বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১০ম পর্ব

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "





এর আগের নবম অধ্যায়ঃ রাজযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ৯ম পর্ব"

 

দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগ

 

শ্রীভগবানুবাচ

ভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।

যৎ তেঽহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া।।

শ্রীভগবান উবাচ

ভূয়ঃ এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।

যৎ তে অহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া।।

শ্রীভগবান বললেন- হে মহাবীর, আমার পরম তত্ত্বকথা আমি আরও একবার বলছি, শোনো। তোমার মঙ্গলকামনায় যে কথা আমি এখন বলব, তাতে তুমি খুশীই হবে।

 

ন মে বিদুঃ সুরগণাং প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ।

অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাঞ্চ সর্বশঃ।।

ন মে বিদুঃ সুরগণাং প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ।

অহম্‌ আদিঃ হি দেবানাং মহর্ষীণাঞ্চ সর্বশঃ।।

দেবতারা কিংবা মহর্ষিরা কেউই আমার আবির্ভাবের তত্ত্বটি জানেন না। কারণ আমিই সমস্ত দেব ও মহর্ষিদের উৎপত্তির আদি কারণ।

 

যো মামজমনাদিঞ্চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌।

অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।

যো মাম্‌ অজম্‌-অনাদিম্‌ চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌।

অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।

আমার জন্ম নেই, আমি অনাদি এবং সর্বলোকের আমিই ঈশ্বর, এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনি এই পৃথিবীর সমস্ত মোহ ত্যাগ

করে, সমস্ত পাপ থেকেই মুক্ত হন

 

৪-৫

বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ ক্ষমা সত্য দমঃ শমঃ।

সুখং দুঃখং ভবোঽভাবো ভয়ং চাভয়মেব চ।।

অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোঽযশ।

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথিগ্বিধাঃ।।

বুদ্ধিঃ-জ্ঞানম্‌ অসংমোহঃ ক্ষমা সত্য দমঃ শমঃ।

সুখং দুঃখং ভবঃ অভাবঃ ভয়ং চ অভয়ম্‌ এব চ।।

অহিংসা সমতা তুষ্টিঃ তপঃ দানং যশঃ ঽযশ।

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্তঃ এব পৃথিগ্বিধাঃ।।

বুদ্ধি, জ্ঞান, অনাসক্তি, ক্ষমা, সত্য, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের দমন এবং সংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম ও মৃত্যু, ভয় এবং অভয়, অহিংসা, সমদর্শিতা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, খ্যাতি ও অখ্যাতি – জীবের এই সমস্ত ভাব আমিই সঞ্চার করে থাকি।

  

মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা।

মদ্ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।

মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারঃ মনবঃ তথা।

মৎ-ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।

পুরাকালে সাত মহর্ষি, চার মুনিকুমার এবং চোদ্দজন মনু আমারই আত্মার প্রভাবে, আমার মন থেকে জন্মেছিলেন এবং তাঁরাই এই জগতের সকল প্রজা সৃষ্টি করেছিলেন।

[ভৃগু, মরীচি, অত্রি, পুলহ, অঙ্গিরা, ক্রতু ও পুলস্ত – সাত মহর্ষি; সনক, সনন্দন, সনৎকুমার ও সনাতন – চার কুমার; স্বায়ম্ভূব, স্বারোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত, সাবর্ণি, দক্ষসাবর্ণি, ব্রহ্মসাবর্ণি, ধর্মসাবর্ণি, রুদ্রসাবর্ণি, দেবসাবর্ণি ও ইন্দ্রসাবর্ণি – চোদ্দজন মনু।]

 

 

এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

সোঽবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।।

এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

সঃ অবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে ন অত্র সংশয়ঃ।।

যিনি আমার এই বিভূতি ও যোগের তত্ত্বটি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তিনি অবিচলিত একনিষ্ঠ সাধনায় আমার সঙ্গেই যে যুক্ত হন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

 

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।

ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।।

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।

ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।।

এই সমস্ত জগৎ আমারই সৃষ্টি, আমার থেকেই সমস্ত জগৎ প্রবর্তিত হয়, এই তত্ত্ব জেনে জ্ঞানীজন একান্ত ভক্তিভাবে আমার ভজনা করেন।

 

মচ্চিত্তা মদ্‌গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্‌।

কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ।।

মৎ-চিত্তা মৎ-গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্‌।

কথয়ন্তঃ চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ।।

আমাতে মন এবং প্রাণ সম্পূর্ণ সমর্পণ ক’রে, জ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে সবসময় আমাকে নিয়ে আলোচনা ক’রে, সন্তোষ লাভ করেন ও আনন্দ পান।

 

১০

তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্‌।

দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে।।

তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্‌।

দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মাম্‌ উপযান্তি তে।।

যাঁরা সর্বদা আত্মস্থ অবস্থায়, একান্ত ভক্তিতে আমার ভজনা করেন, সেই জ্ঞানী ব্যক্তিদের আমিই আমার এই তত্ত্বের সম্যক জ্ঞান দান করি, আর সেই জ্ঞানের উপলব্ধিতেই তাঁরা আমাকে নিজেদের আত্মায় লাভ করেন।

 

১১

তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ।

নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।

তেষাম্‌ এব অনুকম্পার্থম্‌ অহম্‌ অজ্ঞানজং তমঃ।

নাশয়ামি আত্মভাবস্থঃ জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।

তাঁদের প্রতি করুণাবশেই, আমি তাঁদের আত্মায় বাস ক’রে তাঁদের অন্তরে জ্ঞানের দীপ জ্বালাই, সেই দীপ্তিতে তাঁদের অন্তর থেকে অজ্ঞানের সকল অন্ধকার আমিই দূর করে দিই।

  

১২-১৩

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভূম্‌।।

আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদস্তথা।

অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যম্‌ আদিদেবম্‌ অজং বিভূম্‌।।

আহুঃ ত্বাম্‌ ঋষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদঃ তথা।

অসিতঃ দেবলঃ ব্যাসঃ স্বয়ং চ এব ব্রবীষি মে।।

অর্জুন বললেন – তুমিই পরম ব্রহ্ম, তুমিই পরম আশ্রয় এবং তুমি পরম পবিত্র। তুমিই সেই শাশ্বত দিব্য পুরুষ, যাঁর আদি নেই, যাঁর জন্ম নেই এবং যিনি এই জগতের সর্বত্র ব্যাপ্ত। এমন কথা আমি সমস্ত ঋষি, দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল ও ব্যাসদেবের কাছেও শুনেছি। এখন তুমি নিজেও সেকথাই বর্ণনা করলে।

   

১৪

সর্বমেতদৃতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্‌ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ।।

সর্বম্‌ এতৎ ঋতং মন্যে যৎ মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্‌ ব্যক্তিং বিদুঃ দেবা ন দানবাঃ।।

হে কেশব, আমি বিশ্বাস করি তুমি যা বললে, তা সবই সত্যি, যেহেতু, হে ঈশ্বর, তোমার এই মানবরূপ না দেবতারা জানেন, না দানবরা উপলব্ধি করতে পারে।

 

১৫

স্বয়মেবাত্মনাত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম।

ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।

স্বয়ম্‌ এব আত্মনা আত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষ-উত্তম।

ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।

হে পুরুষোত্তম, তুমিই সকল ভূতের স্রষ্টা, সকল ভূতের নিয়ন্তা এবং তুমিই সমস্ত দেবতাদের দেবতা, এই জগতের প্রভু। তুমি ছাড়া অন্য আর কেউ তোমার আত্মার এই পরম স্বরূপ জানতে পারে না।

 

১৬

বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ।

যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।

বক্তুম্‌ অর্হসি অশেষেণ দিব্যাঃ হি আত্মবিভূতয়ঃ।

যাভিঃ বিভূতিভিঃ লোকান্‌ ইমাং ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।

যে যে বিভূতি দিয়ে এই জগতের সর্বত্র তুমি ব্যাপ্ত রয়েছ, নিজের সেই সব পরমবিভূতির দিব্যস্বরূপ ব্যাখ্যা করা, একমাত্র তোমার পক্ষেই সম্ভব।

 

১৭

কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্‌।

কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যোঽসি ভগবন্‌ ময়া।।

কথং বিদ্যাম্‌ অহং যোগিং ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্‌।

কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যঃ অসি ভগবন্‌ ময়া।।

হে যোগেশ্বর, সর্বদা তোমার চিন্তা করতে করতে কিভাবে তোমাকে জানব? আর হে ভগবান, কী কী ভাবেই বা আমার চিন্তায় শুধু তুমিই থাকবে?

 

১৮

বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন।

ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মেঽমৃতম্‌।।

বিস্তরেণ আত্মনঃ যোগং বিভূতিং চ জনার্দন।

ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তিঃ হি শৃণ্বতঃ ন অস্তি মে অমৃতম্‌।।

হে জনার্দন, তোমার আত্মযোগের ঐশ্বর্য্য এবং তোমার বিভূতির কথা সবিস্তারে আরও একবার বলো। কারণ তোমার এই অমৃতবাণী বার বার শুনেও আমার তৃপ্তি হচ্ছে না।

 

১৯

শ্রীভগবানুবাচ

হন্ত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ।

প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ নাস্ত্যন্তো বিস্তরস্য মে।।

শ্রীভগবান উবাচ

হন্ত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হি আত্মবিভূতয়ঃ।

প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ ন অস্তি অন্তঃ বিস্তরস্য মে।।

শ্রীভগবান বললেন – হে কুরুশ্রেষ্ঠ, আমার অলৌকিক বিভূতির মধ্যে যেগুলি প্রধান, তার কথাই আমি এখন তোমাকে বলব, কারণ আমার এই বিভূতি বিশ্বব্যাপী, তার কোন অন্ত নেই।

 

২০

অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।

অহমাদিশ্চ মধ্যঞ্চ ভূতানামন্ত এব চ।।

অহম্‌ আত্মা গুড়াকেশ সর্বভূত-আশয়স্থিতঃ।

অহম্‌ আদিঃ চ মধ্যম্‌ চ ভূতানাম্‌ অন্তঃ এব চ।।

হে জিতনিদ্র অর্জুন, সমস্ত জীবের অন্তরে আমিই আত্মা বা চৈতন্যরূপে বাস করি এবং আমিই সমস্ত জীবের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কারণ।

 

২১

আদিত্যানামহং বিষ্ণুর্জ্যোতিষাং রবিরংশুমান্‌।

মরীচির্মরুতামস্মি নক্ষত্রাণামহং শশী।।

আদিত্যানাম্‌ অহং বিষ্ণুঃ জ্যোতিষাং রবিঃ অংশুমান্‌।

মরীচিঃ মরুতাম্‌ অস্মি নক্ষত্রাণাম্‌ অহং শশী।।

দ্বাদশ আদিত্যদের মধ্যে আমিই বিষ্ণু, জ্যোতির্মণ্ডলের মধ্যে আমিই অংশুমান সূর্য, সপ্তবায়ুর মধ্যে আমিই মরীচি, সহস্র নক্ষত্রদের মধ্যে আমিই চন্দ্র।

[ধাতা, মিত্র, অর্যমা, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বান, পুষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু – এঁরা দ্বাদশ আদিত্য। আর আবহ, প্রবহ, বিবহ, পরাবহ, উদ্বহ, সংবহ ও পরিবহ – এই সাতটি মরুৎ বা বায়ু।]

  

২২

বেদানাং সামবেদোঽস্মি দেবানামস্মি বাসবঃ।

ইন্দ্রিয়াণাং মনশ্চাস্মি ভূতানামস্মি চেতনা।।

বেদানাং সামবেদঃ অস্মি দেবানাম্‌ অস্মি বাসবঃ।

ইন্দ্রিয়াণাং মনঃ চ অস্মি ভূতানাম্‌ অস্মি চেতনা।।

চার বেদের মধ্যে আমিই সামবেদ, দেবতাদের মধ্যে আমিই বাসব, সকল ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমিই মন, এবং সমস্ত জীবের অন্তরে আমিই চেতনা।

 

২৩

রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্‌।

বসূনাং পাবকাশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম্‌।।

রুদ্রাণাং শঙ্করঃ চ অস্মি বিত্তেশঃ যক্ষরক্ষসাম্‌।

বসূনাং পাবকাঃ চ অস্মি মেরুঃ শিখরিণাম্‌ অহম্‌।।

একাদশ রুদ্রের মধ্যে আমিই শঙ্কর, যক্ষ ও রাক্ষসের মধ্যে আমিই ধনপতি কুবের, অষ্ট বসুর মধ্যে আমিই অগ্নি, সুউচ্চ পর্বতের মধ্যে আমিই মেরুপর্বত।

[একাদশ রুদ্র- অজ, একপাদ, অহিব্রধ্ন, পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর শংকর, বৃষাকপি, শম্ভু, হরণ ও ঈশ্বর। অষ্ট বসু – আপ, ধ্রুব, সোম, ধর, অনিল, অগ্নি, প্রত্যূষ ও প্রভাস।]

 

২৪

পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহষ্পতিম্‌।

সেনানীনামহং স্কন্দঃ সরসামস্মি সাগরঃ।।

পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহষ্পতিম্‌।

সেনানীনাম্‌ অহং স্কন্দঃ সরসাম্‌ অস্মি সাগরঃ।।

হে অর্জুন, জেনে রাখো, সমস্ত পুরোহিতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আমিই বৃহষ্পতি। সমস্ত সেনাপতিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আমিই স্কন্দ, সমস্ত জলাশয়ের মধ্যে আমিই সাগর।

 

২৫

মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ।।

মহর্ষীণাং ভৃগুঃ অহং গিরাম্‌ অস্মি একম্‌ অক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞঃ অস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ।।

মহর্ষিদের মধ্যে আমিই ভৃগু, সমস্ত বাক্যের মধ্যে আমিই একাক্ষর প্রণব, সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে আমিই জপযজ্ঞ, সমস্ত স্থাবরের মধ্যে আমিই হিমালয়।

 

২৬

অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাঞ্চ নারদঃ।

গন্ধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলো মুনিঃ।।

অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাং চ নারদঃ।

গন্ধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলঃ মুনিঃ।।

সমস্ত বৃক্ষের মধ্যে আমিই অশ্বত্থ, দেবর্ষিদের মধ্যে আমিই নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমিই চিত্ররথ, সিদ্ধযোগীগণের মধ্যে আমিই কপিল মুনি।

 

২৭

উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্‌।

ঐরাবতং গজেন্দ্রাণাং নরাণাঞ্চ নরাধিপম্‌।।

উচ্চৈঃশ্রবসম্‌ অশ্বানাং বিদ্ধি মাম্‌ অমৃত-উদ্ভবম্‌।

ঐরাবতং গজ-ইন্দ্রাণাং নরাণাং চ নর-অধিপম্‌।।

জেনে রাখো, অমৃত লাভের জন্যে সমুদ্র মন্থনের সময় যে শ্রেষ্ঠ অশ্বটির উৎপত্তি হয়েছিল, আমিই সেই উচ্চৈঃশ্রবা, শ্রেষ্ঠ হাতিদের মধ্যে আমিই ঐরাবত আর সমস্ত মানুষের মধ্যে আমি নৃপতি।

 

২৮

আয়ুধানামহং বজ্রং ধেনূনামস্মি কামধূক।

প্রজনশ্চাস্মি কন্দর্পঃ সর্পাণামস্মি বাসুকিঃ।।

আয়ুধানাম্‌ অহং বজ্রং ধেনূনাম্‌ অস্মি কামধূক।

প্রজনঃ চ অস্মি কন্দর্পঃ সর্পাণাম্‌ অস্মি বাসুকিঃ।।

সমস্ত অস্ত্রের মধ্যে আমিই বজ্র, সমস্ত গাভীর মধ্যে আমিই কামধেনু, জীব প্রজননে আমিই কামদেব কন্দর্প, সমস্ত সর্পগণের মধ্যে আমিই বাসুকি।

 

২৯

অনন্তশ্চাস্মি নাগানাং বরুণো যাদসামহম্‌।

পিতৄণামর্যমা চাস্মি যমঃ সংযমতামহম্‌।।

অনন্তঃ চ অস্মি নাগানাং বরুণো যাদসাম্‌ অহম্‌।

পিতৄণাম্‌ অর্যমা চ অস্মি যমঃ সংযমতাম্‌ অহম্‌।।

নাগেদের মধ্যে আমিই অনন্তনাগ, সমস্ত জলচরদের দেবতা আমিই বরুণ, পিতৃলোকে আমিই অর্যমা আর এই জগতের নিয়ন্ত্রণকর্তা আমিই যম।

 

৩০

প্রহ্লাদশ্চাস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তামহম্‌।

মৃগাণাঞ্চ মৃগেন্দ্রোঽহং বৈনতেয়শ্চ পক্ষিণাম্‌।।

প্রহ্লাদঃ চ অস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তাম্‌ অহম্‌।

মৃগাণাং চ মৃগেন্দ্রঃ অহং বৈনতেয়ঃ চ পক্ষিণাম্‌।।

দৈত্যদের মধ্যে আমিই প্রহ্লাদ, অনন্ত সময় প্রবাহের নিয়ন্তা আমিই কাল, পশুদের মধ্যে আমিই সিংহ, পক্ষিদের মধ্যে আমিই বিনতাপুত্র গরুড়।

 

৩১

পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্‌।

ঋষাণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী।।

পবনঃ পবতাম্‌ অস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতাম্‌ অহম্‌।

ঋষাণাং মকরঃ চ অস্মি স্রোতসাম্‌ অস্মি জাহ্নবী।।

গতির মধ্যে আমিই বাতাসরূপী পবন, অজেয় বীরদের মধ্যে আমিই শ্রীরাম, মাছেদের মধ্যে আমিই মকর, আর সমস্ত নদীর মধ্যে আমিই গঙ্গা।

 

৩২

সর্গাণামাদিরন্তশ্চ মধ্যঞ্চৈবাহমর্জুন।

অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতামহম্‌।।

সর্গাণাম্‌ আদিঃ অন্তঃ চ মধ্যং চ এব অহম্‌ অর্জুন।

অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতাম্‌ অহম্‌।।

হে অর্জুন, আমিই সকল পদার্থের আদি, মধ্য এবং অন্ত। সমস্ত বিদ্যার মধ্যে আমিই পরমজ্ঞান, আমিই তার্কিক পণ্ডিতগণের বিতর্কিত মতবাদ।

 

৩৩

অক্ষরাণামকারোঽস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ।

অহমেবাক্ষয়ঃ কালো ধাতাহং বিশ্বতোমুখঃ।।

অক্ষরাণাম্‌ অকারঃ অস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ।

অহম্‌ এব অক্ষয়ঃ কালঃ ধাতা অহং বিশ্বতোমুখঃ।।

সমস্ত অক্ষরের মধ্যে আমিই অ-কার। সমস্ত সমাসের মধ্যে আমিই দ্বন্দ্ব। আমিই অনন্তকাল এবং সর্ব ফল প্রদানকারী বিশ্ববিধাতা।

 

৩৪

মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্‌।

কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্‌ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।

মৃত্যুঃ সর্বহরঃ চ অহম্‌ উদ্ভবঃ চ ভবিষ্যতাম্‌।

কীর্তিঃ শ্রীঃ বাক্‌ চ নারীণাং স্মৃতিঃ মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।

আমিই সর্বানাশা মৃত্যু আবার আমিই মঙ্গলময় ভবিষ্যতের স্রষ্টা। কীর্তি, শ্রী, বাক্য, স্মৃতি, মেধা, ধৈর্য ও ক্ষমা রূপে আমিই সকল নারীর গুণাবলী।

 

৩৫

বৃহৎসাম্‌ তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসামহম্‌।

মাসানাং মার্গশীর্ষোঽহমৃতুনাং কুসুমাকরঃ।।

বৃহৎসাম্‌ তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসাম্‌ অহম্‌।

মাসানাং মার্গশীর্ষঃ অহম্‌ ঋতুনাং কুসুম-আকরঃ।।

আমিই সামবেদের মধ্যে মহৎ সাম। সমস্ত ছন্দের মধ্যে আমিই গায়ত্রী। বারোমাসের মধ্যে আমিই অগ্রহায়ণ, ছয় ঋতুর মধ্যে আমিই বসন্ত।

 

৩৬

দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্‌।

জয়োঽস্মি ব্যবসায়োঽস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্‌।।

দ্যূতং ছলয়তাম্‌ অস্মি তেজঃ তেজস্বিনাম্‌ অহম্‌।

জয়ঃ অস্মি ব্যবসায়ঃ অস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতাম্‌ অহম্‌।।

সমস্ত প্রতারকের মধ্যে আমিই পাশাখেলার চাতুরি, শক্তিশালীদের মধ্যে আমিই শক্তি, বিজয়ীদের জয়, উদ্যমী লোকেদের মধ্যে আমিই অধ্যবসায়, আর সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের সত্ত্বগুণ।

 

৩৭

বৃষ্ণিনাং বাসুদেবোঽস্মি পাণ্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ।

মুনীনামপ্যহং ব্যাসঃ কবীনামুশনা কবিঃ।।

বৃষ্ণিনাং বাসুদেবঃ অস্মি পাণ্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ।

মুনীনাম্‌ অপি অহং ব্যাসঃ কবীনাম্‌ উশনা কবিঃ।।

আমি বৃষ্ণিবংশের মধ্যে বাসুদেব-কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের মধ্যে আমিই ধনঞ্জয়-অর্জুন, মুনিদের মধ্যে আমিই ব্যাসদেব, আর কবিদের মধ্যে কবি শুক্রাচার্য।

 

৩৮

দণ্ডো দময়তামস্মি নীতিরস্মি জিগীষতাম্‌।

মৌনং চৈবাস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতামহম্‌।।

দণ্ডো দময়তাম্‌ অস্মি নীতিঃ অস্মি জিগীষতাম্‌।

মৌনং চ এব অস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতাম্‌ অহম্‌।।

শাসকদের হাতে আমিই দণ্ড, জয়ের ইচ্ছায় আমিই রণনীতি, গোপন বিষয়ে আমিই মৌন আর জ্ঞানীদের মধ্যে আমিই জ্ঞান।

 

৩৯

যচ্চাপি সর্বভূতানাং বীজং তদহমর্জুন।

ন তদস্তি বিনা যৎ স্যান্ময়া ভূতং চরাচরম্‌।।

যৎ চ অপি সর্বভূতানাং বীজং তদহম্‌ অর্জুন।

ন তৎ অস্তি বিনা যৎ স্যাৎ ময়া ভূতং চরাচরম্‌।।

হে অর্জুন, বিশ্বে যা কিছু তোমার দৃষ্টিতে অথবা অনুভবে ধরা দেয়, সেই সবকিছুর মূল আমি। আমায় ছাড়া থাকতে পারে, এই চরাচরে এমন কিছুই নেই

 

৪০

নান্তোঽস্তি মম দিব্যানাং বিভূতীনাং পরন্তপ।

এষ তূদ্দেশতঃ প্রোক্তো বিভূতের্বিস্তরো ময়া।।

না অন্তঃ অস্তি মম দিব্যানাং বিভূতীনাং পরন্তপ।

এষ তু উদ্দেশতঃ প্রোক্তঃ বিভূতেঃ বিস্তরঃ ময়া।।

হে অর্জুন, আমার অলৌকিক বিভূতির কোন সীমা নেই, আমার সেই বিশ্বব্যাপী বিভূতির খুব সামান্য অংশই তোমার কাছে ব্যাখ্যা করলাম।

 

৪১

যদ্‌ যদ্‌ বিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমদূর্জিতমেব বা।

তত্তদেবাবগচ্ছ ত্বং মম তেজোঽংশসম্ভবম্‌।।

যৎ যৎ বিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমৎ ঊর্জিতম্‌ এব বা।

তৎ তৎ এব অবগচ্ছ ত্বং মম তেজঃ অংশসম্ভবম্‌।।

এই পৃথিবীতে ঐশ্বর্যবান, শ্রীমান কিংবা প্রাণশক্তিতে ভরপুর যেখানে যা কিছু দেখতে পাবে, আমার এই বিভূতির অংশ থেকেই তাদের সৃষ্টি, এই তত্ত্বটি জেনে রাখো।

 

৪২

অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন।

বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ।।

অথবা বহুনা এতেন কিং জ্ঞাতেন তব অর্জুন।

বিষ্টভ্য অহম্‌ ইদং কৃৎস্নম্‌ একাংশেন স্থিতঃ জগৎ।।

কিন্তু হে অর্জুন, তোমার এত বেশী জানার কি প্রয়োজন? শুধু এইটুকু জেনে রাখো যে, আমার খুব সামান্য একটি অংশ দিয়েই আমি এই নিখিল বিশ্বচরাচরকে ধারণ করে আছি।

 

বিভূতিযোগ সমাপ্ত

চলবে...

বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১

 


["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের অষ্টম ও অন্তিম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/৮"]


চতুর্থ পর্ব প্রথম পর্বাংশ - ০ থেকে ১৩০০ সি.ই.

 

৪.১.১ পূবের প্রজ্ঞা পশ্চিমে ও খ্রিষ্টধর্মের সূচনা

সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকেই পশ্চিম এশিয়ার আরব কিংবা মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে ভারতের যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল, সে কথা আমরা আগেই দেখেছি। পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক চিন্তাধারার আদান-প্রদানও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাক-বৌদ্ধ যুগেও ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে গ্রীসের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। হয়তো ভারতীয় দার্শনিকরা এথেন্স, স্পার্টা বা করিন্থ গিয়েছিলেন, গ্রীক দার্শনিকদের উপনিষদের দর্শন শুনিয়েছিলেন। দিগ্বিজয়ী আলেজাণ্ডারের সমসাময়িক গ্রীক ঐতিহাসিক অ্যরিস্টোজেনাসের লেখা থেকে জানা যায়, বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস (৪৬৯-৩৯৯ বি.সি.ই)-এর সঙ্গে এথেন্সে কোন এক ভারতীয় পণ্ডিতের সাক্ষাৎ হয়েছিল। অনুমান করা হয়, ভারতীয় প্রজ্ঞার প্রভাবেই, পিথাগোরাস (৫৭০-৪৯৫ বি.সি.ই), প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ বি.সি.ই) এবং পরবর্তী কালে এথেন্সের স্টোয়িসিজ্‌ম্‌ (Stoicism) দর্শনে - বি.সি.ই তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে যার সূচনা - পুনর্জন্ম এবং আত্মার দেহান্তরের বিষয় এসেছিল।

 এর পরে, যিশুর জন্মের প্রায় দু’শ বছর আগে থেকে আলেকজান্দ্রিয়া এবং প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের একাংশের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য এবং রহস্যময় কিছু ধর্মীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মিশরের এই রহস্যময় ধার্মিকদের বলা হত থেরাপিউট (Therapeutae) এবং প্যালেস্টাইনে তাঁদের আধ্যাত্মিক ভাইয়েরা নিজেদের এসেনেস (Essenes) বা নাজারিনস (Nazarenes) বলতেন। সম্রাট অশোক তাঁর রাজত্বকালে পাঁচটি গ্রীক রাজার দরবারে বৌদ্ধ প্রচারকদের পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়া ছিল অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সে কথা আগেই বলেছি।

থেরাপিউট” এই ল্যাটিন শব্দের অর্থ, “যিনি ঈশ্বরের সেবক”, “যিনি মানুষকে সেবা করেন” এবং “পীড়িত মানুষকে আরোগ্য করেন”। এই সেবা শুধুমাত্র অসুস্থ মানুষকে সেবা করে আরোগ্য করা নয়। বরং দুঃখশোকে বিষণ্ণ অজ্ঞান অসুস্থকে, জ্ঞানের আলোকেও আরোগ্য করে তোলা। যে কথাটি গৌতমবুদ্ধ এবং তাঁর ধর্মের সারকথা। এই “থেরাপিউট” শব্দটি একটি ল্যাটিন শব্দ হলেও, এর “থেরা” শব্দটি বৌদ্ধদের প্রাচীনপন্থী “থেরবাদ” থেকেই হয়তো গ্রহণ করা হয়েছে। বৌদ্ধ অহর্ৎদের সঙ্ঘ-বাসের সময়, তাঁদের ভেষজ চিকিৎসারও যে চর্চা করতে হত, সে কথা আগেই বলেছি। যার ফলে পরবর্তীকালে “থেরাপিউটিক” (Theraputic) শব্দটি ডাক্তারি শাস্ত্রে চিকিৎসা এবং ওষুধকেও বোঝায়। থেরাপি (Therapy) শব্দটিও আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার নানান প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত – যেমন Physiotherapy, Psychotherapy ইত্যাদি।

আলেকজান্দ্রিয়া শহরের আশেপাশে এই ইহুদি থেরাপিউট গোষ্ঠীর মানুষেরা যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের থেকে প্রভাবিত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। থেরাপিউটরা বৌদ্ধ অর্হৎ বা ভিক্ষুদের মতোই শহরের বাইরে বাস করতেন। তাঁরা কুশের আসনে বসে ধ্যান করতেন। তাঁরা মদ্য ও মাংস খেতেন না এবং ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন স্বেচ্ছা-ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী এবং কোন কোন বিশেষ দিনে উপবাস করতেন। তাঁরা সাদা বস্ত্র পরতেন, এবং সকলে মিলে একসঙ্গে ধর্মকথা পাঠ কিংবা সুর করে শ্লোক উচ্চারণ করতেন। এমন অদ্ভূত আচরণের ধর্ম-সম্প্রদায়ের কথা, এর আগে মিশরে কেউ কোনোদিন দেখেনি এবং শোনেওনি।  

ইহুদি এসেনেস সম্প্রদায় বাস করতেন, ডেড সী (Dead Sea)-র পাড়ে পাহাড় কেটে বানানো কিছু গুহায়, প্রাচীন জেরিকো শহরের উল্টোদিকে। এই গুহাগুলি যে সময়ের, তার কিছুদিন আগেই ভারতের পশ্চিম উপকূলে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা গুহা-বিহারে থাকতে শুরু করেছিলেন এবং সেখানে চৈত্য বা স্তূপ নির্মাণ করে, নির্জনে ধ্যান করতে পছন্দ করতেন। বৌদ্ধদের মতো এসেনেস এবং থেরাপিউটরাও ছিলেন ব্রহ্মচর্য ব্রতধারী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়। শুধু প্যালেস্টাইন কেন, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কোন দেশে এবং কোন সংস্কৃতিতেই এমন অদ্ভূত সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। যাঁরা অত্যন্ত কম পরিমাণে নিরামিষ আহার করেন, মদ্যপান করেন না, যৌনজীবন ত্যাগ করেছেন, এবং ঈশ্বর-জ্ঞানের সন্ধানে, দিনের অধিকাংশ সময় নিবিষ্ট চিন্তা (meditation) করেন।

আলেকজান্দ্রিয়া শহরের এক প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন ফিলো (Philo)মার্কোটিস সাগরের তীরে কোন এক থেরাপিউট সঙ্ঘে তিনি কিছুদিন ছিলেন, তাঁর লেখা থেকে এই সকল তথ্য পাওয়া যায়। তিনি আরও লিখেছেন, জেরুজালেমের সলোমনের মন্দিরে তখন নিয়মিত পশুবলির প্রথা প্রচলিত ছিল, এসেনেস সম্প্রদায় এই প্রথার তীব্র বিরোধিতা করতেন। ইহুদিরা কোনদিনই মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। অতএব এসেনেস সম্প্রদায়ের ইহুদিরা মূর্তিপূজা সহ অ-ইহুদিদের কোন ধর্মীয় গোঁড়ামিই মানতেন না এবং এমনকি ইহুদি ধর্মের কিছু কিছু কঠোর নিয়মকেও অস্বীকার করতেন। যার ফলে সমসাময়িক প্রচলিত ধর্ম-বিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলি, এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক রাজন্যবর্গ, এসেনেসদের বিষ চোখে দেখতে শুরু করেন।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বহুদিন ধরেই বহু জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের সাক্ষী থেকেছে। এক সময়ের মিশর, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া সভ্যতা এবং পরবর্তী কালে পারস্য, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা। প্রত্যেকটি সভ্যতারই নিজস্ব ধর্ম দেব-দেবী, সংস্কার, উপাসনা, বিধিনিষেধ ছিল। তবে বিজয়ী রাজারা সাধারণতঃ বিজিত প্রজাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতেন না। অতএব রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ সীমার মধ্যে যেমন নানান জাতির বসবাস ছিল, তেমনই ছিল নানান ধর্মে বিশ্বাসীদের বিচিত্র আচরণ। এই ধর্মগুলির সবকটিতেই, বহু দেব-দেবীর মূর্তি (Polytheism) উপাসনার প্রচলন ছিল। এই উপাসনায় পুরোহিতদের প্রভাব ছিল অপরিসীম, কোন কোন সভ্যতায় রাজপুরোহিতের ক্ষমতা এবং প্রভাব রাজা বা সম্রাটের থেকে খুব কম ছিল না। ভারতের ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতদের মতোই তাঁরাও যজমান এবং সাধারণ ভক্ত জনগণের থেকে প্রচুর ধনসম্পদ উপহার পেতেন (বলা ভাল, আদায় করতেন) এবং এই ধরনের উপাসনায় পশুবলি আবশ্যিক ছিল। সম্রাট অশোক পশুহিংসা নিষিদ্ধ করে, ব্রাহ্মণদের যেমন বিদ্বিষ্ট করে তুলেছিলেন, এসেনেসরাও তেমনি এই পুরোহিত সম্প্রদায় এবং শাসকগোষ্ঠীরও চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন।

খ্রিষ্টিয় চতুর্থ শতকে, অখ্রিষ্টিয় (Non-Christian) এই সমস্ত ধর্মমতকে একত্রে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা “পেগান ধর্ম” (Paganism) বলতে শুরু করেছিলেন। ল্যাটিন ভাষায় “পেগানাস” শব্দের অর্থ – গ্রামের মানুষ, দেহাতি। অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের কাছে অখ্রিষ্টিয় ধর্মের মানুষরা – যাঁরা নেহাতই গ্রাম্য চাষাভুষো, তাঁরা অনেক দেবদেবীর মূর্তি পুজো করেন। পেগানিজমের প্রায় সমার্থক শব্দ “হিদেন” (heathen) – সাকারবাদী, ধর্মবোধহীন এবং বর্বর। যদিচ ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বহু মানুষ আবার পেগান ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন, তবে তাঁদের ধর্মবিশ্বাস এবং সংস্কার প্রাচীন পেগান ধর্ম থেকে অনেকটাই আলাদা এবং পরিবর্তিত। নতুন এই ধর্মের নাম – নব্য-পেগানধর্ম (Neo-Paganism)আমাদের আলোচ্য বিষয়ে নব্য-পেগান ধর্ম একান্তই অপ্রাসঙ্গিক, অতএব এসেনেসদের প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যাওয়া যাক।

এসেনেস সম্প্রদায় বৌদ্ধসঙ্ঘের মতোই দুইভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিলেন ব্রতধারী সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীরা। যাঁরা জেরিকোর আশেপাশে দুর্গম এবং বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের গুহায় ধর্মচর্চা করতেন, আর এক দিকে ছিলেন গ্রাম ও শহরের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ –গৃহীশিষ্যরা। গৃহীশিষ্যরা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই সংসার ধর্ম এবং কাজ কর্ম করতেন, তার সঙ্গে ধার্মিক, পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক জীবনেরও চর্চা করতেন। শোনা যায় যিশুর দীক্ষাগুরু জন (Baptist John) এসেনেস সম্প্রদায়ের নির্জনবাসী সন্ন্যাসী ছিলেন। এসেনেস সম্প্রদায়ে যোগ দেওয়ার সময় নবীন সন্ন্যাসীদের দীক্ষিত (baptized) করা হত। এই দীক্ষা দানের প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে, নবীন বৌদ্ধভিক্ষুদের সঙ্ঘে (৩.৩.২ অধ্যায়) অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যায়।

সালামিসের (কন্সট্যানসিয়া)-র সেন্ট এপিফেনিয়াস[1]-এর লেখা থেকে জানা যায়, এসেনেসদের নাজারিন, অথবা নাজারিনোও বলা হত। প্রাচীন ইজরায়েলে কিছু প্রাজ্ঞ মানুষকে নাজারাইটও বলা হত। এই নাজারাইটরা মন্দিরের উপাসনার সময় রক্তাক্ত বলি বা উৎসর্গের প্রথাকে তীব্র ধিক্কার এবং প্রতিবাদ করতেন। ফলতঃ মন্দিরের প্রাচীনপন্থী গোঁড়া পুরোহিতরা নাজারাইটদের রীতিমত ঘৃণা করতেন। তাঁরা তাঁদের ধর্মে বিশ্বাসী সকল মানুষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, দিনে অন্ততঃ তিনবার যেন ভগবানের কাছে সকলে প্রার্থনা করে, “হে ঈশ্বর, নাজারাইটদের ওপর আপনার চরম অভিশাপ বর্ষণ করুন”। অতএব নাজারিন এবং নাজারাইট সংঘগুলির প্রতি, সনাতনপন্থী পুরোহিতসম্প্রদায় এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক শাসকগোষ্ঠী তীব্র বিদ্বেষী হয়ে উঠছিলেন।

এরকম পরিস্থিতিতে, বি.সি.ই প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে, এসেনেস এবং নাজারিন পণ্ডিতেরা ভবিষ্যৎ গণনা করে দেখেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে আসছেন এক মহামানব। সেই মহামানবের নাম হবে যিশুখ্রিষ্ট - “খ্রিষ্ট” শব্দের অর্থ অভিষিক্ত; হিব্রু ভাষায় “মেশায়া” (Messiah) তাঁদের সকলের এই বিশ্বাস ছিল, এসেনেস ও নাজারিনতো বটেই, সমগ্র ইহুদি জাতিরই তিনিই হবেন পরিত্রাতা এবং (ধর্মীয়) রাজা। তাঁদের এই গোপন ও গভীর আনন্দের সংবাদ, দেশের রাজা, পুরোহিত সম্প্রদায় এবং প্রশাসনের কানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সে কথা আসবে পরবর্তী অধ্যায়ে।

 বাইবেলের সুসমাচারে জন বলেছেন, ক্রুসবিদ্ধ করার সময়, প্রধান বিচারক পিলেট[2] ভগবান যিশুর ক্রসে স্বাক্ষর করে লিখেছিলেন, “জেসাস, এক নাজারিন, ইহুদিদের এক রাজা (Jesus the Nazarene, the King of the Jews)”যদিও অনেকে ইংরিজিতে এর অনুবাদ করেছেন, “জেসাস অব নাজারেথ”, অর্থাৎ যিশু, নাজারেথ শহরের বাসিন্দা। কিন্তু গবেষণা করে দেখা গেছে, সে সময় নাজারেথ জায়গাটি একেবারেই গুরুত্বহীন জনপদ ছিল। ভগবান যিশুকে “নাজারেথ-শহরবাসী” এমন পরিচয় দেওয়ার কোন তাৎপর্যই খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং অন্যান্য অধিকাংশ ভাষার অনুবাদে যে, “জেসাস দা নাজারিন” বলা হয়েছে, অথবা নাজারাইট অর্থে “নাজারেথ” শব্দটির ব্যবহারই অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ ধর্মান্ধ প্রাচীনপন্থী রোমান ও অন্যান্য অ-ইহুদিয় ধর্মের উচ্চ সংসদের পক্ষে, ভগবান যিশুকে ঘৃণিত নাজারিন বা নাজারাইটদের নেতা হিসেবেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি ছিল। হয়তো শাসকগোষ্ঠীর ধারণা হয়েছিল, দলনেতাকে দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি দিলেই, নাজারিনদের বাকি সবাই ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।  

 

৪.১.২ ভগবান যিশুর শৈশবকাল

বাইবেলের নূতন বিধান (the New Testament)-এর মথি (Matthew) লিখিত সুসমাচার (Gospel)-এর দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেঃ-

২:১  রাজা হেরোদের সময়ে, যিহূদিয়ার বৈৎলেহমে যীশুর জন্ম হইলে পর, পূর্ব্বদেশ হইতে পণ্ডিতেরা যিরূশালেমে আসিয়া বলিলেন, যিহূদিদের নবজাত রাজা কোথায়?

২:২  কারণ আমরা তাঁহার তারাটি উদয়কালে দেখিয়া তাঁহাকে প্রণিপাত করিতে আসিয়াছি।

২:৩  ইহা শুনিয়া রাজা হেরোদ ও তাঁহার সহিত যিরূশালেমের সকল লোক, উদ্বিগ্ন হইল।

২:৪  তিনি প্রধান পুরোহিত ও লোকদের ধর্ম্মগুরু সকলকে একত্র করিয়া সেই খ্রিষ্ট কোথায় জন্মিবেন, তাঁহাদের কাছে জিজ্ঞাসা করিলেন।

২:৫  তাঁহারা তাঁহাকে বলিলেন, যিহূদিয়ার অন্তর্গত বৈৎলেহমে, কারণ ভাববাদী দ্বারা এই রূপ লেখা আছে,-

২:৬  ‘বৈৎলেহম, যিহূদা-ভূমি, তুমি যিহূদার শাসনকর্ত্তাদের মধ্যে কোন অংশে ক্ষুদ্রতম নও, কারণ তোমার মধ্য হইতে এমন একজন নেতা আসিবেন যিনি আমার জাতি ইস্রায়েলকে পরিচালনা করিবেন’।

২:৭  তখন হেরোদ পণ্ডিতদের গোপনে ডাকিয়া, তারাটি কোন সময়ে দেখা গিয়াছিল তাহা তাঁহাদের নিকট হইতে বিশেষ করিয়া জানিয়া লইলেন;

২:৮  তোমরা গিয়া শিশুটির বিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান কর এবং উদ্দেশ পাইলে আমাকে সংবাদ দিও, আমিও গিয়া যেন তাঁহাকে প্রণিপাত করিতে পারি, এই কথা বলিয়া তিনি বৈৎলেহমে তাঁহাদের পাঠাইয়া দিলেন।

২:৯  রাজার কথা শুনিয়া তাঁহারা চলিয়া গেলেন। আর যে তারাটি তাঁহারা উদয়কালে দেখিয়াছিলেন, তাহা তাঁহাদের অগ্রে অগ্রে, শিশুটি যেখানে ছিলেন সেই স্থানের উপরে আসিয়া স্থির হইয়া রহিল।

২:১০-১১  তারাটি দেখিয়া তাঁহারা অতিশয় আনন্দিত হইলেন এবং ঘরে প্রবেশ করিয়া শিশুটিকে তাঁহার মাতা মরিয়মের সঙ্গে দেখিতে পাইয়া, ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণিপাত করিলেন এবং আপনাদের পেটিকা খুলিয়া ‘স্বর্ণ, কুন্দুরু ও গন্ধরস’ তাঁহাকে উপহার দান করিলেন।

২:১২  পরে যেন হেরোদের নিকটে ফিরিয়া না যান, স্বপ্নে এই প্রত্যাদেশ পাইয়া তাঁহারা অন্য পথ দিয়া স্বদেশে চলিয়া গেলেন।

২:১৩   তাঁহারা চলিয়া গেলে পর, দেখ, প্রভুর এক দূত স্বপ্নে যোষেফকে দর্শন দিয়া বলিলেন, উঠ, শিশুটি ও তাঁহার মাতাকে লইয়া মিসরে পলায়ন কর; যত দিন আমি তোমাকে না বলিব, ততদিন সেইখানে থাক।

২:১৪   কারণ হেরোদ শিশুকে নাশ করিবার জন্য তাঁহার অন্বেষণে উদ্যত। তিনি উঠিয়া শিশু ও তাঁহার মাতাকে লইয়া রাত্রিযোগে মিসরে চলিয়া গেলেন।

২:১৫   এবং হেরোদের মৃত্যু পর্য্যন্ত সেখানে থাকিলেন; তাহাতে ভাববাদী দ্বারা প্রভু যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা পূর্ণ হইল, - ‘আমি মিসর হইতে আমার পুত্রকে ডাকিয়া আনিলাম’।

২:১৬   পণ্ডিতেরা তাঁহাকে তুচ্ছ করিয়াছেন দেখিয়া হেরোদ অত্যন্ত উত্তেজিত হইলেন এবং তাঁহাদের নিকট যে সময়ের কথা বিশেষ করিয়া জানিয়া লইয়াছিলেন, সেই অনুসারে দুই বৎসর ও তাহার কম বয়সের যত বালক বৈৎলেহম ও তাহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছিল, তিনি লোক পাঠাইয়া তাহাদের সকলকে হত্যা করাইলেন।

২:১৭  তখন যে কথা ভাববাদী যিরমেয়ের দ্বারা কথিত হইয়াছিল তাহা পূর্ণ হইল, -

২:১৮  ‘রামা পল্লিতে ধ্বনিত এক রব শোনা গেল, ক্রন্দন ও তীব্র বিলাপ। রাহেল আপন সন্তানদের জন্য রোদন করিতেছেন, সান্ত্বনা প্রাপ্ত হইতে চান না, কারণ তাহারা আর নাই’।

২:১৯  হেরোদের মৃত্যু হইলে পর প্রভুর দূত মিসরে যোষেফকে স্বপ্নে দর্শন দিয়া বলিলেন,

২:২০  উঠ, শিশুটি ও তাঁহার মাতাকে লইয়া ইস্রায়েলের দেশে চল, কারণ যাহারা শিশুর প্রাণনাশের চেষ্টা করিতেছিল, তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে।

২:২১   তিনি উঠিয়া শিশু ও তাঁহার মাতাকে লইয়া ইস্রায়েলের দেশে আসিলেন।

২:২২  কিন্তু আর্খিলায় আপন পিতা হেরোদের স্থলে যিহূদিয়াতে রাজত্ব করিতেছেন শুনিয়া সেখানে যাইতে ভয় করিলেন। স্বপ্নে প্রত্যাদেশ পাইয়া তিনি গালীল প্রদেশে চলিয়া গেলেন,

২:২৩  আর নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বাস করিলেন; যেন ভাববাদীদের কথা পূর্ণ হয়, তিনি নাসরীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।

(ধর্মপুস্তক–নূতন নিয়মের (The Holy Bible – Bengali – The Bible Society of India, Bangalore) প্রথম অধ্যায় থেকে উদ্ধৃত। (বানান অপরিবর্তিত)

খ্রিষ্টিয় ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের অধ্যায়গুলিকে গসপেল (gospel) বলে, শব্দটির সাধারণ অর্থ “সুসমাচার” অর্থাৎ শুভ সংবাদ। বাইবেলের “নূতন বিধান” (New Testament)-এ যে চার জন সন্ন্যাসীর (Saints) সুসমাচার পাওয়া যায়, তাঁরা হলেন সেন্ট ম্যাথিউ (Matthew) (ম্যাথিউ বাংলা অনুবাদে মথি হয়েছেন!), সেন্ট মার্ক (Mark), সেন্ট লিউক (Luke) এবং সেন্ট জন (John)উপরে যে অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে, সেটি সেন্ট ম্যাথিউ-এর সুসমাচারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথমাংশ।

সেন্ট ম্যাথিউ-এর প্রথম অধ্যায় থেকে যিশুর জন্ম এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে যিশুর শৈশবের বিশেষ কিছু ঘটনা জানতে পারা যায়। যেমন, জুডিয়া (যিহূদিয়া; Judea)-র বেথলেহেমে যিশুর যখন জন্ম হল, তখন সেখানকার রাজা ছিলেন হেরড। সে সময়ে তিনজন পূর্বদেশের প্রাজ্ঞমানুষ জেরুজালেম শহরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ইহুদিদের রাজার কোথায় জন্ম হয়েছে? আমরা তাঁর তারা (star) পূর্বদিকে দেখেছি। আমরা দেখা করে, তাঁর পূজা করতে চাই”। এ কথা শুনে রাজা হেরড এবং জেরুজালেমের নাগরিকরা খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। রাজা হেরড তাঁর প্রধান পুরোহিত এবং ধর্মগুরুদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই খ্রিষ্ট কোথায় জন্মাবে”? তাঁরা রাজাকে বললেন, “জুডিয়ার বেথলেহেমে। কারণ ভবিষ্যদ্বক্তারা (ভাববাদী – Prophet, যাঁদের মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছার কথা ও নির্দেশ ব্যক্ত করেন) লিখে গেছেন, ‘হে জুডিয়া ভূমির বেথলেহেম, আপনি কোন রাজকুমারের থেকে কম নন, কারণ আপনার ভূমিতে এমন একজন নেতা আবির্ভূত হবেন, যিনি আমার ইজরায়েলের মানুষদের শাসন করবেন’”।  রাজা হেরড কী করে জানলেন, “খ্রিষ্ট” বলে কেউ জন্মগ্রহণ করবেন? আগেই বলেছি, এসেনেস বা নাজারিন সম্প্রদায়ের প্রাজ্ঞলোকেরা যিশুর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিলেন, সেটি রাজা এবং পুরোহিত সম্প্রদায়ের অগোচর ছিল না।

যাই হোক, পুরোহিতদের কথা শুনে হেরড পূর্বদেশের তিন পণ্ডিতকে ডেকে খুঁটিয়ে জেনে নিলেন, তাঁরা ওই শিশুর তারাটি কতদিন আগে, কোথায় দেখেছেন। তারপর তাঁদের বললেন বেথলেহেমে গিয়ে খোঁজ করতে এবং শিশুর দেখা পেলে তাঁকে জানিয়ে যেতে, যাতে তিনিও গিয়ে শিশুকে প্রণাম জানাতে পারেন। রাজার কথা শুনে তিন পণ্ডিত বেথলেহেমে গেলেন এবং সেই শুভ তারা তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল শিশু যিশুর বাড়িতে, সেখানেই সেই তারা স্থির হয়ে রইল! মাতা মেরির কোলে যিশুকে দেখে তিন পূর্বদেশীয় পণ্ডিত ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন, তারপর তিনজনেই শিশুকে তিনটি উপহার দিলেন। তারপর দেবতার নির্দেশে তাঁরা রাজা হেরডের সঙ্গে দেখা না করে, অন্য পথে ফিরে গেলেন।

যে তারাটির ভরসায় তিনজন প্রাচ্যের পণ্ডিত সুদূর পথ পার হয়ে শিশু যিশুকে দেখতে গিয়েছিলেন, সেটি কী বাস্তব, নাকি কোন পৌরাণিক গল্পকথা? পুরোটাই গল্পকথা নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের গভীর গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ওই সময়ে একটি দুর্লভ গ্রহ-সংযোগের সন্ধান পেয়েছেন। ৭ বি.সি.ই-তে বৃহষ্পতি এবং শনি গ্রহদুটি একই সঙ্গে মীনরাশিতে অবস্থান করছিল এবং ওই বছরের ২৯শে মে, শনি ও বৃহষ্পতি প্রায় সমরেখায় (মাত্র ১০ কৌণিক দূরত্ব) চলে এসেছিল। এমন ঘটনা ওই বছরে আরও দুবার ঘটেছিল, ৩রা অক্টোবর আর ৫ই ডিসেম্বর। ওই তিনটি দিনে গ্রহ দুটি অস্বভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং সূর্যাস্তের পর যুগ্ম-তারা হয়ে পূর্বদিকে উদয় হত, সূর্যোদয়ের আগেই পশ্চিমে অস্ত যেত। পণ্ডিতেরা বলেন, এই দুই গ্রহ ও মীনরাশির সংযোগ ৭৯৪ বছর অন্তর ঘটে থাকে।

যদিও তারাটি পণ্ডিতদের আগে আগে গিয়ে যিশুর গৃহের সন্ধান নির্দেশ এবং তাঁর ঘরের ওপর “স্থির হয়ে” থাকা ব্যাপারটা, অবশ্যই কাল্পনিক। বিশেষ সেই তারাটি যখন তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়েই যাচ্ছিল, তাহলে পূর্বের পণ্ডিতরা খামোখা রাজা হেরডকে জিজ্ঞাসা করতে গেলেন কেন? বেথলেহেমের অন্যান্য সমবয়সী শিশুদের অনর্থক বিপদে ফেলতে

রোম সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ, জুডিয়ার রাজা হেরডের রাজত্বকাল ৩৭ বি.সি.ই-তে শুরু হয়েছিলে এবং তাঁর মৃত্যু হয় ৪ বি.সি.ই-তে। জুডাইজ্‌ম্‌ ধর্মে বিশ্বাসী রাজা হেরড বিপথগামী ইহুদি অর্থাৎ এসেনেস বা নাজারিনদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষী ছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, সঠিক সন্ধান পেলে, ইহুদিদের ভবিষ্যৎ-রাজা শিশু যিশুখ্রিষ্টকে তিনি হত্যা করবেন। কিন্তু প্রাচ্যের পণ্ডিতেরা শিশু যীশুর সঙ্গে দেখা করার পর, তাঁর সঙ্গে দেখা না করাতে, হেরড ভয়ংকর রেগে উঠলেন। তিনি প্রাচ্য পণ্ডিতদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেথলেহেম এবং তার আশপাশ অঞ্চলের সমস্ত দু’বছর বা তার কমবয়সী ইহুদি শিশুদের হত্যার আদেশ দিলেন। এই বিপদের আঁচ করে, আগে থেকেই দেবতারা (নাকি নাজারিন বা নাজারাইট প্রাজ্ঞ মানুষরা?) যিশু ও তাঁর মাতা-পিতাকে মিশরে গিয়ে আত্মগোপন করতে বলেছিলেন।

কিছুদিনের মধ্যেই হেরডের মৃত্যুর পর তাঁরা ইজরায়েলে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু জুডিয়ার সিংহাসনে হেরডের পুত্র আর্কিলিয়স রাজা হওয়াতে তাঁরা সেখানেও নিজেদের নিরাপদ মনে করলেন না। তাঁরা গালীল প্রদেশে চলে গেলেন। সেখানে “নাসরৎ” - নাজারেথ শহরে বাস করতে লাগলেন এবং সেখানকার প্রাজ্ঞ মানুষরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে “নাজারিন” বলেই সম্বোধন করতেন।

বাইবেলের উল্লেখ এবং রাজা হেরড ও তাঁর পুত্র আর্কিলিয়সের রাজত্বকালের হিসেব কষে, বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভগবান যিশুর জন্ম হয়েছিল ৭ বি.সি.ই-র কাছাকাছি। তাঁর প্রাণ সংশয়ের ভয়ে, আর্কিলিয়সের রাজত্ব কাল ৬ সি.ই. পর্যন্ত নাজারিনরা বালক যিশুকে তাঁদের কোন সঙ্ঘে বা মঠে গোপনে রেখে দিয়েছিলেন - অর্থাৎ ভগবান যিশুর তের বছর বয়স পর্যন্ত। এর পরে ভগবান যিশুর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায় না। তাঁকে ইজরায়েলে আবার দেখা গিয়েছিল, যখন তাঁর বয়স ঊনত্রিশ বা তিরিশ বছর। এই ষোলো-সতের বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন? প্রায় এক হাজার নশো বছর ধরে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সে উত্তর অকস্মাৎ অবিশ্বাস্যভাবে পাওয়া গেল ইজরায়েল থেকে বহুদূরের এক গ্রন্থাগারের তথ্যভাণ্ডার থেকে!

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/২ "



[1] সালামিস (বা কন্সট্যানসিয়া)-এর এপিফেনিয়াস (Epiphanius of Salamis or Constantia) সি.ই. চতুর্থ শতাব্দীতে সাইপ্রাসের সালামি শহরের বিশপ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেন্ট হন এবং সমস্ত অর্থডক্স ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের পিতা বলে গণ্য হতেন।

[2] বাইবেল অনুযায়ী জুডিয়ার রোমান প্রশাসন-প্রধান (Governor) পন্টিয়াস পিলেট (Pontius Pilate) (২৬-৩৭ সি.ই.) ছিলেন ভগবান যিশুর বিচারসভার প্রধান বিচারক।

 


মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬

নতুন চাল

 এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "








অন্যদিন সন্ধে ছটায় ছুটি হলেও, শনিবার আমাদের আপিসে হাফ-ছুটি। মানে বিকেল চারটে নাগাদ ঝাঁপ পড়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুঘন্টার তফাতে পুরো দিনের মধ্যে কেন হাফ-ছুটি বলা হয়, আজ পর্যন্ত  বুঝিনি। তবে ওই দিন চারটে নাগাদ আপিস থেকে বেরিয়ে যে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি – সে কথাটা সত্যি। সেদিক থেকে দেখলে কথাটা হাঁফ-ছুটি অর্থাৎ হাঁফ নেওয়ার ছুটি বলাটাই বেশ যুক্তিযুক্ত। সে যাগ্‌গে, আসল কথায় আসি।

এই শনিবার আড়াইটে নাগাদ আমরা তিনজন শীদ্দার চেম্বারে গেলাম একটা আরজি নিয়ে। শীদ্দা, মানে শীতাংশুদা আমাদের কোঅর্ডিনেটর, অর্থাৎ ইমিজিয়েট বস। তিনজনের মধ্যে আমিই নাটের গুরু, তাই চেম্বারে ঢুকে বললাম, “শীদ্দা, আজকে একটু আগে ছেড়ে দেবেন – এই সোয়া তিনটে নাগাদ? আমরা তিনজন নবান্নে যাবো”।

রীতিমতো চমকে উঠে শীদ্দা বলল, “তার মানে? এসব হুজুগ তোদের মাথায় কে ঢোকালো? নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারতে চলেছিস – এ আমি বলে দিলাম...। ছুটির তো কোন প্রশ্নই নেই – বরং অফিস কেটে তোরা নবান্ন যাওয়ার হিড়িক তুলেছিস বলে, আমি হেড-অফিসে কমপ্লেন করব। সুখে থাকতে তোদের ভূতে কিলোয় না?”

নবান্নে যাওয়ার কথায় শীদ্দার কেন এত আপত্তি, আমাদের মাথায় ঢুকল না। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে – আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। শীদ্দা আবার বলল, “আর যদি যেতেই হয়, আজকের দিনের জন্যে ব্যাকডেটে ছুটির দরখাস্ত কর – তিনজনেই। তারপর যেখানে খুশি যা, যা খুশি কর - নবান্ন গিয়ে টিয়ার গ্যাস খা, পুলিশের লাঠির বাড়ি খা, জেলে যা – অফিসের কিচ্ছু যাবে আসবে না। পুলিশ ইনভেস্টিগেট করতে এলে বলব, “তোরা আজ ছুটিতে – ছুটির দিনে কোন এমপ্লয়ি কোথায় কোন অভিযান করছে, তার দায় অফিসের নয়...”।

আমাদের মধ্যে নীলু, মানে নীলকান্ত একটু একরোখা ধরনের। রেগে গেলে বসকেও দু কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না। একটু রাগী স্বরে বলল, “শীদ্দা, আপনি কোন নবান্নের কথা বলছেন? আমরা যাব বিজনের গ্রামের বাড়ি...। ওদের ওখানে এই অঘ্রাণের শেষে নতুন ধান ওঠা শুরু হয় – নতুন ধান দিয়ে নবান্ন পুজো হয় – নতুন চালের পিঠে-পুলি পায়েস হয়...। সেখানে টিয়ার গ্যাস খাওয়ার কথা আসছে কোথা থেকে? পুলিশের লাঠিই বা খেতে যাবো কোন দুঃখে?”

এবার শীদ্দার অবাক হবার পালা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে বললেন, “বিজন, তোদের গ্রামের বাড়ি কোথায়?”

“গঙ্গার ওপাড়ে...”।

“কিন্তু গঙ্গার ওপাড়েই তো নবান্ন...”।

আমি এতটুকু আমতা-আমতা না করে, দৃঢ় স্বরে বললাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, শীদ্দা - গঙ্গার ওপাড়েই আমতায় আমাদের গ্রামের বাড়ি। এসপ্ল্যানেড থেকে চারটে নাগাদ একটা বাস আছে, সেটা ধরতে পারলে বাড়ি পৌঁছে যাবে সন্ধ্যে নাগাদ। কাল রোববারটা থেকে, সোমবার সকালে আমরা তিনজন সরাসরি অফিসে আসব। তবে সেদিন আসতে একটু দেরি হবে, এই ধরুন এগারোটা...। সেটা বলতে আর পারমিশান নিতেই আপনার কাছে আসা...”।    

শীদ্দা কিছু বলল না, হতবাক মুখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। একটু পরে আমি আরও বললাম, “সেখানে সব বাড়িতেই এখন নবান্ন উৎসব শুরু হয়েছে। আর শুধু আমাদের ওদিকেই বা কেন? গঙ্গার দুপাড়ের গ্রামে গ্রামে – হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতেই এখন চলছে নবান্ন উৎসব – ঘরে ঘরে নতুন চালের সুবাস। সে চাল এক্কেবারে সেকুলার চাল, শীদ্দা। এই নবান্নে অন্য কোন চাল চলেই না...”।

 --০০— 

এর পরের বড়োদের গল্প - " একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা "

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...