এর আগের গল্প - " জঙ্গী ব্যবসা "
এর আগের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "
এর আগের নাটক - " এক দুগুণে শূণ্য "
[প্রাককথাঃ ব্রহ্মশাপের কারণে তক্ষকের
দংশনে রাজা পরীক্ষিতের যখন এক অলৌকিক মৃত্যু হয়েছিল, তখন তাঁর পুত্র জন্মেজয় ছিলেন
নাবালক। সাবালক হয়ে তিনি হস্তিনাপুরের পিতৃ-সিংহাসনে বসে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁর
পিতার হত্যাকারীদের বিনাশ করবেন। তাঁর মন্ত্রীসভা (এই মন্ত্রীসভার অনেকেই ছিলেন রাজা
পরীক্ষিতেরও মন্ত্রীমণ্ডলে!) সিদ্ধান্ত করলেন সর্পদংশনই রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যুর
একমাত্র কারণ, এবং পরামর্শ দিলেন, সর্পসত্র যজ্ঞে সর্পবংশ ধ্বংস করলেই তাঁর পিতার
মৃত্যুর প্রতিশোধ হতে পারে। সেই পরামর্শ মেনে রাজা জন্মেজয় সর্পযজ্ঞ করেছিলেন।
মহাভারতে তাৎপর্যপূর্ণ
কিছু ইঙ্গিতসহ এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ আছে, যার থেকে গভীর এক ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া
যায়। সেই নিয়েই এই নাটিকা- “ওঁ শান্তিঃ”।]
পাত্র-পাত্রী
নির্মল
– মহামন্ত্রী
বিভূতি
– রাজগুরু
বিজু
- সেনাপতি
১
[নাটক শুরু
হতে সামান্য দেরি। পিছনে পর্দা নিয়ে মঞ্চেই মুখোমুখি বসে আছেন তিনজন। তিনজনে
নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলছে। তিনজনের মধ্যে দুজন বয়স্ক, একজন হাট্টাকাট্টা যুবক।
বয়স্ক দুজনের, একজন বিভূতি, অন্য জন নির্মল, আর ছোকরা বিজয়, ডাক নাম বিজু। যুবকের
পরনে জামা-প্যান্ট। বয়স্ক দুজনের পরনে ধুতি। নাটক শুরুর প্রথম ঘণ্টা শেষ হতে, ওদের
আলাপ শোনা গেল।]
বিজুঃ নাটকটা তুমি ভালই লেখ, নির্মলদা। কিন্তু এই
মহাভারত-টারত না চটকে, অন্য কিছু নিয়ে লেখ না, কেন? কত কী বিষয় রয়েছে! যেমন ধরো
রাজনীতি। দুর্নীতি। ষড়যন্ত্র। হত্যা। রহস্য।
নির্মলঃ কেন তোর কী মনে হয়, মহাভারতে ওসব নেই?
বিজুঃ কী জানি দাদা। মহাভারত মানেই চেঁচিয়ে পাড়া
মাথায় করা ডায়ালগ। সত্যের জয়, মিথ্যের ভয়। আজগুবি যত মেসেজ। পাবলিক নেয় না।
নির্মলঃ তা পাবলিক কী নেয় শুনি?
বিজুঃ এই তো
গতবার পুজোয় “খেলাধুলো” ক্লাব নাটক নাবাল, “সংসারের সং”। লিখেছিল প্রকাশ দস্তিদার।
প্যানপেনে ফ্যামিলি ড্রামা, কিন্তু সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ। প্রতিটা সিনে
পাবলিকের কী ক্ল্যাপ। যেন হাজার হাজার পায়রা উড়ছে!
বিভূতিঃ ও নির্মল, এ যে এখনও বাবুদের মতো পায়রা ওড়াতে
চায়।
নির্মলঃ তা ভালো। কিন্তু বিজু আমার নাটক মহাভারত নিয়ে
হলেও, তাতে তো লম্বা চওড়া ডায়ালগ থাকে না।
বিজু: না, তা থাকে না।
নির্মলঃ চকচকে ঝকঝকে পোষাক, মুকুট-গয়না কিছুই তো থাকে
না।
বিভূতিঃ না, না কিচ্ছু থাকে না। মহাভারত মনেই হয় না। মনে
হয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে আটপৌরে আলোচনা হচ্ছে।
বিজুঃ তা ঠিক।
নির্মলঃ আর নাটকে মেসেজ যা দিই, তাতে হাততালি মেলে না।
তবে পাবলিক মাথা চুলকোয়। চিন্তা করে। চিন্তার তো আওয়াজ হয় না, বিজু!
[দ্বিতীয়
ঘন্টা পড়ল]
বিভূতিঃ ঘন্টার আওয়াজ শুনলে, নির্মল। নাটক শুরু কর।
নির্মলঃ ইয়েস। গেট রেডি। মেকআপ করে নাও চটপট। এখনই নাটক শুরু হবে।
[পর্দা পিছনে নিয়ে, মঞ্চের সামনে
বসেই তিনজন মেকআপ সেরে নিল। বিজুর হাতে প্লাস্টিকের তলোয়ার। বিভূতি জামা খুলে খালি
গা, তার কাঁধে পৈতে, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। নির্মল মাথায় চাপিয়ে নিল একটা টুপি,
তার মাথাভরা চুল আর নেই, যেন মাথা জোড়া বিশাল টাক। এতক্ষণ যে ভাবে বসেছিল, সে
ভঙ্গিগুলোও পাল্টে গেল। বিজু উঠে দাঁড়াল, তার ভঙ্গিতে বীর ভাব, সে এখন সেনাপতি।
কুচুটে ব্রাহ্মণের ছদ্মবিনয়ী ভাব নিয়ে বসল বিভূতি, রাজগুরু। আর দুনিয়ার যত চিন্তা
মাথায় নিয়ে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নির্মল, মহামন্ত্রী। সকলেই প্রস্তুত, সকলেই চিত্রার্পিতের
মতো স্থির।]
[তৃতীয় ঘন্টা পড়ল]
সেনাপতিঃ মন্ত্রিমশাই, গুরুদেব, আপনারা আমার প্রণাম
নেবেন। প্রাসাদের সব সংবাদ কুশল তো?
মহামন্ত্রিঃ আশীর্বাদ নাও, সেনাপতি। আপাত দৃষ্টিতে
প্রাসাদের সব খবরই ভাল। দুশ্চিন্তার কারণ নেই, তবে চিন্তা আছে!
রাজগুরুঃ [জপ করছেন, যেন মৌনব্রত, হাত তুলে
আশীর্বাদের ভঙ্গি করলেন।]
মহামন্ত্রীঃ বস, সেনাপতি বস। তারপর সীমান্তের খবর কী?
যুদ্ধ-বিগ্রহের কোন আশঙ্কা নেই তো?
[সেনাপতি বসল।]
সেনাপতিঃ বিলক্ষণ, নেই আবার? শত্রুরা
তো মুখিয়ে আছে, আক্রমণ করার জন্যে। সরাসরি যুদ্ধে পেরে উঠবে
না জেনে, ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর চোরাগোপ্তা লোক ঢুকিয়ে
লাগাতার ঝামেলা পাকিয়ে চলেছে। অসতর্ক হবার কোন জো নেই। এই সময়েই পেলাম রাজামশাইয়ের
জরুরি তলব। দৌড়ে এলাম।
রাজমন্ত্রিঃ রাজামশাইয়ের দেখা পাবে কাল সকালে - রাজসভায়। এখন
আমরাই তোমাকে ডেকেছি, খুব জরুরি একটা আলোচনার জন্যে।
সেনাপতিঃ সে আলোচনাটা একটু তাড়িতাড়ি সেরে ফেলা যায়
না, মন্ত্রিমশাই? পাঁচমাস পরে সীমান্ত থেকে ফিরে...। ঘর থেকে বেরোনোর মুখেই বালিকা
কন্যা সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো, বলল, এতদিন পরে এলে, বাবা, তুমি এখনই আবার কোথায়
যাচ্ছো? মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখ ছল ছল করছে। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়েছে। তাকে
কোলে নিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মায়ের কোলে রেখে তবে বেরোতে পারলাম।
রাজগুরুঃ হে
হে হে, প্রাণ হাতে নিয়ে ঘোরা ফেরা করাই আপনাদের কাজ। এই ঘোড়া নিয়ে ঘুরছেন টগবগ
করে, আর এই হয়তো বুকে শত্রুর তির বিঁধে টপকে পড়লেন ঘোড়ার পিঠ
থেকে। কখন কী হয়, বলা যায়? আপনাদের
জীবন যেন পদ্মপাতায় জল।
সেনাপতিঃ তবে? আমাদের সঙ্গে কার তুলনা? (একটু চাপা স্বরে) আমরাই তো যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিয়ে লড়ি, সীমান্ত রক্ষা করি। অন্যরাজ্য জয় করে, ধন সম্পদ এনে
রাজকোষ ভরে তুলি। আমাদের জন্যেই রাজ্য আর রাজাদের এত ঠাটবাট, চমকদমক, ফুর্তিফার্তা। বলি রাজাকে রাজা বানায় কে?
আমরাই তো, নাকি?
রাজগুরুঃ কথাটা খুব মন্দ বলেননি, সেনাপতি মশাই।
তবে আমরাও কিছু কম যাই না, এটা তো মানবেন? এই আমরা যদি, মন্ত্র-টন্ত্র পড়ে, যুদ্ধে যাবার শুভ দিনক্ষণ না দেখে দিই, রাজ্যজয় করা
যেত কি? ঠিক ঠিক দেবতাকে, মোক্ষম লগ্ন
দেখে, তাঁদের মনোমত ভোগ দিয়ে, ইন্দ্র, অগ্নি,
পবন, সূর্য, চন্দ্র
সক্কলকে আমরা হাতের মুঠোয় ধরে রাখি বলেই না, রাজ্যের,
রাজার, সমস্ত লোকজনের এত জয় জয়কার, এত সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি।
সেনাপতিঃ ঠাকুরমশাই, আমাদের ওদিকে একবার চলুন না,
আপনার শান্তিজলের কুণ্ডটা নিয়ে!
রাজগুরুঃ কোথায়?
সেনাপতিঃ কেন, সীমান্তে? আমাদের
সকলকে এক সঙ্গে বসিয়ে মাথায় একছিটে করে জল দেবেন, আর মন্তর
ঝাড়বেন, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ। ব্যস, যুদ্ধের বালাই
চিরকালের মত ঘুঁচে যাবে।
রাজগুরুঃ ধুর খ্যাপা, তাই কখনো হয় নাকি? মনটাকে মায়া থেকে, মোহ থেকে তুলে আনতে হয়। মনের
মধ্যে অহংকার, লোভ, হিংসার লেশমাত্র
থাকলে হবে না। তবে না শান্তি আসবে!
সেনাপতিঃ তা মনের এই দারুণ দারুণ ব্যাপার
স্যাপারগুলো কার থাকা জরুরি, ঠাকুরমশাই? যে জল নেবে তার,
নাকি যিনি জল ছিটোবেন, তাঁর?
রাজগুরুঃ তা মন্দ বলেননি, ভায়া। সত্যি বলতে
দুজনের পক্ষেই জরুরি। তবে আমরা কিনা ব্রাহ্মণ, তাই ওগুলো
আমাদের পক্ষে কম হলে ক্ষতি হয় না; কিন্তু অন্যদের পক্ষে
একেবারে অনিবার্যরকম জরুরি। হে হে হে হে।
সেনাপতিঃ (মিচকে হেসে) তার মানে এই শান্তি-টান্তি
ব্যাপারগুলো বলছেন, পুরোটাই গোলা ব্যাপার?
রাজগুরুঃ নির্ঘাৎ, তবে মুখ ফুটে বলতে নেই, এই আর কি!
মহামন্ত্রিঃ [কথার ভঙ্গিতে বেশ বিরক্তি] আপনাদের এই ডেঁপো
কথাবার্তা আর কতক্ষণ চলবে বলুন দেখি? আপনারা দুজনেই রাজ্যের দুই স্তম্ভ, কিন্তু আপনাদের বাচালতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি।
সেনাপতিঃ চুপচাপ আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়, বলুন দেখি? তাই এই
বিশ্রম্ভালাপ, বুঝলেন না? কিন্তু আপনি
খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মনে হচ্ছে। কী ব্যাপার বলুন তো?
মহামন্ত্রিঃ আমার
আবার কিসের দুশ্চিন্তা?
কিছুই না।
সেনাপতিঃ উহুঁ, সে বললে শুনছি না, কিছু
একটা চিন্তার মধ্যে নিশ্চয়ই আছেন। এতক্ষণ এখানে বসে রয়েছি, কথাই
বলছেন না; যাও বা বলছেন কেমন যেন বিরক্তির ভাব। এ সবই
দুশ্চিন্তার লক্ষণ। কী হয়েছে বলুন না, রাজামশাই কিছু হুজুগ
তোলার মতলব ভাঁজছেন, নাকি? বলুন না,
মন্ত্রিমশাই, সমস্যার কথা ভাগ করে নিলে, অনেক
সময় তার সমাধানও বেরিয়ে আসে। অবিশ্যি ব্যক্তিগত কোন ব্যাপার হলে আমি জোর করব না।
মহামন্ত্রিঃ আরে না, না, এই বয়েসে
আবার ব্যক্তিগত কী? ছেলেমেয়েদের বিয়ে থা হয়ে যে যার মতো
সংসার ধর্ম পালন করছে। আমরা বুড়োবুড়ি খাইদাই গান গাই। আমাদের আবার সমস্যা কী?
সেনাপতিঃ তা হলে? তার মানে পারিবারিক কোন সমস্যা নয়,
সমস্যাটা এখানকার, মানে এই রাজসভার। (চাপা
স্বরে) রাজা তাঁর অকালের কুমড়ো শালাটিকে সহমন্ত্রি করে, আপনার ঘাড়ে চাপাতে চাইছে
নাকি?
মহামন্ত্রিঃ হা হা হা, না, না, সে সবও কিছু নয়। এই
রাজার সেই দাদুর আমল থেকে রাজসভায় আছি, এর বাবাকেও সামলেছি। রাজা আমাকে যথেষ্ট
ভক্তিছেদ্দা করে। সব ব্যাপারে, এ রাজাও বাপ ঠাকুদ্দাদের মতই,
আমাকে মান্যিগণ্যিও করে, তবে...
সেনাপতিঃ তবে? আর কী সমস্যা? রাজকোষে
ধনসম্পদ উপচে পড়ছে। গত চার পাঁচ বছর বর্ষা ভাল হওয়াতে, চাষবাস
ভালই হয়েছে, জনগণ কর দিতেও কোন কারচুপি করেনি। আমার
গুপ্তচরদের থেকে যা জেনেছি, দেশের মানুষ মোটামুটি খুশিই আছে।
কোথাও কোন বিক্ষোভ বা বিদ্রোহের কোন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, তাহলে আর সমস্যা কিসের?
মহামন্ত্রিঃ ঠিক তাই, কোন সমস্যাই নেই, কিন্তু রাজা
নিজেই সমস্যা ডেকে আনতে চাইছেন, অন্ততঃ আমার সেই রকমই ভয়
হচ্ছে।
সেনাপতিঃ কি রকম?
মহামন্ত্রিঃ রাজামশাই হঠাৎ কদিন ধরে আমাকে চেপে
ধরেছেন, তাঁর পিতার মৃত্যুর জন্যে কে বা কারা দায়ী, আমাকে
খুলে বলতে হবে।
সেনাপতিঃ এতে সমস্যা কোথায়? পিতার মৃত্যুর
সময়, আমাদের রাজা নিতান্ত বালক ছিলেন। তিনি এখন বড়ো হয়েছেন,
পিতার অকালমৃত্যুর কথা জানতে চাইবেন না? অন্তঃপুরের
মহিলা মহলে আবাল্য নানান গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর যা শুনেছেন, সে
সব কথার সত্যতা বুঝতে চাইছেন আর কি? এর জন্যে আপনি চিন্তা
করছেন কেন?
মহামন্ত্রিঃ সেনাপতিমশাই, আমরা সবাই
রাজপিতার মৃত্যুর কারণ জানি। আমি আর ঠাকুরমশাই চোখের সামনেই সেই ঘটনা ঘটতে দেখেছি।
কি ঠাকুরমশাই, চুপ করে রয়েছেন কেন, বলুন
না, দেখেননি?
রাজ গুরুঃ দেখেছি বৈকি, চোখের সামনে দেখেছি। এখনও সে দৃশ্য
মনে পড়লে শিউরে উঠি। সব্বাই ছিলাম, কিন্তু কোন প্রতিকারও
করতে পারিনি। আপনার কী মনে হয়, সে ঘটনার কোন প্রতিকার করতে
পারিনি বলে, রাজামশাই আজ বিচার করে আমাদের সাজা দেবেন?
মহামন্ত্রিঃ আমাদের শাস্তি দেবেন? কে জানে, দিতেও পারেন। কিন্তু আমার সে ভয় হচ্ছে না। রাজা এখন সদ্য যুবক, তাঁর পিতার মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত তাঁর গায়ে আমরা কোন আঁচ লাগতে দিইনি।
কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁকে পড়তে হয়নি। এখন পিতার মৃত্যুর জন্য যারা যারা দায়ী,
সেই কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে, তাদের বিরুদ্ধে
যুদ্ধযাত্রায় যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। সেই ভয়ংকর মৃত্যুর জন্যে কে দায়ী আমরা
জানি। সেই ব্যক্তি যদিও আজ আর নেই, কিন্তু তার রাজ্য কতটা শক্তিশালী সে কথাও আমরা
সকলেই জানি।
সেনাপতিঃ মন্ত্রীমশাই নাগরাজ্যের কথা বলছেন বোধ হয়।
শক্তিতে আমাদের সমকক্ষ বলাই যায়, লড়াই হলে জয়পরাজয় যাই হোক, ক্ষতির
পরিমাণ যা হবে, তা সামলে ওঠা কঠিন হবে সন্দেহ নেই। এই কারণেই
আপনি এমন চিন্তাগ্রস্ত বুঝতে পারলাম। এমন কী কিছু করা যায় না, যাতে সাপও মরে
কিন্তু লাঠি না ভাঙে?
মহামন্ত্রিঃ আছে বৈকি, সে উপায় আছে। বহুদিন - প্রায়
আঠারো বিশ বছর আগের কথা,
সাধারণ লোক সে সব দিনের কথা অনেকটাই ভুলে গেছে। এতদিন পরে কিছু কিছু
ঘটনা একটু অন্য চোখে দেখতে বা দেখাতে পারলে, ঘটনার তীব্র
তিক্ততা হয়তো কমানো সম্ভব, সেক্ষেত্রে আমাদের এই রাজ্য ও
রাজ্যবাসী - উভয়েরই মঙ্গল।
সেনাপতিঃ মন্ত্রীমশাই, রাজামশাইকে এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ
একদিন না একদিন, আমাদের বলতেই হবে। আপনি চাইছেন, রাজামশাইয়ের কাছে আপনি যে ঘটনার কথা বর্ণনা করবেন, আমরাও
যেন সেই কথার সমর্থন করি।
রাজামশাইঃ একদম ঠিক। পাঁচজন পাঁচরকম বললে, রাজামশাইয়ের কাছে
আমরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবো। আমাদের মধ্যেই কেউ ওই ঘটনার ষড়যন্ত্রে হয়তো জড়িত,
এমন সন্দেহও তাঁর মনে আসা বিচিত্র নয়।
সেনাপতিঃ আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্য এটুকু আমরা
করতেই পারি। রাজ্যের এমন সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তির সময়, একটা
বড়সড় যুদ্ধের দিকে রাজ্যের মানুষকে ঠেলে দেওয়াতে আমি তো কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি
না। কী বলেন, ঠাকুরমশাই?
রাজ গুরুঃ আমরা কোনদিনই যুদ্ধের খুব একটা পক্ষে তো নই
ভাই, একমাত্র
আত্মরক্ষা আর আপৎকাল ছাড়া! আর অকারণ যুদ্ধে কার কী মঙ্গল হয়, আমার তো জানা নেই।
সেনাপতিঃ তার মানে আমরা কেউই চাইছি না যুদ্ধটুদ্ধ
হোক। তাহলে মন্ত্রীমশাই,
এখন আপনিই রাজার হত্যা বলুন, হত্যা কিংবা
মৃত্যু বলুন মৃত্যু - কিভাবে হয়েছিল, সে কথা বর্ণনা করুন।
সেই ঘটনার সময় আমি রাজধানীতে ছিলাম না। ফিরে এসে যা শুনেছিলাম, তার অনেকটাই অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল। কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য, কিছুটা মনে হয়েছিল গুজব। আজ আমারও সত্যটা জানা হয়ে যাবে।
মহামন্ত্রিঃ (কিছুক্ষণ দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে
কি়ছু চিন্তা করলেন) তাহলে একদম শুরু থেকেই শুরু করি। কী বলেন, ঠাকুরমশাই?
রাজ গুরুঃ দুশ্চিন্তা করবেন না মন্ত্রীমশাই, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আপনি বলুন, আমিও একবার
ঝালিয়ে নিই আমার দেখা, শোনা আর বোঝা সেই ঘটনার সঙ্গে,
কোথাও কোন অসঙ্গতি রইল কিনা।
মহামন্ত্রিঃ পঞ্চপাণ্ডব মহাপ্রস্থানে যাওয়ার সময়, তাঁরা পৌত্র
পরীক্ষিৎকে যখন সিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন, গোটা ভারতভূমি তখন
শত্রুহীন। রাজা যুধিষ্ঠির তার ক বছর আগেই রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলেন, তাতে সসাগরা এই ভারতের সমস্ত রাজাই তাঁর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছিল। রাজা পরীক্ষিৎ আচার আচরণে
কিংবা চিন্তা ভাবনা়য়,
তাঁর পিতামহদের থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না। কিন্তু নিজেদের জীবনের
নানান কঠিন পরিস্থিতির চাপে, তাঁরা যেভাবে নিজেদের পাথরের
মতো কঠোর করে তুলেছিলেন, সেই দাদুদের স্নেহের ছায়ায় থাকা
রাজা পরীক্ষিৎ তো আর সেই সুযোগ পাননি। তাই খুব সামান্য এক ঘটনায় নিজের নিয়তিকেই
তিনি যেন মৃত্যুর দিকে ডেকে নিলেন।
রাজ গুরুঃ হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। সেদিন মৃগয়া করতে গিয়ে যে
হরিণটাকে তিনি তির মারলেন,
সেটা আঘাত পেল, কিন্তু সে আঘাত মারাত্মক না
হওয়ায়, পালিয়ে গেল ঘন বনের মধ্যে। বোধহয় রাজার মনে হয়েছিল - আমি রাজা পরীক্ষিৎ, মস্ত
বীর, আমার হাতের তির খেয়েও কিভাবে হরিণটা বেঁচে গেল! তিনি
জেদ করেই সেই হরিণের পিছনে দৌড়ে বেড়াতে লাগলেন। অনেকক্ষণ ছুটোছুটি করেও সে হরিণতো
ধরতেই পারলেন না, উল্টে বনের মধ্যে পথ হারিয়ে চূড়ান্ত হয়রান
হলেন। ক্ষিদে, তেষ্টায় হাক্লান্ত রাজা বনের মধ্যে ঘুরতে
ঘুরতে দেখতে পেলেন এক ঋষির কুটির।
মহামন্ত্রিঃ সেই কুটিরে গিয়ে মুনির কাছে তিনি তৃষ্ণার
জল, কিংবা
ক্ষুধার অন্ন বা ফলমূল কিছুই চাইলেন না। কারণ তিনি রাজা! তিনি মুনির কাছে জানতে
চাইলেন, মুনিবর, আপনি এদিক দিয়ে কোন আহত হরিণকে পালাতে
দেখেছেন? সে কোনদিকে পালাল, বলতে পারবেন?
রাজ গুরুঃ সেদিন আবার মুনি মৌনব্রতে ছিলেন, চট করে উত্তর
দিতে পারলেন না। কিন্তু রাজা পরীক্ষিতের তখন মেজাজ সপ্তমে, তিনি অতশত বুঝতে
যাবেন কোন দুঃখে? বেশ ক’বার একই প্রশ্ন করেও, তিনি মুনির উত্তর না পেয়ে, প্রচণ্ড
ক্রোধে কুটিরের বাইরে পড়ে থাকা একটা মরা সাপ ধনুকের ডগায় তুলে এনে মুনির গলায়
মালার মতো পরিয়ে দিলেন।
সেনাপতিঃ মরা সাপ, মুনির গলায়? ছি
ছি, দেশের রাজার আরেকটু ধৈর্য ধরা উচিৎ ছিল না?
রাজ গুরুঃ ছিলই তো। রাজা পরীক্ষিতের স্বভাবে এমন
ঔদ্ধত্য এর আগে কিন্তু কোনদিন দেখিনি।
সেনাপতিঃ তার মানে ওই মুনিই রাজাকে শাপ দিয়ে দিলেন? মুনিরা যেমন দিয়ে
ফেলেন আর কি!
মহামন্ত্রিঃ না রে বাবা, সে কি আর যে সে
মুনি ছিলেন? তিনি হচ্ছেন মহামুনি শমীক। তিনি ভালমন্দ কিছুই
বললেন না। তিনি তো তখন মৌন! বরং ক্ষমাই করে দিলেন।
সেনাপতিঃ সে কি, আমি যে শুনেছিলাম কোন এক মুনি রাজাকে শাপ
দিয়েছিলেন?
রাজ গুরুঃ ঠিকই শুনেছেন, তবে সে মুনি শমীক
নন, তাঁর ছেলে শৃঙ্গী। সেদিন শৃঙ্গী ভগবান
ব্রহ্মার ধ্যান সেরে কুটিরের দিকেই ফিরছিলেন। পথে দেখা হল, তাঁর বাল্যবন্ধু,
আরেক ঋষিপুত্র কৃশের সঙ্গে। এই শৃঙ্গী ছিলেন খুব তেজস্বী তাপস,
কিন্তু কৃশ তেমন না; একটু হাল্কা আর ডেঁপো
ধরনের...
[অন্ধকার
হয়ে এল। পর্দা নেমে এল]
২
[পর্দা
সরে গেল, পিছনে বনের পটভূমি। বনের পথে দুই তরুণের দেখা]
কৃশঃ আরেঃ, শৃঙ্গী যে, অনেক
দিন পর তোর সঙ্গে দেখা হল। এই অবেলায় কোথা থেকে ফিরছিস বলতো?
শৃঙ্গীঃ ব্রহ্মার ধ্যান করতে গিয়েছিলাম
গুরুদেবের আশ্রমে। রোজই যাই, এই সময়েই ফিরি। তারপর তোর কী খবর বল, কী করছিস আজকাল?
কৃশঃ আমার আর কী খবর? সেই একই। জানিস
তো সবই, কেউ বলে বয়াটে, কেউ বলে অকালের
কুমড়ো।
শৃঙ্গীঃ কই,
আমি তো তেমন কিছু শুনিনি!
কৃশ তুই আর আমাদের কথা শুনবি কী করে? তুই তো শুনি এখন
খুব নাম করা তপস্বী, তোর খুব তেজ। একেবারে আগুনের মতো, বাস্ রে!
শৃঙ্গীঃ কৃশ, তোর আর কিছু বলার আছে? সেই ভোর থেকে ধ্যান অভ্যেস করে আমি এখন ক্লান্ত, তার
ওপর বাবাও কুটিরে আমার অপেক্ষায় রয়েছেন। আমি এখন চলি রে, তাড়া
আছে, পরে কোন একদিন না হয় কথা বলা যাবে!
কৃশঃ আরে দাঁড়া দাঁড়া, তোর বাবার কথায় মনে
পড়ল। ওদিক থেকে আসার সময় দেখলাম, তোর বাবা গলায় মরা সাপের মালা নিয়ে বসে আছেন। বেড়ে
মানিয়েছে কিন্তু, যা যা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। হ্যা হ্যা হ্যা
হ্যা।
শৃঙ্গীঃ অ্যাই, কৃশ দাঁড়া,
কী বললি? বাবার গলায় মরা সাপের মালা? তার মানে?
কৃশঃ বোঝো, তুই নাকি কড়া তপস্বী, তোরা নাকি অনেক আগে থেকে, অনেক দূর থেকেও সব কিছু
জেনে যাস, বুঝে যাস! আর এই খবরটা জানিস না? হাসালি মাইরি, হ্যা হ্যা, হ্যা।
তার মানে তোতে আর আমাতে, আহামরি কিছু ফারাক নেই বলছিস?
শৃঙ্গীঃ বাজে
কথা বলে আমার মাথা গরম করাস না, কৃশ, কী হয়েছে, আমাকে খুলে বল।
কৃশঃ আমার ওপর মাথা গরম করিসনি, শৃঙ্গী, আমি কী করেছি বল? তুই রেগে গিয়ে কটমট করে তাকালে,
ভস্ম হয়ে যাবো, এক টিপ নস্যির মতো মাটিতে ছাই
হয়ে পড়ে থাকবো, নির্ঘাৎ।
শৃঙ্গীঃ [প্রচণ্ড রাগত স্বরে] কৃশ, অনেকক্ষণ তোর রঙ্গকৌতুক
শুনলাম। আমার ধৈর্যের সীমা আছে ভুলে যাস না।
কৃশঃ এই রে, সত্যি সত্যি রেগে গেলি যে। দাঁড়া,
দাঁড়া বলছি। তোদের কুটিরের একটু দূরে আমরা বসে আড্ডা মারছিলাম, আর ছিলিম টানছিলাম। হঠাৎ দেখি রাজা পরীক্ষিৎ হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছেন,
বনের ভিতর থেকে। সে কী চেহারা রে বাবা, কাঁটায়
ছেঁড়া কাপড়চোপড়, উস্কো-খুস্কো চুল। আর মুকুটটা বগলে ধরা।
প্রথমে ভাবলাম, ভুল দেখেছি, নেশাটা
নিশ্চয়ই আজ মাত্রা ছাড়িয়েছে। তারপর চোখ কচলে ভাল করে দেখলাম, নাঃ, রাজাই বটে। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দিলাম। বলা যায়
না, আমরা নেশা করছি দেখতে পেলে, হয়
আমাদের উপদেশ দেবে, নয়তো শূলে চড়াবে।
শৃঙ্গীঃ তারপর? তারপর?
কৃশঃ কুটিরের দরজার কাছেই তোর বাবা ধ্যানে
বসেছিলেন। তাঁকে দেখতে পেয়েই রাজা জিজ্ঞেস করল, এদিক দিয়ে কোন আহত হরিণকে পালাতে দেখেছেন?
কোনদিকে গেল বলতে পারবেন? তোর বাবা কোন উত্তর
দিলেন না।
শৃঙ্গীঃ [কণ্ঠে
উদ্বেগ] উত্তর দেবেন কোত্থেকে তিনি তো মৌনব্রতে রয়েছেন!
কৃশঃ সে তো তুই জানিস আর তোর বাবা জানে! হে
হে হে হে। রাজা তো আর জানে না। রাজা উত্তর না পেয়ে, রাগে গজগজ করতে করতে কুটিরের
বাইরে বেরিয়ে এল। তোদের ঘরের পাশে একটা মরা সাপ পড়েছিল, সেটাকে ধনুকের
ডগা দিয়ে তুলে এনে তোর বাবার গলায় পরিয়ে দিল, মালার মতো।
তাতেও তোর বাবা কোন কথা বললেন না, চোখ মেলে তাকালেন না। তাতে
রাজা আরো রেগেমেগে খ্যাপা মোষের মতো বেরিয়ে এল ঘর থেকে, তারপর
ফিরে গেল বনের পথে, যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকে।
শৃঙ্গীঃ বাবা, কিচ্ছু বললেন না,
এত কাণ্ডের পরেও!
কৃশঃ [শৃঙ্গীর কাঁধে চাপড় মেরে] ভয় পেয়েছেন, বুঝলি না?
যতই তোরা মন্ত্রসিদ্ধি, তপস্যা, ধ্যান এসব নিয়ে নাচানাচি করিস না কেন, আসলে রাজার
ক্ষমতার কাছে সবই তুশ্চু। আসল শক্তি হচ্ছে রাজশক্তি। একথা এতদিন
তুই স্বীকার করতিস না,
এবার অন্ততঃ স্বীকার কর। তোর বাবার মতো বিখ্যাত মুনিকেই এত বড়ো
অপমান করে, রাজা যখন পার পেয়ে গেল, তখন
তোরা ওই তেজ-টেজ নিয়ে যে বগল বাজাস, সেটা আর নিশ্চয়ই করবি না,
কী বল? আর আমাদেরও এত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবি
না। [কণ্ঠে তীব্র বিদ্রূপ]
শৃঙ্গীঃ কৃশ, এ কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বাবা কী
করেছেন, কেন করেছেন, আমি জানি না। তবে
আমি বলছি তোকে কৃশ, কঠোর তপস্যা করে, যদি
সামান্য কিছু শক্তিও অর্জন করে থাকি, তাহলে ওই উদ্ধত অহংকারী
রাজা আজ থেকে সাতদিনের মাথায়, সাপের দংশনে মারা যাবে। হ্যাঁ
এই আমার অভিশাপ, তীব্র বিষধর তক্ষক দংশন করবে রাজার মাথায়,
বিষের জ্বালায় জ্বলে মরবে ওই রাজা। আমার এই কথা মিথ্যা হবার নয়,
দেখে নিস।
কৃশঃ হুঁ, বলিস কী? এত
একেবারে চরম অভিশাপ? হে হে হে, ঠিক আছে
সাতদিন অপেক্ষাই করব, না হয়। দেখাই যাক তোর কত ক্ষ্যামতা। তবে যাই বলিস, তোর মধ্যে
তাও যেন একটা গনগনে রাগের আঁচ পাচ্ছি, তোর বাবার মধ্যে কেমন যেন ম্যাদামারা ভাব,
এত নাম ডাক, কিন্তু কোন রোখঠোক নেই, না বাপু এ আমার...। আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিকাছে,
ঠিকাছে, রাগ করিস কেন? তোরাও যদি সত্যিকথা শুনতে রাগ করিস, তাহলে রাজাদের আর দোষ
কী? যা, যা, তুই এখন বাড়ি যা, আমিও ওদিকে অন্য কোন আসর দেখি।
[দুজনে দুপাশে দ্রুত চলে
গেল, মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল। যখন আলো এল, বনের পটভূমিকায় একটি কুটির, তার মধ্যে ধ্যানমগ্ন
অবস্থায় বসে আছেন মহামুনি শমীক, তাঁর গলায় মরা সাপ, মালার মতো ঝুলছে। শৃঙ্গী খুব
সন্তর্পণে বাবার গলা থেকে সাপটি খুলে নিয়ে ফেলে এল কুটিরের বাইরে। ]
শৃঙ্গীঃ [পায়ের কাছে বসে, তীব্র আক্ষেপের
কণ্ঠে] বাবা, আমার বাবা, তোমার মতো লোকের সঙ্গে যে এমন দুর্ব্যবহার করতে পেরেছে,
তার চরম শাস্তির বিধান আমি করেছি, বাবা। আমি তাকে অভিশাপ দিয়েছি, আজ থেকে সাতদিনের
মাথায়, সাপের দংশনে তার মৃত্যু নিশ্চিত।
মহামুনি শমীকঃ কী সর্বনাশ, এ তুই কী করেছিস, শৃঙ্গী। রাজার
আচরণে তো আমার ব্রত ভঙ্গ হয়নি, কিন্তু তোর এই কথায় যে আমায় ব্রত ভঙ্গ করতে হল,
দুরাচারী, উদ্ধত, অহংকারী পুত্র। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। তিনি আমাদের সকলের রাজা, তিনিই
আমাদের ভরণ করেন, পোষণ করেন। আমাদের দুর্ধর্ষ শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেন।
আমাদের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করেন, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করতে
পারি। সেই রাজা আজ আমাদের কুটিরে এসেছিলেন, অনাহুত অতিথি হয়ে। আমি জানি তিনি তখন
পথশ্রমে আর হতাশায় পরিশ্রান্ত ছিলেন। তাঁকে আমি সামান্য তৃষ্ণার জল দিয়েও সেবা
করতে পারলাম না, আমার মৌনব্রতের জন্যে। অপরাধ আমার। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তো
আমার কোন ক্ষতি করেননি, আমার গলায় মরা সাপটি পরিয়ে দিয়ে গিয়েছেন মাত্র। এইটুকু
অপরাধে তুই তাঁকে মৃত্যুর অভিশাপ দিলি? তোর এই অপরাধের কোন ক্ষমা নেই, শৃঙ্গী। তোর
তপস্যা, তোর ধ্যান, উপাসনা সবই ব্যর্থ।
শৃঙ্গীঃ [গলায় একটু অভিমান] আমার তপস্যা
ব্যর্থ হতে পারে, বাবা, কিন্তু আমার কথা ব্যর্থ হতে পারে না, আমি নিশ্চিত। যে কথা
আমি বলে ফেলেছি, তার অন্যথা হওয়া অসম্ভব।
মহামুনি শমীকঃ সে আমি জানি। ওরে মূর্খ, অভিশাপ দেওয়ার আগে
ক্ষমা করতে শেখ, নম্র হতে শেখ, নয়তো তুইও ধ্বংস হবি। আমার সামনে থেকে তুই দূর হয়ে
যা, আর আমার প্রিয় শিষ্য গৌরমুখকে পাঠিয়ে দে। তাকে আমি রাজসভায় পাঠাবো। রাজা
পরীক্ষিতের কাছে সে যাবে, তাঁর কাছে সমস্ত ঘটনার কথা জানিয়ে আসবে। তারপর রাজা যদি
প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা করতে পারেন তো, তাঁর পক্ষেও মঙ্গল, মঙ্গল আমাদের সকলের।
[পর্দা
নেমে এল, অন্ধকার হয়ে এল মঞ্চ]
৩
[পর্দা
সরে যেতে, অবিকল প্রথম দৃশ্যের মঞ্চ সজ্জা, এবং পাত্ররা]
মহামন্ত্রীঃ মহামুনি শমীকের দূত হয়ে কিশোর-তাপস
গৌরমুখ, রাজসভায় এসে রাজাকে সকল কথা জানিয়েছিলেন। রাজা পরীক্ষিৎ তাঁকে এতটুকুও
অনাদর বা অসম্মান করেননি। তাঁকে বিদায় দেওয়ার সময়, রাজা বলেছিলেন হে তাপস, আপনার
গুরুদেব মহামুনি শমীককে গিয়ে বলবেন, তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করেন এবং আমার প্রতি
সর্বদা প্রসন্ন থাকেন।
রাজগুরুঃ গৌরমুখের থেকে সব কথা শোনার পর, মহারাজ
পরীক্ষিৎ একটিমাত্র স্তম্ভের উপর একটি নিরাপদ প্রাসাদ নির্মাণের আদেশ দিলেন।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে, অতি বিশ্বস্ত কয়েকজন প্রিয় পারিষদ ছাড়া সেই প্রাসাদে
আর কারো যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ছ’ছটা দিন পার হয়ে গেল নিরাপদে, কোন ঘটনাই ঘটল না।
সপ্তমদিনের দুপুরবেলা, রাজার প্রাসাদ অনেকটাই যেন নিশ্চিন্ত, সকলের মনে আশা, হয়তো
কোনভাবে এই অভিশাপ থেকে রাজা মুক্ত হয়েই যাবেন। আর ঠিক তখনই শহরের কিছুটা বাইরের
রাজপথে অদ্ভূত এক ঘটনা ঘটছিল। ওই রাজপথ ধরে মহামুনি কশ্যপ আসছিলেন
রাজ প্রাসাদের দিকে, পথে এক বট বৃক্ষের তলায় বসে থাকা এক তেজস্বী ব্রাহ্মণ যুবক
তাঁকে ডাকলেন। কশ্যপ তাঁর ডাকে পিছন ফিরে তাকালেন,
[মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল, সামনে নেমে
এল রাজপথের দৃশ্যপট। পথের ধারে বটগাছের তলায়, এক সুপুরুষ দীর্ঘদেহী ব্রাহ্মণ বসে
আছেন, আর মহামুনি কশ্যপ চলেছেন, রাজপ্রাসাদের দিকে]
ব্রাহ্মণঃ মহামুনি কশ্যপ, আমার প্রণাম নিন। এই
ভরদুপুরে রোদ্দুরের মধ্যে হনহন করে কোথায় চলেছেন? আসুন না, এই গাছের ছায়ায় বসে একটু
বিশ্রাম নিন।
মহামুনি কশ্যপঃ অ, আপনি ব্রাহ্মণ, তাহলে একটু বসতেই পারি। এখান
থেকে রাজপ্রাসাদ কতদূর বলতে পারেন? আমার আবার একটু তাড়া আছে।
ব্রাহ্মণঃ এখান থেকে বড়ো জোর অর্ধ দণ্ডের পথ,
বিকেলের অনেক আগেই পৌঁছে যেতে পারবেন। তা এত তাড়া কিসের রাজপ্রাসাদে যাবার?
মহামুনি কশ্যপঃ রাজার যে ভীষণ বিপদ, শোনেননি? আজ সন্ধ্যের আগেই
রাজার সর্প দংশনে মৃত্যু।
ব্রাহ্মণঃ হ্যাঁ শুনেছি বটে, আমার যদিও সেকথায় বিশ্বাস
হয়নি। তবে রাজার ভাগ্যে মৃত্যু যদি থাকেই, আপনি ব্যস্ত হয়ে কী করবেন? আপনি কী তাঁর
ভাগ্য পাল্টাতে পারবেন? ভাগ্য কী বদলানো যায়, মহামুনি?
মহামুনি কশ্যপঃ আপনি বোধহয় জানেন না, আমি মহাসঞ্জীবনী মন্ত্রে
এবং ওষধিতে সিদ্ধ। যে কোন সদ্যমৃতের দেহে, আমি প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারি।
ব্রাহ্মণঃ বলেন কী? এ কোনদিন সম্ভব? মৃতদেহে প্রাণ
সঞ্চার? হা হা হা, কিছু মনে করবেন না, মহামুনি, কথাটা ঠিক হজম হল না। ধরুন এই, এই
যে গাছটাকে, আমি যদি বিষ দিয়ে মেরে ফেলি, আপনি পারবেন একে আবার আগের অবস্থায়
বাঁচিয়ে তুলতে?
মহামুনি কশ্যপঃ বেশি কথায় কাজ কী? পরীক্ষা করেই দেখা যাক না।
ভালই হবে, রাজার সামনে যাবার আগে, আমার ক্ষমতার আরেকবার যাচাইও হয়ে যাবে।
ব্রাহ্মণঃ বাঃ বেশ, তাহলে দেখাই যাক।
[ব্রাহ্মণ সামনের অশ্বত্থ গাছের
কাণ্ডে বিষ প্রয়োগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই, সতেজ সবুজ গাছ, জ্বলে শুকনো কংকালের
মতো হয়ে গেল। এবার মহামুনি কশ্যপ সেই মরা গাছে পবিত্র জল সিঞ্চন করে, তাঁর
সঞ্জীবনী মন্ত্র পাঠ করলেন। আশ্চর্য, সেই মরা গাছের ডালে আবার নতুন পাতা গজিয়ে
উঠল, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই গাছ অবিকল আগের মতোই সতেজ সবুজ দাঁড়িয়ে রইল মাটির উপর।
যেন কিছুই হয়নি তার]
[উচ্ছ্বসিত স্বরে] আশ্চর্য, হে
মহামুনি কশ্যপ, আপনার ক্ষমতা আশ্চর্য, অদ্ভূত। আপনার মন্ত্রসিদ্ধিতে
আমার আর কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস না করে পারছি না, আপনি রাজাকে বাঁচাতে চাইছেন
কেন? মহামুনি শমীককে অপমান করার জন্যে, রাজা ব্রাহ্মণের শাপগ্রস্ত হয়েছেন। আপনি
নিজেও মহামুনি হয়ে, তাঁর প্রাণ বাঁচিয়ে, সেই ব্রহ্মশাপকে ব্যর্থ করতে চাইছেন কেন?
মহামুনি কশ্যপঃ নির্জলা সত্যি কথা বললে, আমার এখানে আসার আসল
উদ্দেশ্য - বেশ কিছু অর্থ উপার্জন। রাজাকে এই বিপদ থেকে যদি উদ্ধার করতে পারি,
রাজা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে প্রচুর সোনা, চাষের জমি আর গর্ভবতী গাভি দান করবেন। এই
পুরষ্কার লাভ ছাড়া আমার অন্য আর কোন মহান উদ্দেশ্য নেই।
ব্রাহ্মণঃ বাঃ বেশ, খুব ভালো কথা। কিন্তু হে মহামুনি, যদি কোন
ক্রমে আপনি রাজার জীবন ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হন? না মানে, আপনি অন্য ভাবে নেবেন
না....আমার কথাটা আপনি একটু মন দিয়ে শুনুন। আপনি এই যে অশ্বত্থ গাছের প্রাণ ফিরিয়ে
দিলেন, সেই গাছের উপর কিন্তু কোন ব্রহ্মশাপ ছিল না। আর এই গাছের নিয়তিতেও আজকেই যে
ওর মৃত্যু হবে, এমন কোন কথাও ছিল না। কিন্তু রাজার ব্রহ্মশাপ রয়েছে, ব্রাহ্মণের
কথা নিয়তির মতোই, নড়চড় হবার জো নেই। সেক্ষেত্রে যদি, আবারও বলছি, ‘যদি’, আপনি ব্যর্থ
হন, তখন? আপনার অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হবে। তার ওপর সমাজে আপনার যে একটা
সম্মান আছে, খ্যাতি আছে, তারও অনেকটাই ক্ষতি হয়ে যাবে, তাই না? লোকে বলবে, মহামুনি
কশ্যপ, সকলের প্রাণ ফেরাতে পারেন না, রাজা পরীক্ষিতের পারেননি। তখন?
মহামুনি কশ্যপঃ সত্যি করে বলুন তো, আপনি কে? আপনার কথায় আপনাকে
আর ব্রাহ্মণ বলে মনে হচ্ছে না, আমার মনে হচ্ছে, ব্রাহ্মণের বেশে আপনি কোন
রাজপুরুষ। আপনি কে?
ব্রাহ্মণঃ [হাসি] বলব, সব কথাই বলব, মহামুনি। এখন
দয়া করে আমার প্রস্তাবটা শুনুন না। আপনি মনে মনে যে পরিমাণ অর্থ লাভের আশা করে
রাজার প্রাসাদে যাচ্ছিলেন, আমি যদি তার থেকেও বেশি অর্থ আপনাকে দিই, রাজপ্রাসাদে
না যাওয়ার জন্যে? তাহলেও কী আপনি রাজপ্রাসাদেই যাবেন?
মহামুনি কশ্যপঃ আপনি কে?
ব্রাহ্মণঃ আমার পরিচয় আমি ঠিক সময়েই দেব, মহামুনি।
কিন্তু আমি যে কথাগুলি বলছি সে কথা কিন্তু হাল্কা প্রতিশ্রুতি নয়। আপনি এখান থেকেই
যদি নিজের আশ্রমে ফিরে যান, আপনার হাতে আমি এখনই, এইখানে, আপনার আশার থেকেও অনেক
বেশি অর্থ দান করবো।
মহামুনি কশ্যপঃ আপনি কে আমি জানি না, কিন্তু আপনি যে সাধারণ কেউ
নন বেশ বুঝতে পারছি। আর এও বুঝতে পারছি, রাজা পরীক্ষিতের বিরুদ্ধে শুধু ব্রহ্মশাপই
নয়, আপনাদের মতো ক্ষমতাশালী ও অর্থবানের ষড়যন্ত্রও রয়েছে। মনে হচ্ছে ব্রহ্মশাপটা
উপলক্ষ মাত্র। অতএব আমার মতো নিরীহ ব্রাহ্মণের এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ার কোন মানেই হয়
না। আমার প্রয়োজন মতো অর্থ যদি আমি পেয়ে যাই, আমি রাজার প্রাসাদে যাবো না, কথা
দিলাম, আমার আশ্রমে ফিরে যাবো।
ব্রাহ্মণঃ বাঃ, অতি বিচক্ষণ ও উত্তম বিবেচনা,
মহামুনি কশ্যপ। আপনাকে আরেকবার প্রণাম। আমার অনুচরেরা গরুর গাড়িতে সোনার মুদ্রা আর
নানান উপহার দিয়ে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আপনার আশ্রমে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আর কাল সকালে,
আপনার আশ্রমে পৌঁছে যাবে পাঁচশ’ সবৎসা তরুণী গাভী। তারপর আমার অনুচরেরা কাল সকালে
আপনাকে কৃষিজমিও দেখিয়ে দেবে, সেখান থেকে পছন্দমতো, যতটা খুশি আপনি নিয়ে নেবেন। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, এই
দানেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, কোন সংকোচ করবেন না, মহামুনি।
মহামুনি কশ্যপঃ হে রাজা, এই পুরষ্কার ও অনুগ্রহ আমার কাছে
আশাতীত। আমি সন্তুষ্ট।
ব্রাহ্মণঃ আপনার কাজে লাগতে পেরে, আপনাকে খুশি করতে
পেরে, আমি কৃতার্থ হলাম, হে মহামুনি। বিদায়ের আগে আমার পরিচয়টুকুই বা বাকি থাকে
কেন? হে মহামুনি, আমি নাগরাজা - আমার প্রভাব, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা তেমন কিছুই হয়তো
নয়, কিন্তু আপনার মতো পণ্ডিতের কাছে সে তথ্য অজানাও নয়, আশা করি। আমার প্রণাম
নেবেন। এখন দয়া করে আমায় অনুমতি দিন, মহামুনি, ওদিকে আপনাকে অনেকটা পথ ফিরতে হবে, আর
এদিকে আমারও অনেক জরুরি কাজ সারা বাকি।
[নাগরাজ হাতে তালি দিতেই
এক অনুচর উপস্থিত হল সেখানে। নাগরাজ তাকে কিছু নির্দেশ দিতে দিতেই, মঞ্চ অন্ধকার
হয়ে এল, রাজপথের দৃশ্য সরে গেল, আবার যখন আলো ফিরে এল, দেখা গেল প্রথম দৃশ্যের
সভাগৃহ]
সেনাপতিঃ ওরেব্বাবা, উৎকোচ, ষড়যন্ত্র মিলিয়ে এ যে একেবারে দুর্নীতির
চূড়ান্ত!
মহামন্ত্রিঃ ঠিক তাই, সমস্ত ঘটনার কথা জানলে, রহস্যের
তল খুঁজে পাওয়া যায় না, হে।
সেনাপতিঃ মহামুনি কশ্যপকে বিদায় করিয়ে, নাগরাজ কী করলেন, মন্ত্রিমশাই?
মহামন্ত্রিঃ এই, এর পর থেকে পুরো ঘটনাটাই ঝাপসা,
অস্পষ্ট। আন্দাজ করা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় না। কিছুটা অলৌকিক আবার অনেকটাই
যেন অবিশ্বাস্য!
[কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর]
তখন, সূর্য অস্ত যেতে আর সামান্যই
বাকি। রাজার নিরাপদ প্রাসাদের নিভৃত কক্ষে চারজন অচেনা ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হল।
তারা কী করে, ঢোকার অনুমতি পেল, বিশ্বস্ত প্রহরীরা কেন তাদের ঢুকতে দিল, জানা যায়
না। সেই ব্রাহ্মণদের হাতে ছিল, প্রচুর ফল, অনেক মিঠাই। তারা নাকি এসেছিল, রাজার
মঙ্গল ও দীর্ঘ আয়ুর জন্যে আশীর্বাদ করতে। তারা সকলে আশীর্বাদ করে, রাজার হাতে তুলে
দিল ফলের ডালি। সেই ফল রাজা নিজেই ভাগ করে, আমাদের সকলের হাতে তুলে দিয়ে, একটা
মাত্র ফল নিজের জন্যে রাখলেন। আমরা, এমনকি রাজাও তখন নিশ্চিত, ব্রহ্মশাপ ব্যর্থ
হয়েছে, কারণ সুর্য তখন প্রায় দিগন্তে। মৃত্যুর করাল ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া রাজা,
খুব স্বাভাবিক ভাবেই, তখন একটু প্রগলভ, একটু যেন ছেলেমানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি
হস্তিনাপুরের রাজা, অচেনা লোকের হাতের ফল, নিরাপত্তার কারণেই তিনি কখনো খাননি,
খাওয়ার নিয়মই ছিল না। কিন্তু সেদিন খেলেন। আর নিজের হাতের ফলটিতে কামড় দিয়েই তিনি
দেখতে পেলেন, সেই ফলের মধ্যে বাসা বেঁধেছে, ছোট্ট একটি পোকা! ছোট্ট, তামাটে রঙের
সামান্য একটি পোকা। অতগুলো ফলের মধ্যে আমরাও যারা সেই ফল খাচ্ছিলাম, কোন ফলেই আমরা
পোকা পাইনি। কিন্তু রাজার ফলেই ছিল পোকা - ব্যাপারটা আশ্চর্য নয়!
রাজগুরুঃ নিয়তি, নিয়তি। নিয়তি ছাড়া এর কোন ব্যাখ্যা
হয় না।
মহামন্ত্রিঃ ঠিক, যেখানে যুক্তি কাজ করে না, সেখানে
নিয়তি আর ভাগ্য এসেই যায়! পোকা দেখে রাজা যদি তখনই ফলটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে
দিতেন ...। নাঃ, রাজা তা করলেন না, তিনি ওই ছোট্ট পোকাটিকে তালুতে
নিয়ে আমাদের দেখালেন, তারপর নিজের গলায় পোকাটিকে রেখে বাচালের মতো হাসতে হাসতে
বললেন, মন্ত্রিমশাই দেখুন, ওহে সভাসদগণ দেখ, আজ সপ্তমদিনও শেষ হয়ে এল, সন্ধ্যে হবো
হবো। কোন সাপ আমাকে দংশন করতে পারল না। এখন এই তুচ্ছ কীট যদি আমায় দংশন করে,
তাহলেই সব যথাযথ সমাধা হয়। সেই ব্রাহ্মণের শাপও ব্যর্থ হয় না, আর আমার আয়ুও শেষ হয়
না।
রাজগুরুঃ মন্ত্রিমশাই, সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে
আজও আমার সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। ওফ, সে কী ভয়ংকর!
মহামন্ত্রিঃ রাজার কথা শেষ হতে না হতেই, সেই কীট
বিশাল এক বিষধর সাপ হয়ে উঠল, রাজার কণ্ঠ জড়িয়ে ধরে, বিশাল ফণা বিস্তার করে,
নিমেষের মধ্যে ছোবল মারল রাজার মাথায়। তারপর কী এক বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ল সেই নিরাপদ
প্রাসাদের দেওয়াল। সেই অচেনা ব্রাহ্মণেরা, সেই অলৌকিক সাপ, এই বিশৃঙ্খলার
সুযোগে যেন মিশে গেল, আসন্ন সন্ধ্যার ছায়ায়। আর বিষে নীল হয়ে যাওয়া আমাদের মৃত রাজা
পড়ে রইলেন, তাঁর রাজাসনে। বিশ্বস্ত, অনুগত দেহরক্ষীরা তখন কোথায়? মহামুনি কশ্যপ
তখন হয়তো গরুরগাড়িতে বসে, লণ্ঠনের আলোয় সোনার মুদ্রা গুনছেন!
সেনাপতিঃ এ তো হত্যা।
মহামন্ত্রিঃ হতে পারে, এ হত্যাই! কিন্তু এই হত্যার
দায় কার?
সেনাপতিঃ নাগরাজ। আমি নিশ্চিত, নাগরাজ। মহারাজ
যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে বশ্যতা স্বীকার করেছিল ঠিকই, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে
পারেনি। তাই এই ষড়যন্ত্র, এই প্রতিশোধ।
মহামন্ত্রিঃ কী করে নিশ্চিত হচ্ছেন? কোন প্রমাণ দিতে
পারবেন? শুধু নাগরাজাই কেন? সেই যে মহামুনি শমীকের ছেলে অভিশাপ দিল, সে দায়ী নয়
কেন? ব্রহ্মশাপ তো ব্যর্থ হয় না। যদি ব্রহ্মশাপ ব্যর্থ ধরেই নিই, আমাদের
দেশের ব্রাহ্মণরা সেটা মেনে নেবেন কী? তাঁরা কি স্বীকার করবেন, ব্রহ্মশাপ-টাপ আসলে
কিছুই নয়। এই ঘটনা তার আড়ালে অন্য এক ষড়যন্ত্র? তাতে তাঁদের প্রাধান্য অটুট থাকবে
তো?
সেনাপতিঃ ঠাকুরমশাই চুপ করে কেন? কিছু বলুন? এই
মৃত্যু কি ব্রহ্মশাপের ফল?
রাজগুরুঃ আসল কথাটা হচ্ছে, ওইদিন, ওইভাবেই রাজার
মৃত্যু ধার্য ছিল, বাকি সব্বাই উপলক্ষ।
সেনাপতিঃ কিন্তু, এই ভাবেই রাজার মৃত্যু কে ধার্য
করেছিলেন?
রাজগুরুঃ অবাক করলেন, কে আবার? নিয়তি, মহাকাল। যাঁর
কবল থেকে আমার আপনার কারো রেহাই নেই।
সেনাপতিঃ অসুখ, মৃগয়ায় শ্বাপদের আক্রমণ, অগ্নিকাণ্ড,
বজ্রপাত বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা অথবা ক্ষত্রিয় বীর হিসেবে, যুদ্ধক্ষেত্রে
শত্রুর হাতে মৃত্যু – মহাকালের হাতে অনেক, অনেক উপায় ছিল। তা না করে, তিনি হঠাৎ
মহামুনি কশ্যপকে উৎকোচ দিয়ে ঘরে ফেরাবেন কেন? রাজার নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও,
হয়তো উৎকোচ দিয়েই, চার ব্রাহ্মণকে ঢোকাতে হল কেন? সেই ব্রাহ্মণরাও ছদ্মবেশী সন্দেহ
নেই। ফলের মধ্যে কীট, সেই কীটই হয়ে গেল বিষধর সাপ। তারপর আবার বিস্ফোরণ।
ঠাকুরমশাই, একজন লোককে মারতে মহাকালকে এত কাঠখড় পোড়াতে হল?
রাজগুরুঃ [প্রচণ্ড ক্রোধে] আপনি নাস্তিক, আপনি
ঈশ্বরের বিধানকে বিদ্রূপ করছেন?
সেনাপতিঃ না। ঈশ্বরের নাম ভাঙিয়ে যারা তঞ্চকতা করে,
সেইসব মানুষদের আমি মুখোস খুলছি।
রাজগুরুঃ আপনি কে? ঈশ্বরের কার্য-কারণের হিসাব
নেওয়ার অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে?
সেনাপতিঃ আমি নিজের জীবনকে বাজি রেখে, এই দেশ, এই
দেশের সাধারণ মানুষ, এই দেশের রাজাকে রক্ষা করি; যদি বলি সেই অধিকারে?
মহামন্ত্রিঃ যাচ্চলে, আপনারা নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া
করতে শুরু করলেন যে। শান্ত হোন, আপনারা দুজনেই শান্ত হোন। আপনাদের ঝগড়া থেকে কোন
সমাধান বের হবে কি?
[সকলেই
চুপ করে বসে রইলেন মাথা নীচু করে।]
আমি কদিন ধরে এই কথাটাই চিন্তা করে দুশ্চিন্তায় ছিলাম।
রাজা এই সমস্ত ঘটনা শুনে, যদি জানতে চান, কে তাঁর পিতার মৃত্যুর জন্য দায়ী? আমি কী
জবাব দেব? শমীকপুত্র শৃঙ্গী, নাকি মহামুনি কশ্যপ, নাকি সেই চার অচেনা ব্রাহ্মণ?
সেক্ষেত্রে রাজা যদি ক্রুদ্ধ হয়ে, সেই ব্রাহ্মণদের হত্যার আদেশ দেন, গোটা দেশ
অশান্ত হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা। অথবা যদি আমি নাগরাজকেই সরাসরি দায়ী করি আর তিনি
যদি বলেন, নাগরাজ্যের বিরুদ্ধে এখনই যুদ্ধের আয়োজন করুন, তাতেও কি দেশের মঙ্গল
হবে?
সেনাপতিঃ নাঃ, দুটোর কোনটাই আমাদের কাম্য নয়।
রাজগুরুঃ কাম্য তো নয়ই, কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের
উপায় কী হতে পারে, আমার তো মাথায় কিছু আসছে না।
মহামন্ত্রিঃ আমার মাথায় আছে, যদি আপনাদের সাহায্যের
আশ্বাস পাই, আমি এর সমাধান করতে পারবো।
সেনাপতিঃ দেশের মঙ্গলের জন্যে আমি সব সাহায্য করতে
প্রস্তুত।
রাজগুরুঃ আমিও। কিন্তু সমাধানটা কী?
মহামন্ত্রিঃ রাজনীতি। সহজ, সরল রাজনীতি।
সেনাপতিঃ তার মানে?
মহামন্ত্রিঃ এই ঘটনায় আমি সম্পূর্ণ দায়ী করবো নাগকে।
সেনাপতিঃ নাগকে, মানে সেই নাগরাজাকে?
রাজগুরুঃ না, আমি বোধহয় বুঝতে পেরেছি, নাগ মানে
সাপও হয়। অবোলা সাপ, কেউ কেউ নিরীহ, কেউ বা বিষধর।
মহামন্ত্রিঃ ঠিক, নাগরাজ বলতে আমি যদি সাপেদের রাজাকে
বোঝাই? শেষমেষ সাপের কামড়েই তো রাজার মৃত্যু। তিনি হয়তো সব শুনে বলবেন, সাপেদের
বংশ, নির্বংশ করে ছাড়বো।
রাজগুরুঃ হ্যাঁ, সে তো করাই যাবে। আমাদের শাস্ত্রে
সর্পসত্র বলে যজ্ঞের কথাও আছে, সেখানে যজ্ঞের আগুনে সাপদের আহুতি দেওয়া হয়। সে আমি
বেশ আয়োজন করে ফেলতে পারবো। দেশের যত্তো বাঘা বাঘা ব্রাহ্মণপণ্ডিতদের নেমন্তন্ন
করে, প্রচুর সোনা আর গাভি দান করলে, কেউ কোন কথাও বলবে না।
সেনাপতিঃ যাক, এত কিছুর পর আমরা একজনকে ঠিকই দাঁড়
করাতে পারলাম, তাহলে? যাকে নিরুপদ্রবে, শান্তিতে, মনের মতো শাস্তি দেওয়া যাবে।
সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। ওঁ শান্তিঃ।
রাজগুরুঃ হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা, রাজনীতিতে কী না হয়?
মন্ত্রিমশাই, আপনার মাথা বটে একখান, ধন্যি আপনি।
মহামন্ত্রিঃ সেরেছে, আপনি আমার মাথাটাকেই দায়ী করলেন
না তো? তাহলে তো আমার আবার মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠবে, ঠাকুরমশাই।
সকলের সমস্বরে হাসি।
[পর্দা
নেমে এল]
সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন