ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৫ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
ষোড়শ পর্বাংশ
৪.৮.৩ কল্যাণের পশ্চিমা-চালুক্য
শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা তৈলপ ছিলেন, চালুক্যরাজ
কীর্তিবর্মনের কোন কাকার বংশধর। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব মানেন না। এঁরা বলেন, নাম না জানা
কোন গুরুত্বহীন গোষ্ঠীর রাজা ছিলেন তৈলপ। সে যাই হোক, তৈলপের
জীবনের শুরু রাষ্ট্রকূটদের সামন্তরাজা হিসেবে। পরমার রাজা যখন রাজধানী মান্যখেটের
পতন ঘটালেন, সেই
ডামাডোলের মধ্যে তৈলপ রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কর্ককে হয় হত্যা করেছিলেন, অথবা দূর
কোন নিরাপদ জায়াগায় পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন। এরপর পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব
নিয়ে রাষ্ট্রকুটরা যখন নাজেহাল, তখন তৈলপ চতুর্থ ইন্দ্রকে পরাস্ত করে, রাষ্ট্রকূট
রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তৈলপ দক্ষিণ গুজরাটের লাট জয় করেছিলেন, কিন্তু
বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি,
অনহিলওয়াড়ার মূলরাজ চালুক্য, তৈলপের প্রশাসক বারপ্পকে লাট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শোনা
যায়, তৈলপ
কুন্তল (কর্ণাটের অংশ),
চেদি এবং চোলদের পরাজিত করেছিলেন। যদিও তাঁর রাজ্যের উত্তর সীমান্তে পরমার
রাজা বাকপতি-মুঞ্জ বারবার হানা দিচ্ছিলেন। শোনা যায় শেষ যুদ্ধে তৈলপ
বাকপতি-মুঞ্জকে বন্দী করে,
তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এখান থেকেই পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে পরমার রাজাদের
চিরশত্রুতার সূত্রপাত হল। তৈলপের মৃত্যু হয় ৯৯৭ সি.ই.-তে, তারপর রাজা
হলেন তাঁর পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.)।
তাঁর রাজত্বকালে চোল রাজা প্রথম-রাজারাজ চালুক্য
রাজ্যে প্রভূত ক্ষতি এবং গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু সত্যাশ্রয় অচিরেই চোলদের এই
ধাক্কা সামলে তাঁদের সমুচিত শিক্ষাও দিয়েছিলেন। সত্যাশ্রয়ের পরে রাজা হলেন তাঁর
ভাইপো পঞ্চম-বিক্রমাদিত্য,
খুব কমদিনই তিনি রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। পরমার রাজা ভোজ তাঁকে চূড়ান্ত পরাস্ত
করে, পরমার
রাজা বাকপতি-মুঞ্জের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এরপরে রাজা ভোজ দাক্ষিণাত্যের
অধিকার সুরক্ষিত করতে শক্তিশালী অনহিলওয়াড়ার প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজাদের সঙ্গে
মৌখিক চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চম-বিক্রমাদিত্যর পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ
জগদেকমল্ল (১০১৬-৪২ সি.ই.),
মালবের পরমার রাজা ভোজের এই স্বপ্ন পূর্ণ হতে দেননি।
প্রথম সোমেশ্বর(১০৪২-৬৮ সি.ই.)
১০৪২ সি.ই.-তে রাজা হলেন, দ্বিতীয়
জয়সিংহের পুত্র, প্রথম
সোমেশ্বর। তিনি চোল এবং পরমারদের আক্রমণ করলেন, এবং পরমার রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে
মালব রাজ্যের মাণ্ডু এবং ধারা অঞ্চল অধিকার করে নিলেন। রাজা ভোজের অনুপস্থিতিতে, পরমার
দুর্বল রাজারা প্রথম সোমেশ্বরের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পেরে, উজ্জয়িনী
পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানেও ধাওয়া করলেন প্রথম সোমেশ্বর এবং উজ্জয়িনী জয় করলেন।
এর মধ্যে রাজা ভোজ রাজধানীতে ফিরে উজ্জয়িনী উদ্ধার করে, নিজের
কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু এরপর অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম এবং কলচুরি
রাজা লক্ষ্মী-কর্ণের যৌথ আক্রমণে পরমারদের দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে এল। এই যুদ্ধে রাজা ভোজ
মারা গেলেন, এবং
পরমার রাজত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল। এই সময়ে ভোজের পরবর্তী পরমাররাজা জয়সিংহ, অনহিলওয়াড়া
এবং কলচুরিদের থেকে রক্ষা পেতে, সোমেশ্বরের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সোমেশ্বর এই সুযোগ
হাতছাড়া করলেন না, তিনি
চিরশত্রু পরমারদের সঙ্গে সখ্যতা করে, প্রথম ভীম এবং লক্ষ্মীকর্ণকে পরাস্ত
করে, জয়সিংহকে
পরমার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি জানতেন মধ্য ভারতের যে কোন শক্তিই প্রবল হলে, তাঁর
চালুক্যরাজ্যের পক্ষে তাঁরা বিপজ্জনক।
যুদ্ধে প্রথম সোমেশ্বরের প্রধান সহায় ছিলেন, তাঁর পুত্র
ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। মধ্যভারত নিয়ন্ত্রণে আসার পর, প্রথম সোমেশ্বর উত্তরভারতের দিকে মন
দিলেন। গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলের প্রতিহার রাজারা তখন দুর্বল, অতএব
চালুক্য সৈন্যরা অতি সহজেই দোয়াব এবং কনৌজ জয় করে নিলেন। তারপর ষষ্ঠ
বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী, মিথিলা, মগধ, অঙ্গ, বঙ্গ এবং
গৌড় পর্যন্ত বিনা বাধায় চলে এসেছিলেন। তখন গৌড়ের পালরাজারাও প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে
পড়েছিলেন। যদিও কামরূপের রাজা রত্নপাল চালুক্য সৈন্যদের পরাস্ত করেছিলেন এবং এরপর
চালুক্য সৈন্যবাহিনী দক্ষিণ কোশলের পথে নিজেদের ঘরে ফিরেছিলেন। এ ভাবেই প্রথম
সোমেশ্বরের আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষই চালুক্য রাজাদের শক্তি টের পেয়েছিল।
প্রথম সোমেশ্বর তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপন
করেছিলেন কল্যাণে (কল্যাণী,
হায়দ্রাবাদ)। ১০৬৮ সি.ই.তে তাঁর মৃত্যুও ঘটেছিল অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে। শোনা যায়
তিনি মারাত্মক এক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং নিরাময় অসম্ভব জেনে, রীতিমতো
উৎসব করে, মন্ত্র
উচ্চারণ করতে করতে তুঙ্গভদ্রার জলে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় সোমেশ্বর
আহবমল্ল, তাঁর
জ্যেষ্ঠ পুত্র। যদিও যাবতীয় যুদ্ধ বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল, তাঁর ভাই
ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর,
কিন্তু প্রথম দিকে সিংহাসন নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন বিবাদ ছিল না। দ্বিতীয়
সোমেশ্বরের স্বল্পস্থায়ী রাজত্বে তেমন কিছু কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায় না, তাঁর সময়ে
একটাই প্রধান ঘটনা হল,
ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বন্ধু মালবের রাজা জয়সিংহকে আক্রমণ করে, তিনি পরাজিত
করেছিলেন।
১০৭৬ সি.ই.তে দ্বিতীয় সোমেশ্বরের মৃত্যুর পর ষষ্ঠ
বিক্রমাদিত্য রাজা হয়েছিলেন, এবং সেই বছর থেকে চালুক্য-বিক্রমাঙ্ক অব্দ শুরু হয়। এই
পশ্চিমা-চালুক্য বংশের সব থেকে সফল ও উজ্জ্বল রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। তিনি শিল্প, শিক্ষা এবং
জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কাশ্মীরি লেখক বিলহনের গুণমুগ্ধ ছিলেন, বিলহনের
লেখা “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত”,
রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যকে অমর করে দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজসভার পণ্ডিত
বিজ্ঞানেশ্বর, হিন্দু
রীতিনীতির ওপর “মিতাক্ষরা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর পুত্র তৃতীয় সোমেশ্বর ভূলোকমল্ল ১১২৬ থেকে ১১৩৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় জগদেকমল্ল রাজত্ব করেছিলেন ১১৩৮-১১৫১ সি.ই.। তারপর সিংহাসনে বসেন, তাঁর ভাই নুরমডি তৈল। কিন্তু এরপর কলচুরি রাজ্যের রণমন্ত্রী, ভিজ্জলার মন্ত্রণা এবং প্ররোচনায় চালুক্য রাজ্যের সামন্তরাজাদের মধ্যে বিদ্রোহ এবং ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তাঁরা নুরমডি তৈলকে ১১৫৭ সি.ই.তে সিংহাসন চ্যুত করেন। নুরমডি তৈলর পুত্র ভীর সোম বা চতুর্থ সোমেশ্বর ১১৮২ সি.ই.তে পিতৃরাজ্য কিছুটা উদ্ধার করে ১১৮৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু দেবগিরির যাদব এবং দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজ্যের প্রবল আক্রমণে পশ্চিমা-চালুক্যবংশ ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল।
৪.৮.৪ দেবগিরির যাদব
মহাভারতের ভগবান শ্রীকৃষ্ণর যদু বংশ থেকে যাদবদের
উৎপত্তি, এমনই
প্রবাদ শোনা যায়। যদিও,
তাঁদের রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল, মান্যখেড়ের রাষ্ট্রকূট এবং
পশ্চিমা-চালুক্যদের সামন্তরাজা হিসাবে। পশ্চিমা-চালুক্যদের দুর্বলতার সুযোগে
যাদবদের উত্থানের শুরু এবং পরবর্তী কালে তাঁরা বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা
করতে পেরেছিলেন। এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, পঞ্চম
ভিল্লাম। তাঁর রাজধানী ছিল দেবগিরি (হায়দ্রাবাদ জেলার আধুনিক দৌলতাবাদ)। তিনি খুব
বেশি রাজত্ব বিস্তার করতে পারেননি, কারণ ১১৯১ সি.ই.-তে হোয়সল রাজ প্রথম
বীর-বল্লালের হাতে তিনি পরাস্ত হন এবং খুব সম্ভবতঃ প্রাণও হারান।
ভিল্লমের পুত্র জৈতুগি বা প্রথম জৈত্রপাল
(১১৯১-১২১০ সি.ই.)। তিনি তৈলঙ্গ (ত্রিকলিঙ্গ) রাজ রুদ্রদেবকে পরাজিত করেন এবং
হত্যাও করেন, তারপর
রাজা রুদ্রদেবের ভাইপো গণপতিকে সিংহাসনে বসিয়ে কাকতীয় বংশের সূচনা করেছিলেন।
এভাবেই যাদবরা সমসাময়িক রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে থাকেন।
যাদব বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন, জৈত্রপালের
পুত্র সিংহন (১২১০ - ১২৪৭ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু অঞ্চল এবং রাজ্য জয় করেছিলেন।
তিনি ১২১৫ সি.ই.তে বীরভোজকে পরাস্ত করে, কোলাপুরের সিলাহারা অঞ্চল এবং পরনালা
বা পনহালা দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তাঁর দাদুর হত্যাকারী হোয়সল রাজ
দ্বিতীয় বীরবল্লালকে পরাস্ত করে, কৃষ্ণা নদীর অপর পাড়ে হটিয়ে দিয়েছিলেন। সিংহন এরপরে মালবের
রাজা অর্জুনবর্মন, ছত্তিশগড়ের
চেদি রাজা জাজ্জল, গুজরাটের
বাঘেলা রাজাদের আক্রমণ করেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন।
সিংহন অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায়
বিখ্যাত কিছু গুণী এবং বিদ্বানেরা বিশেষভাবে সম্মানীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান
ছিলেন সারঙ্গধর, সঙ্গীত
বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম “সঙ্গীত-রত্নাকর”। এই গ্রন্থের টীকা এবং ভাষ্য
রচনা করেছিলেন, স্বয়ং
রাজা সিংহন। সিংহনের সভায় আরেকজন বিদ্বান ছিলেন, শার্ঙ্গদেব, বিখ্যাত
জ্যোতির্বিদ। তিনি খান্দেশ জেলার পাটনায় একটি মঠ (মহাবিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে
ভাস্করাচার্যের “সিদ্ধান্ত-শিরোমণি” এবং অন্যান্য জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হত।
সিংহনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি
কৃষ্ণ বা কনহার (১২৪৭-৬০ সি.ই.)। তাঁকেও মালব, গুজরাট এবং কোঙ্কনের সঙ্গে যুদ্ধ
করতে হয়েছিল। তিনি হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময়েই জলহনের
কাব্য সংকলন “সূক্তিমুক্তাবলী” এবং আমলানন্দর বেদান্ত ভাষ্য - “বেদান্ত-কল্পতরু”
রচিত হয়েছিল। কৃষ্ণের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মহাদেব (১২৬০-৭১ সি.ই.)।
তিনি বেশ কিছু রাজ্য,
যেমন সিলাহারদের উত্তরকোঙ্কন, কর্ণাটক, গুজরাটের লাট এবং কাকতীয় রাণী রুদ্রাম্বার রাজ্য জয় করে
নিয়েছিলেন। মহাদেব এবং তাঁর পরবর্তী রাজা রামচন্দ্র বা রামরাজার (১২৭১-১৩০৯ সি.ই.)
মন্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত হেমাদ্রি বা হেমাদপন্ত। যিনি “চতুর্বর্গ–চিন্তামণি”
নামে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। শোনা যায় তিনি দাক্ষিণাত্যের মন্দির
স্থাপত্যের নতুন প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন এবং মোড়ি[1] লিপির
সংস্কার করেছিলেন। আরও শোনা যায় রাজা রামচন্দ্র সন্ন্যাসী জ্ঞানেশ্বরের শিষ্য
ছিলেন, পণ্ডিত
জ্ঞানেশ্বর ১২৯০ সি.ই.-তে মারাঠী ভাষায় প্রথম ভাগবত-গীতার ভাষ্য রচনা করেছিলেন।
রামচন্দ্রের রাজত্বকালে ১২৯৪ সি.ই.-তে আলাউদ্দিন খিলজি হঠাৎ দেবগিরি অবরোধ করেন, রামচন্দ্র তখন দেবগিরি দুর্গেই ছিলেন। তাঁর পুত্র শংকর তাঁকে মুক্ত করতে, বহু প্রয়াস করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন রামচন্দ্র বাধ্য হলেন আলাউদ্দিনের সঙ্গে এক তরফা চুক্তি করতে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন “৬০০ মণ মুক্তা, ১,০০০ রৌপ্যমুদ্রা, ৪,০০০ রেশম বস্ত্র এবং প্রচুর দামি জিনিষপত্র” আদায় করলেন এবং দিল্লিতে বাৎসরিক রাজস্ব পাঠানোর শপথ করালেন। এর পর আলাউদ্দিন নিজে যখন দিল্লির মসনদে বসলেন, তিনি সেনাপতি মালিক কাফুরকে পাঠিয়ে ১৩০৭ সি.ই.-তে দেবগিরি অধিকার করলেন এবং পরাজিত রামচন্দ্রকে বন্দী করে দিল্লি নিয়ে গেলেন। সম্রাট আলাউদ্দিন তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্যের বিনিময়ে মুক্তি দিলেন, কিন্তু ১৩০৯ সি.ই.-তে রামচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল। রামচন্দ্রের পুত্র শংকর দিল্লিকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে দিলে, ১৩১২ সি.ই.-তে মালিক কাফুর আবার দেবগিরি আক্রমণ করে শংকরকে হত্যা করেন। এরপরেও রামচন্দ্রের জামাই হরপাল যখন মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেন, সুলতান মুবারকের আদেশে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল[2]। এভাবেই অতি নিদারুণভাবে যাদববংশের সমাপ্তি ঘটেছিল।
৪.৮.৫ ওয়ারাঙ্গালের কাকতীয়
কাকতীয় বংশের উৎপত্তি সঠিক জানা যায় না। কেউ বলেন
“কাকত” শব্দের অর্থ কাক,
সেখান থেকেই বংশের নাম কাকতীয়। কেউ বলেন স্থানীয় দেবী দুর্গার এক রূপ “কাকতী”
সেখান থেকে এই বংশের নাম এসেছে। আবার পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন তাঁরা সূর্য
বংশীয় ক্ষত্রিয়। কিন্তু নেল্লোর জেলার কয়েকটি শিলালিপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে
কাকতীয়রা ছিলেন শূদ্র।
প্রথমদিকে কাকতীয়রাও চালুক্যরাজাদের সামন্তরাজা
ছিলেন। চালুক্য সাম্রাজ্যের পতনের সময়, তাঁরা তেলেঙ্গানা অঞ্চলে প্রথম
কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বহু উত্থান ও পতনের পর, যাঁদের
সমাপ্তি ঘটে বাহমনি সুলতান আহমদ শাহের হাতে ১৪২৪-২৫ সি.ই.-তে।
প্রথম দিকে কাকতীয় রাজাদের রাজধানী ছিল
অনমাকোণ্ডা বা হনুমাকোণ্ডাতে, পরবর্তী কালে তাঁরা রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ারাঙ্গাল বা
ওরুঙ্গল্লুতে। প্রথম যে রাজা এই বংশের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি
প্রোলরাজ মোটামুটি ১১১৭-১৮ সি.ই.-তে। তিনি পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য
বিখ্যাত এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরে রুদ্র ১১৬০ সি.ই. অব্দি এবং তাঁর
ভাই মহাদেব ১১৯৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এরপর রাজা হয়েছিলেন, রাজা
মহাদেবের পুত্র, রাজা
গণপতি, তিনি
প্রায় বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই কাকতীয় রাজত্বের গৌরব সর্বোচ্চ
শিখরে উঠেছিল। তাঁর পরাক্রমে চোল, কলিঙ্গ, যাদব, কর্ণাটের লাট এবং বলনাড়ুরা পরাস্ত হয়েছিলেন।
রাজা গণপতির পুত্র না থাকায়, তাঁর সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর কন্যা রুদ্রাম্বা ১২৬১ সি.ই.-তে। শোনা যায় তিনি পিতার রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন এবং প্রায় তিরিশ বছর রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পৌত্র প্রতাপরুদ্রদেব। এই প্রতাপরুদ্রদেবকে অমর করে গিয়েছিলেন, তাঁর সমসাময়িক কবি বৈদ্যনাথ, তাঁর রচিত “প্রতাপরুদ্রীয়” কাব্যে। এই প্রতাপরুদ্রই ছিলেন কাকতীয় বংশের শেষ রাজা এরপর সেনাপতি মালিক কাফুরের দাক্ষিণাত্য অভিযানে কাকতীয় বংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শোনা যায় তাঁদের বংশের কোন শাখা বস্তার (মধ্যপ্রদেশ) অঞ্চলে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৪.৮.৬ শিলাহার
শোনা যায় শিলাহার বংশের উৎপত্তি পৌরাণিক রাজা
জীমূতবাহনের থেকে, যিনি
বিদ্যাধরের রাজা ছিলেন এবং নাগদের রক্ষা করার জন্যে, নিজেকে গরুড়ের আহার হিসেবে উৎসর্গ
করেছিলেন। এই কাহিনীর মূল্য যাই থাক, শিলাহাররা সম্ভবতঃ ক্ষত্রিয় ছিলেন।
যতদূর জানা যায়, শিলাহারদের তিনটি শাখা ছিল এবং
তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল টগর বা টের নামক কোন অঞ্চলে। প্রাচীনতম শাখা অষ্টম
শতাব্দীর শেষ থেকে একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত দক্ষিণ কোঙ্কনে রাজত্ব
করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল গোয়া। শিলাহারদের দ্বিতীয় শাখা উত্তর কোঙ্কনে রাজত্ব
করেছিলেন, নবম
শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর। তাঁদের রাজত্বের মধ্যে ছিল থানা, রত্নগিরি
এবং সুরাট জেলার কিছু অংশ। তাঁদের রাজধানী ছিল থানা। তৃতীয় শিলাহার শাখা একাদশ
শতাব্দীর প্রথম দিকে,
তাঁদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কোলাপুর, সাতারা এবং
বেলগামে। শিলাহারদের প্রথম দুই শাখা মোটামুটি কোন না কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্যের
অধীনে রাজত্ব করতেন,
যেমন, রাষ্ট্রকূট, চালুক্য এবং
যাদব প্রমুখ। সে দিক থেকে শিলাহারদের তৃতীয় শাখা মাঝে মধ্যে স্বাধীনভাবেই রাজত্ব
করতে পেরেছিলেন। শোনা যায় এই শাখার এক রাজা বিজয়াদিত্য বা বিজয়ার্ক, চালুক্যবংশের
পতনের জন্য কলচুরি মন্ত্রী বিজ্জলকে সাহায্য করেছিলেন। এই শাখার সব থেকে
উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন ভোজ (১১৭৫-১২১০ সি.ই.), শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পরে যাদব রাজ
সিংহন, শিলাহারদের
এই রাজ্যটি অধিকার করে নিয়েছিলেন।
[1] সংস্কৃতর দেবনাগরি লিপি ভেঙে মোড়ি লিপি বা মুদিয়া লিপি
মারাঠিভাষার প্রথম লিপি, যে লিপির আধুনিক
সংস্করণ আজও প্রচলিত।
[2]
হয়তো ভয়ংকর এই
ঘটনার স্মৃতি থেকেই বলিউডি সিনেমায় বহু ভিলেনের মুখে “তেরা খাল খিঁচ লুঙ্গা” ডায়লগ
শুনতে পাওয়া যায়। যেমন মহাভারতে মহাবীর ভীমের দুঃশাসনের রক্তপানের বর্ণনা থেকে “তেরা
খুন পি যাউঙ্গা” ডায়লগটি অনেক নায়কের মুখেই শোনা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন