মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯ 


২৬ 

গতকাল দুপুরে নোনাপুর এবং সুকরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আস্থানের রক্ষীরা যে ব্যবহার করেছে, তারপরে আজকের ভোরটা ভল্লার কাছে অত্যন্ত সঙ্কটজনক। যদিও গতকাল রাত্রে সে আর রামালি দুই গ্রামেরই কিছু ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাতের গোপন অন্ধকারে বড়ো বড়ো কথা বলা, আর প্রকাশ্য দিবালোকে নিজের নিজের পরিবার - মা-বাবা-ভাই-বোনদের সামনে দিয়ে হেঁটে, ভল্লার কাছে মহড়ায় যোগ দিতে আসার অন্য মাত্রা আছে। তার জন্যে প্রয়োজন প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভয়হীন বুকের খাঁচা।  

ছেলেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সকলেই এখন সন্ত্রস্ত। তাদের চোখে-মুখে অসহায় বিপন্নতা। একে তো আস্থানের রক্ষীরা অভিযোগ করেছে, এই গ্রামের ছেলেরাই আস্থানে ডাকাতি করেছে। তিনজন রক্ষীকে মেরে ফেলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, এসবই ঘটেছে, রাজার দণ্ড পাওয়া অপরাধী ভল্লার উস্কানিতে। কোন ঘটনা এবং অভিযোগেরই প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই – সবটাই অনুমান নির্ভর। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই গতকাল তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। বন্দী করে নিয়ে গেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজকাকাকে। বীভৎস প্রহারে মৃতপ্রায় করে দিয়েছে গ্রামপ্রধান জুজাককে। তারপরেও গ্রামের ছেলেরা যদি ভল্লার কাছেই যায় শরীর চর্চা করতে, পরিবার-পরিজনদের এবং প্রতিবেশীদের আতঙ্ক বাড়বে। বাড়বে নিজের নিজের ছেলেদের প্রতি সন্দেহ। যারা বিশ্বাস করত, আমাদের ছেলেরা কোন কুকাজ করতে পারে না। তারাও এবার সন্দিহান হয়ে উঠবে। ছেলেদের এখন লড়তে হবে ঘরে এবং বাইরে। ঘরের লড়াইটাই বেশি কঠিন - স্নেহ-মমতাপ্রবণ পরিবারের সঙ্গে মানসিক লড়াই। তার থেকে বাইরের লড়াইটা অনেক বেশি স্পষ্ট।   

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নোনাপুর গ্রাম থেকে এল চোদ্দজন। আর সুকরা থেকে আটজন। ভল্লা সকলকে বসতে ইশারা করল। সকলে বসার পর ভল্লা বলল, “কী করে এলি তোরা? মা-বাবা, ভাই বোনরা কেউ মানা করল না?”

শল্কু হাসতে হাসতে বলল, “করেনি আবার? আমার মা তো হাতে পায়ে ধরতেই যা বাকি রেখেছেন। বোনদুটো এমন কাঁদছিল বেরোনোর সময়”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? পারবি? এই বাধা রোজ পেরিয়ে, লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে?”

শল্কু বলল, “ভল্লাদাদা, কে কী করবে আমি জানি না। আমি তো আসবোই। রক্ষীদের নাম শুনলেই,  ছোটবেলা থেকে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের দেখেছি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে। তোমার এখান থেকে গতকাল ফিরে গিয়ে যা দেখলাম, যা বুঝলাম, রক্ষীরাও ভয় পায়। এতদিন ওদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি, ওরা যা খুশি করে গেছে। ওদের গায়ে আমরা একবার হাত তোলাতেই – ওরা ভয়ে দৌড়ে চলে আসছে গ্রামে গ্রামে। অপমান করছে গুরুজনদের। কবিরাজকাকাকে ধরে নিয়ে গেল...তিনি কি আমাদের ডাকাতি করতে শিখিয়েছেন? নাকি ডাকাতি করতে আমাদের উস্কেছেন? আসলে এবার ওরাও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে ভল্লাকে। ভয় পেয়েছে ভল্লার দলকে। আমরা যদি ভয়ে সিঁটিয়ে আবার গিয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকি, ওরা তো আমাদের সকলের ঘাড়ে বসে হাগবে, ভল্লাদাদা! যে পথে আমরা এগিয়েছি...সেখান থেকে আমি অন্ততঃ ফিরে আসবো না, ভল্লাদাদা। হয়তো মরবো, কিন্তু মরার আগে ওদের টের পাইয়ে দিয়ে মরবো”।

ভল্লা লক্ষ্য রাখছিল, শল্কু্র কথাগুলো বাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে। তাদের মনে হয়তো কিছু দ্বিধা ছিল, সেটা ফিকে হয়ে উঠছে শল্কুর প্রত্যয়ী কথায়। তাদের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠছে। তাদের চোখে ফুটে উঠছে ক্রোধ।

ভল্লা সবাইকে ভাবতে একটু সময় দিল, তারপর বলল, “তোরাও কি শল্কুর সঙ্গে একমত? মনে কোন ভয় বা দ্বিধা নেই তো?”

ছেলেরা প্রায় একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাদের লড়তে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়বো”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ। আমি শেখাবো। নিজে হাতে ধরেই শেখাবো। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কোনদিন বিশ্বাস ভাঙবে না। প্রাণ দিতে হলেও না। একটা কথা মনে রাখিস – তোদের এই ভল্লাদাদাও কম নিষ্ঠুর নয়। চাপে পড়ে বা ভয়ে কেউ যদি রাজসাক্ষী হয়েছিস – কিংবা আমাদের কথা এই দলের বাইরের কাউকে বলেছিস, অন্য কেউ নয় - আমার হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাজি?”

“রাজি”! সকলের সমবেত চিৎকার, জঙ্গলের মধ্যে গর্জনের মতো শোনালো।

ভল্লা সুকরা গ্রামের সুরুলকে বলল, “সুরুল, গতকাল রাত্রে তোর সঙ্গে কথা বলার সময়, তোর মধ্যে যে জেদ আর রাগ দেখেছিলাম, সেটা কি এখনো আছে? নাকি একটু ভয় ভয় করছে”?

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে গতকাল ওরা যেভাবে অকারণ আঘাত করল, তার শোধ তো আমি তুলবই, ভল্লাদাদা। আমাদের সকলের মনের জোর আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু রক্ষীদের সঙ্গে লড়ার দক্ষতা নেই...তুমি আমাদের শেখাও ভল্লাদাদা।

“তবে, মনে রাখিস, লড়াই শিখতে গেলে জরুরি হচ্ছে, ধৈর্য আর জেদ। এ দুটো যার যত বেশী, সে শিখবে তত তাড়াতাড়ি। চল, তাহলে এখনই শুরু করা যাক”।  

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, আমাদের রণপাগুলো বের কর। আজ রণপার খেলা শেখাই সবাইকে”। রামালি দুজোড়া রণপা এনে ভল্লার হাতে দিল। ভল্লা একজোড়া রেখে অন্য জোড়াটা দিল রামালিকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাঁশের এই লাঠি দুটোয় চড়ে আমরা আজ হাঁটতে শিখব। আমাদের ঘোড়া নেই...ঘোড়ার বদলে আমাদের আছে রণপা। এই রণপা শুধু যে আমাদের পা দুটোকে লম্বা করে দেবে তাই নয়, প্রয়োজনে এই রণপা আমাদের অস্ত্রও হয়ে উটবে। এই লাঠির আঘাতে শত্রুর মাথাও ফাটানো যাবে অনায়াসে। কাজেই রণপা বড়ো কাজের জিনিষ। এখন আমি আর রামালি তোদের দেখাব – কীভাবে এতে চড়তে হয়, কীভাবে হাঁটতে হয়। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে দৌড়তেও হবে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই রণপায়ে চড়ল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখাল সবাইকে। আহোক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী করে শিখলি, রামালি?” রামালি স্বচ্ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বলল, “গতকাল ভোরে ভল্লাদাদা শেখাল। কাল সারাদিনে হাঁটতে শিখেছি...এবার দৌড়তেও শিখব”।

ভল্লা বলল, “সুকরার ছেলেরা ছাড়া, তোরা সবাই জানিস, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কোথায় লুকোনো আছে...চল সবাই ওদিকে যাই...ওখান থেকে রণপা নিয়ে এখনই মহড়া শুরু করব। রামালি তুই আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে আয়, আমি এগিয়ে যাচ্ছি”।

পলক ফেলার আগেই রণপা চড়ে ভল্লা যেন উধাও হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর। দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত ছেলেরা। শুধু একজোড়া লাঠি নিয়েই এত দ্রুত চলাফেরা করা যায়? তাও এই জঙ্গলের রাস্তায়? রামালি ওদের পাশে রণপায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, “শল্কু, কাকার কী অবস্থারে?”

শল্কু খুব মন দিয়ে রামালির হাঁটা দেখতে দেখতে বলল, “আজ ভোরে শুনলাম একটু ভাল আছেন। উঠে বসেছেন। তবে তোর কাকি একদম চুপ মেরে গেছে, জানিস তো? চাইলে তুই আবার ফিরে আসতে পারিস। মনে হয় না, তোর ওপর কাকি আর কোন চোটপাট চালাবে।”

রামালি হেসে বলল, “ধূর কী হবে, কাকার সংসারের বোঝা হয়ে থেকে? আমাকে কিছু না বললেও, কাকাকে ছেড়ে দেবে? এই ভালো – ছোটবেলা থেকে বহু সহ্য করেছি... খুব ভয়ে ভয়ে বড়ো হয়েছি। আর না...এবার বাঁচবো...তার জন্যে যদি মরতে হয়...তাও। মরার আগে এটুকু অন্ততঃ জেনে যাবো... বসে বসে মার খাইনি, চেষ্টা করেছিলাম...”!

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “কাল তোমাদের গাঁয়ে এসে রক্ষীরা কী করেছে, শল্কুদাদা?”

শল্কু বলল, “গ্রামে এসেই তো শুয়োরের বাচ্চারা যাকে সামনে পেয়েছে চাবুক মেরেছে। কেউ কেউ তো আবার বল্লমের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়েছে। বাচ্চা, বুড়ো, মেয়েছেলে কাউকে ছাড়েনি। ভাবলেই মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, কার কার বাড়িতে ডাকাতির মাল রাখা আছে...বার করে দে...নয়তো আগুন ধরিয়ে দেব সব কটা বাড়িতে। সেই সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন কবিরাজকাকা। আর পৌঁছুলেন গ্রামপ্রধান জুজাককাকা...”।

আহোক বলল, “ভল্লাদাদা আমাদের গাঁয়ে ঢুকতে মানা করেছিল। আমরা থাকলে, ভয়ংকর কাণ্ড হয়ে যেত। আমার ছোটকাকার কাছে শুনলাম, প্রধানমশাই ওদের সামনে গিয়ে, বলার মধ্যে বলেছিলেন, “আমি এই গ্রামের প্রধান, আপনাদের কোন অভিযোগ থাকলে, আমাকে বলুন...যাকে তাকে সবাইকে এভাবে আপনারা মারতে পারেন না...দেশে কি রাজা নেই নাকি? এটা কি অরাজক দেশ?” ব্যস্‌, আর যায় কোথায়, গুয়োর ব্যাটারা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমশাইয়ের ওপর। কী মার কী মার। বল্লমের বাঁট, লাথি, চড় ঘুঁষি। কবিরাজকাকা গ্রাম প্রধানকে বাঁচাতে গিয়েছিল, তাকেও বেধড়ক মারল। লাথি মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

এই সময়েই বেরিয়ে এসেছিল রামালির কাকি। গলার শির ফুলিয়ে নাকি চেঁচাচ্ছিল, “ওদের মারছো কেন? ওরা কী করেছে? ডাকাতি তো করেছে, বাপ-মা খেগো রামালি আর ওই আঁটকুড়ির বেটা ভল্লা। তাদেরকে ধরো না। ওদের কাছেই পেয়ে যাবে সব লুঠের মাল। এ গাঁয়ে কোন বাড়িতে কিচ্ছু নেই।

রামালির কাকির চিৎকারে রক্ষীরা একটু থমকে গিয়েছিল। না হলে গ্রামপ্রধান কালকেই শেষ হয়ে যেত। অকথ্য গালাগাল দিয়ে রক্ষীদের সর্দার বলল, এই রামালিটা আবার কোন বেজন্মা? রামালির কাকা গিয়েছিল, বউকে সামলাতে, সে বলল, আজ্ঞে আমার দাদার ছেলে, আমরা গতকালই ঝ্যাঁটা মেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এবার শুরু হল রামালির কাকার ওপরে মার...শুয়োরের বাচ্চা, কে তোদের তাকে তাড়াতে বলেছে?  সে এখন কোথায়? কাকাকে বাঁচাতে, কাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে আর এই গ্রামে নেই... হাভেতে ভল্লার সঙ্গে গিয়ে জুটেছে।

রক্ষীরা যখন রামালির কাকা আর কাকিকে নিয়ে ব্যস্ত, ওদিকে প্রধানমশাইয়ের তখন জ্ঞান নেই, মাটিতে পড়ে আছেন মড়ার মতো। কবিরাজকাকা ধুলো থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গেলেন প্রধানমশাইয়ের কাছে, ওখানেই তিনি নাড়ি পরীক্ষা করে দেখছিলেন প্রধানমশাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে। রক্ষীসর্দারের চোখ শালা শকুনের মতো, ঠিক দেখেছে। রাক্ষসটা কবিরাজকাকার কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাকে ওঠাল, বলল, অ তুই বুঝি সেই কবিরাজ? আশপাশের গাঁগুলোতে তোর কথাও তো খুব শুনেছি...তুইই শালা সবাইকে খেপাচ্ছিস। ঢ্যামনা ঢকঢকে বুড়ো তুই আমাদের সঙ্গে চল...তোর পেটে পা দিলেই, ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসবে গোপন সব কথা।

লোকটা কবিরাজকাকাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল রামালির বাড়ির সামনে। প্রধানমশাইয়ের রক্তাক্ত দেহটা পড়ে রইল মাঠেই। রামালির বাড়ি তছনছ করে কী খুঁজল, দেখল কে জানে। যাবার সময় রামালির কাকাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেল ওদের উঠোনে। তারপর বাইরে এসে সকলে ঘোড়ায় চড়ল, কবিরাজকাকার দুই হাত আর কোমরে দড়ি বাঁধল। রওনা হওয়ার আগে গাঁয়ের সবাইকে শাসিয়ে গেল, ভল্লা আর রামালিকে যদি না পায়, ওরা আবার আসবে। ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। কবিরাজকাকার পা দুটো ঘষটাতে লাগল মাটিতে, ঠোক্কর খেতে লাগল, পথের ধারের পাথরে, ঝোপঝাড়ে”।  

আহোক বর্ণনা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। আহোক আবার বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে এইসব ঘটনার কথা যখন শুনছি, সবাই ছিল সামনে - বাবা, জ্যাঠা, অন্য কাকারা...মা কাকিমারা...ভাইবোনগুলোও...আমি বললাম গাঁয়ের এতগুলো মানুষ রয়েছো – কেউ বেরিয়ে গিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে না? জ্যাঠা গম্ভীর গলায় বলল, জুজাক তো গিয়েছিল। কবিরাজদাদাও গিয়েছিল...ওদের কী হয়েছে সবই তো শুনলি...আমরা গেলেও একই দশা হত...কী আর বলবো...বয়স্ক গুরুজন... রাজরক্ষীদের ভয়ে এরা কোনদিন মাথা তুলে বাঁচতেই শেখেনি...”

সুরুল বলল, “এসব দেখে শুনেও আমাদের রক্ত যদি গরম না হয়...যদি এর শোধ না নিই...রক্তখেকো রক্ষীদের যদি এখনই উচিৎ শিক্ষা না দিই...তাহলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না, আহোকদাদা...রোজ রোজ তিলে তিলে মরার থেকে...ওদের অন্ততঃ একজনকে মেরে যদি মরি...সেটাই হবে প্রকৃত বাঁচা...”।

তেইশজন ছোকরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের পথে।

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...