এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
৪
শশাঙ্ক আর সুনেত্র হুইস্কির পেগ হাতে নিয়ে যখন বসল, তখন
সাড়ে দশটা বাজে। সামনের গ্লাস টপ সেন্টার টেবিলে ফ্রুট স্যালাডের প্লেট, সল্টেড পিনাটস,
কাজু আর সেঁকা পাঁপড়। সুকন্যা ফ্রেস হয়ে বসার ঘরে এলো – পরনে হাউসকোট।
“ব্যস, শুরু হয়ে গেছে? সুনুদা, রাত্রে তুমি রুটি খাও তো?
কটা রুটি? একটু ডাল আর সঙ্গে চিকেন কারি – এত রাত্রে এর বেশি কিছু আর জোগাড় করতে
পারছি না – অসুবিধে হবে না তো”?
“অসুবিধে হলেও কি আর বলব, ভেবেছিস? তবে এই ড্রিংক্সের পর
দুটো রুটিই যথেষ্ট। এখন কি দোকান খোলা থাকবে – এক প্যাকেট সিগারেট আনতে পারলে ভালো
হত”।
“কেন হবে না? আপনি মুখ ফুটে একবার বলুন না, সব চলে আসবে –
আকাশের চাঁদখানা ছাড়া। সুকু, হারুকে একবার পাঠিয়ে দাও না, মোড়ের দোকান থেকে এক
প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসুক – কোন ব্র্যাণ্ড চলে আপনার”?
সুনেত্র তার সিগারেটের ব্র্যাণ্ড বলতে বলতে পার্স খুলে টাকা
বের করছিল, তাই দেখে সুকন্যা বলল, “দেখছ, তোমার সামনে বসে সুনুদা পার্স থেকে টাকা
বের করছে সিগারেটের দাম দেবে বলে, আর তুমি সেটা সহ্য করছ? হি ইজ ইয়োর অনারেব্ল্
গেষ্ট, অ্যান্ড ইউ বিয়িং আ রেস্পন্সিব্ল্ হোস্ট – এটা কি উচিৎ হচ্ছে, বস্”?
সুকন্যার ঠোঁটে মুচকি হাসি। একথায় চোখ ছোট করে শশাঙ্ক
সুনেত্রর দিকে দেখল, বলল, “হারু, সিগারেটটা ঝট করে নিয়ে আয়, আমি টাকা দিয়ে দেব”।
“হারু, এক কাজ করিসতো, বাবা, তিনটে পান আনিস, খয়ের ছাড়া,
মিঠে পাতার সাদা পান – এলাচ, মৌরি, চমনবাহার...চট করে যা – দোকান না বন্ধ হয়ে যায়”।
সুকন্যা বলল।
হারু বেরিয়ে যাবার পর, শশাঙ্ক তৃতীয় গ্লাসে অল্প হুইস্কি
ঢালল, তারপর অল্প সোডা আর তিন পিস আইস কিউব। গ্লাসটা সুকন্যার দিকে বাড়িয়ে দিতে
দিতে বলল, “লেট আস সেলিব্রেট দি গ্রেট আবির্ভাব অফ মিস্টার সুনেত্র...। আজকের
দিনটাকে বেশ মেমোরেব্ল্ করে তোলা যেত – কিন্তু এত রাত্রে সে আর হবার নয়। তাছাড়া সুনেত্রসায়েব
মনে হচ্ছে সুরার আসরে জনৈক বেসুরো মানুষ বিশেষ, অতএব সেই ফিউটাইল প্রচেষ্টার কোন মানে
হয় না।”
সুকন্যা গ্লাসটা হাতে নিতে শশাঙ্ক নিজের গ্লাস সুকন্যার
হাতে ধরা গ্লাসে ঠেকিয়ে বলল, “চিয়ার্স”।
“তোমরা তো অলরেডি শুরু করে দিয়েছ, এঁটো গেলাসে ঠেকিয়ে আবার
চিয়ার্স হয় না কি”?
“তুমি সেই বিধবা পিসিমাদের মতো এঁটোকাঁটা নিয়ে ভাবতে বসলে?
মদ আবার এঁটো হয় নাকি? নাও চালু করো”।
“উল্লাস” – সুকন্যা বলল, তারপর হাল্কা করে ঠোঁটে ছোঁয়ালো
গ্লাসটা।
“উল্লাস... আজকাল বঙ্গসমাজে “চিয়ার্স” চলছে না, না?”
সুনেত্র সুকন্যাকে জিজ্ঞেস করল। কথাটা শুনে শশাঙ্ক বলল, “আপনার “কনি” আগে একদমই খেত না, জানেন।
আজকাল মাঝে মধ্যে খায়। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস আর কুসঙ্গে সর্বনাশ – আমার পাল্লায় পড়ে
অধঃপাতে চলে গেছে – তা যদি বলেন – আই উইল ফিল প্রাউড।”
সুনেত্র কোন জবাব দিল না, একটু অপ্রস্তুতভাবে হাসল, কিন্তু
সুকন্যা বড় বড় চোখে শশাঙ্কর দিকে তাকিয়ে বলল, “হাউ ডেয়ার ইউ কল মি “কনি” – ইট্স্
নট ফর ইউ...”।
“আই নো, আই নো। এটা অনেকটা বীজমন্ত্রের মতো – মিতা আর বন্যা
– সকলের জন্যে নয় – হাটে বাজারে ব্যবহৃত হয়ে সাতকান হবার নয়। বাট আই লাইক ইট
অ্যাণ্ড ফিল জেলাসি – এমন নামটা আমার মাথায় কেন আগে আসেনি”?
“মাথায় এলেও লাভ হতো না...”
“কেন? সুনেত্রবাবু কপিরাইট করে নিয়েছেন বলছ”?
“সুনুদাকেই জিজ্ঞেস কর, বাট দ্যাট নেম ইজ নট ফর ইউ, ব্যস্”। সুকন্যা বলল।
শশাঙ্কর গ্লাস খালি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুনেত্রর গ্লাস
অর্ধেকও খালি হয়নি দেখে শশাঙ্ক বলল, “আপনি কি মশাই, ওই এক গ্লাসেই রাত পোয়াবেন
নাকি? খালি করুন”।
“আপনি নিন না, আমি একটু স্লো - টেস্ট প্লেয়ার – টি২০র মতো
চৌকা-ছক্কা মারা আমার ধাতে নেই। আপনি আমার গ্লাসের দিকে নজর দিলে খুব বোর হবেন,
তার চেয়ে নিজের মতো এনজয় করুন”। সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল।
“বলছেন”? বলে শশাঙ্ক নিজের গ্লাস আবার ভরে তুলল
হুইস্কি-সোডা-বরফে। “আসলে কি জানেন ছোটবেলায় এক জ্যোতিষী আমার কোষ্ঠীবিচার করে
বলেছিল আমার নাকি জলে ভয় আছে”। বড় চুমুকে গেলাস হাফ খালি করে শশাঙ্ক আবার বলল – “তারপর যা
হয়, ছোটবেলায় মা-বাবা আমায় জলের ধারে কাছে যেতে দেয়নি কোনোদিন। তাই বড় হয়ে নিরন্তর
চেষ্টায় আছি ডুবে মরার – চুল্লুভর পানি মে বলুন অথবা হুইস্কির গেলাসে বলুন - একই
ব্যাপার”।
“এটা কি তুমি রসিকতা করলে? বলে দিও, বাপু, যদি হাসতে হয়
সেটাও স্পষ্ট উল্লেখ করে দিও”। সুকন্যার এই কথায় শশাঙ্ক উচ্চৈস্বরে হাসল।
হাসির দমক থামলে বলল, “সুকু, তুমি কিন্তু রীতিমত আমার
লেগপুল করছো”।
সুকন্যা নিজের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “কখন খেতে বসবে?
এগারোটা বাজতে চলল প্রায়। হারু এলে খাবার গরম করতে বলব”?
“কি বলছো, সুনেত্রবাবুর গ্লাস এখনো খালিই হল না, এখন খাবেন কী
করে? আরেক পেগ নিতে হবে তো”? বড়ো চুমুকে নিজের গ্লাস খালি করে শশাঙ্ক বলল, “এবার
অন্ততঃ আপনারটা খালি করুন”।
“নাঃ। ইট্স্ ফাইন। আমি কিন্তু দারুণ এনজয় করছি। প্লিজ জোর
করবেন না। আপনি আপনার মতো চালিয়ে যান। নো প্রবলেম”।
শশাঙ্ক নিজের গ্লাস আবার ভরে নিল – এবারে আর সোডা নিল না –
হুইস্কি, জল আর বরফ, তারপর বলল, “আপনার মতো সঙ্গী পেলে নির্ঘাৎ অমর হয়ে যাবো,
মশাই। সামনের সোফায় যম এসে বসেই থাকবেন, আপনার গ্লাসটা খালি হলে আমাকে তুলে নিয়ে
যাবেন ভেবে। আপনার গ্লাসও খালি হবে না আর সে বেচারা হাই তুলতে তুলতে একসময় ঘুমিয়েই
পড়বেন হয়তো বা...। আমার আয়ুতে একটা রাত বেড়ে যাবে”। কথা শেষ করে বেশ বড় চুমুক দিল
শশাঙ্ক।
“তুমি কি এরপরেও আর নেবে? তোমার অবস্থা খুব সুবিধের নয়। আজেবাজে বকা শুরু হয়ে গেছে তোমার”। সুকন্যা বলল।
“কিছু কি ভুল বললাম, সুকু? “গৃহীতৈব কেশেষু মৃত্যুনা,
ধর্মমাচরেৎ”। যম আমাদের চুলের মুঠি ধরেই আছেন...যে কোন সময়ে তিনি বলতেই পারেন, প্যাক
আপ ...ব্যস্। অতএব এনজয় – এনজয় দিস লাইফ...”। শেষ দিকে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিল,
জিভ জড়িয়ে আসছিল শশাঙ্কর।
“ও। “ধর্মমাচরেৎ” মানে এনজয় দিস লাইফ”?
“হোয়াই নট, সুকু, হোয়াই নট – এ ধর্ম জীবধর্ম হতেই বা বাধা
কোতায়? ধর্ম মানেই কি ভুলভাল কিছু মন্ত্র ঝাড়া আর ট্যাং ট্যাং ট্যাং ঘন্টা নাড়া? জীবনকে
যা ধরে রাখে সেটাই কি ধর্ম নয়? বহুদিন আগে বেশ ইন্টারেস্টিং একটা গল্প পড়েছিলাম –
ট্রাইবাল ফোক লোর। কোথায়, কোন বইতে পড়েছিলাম, মনে নেই।
গল্পটা হল - বহুযুগ আগে জীবন যখন খুব সাধারণ ছিল, মানে
আমাদের মতো মানুষ তখনো অসভ্য ধরনের সুসভ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এবং তাকে সামলানোর
জন্যে গোদা গোদা শাস্ত্র-গ্রন্থ রচনা এবং তার পাশাপাশি বীভৎস অস্ত্র-শস্ত্র,
অ্যাটম বা নিউক্লিয়ার ফিউশন এবং ফিশন করে উঠতে পারেনি। সেই নির্মল-সরল জীবনে, আমাদের
মাথার ওপরে থাকা আকাশটাকে আঁকশি দিয়ে হাতের কাছে টেনে নামানো যেত রোজ। চাঁদ এবং
প্রতিটি নক্ষত্রকে হাতে ধরে কাপড় দিয়ে ঘষে ঘষে চকচকে করে তোলা যেত। ন্যাতা-জল দিয়ে
পরিষ্কার ঝকঝকে করে নিকিয়ে নেওয়া চলত বিশাল আকাশটাকেও। তারপর আবার আঁকশি দিয়ে তুলে
ঠেলে ঠিকঠাক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যেত আকাশটাকে।
তারপর মানুষ সভ্য হতে লাগল। চাষবাস শিখে ফেলল, পশুপালন শিখে
ফেলল। সে যুগের সভ্য মানুষদের লোভ বাড়তে লাগল। প্রকৃতিকে ভেঙে-চুরে নিজেদের কাজ
গোছাতে লাগল। সে সময় এক সভ্য মহিলার ছিল অনেক গরু-মোষের এক বিশাল বাথান। সেখান
থেকে সে যেমন প্রচুর দুধ পেত, তেমনি পেত প্রচুর গোময়। কিন্তু সেই গোময় শুকিয়ে
ঘুঁটে দেওয়ার মতো নিরিবিলি জায়গার খুবই অভাব হল। সেই মহিলা একদিন করল কি, আঁকশি
দিয়ে আকাশটাকে টেনে এনে – আকাশের গায়ে থাবড়ে দিল অজস্র ঘুঁটে। ঢাকা পড়ে গেল চাঁদ
এবং কত শত নক্ষত্র। কদর্য নোংরা দুর্গন্ধময় হয়ে উঠল গোটা আকাশটা। এমনই ঘটতে লাগল
প্রায় রোজ।
একদিন ঈশ্বরের চোখে পড়ল, তিনি ভয়ানক ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁর
সৃষ্টির ওপর একি অত্যাচার? এত সাহসই বা পায় কোত্থেকে লোভী মানুষগুলো? প্রথমে তিনি
অভিশাপ দিলেন মানুষকে – “তোরা লোভী হয়ে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠ”। তারপর তিনি প্রবল ঝড়-বৃষ্টি এনে তাঁর আকাশ ও
নক্ষত্রসমুহকে ধুয়ে-মুছে আবার আগের মতো ঝকঝকে করে তুললেন। কিন্তু এবার আকাশটাকে
তুলে দিলেন বহু উঁচুতে, মানুষের কোন আঁকশি দিয়েই তাকে আর নামিয়ে আনা সম্ভব নয়...,”।
শশাঙ্ক গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে আবার বলল, “ফ্রম দ্যাট
ভেরি ডে আমরা সুসভ্য হয়ে উঠতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে একদল হেন অন্যায় কাজ নেই যা
করে না, অন্য দল মোটা মোটা গ্রন্থ লিখে আর ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে পাপ-পুণ্যের বাণী
ছড়াতে লাগল। মাঝের থেকে আমরা, যারা না ঘরকা – না ঘাটকা - ডুবে রইলাম দ্বিধা-দ্বন্দ্বের
পারাবারে...”।
হারু ফিরে আসাতে এই আলোচনায় ছেদ
পড়ল। সিগারেটের প্যাকেটটা আর পানগুলো সুকন্যাকে হস্তান্তর করল হারু। সুকন্যা সিগারেটের প্যাকেটটা সুনেত্রর হাতে দিতে দিতে বলল, “তোমার তো যা
দৌড়, আর নেবে না নিশ্চয়ই। আর ওর সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে তোমার রাত ভোর হয়ে যাওয়াও
আশ্চর্য নয়। আমি বরং খাবার দিতে বলি। হারু, খাবার গরম করো, আমি আসছি...”।
শশাঙ্ক কিছুটা আনমনা হয়ে বলল,
“শশাঙ্কবাবু, আপনার ফোক-লোরটি অসাধারণ... এত সিমপ্ল আর সরল বলেই মনে দাগ রেখে
যায়...”।
নিজের গ্লাসটা খালি করে শশাঙ্ক একটু হেসে হাত বাড়াল সুনেত্রর দিকে, “একটা সিগারেট দিন তো, ব্রাদার”। তারপর টিশার্টের কলারে সামান্য নাড়া দিয়ে র্যালা করে বলল, “আমি শুধু মালই খাই না, ব্রাদার, শুধু বেওসাই করিনা। আরও অনেক – অনেক কিছু পাবেন এই খোলসটার অন্দরে ...খালি কষ্ট করে আপনাকে একটু কাল্টিভেট করতে হবে”।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন