এর আগের রম্যকথা - " নিত্যযাত্রী "
পাড়ার বিশাখা বৌদির সঙ্গে হরিপদর বৌয়ের গলায় গলায় ভাব।
বিশাখাবৌদির ননদের বড়ো জায়ের কাকিমা এক মহাতান্ত্রিকের খবর দিয়েছেন, বাবা কাত্যায়ন
তন্ত্রার্ণব। বিশাখাবৌদি হরিপদর বৌকে বলেছে, হরিপদকে নিয়ে গিয়ে বাবা
কাত্যায়নের সামনে ফেলে দে, তারপর দেখ তোদের কপাল কেমন খুলে যায়! হরিপদর বাবা ছিলেন
বৈষ্ণব, হরির একান্ত ভক্ত। যখন তখন হরিপদর নাম ধরে ডাকলে, তাঁর নাকি হরিনামও করা
হবে, তাই ওই নাম। কিন্তু প্রথম বিড়ি খেয়ে হরিপদ যেদিন বাড়িতে ধরা পড়েছিল, “হতভাগা
হোর্যা, তুই বিড়ি খাওয়া ধরেছিস, হতচ্ছাড়া”? বলে পিঠে গুম গুম কিল বসিয়েছিলেন তার
বাবা, সেদিন শ্রীহরি কাছে পিঠে কোথাও ছিলেন কি না, কে জানে?
আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিক-কূল-চূড়ামণি বাবা কাত্যায়নের কাছে হরিপদ ও তার বৌ প্রথম গিয়েছিল মঙ্গলবারের সন্ধেতে। উত্তরকলকাতার ঠনঠনে কালিবাড়ির কাছে, ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো বাড়ির একতলায়, মাথা নোয়ানো দরজাওয়ালা গুমোট ঘরে বাবার চেম্বার। হরিপদ ফেডেড জিন্স দেখেছে, এখানে এসে প্রথম দেখল, ফেডেড অজিন। নিচু জলচৌকির উপর বিছানো রোঁয়াওঠা হাতপা ছড়ানো হরিণের চামড়ার পিঠে বাবা কাত্যায়ন বসে আছেন বাবু হয়ে। মাথায় বিড়েবাঁধা তেলচিটে জটা। পোড় খাওয়া তামাটে কপালে দেড় ইঞ্চি চওড়া সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষ, আর রংচঙে পাথরের মালা। দু হাতেও রুদ্রাক্ষের মালার বালা। খালি গা, ভালুকের মতো লোমওলা বুকে ধবধবে মোটা পৈতে। পরনে হ্রস্ব একটি রক্তাম্বর, ঘরের গুমোট গরমে সেটাও গুটিয়ে তোলা, উরুর অনেকখানি উপরে। সামান্য নড়চড়ায় বিপজ্জনক হয়ে ওঠা কিছু আশ্চর্যের নয়।
বাইরে জুতো খুলে এসে, ঘরে ঢুকে ওরা দুজনে বাবাকে প্রণাম করল। পায়ের নখগুলো বাবার জন্মের পর থেকে নরুনের সংস্পর্শ রহিত, দেখেই বোঝা যায়। অন্য একজনের হস্ত রেখা বিচার করছিলেন, আর ফিসফিস করে কথা বলেছিলেন। চশমার উপর দিয়ে রক্তচক্ষু তুলে ওদের দেখলেন, বললেন, “অফিসে বড়ো অশান্তি, না রে? তারা মার কাছে এসে পড়েছিস যখন আর চিন্তা নেই, যা বোস ওইখানটাতে”।
হরিপদর বউ মুগ্ধ নেত্রে বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার
পর, হরিপদর কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, “দেকলে, বিশাকাদি ঠিকই বলেছিল, বাবা পুরো
অন্তজ্জামি”। হরিপদ ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি দিল। অপেক্ষা করতে লাগল বাবা
কখন ডাকেন। একটু ভয়ও যে করছিল না তা নয়, বাবা যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন,
হরিপদর যৌবন কালে অনেক কেলেংকারির কথা আছে, যা হরিপদর বৌ জানে না। সে সব ফাঁস হয়ে
গেলেই হয়েছে আর কি!
মোটা কাঠের কড়ি-বর্গাওয়ালা নিচু ছাদের ঘর। সিলিংএ ঝুলে ঘাড় দোলাচ্ছে ফ্যানটা। দেখে মনে হল এ ফ্যানটা এই বাড়ির থেকেও পুরোনো। বৃটিশ জমানার হাল হকিকত বিস্তর দেখে এসেছে। এখন বাবার কীর্তি দেখে অনবরত ঘাড় দুলিয়ে চলেছে। আওয়াজ উঠছে ঘট ঘট ঘট ঘট। মেঝে থেকে দেওয়ালের ফুটতিনেক অব্দি টকটকে লাল প্লাসিক পেন্টের আস্তর। বাকি দেওয়াল থেকে সিলিং ঘন সবুজ রঙের প্লাস্টিক পেণ্ট করা। ঘরে তিনটে ছানার জিলিপির মতো দেখতে সিএফএল জ্বলছে। রঙের জেল্লায় একটুও আলো ফুটছে না। বাবার বাঁ হাতের সামনে কাঠের একটা বহু পুরোনো ডেস্ক। তার ওপরে লেখার প্যাড আর ফাউন্টেন পেন। সামনে কালির দোয়াত। ডেস্কের এক পাশে গুচ্ছের কোণা দুমড়ানো কাগজের তাড়া।
ডেস্কের ওপাশে মা কালীর কুচকুচে কালো মূর্তি। ফুট চারেক
উঁচু। টকটক করছে তাঁর মুখের চারপাশ, জিভ, হাতের তালু আর চরণতল। চরণতলে শুয়ে আছেন
দেবাদিদেব মহাদেব। মায়ের উপরের একহাতে বরাভয়, অন্য হাতে টিনের পাতলা খড়্গ। নিচের
একহাতে কাটা মুণ্ডু, অন্য হাত খালি। গলায় নরমুণ্ড মালা। মায়ের লজ্জা নিবারণ হয়েছে
অজস্র কাটা হাত ও পায়ের মালায়। মায়ের গলায় ঝুলছে একগোছা রক্তজবার মালা, একদম
টাটকা। অনালোকিত এই ঘরের আলোয়, মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে, হরিপদর আবার মনে হল, বাবা
কাত্যায়ন যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, তাহলে কী হবে?
যে লোকটি হাত দেখাতে এসেছিল, তার মনে হচ্ছে হয়ে গেল,
কাত্যায়ন বাবা, জোরে বলে উঠলেন, “যাঃ, বেশি ভাবিস না। যেমন বললাম, মায়ের ওপর ভরসা
করে, সব মেনে চল। তোর ভালো দিন আসছে, মনে রাখিস”।
“সবই আপনার কৃপা, বাবা” বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে
করতে বলল ভদ্রলোক।
“ছি, ছি। অমন কথা মুখেও আনিস না রে, ব্যাটা। আমি কৃপা
করার কে রে? কৃপা করছেন, জগত্তারিণী মহামায়া, মা তারা। ওই মাকে
প্রণাম কর, মা-ই তোকে ঠিক পথে চালিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। সামনের ঘোর অমাবস্যায় নীল
সরেস্বতী মহাকালী যজ্ঞের আয়োজন কর, যেটুকু বিপদের জের এখনো আছে, কেটে যাবে একদম”।
“এই অমাবস্যায় হবে না, বাবা। ছেলেটার সামনে পরীক্ষা”।
“পরেরটায় দ্যাখ, নয়তো তার পরেরটা? মা অপেক্ষায় থাকবেন,
চিন্তা করিস না”।
ঘাড় নেড়ে ভদ্রলোক মায়ের পায়ে প্রণাম করে উঠে যেতে বাবা
কাত্যায়ন হরিপদদের ডাকলেন, “মন্ত্রে তন্ত্রে, পুজো পাঠে কিছুতেই তোর বিশ্বাস হয়
না, না রে? সবটাই বুজরুকি, কি বল”?
“কি বলছেন, বাবা, বিশ্বাস না থাকলে আপনার কাছে, আসতাম”? হরিপদর
বউ চমকে বলে উঠল।
“তোর কথা বলছি না, রে পাগলি? তোর স্বামীর কথা বলছি। দে তোর
হাতটা বাড়া। ডানহাত নয় রে, বাঁ হাত, মেয়েছেলেদের বাঁহাত আর ব্যাটাছেলেদের ডানহাতে লেখা
থাকে তাদের নিয়তি। আয়, আরেকটু সরে আয়। তোর স্বামী সেই থেকে সব দেখে চলেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তান্ত্রিক-বাবাটা
লোক কেমন। জোচ্চোর কিনা। চুক্কি মারছে, নাকি সত্যি কিছু জানে? তাই না রে। ভক্তি আন
রে ব্যাটা, মনে ভক্তি আন”।
হরিপদর বউ আরেকটু সামনে সরে বসতে, বাবা কাত্যায়ন তার বাঁহাতটা ধরে কোলের উপর রাখলেন, বললেন, “ন্যায়নিষ্ঠ, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং ক্ষণক্রোধী। কি তোর স্বামীর মধ্যে এই গুণগুলো নেই”? হরিপদর গা জ্বলছিল কারণ, কথা বলতে বলতে বাবা কাত্যায়ন তাঁর কোলে তার বউয়ের হাতটা রেখে বিপজ্জনকভাবে ডলছিলেন।
“ময়লা, ময়লা। ময়লা আমাদের সবখানে। ময়লা আমাদের মনে। ময়লা
আমাদের দৃষ্টিতে। ময়লা আমাদের অতীত জীবনে। হাতের ময়লা না তুললে কি আর হাতের রেখা
ফুটে ওঠে”? হরিপদর পাপী মন এবার চমকে উঠল, বাবা কাত্যায়ন কি সত্যি অন্তর্যামী?
“আজকের যুগে তোর স্বামীর মতোন লোক অচল। এমন লোওওওক অচঅঅঅঅল।
একটুতেই রেগে ওঠে। অন্যায় করতে দেখলে ওপরওলাদেরও ছেড়ে কথা কয় না। এমন আহাম্মক। ওপরওলাদের
তেল মাখাতে পারে না। উলটে কটকট করে সত্যি কথা শুনিয়ে দেয়! আশে পাশে সবাই দুনম্বরি
পয়সা পকেটে ঢোকাচ্ছে, তোর স্বামী ন্যায় দেখছে, নীতি দেখছে। বিবেকের কুটুস কাটুস কামড়
খাচ্ছে। ওর চেয়ে বয়সে ছোট, কিস্সু জানে না, আকাট মুখ্যু। শুধু তেল মেরে মেরে প্রমোশন
পেয়ে কোথায় চলে গেল। তুই কতদিন একই জায়গায় পচছিস, দাঁড়া আমি বলছি, তা বছর সাতেক তো
হবেই”?
সামনে বসে বিস্ফারিত চোখে এতক্ষণ হরিপদর বউ বাবার কথা
শুনছিল, বউয়ের পিছনে বসে হরিপদও শুনছিল। বাবার এই কথায় দুজনেই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাবার পায়ে।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে হরিপদর বউ বলল, “আপনি সব জানেন, বাবা। আপনার কাচে কিচ্চুটি গোপন
নেই, আপনি অন্তজ্জামী। আটবছর ধরে ও একই জায়গায় পড়ে রয়েচে। ওর
ওপরওলাগুলো কি যে বিষ নজরে ওকে দ্যাকে, সে আপনি জানেন, বাবা। আপনাকে এর একটা বিহিত
করতেই হবে।”
“উতলা হোস না। শান্ত হ। স্বামীর
জন্যে কত কী করতে হয়, সাধ্বী মেয়েদের। দাঁড়া তোর হাতটা এবার দেখি”। রক্তাম্বরে
ঢাকা পড়ে যাওয়া হাতটা নিয়ে বাবা এবার খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলেন। হরিপদ আর
তার বৌ দম বন্ধ করে অপেক্ষায় রইল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।
“ভৌম দোষ কি জানিস”?
“না বাবা, জানি না”।
“তোর ভৌম দোষ আছে। খুব খারাপ দোষ, সে কথা উচ্চারণ করতেও মন শিউরে
ওঠে। তোর স্বামী ছোটবেলায় মস্ত এক ফাঁড়া থেকে বেঁচে উঠেছিল না”?
“হ্যাঁ উঠেছিল, তো। আমার শ্বাশুড়ি মায়ের মুখে শুনেছি। বলো
না গো, চুপ করে আছো কেন? বাবার কাছে সব খুলে বলতে হয়”। হরিপদর বউ কান্না ধরা গলায়
বলল। হরিপদ বাবা কাত্যায়নের অলৌকিক ক্ষমতায় একদম কাবু হয়ে গেল, আমতা আমতা করে বলল,
“আমি তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। আমাদের স্কুলের পুকুরের গায়েই একটা বড়ো আমগাছ
ছিল। সেই আমগাছ থেকে আম পাড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে পড়েছিলাম পুকুরের জলে...”।
“পড়তেই হবে। পঞ্চমে শনি আর তৃতীয়ে মঙ্গল। একেবারে মোক্ষম
মৃত্যুর যোগ। বেঁচে থাকার কথাই নয়। বেঁচে আছে সপ্তমে বৃহষ্পতি ছিল বলে। সে যাত্রায়
রক্ষে পেলেও এবারে কিন্তু ভীষণ সংকট। আজ থেকে মোটামুটি দু বছর বাদে, মোটামুটিই বা
কেন? তোর জন্ম মাসটা কবে? চোত না মাঘ”?
“আজ্ঞে বাবা, আষাঢ় মাসে”।
“ওই একই হল। চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং। অর্থাৎ কিনা, চোত, মাঘ
কিংবা আষাঢ় মাসের জাতকদের ভাগ্যফল একই হয়ে থাকে”। চোখ বন্ধ
করে বাবা কাত্যায়ন কিছু চিন্তা করে আবার বললেন, “আজ থেকে ঠিক এক বছর ন মাস পড়ে তোর
বৈধব্য যোগ রয়েছে। বৈধব্য যোগ কিংবা ভৌম দোষ, জীবনে খুবই কঠিন সংকটময় কাল”।
রুদ্ধ কান্না আবার উথলে নিয়ে হরিপদর বউ বলল, “তাহলে আমার কী
হবে, বাবা। কোন কী উপায় নেই? একটা কিছু উপায় আপনাকে করতেই হবে, বাবা”।
“শনিকে সামলানো যায়, কেতু কে সামলানো যায়, কিন্তু শনি আর
কেতু একসঙ্গে হলে রক্ষা পাওয়া মুশকিল। চারদিক থেকে ছেঁকে ধরেছে শত্রুরা। ভেতরে শত্রু, বাইরে
শত্রু। মুখে মিষ্টি হাসি, মিষ্টি কথা, কিন্তু পিঠে ছুরি বসিয়ে যাচ্ছে, খুব কাছের
লোকরাও। কর্মক্ষেত্রে রাহুর দৃষ্টি, তোর কত্তাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে
দিচ্ছে না”।
“ওসব আমি কিচ্চুটি জানি না বাবা, এই আমি আপনার চরণে পড়ে
থাকবো, যতক্ষণ না আপনি এর বিহিত করছেন”। হরিপদর বউ বাবা কাত্যায়নের চরণ ধরে হাউ
হাউ করে কেঁদে ফেলল।
“আহা, আহা করিস কি? করিস কি? মেয়েছেলের চোখের জল, আমি যে
আবার সহ্য করতে পারি নে। আছে আছে, উপায় আছে, কিন্তু সে তো আমার হাতে নেই রে! সে
আছে আমার খ্যাপা মায়ের হাতে। কুপিত গ্রহশান্তির জন্যে খরচের ব্যাপারে কিন্তু কোন কার্পণ্য
করলে চলবে না”।
“বাবা, খরচ আগে, না আমার মানুষটা আগে? মানুষ বাঁচলে অনেক
টাকা রোজগার করবে, বাবা। আপনি শুধু উপায় বলুন”।
“অতি উত্তম। কই হে, রত্নধর, শুনলে তো সব কথা”?
লাল ফতুয়া পড়া রত্নধর ঘরেই দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল,
এতক্ষণ চোখেই পড়েনি। ছায়া মাখা লাল দেয়ালে মিশে ছিল তার চিমসে হাড়গিলে শরীর। সামনে
সরে এসে জোড়হাতে বলল, “আজ্ঞে শুরু থেকে সবই দেখলাম, বুঝলাম এবং শুনলাম, গুরুদেব। এখন আদেশ করুন”।
“ছ রতির পীতাম্বরি নীলা, মধ্যমায়। আট রতির রক্ত প্রবাল
অনামিকায়। চার রতির সিংহলী চূণী কনিষ্ঠায়। চার রতির বসরাই মুক্তা তর্জনীতে। ছ”রতির
পান্না, ছ”রতির গোমেদ আর চার রতির পোখরাজ”।
হরিপদ অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “বাবা, হাতে অত আঙুল কোথায়”?
বাবা অভয় হাত তুলে বললেন,
“সব বলে দেব। কথার মাঝখানে কথা বলিস না, মূর্খ। রত্নধর কি
বলছিলাম যেন”? রত্নধর প্যাডে লিখতে লিখতে বলল, “আজ্ঞে, গুরুদেব, নীলা, পলা, চূণী,
মুক্তো, পান্না, গোমেদ, -পোখরাজ। শুধু হীরে আর ক্যাট্স্ আইদুটো বাকি রয়ে গেল”।
“হ্যাঁ ঠিক আছে। নীলা, আর পলা বসবে রূপোর আংটিতে। চূণি আর
মুক্তো সোনার আংটিতে। বাকি পান্না, গোমেদ আর পোখরাজ রূপোর চেনে বসিয়ে ঊর্ধ্ববাহুতে
ধারণ করতে হবে। এসব হচ্ছে তোর স্বামীর জন্যে বুঝেছিস? তোর জন্যে তেমন কিছু না হলেও
চলে যায়। তবুও চার রতির পান্না আর ছরতির গোমেদ ধারণ করলে লাভ বৈ কোন ক্ষতি তো
নেই। তারা তারা, মাগো, তাড়া। রত্নধর আমার
এখন মাতৃসেবার সময় হয়েছে। তুমি ওদের নিয়ে ও ঘরে যাও, তোমাদের এই অর্থ অনর্থের টানা-পোড়েনের
মধ্যে আমি থাকতে চাই না, ওসবে আমার একেবারেই রুচি হয় না”। হরিপদর বউ এবং হরিপদ শেষ বারের মতো প্রণাম করে
বলল, “বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে তো”?
“চেষ্টা তো করছি রে, পাগলি? এখন সবই মায়ের ইচ্ছে। সব কটা
রত্ন সামনের মঙ্গলবারের মধ্যে আমার কাছে নিয়ে আয়। দেরি করিস না। কটা রত্ন এ মাসে
ধারণ করবি, পরের মাসের মাইনে পেলে বাকিগুলো! ওসব কথা মনেও ঠাঁই দিস নে। যত দেরি
করবি, ততই গুঁড়ি মেরে বিপদ ঘনিয়ে আসবে...। আমার কাছে নিয়ে আসবি, মায়ের চরণ ধোয়া
জলে আমি শোধন করে দেব। বলে দেব রত্ন ধারণ করার মোক্ষম সময় আর দিন। তারপর রাখলে মা
তারাই রাখবেন, মারলে তিনিই মারবেন”।
“তাই হবে, বাবা, তাই হবে। আপনি যে একটা উপায় বলে দিয়েছেন, এ
যে আমাদের কি ভাগ্যি, বাবা। বাবা আপনার দক্ষিণা”?
“ও কথা মুখেও আনিস না রে, ওরে পাগলি, আমি যে দক্ষিণা নিতে
পারি না। মায়ের সেবায় আবার দক্ষিণা কি রে? মায়ের আদেশ, “কাত্যায়ন,
শোকেতাপে, সংসারের জ্বালায় পোড়া-মানুষগুলো, তোর কাছে আসে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে।
তোর অন্ন বস্ত্রের অভাব আমি রাখবো না, বাবা। তুই শুধু ওদের থেকে কোন পয়সা নিতে
পাবি না”। ন্যাংটা মায়ের আমি ন্যাংটা ব্যাটা, আমার আবার অভাব কিসের, যে টাকা
হাতাবো? যা কিছু দিবি মায়ের পায়ের কাছে রাখা ওই দান-পেটিতে ঢেলে দে। তবে মায়ের সেবায়, দুশো
একান্নর নিচে না দেওয়াই ভালো, ওর কমে মায়ের সেবা হয় না”।
হরিপদর কানে কানে হরিপদর বউ কিছু বলল। হরিপদ, তিনশ টাকা আর একটাকার একটা কয়েন গুঁজে দিল মায়ের পায়ের কাছে রাখা দান-পেটির স্লটে। বাবা নির্লিপ্ত চোখে দেখে বললেন, “যা। এবার আমার মায়ের সঙ্গে আলাপের সময় হল। ওঘরে গিয়ে সব রত্নের মাহাত্ম্য বুঝে নে রত্নধরের থেকে। শুভকাজে দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি যা। মা তারা, তাড়া, তাড়া, সবার বিপদ তাড়া, বিপত্তারিণী মাগো”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন