রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " স্তন্য-ডাইনী "


আমাদের এই শহর – পথিকপুরের শহীদ জগবন্ধু স্টেডিয়ামে আসছেন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় জিকাল্ডো। কোন দেশে থাকেন ঠিক জানি না। পর্তুগাল, ইটালি কিংবা ব্রাজিল এমনকি চিলি হলেও হতে পারে। সত্যি বলতে এই দেশগুলোও ঠিক কোনদিকে, মানে আমাদের দেশের পূর্বে না উত্তরে, নাকি কিছুটা দক্ষিণ দিক ঘেঁষে – সেটাও সঠিক বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি আমি তাঁর অন্ধ ভক্ত। জিকাল্ডোকে আমি আদর করে বলি জিকুদা। জিকুদার খেলা টিভিতে দেখাই যায়, কিন্তু সে খেলাও যে আমি খুব দেখেছি তা নয়। তবে খবরের কাগজে ছাপানো তাঁর সব ছবির কাটিং আমি সাঁটিয়ে রেখেছি আমার ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে।

আমি নিজে ফুটবল সেভাবে খেলি না, ছোটবেলায় গলিতে খেলতাম, রবারের বলে। সেই পর্যন্তই। অতএব খোলা মাঠে ফুটবল খেলাটা কী ভাবে খেলতে হয় সে বিষয়েও আমার তেমন ধারণা নেই। তার কারণ মাঠে গিয়ে আমাদের এদিকের ভাল ভাল টিমের খেলা দেখতে আমি তেমন উৎসাহ পাই না। লাইন দিয়ে টিকিট কাট, দুঘন্টা আগে থেকে মাঠের গ্যালারিতে সিট আগলে বসে থাক। আর বসে বসে খেলা দেখা? ইস্‌ সে খেলার যা ছিরি - অখাদ্য যত প্লেয়ার নিজেদের মধ্যে বল নিয়ে ঝুটোপুটি করছে। একবার বাঁদিকে ছুটছে তো পরক্ষণেই আবার উল্টোমুখে ছুটছে। এ আবার কি, মাঠের মধ্যে আনতাবড়ি ছুটোছুটি করলেই ফুটবল খেলা হয়ে গেল? তবে আমার বন্ধুদেরও বলিহারি। তাদের সবাই এবং গ্যালারির সব দর্শকও ওই খেলা দেখেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, গোল-টোল হলে তিড়িং বিড়িং লাফায়। আর নিজের দল গোল খেয়ে গেলে মাথা চাপড়ে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি গালাগাল দেয়।

সেখানে জিকুদাকে দেখ – কি শান্ত, সৌম্য চেহারা, যেন দেবদূত। দেখিনি কোনদিন, তবে শুনেছি জিকুদার পায়ে আঠা আছে, একবার বল এলে জিকুদার শ্রীচরণে সেটা চিপকে যায় – সে আঠা ছাড়ে বিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে – গোওওওল হলে। সেই জিকুদা আমাদের শহরের স্টেডিয়ামে আসছে আর আমি মাঠে যাবো না তাকে একবার চোখের দেখা দেখতে?

আমাদের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার দশেক মতো সিট। প্রথমে ভেবেছিলাম, আরামসে টিকিট পেয়ে যাব, এই পোড়া শহরে কপিস লোক আর আছে – যারা জিকুদার কদর বোঝে? তাই প্রথম দিকে একটু গড়িমসি করে, দিন তিনেক পরে টিকিট কাটতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! শুনলাম প্রথম দিনেই টিকিট সব শেষ, টিকিটের খুদ-কুঁড়োও এখন আর মিলবে না।

পরদিন সকালেই রওনা হলাম শানুদার বাড়ি। আমাদের এলাকার নেতা, তাঁর নাম শুনলে আগে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত। ইচ্ছা থাকলেও আজকাল অবশ্য খেতে পারে না  – কারণ বাঘগুলো থাকে সুদূর অভয়ারণ্যের ভেতর আর গরুরা গোমাতা হয়ে আমাদের সঙ্গে। শানুদার পুরো নাম শান্তিরঞ্জন, তবে তাঁর চারপাশে এবং তাঁর কীর্তিকলাপে সর্বত্রই অশান্তি বিরাজ করে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে আড়ালে বলে শানু মানে সেয়ানা – নিজের স্বার্থটি তিনি ষোলআনা বোঝেন কিনা।

কী সব জরুরি মিটিং-টিটিং চলছিল বলে, তাঁর বৈঠকখানা ঘরে আমি ডাক পেলাম ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর। আমাকে দেখেই আধবোজা চোখে বললেন, “কিরে তোর আবার কী হল, গতি? টিকিট পেলি না? তাহলে কী হবে? জিকাল্ডোকে দেখবি কী করে?”

আমার নাম গৌতম পল্লে, সংক্ষেপে গতি। কিন্তু গতি নাম হলে কী হবে – শানুদার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও আমার আজ পর্যন্ত কোন গতি হয়নি। তবে আশা আছে আজ আর শানুদা আমাকে হতাশ করবেন না, কিছু একটা গতি করে দেবেনই।

কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, “বুঝতেই তো পারছেন, দাদা। কোন গতিকেই সুবিধে করতে পারলাম না। তাই আপনার কাছে আসা। কিছু একটা করে দিতেই হবে দাদা, আমাদের শহরে জিকুদা আসছেন আর আমি দেখতে পাবো না, এ হতেই পারে না। বিশেষ আপনি থাকতে”।

“বুঝি রে সব বুঝি, তোরা আমায় এত ভক্তি-শোদ্দা করিস, ভরসা করিস, বিশ্বাস করিস। তোরা ছাড়া আমার কী আছে বল তো? সমাজের পাঁচ জনের জন্যে কিছু করতে পারলে, আমি মনে করি, তোদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারলাম। টিকিট আমার কাছে আছে, কিন্তু যা দাম, তুই কি দিতে পারবি, গতি?”

আমি খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কত দাম, শানুদা?”

“দুরকম টিকিট আছে - পঁচিশ আর চল্লিশ হাজার। চল্লিশের টিকিটে বসলে মনে হবে, তুই মাঠের মধ্যেই বসে আছিস – গ্যালারিতে নয়”।

“কিন্তু শুনেছি, গ্যালারির টিকিট দু রকমের? পিছনের দিকের সিটের দাম পনেরশ আর সামনের দুহাজার...”।

“ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু এখন তার ওই রকমই দাম...কিছু পড়ে আছে... খুব চাপ চলছে রে, হয়তো আজ কালের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে”।

আমি রীতিমত চমকে গিয়ে বললাম, “এত দাম দিয়ে কারা কিনছে, শানুদা?”

“নেবার লোকের অভাব নেই রে, গতি – ওই দামেও লোকে হা হা করে কিনছে। এ রাজ্যের লোক তো বটেই – ভিন রাজ্যের লোকরাও...। বর্ষার সন্ধ্যেয় চপ-ফুলুরির দোকানে কেমন ভিড় হয় দেখিসনি? তার থেকেও বেশি – সাত হাজার টিকিট আমার হাতে এসেছিল – শ তিনেক বাকি আছে...”

খুব কাকুতির সুরে বললাম, “আমার জন্যে দামে-দামে একটা দিন না, দাদা”।

“ফাগল হয়েছিস? এ টাকার হিসেব দিতে হবে না আমায়? এই টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতার এদিকে ওদিকে। তুই কী ভাবছিস, আমি ঝাড়ছি টাকাটা? এমনটা ভাবতে পারলি, গতি? তোদের সঙ্গে এতদিন উঠছি বসছি, এই বুঝি তার পোতিদান?”

আমি লজ্জায় কুঁজো হয়ে বললাম, “তোমাকে আমরা দেবতার মতো ভক্তি করি, দাদা। এমন কথাটা তুমি ভাবলে কী করে? আমার বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে সারদায় পাঁচলাখ লাগালো, সবটাই গেল জলে। তোমায় আমরা কিছু বলেছি? এ পাড়া - সে পাড়ার কত গরু যে পাচার হয়ে চলে গেল সীমান্ত পেরিয়ে – তুমি তার কী করবে বলো? মায়ের গয়না বেচা আট লাখ টাকা গেল আমার ক্লাস ফোর পাস ভাইয়ের হাইস্কুলের টিচার হতে গিয়ে। তাতেই বা তোমার কী করার ছিল, বলো। আমাদের ভক্তিতে কোনদিন কোন খাদ দেখেছ? রেশনে চাল পাইনি, চিনি পাইনি – তাতে কি? বাজার থেকে সেই চাল- চিনি কিনেই তো ভাত খেয়েছি, চা খেয়েছি। বলো খাইনি – চুপ করে, মুখ বুজে। আমরা তো জানি – সব দিক দিয়েই তোমার হাত-পা বাঁধা। আমি একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে সিকিউরিটির কাজ করি, মাস গেলে হাজার ছয়েক পাই। তাতেই কোন মতে আমাদের দিন চলে যাচ্ছে...। তোমার কাছে কোনদিন কিছু চেয়েছি? কোন অভিযোগ করেছি? আমরা জানি, তুমি যখন আছ মাথার ওপরে, আমরা টিকে থাকব ঠিক...”। বলতে বলতে আমার চোখে জল ভরে এল। গলা বুঝে এলেও বললাম, “তোমাকে আমরা অবিশ্বাস করতে পারি, একথা তোমার মনে হল কী করে, দাদা?”

শানুদাও চশমা খুলে চোখটা মুছল রুমালে, বলল, “আমিই বা কী পেয়েছি বল? সারাটা জীবন দলের জন্যেই তো প্রাণপাত করে দিলাম। একফালি এই জমিতে ধারদেনা করে ছোট্ট এই বাড়িটা করেছি – কোন মতে। তিনতলা বাড়ি, মোটে বারোখানা ঘর। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথ, ব্যালকনি। এসি। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে সবজি বাগান। মাথাগুঁজে এ বাড়িতে থাকার এত কষ্ট যে, ছেলে-মেয়ে দুটোকে চোখের সামনে রাখতে পারলাম না। কলকাতায় রেখে আসতে হল তাদের লেখাপড়ার জন্যে। তাও ইংরিজি মিডিয়াম, প্রাইভেট স্কুলে। গাড়ি রাখতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে – কিন্তু তাও দলের কাজের জন্যেই তিনটে গাড়ি রাখতে হয়েছে। আরও দুটো হলে ভালো হত – কী করব উপায় নেই... টাকার বড়ো টানাটানি, রে গতি...”।

আমি নিজেকে সামলে শানুদার সামনে মেঝেয় বসে পড়ে বললাম, “সে কি আর আমরা জানি না, বুঝি না, শানুদা? বুকের রক্ত দিয়ে, কী ভাবে তুমি দলটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ? ছাতা হয়ে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছ আমাদের মাথার ওপর – ঝড়-ঝাপটা-রোদ-বৃষ্টি সামলে। আমাদের এতটা অকিতজ্ঞ ভেব না, শানুদা। তোমাকে দাদার মতো মনে করি বলেই না, তোমার কাছে একটা টিকিটের আবদার নিয়ে এসেছিলাম। এ ব্যাপারেও যে তোমার হাত-পা বাঁধা, সেকথা বুঝতে পারিনি গো দাদা। বুঝলে কি আর আসতাম, তোমাকে দুঃখ দিতে?”

শানুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, বলল, “সত্যিই রে, আমার হাত-পা বাঁধা, কিচ্‌ছু করার নেই। এভাবে ফেরাতে আমারও কি মন চাইছে? একদম না। কিন্তু... একটা উপায় বলতে পারি, যদি পাঁচকান না করিস”।

অসহায় হাত-পা বাঁধা শানুদার হাত হয়তো কোনভাবে খোলার আশায় আমি খুব উদ্গ্রীব হয়ে বললাম, “কী উপায়, দাদা?”

চারদিকে তাকিয়ে, ঘরে উটকো কেউ নেই দেখে, শানু দুহাতের আট আঙুলের আটটা আংটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “ঠোঁটকাটা নেপালকে নিয়ে থানায় যা, ওখানে স্টেডিয়ামে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু সাবধান, ঘুণাক্ষরেও কেউ যেন জানতে না পারে”।

“কেউ জানবে না, দাদা। ওফ্‌, তোমাকে কী বলে যে শোদ্দা জানাবো, শানুদা। কী যে আনন্দ হচ্ছে, চোখের সামনে জিকুদাকে দেখব, হেঁটে চলে বেড়াতে – ভাবা যায় না। আমি তাহলে এখন আসি, দাদা?”

“আয়”।

 

 

শানুদার বাড়ি থেকে বেরোতেই সামনের চায়ের দোকানে ঠোঁটকাটা নেপালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নেপাল বলল, “কি রে, দাদার সঙ্গে দেখা করলি? কী বলল, দাদা?”

“খুব গোপন কথা, বাইরে আয়, বলছি”। নেপাল দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াতে বললাম, “দাদার কাছে গিয়েছিলাম, একটা টিকিটের জন্যে। বলল, তোর সঙ্গে থানায় যেতে...”।

“জিকুদার টিকিট? আবে আমাকে বলবি তো”!

“আমি আমতা-আমতা করে বললাম, “ভেবেছিলাম, দাদাকে বলে, স্টেডিয়ামের একটা টিকিট যদি যোগাড় হয়ে যায়...”।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে নেপাল বলল, “তা কি বলল, শানুদা?”

“যা দাম বলল, তাতে আমাকে বাপের ভিটেমাটি বেচতে হবে... পঁচিশ আর চাল্লিশ হাজার”।

“তুই কি বললি?”

“বলার আর আছেটা কী? দাদা তো আমার অবস্থা জানেই। তোর সঙ্গে থানায় যেতে বলল, ওখানে নাকি মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে?”

“তা হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানেও কিছু টাকা খসাতে হবে – দুহাজার পার হেড। তোর কটা লাগবে?”

“একটাই...কিন্তু দু হাজার? কমসম হবে না?”

শানুদার মতোই দুখু-দুখু উদাসমুখে নেপাল বলল, “কমের কথা মুখেও আনিস না, গতি। আমাদের হাত-পা বাঁধা। জানিস তো সবই – এ টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতায়। তোর কী মনে হয় – থানার সঙ্গে সাঁট করে আমরা ঝাড়ছি টাকাটা?”

“আরে না না, তা কেন ভাবব? তোর সঙ্গে কি আমার সেই সম্পক্কো?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেপাল বলল, “সেই...শানুদাকে তো চিনিস, সবার জন্যেই কত চিন্তাভাবনা করে। তোদের মতো কাছের ছেলেদের জন্যেই, নানান রকম ফন্দি-ফিকির বানিয়ে রেখেছে। সাধ্যের মধ্যেই যাতে তোদেরও সাধ মেটে। মাঝে মাঝে খুব ধিক্কার দিই নিজেকে, জানিস তো? এতদিন ধরে পাটি করে কী পেয়েছি বল? তুই তো জানিস চার কাঠা জমিটা কীভাবে যোগাড় করলাম। তারপর কীভাবে চারতলা বাড়িটা পোমোট করলাম। বদলে কী পেলাম? মোটে দুখানা ফ্ল্যাট আর একতলার দোকানটা”।

সবটা না জানলেও কিছু কিছু জানি। নেপালরা বছর পাঁচেক আগেও থাকত রেললাইনের ধারে জবরদখল জমিতে। এর মধ্যেই বিধবা এক বুড়িকে ধমকে-চমকে চার কাঠার ওই জমিটা হাতাল, আর রাতারাতি তুলে ফেলল চারতলা বাড়িটা। নিজের জন্যে, রাস্তার ধারে একটা দোকানঘর, আর দোতলায় দুটো ফ্ল্যাট রাখল, বুড়িকেও দিল একটা। বাকি তেরটা ফ্ল্যাট বেচে দিল। রাস্তার ওপরেই নেপালের মনিহারি দোকানটা এখন চালায়, ওর বৌ আর মা। রমরমিয়ে চলছে দোকানটা। সত্যিই তো, কী এমন পেল এত বছর পাটি করে?

নেপাল একটু চুপ করে থাকার পর আবার বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোদের মতোই একটা চাকরি নিয়ে সারাজীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু পারি না ওই শানুদার জন্যে। মানুষটা এত ভাল, আর উদার সমাজসেবী – মনে হয় – ওকে দেখে আমাদের সকলের শেখা উচিৎ। শুধু নিজেরটুকু নিয়ে থাকলেই হয় না – সবার জন্যেই কিছু না কিছু করা দরকার। তা নইলে সমাজে থেকে আর লাভ কি, বল? সে দুঃখের কথা যাগ্‌গে, থানায় কখন যাবি...আজই বিকেলে, নাকি কাল সকালে?”

“বিকেলে ... আজ ডিউটি থেকে ছুটি নিয়েছি। পরপর দুদিন ছুটি নিলে চাকরিটাই...”

“ঠিক আছে, সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ এখানেই আয় – দু হাজার টাকা নিয়ে... একসঙ্গে থানায় যাব, ঠিক আছে?”

 

 

সেদিন দুহাজার টাকা নিয়ে, থানা থেকে আমাকে একটা চুটকা কাগজ দিয়েছিল। সে কাগজের মাঝখানে গোল স্ট্যাম্প মারা। সেই কাগজটা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের গেটে যেতেই, গেটে থাকা পুলিশরা কাগজটা পকেটে পুরে, আমাকে মাঠে ঢুকিয়ে দিল। সেদিন থানাতেই বলেছিল, এই কাগজ কিন্তু গ্যালারিতে বসার জন্যে নয় – শুধু মাঠে ঢোকার জন্যে। মাঠে ঢুকে কোথায় দাঁড়াব, কী করব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তবে হ্যাঁ – থানা থেকে দেওয়া চুটকার কথা বাইরের লোকের কানে যেন কোন মতেই না যায়।

পোগ্‌গামের ঘন্টা দুয়েক আগে আমি মাঠে ঢুকে দেখলাম, স্টেডিয়ামের গ্যালারির অনেক সিটই ফাঁকা। আর গ্যালারির নীচে আমরা বেশ কজন ঘোরাঘুরি করছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার চেনাজানা, যেমন পদা, রতন, সমু, বাপি। কাজেই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। রতনই প্রথম কথা বলল, “কি বে, থানার চোথা?”

আমি ভয়ে ভয়ে নীচু গলায় বললাম, “চুপ বেটা, কেউ যেন জানতে না পারে”। আমার কথায় ওরা সবাই হো হো করে হেসে উঠল, পদা বলল, “শহরের সব কচি বাচ্চারাও জানে, আর তুই আমাদের চুপ করতে বলছিস?”

সমু বলল, “শুনেছি, মোটামুটি হাজার তিনেক চোথা ছেড়েছে থানা থেকে”।

রতন বলল, “শানুদা বলছিল গ্যালারির টিকিট সব বিক্রি হয়ে গেছে, তার ওপর আমাদের মত থানার চোথাধারীরা, মাঠে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যাবে না, মাইরি”।

দেখলাম ওরা ভেতরের খবর সব জানে, সে খবরের কিছু কিছু যে আমিও জানি, সেটা দেখাবার জন্যে বললাম, “তা তো হবেই, পনেরশর টিকিট পঁচিশে আর দুহাজারের টিকিট চল্লিশ হাজার ব্ল্যাকে বিক্রি হয়েছে, এমন ডিম্যাণ্ড”।

পদা ফিচেল হেসে বলল, “এমন এঁটো-কাঁটা বাসি খবর কেন ছড়াচ্চিস, গতি? লাস্টের দিকে পনেরশ বিক্রি হয়েছে পঁচাত্তরে আর দু হাজার এক লাখে”।

আমি চমকে উঠলাম, “বলিস কি?” তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “অবিশ্যি শানুদা আর কী করবে? হাত-পা বাঁধা, কলকাতা যেমন বলবে...”।

সমু বলল, “তুই চিরকাল সেই একই রকম ক্যালানে কাত্তিকই রয়ে গেলি, গতি। কোনকালে আর মানুষ হবি না! তোকে ওই সব ভুজুং দিয়েছে বুঝি?”

রতন আমার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে বলল, “চ গ্যালারির নীচে কোথাও বসি, বাপি, বাবার পেসাদ এনেছিস, নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?”

আমরা গ্যালারির তলায় মাথা নীচু করে ঢুকলাম, নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বসলাম গোল হয়ে। রতন পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে সবাইকে দিল, বাপি নিল না। বাপি জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল, তারপর সিগারেটের পেট টিপে তামাক বের করে, থানার চুটকাতে জমা করতে লাগল। আমি বললাম, “সে কি রে? চুটকাটা গেটে দাঁড়ানো পুলিশগুলো নেয়নি?” বাপি কোন উত্তর না দিয়ে, বিচ্ছিরি একটা মুখভঙ্গি করল, যার অর্থ হতে পারে, আমার বাপ-মা তো বটেই –  আমার চোদ্দ পুরুষকেও উদ্ধার হয়ে গেল। আমি গুম হয়ে বিড়ি টানতে লাগলাম।

 

 কোথা দিয়ে যে সময়টা কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এটুকু বুঝলাম গ্যালারি তো বটেই - বেড়ার এদিকের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরে গেছে। এমনকি আমাদের আশেপাশেও প্রচুর লোক গিজগিজ করছে। রতন বলল, “আর না, এবার চল, সামনের দিকে যাই। সওয়া চারটে বাজে, চারটের মধ্যে পৌঁছনোর কথা না?” কিন্তু তখন আর সামনের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই – ঠাসাটাসি ভিড়। তার মধ্যেও আমরা কোনমতে কিছুটা এগোতে পারলাম, কিন্তু বেড়ার ধার অব্দি পৌছনো গেল না। ওদিকে মানুষের দুর্ভেদ্য পাঁচিল। এর মধ্যেই গ্যালারির মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তারস্বরে চিৎকার করছে “জি কাল্ডো, জি কাল্ডো”। আমরা ডিং মেরে মাঠের দিকে তাকালাম। এক জায়গায় অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে ভনভন করছে – মৌচাকে জমে ওঠা মৌমাছি। তারা সব দামি দামি চকচকে নানান রংদার পোষাক পরা। তাদের মধ্যে মহিলারাও রয়েছে। মৌচাকটাকে চেপে বেঁধে রেখেছে গাদা-গাদা বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীরা। যেমন তাদের দশাসই চেহারা তেমনি তাদের হেক্কড়। আর রয়েছে, ফটো তোলার লোকেরা। ওরা ওই মৌচাকের চারপাশে উড়ছে – কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে, শরীর দুমড়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে চলেছে অবিরাম। কিন্তু জিকুদা কোথায় – দেখতে পাচ্ছি না তো?

আমার থেকে বেশ কিছুটা ঢ্যাঙা রতন, পাশেই দাঁড়িয়েছিল, তাকে বললাম, “জিকুদা কোথায় রে? দেখতে পাচ্ছিস?”

“আছে, মনে হচ্ছে ওই ভিড়ের মাঝখানে। ভিআইপিরা ওকে ঘিরে ধরে প্রচুর সেলফি তুলছে। তাদের মধ্যে আমাদের শানুদাও রয়েছে – দেখতে পাচ্ছিস? আর আছে কলকাতা থেকে আসা বেশ কিছু নেতা। বেশ কিছু ফিলিম-এস্টারও এসেছে...”।

অধীর ব্যাকুলতায় আমি ওই দিকেই তাকিয়ে রইলাম, চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেলাম। একবার – একঝলক দেখা দাও জিকুদা...তোমার কাছে ওই ভিআইপিরাই বুঝি সব? আমরা এই যে এত মানুষ এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ট্যাঁকের পয়সা খসিয়ে – মাস শেষের দিনগুলো কী করে কাটাবো জানি না...কিন্তু তোমাকে একবার দেখতে পেলে – সে দুঃখের কথা মনেও পড়বে না, জিকুদা একবারটি সামনে এসো। কিন্তু মৌচাক ভাঙল না, বরং আরও যেন জমাট বাঁধতে লাগল।

হঠাৎ আমাদের মাথার ওপরে গ্যালারি থেকে অজস্র জলের বোতল উড়ে গিয়ে পড়তে লাগল মাঠের মধ্যে। যেগুলো খালি, সেগুলো বেশি দূর গেল না। তবে যেগুলো খালি নয়, সেগুলোর বেশ কিছু গিয়ে পড়ল ভিআইপিদের গায়ে, মাথায়। ভিআইপিদের ফুলের গায়ে মুচ্ছো যাওয়ার অবস্থা। রীতিমতো চিড়বিড়িয়ে উঠে তিড়িংবিড়িং লাফাতে শুরু করল। তাই না দেখে টনক নড়ে উঠল তাদের ঘিরে থাকা যত নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশদের। এরই মধ্যে আমাদের ওপর চড়াও হল একদল পুলিশ, হাতের ডাণ্ডা উঁচিয়ে। “শালা, হারামীর বাচ্চারা, বোতল ছুঁড়ছিস?” বলেই সপাসপ ডাণ্ডা হাঁকাতে লাগল। আমরা চেঁচালাম অনেক, “আমরা বোতল কোথায় পাবো, যে ছুঁড়বো? আমরা কি কেউ জল কিনে খাই?” কেউ বলল, “বোতল ছুঁড়েছে গ্যালারির একলাখি সিটের লোকেরা, তাদের গিয়ে ক্যালান না...”। তাতে ফল হল আরও মারাত্মক। “শালা, অন্যের নামে ঢপ দিচ্ছিস ? আমরা দেখলাম তোদের ছুঁড়তে...” বলামাত্র পুলিশদলের লাঠির দাপট বারবার টের পেতে লাগলাম আমাদের পিঠে কাঁধে, ঘাড়ে...।

বাস্তবিক বোতলের জল কোনদিন আমরা কিনে খেয়েছি? মনে তো পড়ে না। আজকাল বিয়েবাড়িতে প্রায়ই পুঁচকে পুঁচকে জলের বোতল দেয়, সেগুলোর কিছু বাড়িতে চলে আসে। সেই বোতলেই জল ভরে, আমার বাবা এবং আমি, কাজে বেরোই। আমাদের কাঁধের ছোট্ট ব্যাগ, টিফিন কৌটো আর ওই তেলচিটে ময়লা জলের বোতলটা আমাদের নিত্যসঙ্গী। সেই সঙ্গীকে আমরা ছুঁড়বো ভিআইপিদের দিকে?

বুঝলাম, পুলিশরা একলাখি টিকিটওয়ালাদের কিছুই করতে পারবে না, কারণ ওদেরও হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আমরা? মার খেতে খেতে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে আমরা গেট দিয়ে ছুটে পালাচ্ছিলাম, তার মধ্যে বেনোজলে কই মাছ ধরার মতো আমাদের কজনকে কপাকপ ধরে ভ্যানে তুলে দিল পুলিশরা। তারপর আমাদের নিয়ে গেল থানায়, ভরে দিল লকআপে। আমার চেনা বলতে বাপিও ছিল আমার সঙ্গে।

সন্ধে গেল, রাত্রি হল। আমার বাবা থানায় এলেন আমাকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কিছুই হল না, শুনলাম, শানুদা থানায় আসছেন, তিনি যা বলবেন তাই হবে। ভরসা পেলাম, শানুদা নিশ্চয়ই...।

শানুদা এল রাত বারোটার একটু আগে। লকআপের সামনে শানুদা এসে দাঁড়াতেই, বন্ধ লোহার দরজায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম, “শানুদা, আমরা কিচ্ছু করিনি, বিশ্বাস করো...শুধুমুধু আমাদের ধরে এনেছে...”।

শানুদা গম্ভীরমুখে আমাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী যে করিস না, তোরা। তোদের জন্যে আমার মাথাটা কাটা গেল। যাতে দেখতে পাস বলে অনেক কষ্টে মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলাম, তোরা এই করলি?”

“কিচ্ছু করিনি, শানুদা, মাইরি বলছি”।

“সে কথা তোরা বা আমরা বললেই তো কেউ মেনে নেবে না রে। এটা এখন কেন্দ্রের হাতে, তারাই তদন্ত করে দেখবে, কারা আসল দোষী। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে তোরা শিগ্‌গিরি ছাড়া পেয়ে যাস। তবে বুঝতেই তো পারছিস...”।

“আপনার হাত-পা বাঁধা...” দু হাতে লোহার দরজার শিক ধরে বাপি উত্তর দিল।   

--০০-- 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...