এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
পরীক্ষিতের জন্ম
শ্রীশৌণক বললেন, “কৃষ্ণ
অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রে হতপ্রায় উত্তরার গর্ভরক্ষা করলেন, এ কথা তো বললেন। এখন
সেই বিজ্ঞ মহাত্মা পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মৃত্যুর পর তাঁর যে গতি হয়েছিল, সে
সম্পর্কে শ্রীশুকদেবের কাছে যেমন শুনেছেন, সেই সমস্ত ঘটনা আমাদের বর্ণনা করুন”।
সূত বললেন, “কৃষ্ণের চরণপদ্মে একান্ত অনুরক্ত এবং কামনার
বস্তুতে একান্ত অনাসক্ত যুধিষ্ঠির প্রজাদের পিতার মতোই পালন করতে লাগলেন। তাঁর মন
সর্বদাই মুকুন্দে অর্পিত, অতএব ফুলের মালা ও চন্দন যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খুশি
করতে পারে না, তেমনই সম্পদ, যজ্ঞের অনুষ্ঠান, প্রিয়তমা মহিষী, অনুগত ভ্রাতৃগণ,
পৃথিবীর আধিপত্য কোন কিছুতেই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।
হে ভৃগুনন্দন শৌণক, পরীক্ষিৎ যখন মাতৃগর্ভে ব্রহ্মাস্ত্রের
তেজে দগ্ধ হচ্ছিলেন, সেই সময় তিনি এক অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ পুরুষকে দেখতে পেয়েছিলেন। ওই
পুরুষের মাথায় উজ্জ্বল মুকুট। তিনি অত্যন্ত সৌম্যদর্শন, শ্যামবর্ণ, বিদ্যুতের মতো
পীতবসনে আবৃত কিন্তু নির্বিকার। তিনি গর্ভের চারদিকে উল্কাবর্ণের এক গদা বারবার
ঘোরাচ্ছিলেন। সূর্য যেমন হিমরাশিকে বিনাশ করেন, তেমনই ভগবান নিজের গদার সাহায্যে
সেই ব্রহ্মাস্ত্রকে নিস্তেজ করলেন। গর্ভের শিশু তাঁকে সামনে দেখে, যখন ভাবছে, ইনি
কে? তখনই অনন্তস্বরূপ ভগবান শ্রীহরি সেই শিশুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন।
যথাসময়ে শুভলগ্নে উত্তরার কোলে উজ্জ্বল এক পুত্রের জন্ম হল।
এই পুত্র পাণ্ডুবংশের একমাত্র বংশধর। মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রসন্নমনে ধৌম্য, কৃপ
প্রমুখ ব্রাহ্মণদের স্বস্তি বচনে নবজাত কুমারের জাতকর্ম করলেন। তিনি সৎ
ব্রাহ্মণদের প্রচুর সোনা, গাভি, বাসভূমি, ক্ষেত্রভূমি, হাতি, ঘোড়া এবং অন্ন দান
করলেন। ব্রাহ্মণেরা সন্তুষ্ট হয়ে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “হে মহারাজ, এই শিশুর
গর্ভাবস্থাতেই অমোঘ অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুযোগ ছিল, ভগবান বিষ্ণুর মহাপ্রভাবে এই
শিশুর প্রাণরক্ষা হয়, অতএব ইনি বিষ্ণুরাত নামে বিখ্যাত হবেন। এই শিশু অসাধারণ গুণের
আধার ও পরমভক্ত হয়ে উঠবেন। বড় হয়ে এই শিশু, মনুপুত্র ইক্ষ্বাকুর মতো প্রজাপালক
হবেন। দশরথের পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের মতো ব্রাহ্মণের রক্ষক ও সত্যের পুজারী হবেন।
উশীনরের পুত্র রাজা শিবির মতো মহাদাতা ও দুর্বলের আশ্রয় হয়ে উঠবেন। দুষ্মন্তের পুত্র
মহারাজ ভরতের মতো বংশের নাম উজ্জ্বল করবেন। অর্জুনের মতো মহাবীর হবেন। ইনি যযাতির
মতো ধার্মিক হবেন এবং প্রহ্লাদের মতো কৃষ্ণভক্ত হবেন।
সামান্য এক ভ্রান্তির কারণে, ঋষিপুত্রের অভিশাপে তক্ষকের
দংশনে এঁনার মৃত্যু হবে। এই মৃত্যুর কথা জানার পর সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করে,
শ্রীহরিতে ইনি মন প্রাণ সমর্পণ করবেন। ব্যাসদেবের পুত্র মুনিশ্রেষ্ঠ শুকদেবের কাছে
ইনি পরমতত্ত্ব লাভ করে, শ্রীকৃষ্ণের পরমপদে আশ্রয় পাবেন”।
শুক্লপক্ষে চাঁদের কলা যেমন শোভা পায়, সেই শিশু দিন দিন
তেমনি বড় হতে লাগলেন। মায়ের গর্ভে বাস করার সময়, এই শিশু যে পরমপুরুষকে দেখেছিলেন,
তাঁকে কিন্তু ভুলতে পারেননি। যে কোন মানুষকেই তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন এবং
ভাবতেন এই লোকই সেই মহাপুরুষ নয় তো? এইভাবেই তাঁর মনের দৃষ্টিতে তিনি সকলকে
পরীক্ষা করতেন বলে, তাঁর নাম হল পরীক্ষিৎ। যুধিষ্ঠির ও চার ঠাকুদার তত্ত্বাবধানে
এবং তাঁদের পরম স্নেহের ছায়ায় পরীক্ষিৎ বড় হয়ে উঠতে লাগলেন দিন দিন। ছোটবেলা থেকেই
তিনি ধার্মিক, কৃষ্ণভক্ত, বুদ্ধিমান ও সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন।
এরই মধ্যে মহারাজ যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রে স্বজন হত্যার পাপ
মুক্তির জন্যে আরও একবার অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের মনস্থ করলেন। কিন্তু তাঁর কাছে
যথেষ্ট অর্থের তখন অভাব ছিল, কারণ তিনি প্রজাদের থেকে নির্দিষ্ট কর ছাড়া অন্য কোন
শুল্ক নেবার পক্ষপাতী ছিলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে চারভাই উত্তরদিকে গিয়ে
মরুত্ত রাজার যজ্ঞে পরিত্যক্ত অনেক সোনার বাসনপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন। সেই
সোনার বিনিময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের যোগাড় সম্পন্ন হল।
মহারাজ যুধিষ্ঠিরের নিমন্ত্রণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার হস্তিনাপুরে এলেন। তাঁর উপস্থিতিতে, ব্রাহ্মণেরা তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণকেই অর্চনা করলেন। এই যজ্ঞ শেষে শ্রীকৃষ্ণ কয়েকমাস হস্তিনাপুরেই বাস করে সকলকে আনন্দ দিলেন। তারপর মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তিনি অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে দ্বারকায় ফিরে গেলেন”।
বিদুরের ঘরে ফেরা
শ্রীসূত বললেন, “ইতিমধ্যে বিদুর
তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে মৈত্রেয় মুনির কাছে আত্মার গতিস্বরূপ শ্রীহরির সকল তত্ত্ব
অবগত হয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। কুশারুতনয় মৈত্রেয়কে কয়েকটি প্রশ্ন করেই বিদুরের
গোবিন্দের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির উদয় হয়েছিল। এখন দূর থেকে তাঁর ফেরার সংবাদ পেয়েই
যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা, ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, সঞ্জয়, কৃপাচার্য্য, কুন্তী,
গান্ধারী, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, উত্তরা, আর আর অনেক আত্মীয়পরিজন বিদুরকে সঙ্গে আনার
জন্যে এগিয়ে গেলেন। বিদুরকে দেখে তাঁদের সকলেরই দেহে
যেন প্রাণ ফিরে এল। তাঁকে আলিঙ্গন করে, অভিবাদন করে সকলের চোখ আনন্দে অশ্রুসজল
হয়ে উঠল। রাজা যুধিষ্ঠির তাঁর পুজো করলেন, ভোজন এবং বিশ্রামেরও ব্যবস্থা করলেন।
তারপর বিদুর সকলের সামনে এসে
বসলে, বিনীত যুধিষ্ঠির তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে পিতৃব্য, দীর্ঘ তীর্থ ভ্রমণের
সময়, আমাদের কথা কি আপনার কখনো মনে পড়েনি? পক্ষীমাতা যেমন পাখার আবরণে তার
শাবকদের রক্ষা করে, পোষণ করে, আপনিও ঠিক তেমনি আমাদের সকলকে বিষপ্রয়োগ, অগ্নিদহনের
মতো বিপদ থেকে বহুবার রক্ষা করেছেন। আপনার অন্তরে সর্বদাই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান, আপনি
নিজেই তীর্থ স্বরূপ। মলিন জীবগণের সংস্পর্শে যখন তীর্থ দূষিত হয়ে পড়ে, আপনার মতো
ব্যক্তিদের পায়ের ছোঁয়ায় সেই তীর্থ আবার হারানো মাহাত্ম্য ফিরে পায়। আপনার
তীর্থভ্রমণে কোন স্বার্থ নেই, বরং আপনার মতো ঈশ্বরভক্তদের কল্যাণে তীর্থ সার্থকতা
পায়। আপনার সেই সার্থক তীর্থভ্রমণ আমাদের বর্ণনা করুন।
হে পিতৃব্য, বহুকাল দ্বারকার যদুকুলের কোন সংবাদ পাইনি। তাঁরা সকলে কুশলে আছেন তো? যদুকুলের প্রাণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ কুশলে আছেন তো? অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়সখা, সেও বহুকাল দ্বারকায় রয়েছে, তারও সংবাদ কুশল তো? আপনার সঙ্গে যদুকুলের কারোর সম্প্রতি সাক্ষাৎ হয়েছিল কি? আপনি কি কোন সংবাদ দিতে পারেন”?
বিদুর তাঁর দীর্ঘ তীর্থভ্রমণের
অনেক কথাই বললেন, কিন্তু এড়িয়ে গেলেন যুধিষ্ঠিরের শেষ প্রশ্নগুলি। যদুবংশধ্বংসের
যে সংবাদ তিনি শুনেছেন, সে কথা যুধিষ্ঠিরকে এখনই বললে তার পক্ষে এ সংবাদ সহ্য করা
সম্ভব হবে না, এই বিবেচনায় তিনি নীরব থাকলেন। তিনি বড়োভাই ধৃতরাষ্ট্রকে অনেক
ধর্মতত্ত্ব উপদেশ করলেন।
কিছুদিন হস্তিনাপুরে থেকে বিদুর
দেখলেন যুধিষ্ঠির রাজ্যগ্রহণ করে, ভাইদের সঙ্গে সুযোগ্য পৌত্র পরীক্ষিতের প্রতি
স্নেহে পরম আনন্দে রাজ্যসুখ ভোগ করছে। একদিন
তিনি বড়ভাই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, “হে রাজন, আপনার পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু, পুত্রগণ
সকলেই কালের প্রভাবে মৃত্যু বরণ করেছে। এখন আপনিও বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে, আপনার
পরমায়ু প্রায় শেষ হতে চলল। আপনি চিরদিন অন্ধ ছিলেন, এখন কানেও কম শোনেন এবং আপনার
বুদ্ধিও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আপনার
দাঁত পড়ে গেছে, হজমশক্তিও হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় আপনার পরের ঘরে পরের দয়ায়
জীবনধারণ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। কিন্তু
আপনি কার ঘরে রয়েছেন? আপনি কিসের আশায়
আপনার পুত্রদের যারা হত্যা করেছে তাদের দেওয়া অন্নে আপনার এই শরীর রক্ষা
করছেন? যাদের হত্যা করার জন্য জতুগৃহে
আগুন লাগানো হয়েছিল, যাদের হত্যা করার জন্যে বিষাক্ত মিষ্টি দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য ও
ধন পাশার খেলার নামে চুরি করে, যাদের রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তাদের
অন্নে বেঁচে থাকার আপনার কি প্রয়োজন? এখনো
সময় আছে, হে রাজন, কাউকে কিছু না বলে, ঘর ছেড়ে উত্তর দিকে চলে যান। নিস্পৃহ ও
বিবেক অনুসারে জীবনের বাকি কয়েকটা দিন শ্রীহরির চিন্তায় মগ্ন থাকুন। তিনি পরমপুরুষ,
তাঁর চরণে আশ্রয় নিন”।
বিদুরের এই কথায়, ধৃতরাষ্ট্রের মোহভঙ্গ হল, তিনি সমস্ত মায়া ও মমতা বন্ধন ছিন্ন করে, কাউকে কিছু না বলে হিমালয়ের পথে রওনা হলেন। তাঁর সঙ্গে রইলেন পতিব্রতা স্ত্রী গান্ধারী আর ছোটভাই মহাত্মা বিদুর।
সন্ধ্যা আরতির পর যুধিষ্ঠির ঘরে
ফিরে গুরুজনদের প্রণাম করতে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও বিদুরকে দেখতে পেলেন না।
ঘরের দরজায় বসে থাকা সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “সঞ্জয়, তুমি কি জান, জ্যেষ্ঠতাত
ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারী ও খুল্লতাত বিদুর কোথায় গেলেন? তাঁর পুত্রদের আমি হত্যা
করেছি, অতএব তাঁদেরকেও হত্যা করতে পারি, এই আশঙ্কাতেই কি তাঁরা ঘর ছাড়লেন? আমাদের
শৈশবে পিতাকে হারানোর পর, এই মহাত্মা বিদুর আমাদের কত বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনিও
আমাদের বিশ্বাস করতে পারলেন না”?
সঞ্জয় চোখের জল মুছে বললেন, “হে মহারাজ, আমি যখন
নিদ্রামগ্ন ছিলাম, সেই সময়েই ওঁনারা গৃহত্যাগ করেছেন। কাজেই আমিও ওঁনারা কোথায়
গেছেন, কী উদ্দেশে গেছেন কিছুই জানি না। আমি জানি না, আর আমি ওঁনাদের পদসেবা করতে
পারবো কিনা”।
যুধিষ্ঠির ও সঞ্জয় যখন
উদ্বিগ্নমনে এইরকম শোক করছেন, সেই সময়ে উপস্থিত হলেন দেবর্ষি নারদ। নারদকে দেখে
যুধিষ্ঠির ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
তাঁকে প্রণাম ও পুজো করে বললেন,
“হে দেব, আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন। অন্ধ ও বৃদ্ধ জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, পুত্রশোকে কাতর
মাতাগান্ধারী আর খুল্লতাত বিদুর কোথায় চলে গেলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি
এসেছেন, শুভ দৈবের মতো। আপনি নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, তাঁরা কোথায় গেছেন, কেন গেছেন,
কারণ আপনি অন্তর্যামী”।
যুধিষ্ঠিরের এই ব্যাকুল কথায়
দেবর্ষি নারদ বললেন, “হে রাজা যুধিষ্ঠির, এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন। কাঠের পুতুল নিয়ে খেলতে থাকা
বালক যেমন তার ইচ্ছে মতো পুতুলকে খুলে ফেলে আবার যুক্ত করে, ভগবানও তাঁর ইচ্ছে মতো
জীবকে কখনো জগত থেকে আলাদা করে দেন, কখনো যোগ করেন। যে শক্তিতে সত্ত্ব, রজঃ ও
তমোগুণের বৈষম্য হয়, তাকে বলে কাল। যে বাসনা ও সংস্কারের বশীভূত হয়ে জীব বারবার
জন্ম নেয়, তাকে বলে কর্ম। আর যে উপাদানে জীবদেহের নির্মাণ হয় তাকে গুণ বলে। এই পঞ্চভূতে নির্মিত দেহ, কাল, কর্ম ও গুণের
অধীন। কালরূপ অজগর যাকে গ্রাস করেছে, সে ব্যক্তি অন্য কাউকে যেমন রক্ষা করতে পারে
না। সেরকমই কাল, কর্ম ও গুণের বশীভূত দেহ অপরকে রক্ষা করতে সমর্থ হয় না।
[সনাতন ধর্মে কাল, কর্ম ও গুণ তিনটি বিষয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, দেবর্ষি এই তিনটি বিষয়েরই সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিলেন দেবর্ষি।]
আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে চিন্তিত হবেন না। কারণ, ভগবান সমস্ত জীবের জীবিকার সংস্থান করেই রেখেছেন। ছোট ছোট মাছ, বড়ো মাছের খাদ্য। তৃণ, শষ্প মৃগাদি ও গবাদির খাদ্য। মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য। মহারাজ, এইভাবে সমস্ত জীবই একে অপরের জীবিকার স্বাভাবিক উপায়। যত ভোক্তা জীব আছে, ভগবান সকলেরই আত্মা। আবার যত ভোগ্য আছে, তাদেরও আত্মা একই ভগবান। এই জগতের কোন কিছুই ভগবানের থেকে আলাদা নয়। আমরা বুঝতে পারি না, তাই সবকিছুর মধ্যেই পার্থক্য দেখতে পাই। কিন্তু আসল তত্ত্বটি হল, ভগবান এক। তিনি তাঁর মায়ায় বহুভাগে বিভক্ত হয়েছেন। হে মহারাজ, মহামায়াবী ভগবান এখন অসুর বিনাশের জন্যে কালরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে দ্বারকায় বাস করছেন। তাঁর কার্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সামান্য কিছু আর বাকি আছে। অতএব যতদিন ভগবান পৃথিবীতে থাকেন, আপনারাও তাঁর অপেক্ষা করুন।
[কি সর্বনাশ, দেবর্ষি নারদ বললেন, "মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য!!" অথচ আজ আমরা নিরামিষ ভোজনকে বলছি ধর্মের একমাত্র পথ আর আমিষ ভোজনকারীরা অনাচারী অধার্মিক! আজকের সনাতন ধর্মের ধর্মরক্ষকগণ দেবর্ষি নারদের থেকেও ধর্মপ্রাণ? ]
রাজা ধৃতরাষ্ট্র, রাজ্ঞী
গান্ধারী ও ধর্মাত্মা বিদুর হিমালয়ের দক্ষিণভাগে ঋষিগণের আশ্রমে গিয়েছেন। সুরধনী
গঙ্গা যেখানে সাতভাগে বিভক্ত হয়েছেন, সেই সপ্ততীর্থে তাঁরা স্নান করে প্রত্যেকদিন
হোম করেন এবং একমাত্র জলপান করে জীবনধারণ করছেন। তাঁরা ধন, জন ও পুত্রদের প্রতি
আসক্তি ত্যাগ করে আত্মাকে প্রশান্ত করে সংযম অভ্যাস করছেন। তাঁরা শ্রীহরির ভাবনায়
নিজেদের উৎসর্গ করে সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রভাব দূর করে ধ্যান অবস্থা পেয়েছেন।
যতক্ষণ দেহরূপ এই ঘট সচেতন থাকে, তখন ঘটে আবদ্ধ আকাশ আর বাইরের মহাকাশের মধ্যে
পার্থক্য দেখা যায়। এই ঘট ভেঙে গেলে, দেহের আকাশ, মহাকাশের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার
হয়ে যায়। এই ভাবেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁর এই জীবাত্মাকে শুদ্ধচৈতন্য ব্রহ্মে লীন
করতে চলেছেন।
[ধৃতরাষ্ট্রের মতো স্নেহান্ধ ও অন্যায়-সহায়ক রাজার দেহরূপ ঘট ভেঙে গেলে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর জীবাত্মা যদি শুদ্ধ চৈতন্য ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে পারে, তাহলে মৃত্যুর পর আমাদের জীবাত্মা ব্রহ্মপদে লীন হবে না কেন? আমরা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের তুলনায় কতটুকুই বা অন্যায় করেছি সারা জীবনে?]
অতএব, হে রাজা যুধিষ্ঠির, আপনি
তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ ত্যাগ করুন ও বৃথা শোক করবেন না। আপনি তাঁদের
মোক্ষপথে বাধা সৃষ্টি করে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করবেন না। রাজা ধৃতরাষ্ট্র
সমস্ত কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং আজ থেকে পঞ্চম দিনে তিনি দেহত্যাগ করবেন। তাঁর দেহ যোগ অগ্নিতে ছাই হয়ে
যাবে। যোগের আগুনে যখন তাঁর দেহ ও পাতার কুটির জ্বলবে, সেই আগুনেই দেহত্যাগ করবেন
পতিব্রতা রাজ্ঞী গান্ধারী। মহাত্মা বিদুর এই আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করবেন।
বড়োভাইয়ের এই পরমগতি লাভের দৃশ্যে তিনি আনন্দ পাবেন, আবার দুঃখও পাবেন। তারপর
তিনিও বেরিয়ে পড়বেন তীর্থভ্রমণে”।
এই কথা বলে, দেবর্ষি নারদ বীণায় সুরতুলে শ্রীহরির মহিমা কীর্তন করতে করতে পথে বেরিয়ে পড়লেন এবং যুধিষ্ঠিরও তাঁর নির্দেশ হৃদয়ে অনুভব করে শোক পরিত্যাগ করলেন।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন