোর রণপার আওয়াজে ঘুম ভাঙল”।

“ঘরে ঘুমোও না? কোথায় ঘুমোও তাহলে?”

“না রে, ঘরে ঘুমোনোর কপাল কী আর আমাদের?”। রামালি উনুনের সামনে ডালপালাগুলো ঢেলে দিয়ে ঘরে গেল কলসিটা রাখতে। বেরিয়ে এসে উনুনের সামনে বসে কাঠকুটোয় আগুন ধরিয়ে, উনুনে গুঁজে দিল। কিছু ডালপালাও গুঁজে দিল তার মধ্যে। ভল্লা বলল, “তুই রান্না চাপাবি নাকি”?

মালসায় জল ভরে ঘরের বাইরে এল রামালি, মালসাটা উনুনের ওপর চাপিয়ে বলল, “কী খাবে? গ্রাম থেকে কিছু আনাজ এনেছি। লওকি, মেটেকন্দ আর কুঁদরি”।

“কোথা থেকে আনলি?”

“কেন আমাদের বাড়ি থেকে? আমাদের বাড়ির পেছনে অনেকটা জায়গা, সেখানে ভালই আনাজ-টানাজ হয়।”

“বলিস কী? তোর কাকি কিছু বলেনি?”

“বলেনি আবার? আমিও বললাম, এ বাড়ি-জমির অর্ধেক ভাগ তো ছেড়েই দিলাম, দুটো আনাজ নিয়েছি...উরে বাব্বা...”, রামালি হাসতে লাগল খুব, হাসির বেগ কিছুটা কমিয়ে বলল, “যা বুলি ছোটাল না, ভল্লাদাদা...যত গাল দেয় আমিও হাসি...”, আবারও হাসতে হাসতে বলল রামালি।

ভল্লা বেশ অবাক হল, রামালির সঙ্গে যেদিন থেকে তার পরিচয়, কোনদিন ওকে হাসতে দেখেনি। সেই ছেলেটা এক রাত্তিরে এমন বদলে গেল কী করে? এই ছেলেটাই সেদিন গভীর শীতলতায় এতদিনের বন্ধুকে নির্দ্বিধায় হত্যা করেছে। তার মুখে চোখে আচরণে কোথাও সে ঘটনার জন্যে কোন গ্লানি নেই। এই যে হাসছে ও, ভল্লার মতো মানুষও আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে...এত সুন্দর সরল হাসি হাসতে পারে ছেলেটা? সাংঘাতিক তো!

“যাগ্‌গে কী খাবে বলো। খিচড়ি বানাবো? তোমার ঘরে দেখলাম, চাল-ডাল আছে। তার সঙ্গে মেটেকন্দ আর কুঁদরি ভাজা...”

ভল্লা উদাস সুরে বলল, “বানা, আজকে তুই যা খাওয়াবি, সব খাবো। এমনিতেই আমি তো হেরে ভূত হয়ে গেছি”।

“কার কাছে”? অবাক হয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল।

“তোর কাছে রে হতভাগা। রণপা জোড়াও গেল, চকচকে একটা বল্লমও গেল”।

“সত্যি, ভল্লাদাদা”? উচ্ছ্বসিত আনন্দে রামালি চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল ভল্লাকে।

ভল্লা তার পিঠে চাপড় মেরে বলল, “এ তো সবে শুরু রে রামালি, এর থেকেও অনেক বড়ো বড়ো কাজ তোকে করতে হবে...। কিন্তু শল্কুরা কখন আসবে”?

“আসছে। ওরা ছজন আসছে। দুপুরের খাওয়ার পর ওদের আসতে বলেছি...” একটু ইতস্ততঃ করে আবার বলল, “তোমার এদিককার অবস্থা তো জানি, ওরা সবাই না খেয়ে এলে, তুমি সামলাতে কী করে?”

ভল্লা হাসল, কিছু বলল না।

রান্না করতে করতে, তাঁতের মাকুর মতো রামালি ঘর-বার করছিল, সে সময় হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে - কেমন করে জানলে আমি রণপায়ে হাঁটা শিখে গেছি?”

ভল্লা বলল, “ঘুম ভাঙল তোর রণপায়ের খট খট আওয়াজে… তারপর ভগবানের মতো ওপর থেকে সব দেখলাম…”।

“ভগবানের মতো? তার মানে”?

ভল্লা তার সেই মন্দিরের পুরোহিত আর তার ভগবানের গল্পটা রামালিকে শোনালো। রামালি হাসতে হাসতে বলল, “তুমি খুব বেঁচে গেছ ভল্লাদাদা। আমাদের এদিককার পুরোহিতরা, রেগে গিয়ে পৈতে ছিঁড়ে কাউকে অভিশাপ দিলে, সে নাকি সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। চিন্তা করো, লোকটা অভিশাপে মরল বটে, কিন্তু বেঁচে গেল তার যাবতীয় শ্মশান-খরচ!”।

রামালি হাসল না, কিন্তু তার কথার ভঙ্গীতে ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে। কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “অনেকদিন পর এমন হাসলাম, বুঝলি রামালি। সারাদিন নানান কূটকচালি চিন্তা, লোকজনের বজ্জাতি সামলাতে সামলাতে হাসি উপে গিয়েছিল। পুকুরে জল খেতে গিয়ে দেখতাম, মুখখানা দিন-কে-দিন হাঁসের পোঁদের মতো হয়ে উঠছে”।

অনেক হাসাহাসি হল, ফচকেমি হল। ভল্লা এবার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল,”গ্রামের পরিস্থিতি কেমন?”

রামালি খিচড়ির মালসা নামিয়ে, উনুনে একটা সরা চাপিয়ে একটু তেল ঢালল, বলল, “আমি তো তেমন কিছু বুঝলাম না, ভল্লাদাদা। আমাদের দলের ছেলেরা ছাড়াও বড়দের সঙ্গেও দেখা হল। কারও মনে তোমার ওপরে কিংবা আমাদের ওপরে কোন রাগ আছে বলে মনে তো হল না। বরং জিজ্ঞাসা করল, শুনলাম তোর কাকি তোকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে? তা এখন রয়েছিস কোথায়?” গরম তেলে, জিরে আর শুকনো লংকা ছেড়ে কাঠের হাতা দিয়ে নাড়তে নাড়তে রামালি বলল, “বললাম, বাড়ি থেকে কাকি তো আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে – অতএব রয়েছি আরেকজন নির্বাসনের সাজা পাওয়া অপরাধীর সঙ্গে”। ভাজা হয়ে যেতে রামালি সরা থেকে গরম তেলটা ঢেলে দিল খিচড়ির মালসায় – ফোড়নের দেওয়ার শব্দে আর রুচিকর গন্ধে ভরে উঠল বনস্থলী।

“এতদিনে আমাদের এই জঙ্গলের বাসাটাকে গেরস্থ বানিয়ে তুললি রে, রামালি। খিচড়িতে আবার ফোড়ন!”

রামালি কোন উত্তর দিল না, সরাটাকে আবার উনুনে বসিয়ে আরো তেল দিল, উনুনে গুঁজে দিল আরও কিছু কাঠ। তেল গরম হতেই তাতে ছেড়ে দিল কুঁদুরির ফালিগুলো। একটু নুন, আর হলুদগুঁড়ো দিয়ে, বার কয়েক নাড়াচাড়া করে, মাটির থালা চাপা দিয়ে দিল সরার ওপর। তারপর বলল, “গ্রামের বয়স্কদের মধ্যে দু-তিনজন অনেক কথাই বলছে, তোমার নামে, আমাদের নামে। কিন্তু বাকি সবাই, আমার মনে হয়, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। ওরা হয় ওদের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারেনি। নয়তো কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারেনি”।

“কিন্তু খুব শিগ্‌গির বুঝতে পারবে। আজকে না হলেও, কালকে রক্ষীদের দলবল গাঁয়ে আসবে, জঙ্গলের ঢোলের মতো

“ঢোলটা কী বস্তু ভল্লাদাদা?”

“ওরে বাপরে, বস্তু না রে, জন্তু। আমাদের রাজ্যের মাঝের বিষয়গুলোতে গভীর জঙ্গল তো! সেখানে তারা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। এক একটা দলে পঁচিশ- তিরিশটা – ওদের সামনে পড়লে কেঁদো বাঘও লেজ গুটিয়ে পালায়”।

“আচ্ছা? বাঘও তাদের ভয় পায়? তবুও বলব, রাজার রক্ষীদল ঢোল হোক বা হায়না, আমার মনে হয় গ্রামের মানুষ মনে মনে প্রস্তুত হয়ে উঠছে। বললে বলবে, আমি তোমার আমড়াগাছি করছি... কিন্তু একথা সত্যি যে, তুমি এই গ্রামের নির্জীব মানুষগুলোর মনে কম-বেশি একটা আলোড়ন তুলে দিয়েছ। আগে রক্ষীরা এসে ক্যাঁৎক্যাঁৎ করে লাথি মারলেও, এরা যেন কৃতার্থ হয়ে যেত। তারা বিশ্বাস করত আমাদের পালন করতে ভগবান, রাজা বানান। সেই রাজার রক্ষী মানে তারাও ভগবানেরই অংশ। অতএব রক্ষীদের লাথি ছিল, প্রকৃতপক্ষে ভগবানের আশীর্বাদ – বাপ-মা যেমন ছেলেমেয়েদের পেটায়।  কিন্তু কিছুদিন দেখছি, বয়স্ক মানুষদের মনে সেই বিশ্বাস কিছুটা টুটেছে – তাদের মনেও কেমন যেন ধন্দ জাগছে”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে রামালির কথা শুনছিল। আজ শেষরাত থেকে তার যত পরিচয় সে পাচ্ছে, তার মতামতের গুরুত্ব ভল্লার কাছে ততই বাড়ছে। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজবুড়োর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“নাঃ। বোধহয় বাড়িতেই ছিল। ভাগ্যে দেখা হয়নি, হলেই এক ঝুড়ি উপদেশ ঝাড়ত”।

“কবিরাজবুড়ো আর তোদের গ্রামপ্রধান জুজাক। তারা তো আমার বিরুদ্ধেই সবাইকে তাতাচ্ছে!”

ভল্লার কথায় রামালি হাসল। সরার ঢাকা সরিয়ে কুঁদরিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে সামান্য জলের ছিটে দিল।  সরার মুখ আবার ঢেকে দিয়ে বলল, “তাতাবে না? এতদিন গ্রামপ্রধান আর কবিরাজের কথা সকলে বেদবাক্যের মতো মানত। এখন তারা তোমার কথা শুনছে। আমরা – গ্রামের ছেলেপুলেরা - তোমার কথায় উঠছি বসছি। তাদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে... এত সহজে তারা ছেড়ে দেবে? রাখালের হাত থেকে পাঁচন-বাড়ি কেড়ে নিলে – তার আর থাকল কি?”

ভল্লা আবারও অবাক হল। এভাবে তো সেভাবেনি! এভাবে চিন্তা করলে, জুজাক এবং কবিরাজের আচরণের যুক্তি মেলে বৈকি! আরেকটু স্পষ্ট করার জন্যে ভল্লা বলল, “তার মানে?”

“এতদিন আমরা ছিলাম, ছাগল-ভেড়ার পাল। ওরা দুজন ছিল আমাদের রাখাল। আমরা ভাবতাম, ওরাই বুঝি আমাদের রক্ষাকর্তা। তুমি এসে বোঝালে আমাদের এবং ওই রাখালদেরও প্রকৃত প্রভু হল রাজার আধিকারিক আর তার রক্ষীরা। ওদের হাতে কিস্‌সু নেই। তোমার বিরুদ্ধে ওরা আমাদেরকে তাতাবে না তো, কী করবে?”

রামালি কুঁদরির সরা নামিয়ে, অন্য এক সরায় জল নিয়ে উনুনে চাপাল। তার মধ্যে ছেড়ে দিল মেটেকন্দর বেশ কিছু টুকরো। উনুনের গর্তে বেশ কিছু শুকনো পাতা আর ডালপালা গুঁজে, আগুনটা উস্কে দিয়ে বলল, “কখন খাবে ভল্লাদাদা? আমার রান্না কিন্তু শেষের দিকে। চান করে খেতে বসলেই হল”।

রামালির কথাগুলোই চিন্তা করতে করতে ভল্লা বলল, “তুই যা, চান করে আয়”।

“ঠিক আছে, তাই যাই। তাহলে তোমাকে একটু লক্ষ্য রাখতে হবে, সরার জল যেন শুকিয়ে না যায়, আর উনুনের আগুন যেন ঝিমিয়ে না যায়”।

খালি কলসি এবং আরও কিছু বাসনকোসন নিয়ে রামালি পুকুরে গেল। ভল্লা গাছের ছায়ায় বসে এক মনে উনুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তলায় তলায় আগুন জ্বলছে। সেই তাপে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হচ্ছে মানুষজনের মন। 

চলবে...      

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...