এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
৩
“পুরোনো সব
কথা মনে পড়ছে, সুনুদা, না? আমারও।” সুকন্যার কথায় সুনেত্রর চিন্তায় ছেদ পড়ল। “বেশ
ছিল সেই দিনগুলো, না? খুব সিম্পল বাট আন্তরিক, তাই না? জেঠুমণির কাছে ধরা পড়ে
তোমার সব চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হয়েছিল। তোমাকে তো বলেছিলাম। এখন খুব আপশোষ হয়।
যদি না পোড়াতাম – আজ মাঝে মাঝে পড়তে পারতাম – হাতের মধ্যে ফিরে পেতে পারতাম সেই
দিনের টুকরোগুলো। তোমার কাছে আছে, আমার লেখা সব চিঠি”?
“নাঃ”।
দীর্ঘশ্বাস চেপে সুনেত্র উত্তর দেয়।
“কেন? কী করলে, সে সব”?
“তোর বিয়ের
বেশ কিছুদিন পর এক রবিবারের বিকেলে সব ছিঁড়ে ফেলে দিলাম”।
“এঃ, মা।
আপশোষ হয় না”?
“হয় তো”।
“চিঠিগুলো
থাকলে আজকে আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে পারতে। তাই না”? অবাক হয়ে সুকন্যার দিকে তাকাল
সুনেত্র – সুকন্যার দু চোখের তারায় হাসি, “আচ্ছা, বাবা আচ্ছা। ব্ল্যাকমেল না হয়
নাই করতে, মাঝে মাঝে পড়ে দীর্ঘশ্বাস তো ছাড়তে পারতে – সেও তো এক রকমের প্রাণায়াম
হতে পারত, নাকি – কপালভাতি নাই বা হল। ব্ল্যাকমেলের কথায় এমন তাকালে – ঘোর কলিকাল,
না হলে ভস্ম হয়ে যেতে পারতাম – এতক্ষণ গাড়ির এই সিটে পড়ে থাকত আমার সামান্য একটু
ছাই। তোমাকেই তখন গাড়ি ড্রাইভ করতে হত, আমার হিরোটিকে পিছনে নিয়ে”।
“এত বাজে
কথাও বলতে পারিস - একই রকম রয়ে গেলি, কনি। এত বয়েস হল, তাও”?
“বয়েস? সে আবার
হল কোথায়? তোমার বয়েস বাহান্ন – বাহান্ন বছর সাড়ে তিনমাস মোটামুটি। আর আমার? আমার
ডিওবি তোমার মনে আছে”? সুকন্যার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক, পরীক্ষা নিতে চায় নাকি
সুনেত্রর?
“চৌষট্টির
থার্ড ডিসেম্বর”। সুনেত্র হেসে জবাব দেয় “কিছুই ভুলিনি, রে”।
“তুমি
ভুলবে? ভবি কখনো ভোলে? মানুষের তিনশ ছ খানা হাড়ের হিসেব থেকে শুরু করে চোখ কান নাক
গলা সবকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ভেতরের কলকব্জা - সব তোমাদের মনে রাখতে হয় – বাপরে। কার
কাছে খাপ খুলতে গিয়েছিলাম, আমি”? নিজের রসিকতায় নিজেই হাসল সুকন্যা। সুনেত্র হাসল না। হলদিয়া
শহরের কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। সুনেত্র সামনের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকল।
“বয়েসের কথা
হচ্ছিল না, এই বয়েসটা কিন্তু মারাত্মক সাসেপ্টিব্ল্। একজন মানু্ষের জীবনে দুবার এই
সাংঘাতিক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার চান্স থাকে, জানো তো? অসুখটা সাংঘাতিক তো বটেই কিন্তু আনন্দদায়ক এবং ভয়ংকর ইনফেক্সাসও”!
“কি অসুখ?
কিসের ভাইরাস” সুনেত্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। সুকন্যা একবার তাকাল সুনেত্রর দিকে তারপর ভীষণ গম্ভীর ভাবে বলল, “লেগ
স্লিপিং – বাংলায় বললে পদস্খলন। প্রথম যৌবনে এক-দু'বার আর শেষ যৌবনে আরেকবার - খুব
ভালনারেব্ল্” – অর্থাৎ ব্যাপারটা মোটেই ভাল না রে, বল?
“ওফ্, তুই
সত্যিই ইনকরিজিব্ল্...”।
দিবাকরের কল এসে যাওয়াতে, সুনেত্র কথা শেষ করতে পারল না, ফোন কানেক্ট করে বলল, “হ্যাঁ,
দিবাকর বলো কী অবস্থা”?
“সামান্য গড়বড় হয়েছিল, গাড়ি ঠিক করে নিয়েছি, স্যার।”
“আচ্ছা,
আচ্ছা, ভেরি গুড। তুমি তাহলে চলে আসছো তো”?
“আজ আর যাচ্ছি না, স্যার, অনেক রাত হল...কাল সকালে পৌঁছে যাবো।”
“ওকে, ওকে,
কাল সাড়ে নটার মধ্যে চলে এলেই হবে, নো প্রবলেম”।
“থ্যাংক ইউ স্যার, গুডনাইট”।
“হ্যাঁ,
হ্যাঁ গুডনাইট, ভাই, গুডনাইট”। ফোন অফ করে দিল সুনেত্র।
“গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে”? সুকন্যা জিজ্ঞেস করল।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সুনেত্র বলল, “হ্যাঁ, গাড়িটা
আজ রাত্রে ও ওর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে, কাল সকালে আসবে নটা সাড়ে নটার মধ্যে”।
“যাক, ভালো হয়েছে। তোমার টেনসানটা দূর হল”।
কথা বলতে বলতে তারা সিটি সেন্টার পৌঁছে গিয়েছিল,
সুনেত্র বলল, “আমাকে কোন একটা পয়েন্টে নামিয়ে দে না। অটো ধরে আমি চলে যাবো”।
“পাগল হয়েছ নাকি?
আজ রাত্রে তোমায় ছাড়ছি না। আমার হিরোটির সঙ্গেও তোমার আলাপ-পরিচয় কিছুই হল না -
তোমাকে আমি যত্রতত্র নামিয়ে দেব? ভাবলে কী করে? আর নামাতেই যদি হয়... তোমাকে অনেক নীচেয় –
অধঃপাতের শেষ সীমায় নামাবো, সুনুদা, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। তোমাকে আজ যখন ধরতে পেরেছি, আমার
কাছেই তুমি থাকবে। কাল সকালে ব্রেকফাস্টের পরে আমাদের ড্রাইভার, অনিমেষ তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে –
ডোন্ট ওরি। শুনেছি বিয়ে-থা করোনি। তোমার ঘরে বউ নেই, এণ্ডিগেণ্ডি সাত-আটটা ছেলেমেয়েও নেই, যে তুমি ঘরে ঢুকলেই তারা দৌড়ে এসে তোমাকে ঘিরে ধরে বলবে, "ও মা, বাপি এয়েচে, বাপি এয়েচে, আমাদের জন্যে কী এনেচো, বাপি? ঘরে ফিরে আজ রাত্তিরে তোমার কাজ তো একটাই, বিছানায় একা একা শুয়ে এপাশ ওপাশ করা। আর ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আজকের এই "হঠাৎ-দেখা-হয়ে-যাওয়ার" ঘটনাটি নিয়ে কল্পনার জাল বোনা। বরং আরও কিছুক্ষণ আমার নিবিড় সঙ্গ পাওয়ার অনুভবটুকু সঙ্গে নিয়ে কাল সকালে বেরিয়ে যেও - লাভ বই লোকসান হবে না, কথা দিলাম"।
সুনেত্র এবার সত্যিই বেশ বিরক্ত হল, বলল, "তোর বাচালতা কিন্তু সীমা ছাড়াচ্ছে, কনি। ভালো লাগছে না, বিরক্তিকর হয়ে উঠছিস। তাছাড়া ভদ্রলোক কী ভাববেন, উনি বিব্রত হবেন...এত রাত্রে একজন উটকো লোকের উপস্থিতিতে..."।
“বিব্রত? বিব্রত কিসের। আজ আপনার সেবা করবে বলে, আপনার কনি ব্রত মেনেছে, তার জন্যে আমি বিব্রত হবো? মাত্র একখান মাথা নিয়ে আমি দশমাথাওয়ালা দর্পী রাবণ হয়ে উঠতে পারব, এতটা আশা আমার থেকে প্লিজ করবেন না, সুনেত্রসায়েব”। পিছনদিকে সুকন্যার স্বামী উঠে বসেছেন, তিনিই বললেন কথাগুলো, তিনি আরও বললেন, “আপনার নাম ওদের বাড়িতে সকলের মুখে এতো শুনেছি, যেন সবাই মিলে বীজমন্ত্র জপ করছেন, ওঁ তৎ সৎ - ওঁ সু নু। রীতিমত জেলাসি ফিল করতাম। ইংরিজিতে কথাটা হয়তো সুসভ্য হল, হয়ত মার্জিতও হল, কিন্তু মাইরি বলছি, আমার মনের ভাবটা ওতে প্রকাশ পেল না। বাংলা করে বলি, মনের কোষ্ঠকাঠিন্যটুকু সাফ হোক - আমার রীতিমত গা জ্বালা করত। সেই মানুষের আজ দর্শন পেলাম, ভাবা যায়? সুকু, একদম ঠিক বলেছে, আজ রাত্রে শুধু সেলিব্রেসন...”
“তুমি তার
মানে মটকা মেরে পড়েছিলে? আর আমাদের কথা সব শুনছিলে”? সুকন্যা বলল।
“ইয়েস,
শুনছিলাম। উঁহু, তোমরা একটা কথাও তো অশ্রাব্য কিছু বলনি....আমি শুনলে আপত্তি
কোথায়? আর বললেই বা শুনব না কেন? অশ্রাব্য কথাও কখনো কখনো বেশ সুখশ্রাব্য হয়ে ওঠে না
কি”? বলে উচ্চৈস্বরে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। তারপর পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে বললেন – “আই
অ্যাম শশাঙ্ক মিত্র – আপনার সুকন্যার মতো একটি সুন্দর শশকে সারাজীবন অঙ্কে ধরে রাখার চেষ্টায় রয়েছি, আর আজ থেকে আপনার মিত্র হতে পারলে রিয়্যালি খুব আনন্দ পাবো।” সুনেত্রর বাড়ানো
হাত ধরে উষ্ণ ভাবে হাসলেন ভদ্রলোক। “লেট আস সেলিব্রেট ইয়োর প্রেজেন্স অ্যাট আওয়ার প্লেস – প্লিজ না বলবেন না”।
“ও কে”।
সুনেত্র হেসে শশাঙ্কর হাতে হাত রাখল, “বাট আপনার সেলিব্রেসন মানে কি ড্রিংকস?
সেক্ষেত্রে আমি কিন্তু আপনাকে বেশ হতাশ করব বলেই আশা রাখি”।
“অ। সে সুখবরটিও সুকু আপনাকে দিয়ে দিয়েছে? নিশ্চয়ই বলেছে তার সঙ্গীটি একটি জলজ্যান্ত পিপে
বিশেষ”।
“আমাকে
কিছুই বলতে হয়নি, স্যার। আমি গাড়ি ড্রাইভ করছি, আর পিছনের সিটে তার হিরোটি ভর
সন্ধ্যেবেলা সুখে লাট খাচ্ছে – এ দৃশ্য সেল্ফ্ এক্সপ্লেনেটারি – কাউকে বোঝাতে হয় না”।
সুকন্যা একটু বিরক্ত ভাবেই কথাটা বলল।
“ও কে,
ম্যাডাম। আই অ্যাপলজাইজ অ্যাণ্ড নাও লেট মি প্রুভ
দ্যাট আই ক্যান অলসো বি এ গুড হোস্ট”!
কথা বলতে বলতে সুকন্যা একটা বাড়ির বন্ধ গেটের সামনে গাড়ি
দাঁড় করিয়ে দুবার হর্ন দিল। ভেতর থেকে এসে গেট খুলে দিল একজন বয়স্ক দারোয়ান,
সুকন্যা গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করাল, বলল, “আমি বাপু এই সময় আর গ্যারেজে গাড়ি
তুলতে পারছি না। রামশরণকে বলে দাও রাত্রে গাড়ি এখানেই থাকুক। অনিমেষ এসে কাল সকালে
গ্যারেজে তুলে দেবে খন। সুনুদা এসো। আজ রাতটুকু এখানেই কাটিয়ে দাও কোনমতে”।
“আমাদের এই গরীবখানায়, কি বলো”? উচ্চস্বরে হেসে উঠল শশাঙ্ক।
“তুমি সুনেত্রসায়েবকে নিয়ে ভেতরে চলো, আমি গ্যারেজে গাড়ি তুলে দিচ্ছি...”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন