এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
শ্রীকৃষ্ণের লীলাসংবরণ
অর্জুন প্রিয়সখা-শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায়
গিয়েছিলেন, সে অনেকদিন হয়ে গেল। প্রিয়ভাই অর্জুন ও চিরসখা কৃষ্ণের অনেকদিন কোন
সংবাদ না পেয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের চোখে
ভয়াবহ অশুভ সব লক্ষণ ধরা পড়তে লাগল। তিনি দেখলেন, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম
বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ব্যবহার। মানুষ ক্রোধ, লোভ ও মিথ্যাকে
আশ্রয় করে, অসৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করছে। বাবা, মা, বন্ধু, ভাই, স্বামী, স্ত্রী
নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। মানুষের অন্তরে সরল আত্মীয়তার বদলে কুটিল শঠতা আশ্রয়
নিয়েছে।
[পরিবেশ নিয়ে সুসভ্য আধুনিক মানুষ সচেতন হয়েছে বা হচ্ছে বিগত পাঁচ-ছয় দশকে। তার কারণ বলা হয়, আধুনিক সভ্যতার ব্যাপক শিল্পায়ন, বিপুল নগরায়ণ এবং বীভৎস অরণ্য আগ্রাসন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের যুগে (ঐতিহাসিকরা বলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৯০০ বিসিই) আধুনিক সভ্যতার ওই ত্র্যহস্পর্শের স্পর্শ ছিল নামমাত্র। অতএব যুধিষ্ঠির যে লক্ষণগুলি দেখেছিলেন বা অনুভব করেছিলেন, সেগুলির সবকটিই ঘোর কলির লক্ষণ। কিন্তু একটু আশ্চর্য লাগে তাঁর "গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে" এই মন্তব্যে। তাঁর সময়েও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণ কি? ভগবান তাঁর মর্ত্যলীলা সংবরণ করেছেন বলে আমাদের সামাজিক দুর্গতি শুরু হল, কিন্তু ঋতুর ধর্ম তিনি কেন বদলে দেবেন?]
মহারাজ যুধিষ্ঠির একদিন অনুজ
ভীমকে ডেকে বললেন, “বৃকোদর, অর্জুন প্রিয়সখা কৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায় গেছে বহুদিন হয়ে গেল। অর্জুন এখনও
ফিরছে না কেন, বুঝতে পারছি না। দেবর্ষি
নারদ ভগবানের নরলীলা সংবরণের যে ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন, সেই সময় কি তবে আসন্ন? এই
ভগবান কৃষ্ণের জন্যেই আমরা আজ এই রাজ্য, সম্পদ, প্রাণ, সম্মান, কুল ও প্রজা লাভ
করেছি। তাঁর অনুগ্রহেই আমরা আমাদের শত্রুদের জয় করে স্বর্গসুখের অধিকারী হয়েছি।
কিছুদিন ধরে, আমার শরীরে এবং চারপাশে আমি নানান অশুভ লক্ষণ লক্ষ্য করছি। আমার মনে
হচ্ছে কোন এক ভয়ংকর বিপদ আমাদের দিকে যেন এগিয়ে আসছে।
এই দেখ, ভীম, আমার বাম চক্ষু,
উরু আর বাহু বারবার কেঁপে উঠছে। কাঁপছে আমার হৃদয়। ওই দেখ, উদীয়মান সূর্যের দিকে
মুখ করে শৃগালী বমি করছে, আর কাঁদছে। কুকুর আমার দিকে তাকিয়েও নির্ভয়ে চিৎকার
করছে। গবাদি পশুরা কেন আমার ডানদিকে আর গাধারা আমার বাঁদিকে যাওয়া আসা করছে।
ঘোড়াগুলিকে দেখ, আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। পেঁচা আর কাক কুৎসিত আওয়াজে কেমন ডাকছে
শুনতে পাচ্ছো? ঐ দেখ ভীম, নদ, নদী, সরোবর
অশান্ত হয়ে উঠছে। কি আশ্চর্য, দেখ, আগুনে ঘি দিলেও আগুন জ্বলছে না। গোয়ালের
বাছুরেরা স্তন্যপান করছে না। গাভীরা দুগ্ধক্ষরণ করছে না। দেবপ্রতিমাসকল দেখ, যেন
ঘর্মাক্ত শরীরে কাঁদছে, তাঁরাও যেন অস্থির।
অশান্ত বাতাসে আর ধুলিকণায় সূর্য প্রভাহীন, নিস্তেজ। সমস্ত জনপদ, গ্রাম,
নগর, উদ্যান, আশ্রম ধূসর, মলিন আর নিরানন্দ হয়ে উঠছে। এই সমস্ত ভয়াবহ লক্ষণ দেখে
আমার মনে হচ্ছে, ভাই ভীম, এতদিনে বোধহয় পৃথিবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্নলাভের
সৌভাগ্য হারাল”।
[যুধিষ্ঠির বর্ণিত এই দুর্লক্ষণগুলিই আমাদের মনে কুসংস্কার হিসেবে গেঁথে রয়েছে বিগত প্রায় তিনহাজার বছর ধরে!]
এইরকম উদ্বিগ্ন চিন্তায় মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন কিছুদিন ব্যাকুল, একদিন অর্জুন দ্বারকাপুরী থেকে হস্তিনাপুরে ফিরলেন। ফিরে এসেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের পদতলে। অর্জুনের চোখে অশ্রুধারা, মুখ বিষণ্ণ, তিনি যেন ঘোরতর অসুস্থ। তাঁকে দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আরেকবার দেবর্ষি নারদের সেই ইঙ্গিতের কথা মনে পড়ল।
ব্যাকুল হয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস
করলেন, “ভাই অর্জুন, তুমি এমন কাঁদছো কেন? তোমার সুন্দর মুখ, কেন এত বিষণ্ণ?
দ্বারকায় মধু, ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, সাত্বত বন্ধুরা সকলে ভালো আছেন তো? পূজনীয়
মাতামহ শূর ও মামা বসুদেব, দেবকীসহ আমাদের সপ্ত মামীরা, তাঁদের পুত্র ও পুত্রবধূগণ
সকলে কুশলে আছেন তো? পুত্রহীন রাজা উগ্রসেন, তাঁর ভাই দেবক ও হৃদীক, তাঁদের
পুত্রেরা কৃতবর্মা, অক্রুর, জয়ন্ত, গদ, সারণ, শত্রুজিৎ এবং যদুশ্রেষ্ঠ ভগবান বলরাম
ভালো আছেন তো? মহাবীর প্রদ্যুম্ন, ভগবান অনিরুদ্ধ, সুষেণ, চারুদেষ্ণ, জাম্ববতীর
পুত্র শাম্ব এবং কৃষ্ণের অন্য পুত্রেরাও সকলে ভালো আছেন তো? শ্রীকৃষ্ণের অনুচর
শ্রুতদেব ও উদ্ধব, সুনন্দ, নন্দ ও অন্যান্য যদুবীরগণের কুশল তো? ব্রাহ্মণের
মঙ্গলকারী ও ভক্তবৎসল ভগবান গোবিন্দ দ্বারকাপুরীতে বন্ধুগণের সঙ্গে সুখে ও
পরমানন্দে বাস করছেন তো?
ভাই অর্জুন, তোমার একি দশা
হয়েছে? তোমার অঙ্গকান্তি মলিন, তোমার আর সেই তেজ নেই, তোমার এই অবস্থার কারণ কী?
অনেকদিন বন্ধুগণের সঙ্গে ছিলে বলেই কি তোমার প্রাপ্য সম্মান তুমি পাওনি? তোমাকে কি
তাঁরা অবহেলা করেছেন? কর্কশ কটুকথায় কেউ কি তোমার মনে কষ্ট দিয়েছে? দান করার
প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোন দরিদ্রকে তুমি কি দান করতে পারোনি? তোমার সাহায্যপ্রার্থী ব্রাহ্মণ, বালক, বৃদ্ধ,
স্ত্রী, রোগী বা অন্য কাউকে তুমি কি সাহায্য করতে পারোনি? কোন দুশ্চরিত্রা নারীতে
তুমি উপগত হওনি তো? আসার পথে তোমার চেয়ে
নীচ কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে পরাজয় স্বীকার করোনি তো? ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ অথবা বালককে ভোজন না করিয়ে,
তুমি নিজে ভোজন করে নিয়েছ, এমন হয়নি তো? অথবা তোমার চিরদিনের সখা কৃষ্ণকে হারিয়ে
তুমি কি নিজেকে নিঃস্ব মনে করছো? আমার মনে হয়, এটাই একমাত্র কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন
কারণেই তোমার এই দশা হতে পারে না”।
নিজেকে যথাসাধ্য সংবরণ করে,
অর্জুন অগ্রজ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “দাদা, আমাদের সেই পরম বন্ধু
শ্রীহরি আমাকে পরিত্যাগ করে দিব্যলোকে চলে গেছেন, যাবার সময় তিনি আমার সমস্ত
শক্তিও হরণ করে নিয়েছেন। প্রাণহীন দেহ ক্ষণকালের মধ্যেই যেমন শবদেহ হয়ে যায়, তেমনই
কৃষ্ণের ক্ষণকাল বিয়োগেই সমস্ত পৃথিবী শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
দাদা, তোমার মনে আছে, আমি
দ্রুপদরাজার স্বয়ংবরে সমবেত সমস্ত রাজাদের পরাস্ত করে, মাছের চোখ বিদ্ধ করে,
কৃষ্ণাকে লাভ করেছিলাম। ইন্দ্রের দেবসৈন্যকে পরাজিত করে খাণ্ডববন অগ্নিকে সমর্পণ
করেছিলাম। ময়দানবকে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ করে, তার অপূর্ব শিল্পকর্ম স্বরূপ আমাদের
রাজসূয় সভা নির্মাণ করিয়েছিলাম। দাদা ভীম রাজসূয় যজ্ঞের সময়, জরাসন্ধকে হত্যা করে,
তার কারাগারে বন্দী সমস্ত রাজাদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন। রাজসূয় যজ্ঞে মহা অভিষেকের
পর, দ্রৌপদী তার সুন্দর কেশকবরী বন্ধন করেছিল। কিন্তু কপট দুঃশাসনরা সভামধ্যে
কৃষ্ণার কবরী খুলে দিয়েছিল। পরে দাদা ভীম সেই দুঃশাসনদের হত্যা করে, তাদের
পত্নীদেরও কবরী খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিলেন। এই সমস্তই আমরা করতে পেরেছিলাম আমাদের চিরসখা
কৃষ্ণের অনুগ্রহে।
তারপর, দাদা তোমার মনে পড়ে,
দুর্যোধনরা দুর্বাসার শাপে আমাদের বিনাশ করার পরিকল্পনায় আমাদের আশ্রমে একবার
সহস্র শিষ্যসহ দুর্বাসামুনিকে অসময়ে পাঠিয়েছিল? সহস্র লোকের সেই হঠাৎ আতিথ্যে,
মহাসঙ্কটে পড়ে দ্রৌপদী কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। কৃষ্ণ এল, এসে মৃদু হেসে বলল,
“খুব খিদে পেয়েছে, কৃষ্ণা, কী আছে খেতে দাও”। দ্রৌপদীর তখন অসহায় অবস্থা,
যাদের থেকে পরিত্রাণের জন্য সে কৃষ্ণকে ডাকল, তিনিও কিনা অভুক্ত? অবেলায়, কৃষ্ণার
ভাঁড়ার তখন শূণ্য।
ম্লান মুখে কৃষ্ণা বলেছিল, “আমি
নিরুপায়, হে কৃষ্ণ, আমাদের সকলের খাওয়া শেষ, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই তোমাকে দেবার
মতো”।
“রান্নাঘরে যাও না, কৃষ্ণা, দেখ
যা আছে, তাতেই আমার ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে” কৃষ্ণের মুখে অদ্ভূত প্রসন্ন হাসি আর দু
চোখে অনন্ত রহস্য। কৃষ্ণা রান্নাঘরে গেল, শূণ্য পাত্রের গায়ে একটু শাক লেগে আছে,
আর আছে তিন চারটে অন্নের দানা। পরম লজ্জায় আর দ্বিধায় তাই একটা পাত্রে এনে দিল
দ্রৌপদী। তাই দেখে মহা আগ্রহে কৃষ্ণ হাতে নিল সেই পাত্র, কি আনন্দে সে মুখে তুলল
সেই শাক আর অন্ন।
খাওয়ার পর উজ্জ্বল মুখে বলল, “কৃষ্ণা, তবে যে তুমি বলেছিলে তোমার ভাঁড়ার
শূণ্য, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই। তোমার দেওয়া এই অন্নে শুধু আমার নয়, জগতের সমস্ত
জীবের ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে, এ আমি নিশ্চয় জানি”। আশ্চর্য, কৃষ্ণের সেই অদ্ভূত
লীলায় মুনি দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যরা স্নান সেরে সন্ধ্যা আহ্নিক করতে করতে অনুভব
করলেন তাঁদের সকলের উদর পরিপূর্ণ, অন্নগ্রহণের এতটুকুও আর স্থান নেই। অপ্রস্তুত
হয়ে নদীকূল থেকেই তাঁরা সকলে চলে গিয়েছিলেন, আমাদের আশ্রমে আর ফিরে আসেননি।
এই কৃষ্ণের প্রভাবেই আমি শূলপাণি
মহাদেব ও উমাদেবীকে অবাক করে পাশুপত অস্ত্র লাভ করেছিলাম। এই কৃষ্ণের জন্যেই আমি এই নরদেহে
দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে বসতে পেরেছিলাম। যখন আমি ইন্দ্রলোকে ছিলাম
নিবাত, কবচ দৈত্যদের বিনাশ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কৃষ্ণের প্রভাবেই। এই কৃষ্ণকে আমি
হারিয়েছি, দাদা। এই কৃষ্ণ বন্ধুরূপে আমার সঙ্গে ছিলেন বলেই, আমি ভীষ্মের মতো প্রবল
সেনানীদেরও পরাজিত করে, বিরাট রাজার গোধন ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। তারপর মোহনাস্ত্র
প্রয়োগ করে, শত্রুদের ঘুম পাড়িয়ে তাঁদের সকলের মাথার মণি ও মুকুট আহরণ করে আনতে
পেরেছিলাম।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আমার রথের
সারথি হয়ে আমার সামনে বসে, এই কৃষ্ণই তাঁর কালদৃষ্টি দিয়ে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ,
শল্য প্রমুখ বীরদের আয়ু, উৎসাহ, শক্তি ও বীর্য ক্ষয় করে দিয়েছিলেন। নৃসিংহ ভক্ত প্রহ্লাদকে যেমন
অসুরদের কোন অস্ত্র স্পর্শ করতে পারত না, তেমনি আমাকেও ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ,
শল্যদের মতো বীরদের অস্ত্র থেকে কৃষ্ণই বারবার রক্ষা করেছেন। আমরা মূর্খ, তাই তাঁকে আমরা রথের
সামান্য সারথি করে রেখেছিলাম।
আর এক দিনের কথা মনে পড়ছে দাদা,
কুরুক্ষেত্রে জয়দ্রথ বধের দিন, আমার ঘোড়াগুলো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রথ থেকে
নেমে আমি ওদের জল খাওয়াচ্ছিলাম। বিপদের কথা আমার মনেও হয়নি, আর কি আশ্চর্য দাদা,
আমি যতক্ষণ ঘোড়াগুলিকে জল খাওয়াচ্ছিলাম, কৃষ্ণের মায়ায় কেউ আমার দিকে একটা অস্ত্রও
প্রয়োগ করেনি। যদি করত, আজ আমি তোমার সামনে থাকতে পারতাম না, দাদা। এই হচ্ছেন
কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণকে হারিয়ে আমি সবদিক দিয়েই নিঃস্ব ও দুর্বল।
কত দিন আমি কৃষ্ণের সঙ্গে একসাথে বসে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি, শুয়েছি। মাধব সর্বদা হাসিমুখে আমায় অর্জুন, পার্থ, সখে কিংবা কুরুনন্দন বলে ডাকতেন। কতদিন পরিহাসছলে তাঁকে কত কথা বলেছি। আজ মনে হচ্ছে, সে সব কথা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি কিন্তু কিছু মনে করেননি। পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর এবং পতি যেমন পত্নীর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন, তিনিও আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
[গীতা - ১১শ পর্ব -এর ৪৪ সংখ্যক শ্লোকেও অর্জুন প্রায় একই কথা বলেছেন। পাশের সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন।]
পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের লীলা
সংবরণের পর তাঁর মহিষীদের সুরক্ষার জন্যে আমার সঙ্গে নিয়ে আসছিলাম। আসার পথে একদল
নীচ গোপসৈন্য আমাকে অসহায় অবলার মতো পরাস্ত করে, তাঁদের হরণ করে নিয়ে চলে গেল, আমি
কিছু করতে পারলাম না। আমি সেই অর্জুন, আমার সঙ্গে সেই রথ, আমার কাছে সেই তির-ধনুক,
অস্ত্র-শস্ত্র, যা দেখে একসময় মহাবীর রাজারাও ভয়ে মাথা নত করত, কিন্তু কৃষ্ণ বিরহে
আজ আমি অক্ষম হয়ে গেছি। দ্বারকাপুরে যে বন্ধুগণের কুশল সংবাদ তুমি জিজ্ঞেস করলে,
দাদা, তারা মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সকলে মারা গেছে,
বেঁচে আছেন মাত্র চার পাঁচজন।
প্রাণীগণ যে পরস্পরের সঙ্গে
শত্রুতা করে অথবা সৌহার্দ সূত্রে আবদ্ধ হয়, সে সবই ভগবানের কার্য, তিনিই সব
নিয়ন্ত্রণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহাবীর যদুসৈন্যদের দিয়ে ভারতের অন্যান্য
দুর্ধর্ষ বীর অত্যাচারী রাজাদের বিনাশ করেছিলেন। সবার শেষে যদুবীরদের দিয়েই
যদুবীরদের বিনাশ করে, তিনি পৃথিবীর ভার হরণ করলেন। সকল মানুষের মধ্যে এনে দিলেন
সমমনোভাব”।
শ্রীকৃষ্ণমহিমার কথা বলতে বলতে,
তাঁর কথা চিন্তা করতে করতে অর্জুনের মনে শান্তি ও বৈরাগ্যের উদয় হল। তাঁর মনে পড়ে
গেল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে শোনা সেই পরমতত্ত্বকথা। সেই
উপলব্ধি থেকে তাঁর মনের সমস্ত কামনা বাসনা দূর হয়ে গেল, দূর হয়ে গেল অজ্ঞান। যুধিষ্ঠিরও ভগবানের লীলা সংবরণ ও
যদুকুলের বিনাশের কথা শুনে স্থির করে ফেললেন, সবকিছু ছেড়ে তিনিও বেরিয়ে পড়বেন
মহাপ্রস্থানের পথে। মাতা কুন্তীও সব ঘটনার বিবরণ শুনে ভগবানের পাদপদ্মে একান্ত
ভক্তিসহকারে নিজের মন প্রাণ সমর্পণ করে পরম মুক্তির অপেক্ষা করতে লাগলেন।
শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ,
যদুবংশীয় ও যে সকল অসুর রাজকুলে জন্ম নিয়ে পৃথিবীকে ভারযুক্ত করেছিল, তারা সকলেই
শ্রীকৃষ্ণের তনু। প্রথমটিকে যাদব-তনু এবং দ্বিতীয়টিকে ভূভার-তনু বলা যেতে পারে। পায়ে
ফোটা কাঁটা যেমন লোকে আরেকটি কাঁটা দিয়ে তুলে ফেলার পর, দুটি কাঁটাকেই পরিত্যাগ
করে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ যাদব-তনুর সাহায্যে ভূভার-তনুর বিনাশ করে, অবশেষে যাদব-তনুরও
সংহার করলেন। কারণ উভয়েই সংহারযোগ্য বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমান।
যেদিন ভগবান মুকুন্দ এই পৃথিবীর
লীলা সাঙ্গ করে, নিজের মূর্তিতে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গেলেন, সেই দিন অবিবেকীদের
অমঙ্গলকারী কলি পূর্ণরূপে আবির্ভূত হল। বিচক্ষণ রাজা যুধিষ্ঠির নগরে, জনপদে, নিজের
গৃহে ও নিজেদের মনে লোভ, মিথ্যা, হিংসা, কুটিলতা ও অধর্মের প্রবৃত্তিকে কলির প্রসার
বলে বুঝতে পারলেন, এবং মহাপ্রস্থানে যাত্রার বেশ ধারণ করলেন। তারপর বিনীত ও
সর্বগুণে নিজের তুল্য পৌত্র পরীক্ষিৎকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসালেন। অন্যদিকে
অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে মথুরার সিংহাসনে বসিয়ে শূরসেন দেশের অধিপতি করলেন। সকল
কর্তব্যের পর মহারাজা যুধিষ্ঠির প্রাজাপত্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেন। তাঁর অগ্নিগৃহে
তিনটি অগ্নিকুণ্ড বর্তমান ছিল, প্রতিদিন সেই তিন অগ্নিতে তিনি গার্হপত্য, আহবনীয় ও
দক্ষিণ নামক হোম যথা নিয়মে করতেন। এখন তিনি প্রাত্যহিক হোম কার্য পরিত্যাগ করে
মহাপ্রস্থানের জন্য প্রস্তুত। সুতরাং তিনি নিজের আত্মাকেই অগ্নিকুণ্ড কল্পনা করে,
মনে মনে হোমক্রিয়া সমাপ্ত করলেন। তারপর সেই স্থানেই তিনি রাজোচিত পট্টবস্ত্র,
অলংকার, সাজসজ্জা ত্যাগ করে নিষ্ঠুরভাবে সংসারের বন্ধন ছিন্ন করলেন। এরপর হৃদয়ে
পরব্রহ্মের ধ্যান করতে করতে তিনি উত্তরে হিমালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করলেন, কারণ,
উত্তরদিকের হিমালয় প্রদেশে গেলে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না। তাঁর অনুজ ভাইয়েরাও
সকলে তাঁর অনুগমন করলেন। অন্যদিকে বিদুরও প্রভাসক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণে মন প্রাণ
সমর্পণ করে দেহরক্ষা করলেন। দ্রৌপদীও তাঁর পতিদের এই নির্মম ও উদাসীন ভাব দেখে,
ভগবানের প্রতি অবিচলিত ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম লাভ করলেন।
যিনি শ্রীকৃষ্ণের একান্ত ভক্ত পাণ্ডুপুত্রগণের এই অতি পবিত্র মহাপ্রস্থানের কথা শোনেন, তিনি শ্রীহরির চরণ অরবিন্দে ভক্তিলাভ করেন ও সিদ্ধ অবস্থা পেয়ে থাকেন”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন