মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৭  


 

সেইদিন মধ্যাহ্নের দ্বিতীয় দণ্ডে মাঠের ধুলো উড়িয়ে সাত জনের একটি রক্ষীদল দল এসে দাঁড়াল সুকরা গ্রামের প্রান্তে নালার ধারে। সুকরা গ্রামের জনা সাতেক মানুষ ক্ষেতে কাজ করছিল, ভয়ে এবং কৌতূহলে তারাও এসে একত্র হল। নোনাপুরের মানুষরা যারা নালার ওধারে ক্ষেতের কাজ করছিল, তারা এসে দাঁড়াল নালার সামনে। সকলের মনেই আশঙ্কা। পরশু রাত্রে আস্থানে যে ডাকাতি হয়েছিল, নিশ্চয় সে বিষয়ে সন্ধান নিতেই রক্ষীরা গ্রামে উপস্থিত হয়েছে।

রক্ষীদলের সর্দার উপানু ঘোড়ার পিঠে বসেই বলল, “এখানে এসব কী হচ্ছে?”

সুকরার বয়স্ক মানুষ ভীলক বললেন, “চাষ-বাসের কাজ করছি, আজ্ঞে”।

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু এই ঢিপি কবে হল, নালার মধ্যে?”

“আজ্ঞে আমরা এখানে ছোট একটা বাঁধ গড়ে, কিছুটা সেচের ব্যবস্থা করেছি”।

“কে দিয়েছে অনুমতি?”

“অনুমতি, মানে অনুমতি তো...সেভাবে কারও নেওয়া হয়নি...”।

“আপনি অভিজ্ঞ বয়স্ক মানুষ - অনুমতি ছাড়া এমন কাজ করলেন কী করে? জানেন না রাজার অনুমতি ছাড়া এসব কাজ করা যায় না”? সর্দার এতক্ষণ বেশ শান্ত ভদ্রভাবেই কথা বলছিল, এখন হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠল, “এটা কি বাপের সম্পত্তি পেয়েছেন? জানেন না যে কোন নতুন জমিতে আবাদ করতে, নালা-নদী থেকে সেচের জল যোগাড় বানাতে, গ্রামে পুকুর কাটতেও রাজার অনুমতি নিতে হয়? ন্যাকামি করছেন, নাকি রাজার নিয়মকে অমান্য করছেন? আপনার বাড়ি কোন গ্রামে?”

অপমানে ও ভয়ে আড়ষ্ট ভীলক বললেন, “ওই যে সুকরা গ্রামে...”।

“আচ্ছা? এতদিন নোনাপুরের নানান বজ্জাতির কথা কানে এসেছে, এখন সুকরাও তাদের দলে ভিড়েছে? তা এই নালার মধ্যে বাঁধ দেওয়ার ভাবনাটা কার?”

ভীলক বললেন, “আজ্ঞে আমাদেরই...আমরাই সকলে মিলে...”।

উপানু লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে নামল, বাঁহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে বলল, “এই নালা তো আপনাদের চোদ্দপুরুষের আগে থেকেই বইছিল। এতকাল আপনাদের মনে এই ভাবনার উদয় হয়নি কেন? হঠাৎ এই মাস দেড়েক যাবৎ এদিকের গ্রামগুলোতে অনেক কিছু অনিয়ম ঘটে চলেছে, দেখছি? কার বুদ্ধিতে?”

ভীলক খুবই ভীত স্বরে বললেন, “আজ্ঞে কারো বুদ্ধিতে নয়, আমরাই সকলে মিলে..., কই হে, তোমরাও বলো না”। ভীলক তাঁর পিছনের এবং সামনের নোনাপুরের উপস্থিত গ্রামবাসীদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। গ্রামবাসীরা কেউই কোন উত্তর দিল না, ভয়ার্ত অসহায় দৃষ্টিতে উপানুর মুখের দিকে তাকিয়ে রই

উপানু ভদ্রতার মুখোশটা ফেলে দিয়ে এবার ক্রূর হাসল, বলল, “ওঃরে, চাঁদ, এই মাত্র সুকরা গাঁয়ের প্রধানের সঙ্গে আমরা দেখা করে এলাম। তুই তো প্রধান নোস, তাহলে কি গাঁয়ের সর্দার? গাঁয়ের নেতা? এদের সবাইকে দলে টানছিস? এখন ধর তোকে সবার সামনে যদি ল্যাংটো করে চাবকাই, এরা সকলে তোকে বাঁচাবে? কার বুদ্ধিতে তোরা এসব করছিস, বলে ফ্যাল চাঁদ?”

অনেকক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই, উপানু সকলের মুখের দিকে এক এক করে তাকাল। অভিজ্ঞ উপানুর বুঝতে অসুবিধে হল না, ওদের সকলের চোখেই এখন ভয়ের নিবিড় ছায়া। হাতের বল্লমের বাঁট দিয়ে সজোরে গুঁতো মারল ভীলকের পেটে। আকস্মিক এই আঘাতে ভীলক মাটিতে পড়ে গেলেন, যন্ত্রণায় পেটে হাত রাখলেন। তাঁর চোখে এখন যেন মৃত্যুভয়। ভীলকের মাটিতে পড়ে থাকা দেহের পাশে দাঁড়াল উপানু, বলল, “কার বুদ্ধিতে এসব হচ্ছে, বলে ফ্যাল। এ তো সবে শুরু, না বললে আরও যে কী করব তোদের নিয়ে, ভাবতেও পারছিস না”।

ভীলক উঠে বসলেন মাটিতে, কিছু বললেন না। আঘাতে, অপমানে, অসহায় ক্রোধে তাঁর মুখ বিবর্ণ। ঘোলাটে চোখে তাকালেন উপানুর দিকে। উপানু বেশ উপভোগ করল ভীলকের অভিব্যক্তি – ঘাড় ফিরিয়ে সে তার সঙ্গীদের ইশারা করল। অন্য রক্ষীরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে ঘিরে ফেলল উপস্থিত মানুষগুলিকে। তারপর সপাসপ চাবুক চালাতে লাগল, তাদের নগ্ন পিঠে। উপানু সেদিকে একবার তাকিয়ে, চোখ রাখল ভীলকের চোখে, “কে তোদের পোঁদে সলতে ধরাচ্ছে, আমরা জানি না ভাবছিস? জানি...কিন্তু তোদের থেকে নামটা নিশ্চিত করতে চাই। বলে ফেল, নয়তো এমন দশা করব...শেয়ালকুকুর কাঁদবে”।

রক্ষীদের চাবুকের আঘাতে উত্যক্ত একজন হাত তুলে বলল, “বলছি, বলছি, আর মারবেন না”। উপানু হাত তুলে সকলকে চাবুক থামাতে বলল, তারপর সেই লোকটিকে বেশ স্নেহমাখা সুরে ডাকল, “এদিকে আয়, বিনা কারণে এতক্ষণ মার খেয়ে মরলি, প্রথমেই বলে ফেললে পারতিস। বল কার বুদ্ধিতে এসব হচ্ছে?”

“ভল্লা”।

“সে তো জানি, ভল্লা, নেড়িকুত্তীর বাচ্চা শালা, সে ছাড়া আর কে হবে? এখন সে কোথায়?”

“সে তো পশ্চিমদিকে রাজ্য-সীমার বাইরে জঙ্গলে থাকে”।

“আরে, সে তো আমরাও জানি। কিন্তু নোনাপুরে যে তার নিত্যি যাওয়া-আসা আছে সে খবরও আমাদের আছে। সে এখন কোথায়?”

“আজ্ঞে সে এখন কোথায় সত্যিই আমি জানি না। আমি তো সকাল থেকে এই মাঠেই আছি”।

“তোর বাড়ি কোন গাঁয়ে?”

“আজ্ঞে নোনাপুর”।

“নোনাপুর – নোওনাআ। রক্তের স্বাদ নোনতা হয়, চোখের জলের স্বাদও নোনতা...জানিস কি? গত পরশু রাত্রে আস্থানে ডাকাতি হয়েছিল শুনেছিস তো? সে লুঠের মাল কোথায় আছে, কার বাড়িতে। কাদের বাড়িতে?”

নোনাপুরের মানুষগুলোর শরীর এবার ভয়ে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। চাবুকের আঘাত সহ্য করতে না পেরে, এতক্ষণ নোনাপুরের যে মানুষটি কথা বলছিল, এখন তার কথা বলার শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই যেন। আসন্ন বিপদের ভয়ানক আভাসে তার কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা নত হয়ে এল। দু হাত জড়ো করে বুকের কাছে ধরে, সে তাকিয়ে রইল উপানুর চোখের দিকে। তার দুচোখে অসহায় মিনতি। উপানু জিজ্ঞাসা করল, “তোর নাম কি?”

“আজ্ঞে, আমি সত্যিই কিছু জানি না, সরকার”।

উপানু অকারণ উচ্ছ্বাসে হাহা করে হাসল কিছুক্ষণ, বলল, “বলিস কি? নিজের নামটাও জানিস না? বাপের নাম জানিস তো?” উপানুর হাসি যেন উপস্থিত সকলের মনে মৃত্যুভয় ধরিয়ে তুলল।  

“আজ্ঞে, সামারু”। কোন মতে নিজের নামটা উচ্চারণ করল।

“বাঃ, সামারু বেশ নাম। কার কার বাড়িতে লুঠের মাল রাখা আছে, বলে দাও তো ভাই”।

“আজ্ঞে জানি না, বিশ্বাস করুন”। আর্তনাদের মতো শোনাল সামারুর কথাগুলো।

উপানু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তুই নাও জানতে পারিস, কিন্তু তোদের মধ্যে অন্য কেউ তো জানবেই”। কিছুক্ষণ সময় দিয়ে উপানু খুব সহানুভূতি মাখানো গলায় বলল, “দ্যাখ, নামগুলো বলে দিলে, আমরা শুধু তাদের বাড়িতেই যাব। তা না হলে গ্রামের সব বাড়িতেই ঢুকে, আমাদের অনর্থক ভাঙচুর মারধোর করতে হবে। তোদের সবার বাড়িতে বুড়ো মা-বাপ আছে, বউ আছে। ছেলেমেয়ে আছে – অকারণ তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলা...। আর আমাদেরও কাজ সারতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সন্ধের পর আস্থানে ফিরে দুপাত্র রস নিয়ে বসব, আনন্দে উল্লাসে মাথা ঝিমঝিম করবে ...  কী বল?” উপানু ঘাড় ফিরিয়ে তার সঙ্গী রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল। তারা কেউ কিছু বলল না। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল মানুষগুলোর দিকে।

উপানু সামারুদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বুঝতে পারছিস, ওরা কী রকম রেগে আছে? শালা বেজন্মা, তোরা ডাকাতি করলি, তার ওপর আবার দের তিন-তিনজন বন্ধুকে মেরে দিলি? কী ভেবেছিস, ঘাড় শক্ত করে জোড় হাতে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেই আমরা ছেড়ে দেব?” উপস্থিত মানুষগুলোর মুখে কোন উত্তর নেই। আসন্ন দুর্দশার অপেক্ষা করা ছাড়া।

উপানু এবার দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ স্বরে বলল, “এখনও সময় আছে, বলে ফ্যাল। নয়তো তোদের তো বটেই - তোদের গ্রামের সব বাড়িতে আগুন ধরিয়ে – সব কটাকে পুড়িয়ে মারব”।

সামারু এবং আরও তিনজন একসঙ্গেই বলল, “বিশ্বাস করুন আমরা সত্যিই জানি না। গ্রামের কেউ ডাকাতি করতে যায়নি, সরকার। আমাদের বিশ্বাস করুন, দয়া করুন”।         

 কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে উপানু নিজের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই পাঁঠাগুলোর সঙ্গে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চ ওদের গ্রামে যাই, হতভাগাদের ঘর থেকে বের করে সবার সামনে ল্যাংটো করে গ্রাম ঘোরালেই সব কথা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে”।        

উপানু নিজের ঘোড়ায় চড়ল। ভীলক একই ভাবে মাটিতে বসেছিলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে উপানু বলল, “তোকে আমি মনে রাখব, তুই ভল্লার চেলা হয়েছিস না?” তারপর বল্লমের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল ভীলকের মুখে। বলল, “ভল্লা ধরা পড়লে ভাল। নাহলে পরের বার তুই বাঁচবি না, কথাটা মনে রাখিস”। ঘোড়া ছুটিয়ে উপানু সঙ্গীদের নিয়ে রওনা হল নোনাপুরের দিকে।

উপানুর বল্লমের আঘাতে ভীলক যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর চোয়াল ফেটে রক্ত ঝরছিল  দরদর করে। দুই গ্রামের উপস্থিত মানুষরা সকলে তাঁকে ঘিরে ধরল। নালা থেকে জল এনে তাঁর মাথায় মুখে ছেটাতে লাগল। নিজেদের ধুতি থেকে কাপড়ের ফালি ছিঁড়ে চেপে ধরল ভীলকমশাইয়ের ক্ষতে। এখনই রক্ত বন্ধ না হলে প্রাণ সংশয়ও হতে পারে। একটু পরেই ভীলকের জ্ঞান ফিরতে, সুকরার কুশান বলল, “তোরা এখনই গ্রামে ফিরে যা - তাড়াতাড়ি। হায়নার দল ওদিকেই গেল। তোদের যে কী হবে, ভাবতেই শিউরে উঠছি...। পরিস্থিতি বুঝে কবিরাজদাদাকে ভীলকদাদার কথা বলবি। ওদিকটা সামলে তিনি যেন আমাদের গ্রামে এসে ভীলকদাদাকে একবার দেখে যান”।   

সামারু বলল, “ভীলকদাদাকে এভাবে ফেলে রেখে আমরা পালাব?”

ঝেঁজে উঠে কুশান বলল, “আগে বাড়ি যা, নিজের পরিবার সামলা – আমরা তো রয়েছি, ভীলকদাদাকে দেখছি”।  

নোনাপুরের লোকেরা নিজেদের গ্রামের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।

ওরা চলে যেতে কুশান বলল, “এক কাজ কর। সবাই ধরাধরি ভীলকদাদাকে সামনের ওই গাছতলায় নিয়ে যা। ছায়াতে একটু আরাম পাবে। ততক্ষণ আমি দেখছি, জঙ্গল থেকে কিছু গাছগাছড়া এনে, রক্তপাতটা যদি বন্ধ করা যায়”।  

খুব সাবধানে ভীলককে তুলে নিয়ে সুকরার চারজন এগিয়ে গেল বড়গাছটার দিকে। কুশান গেল বাঁধের উজানে কিছুটা দূরের ঝোপঝাড়ের দিকে। সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে তুলে নিল কিছু গাছগাছড়ার পাতা। তারপর দৌড়ে ভীলকের পাশে বসে এক গোছা পাতা নিয়ে দুহাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে বলল, “রক্ত পড়া কমেছে?”

“মনে হচ্ছে না, কাপড়গুলো রক্তে ভিজে উঠছে বারবার”। সবুজ পাতার প্রলেপ বানিয়ে কুশান আলতো হাতে পুরু করে লাগিয়ে দিল ভীলকের ক্ষতে। বলল, “চেপে ধরে থাক কিছুক্ষণ, আশা করি এবার বন্ধ হয়ে যাবে”।

উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে এখন ওদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এখান থেকে তাদের গ্রামের দূরত্ব অনেকটাই। এই অবস্থায় ভীলকের পক্ষে পায়ে হেঁটে গ্রামে ফেরা অসম্ভব। ওরা সবাই মিলে ভীলককে বয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভয় হচ্ছে যে হারে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে, ভীলককে বেশি নাড়াচাড়া করলে, বিপদ আরও বাড়বে। কুশান বলল, “গাছের ডাল দিয়ে ছোট একটা খাটুলা বানিয়ে ফেললে হয় না? সেটায় তুলে ভীলকদাদাকে আমরা গ্রামে নিয়ে যেতে পারি?”

কুশানের থেকে অনেকটাই কমবয়সী সুরুল বলল, “বাঃ ভালো বলেছ, কুশানকাকা, চ তো আমরা বানিয়ে ফেলি”। ওরা তিনজন উঠে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কিছু গাছের ডাল যোগাড় করে আর এক গোছা লতা এনে, বসে গেল খাটুলা বানাতে।

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “রক্তপড়া কমেছে, কুশানকাকা?”

“কমবে। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। গভীর ক্ষত – সময় লাগবে বৈকি! ভল্লাটা এসে সত্যিই আমাদের সবার কপালেই বেশ দুর্ভোগ এনে দিলছেলেটা কাজের, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিপজ্জনকও। ওরা কি সত্যিই কাল আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিল?”

সুরুল আর তার দুই বন্ধু গাছের ডালগুলোকে লতা দিয়ে বেঁধে কাঠামো বানাতে বানাতে বলল, “নতুন পথে চলতে গেলে, একটু হোঁচট তো লাগবেই কুশানকাকা”?

“তার মানে?”

“আমাদের কেউ কোনদিনই রাজাকে দেখিনি। জানিও না, চিনিও না। রাজা বস্তুটা খায় না মাথায় মাখে তাও জানি না। আমরা জানি রাজার কর্মচারীদের। সেই রাজকর্মচারীরা চিরকাল যে আমাদের পোষা ছাগল-ভেড়ার মতোই দেখে একথা আমরা ছোটবেলা থেকে শুনছি। এবং বড়ো হতে হতে টেরও পেয়েছি। একটা পোষা কুকুরকেও তার প্রভু কিছুটা সমীহ করে। কারণ সে জানে বাড়াবাড়ি করলে পোষা কুকুরটাও ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা পারি না। যত ভাবে, যে ভাবেই আমাদের অত্যাচার করুক না কেন, আমরা কামড়ে দেওয়া তো দূরস্থান, দাঁত খিঁচিয়ে সামান্য ঘ্যাঁকটুকুও কোনদিন করতে পারিনি। ভল্লাদাদা আমাদের সেটাই শেখাচ্ছে”।

“ঠিক কি বলতে চাইছিস বল তো”? সুকুলের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কুশান জিজ্ঞাসা করল, “এসব করেই কি আমরা ওদের থেকে সব সম্মান-টম্মান, ন্যায় বিচার-টিচার পেয়ে যাবো?”

সুরুল হেসে ফেলে বলল, “ভীলককাকার রক্তপড়াটা থেমেছে, কুশানকাকা”?

“হ্যাঁ অনেকটাই কমেছে। এখন কেমন লাগছে, ভীলকদাদা?” ভীলকের কথা বলার মতো অবস্থা নয়, হাত তুলে ইশারা করলেন, ঠিক আছি।

সুরুল বলল, “আর একটু সময় দাও, ভীলককাকা, তোমাকে আমরা বীরের সম্মানে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবো”।

“আমার কথার জবাব দিলি না তো?” ভ্রূকুটি চোখে তাকিয়ে কুশান জিজ্ঞাসা করল।

“কিছুই না, কিছুই হবে না”, সুরুল খাটুলা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “তবু একবার লড়েই দেখা যাক না, কিছু তো হতে পারে! হাত-পা গুটিয়ে, হা-হুতাশ করে। কপালকে দোষারোপ করে। আর ঈশ্বরকে অভিযোগ করেই বা এতদিন কী হয়েছে, বলতে পারো, কুশানকাকা?” সুরুলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কুশান ভীলকের দিকে তাকাল, ভীলক কী শুনতে পেলেন সুরুলের কথা? ভীলক অনায়াসে উপানুকে ভল্লার নামটা শুরুতেই বলে দিতে পারতেন। বললে তাঁকে এত দুর্ভোগ আর অপমান সহ্য করতে হত না।

কুশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিন্তু তার জন্যে এই রক্তপাত, অপমান...”।

“এই নাও, আমার খাটুলা প্রস্তুত”। সুরুল নিজেই একবার শুয়ে পড়ল খাটিয়ায়, তারপর উঠে বসে বলল, “নাঃ পিঠে বড়ো লাগছে, কিছু ঘাস-পাতা বিছিয়ে দে তো পুরু করে। সুকুলের সঙ্গীরা ছুটে গেল, ঝোপ-ঝাড়ের দিকে, সুরুল লতার বাঁধনগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে করতে বলল, “অপমানের কথা বলছ, কুশানকাকা? ওদের কাছে আমাদের সম্মান কোনদিন ছিল কি? তাহলে কিসের অপমান বলো তো? ভীলককাকাকে ওরা নয়, আমরা এতদিন সবাই সম্মান করেছি, ভালবেসেছি। আজ থেকে আমরা কি আর কাকাকে ভালবাসব না? সম্মান করবো না?” সুরুল একটা জোড়ে আরো শক্ত করে লতা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “অপমান কোথায়, কুশানকাকা? বরং ওঁর সম্মান বাড়ল! আর রক্তপাত? ভীলককাকার রক্তের দাম আমরা চুকিয়ে দেব, কাকা, তুমি ভেব না...। এই তো, বাঃ একদম কাঁচা ঘাস আর সবুজ পাতা – নরম আর ভারি ঠাণ্ডাও হবে। কুশানকাকা, ভীলককাকাকে তোলা যাবে? তাহলে তুলেই দাও। কাকাকে এই গাছতলার উদলা মাটিতে ফেলে রাখতে ভাল লাগছে না... “।

সকলে ধরাধরি করে ভীলককে খাটুলিতে তুলে শোয়াল। ভীলককে শোয়ানোর সময় নীচু হয়ে থাকা সুরুলের মাথায় ভীলক একটা হাত রাখলেন, কিছু বলতে পারলেন না। এত কষ্টের মধ্যেও তাঁর চোখে যেন আশীর্বাদের বার্তা দেখতে পেল সুরুল

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...