এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
২
ছোটবেলায়
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুনেত্রদের বিরাট পরিবারের একত্র জমায়েত হতো তাদের দেশের বাড়িতেই। কাজেকর্মে,
পুজোপার্বণের অনুষ্ঠানে তাদের দেশের বাড়িটা জমজমাট হয়ে উঠত পিসতুতো মামাতো খুড়তুতো
অনেক ভাইবোনদের হৈ চৈ হট্টগোলে। সুনেত্ররা দুভাই – বোন নেই আর ওদিকে সুকন্যারা দু
বোন – কোন ভাই নেই। কাজেই সুনেত্র আর সুকন্যার বাড়তি ঘনিষ্ঠতা সকলেরই চোখে পড়ত। একটু
বাড়তি খুনসুটি, একটু আলাদা রকমের পিছনে লাগা। এরকম হতেই পারে, অনেক ভাইবোনের মধ্যে
এমন একটু পক্ষপাতিত্বের ভালো লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেভাবে কিছু মনেও হয়নি
কোনদিন।
সেবার ছোটকার
বিয়ের সময় তাদের পরিবারের জমায়েতটা খুব জমে উঠেছিল। ওরকম আনন্দ আর হুল্লোড়ময়
জমায়েত আর কোনদিন হয়নি তাদের পরিবারে। এরপরেও আরেকবার জমায়েত হয়েছিল ঠিকই – কিন্তু
সেটা সুনেত্রর ঠাকুমার মৃত্যুর পর তাঁর কাজে। সেটা তো কোন আনন্দ অনুষ্ঠান নয়।
কাজেই ছোটকার বিয়েটাই তাদের দেশের বাড়ির সর্বশেষ আনন্দ সম্মিলন বললে ভুল বলা হয়
না। সুনেত্র তখন উণিশের কোঠায়। স্কুলের
গণ্ডি ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছে - মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ার। সে তখন কৃতী ছাত্র আর হবু
ডাক্তার হিসেবে পরিবারের সকলেরই চোখের মণি। আগে থেকেই পুত্রহীনা পিসিমার তার প্রতি
আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল, সেটা আরো বেড়ে গিয়েছিল সুনেত্রর এই সাফল্যে।
সেবার
সুকন্যার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তার দুই আঁখিতে সুনেত্র হদিস পেয়েছিল অদ্ভূত এক অনুভবের।
সুকন্যার সঙ্গে ছেলেমানুষী খুনসুটি করতে এবারে আর তার একটুও ইচ্ছে হচ্ছিল না। তার
মনে হয়েছিল সুকন্যা অন্ততঃ তার সঙ্গে একটু ধীর স্থির হোক, বাচালতা কম করুক আর তার
চোখের তারায় নেমে আসুক গভীর আলোর উদ্ভাস। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি, সুকন্যা আগের
মতোই চঞ্চল আর হাল্কা হাসির পিছনে লাগাতেই ব্যস্ত ছিল সারাটাক্ষণ।
বিয়ের
অনুষ্ঠান শেষ হতে সকলেই ফিরে গিয়েছিল নিজের নিজের জায়গায়। সুনেত্রও তার হস্টেলে
ফিরে গিয়েছিল। সারাটাদিন ক্লাসের ব্যস্ততার পর হস্টেলে ফিরে গ্রে”জ অ্যানাটমির
বিশাল বইয়ের পৃষ্ঠায় সে চোখ রাখত ঠিকই, কিন্তু পড়া হত না এক লাইনও। তার
মনে আসত সুকন্যাকে। অবুঝ এক রাগ হত তার
মনে, সুকন্যা কেন বুঝল না, সুকন্যা কেন সাড়া দিল না তার অনুভবে। সুকন্যা এতটা অবুঝ
কেন? কেন সে বুঝতে পারল না, সুনেত্র তাকে বিশেষভাবে পেতে চেয়েছিল! এরকম ভাবনা তার
যেমন হত, তেমনই আবার এক পাপবোধও উঠে আসত তার মনে। পিসিমা কী ভাববেন, সুনেত্রর মা কী
ভাববেন? একথা যদি তাঁরা জানতে পারেন তাঁরা কি “ছিঃ” বলবেন না। বলবেন না, “সুনু,
তোকে যে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, বাবা, শেষ অব্দি তুই এমন করলি”? দীর্ঘশ্বাস ফেলে
সুনেত্র ভাবত – “এই ভালবাসা গোপনই থাক তার অন্তরে, সুকন্যা বোঝেনি সে এক দিক থেকে ভালই
হয়েছে”। মা ও পিসিমার বিশ্বাস নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার মানে হয় না কোন।
এভাবেই চলে
যাচ্ছিল দিনগুলো। সুকন্যার প্রতি অস্ফুট ভালোবাসার সঙ্গে মাখামাখি সুপ্ত এক পাপবোধ
- দুটোই জিইয়ে নিয়ে সুনেত্র কাটিয়ে দিতে পেরেছিল বছর দুয়েক। সেবার সুকন্যা হায়ার
সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় তাদের বাড়িতে এসে ছিল বেশ কদিন। সুনেত্র তখন
হস্টেলে। বাড়ি থেকে মা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন, তার মধ্যেই সুকন্যাও লিখেছিল।
চিটিটা এরকম,
“কল্যাণীয়েষু,
স্নেহের
সুনু,
পত্রপাঠ
কেমন আছিস জানাবি। ঈশ্বরের নিকট তোর সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। ভালো থাকিস,
সাবধানে থাকিস।
তোর
লেখাপড়ার চাপ কেমন জানাবি। লেখাপড়ায় একদম ফাঁকি দিবি না। মনে
রাখিস এখন তুই আর বাড়িতে নেই। কাজেই পড়তে বসার জন্যে আমি আর নিত্য তাগিদ তোকে দিতে
পারব না। এখন তোকেই নিজের ভালো মন্দ বুঝে চলতে হবে। মন দিয়ে নিয়মিত লেখাপড়া করিস। তাই
বলে বেশি রাত্রি জাগিস না। রাত্রি এগারোটার পর আর পড়বার প্রয়োজন নেই। পরেরদিন
কলেজের ক্লাস করাও একান্ত জরুরি মনে রাখিস।
খাওয়াদাওয়া সময়মতো
নিয়মিত করবি। হস্টেলের রান্না তোর মনঃপূত হয় না। নিজের কাছে
বাটার, পাঁউরুটি এনে রাখবি। গতবার যে আমের জেলি নিয়ে গেছিলি সেটা কি ফুরিয়ে গেছে?
এবার বাড়ি এলে আবার দেব, চিন্তা করিস না।
কদিন হল
সুকু এসে আমাদের কাছে রয়েছে। বলছে ওর পরীক্ষা মোটামুটি হয়েছে। রেজাল্ট বের হলেই
বোঝা যাবে – কেমন হয়েছে। দিনরাত পায়ে পায়ে ঘুরছে, আর বক বক করছে - তোর কথা খুব হয়।
যদি
লেখাপড়ার খুব ক্ষতি না হয়, সুকু থাকতে থাকতে একবার আসতে চেষ্টা করিস। দু” একদিন
থেকেই চলে যাবি। মেয়েটা সারাদিন আমার সঙ্গে একঘেয়ে কাটায় – তুই এলে খুশি হবে।
আজ আর বেশি
লিখব না, সুকুর জন্যে জায়গা রাখতে হবে, ও কিছু লিখবে বলছে।
ভালোবাসা
নিস, আদর নিস। সাবধানে থাকিস।
ইতি
আশীর্বাদিকা
মা।
কি ডাকবাবু,
এখনও তো
পুরো ডাক্তার হও নি, তাই ডাকবাবু ডাকলাম। পুরো হলেই তারটা জুড়ে দেব। সে তার, বিনার
তার না ইলেকট্রিকের তার সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু এই যে আমি হায়ার সেকেণ্ডারির মতো
কঠিন এক পরীক্ষা দিয়ে তোমাদের বাড়ি থানা গেড়েছি আজ প্রায় দিন চারেক হতে চলল, তোমার
টিকি দেখা যাচ্ছে না কেন? দেশে কি আর কেউ ডাক্তার হচ্ছে না নাকি? নাকি ওখানে কোন
ডাক্তারনির কুনজরে পড়েছ। বাড়ির কথা মনেই পড়ছে না? আমার মতো পচা মেয়ের কথা না হয়
নাই শুনলে, মামীমার কথাটা তো ভাবতে হয় নাকি? চটপট চলে এসো দেখি কদিনের জন্যে,
তোমার চুলের মুঠি আর কানের জন্যে আমার হাত একদম নিসপিস করছে। তাই বলে আবার ভয় পেয়ো
না যেন। “ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি
মারব না, সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব না। মনটা আমার
বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই, তোমায় আমি চিবিয়ে খাব, এমন আমার সাধ্যি নেই”।
তোমাকে অবিশ্যি
কচমচিয়ে চিবিয়ে খাওয়াই যেত, যদি তুমি অখাদ্য না হতে,
ইতি তোমার সুকু”।
শুক্রবার
দুপুরে বাস ধরে ধর্মতলা, সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে সুনেত্রর রাত হয়ে গেল। শনিবারটা থেকে
রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বাস ধরে হস্টেলে ফিরে এসেছিল সুনেত্র। কিসের জন্যে
গিয়েছিল সুনেত্র – শুধুমাত্র মায়ের ডাকে? নাকি দোলাচলে থাকা তার
মনের মধ্যে, ভালোবাসার পাল্লাটাই ভারি কিনা সেটা পরখ করতে গিয়েছিল? নাকি খুঁজতে
চেয়েছিল সুকুর মধ্যেও কোন নতুন ভাবনার সঞ্চার?
শুক্রবার
রাত্রে বাবা, মা, দাদা সকলেই ছিলেন।
হস্টেলে থাকা এবং খাওয়া নিয়ে মায়ের জেরার জবাব দিতেই জেরবার সুনেত্র। সেদিন
তাই কথাবার্তা হল না। কিন্তু সুকন্যার চোখে এবার অদ্ভূত এক আলো আবিষ্কার করেছিল
সুনেত্র। যে আলোর সন্ধান সে করেছিল সেই ছোটকার বিয়ের সময়, সেদিন ছিল না - আজ আছে।
কিসের যেন সংকোচ - সরাসরি কথা বলতে পারছিল না তারা। ব্যাপারটা মায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি, মা বলেছিলেন, “কি ব্যাপার
রে তোদের? এই এত ভাব, এত ঝগড়া, এখন আবার কোন কথাবার্তা বলছিস না”?
“মামীমা,
ডাক্তার হলে না, ছেলেদের লেজ গজায়, তাই কথাবার্তাও কম বলে”। মা আর বাবা
খুব হাসলেন। তার দাদা সুমিত্রও।
সুনেত্র অপ্রস্তুত
হয়ে বলল, “কী কথা বলব? কী চিঠি লিখেছে দেখনি, মা? আমাকে বলেছে ডাকবাবু, পুরো
ডাক্তার হলে নাকি আমার তারটা ও জুড়ে দেবে। সে তার বীণার না ইলেকট্রিকের সে পরে
দেখা যাবে। বীণার বানানটা কি জানো – লিখেছে বএ হ্রস্বই, দন্ত্য নএ আকার...”। সুনেত্র
ছাড়া সকলেই খুব হাসল।
সুকন্যা লাজুক
হেসে বলেছিল, “এঃমা। বীণা বানানটা ভুল হয়েছিল বুঝি, তাহলে ঠিক বানানটা কি”? সুনেত্রর দাদা সুকন্যার মাথায় হালকা টোকা মেরে
বলেছিল, “বএ দীর্ঘঈ মূর্ধ্য ণএ আকার – হ্যারে, হায়ার সেকেণ্ডারিতে পাস করতে পারবি
তো”?
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন