সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৪ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

পঞ্চদশ পর্বাংশ 



৪.৮ দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্যের রাজবংশ

সংস্কৃতে দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্যের ভৌগোলিক অবস্থান সাধারণতঃ ভারতীয় উপদ্বীপ অঞ্চল, যার বিস্তৃতি নর্মদার দক্ষিণ তীর পর্যন্ত বোঝায়। যেমন উত্তরাপথ বলতে বিন্ধ্য এবং হিমালয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়।

বৈদিক আর্যদের কাছে দক্ষিণ ভারত সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না, তাঁরা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণের অঞ্চলটিকে দুর্গম “মহাকান্তার” বলে মনে করতেন। ব্রাহ্মণ্য পর্যায়ে বিন্ধ্যের বাধা পেরিয়ে তাঁরা দক্ষিণে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন জাতি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছিলেন। যার উদাহরণ পাওয়া যায়, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “অন্ধ্র, পুণ্ড্র, শবর, পুলিন্দ এবং মুটিবরা বৈদিক ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্র”। আবার পৌরাণিক উপাখ্যান আছে, মহামুনি অগস্ত্যের শিষ্য ছিলেন বিন্ধ্যপর্বত। একবার সূর্যের ওপর রাগ করে বিন্ধ্যপর্বত সূর্যের গতিরোধ করার জন্যে খুব বেড়ে উঠছিলেন। সে সময় বিন্ধ্যের বৃদ্ধি কমাতে অগস্ত্যমুনি বিন্ধ্য পার হয়ে দক্ষিণ ভারত যাওয়ার মনস্থ করলেন। মহামুনি অগস্ত্য বিন্ধ্যপর্বতের সামনে দাঁড়াতেই, মহামুনিকে প্রণাম করতে বিন্ধ্য যখন মাথা নত করলেন, মহামুনি বললেন, আমি যতদিন না ফিরে আসি, এভাবেই মাথা নত করে থাকো। অগস্ত্য তারপরে দক্ষিণভারত থেকে আর ফেরেননি, বিন্ধ্যপর্বত আজও মাথা নত করে আছে এবং আমাদের সৌভাগ্যক্রমে, সূর্যেরও প্রদক্ষিণ পথ আজও রুদ্ধ হয়নি। কাহিনী যাই হোক, এর সার কথা হল মহামুনি অগস্ত্য দুর্গম বিন্ধ্যপর্বত পার হয়ে দক্ষিণ ভারতে যেতে পেরেছিলেন এবং তাঁর দেখানো পথে, পরবর্তী উত্তরভারতের রাজা, ঋষি এবং উপনিবেশ-স্থাপনকারী মানুষেরা, উত্তরের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে দক্ষিণে যাওয়া আসা শুরু করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটামুটি ৫০০ বি.সি.ই-র রচনা পাণিনির “অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে” কলিঙ্গ পর্যন্ত নাম পাওয়া যায়, এবং প্রাচীনতম বৌদ্ধ শাস্ত্র “সূত্ত-নিপাত” গ্রন্থে গোদাবরী তীরে একমাত্র বাভারিন সঙ্ঘের উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ বি.সি.ই-র কাত্যায়ন তাঁর পাণিনি-ভাষ্যে মাহিষ্মত, নাসিক্য নগর ছাড়াও চোড় এবং পাণ্ড্যদের কথা উল্লেখ করেছেন। তৃতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে সমগ্র দক্ষিণ ভারত এবং তাম্রপর্ণীর (সিংহল) প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়েই উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের নিবিড় যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল।

এর কিছুদিন পরে এসেছে সাতবাহন রাজবংশ, যাঁরা দাক্ষিণাত্যের অধিকাংশ অঞ্চল এবং আশেপাশের মালব প্রভৃতি অঞ্চলগুলিও শাসন করতেন। তাঁদের রাজত্বের শেষদিকে শকরা কিছুদিনের জন্যে, মহারাষ্ট্র এবং মালব অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন। খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি আভির গোষ্ঠীর রাজা ঈশ্বরসেন উত্তর মহারাষ্ট্র জয় করেছিলেন। এরপর বাকাতক বংশের রাজারা মধ্যভারত এবং দাক্ষিণাত্যের বেশ কিছুটা অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর দাক্ষিণাত্যের পূর্বদিকে ইক্ষ্বাকু এবং পল্লবরা এবং ছোট ছোট অনেকগুলি রাজা রাজত্ব করেছিলেন, যেমন কুদুরার বৃহতফলায়ন, ভেঙ্গিপুরের সালংকায়ন, দেনড়ুলুরুর (ভেঙ্গির কাছে) বিষ্ণুকুণ্ডিন ইত্যাদি। এরপরে দাক্ষিণাত্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ হল চালুক্য।  

৪.৮.১ চালুক্য

চালুক্যদের উৎপত্তি নিয়ে বিস্তর জল্পনা ও কল্পনা শোনা যায়। অনেকে বলেন দেবী হারীতি যখন তর্পণের জল অর্পণ করছিলেন, তাঁর ঘট থেকে চালুক্য বংশের সৃষ্টি। দেবী হারীতি বৌদ্ধদের দেবী, বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৌদ্ধদের এই দেবীর কল্পনা এসেছে - গ্রীস থেকে, জিউস এবং অ্যাফ্রোডাইটের কন্যা - গ্রীক দেবী টাইচের অনুসরণে। অনেকে বলেন, চালুক্য বা সোলাংকি বংশ গুর্জরদের মতো মধ্য এশিয়ার কোন যোদ্ধা উপজাতি। প্রথমদিকে এঁরা রাজস্থানে উপনিবেশ গড়েছিলেন, পরবর্তীকালে এঁদের একটি শাখা দক্ষিণ দিকে চলে এসেছিলেন।

দক্ষিণের চালুক্য বংশের উপস্থিতি ছোট করে শুরু করেছিলেন জয়সিংহ এবং তাঁর পুত্র রণরাগ। ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে রণরাগের পুত্র প্রথম-পুলকেশি চালুক্য বংশকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করলেন বাতাপিতে (এখন বাদামি, বিজাপুর জেলা) এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা কীর্তিবর্মন উত্তর কোঙ্কন, কদম্ব রাজ্যের (উত্তর কানাড়া) বনবাসি এবং নালদের রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, উত্তর কোঙ্কনের তৎকালীন রাজা ছিলেন মৌর্যদের বংশধর! নালদের সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। পুত্ররা নাবালক থাকার জন্যে, কীর্তিবর্মনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মঙ্গলরাজ বা মঙ্গলেশ। তাঁর সাম্রাজ্য শোনা যায় পশ্চিমের সমুদ্র থেকে পূর্বের সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একথা সত্যি হোক বা না হোক, তিনি যে রেবতী দ্বীপ (আজকের রেড়ি, রত্নগিরি জেলা) অধিকার করেছিলেন, তার নিশ্চিত নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনিই বাদামি পাহাড়ে বিষ্ণুর গুহামন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মঙ্গলরাজের মৃত্যু হয়েছিল তাঁর সাবালক ভাইপোদের সঙ্গে যুদ্ধের সময়।  

দ্বিতীয়-পুলকেশি

দ্বিতীয়-পুলকেশি যখন রাজা হলেন, চালুক্য সিংহাসন নিয়ে পারিবারিক বিবাদ তখন তুঙ্গে। কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সেই বিবাদ মিটিয়ে তিনি সাম্রাজ্যের শক্তি বাড়াতে পেরেছিলেন। তিনি নিজেকে “পরমেশ্বর-শ্রীপৃথ্বীবল্লভ-সত্যাশ্রয়” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি গঙ্গবাড়ির (মহীশূরের অংশ) গঙ্গ এবং মালাবারের অলূপা (?) রাজ্য জয় করেছিলেন। শোনা যায়, দক্ষিণ গুজরাটের লাট রাজ্য, মালব এবং গুর্জররা (সম্ভবতঃ ভৃগুকচ্ছ) তাঁর অধীনতা মেনে নিয়েছিল। তবে তাঁর সবথেকে বড় কীর্তি কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধনকে পরাজিত করা। এই যুদ্ধজয়ের পর কলিঙ্গ এবং কোশল রাজ্যও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। এর পরে তিনি পল্লব রাজকুমার প্রথম-মহেন্দ্রবর্মনকে আক্রমণ করে, কাঞ্চীপুর (কাঞ্জিভরম) অবরোধ করেছিলেন, যার ফলে পল্লবরা এবং কাবেরী নদীর অপর পাড়ের রাজ্যগুলি, যেমন চোল, পাণ্ড্য এবং কেরালাও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়-পুলকেশি যে শুধু রণদক্ষ রাজা ছিলেন তা নয়, তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর সঙ্গে পারস্যের রাজা দ্বিতীয়-খুসরুর ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল, তিনি ৬২৫ সি.ই.-তে পারস্যে রাজদূত পাঠিয়েছিলেন, এবং পারস্যের রাজাও তাঁর রাজধানীতে দূত পাঠিয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময় চীনা পর্যটক হুয়ান সাং সম্ভবতঃ ৬৪১ সি.ই.-তে তাঁর সাম্রাজ্যে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে দ্বিতীয়-পুলকেশীর সাম্রাজ্য সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।  

দ্বিতীয়-পুলকেশীর পরবর্তী রাজারা

তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে পল্লবরাজ নরসিংহবর্মন (৬২৫-৪৫ সি.ই.) চালুক্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন এবং ৬৪২ সি.ই.-তে রাজধানী বাতাপি বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন এবং সম্ভবতঃ সেই যুদ্ধেই দ্বিতীয়-পুলকেশীর মৃত্যু হয়। দ্বিতীয়-পুলকেশীর পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় পুত্র প্রথম-বিক্রমাদিত্য। তিনি ৬৫৪ সি.ই.-তে পল্লবদের পরাজিত করে, পিতার হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র ও নাতি, যথাক্রমে বিনয়াদিত্য (৬৮০-৬৯৬ সি.ই.) এবং বিজয়াদিত্য (৬৯৬-৭৩৩ সি.ই.)। বিজয়াদিত্যের পুত্র দ্বিতীয়-বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকাল ৭৩৩ থেকে ৭৪৭ সি.ই. এবং তাঁর পরে রাজা হন দ্বিতীয়-কীর্তিবর্মন। এই সবগুলি রাজার রাজত্বকালেই পল্লব, চোল, পাণ্ড্য এবং কেরালা রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের নিরন্তর যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই ছিল। তবে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে তাঁদের সাম্রাজ্য থেকে মহারাষ্ট্র অধিকার করে নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রকূটদের দন্তিদুর্গা। দ্বিতীয়-কীর্তিবর্মনের পর চালুক্যবংশ এবং সাম্রাজ্য বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তবে ছোট ছোট রাজ্যে তাঁদের অস্তিত্ব ছিল দীর্ঘদিন। 

চালুক্য বংশের ধর্ম ও শিল্প

চালুক্য রাজাদের সকলেই একনিষ্ঠ হিন্দু ছিলেন, কিন্তু ধর্ম সহিষ্ণু ছিলেন। তাঁদের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যে জৈনদের প্রভাব বেড়েছিল। শোনা যায় রবিকীর্তি নামে একজন জৈন আচার্যকে দ্বিতীয়-পুলকেশী “জিনেন্দ্র” মন্দির নির্মাণে পূর্ণ সহযোগীতা করেছিলেন। বিজয়াদিত্য এবং দ্বিতীয়-বিক্রমাদিত্য জৈন পণ্ডিতদের অনেকগুলি গ্রাম দান করেছিলেন। বরং সেই তুলনায় বৌদ্ধদের তেমন কোন প্রভাব দেখা যায় না। যদিও হুয়ান সাং-এর বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি শতাধিক বৌদ্ধসংঘ দেখেছিলেন, যেখানে উভয় মতের – হীনযান এবং মহাযান– প্রায় পাঁচহাজার সন্ন্যাসী বসবাস করতেন। রাজধানীর বাইরে অশোকের নির্মিত পাঁচটি স্তূপ ছিল, এবং দেশ জুড়ে অসংখ্য স্তূপ তিনি দেখেছিলেন। এই যুগে পৌরাণিক দেবতাদের মূর্তি এবং মন্দির অজস্র নির্মাণ হয়েছিল, তার মধ্যে প্রধানতঃ ছিলেন ত্রিমূর্তি - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। অনুমান করা হয় অজন্তা গুহার দেওয়াল-চিত্রগুলির (frescoes) বেশ কিছু এই সময়ের আঁকা। চালুক্য রাজাদের মধ্যে যজ্ঞ আয়োজনের প্রবণতা ছিল, যেমন প্রথম-পুলকেশি একাই অশ্বমেধ, বাজপেয়, পৌণ্ডরিক ইত্যাদি যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন। 

৪.৮.২ মান্যক্ষেট বা মালখেড়-এর রাষ্ট্রকূট

যথারীতি রাষ্ট্রকূটদের উৎপত্তি নিয়েও কল্পনা ও বিতর্কের শেষ নেই। তার মধ্যে বিশেষজ্ঞরা যে মতটিকে সব থেকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, সেটি হল অশোকের শিলালিপিতে উল্লেখ করা কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর নাম, যেমন রাষ্টিক বা রাঠিক, যার থেকে রাষ্ট্রকূট বা রাঠোর। অতএব রাষ্ট্রকূটরা দক্ষিণভারতেরই প্রাচীন অধিবাসী এবং মৌর্যদের সময়ে মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকের কিছু অংশের সামন্তরাজা ছিলেন। এই বংশের কয়েকজন রাজা, যেমন দন্তিবর্মন, প্রথম-ইন্দ্র পৃছকরাজ, প্রথম গোবিন্দ, প্রথম কর্ক এবং দ্বিতীয়-ইন্দ্ররাজ-এর নামটুকু ছাড়া আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাষ্ট্রকূট রাজাদের মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা দন্তিদুর্গা। দন্তিদুর্গার মা ছিলেন চালুক্য রাজকুমারী ভবনাগা, যাঁকে তাঁর বিবাহ-বাসর থেকে তুলে এনে বিবাহ করেছিলেন দ্বিতীয়-ইন্দ্ররাজ।

অষ্টম শতাব্দীর পঞ্চম দশকে দন্তিদুর্গা, চালুক্য সাম্রাজ্য থেকে মহারাষ্ট্র অধিকার করে নিয়েছিলেন। দন্তিদুর্গা সমসাময়িক অনেক রাজাকেই পরাজিত করতে পেরেছিলেন, যাঁদের মধ্যে আছেন, কাঞ্চীর পল্লবরাজ, কলিঙ্গ, দক্ষিণ কোশল, মালব (উজ্জিয়িনীর গুর্জর-প্রতিহার রাজা), লাট (দক্ষিণ গুজরাট), শ্রীশৈল (কারনুল জেলা), ইত্যাদি। দন্তিদুর্গার কোন পুত্র না থাকায়, তাঁর এক কাকা, কন্নর বা প্রথম কৃষ্ণ, ৭৫৮ সি.ই.-র কাছাকাছি, সিংহাসনে বসেন। প্রথম-কৃষ্ণ চালুক্যরাজ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মনকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে, কর্ণাটক ও তার সন্নিহিত বেশ কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি “রাজাধিরাজ-পরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি কোঙ্কন ও গঙ্গবাড়ি (গঙ্গদের রাজ্য) জয় করেছিলেন এবং ভেঙ্গি অঞ্চলের চালুক্য সামন্তরাজা চতুর্থ বিষ্ণুবর্মনকেও পরাস্ত করেছিলেন। এই প্রথম-কৃষ্ণই ইলোরার পাহাড় কেটে বিখ্যাত এবং অনবদ্য কৈলাসমন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। 

রাষ্ট্রকূটবংশের অন্যান্য রাজারা

দ্বিতীয়-গোবিন্দঃ  প্রথম-কৃষ্ণের মৃত্যুর পর, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, ৭৭২ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত অসংযমী এবং কামার্ত মানুষ ছিলেন।

ধ্রুব নিরুপমঃ  দ্বিতীয়-গোবিন্দের ভাই, ৭৭৯ সি.ই.-তে দাদাকে সরিয়ে সিংহাসনে বসেন। তাঁর পরাক্রমে গঙ্গরাজ পরাস্ত এবং বন্দী হন এবং তিনি গঙ্গরাজ্য অধিকার করেন। তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন, কাঞ্চীর পল্লবরাজ। এরপর তিনি প্রতিহার রাজ বৎসরাজকে পরাস্ত করে, মরু অঞ্চলে (রাজস্থান) বিতাড়িত করেছিলেন এবং উজ্জিয়নী সহ মালব অধিকার করেছিলেন। এরপর তিনি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে অভিযান করেছিলেন, রাজা ইন্দ্রায়ুধকে পরাস্ত করেছিলেন। সম্ভবতঃ এই সময়েই গৌড়রাজ ধর্মপালের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয় এবং গৌড়রাজকে পরাস্ত করে, তাঁর শ্বেত ছত্র এবং লক্ষ্মী-কমল অধিকার করেছিলেন। উত্তর ও মধ্য ভারতের এই রাজ্যগুলি তিনি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেননি, নিজের পরাক্রম দেখানোর জন্যে অভিযান করেছিলেন এবং অবশ্যই পরাজিত রাজ্যগুলি থেকে প্রভূত ধনসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন।

তৃতীয়-গোবিন্দ জগত্তুঙ্গঃ ধ্রুবর পর রাজা হয়েছিলেন, তৃতীয়-গোবিন্দ, সম্ভবতঃ ৭৯৪ সি.ই.-তে। তৃতীয়-গোবিন্দকেও প্রতিবেশী সকল রাজাদের সঙ্গে, যেমন গঙ্গ, পল্লব, চালুক্য, প্রভৃতি নিরন্তর যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য রক্ষা করতে হয়েছিল। তিনিও কনৌজের চক্রায়ুধ এবং গৌড়ের রাজা ধর্মপালের বশ্যতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন উত্তর ভারতে ব্যস্ত, তখন তাঁর রাজ্যে যৌথ আঘাত হানল, দক্ষিণের চোল, গঙ্গ এবং পাণ্ড্য রাজারা, যদিও এই যুদ্ধেও তিনিই জয়ী হয়েছিলেন।

প্রথম-অমোঘবর্ষঃ তৃতীয়-গোবিন্দের মৃত্যুর পর ৮১৪ এ.ডি-তে রাজা হলেন নাবালক প্রথম-অমোঘবর্ষ, তাঁর অভিভাবক হয়ে প্রশাসনিক কাজ সামলাতেন, কর্করাজ-সুবর্ণবর্ষ, রাষ্ট্রকূট-সাম্রাজ্যের গুজরাট অঞ্চলের সামন্তরাজা ও মন্ত্রী। প্রথম দিকে ঠিকঠাক চললেও পরবর্তী কালে বিদ্রোহ এবং বিবাদ উপস্থিত হল। রাজ পরিবারের সাবালাক রাজকুমারদের সঙ্গে কর্করাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হল। এই দুর্বলতার সুযোগে ভেঙ্গির রাজা দ্বিতীয় বিজয়াদিত্য রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং অমোঘবর্ষ রাজ্যচ্যুত হলেন। কিন্তু এর পরে গুজরাটের একটি লিপি থেকে জানা যায় ৮২১ সি.ই.-তে অমোঘবর্ষ আবার সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, সম্ভবতঃ কর্করাজের সহায়তায়। অমোঘবর্ষ যুদ্ধ-বিগ্রহে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর হয়ে রাষ্ট্রকূট বংশের অন্যান্য রাজকুমার ও সামন্তরাজারা দক্ষতার সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। অমোঘবর্ষ তাঁর পরমগুরু জিনসেনার প্রভাবে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যদিও অন্য একটি লিপি থেকে জানা যায়, তিনি দেবী মহালক্ষ্মীর ভক্ত ছিলেন। তিনি সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যের গুণগ্রাহী ছিলেন। সাহিত্য তত্ত্ব নিয়ে, কানাড়ি ভাষায় রচিত তাঁর “কবিরাজমার্গ” এবং নৈতিক গুণাবলীর ওপর লেখা “প্রশ্নোত্তরমালিকা” উল্লেখযোগ্য। যদিও শেষ গ্রন্থটি অনেকের মতে শঙ্করাচার্য অথবা বিমলের রচনা। শেষ জীবনে তিনি ধর্ম এবং সাধনাতেই নিমগ্ন থাকতেন, এবং রাজকুমার ও মন্ত্রীদের হাতেই রাজ্যভার সমর্পণ করে দিয়েছিলেন।

মোটামুটি ৮৭৮ সি.ই.-তে অমোঘবর্ষের মৃত্যুর পর, রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র দ্বিতীয়-কৃষ্ণ, যাঁর উপাধি ছিল অকালবর্ষ এবং শ্রী-বল্লভ। দ্বিতীয়-কৃষ্ণ বিবাহ করেছিলেন কলচুরি রাজকুমারী – প্রথম কোকল্লের কন্যাকে। দ্বিতীয়-কৃষ্ণর ৯১৪ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্বকালে, তাঁর পূর্বপুরুষদের মতোই প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করতে হয়েছিল। দ্বিতীয়-কৃষ্ণর পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি তৃতীয় ইন্দ্র। তৃতীয় ইন্দ্রের পিতা ছিলেন, জগত্তুঙ্গ, যিনি কম বয়সেই মারা গিয়েছিলেন, এই জগত্তুঙ্গ ছিলেন, দ্বিতীয়-কৃষ্ণ ও কলচুরি রাজকুমারী লক্ষ্মীর পুত্র। তৃতীয় ইন্দ্র সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর সব থেকে বড় কীর্তি হল কনৌজ জয়, সম্ভবতঃ ৯১৬ বা ৯১৭ সি.ই.-তে। তাঁর স্বল্পস্থায়ী রাজত্বের পর ৯১৮ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন, দ্বিতীয়-অমোঘবর্ষ, এবং তারপরে চতুর্থ-গোবিন্দ। চতুর্থ-গোবিন্দ রাজ্যের প্রশাসনের থেকে বেশি মন দিয়েছিলেন, আমোদ-ফূর্তি এবং নারীসঙ্গে। চতুর্থ-গোবিন্দের পর ৯৩৬ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন তৃতীয় অমোঘবর্ষ, তিনি বুদ্ধিমান রাজা ছিলেন, তিনি কলচুরি এবং গঙ্গ বংশের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, কিছুদিনের জন্যে স্বস্তি পেয়েছিলেন।

তৃতীয় অমোঘবর্ষের পুত্র তৃতীয় কৃষ্ণ রাজা হয়েছিলেন ৯৪০ সি.ই.-তে। তৃতীয় কৃষ্ণ রণকুশল শক্তিশালী রাজা ছিলেন। তিনি কঠিন হাতে সাম্রাজ্য রক্ষা করেছিলেন, উপরন্তু বুন্দেলখণ্ড জয় করে মধ্য ভারতে কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। এরপরেই তিনি “পরমভট্টারক”, “মহারাজাধিরাজ” এবং “পরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর দক্ষিণেও তিনি কাঞ্চি ও তাঞ্জোর জয় করেছিলেন। ৯৬৮ সি.ই.-তে তৃতীয় কৃষ্ণের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রকূট বংশ পারিবারিক কলহের জন্যে অতি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ৯৭৩ সি.ই.-র পর এই বংশের কথা তেমন আর শোনা যায়না।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...