বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮ "

প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্ব

অনাচারী কলির পদপাত ও নিরোধ

শ্রীসুত বললেন, “এরপর মহাভাগবত পরীক্ষিৎ বিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের পরামর্শ অনুযায়ী পৃথিবী পালন করতে লাগলেন এবং তাঁর সম্পর্কে জ্যোতিষী ব্রাহ্মণেরা যেমন বলেছিলেন তাঁর মধ্যে তেমনই গুণাবলী দেখা গিয়েছিল। তিনি উত্তরের কন্যা ইরাবতীকে বিয়ে করলেন এবং জন্মেজয় প্রমুখ চার পুত্র লাভ করলেন। একবার মহারাজ পরীক্ষিৎ দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে একজায়গায় দেখতে পেলেন, একজন রাজবেশধারী শূদ্র, এক বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছে। তিনি সেই শূদ্ররাজাকে কলি বলে চিনতে পেরে তাকে দমন করলেন”

শ্রীশৌণক বললেন, “রাজবেশধারী কলি অতি কুৎসিত শূদ্র, তার ওপর সে আবার বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছিল, মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে শুধু দমন করলেন, হত্যা করলেন না কেন? হে মহাভাগ, যদি এই ঘটনায় শ্রীবিষ্ণুর অথবা তাঁর ভক্তদের কথাপ্রসঙ্গ থাকে, তাহলে বর্ণনা করুন। নচেৎ বৃথা আলাপে কাল হরণের কী প্রয়োজন?”

[এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও  “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি।  কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। এবং তাঁর আক্ষেপ বীর ক্ষত্রিয় রাজা পরীক্ষিৎ, কলি নামক কুৎসিত ওই শূদ্রকে হত্যা করলেন না কেন? আর্যদের আরোপিত ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের পক্ষপাত দুষ্ট প্রভাব কাটিয়ে, সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ – শূদ্রদের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই যে তাদের প্রতি ঋষি শৌণকের এই ঘৃণা, ক্রোধ ও বিরক্তি বুঝতে বাকি থাকে না।]         

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ কুরুজাঙ্গলে বাস করার সময়েই শুনতে পেলেন, কলি তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এই অশুভ সংবাদ শোনামাত্র তিনি রথে চড়লেন এবং অশ্ব, হাতি, রথ ও পদাতি এই চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হলেন। তিনি ভদ্রাশ্ব, কেতুমাল, উত্তরকুরু ও কিংপুরুষ ইত্যাদি রাজ্য সকল জয় করে, সেই রাজাদের থেকে কর আদায় করলেন। ওই সকল রাজ্যের লোকমুখে তিনি শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য, তাঁর পূর্বপুরুষদের যশ, অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ থেকে নিজের পরিত্রাণের কাহিনী, সব শুনলেন। তিনি আরও শুনলেন যাদব ও পাণ্ডবদের মধ্যে আন্তরিক সখ্যতার কথা; কেশবের প্রতি পাণ্ডবদের একান্ত ভক্তির কথা শুনে, তিনিও কৃষ্ণের পাদপদ্মে একান্ত ভক্ত হয়ে উঠলেন। এইভাবে রাজা পরীক্ষিৎ যখন তাঁর পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে রাজ্য শাসন করছিলেন, এমন সময় এক অদ্ভূত ঘটনা ঘটে গেল, সে কথা বলছি, আপনারা শুনুন।

 একদিন বৃষরূপী ধর্ম একটি মাত্র পায়ে ঘুরতে ঘুরতে, গোরূপধারিণী পৃথিবীকে সন্তানহীনা মায়ের মতো কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মাতা, আপনার শরীর কুশল তো? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব কষ্টে আছেন? আপনি কী আমাকে এক পায়ে চলাফেরা করতে দেখে দুঃখ পাচ্ছেন? ভবিষ্যতে শূদ্ররাজারা আপনাকে ভোগ করবে ভেবে আপনি কী ব্যাকুল হয়েছেন? আজকাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান প্রায় লোপ পেয়ে গেছে, দেবতারা যজ্ঞভাগ পান না, অতএব দেবরাজ ইন্দ্র সময় মতো বর্ষণ দেন না। আপনি কী প্রজাদের এই শোচনীয় পরিণাম দেখে ক্লেশ পাচ্ছেন?

হে পৃথিবী, আজকাল এমনই দুঃসময়, পতি স্ত্রীকে, পিতা সন্তানকে রক্ষা করে না, বরং নিষ্ঠুর রাক্ষসের মতো অত্যাচার করে। সরস্বতীদেবী দুরাচারী ব্রাহ্মণদের আশ্রয় নিয়েছেন, কুলীন ব্রাহ্মণরাও রাজার সেবায় দাসের মতো আচরণ করতে লজ্জাবোধ করছে না। বীর ক্ষত্রিয়েরা রাজ্য সকল উৎসন্নে দিয়েছে, শাস্ত্রের নিয়ম অবহেলা করে সর্বত্র পান, ভোজন ও নারীসঙ্গ উপভোগ করতে দ্বিধা করে না।

হে মাতা, আপনি কী এই সব দেখে বিষণ্ণ হয়েছেন? একসময় আপনার সৌভাগ্যে স্বর্গের দেবতারাও ঈর্ষা করত, বলবান কাল কী আপনার সেই সৌভাগ্য হরণ করে নিয়েছে? আপনার ক্লেশের কথা যথাযথ আমাকে বলে আমার উৎকণ্ঠা নিবারণ করুন”

ধরিত্রীদেবী উত্তর দিলেন, “হে ধর্ম, আপনি যা জিজ্ঞাসা করলেন, সে সব কথা আপনিও জানেন, তাও আমি আমার দুঃখের কারণ বর্ণনা করছি। যিনি ছিলেন বলে আপনার চারটি পা বর্তমান ছিল এবং যাঁর কারণে সকল মহাজন ও সাধারণ মানুষের মনে মহাগুণ বিরাজ করত, সেই অনন্ত গুণের আকর শ্রীনিবাস এই লোক থেকে চলে যাওয়ায় পাপের আকর কলি আমাকে আক্রমণ করেছে। হে ধর্ম, শ্রী ভগবানের বিরহ দুঃসহ। ভগবানের শ্রীচরণচিহ্ন আমার সর্ব অঙ্গে ধারণ করে, আমি সৌভাগ্যের গর্বে অহংকারী হয়েছিলাম। মনে হয় সেই অপরাধেই তিনি আমাকে পরিত্যাগ করলেন। যে নির্বিকার পুরুষ অসুর কুলে জাত অত্যাচারি রাজাদের হত্যা করে আমার ভার লাঘব করেছিলেন, যিনি আপনার তিনটি খঞ্জ পায়ের দুর্গতি থেকে উদ্ধার করে আপনাকে পূর্ণাঙ্গ সুস্থ করে তুলেছিলেন, কোন ভক্ত তাঁর বিরহ সহ্য করতে পারবে? যাঁর প্রেমদৃষ্টি, মধুর হাস্য ও মনোহর আলাপ সত্যভামা প্রমুখা মানিনীদের মান ও ধৈর্য হরণ করেছিল, যাঁর পায়ের ধুলিকণা আমার অঙ্গের শোভা বাড়িয়েছিল, সেই পুরুষোত্তমের অন্তর্ধান কিভাবে সহ্য করা যায়?”

এইভাবে ধর্ম ও পৃথিবী যখন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন, সেই সময় রাজর্ষি পরীক্ষিৎ কুরুক্ষেত্রে পূর্ববাহিনী সরস্বতী নদীর তীরে উপস্থিত হলেন” 

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, রাজা পরীক্ষিৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, এক রাজবেশধারী শূদ্র হাতে লাঠি নিয়ে এক বৃষ ও এক ধেনুকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাদা পদ্মের মতো ধবল বৃষটি ভয়ে মূত্রত্যাগ করছে ও এক পায়ে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। যজ্ঞের গব্য প্রসবিনী ধেনুটিও ক্ষুধায় ক্ষীণদেহ, শূদ্রের লাথিতে শোচনীয় অবস্থায় সন্তানহারা গাভির মতো বিলাপ করছে।

রাজা রথ থেকে এই দৃশ্য দেখে তাঁর ধনুতে তির স্থাপন করলেন, তারপর মেঘের মতো ক্রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বললেন, “দুরাচারি, তুই কে? আমার শাসনাধীন রাজ্যে থেকে বল দর্পে তুই দুর্বলকে অত্যাচার করছিস? তুই নটের মতো রাজবেশ ধরেছিস, কিন্তু তোকে দেখে তো শূদ্র বলেই মনে হয়! কৃষ্ণ ও অর্জুন অন্তর্হিত হয়েছেন দেখে তুই নির্জনে এই দুই দুর্বল প্রাণিদের নিধনে উদ্যত হয়েছিস? তোর প্রাণ বধ করলে এই পাপের উচিত শাস্তি হতে পারে”

তারপর তিনি বৃষকে ডেকে বললেন, “তুমি কে? তোমার শরীর পদ্মের মতো শুভ্র, কিন্তু তোমার তিনটি পা নেই কেন? তুমি কী কোন দেবতা, আমাদের ক্লেশ দেবার জন্যে বৃষরূপ ধারণ করেছ? এই রাজ্য পাণ্ডবদের বিশাল বাহুবলে শাসিত হয়, এখানে তোমরা দুইজন ছাড়া আর কাউকে শোক করতে দেখা যায় না। হে সুরভিপুত্র, শোক করো না, এই শূদ্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। হে মাতঃ, আমি যখন দুষ্ট লোকের শাসনে আছি, তখন তোমার মঙ্গল হবেই। তুমিও রোদন করো না। যে রাজার রাজ্যে প্রজারা অসাধু লোকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়, সেই রাজার আয়ু, কীর্তি, ভাগ্য ও সম্পদ সকলই বিলুপ্ত হয়। হে সুরভিনন্দন, তোমার অন্য তিনটি পা কে ছিন্ন করেছে, আমাকে বলো, যাতে আমি তার উচিৎ প্রতিকার করতে পারি”

শ্রীধর্ম বললেন, “যাঁদের গুণে বশীভূত হয়ে স্বয়ং ভগবান দৌত্য, সারথ্য ইত্যাদি কর্ম করেছিলেন, আপনি সেই পাণ্ডবদের বংশধর, বিপন্নদের প্রতি আপনার এই অভয়বাণী সুসঙ্গতই হয়েছে। আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, আমাদের ক্লেশের কারণ কে? কিন্তু প্রাণীদের ক্লেশ কে দেয়, তা আমাদের পক্ষে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, ভিন্ন ভিন্ন মতের বিভিন্ন তর্কজালে আমরা বিভ্রান্ত। কেউ বলেন দেবতারা কর্মের অধীন এবং কর্ম আত্মার অধীন, অতএব আত্মা বা দেবতা কেউই দুঃখের কারণ নয়, সুতরাং আত্মাই আত্মাকে সুখ দুঃখ প্রদান করে। দৈবজ্ঞগণ বলেন, গ্রহরূপ দেবতারা সুখদুঃখের কারণ, আবার মীমাংসার পণ্ডিতরা বলেন, যাবতীয় সুখদুঃখ নিজের কর্মেরই ফল। যারা লোকায়ত* মতে বিশ্বাসী, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখের কোন কর্তা নেই, জীবের স্বভাব থেকে এর সৃষ্টি। যাঁরা বাক্য ও মনের অগোচর এক স্বতন্ত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখ যাবতীয় বিষয় ঈশ্বররূপ মূল কারণ থেকে উৎপন্ন হয়। মহারাজ, আপনি উপরের সবকটি মতের মধ্যে যেটি সবথেকে সমীচীন মনে করেন, সেই মতটিই গ্রহণ করুন”

[এই লোকায়ত মতের বিশ্বাসীরাই ছিলেন নিরীশ্বরবাদী মহাভারতে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি চার্বাক যিনি দুর্যোধনের মিত্র ছিলেন। আবার রামায়ণে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি জাবালি, যিনি শ্রীরামচন্দ্রকে পিতৃসত্য পালনের জন্যে বনবাসে না যাওয়ার উপদেশ দেওয়াতে, শ্রী রাম তাঁকে ধিক্কার দিয়ে তিরষ্কার করেছিলেন]।      

“হে বিপ্রগণ, ধর্মের এই উত্তর শুনে সম্রাট পরীক্ষিতের মন শান্ত ও সংশয়মুক্ত হল, তিনি বললেন, “হে ধর্মজ্ঞ, আপনি নিজের ঘাতকের নাম নির্দেশ না করে, বিবিধ ধর্ম তত্ত্ব নির্দেশ করায় আপনাকে বৃষরূপধারী সাক্ষাৎ ধর্ম বলেই মনে হচ্ছে। হে ধর্ম, আপনি সত্যযুগে তপস্যা, শুদ্ধি, দয়া ও সত্য এই সম্পূর্ণ চার পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ত্রেতাযুগে অধর্মের অংশ গর্ব দিয়ে তপস্যার, কুসঙ্গ দিয়ে শুদ্ধির, নেশাগ্রস্ত উন্মত্ততায় দয়ার ও অসত্য দিয়ে সত্যের চতুর্থাংশ বিনাশ হয়েছিল। এরপর দ্বাপরে অর্ধাংশ, ও কলিতে তিন অংশ বিনাশ হয়েছে। অতএব সত্যই কলিযুগের অবশিষ্ট একপাদ ধর্ম বলে নির্দিষ্ট হয়েছে। হে ধর্ম, এখন একমাত্র সত্যই আপনার জীবনধারণের উপায়, কিন্তু অসত্যে বাড়বাড়ন্ত কলি আপনার অবশিষ্ট পদটিকেও হরণ করতে চায়। ভগবান পরষ্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে, পৃথিবীর ভারভূত রাজাদের ও যাদবদের সংহার করেছিলেন এবং তাঁর শ্রীচরণস্পর্শে সর্বত্র মঙ্গল বিরাজিত ছিল। কিন্তু এখন শান্তশীলা পৃথিবীও শ্রীকৃষ্ণের বিরহে নিজেকে হতভাগ্যা মনে করছেন এবং রাজবেশী শূদ্রেরা তাঁকে ভোগ করবে, এই আশঙ্কায় চোখের জল ফেলছেন”

“মহারথ পরীক্ষিৎ ধর্ম ও ধরিত্রীকে এইভাবে সান্ত্বনা দিয়ে অধর্মের মূল কলিকে হত্যা করবেন বলে ভয়ংকর খড়্গ তুললেন। রাজাকে ক্রুদ্ধ দেখে ভয়ার্ত কলি রাজবেশ ফেলে দিয়ে, মহারাজ পরীক্ষিতের দুই পায়ে মাথা রেখে প্রাণভিক্ষা করতে লাগলেন।

কলির এই দুরবস্থা দেখে দীনবৎসল মহারাজ পরীক্ষিৎ হেসে বললেন, “আমরা মহাবীর অর্জুনের বংশে জন্ম নিয়ে তাঁর যশ অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতিজ্ঞা করেছি। অতএব তুমি যখন আমার সামনে করজোড়ে তখন তোমার আর ভয় নেই, কিন্তু আমার রাজ্যে তোমার মতো অধর্মের কোন ভাবেই স্থান হবে না। তুমি রাজগণের মনে প্রবেশ করায়, লোভ, মিথ্যে, চুরি, দুষ্টতা, নীচতা, অলক্ষ্মী, কপটতা ও অহংকার বেড়ে উঠেছে। এখানে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে, জনগণ যজ্ঞেশ্বরের অর্চনা করেন, যজ্ঞমূর্তি শ্রীহরিও তাঁদের সিদ্ধি ও মঙ্গল করেন। অতএব এই ব্রহ্মবর্তে তোমার স্থান হবে না”

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ এই আদেশ দেওয়াতে কলি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হে সার্বভৌম, আমি আপনার আদেশে যেখানেই বাস করি না কেন, আপনাকে অস্ত্র হাতে সর্বদাই দেখতে পাব। অতএব, হে মহারাজ, আপনি আমাকে এমন একটি স্থান নির্দেশ করুন, যেখানে আমি বাস করে, আপনার আজ্ঞাপালন করতে পারি”

“কলি এই প্রার্থনা করায়, রাজা পরীক্ষিৎ, তাকে দ্যূত অর্থাৎ পাশাখেলায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রী ও প্রাণীহিংসা এই চারটি স্থান নির্দেশ করে দিলেন। এই চারটি স্থান অসত্য, অহংকার, অশুচি ও নিষ্ঠুরতা, এই চারটি অধর্মের আবাস হয়ে উঠল। কলি আরো একটি স্থান অনুনয় করলে, রাজা পরীক্ষিৎ তাঁকে সুবর্ণ দান করলেন। এই সুবর্ণে অসত্য, গর্ব, কাম, হিংসা ও কলহ পাঁচটি অধর্ম একসঙ্গে বাস করে। সেই থেকে সকল অধর্মের স্বরূপ কলি ওই পাঁচটি স্থানে বাস করতে লাগল। অতএব যে ব্যক্তি নিজের মঙ্গল কামনা করে, বিশেষ করে যাঁরা লোকপালক, তাঁদের ওই সকল বিষয় ভোগ করা একান্তই অনুচিত।

[অতএব সেই থেকে কলির বাসা হল পাশাখেলা অর্থাৎ জুয়ায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রীভোগে, প্রাণীহিংসায় ও সুবর্ণে – অর্থাৎ মিথ্যা, অহংকার, বাসনা, হিংসা ও কলহে। এই সব বিষয় যাঁরা ভোগ করেন না, তাঁরা কলির খপ্পর থেকে মুক্ত!]

এইভাবে রাজা কলির নিগ্রহ করে, বৃষের শরীরে তপস্যা, শৌচ ও দয়া এই তিনটি নষ্টপাদ আবার উদ্ধার করে দিলেন, অর্থাৎ ওই সকল ধর্ম আবার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ধরণীকে আশ্বস্ত করলেন। মহারাজ পরীক্ষিতের প্রভাবেই আজ আপনারা এই যজ্ঞে উপস্থিত থেকে দীক্ষিত হতে পেরেছেন”। 

চলবে...      


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড ...