বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


ভীষ্মের কৃষ্ণবন্দনা ও দেহত্যাগ

সূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরার উদ্যোগে ভেঙে পড়লেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁর মন ধর্ম থেকে বিচলিত হয়ে গেল।

তিনি স্নেহ ও মোহের বশে বিলাপ করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না। আমি ভীষণ পাপ করেছি। এই যুদ্ধে আমি কত ব্রাহ্মণ, বন্ধু, জ্ঞাতি, ভাই, গুরু এবং পিতৃতুল্য ব্যক্তিকেও হত্যা করেছি। হাজার হাজার বছর নরকবাসেও আমার এই পাপমুক্তি হবে না। আমি তো কোনদিনই রাজা ছিলাম না, হে কৃষ্ণ। অতএব, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে এই যুদ্ধ করেছি, তাও বলা চলে না। আমি এই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র রাজ্যলোভে। এই যুদ্ধে আমি বহু নারীর স্বামী, পুত্র, ভ্রাতা কিংবা পিতাকে হত্যা করে, তাদের গৃহস্থ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন শাস্ত্রকথায় আমার আর বিশ্বাস নেই। কাদা দিয়ে যেমন দূষিতজলকে শুদ্ধ করা যায় না, তেমনি অশ্বমেধের যজ্ঞে ঘোড়াকে আহুতি দিলেই, এতগুলি নরহত্যার পাপ খণ্ডন হতে পারে না

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে, কুরুক্ষেত্রে দেবব্রত ভীষ্ম যেখানে শরশয্যায় শুয়ে আছেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন সমবেত মুনি, ঋষি ও পাণ্ডবদের চার ভাই। ভরতবংশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখার জন্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, বৃহদশ্ব, ভরদ্বাজ, অনেক শিষ্য নিয়ে পরশুরাম, বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম, অত্রি, কৌশিক, সুদর্শন, শুকদেব, কশ্যপ, আঙ্গিরস। সেখানে আমিও সেদিন উপস্থিত ছিলাম। সকল মুনি ঋষিদের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে ভীষ্মের চোখে জল চলে এলতিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সকলকে প্রণাম জানালেন। বন্দনা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই মহামতি ভীষ্মকে প্রণাম করে তাঁর পাশে বিষণ্ণ মুখে বসলেন।

তাঁদের ম্লানমুখে বসে থাকতে দেখে, মহামতি ভীষ্ম স্নেহস্বরে বললেন, হে পাণ্ডুর পুত্রেরা, সারা জীবন তোমরা ব্রাহ্মণ, ধর্ম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেও, এমন বিষাদগ্রস্ত কেন? মহাবীর পাণ্ডু যখন মারা যান, তোমরা তখন শিশুমাত্র। বধূমাতা পৃথা তোমাদের মানুষ করার জন্যে কি কষ্টই না সহ্য করেছেন! এসবই ঘটেছে কালের নিয়মে। কালের নিয়মেই জীবের সুখদুঃখের দিন আসে আবার চলেও যায়। তোমাদের সঙ্গে আছে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবল, ভীমের বাহুবল, অর্জুনের অস্ত্রবল আর সবার উপরে আছেন সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণের মিত্রবল। এর চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে?

হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমাদের বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমিই যোগ্য রাজা এবং রাজ্য চালনায় তুমি যথেষ্ট দক্ষ। এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন, মনে এই বিশ্বাস রেখে তুমি প্রজাপালন করো। তোমাদের একান্ত মিত্র এই শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম ঈশ্বর, তাঁর প্রতি ভক্তি রেখে তোমরা নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করো। এই শ্রীকৃষ্ণের মনের কী ইচ্ছে, সে কথা তিনলোকের কেউই বুঝতে পারেন না, তোমরা কী করে বুঝবে? ইনি যে এখন যাদবদের মধ্যে যাদব হয়েই রয়েছেন, এ কথা খুব কম লোকেই জানেন। একথা জানেন দেবর্ষি নারদ এবং কপিলমুনি, আর কয়েকজন। ইনি সকলের আত্মা, ইনি সকলকে সমান ভাবে দেখেন। এঁনার মনে অহংকার নেই, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তাঁকে তোমরা সাধারণ মামাতো ভাই মনে করেছ। ভালোবেসেছ, বিশ্বাস করেছ, ভরসা করেছ। যখন যে কাজে তোমরা ওঁনাকে নিয়োগ করেছ, উনি বিনা দ্বিধায় সে কাজ করেছেন। কখনো তোমরা সম্মানীয় মন্ত্রী হিসেবে ওঁনার মন্ত্রণা নিয়েছ। কখনো রাজদূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঠিয়েছ। আবার রথের সামান্য সারথিপদেও তোমরা ওঁনাকে নিযুক্ত করেছ! লক্ষ্য করে দেখ, ওঁনার মনে উঁচু কাজ, নীচু কাজ এমন কোন দ্বিধা নেইওঁনার দৃষ্টিতে সবাই সমান; আপন-পর, শত্রু-মিত্র, উঁচু-নীচু কোন ভেদ নেই”

[এইখানে মহামতি ভীষ্ম ভারতের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। ভারতের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়রূপে বিরাজও করেন।]              

মহামতি ভীষ্ম সামান্য বিরামের পর, শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আবার বললেন, “হে পাণ্ডুর পুত্রগণ, তোমরা ওঁনার মহিমা উপলব্ধি করো যদিও আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের, তাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছে এসেছেন। উনি জানেন আমি ওঁনার একান্ত ভক্ত এবং আমি আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছিতাই ভক্তের প্রতি একান্ত করুণায়, উনি নিজে এসেছেন আমায় দেখা দিতে! আমি তোমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল জেনে উনি তোমাদেরকেও এখানে নিয়ে এসেছেন। এই যুদ্ধের কারণে তোমরা যে মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছ, আমার সান্নিধ্যে সে সব মুছে যাক, এও ওঁনার মনের ইচ্ছা। 

হে কৃষ্ণ, তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আর তোমার ঐ করুণাঘন দৃষ্টিতে আমি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম হে কৃষ্ণ, আমি ধন্য, আমি কৃতার্থ, পরম আনন্দে আমি আপ্লুতআমার একটাই নিবেদন, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু আসে, তুমি আমার এই শরশয্যার পাশে প্রতীক্ষা করো, আমি দু চোখ ভরে তোমায় যেন দেখতে পাই”

এরপর মহামতি ভীষ্ম মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম, স্ত্রীধর্ম, ভগবৎ ধর্ম এবং আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিলেন। এই সব আলোচনা হতে হতেই মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর সময় উত্তরায়ণের কাল ঘনিয়ে এল। কথাবার্তা শেষ করে মহামতি ভীষ্ম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে এবং সমস্ত মন প্রাণ তাঁকেই সমর্পণ করলেন।

কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর তিনি আবার বললেন, “হে যাদব শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান পরমানন্দ স্বরূপ। আমি তোমাতে আমার কামনাহীন মতি সমর্পণ করলাম। হে অর্জুনের সারথি, তোমার তমালকান্তি অপরূপ দেহে নতুন সূর্যের মতো উজ্জ্বল পীত বসন অপূর্ব মানিয়েছে। তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। হে কৃষ্ণ, তোমার প্রতি আমার অহৈতুকি ভক্তি যেন সর্বদা অচল থাকে, এই প্রার্থনা করি।

হে কৃষ্ণ, যুদ্ধের সময় তুমি অর্জুনের রথে ছিলে। আমার ছোঁড়া তিরে তোমার গায়ের কবচ বার বার ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তোমার চুলের থেকে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো মিশে তোমার মুখে অদ্ভূত আলপনা সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার।

হে কৃষ্ণ, বন্ধু অর্জুনের কথায়, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের দুই পক্ষের মাঝখানে তুমি রথ স্থাপনা করেছিলে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রোণ আর আমাকে দেখে, বিষণ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধে বিরত হয়েছিল, তুমি ওকে পরমাত্মা তত্ত্ব উপদেশ দিয়ে ওর মোহ দূর করেছিলে। আর উপদেশ দেওয়ার সময়, তোমার নিষ্ঠুর কালদৃষ্টি দিয়ে আমাদের আয়ু নাশ করেছিলে।

হে মধুসূদন, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এই যুদ্ধে তুমি নিজে অস্ত্র ধরবে না। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আমি অস্ত্র ধরাবোই। আমার তিরের আঘাতে অর্জুন যখন ব্যতিব্যস্ত, অস্থির। তুমি হঠাৎ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে এলে মাটিতে, তারপর দুই হাতে রথের চাকা তুলে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো দৌড়ে আসছিলে আমাকে হত্যা করতে। আমার তিরের আঘাতে তোমার কবচ ছিন্নভিন্ন হল, তোমার শরীর হল রক্তাক্ত। তবু তোমার কি ক্রোধ! তোমার পায়ের চাপে তখন মাটি কাঁপছে থর থর করে, তোমার গায়ের উড়নি উড়ে গেল কোথায়। লোকে বলে তুমি অর্জুনের পক্ষ নিয়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে। আমি জানি হে নাথ, তুমি তোমার ভক্তের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যেই নিজের প্রতিজ্ঞাও বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেভক্তের প্রতি তোমার এই করুণার কোন তুলনা হয় না, হে মধুসূদন।

হে কৃষ্ণ, অর্জুনের রথে ঘোড়ার লাগাম আর চাবুক হাতে তোমার সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি, এখনো আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। সীমাহীন তোমার ঐশ্বর্য, অনন্ত তোমার লীলা। হে জনার্দন, আমার শেষের সময় ঘনিয়ে এল, এখন দয়া করে তোমার চরণ কমলে স্থান দাও  বর দাও, তোমাতে আমার যেন অবিচল ভক্তি থাকে চিরদিন”

মহামতি ভীষ্ম এইভাবে, তাঁর মন, বাক্য, কর্ম ও বৃত্তির সমাপ্তি করলেন। তারপর নিজের আত্মাকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় পড়ে রইল তাঁর নশ্বর দেহ।  যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই এবং উপস্থিত ঋষি মুনিরা সমবেত ভাবে পবিত্র সেই মরদেহের সৎকার করলেন।

মহামতি ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টির পর সকলে হস্তিনাপুর নগরে ফিরে এলেন। সেখান থেকে সমবেত ঋষি, মুনিরা ফিরে গেলেন তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে। যুধিষ্টির জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র ও পুত্রশোকে দুঃখিনী গান্ধারীকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, তারপর ধৃতরাষ্ট্র ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করে, যথা বিধি রাজসিংহাসনে বসে প্রজাপালন শুরু করলেন”    


শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরা

শৌনক বললেন, “হে সূত, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শত্রুদের বধ করে অনুজদের সঙ্গে কিভাবে রাজ্যপালন করলেন, সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “জ্ঞাতিবিরোধের আগুনে কুরুবংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার পর, লোকপালক শ্রীহরি পরীক্ষিতের প্রাণ রক্ষা করে সেই কুরুবংশকেই আবার অঙ্কুরিত করলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে আবার প্রতিষ্ঠা করে পরমপ্রীতি লাভ করলেন। মহামতি ভীষ্ম ও শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠিরের চিত্তে আবার দিব্যজ্ঞানের উদয় হল এবং তাঁর মন থেকে “আমিই এই যুদ্ধের কর্তা”, “আমিই সকল জ্ঞাতিহত্যার জন্য দায়ী” এই ভ্রান্ত মোহ দূর হয়ে গেল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করে, সকল ভ্রাতাদের সঙ্গে সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তাঁর রাজ্যে মেঘ সুষ্ঠু বৃষ্টি উপহার দিল, পৃথিবী প্রচুর শস্যশালিনী হয়ে উঠল এবং গাভীরা প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করল। নদী, সমুদ্র ও পর্বত সকলেই সুস্থ জীবনের অনুকূল হয়ে উঠল। অরণ্যের বনষ্পতি, লতা ও ওষধি প্রচুর ফল ও পুষ্পে সুশোভন হয়ে উঠল। দেশের রাজা অজাতশত্রু হওয়ার কারণে, জীবের মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ত্রিতাপ দূর হয়ে গেল।          

অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়সখা পাণ্ডব ও ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থেকে, সকলকে পরিতুষ্ট করে, যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। তিনি যেদিন দ্বারকার উদ্দেশে রওনা হলেন, হস্তিনাপুরের সকল নর নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠল। মহারাজ যুধিষ্ঠির ও চার ভাই তাঁকে বিদায়কালে আলিঙ্গন করলেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা, গান্ধারী, সত্যবতী সকলেই তাঁর আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে ব্যাকুল হলেন। ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, আচার্য ধৌম্য সকলেই অশ্রুসজল চোখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শ্রীকৃষ্ণকথা ভক্তিভরে একবার মাত্র শুনলে তাঁকে আর ভোলা যায় না। সেই শ্রীকৃষ্ণকে হস্তিনাপুরবাসী এতদিন দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তাঁর স্পর্শও পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের এই বিদায়ক্ষণটিকে সহ্য করা কীভাবে সম্ভব?

শ্রীকৃষ্ণ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পদব্রজে চললেন নগরের রাজপথে। পথের দুপাশের সুন্দর বাড়িগুলির ছাদ থেকে পুরনারীগণ তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি নিবেদন করতে লাগলেন। পথের দুপাশে জোড়হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, সব বয়সের শহরবাসী। বিদায়কালে চোখের জলে যদি তাঁর কোন অমঙ্গল হয়, সেই ভয়ে পুরনারীরা কষ্ট হলেও চোখের জল সংবরণ করলেন।

তারপর তিনি তাঁর  রথে উঠলেন। তাঁর মাথায় সাদা ছাতা ধরলেন তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন। সে ছাতার দণ্ড মণিময়, ছাউনি মুক্তামালায় সাজানো। উদ্ধব আর সাত্যকি তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করতে লাগলেন। শুভক্ষণে চারদিকে বেজে উঠল শাঁখ, মৃদঙ্গ, ভেরী, ঘন্টা, দুন্দুভি।  শ্রীকৃষ্ণের রথ চলতে লাগল, কিন্তু গতি খুব ধীর। তাঁকে বিদায় দিতে, শহরের রাজপথ জনাকীর্ণতাঁর মুখে মোহন হাসি, সকলের দিকে তাঁর করুণাঘন দৃষ্টিসুন্দর রথের ওপর তাঁর অপরূপ মনোহর রূপের দিকে, নারী পুরুষ সকলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

তাঁর কানে এলো, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুরুনারীদের আলাপ, “ওলো, ইনি কে জানিস, ইনিই সেই কৃষ্ণভগবান। সৃষ্টির আগে, জগতে একা ইনিই স্বরূপে থাকেন। এঁনার থেকেই সমস্ত বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি। আবার প্রলয়ের কালে, জগৎ যখন ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত জীবের আত্মা এঁনার মধ্যেই মিশে যায়। ইনিই সেই সনাতন পরমপুরুষ। যাঁর শুরু নেই, শেষও নেই। সামনে থেকে প্রণাম করার এমন সু্যোগ আর পাব কিনা জানি না আয় লো, আয়, এঁনাকে আমরা প্রণাম করি।

প্রিয়সখি, এঁনার ওই করুণা দৃষ্টিতে আমাদের মনের সব ময়লা মুছে যাচ্ছে। সাধু-মুনিরা যুগ যুগ তপস্যা করে, যোগসাধনা করে, ওঁনার পদ্মের মতো পা দুটোই শুধু দেখতে পান। অথচ আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি ওঁর ওই মোহন রূপ, ওই মধুর হাসি আর করুণাসিন্ধু ওই দুই চোখের দৃষ্টি। আমরা কি কম ভাগ্যবতী, বল?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি, বেদমন্ত্রে জীবকে ধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কর্ম কর্তব্য, কোন কর্ম অন্যায় তাও তিনি নির্দেশ করেছেনএই সবই তিনি জীব পালনের জন্যেই করেছেন। তমোগুণে আচ্ছন্ন রাজারা যখন প্রজাদের অমঙ্গল করে, ক্ষতি করে, ধর্মনাশ করে; তাঁদের বিনাশের জন্যে এই কৃষ্ণভগবানই বারবার জগতে জন্ম নেনসত্ত্বমূর্তিতে তিনি নিজে আসেন সকলের সামনে, জগতে ঐশ্বর্য আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে।  করুণাময় ভক্তবৎসল ভগবান, সাধারণ ভক্তদের মনে সঞ্চার করেন ভক্তি, ভরসা, বিশ্বাস আর ধর্ম।

ওলো, আমার খুব হিংসে হয় যদুবংশের ওপর, মধুবন আর দ্বারকাপুরীর ওপর। কেন জানিস। ওই বংশেই যে উনি জন্ম নিয়েছেন! ধন্য হয়ে গেছে যাদবরা, তাঁর লীলায় ধন্য হয়েছে মধুবন, ধন্য হচ্ছে দ্বারকাপুরী। কি ভাগ্য বলতো দ্বারকার প্রজাদের? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ তারা সকাল সন্ধ্যে রোজ দেখে। প্রত্যেকদিন তারা সামনে থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনার সুযোগ পায়।

আরো ভাবতো, সখি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসব পত্নীদের কথা! কত যুগের কঠিন তপস্যা করে, তবেই না তাঁরা পরমপুরুষকে স্বামীরূপে পেয়েছেন! নিজের হাতে শিশুপালদের মতো নৃশংস রাজাকে হত্যা করে, তিনিই উদ্ধার করেছিলেন, রুক্মিণী, জাম্ববতী, নাগ্নজিতীকে। তাঁরা এখন প্রদ্যুম্ন, শাম্ব ও আম্বের মতো গুণবান পুত্রের জননী। নরকাসুরকে হত্যা করেও তিনি উদ্ধার করেছিলেন সহস্র রমণী। তাঁরা নরকাসুরের অধীনে কি দুঃখের জীবন কাটিয়েছে, বল। তাঁদের সকলের হারানো সম্মান, যোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

সই, এমন ভাবিস না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু ভক্তবৎসল করুণাসাগর। ভগবান ভালোবাসা ও প্রেমেরও রাজা। এই কৃষ্ণভগবান প্রেমেরও পারাবার। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে স্বর্গ থেকে পারিজাত এনেছিলেন, কার জন্যে জানিস? আমি জানি লো, আমি জানি, পরমপ্রিয়া রুক্মিণীর জন্যে...”

(সূত বললেন,) "নগরের মহাতোরণের কাছে এসে পড়ায়, কুরুললনাদের সেই আলাপ আর তিনি শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে মৃদুহাস্যে তাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর রওনা হলেন দ্বারকার পথে। তাঁর সঙ্গে রইল উদ্ধব আর সাত্যকি। সামনে আর পিছনে রইল চতুরঙ্গ সেনার দুটি দল। মহারাজা যুধিষ্ঠির, তাঁর পথের নির্বিঘ্ন নিরাপত্তার জন্যে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন”

[মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায় সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে।] 

চলবে... 

                  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...