বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/২

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের প্রথম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৪/১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

দ্বিতীয় পর্বাংশ 

৪.১.৩  যিশুর জীবনের অজানা সেই ষোলোটি বছর

১৮৯০ সালে এক রাশিয়ান পর্যটক ও সাংবাদিক মিঃ নিকোলাস নোটোভিচ ফরাসী ভাষায় একটি বিতর্কিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, সেই বইটি ইংরিজিতে অনূদিত হয়েছিল, নাম “দি আননোন লাইফ অফ জেসাস ক্রাইস্ট”। সেই বইতে মিঃ নোটোভিচ বর্ণনা করেছেন, উত্তরপশ্চিম ভারত ভ্রমণের সময়, তিনি লাদাখের লে শহর থেকে ৪৫ কিমি দূরের হিমিগুম্ফায় (Hemis Monastery) বেড়াতে গিয়েছিলেন। গুম্ফা থেকে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় – ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে - তাঁর পা ভেঙে যাওয়ার কারণে তাঁকে প্রায় দেড় মাস ওই গুম্ফাতেই ফিরে গিয়ে, চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল। সেই সময়ে গুম্ফার প্রধান লামাজীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রধান লামাজীর সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনায় তিনি জানতে পারেন, ওই গুম্ফায় এমন কিছু স্ক্রোল[1] আছে, যাতে “ইশা”-র (বৌদ্ধ গ্রন্থে তো বটেই ভারতীয় পরম্পরায়ও যিশুকে “ইশা” বলা হয়) জীবনের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। হিমিগুম্ফার স্ক্রোলগুলি তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ এবং মূল স্ক্রোলগুলি পালি ভাষায় রচিত। বহু বছর আগে মূল স্ক্রোলগুলি ভারত থেকে নেপালে এসেছিল, সেখান থেকে এসেছিল তিব্বতের লাসায়, এখনও সেখানেই আছে।

হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজীর উক্তি উল্লেখ করে নোটোভিচ লিখেছেন, “বৌদ্ধদের কাছে ঈশা একটি অত্যন্ত সম্মানীয় নাম। যদিও তাঁর কথা শুধু প্রধান লামারাই জানেন, যাঁরা ঈশার সম্পর্কে ওই স্ক্রোলগুলি পড়েছেন। যুগে যুগে ঈশার মতো অসংখ্য বুদ্ধ পৃথিবীতে এসেছেন, তাঁদের সকলের কথাই লেখা আছে ৮৪,০০০ স্ক্রোলে! আমাদের গুম্ফাতেও সেই সব স্ক্রোলের অনুবাদ বেশ কিছু রয়েছে, যেগুলি আমি অবসর সময়ে পড়ে থাকি। সেখানে ঈশা-বুদ্ধের কথাও আছে, যিনি ভারতে এবং ইজরায়েলে তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন”।

নোটোভিচের অনুরোধে হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজী, ঈশা-বুদ্ধের স্ক্রোল থেকে কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং নোটোভিচ তাঁর তিব্বতী দোভাষীর মাধ্যমে সেগুলি নিজের মতো লিখে নিয়েছিলেন। নোটোভিচ তাঁর উল্লিখিত বইখানিতে তাঁর ভারতভ্রমণের বিস্তারিত বর্ণনা এবং হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজীর পাঠ করা ওই স্ক্রোলের অংশগুলি প্রকাশ করেছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রন্থ প্রকাশে পশ্চিমের খ্রিষ্টিয় মহলে তুমুল বিতর্ক ও আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। নোটোভিচের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে, ইওরোপের বেশ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি এর পরে হিমিগুম্ফায় গিয়েছিলেন। তাঁরা ফিরে এসে, বিবৃতি দিয়েছিলেন, মিঃ নোটোভিচ হিমিগুম্ফাতে নাকি কোনদিনই যাননি, এবং প্রধান লামাজী নোটোভিচ নামের কোন লোককে নাকি চেনেনই না। অতএব তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন নোটোভিচ একজন মিথ্যাবাদী এবং তাঁর তথ্যগুলি সবই বানিয়ে তোলা (fabricated)!

বেলুড় মঠের সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্বামী অভেদানন্দ ১৯২২ সালে কাশ্মীর ও তিব্বত ভ্রমণে যান এবং ভ্রমণের সময় তিনি হিমিগুম্ফাতেও গিয়েছিলেন। হিমিগুম্ফা সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কৌতূহলের কারণ, তার আগে আমেরিকায় থাকাকালীন তিনি নোটোভিচের গ্রন্থটি পড়েছিলেন এবং এই গ্রন্থ নিয়ে যাবতীয় বিতর্ক ও সমালোচনা সম্পর্কেও তিনি অবহিত ছিলেন। স্বামীজী হিমিগুম্ফার লামাজীদের সঙ্গে মিঃ নোটোভিচ এবং তাঁর লেখা সম্পর্কে আলোচনা করে জেনেছিলেন, মিঃ নোটোভিচের ঘটনা এবং তথ্যসমূহ সম্পূর্ণ সত্য। তিনি গুম্ফার লামাজীদের কাছে স্ক্রোলগুলি দেখতে চাইলে, তাঁকেও দেখানো হয়েছিল। লামাজীরা তাঁকেও বলেছিলেন, হিমিগুম্ফার স্ক্রোলগুলি মূল স্ক্রোলের তিব্বতী নকল, মূল পালিভাষার স্ক্রোলগুলি আছে লাসার কাছে মারবুর অঞ্চলের এক গুম্ফায়। যিশু সম্পর্কিত মূল স্ক্রোলগুলিতে চোদ্দটি পরিচ্ছেদ আছে এবং তাতে মোট ২২৪টি শ্লোক আছে। স্বামিজী তাঁর দোভাষীর সাহায্যে এই শ্লোকগুলির কিছু অংশ অনুবাদ করে এনেছিলেন, তার নির্বাচিত কয়েকটিঃ-

পরিচ্ছেদ ৪

১০. “ক্রমে ঈশা ত্রয়োদশ বৎসরে পদার্পণ করিলেন। এই বয়েসে ইজরায়েলের জাতীয় প্রথানুযায়ী বিবাহ-বন্ধনে[2] আবদ্ধ হয়। তাঁহার পিতামাতা সামান্য গৃহস্থের ন্যায় দিন যাপন করিতেন”।

১২. “ঈশা বিবাহ করিতে নারাজ ছিলেন। তিনি ইতঃপূর্বেই বিধাতৃ-পুরুষের স্বরূপ ব্যাখ্যায় খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। বিবাহের কথায় তিনি গোপনে পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করিতে সংকল্প করিলেন”।

১৪. “তিনি জেরুজালেম পরিত্যাগ করিয়া একদল সওদাগরের সঙ্গে সিন্ধুদেশ অভিমুখে রওনা হইলেন। উহারা সেখান হইতে মাল লইয়া যাইয়া দেশ-বিদেশে রপ্তানি করিত”।

পরিচ্ছেদ ৫

১. “তিনি চৌদ্দ বৎসর বয়সে উত্তর সিন্ধুদেশ অতিক্রম করতঃ পবিত্র আর্যভূমিতে আগমন করিলেন”।

৪. “তিনি ক্রমে ব্যাস-কৃষ্ণের লীলাভূমি জগন্নাথধামে উপনীত হইলেন এবং ব্রাহ্মণগণের শিষ্যত্ব লাভ করিলেন। তিনি সকলের প্রিয় হইলেন এবং সেখানে বেদ পাঠ করিতে, বুঝিতে ও ব্যাখ্যা করিতে শিক্ষা করিতে লাগিলেন।

(অভেদানন্দ স্বামীজীর “কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।)

শ্রদ্ধেয় স্বামীজীকে লামাজী আরও বলেছিলেন, যিশুখ্রিষ্ট পুনরুত্থানের (Resurrection) পর গোপনে কাশ্মীর চলে এসেছিলেন এবং সঙ্ঘ নির্মাণ করে, বহু শিষ্য সহ আমৃত্যু (অবশ্যই স্বাভাবিক মৃত্যু) সেখানেই ছিলেন। যিশুর মৃত্যুর তিন-চার বছর পর পালি ভাষায় এই স্ক্রোলগুলি লেখা হয়েছিল।

এবার নোটোভিচের লেখা থেকে ভগবান যিশুর ভারতবাসের কিছু ঘটনা দেখে নেওয়া যাক, -

পরিচ্ছেদ ৫

৫. তিনি জগন্নাথ, রাজগৃহ, বেনারস এবং অন্যান্য তীর্থে ছ’ বছর কাটিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ ঈশাকে ভালোবাসত, কারণ তিনি বৈশ্য এবং শূদ্রদের সঙ্গে শান্তিতে বাস করতেন, তাদের পবিত্র শাস্ত্র শেখাতেন।

৬. কিন্তু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা তাঁকে বলেছিলেন, তারা নিষিদ্ধ, কারণ তাদের সৃষ্টি হয়েছে পর-ব্রহ্মের উদর এবং পদতল থেকে।

৭. বৈশ্যরা বেদমন্ত্র শুধু শুনতে পারে, তাও বিশেষ কোন পর্বের দিনে এবং

৮. শূদ্রদের বেদপাঠের স্থানে উপস্থিত থাকা, এমনকি দেখাও নিষিদ্ধ, কারণ তারা আজীবন দাসত্বে পতিত, তারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, এমনকি বৈশ্যদেরও ক্রীতদাস।

৯. “একমাত্র মৃত্যুই তাদের এই দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে”, পর-ব্রহ্ম বললেন, “অতএব ওদের ত্যাগ করো, এবং আমাদের সঙ্গে দেবতাদের উপাসনা কর, তাঁকে অমান্য করে নিজের প্রতি তাঁদের ক্রুদ্ধ করে তুলো না”।

১০. কিন্তু ঈশা, তাঁদের কথা অমান্য করেই শূদ্রদের সঙ্গে রইলেন, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে প্রচার করতে লাগলেন।

১১. সাথী-মানুষদের মানবিক ও আধ্যাত্মিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, কিছু মানুষের এই উদ্ধত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে উঠলেন। “নিশ্চিতভাবেই (verily)”, তিনি বললেন, “ঈশ্বর তাঁর সন্তানদের মধ্যে কোন বিভেদ রাখেননি, তাঁর কাছে সকলেই সমান প্রিয়”।

১৩. “ঈশ্বর তোমার প্রভু, তাঁকে ভয় করো, তাঁর সামনে নতজানু হও এবং তোমার উপার্জনের উপহার তাঁকে সমর্পণ করো”।

১৪. ঈশা ত্রিমূর্তি এবং পর-ব্রহ্মের অবতার - বিষ্ণু, শিব এবং অন্যান্য দেবতাদের অস্বীকার করলেন, “কারণ”, তিনি বললেন,

১৫. “শাশ্বত বিচারক, শাশ্বত আত্মার মধ্যেই এই জগতের অনন্য এবং অভিন্ন আত্মা বিরাজ করছেন, এবং একমাত্র সেই আত্মাই সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সকলের মধ্যে নিহিত থেকে প্রাণ সঞ্চার করেন”।

পরিচ্ছেদ ছয়

১. শ্বেতবসন পুরোহিত এবং যোদ্ধারা[3] যখন শূদ্রদের প্রতি ঈশার এই উপদেশের কথা জানল, তারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল এবং তরুণ এই শিক্ষককে খুঁজে বের করে হত্যা করতে পাঠালো তাদের অনুচরদের।

২. কিন্তু শূদ্ররা তাঁকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়ায়, ঈশা রাত্রেই জগন্নাথ ভূমি ছেড়ে পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন এবং “গৌতমাইড” (Gautamides)[4] -এর দেশে অবস্থান করতে লাগলেন, যেখানে মহান বুদ্ধ শাক্য-মুনির আবির্ভাব হয়েছিল এবং (যে দেশের) মানুষরা একমাত্র মহিমময় ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে।

৩. ঈশা যখন পালি ভাষা শিখে ফেললেন, তিনি পবিত্র সূত্রগুলির স্ক্রোল পাঠে মনোনিবেশ করলেন।

৪. ছ’বছর গভীর চর্চার পর, ঈশা, যাঁকে বুদ্ধ তাঁর পবিত্র বাণী প্রচারের জন্য নির্বাচিত করেছেন, পবিত্র স্ক্রোলগুলির নিখুঁতব্যাখ্যা করতে পারতেন।

৫. এরপর তিনি নেপাল এবং হিমালয় ছেড়ে রাজপুতানার উপত্যকায় নেমে গেলেন এবং পশ্চিমে যাত্রা শুরু করলেন।

(“The Unknown Life of Jesus Christ” – গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, বাংলা অনুবাদ – লেখক)

অতএব দেখা যাচ্ছে, ভগবান যিশুর ভারতবাস যথেষ্ট ঘটনাবহুল। ইজরায়েলের আগেই, তিনি ধর্মপ্রচারের সূচনা করেছিলেন এই ভারতেই, অন্ততঃ বৈশ্য এবং শূদ্র বর্ণের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষদের মধ্যে। এবং তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে যাওয়াতে এদেশেও তাঁর প্রাণনাশের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর নিজের দেশেই হোক অথবা ভারতে, সব দেশেই পুরোহিত সম্প্রদায় এবং রাজন্যবর্গদের চরিত্র যে একই, ধার্মিক ভারতে এসে অন্ততঃ এটুকু স্পষ্ট উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল।

ভগবান যিশুর ভারতে ধর্মপ্রচারের আরেকটি প্রচলিত ধারণার উল্লেখ করেছেন শ্রদ্ধেয় অভেদানন্দ স্বামীজি, তাঁর “কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থে। বাংলার রাজনৈতিক নেতা শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল “প্রবাসী” পত্রিকায় তাঁর লেখা কোন এক প্রবন্ধে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে শোনা যে কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন, সেটি এরকমঃ-

পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয়ের মুখে একদিন শুনিয়াছিলাম যে, তিনি একবার একদল যোগী-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আরাবল্লী পর্বতে গিয়াছিলেন। এই সম্প্রদায়ের যোগীদের “নাথ” উপাধি ছিল। ইঁহারা “নাথযোগী” বলিয়া নিজেদের পরিচয় দিতেন। ইঁহাদের সম্প্রদায়-প্রবর্তকদিগের মধ্যে “ইশাই নাথ” নামে এক মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁহার জীবনী এই নাথযোগীদের ধর্মপুস্তকে লেখা আছে। গোস্বামী মহাশয়কে একজন নাথযোগী তাঁহাদের ধর্মগ্রন্থ হইতে ঈশাই নাথের জীবনচরিত পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন। খৃষ্টানদের বাইবেলে যীশুখৃষ্টের জীবনচরিত যে ভাবে পাওয়া যায়, ঈশাই নাথের জীবনচরিত মোটের উপর তাহাই”।

ইহার উপরে বিপিনবাবু এইরূপ মন্তব্য করেনঃ “বাইবেলে যীশুর যে জীবন-ইতিহাস পাওয়া যায়, তাহাতে দ্বাদশ হইতে ত্রিংশৎ বর্ষ পর্যন্ত এই আঠারো বৎসরের যীশুর জীবনের কোন খোঁজ-খবর মিলে না। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, এই সময়ের মধ্যে যীশু ভারতবর্ষে আসিয়াছিলেন এবং তিনিই নাথ যোগী সম্প্রদায়ের এই ঈশাই নাথ”। (“কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত - বানান অপরিবর্তিত।)

ভগবান যিশুর ক্রুশবিদ্ধ (Crucifixion) হয়ে (আপাত) মৃত্যু হয়েছিল ৩০ থেকে ৩৩ সি.ই.-র মধ্যে। অতএব বাইবেলের নূতন-বিধান লেখার সময় রোম সম্রাট বা রাজার থেকে তাঁর প্রাণসংশয়ের কোন আশঙ্কা থাকতে পারে না। কিন্তু বাইবেলের নূতন-বিধান যখন লেখা হয় (৫০ থেকে ১০০ সি.ই.-র কোন সময়ে) ইহুদিদের রাজা এবং পরিত্রাতা যিশুর তের থেকে ঊনত্রিশ – ষোলো বছরের ইতিহাস হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই গোপন করা হয়েছিল। কেন, তার স্পষ্ট কোন উত্তর পাওয়া যায় না। হয়তো নূতন-বিধান লেখার সময় সন্ন্যাসী ম্যাথিউ, লিউক, মার্ক এবং জন জানতেন ভগবান যিশু তখনও সুস্থ অবস্থাতেই জীবিত এবং রয়েছেন ভারতবর্ষের কাশ্মীরে। সেক্ষেত্রে সত্য ঘটনা প্রকাশ করে, তাঁরা ভগবান যিশুর বিপদ বাড়াতে চাননি।

খ্রিষ্টধর্মে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব কতটা কিংবা আদৌ ছিল কি না, এই বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়। সেই বিষয়ে বহু পণ্ডিতের বহু গ্রন্থ প্রচলিত রয়েছে। এই গ্রন্থে এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ, বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শনের আন্তর্জাতিকতা। সম্রাট অশোকের সময়েই সিংহল, বার্মা, শ্যাম, কম্বোজ, সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছিল সে কথা আগেই বলেছি। উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল, যিশুখ্রীষ্টের জন্মের প্রায় দুশ বছর আগে থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও “পেগান” ধর্ম বিরোধী, দুটি ইহুদি ধর্মগোষ্ঠীর – থেরাপিউট এবং এসেনেস বা নাজারিন - সৃষ্টি হয়েছিল, স্পষ্টতঃ বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে। এরপর পরবর্তী কয়েকশ বছরে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন, খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতকে চীন, খ্রীষ্টাব্দ চতুর্থ শতকে কোরিয়া, খ্রিষ্টিয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে ফরমোসা ও মঙ্গোলিয়া, খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে জাপান এবং তিব্বত। বৌদ্ধধর্মের এই আন্তর্জাতিকতা ভারতীয় সংস্কৃতি, স্থাপত্য, শিল্প এবং বিজ্ঞানকে কতটা প্রভাবিত করেছিল সে কথা আলোচনা করা যাবে পরবর্তী পর্যায়ে।



[1] স্ক্রোল (scroll) – এক ধরনের কাগজের ওপর লেখা পুঁথি, যেগুলি পাকিয়ে গোল করে রাখা হয়। আজকাল জ্যোতিষীরা কুষ্ঠীর কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট দেন A4 কাগজে, কিন্তু কিছুদিন আগেও জাতকের কুষ্ঠি বা ঠিকুজি লেখা হত হলুদ রঙের বিশেষ কাগজের স্ক্রোলে। এগুলি খুব সহজেই বহুদিন সুরক্ষিত রাখা যেত।   

[2] ইহুদিদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল এমন কথা কোনদিনই শোনা যায়নি। বরং ইহুদিদের মধ্যে যে প্রথার প্রচলন ছিল সেটি এরকম – ছেলেদের তের আর মেয়েদের বারো বছর বয়স হলে, তাদের ইহুদিয় প্রত্যাদেশের বিধি পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হত – অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে ওই বয়সে ছেলেমেয়েদের ইহুদি ধর্মীয় গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তি হত। এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় বার এবং বাত মিৎসবা (Bar and Bat Mitzvah)। “বার” এবং “বাত” কথাগুলি আরামায়িক, অর্থ পুত্র এবং কন্যা। আর হিব্রু এবং আরামায়িক ভাষায় “মিৎসবা” কথার অর্থ প্রত্যাদেশ (commandment)। অতএব শৈশবের সাধারণ মানব অবস্থা কাটিয়ে ইহুদি পুত্র-কন্যারা হয়ে ওঠেন প্রত্যাদেশ-পুত্র এবং প্রত্যাদেশ-কন্যা। হতে পারে এই বিষয়টি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বুঝতে ভুল করে থাকবেন।     

[3] ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা।

[4] গৌতমাইড্‌স্‌ (Gautamides) – হয়তো গৌতমবুদ্ধের অনুগামী ভিক্ষু ও ভক্তদের কথা বলা হয়েছে। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী – নেপালের কপিলাবস্তু অঞ্চল।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/৩ "

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


    


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের অষ্টম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব


১৯

 

এই ঘটনার পর প্রায় দেড় মাস অতিক্রান্ত। সারা রাজ্যে এখন পূর্ণ বর্ষা সমাগত। পথঘাট দুর্গম। কোথাও কোথাও মাঠঘাট, জলাশয়, সরোবর বৃষ্টির ধারাস্রোতে একাকার। দহনের জ্বালা ধরানো উজ্জ্বল তীব্র রৌদ্র, ঢাকা পড়েছে শ্যামল মেঘের স্নিগ্ধ ছায়ায়। গ্রামে গ্রামে কৃষক ও কৃষকবধূদের ব্যস্ততার শেষ নেই। চারিদিকে শান্তি, সমৃদ্ধির আশ্বাস। রাজ্যের সর্বত্র নিরাপদ প্রশান্তি। প্রজাদের অতিপ্রিয় রাজমাতা সুনীথার সুশাসনে রাজ্যবাসী এখন নিরাপদ, নিশ্চিন্ত, খুশী, সুখী। রাজাবেণের রাজত্বকালের ঊণিশটা মাসকে রাজ্যের জনগণ ভুলতে শুরু করেছে দুঃস্বপ্নের মতো। কোন অভিযোগ নেই কোথাও। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বানিয়ে তোলা হচ্ছে গৃহহারাদের নতুন গৃহ। বিনাশের থেকে নির্মাণে অনেক বেশি সময় লাগে, তা লাগুক। অস্থায়ী বাসায় তারা নিশ্চিন্ত ধৈর্যে বাস করছে। কিছুদিন আগেও যারা গোপনে, মনে মনে রাজা বেণের মৃত্যু কামনা করত, এখন তারাই নতজানু হয়ে করজোড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, “রাজমাতাকে আর কত কষ্ট দেবে, হে ঈশ্বর? করুণা করো, দয়া করো, সুস্থ করে তোলো তাঁর পুত্রকে”।

কক্ষের বাইরে অঝোর বর্ষা ধারা। বর্ষার এই কয়েক মাস মহর্ষির বাইরের ব্যস্ততা কমই থাকে। দূরদেশে কোথাও যান না, আশ্রমেই থাকেন। আর সারাদিন আশ্রমেরই নানান কাজ কর্ম দেখেন, চিন্তা ভাবনা করেন, সহকর্মীদের উপদেশ দেন, নির্দেশ দেন। আর সন্ধের পর নিজের কক্ষে বসে, কিছু আবাসিক শিষ্যদের নিয়ে, নানান বিষয়ে আলোচনা করেন। আজও তেমনই করছিলেন একটু রাত্রি হতে সকলকেই বিদায় দিলেন, কক্ষে রইল শুধু বিশ্বপ্রভ। আর ধরণী গেল মহর্ষির আহারের ব্যবস্থা করতে। এই দুর্যোগের রাতে, মহর্ষি ভোজনালয়ে গিয়ে আহার করে আসবেন, ধরণীর এই ব্যবস্থা মনঃপূত নয়। সে মহর্ষির আহার আনতে গেছে। পাতার টোকা মাথায় দিয়ে, এই বর্ষার মধ্যেও ধরণীর ব্যস্ততার শেষ নেই।

নির্জন কক্ষে একলা পেয়ে বিশ্বপ্রভ মহর্ষিকে বলল, “গুরুদেব, আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধর সেই যে গেছেন, আজও ফিরলেন না। কোন সংবাদও নেই। আপনি কি কিছু জানেন?”

ঘাড় নেড়ে মহর্ষি সম্মতি জানালেন, মৃদু হেসে বললেন, “জানি বৈকি, বিশ্বপ্রভ। আমারই নির্দেশ নিয়ে তারা কঠিন এক ব্রতে গিয়েছে। আমি নিশ্চিন্ত থাকি কী করে বল? তাদের মঙ্গলামঙ্গল, তাদের দুই পরিবারের শুভাশুভ, এখন সব কিছুই আমার অবশ্য কর্তব্য! ওরা ভাল আছে। ওরা নির্বিঘ্নে ফিরে আসছে। গতকাল কিংবা আজ সকালেই ওদের ফেরার কথা ছিল। মনে হয় এই প্রবল বর্ষণে কোথাও আটকে পড়েছে। এসে পড়বে যে কোন সময়”।

উদ্বিগ্ন স্বরে বিশ্বপ্রভ জিজ্ঞাসা করল, “ওঁরা কী সেই তরুণ-তরুণীর সন্ধান পেয়েছেন, গুরুদেব?”

মৃদু হাসলেন মহর্ষি, “শুনেছি যে পেয়েছে, তারাও ওদের সঙ্গেই আছে। দেখা যাক কী হয়!”

দরজার বাইরে মাথার টোকা খুলে রেখে, ধরণী কক্ষে ঢুকল। তার পিছনে আছে বানো। ঢাকা দেওয়া কাংস্য থালিকায় সাজানো স্বল্প আহার নিয়ে, সযত্নে রাখলো মহর্ষির সামনে। কাংস্য পাত্রে ভরা ঈষদুষ্ণ দুধ রাখতে রাখতে বলল, “আচার্য বেদব্রত আর ধর্মধর এইমাত্র এসেছেন, গুরুদেব। তাঁদের সঙ্গে আছেন একটি ছেলে আর মেয়ে”।

“বাঃ শুভ সংবাদ, ধরণী, বিশ্বপ্রভ একটু আগেই ওদের কথা জিজ্ঞাসা করছিল! নিশ্চিন্ত হলাম”।

“তাহলে আরও দুটো পুরোডাশ দেব, গুরুদেব। বেশ কদিন আপনি আহার কমিয়ে দিয়েছিলেন”।

“আরে না, না, ধরণী, চিন্তায় আহার কমিয়ে দেব, এমন অবিবেচক আমি নই। আহার কমিয়েছি বয়সের কারণে। একটা বয়সের পর আহার নিয়ন্ত্রণ জরুরি”। হাসতে হাসতে মহর্ষি থালার ঢাকা খুললেন। থালায় তিনটি পুরোডাশ, পাশে একটি ছোট বাটিতে সবজি, অন্যটিতে ডাল। মহর্ষি দেখে খুশি হলেন, বললেন, “বৎস, ধরণী, এমন আয়োজন করলে, এক আধটা বাড়তি পুরোডাশ নেওয়াই যায়, কি বল?”।

“আপনি শুরু করুন গুরুদেব,  আমি আনছি”।

মহর্ষি আহার শুরু করার পর ধরণী আবার বলল, “আচার্য বেদব্রত আর আচার্য ধর্মধরের এমন চেহারা হয়েছে যে চেনাই দায়! আমি তো প্রথমে চিনতেই পারি নি। একমুখ দাড়ি, মাথায় লম্বা লম্বা চুল। তার ওপর সারা শরীর জলে কাদায় মাখামাখি”।

“আর সঙ্গের ছেলে-মেয়ে দুটো?” বিশ্বপ্রভ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

“তাদের অবস্থাও একই রকম। সকলকেই বললাম, স্নান সেরে শুকনো কাপড়চোপড় পরে, আগে আহার করে নিন। তারপর মহর্ষির অনুমতি পেলে, আমি সংবাদ দেব। আচার্য ধর্মধর বলছিলেন, গুরুদেবের সঙ্গে একবার দেখাটা সেরেই আসি, ধরণী। আমি মানা করলাম। বললাম, আপনাদের এই অবস্থায় দেখলে, গুরুদেব মোটেই খুশি হবেন না, বরং ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবেন”।

“ঠিক বলেছিস, ধরণী। তুই ফিরে গিয়ে ওদের বলে দে, আহারের পর ওরা আজ রাত্রে বিশ্রাম নিক। দেখা, সাক্ষাৎ যা হবে সে কাল সকালেই হোক আমাকে আরেকটা পুরোডাশ আর একটু সবজি দে তো, ধরণী। আজ মনে হয় একটু বেশিই ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে!” 

২০ 

প্রত্যূষে উঠে কক্ষের বাইরে এসে মহর্ষি ভৃগু দেখলেন, বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু আকাশ ঘন মেঘে ভারি হয়ে আছে। যে কোন সময় আবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। প্রাতঃকৃত্য সেরে, সূর্য প্রণাম ও ধ্যান করতে করতে, আজ তাঁর মনঃসংযোগে বার বার ব্যাঘাত ঘটল। মহর্ষি ভৃগুর মতো শান্ত, সমাহিত, স্থিতধী মানুষের মনেও আজ এত চাঞ্চল্য! বারবার তাঁর বেদব্রত ও ধর্মধরের কথা মনে হচ্ছিল। বেদব্রত একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, এই সূর্য প্রণাম, এই ঈশ্বরের ধ্যান - মহারাজ বেণের রাজত্বে এ সবই অনাচার। আজ মহারাণি সুনীথার রাজ্য পরিচালনায়, সেই বাধা দূর হয়েছে। কিন্তু মহারাণি সুনীথার এই রাজ্যশাসন কোন স্থায়ী সমাধান নয়। যে সংকল্প নিয়ে তিনি এই কাজে নেমেছেন, সেই কাজের সমাপ্তি হবে তখনই, যখন এই রাজ্যের সিংহাসনে যোগ্য রাজার অভিষেক সম্পন্ন হবে। বিগত রাত্রে বেদব্রত ও ধর্মধর একটি ছেলে এবং মেয়েকে এনেছে, কিন্তু তারা কি এ রাজ্যের রাজা হবার যোগ্য হয়ে উঠবে? প্রজারা এই রাজাকে কী মেনে নেবে? তিনি বেদব্রত, ধর্মধর এবং ওই ছেলেমেয়ের সাক্ষাতের প্রতীক্ষাতেই চঞ্চল হচ্ছেন বারবার।

নিজ কক্ষে ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর অপেক্ষায় ক্ষৌরকার চতুরমণি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে নিত্য সকালে এসে, তাঁর ক্ষৌরকর্ম করে। এই ক্ষৌরকার অত্যন্ত কথা বলে। এই আশ্রমের সমস্ত বার্তার সে ভাণ্ডারি। তাকে কিছু প্রশ্ন না করলেও সে অনর্গল কথা বলে। বসে বসে অধৈর্য হওয়ার থেকে, এই লোকটির বাক্য প্রবাহতে কিছুক্ষণ আনমনা থাকা যাবে। মহর্ষি এই ভেবে কক্ষের সামনের দাওয়ায় বসে, চতুরমণিকে একটু উস্কে দিলেন, “কী সংবাদ, চতুরমণি? কী মনে হয়, আজও কি গত দুদিনের মতোই বৃষ্টি হবে?”

চতুরমণি তার ঝোলা থেকে, ক্ষৌরকর্মের সরঞ্জাম বের করতে করতে বলল, “বর্ষাকালে বৃষ্টির কথা কী বলা যায়, মহর্ষি? কখন যে তার কী মতিগতি, কে জানে? তবে এবার খুব সুচারু বর্ষা হচ্ছে, জানেন মহর্ষি? আমি আশে পাশের অনেক গ্রামেও যাই তো, কৃষকদের কথাবার্তা শুনি। সকলেই খুব খুশি। তারা বলে এ সবের মূল কারণ মহারাণি। তিনি অধার্মিকের পৌত্রী, মৃত্যুর কন্যা হয়েও, আজ তিনি যে কোন ধার্মিকের থেকেও ধার্মিক। তাঁর পুত্র রাজা থাকলে, এমনটা কক্ষণো হতো না। কী অনাচার, কী অনাচার। রাজা বেণের রাজত্ব মানেই হয় খরা, নয় বন্যা। হয় দুর্ভিক্ষ, নয় মড়ক। সত্য কথা বলতে আমি ভয় পাই না, মহর্ষি। রাজা বেণ অসুস্থ হওয়াটা শাপে বর হয়েছে”।

কাঠের ছোট্ট বাটি থেকে জল নিয়ে, মহর্ষির দুই গাল ভিজিয়ে তুলতে তুলতে চতুরমণি বলল, “যারা বলে ঈশ্বর নেই, ধর্ম নেই। অন্যায়ের প্রতিকার নেই। তারা এসে দেখে যাক, রাজাবেণের অত্যাচার আর অনাচারের প্রতিফল মিলল কিনা? একেবারে হাতেনাতে পেয়ে গেলেন কিনা?”

ভেজাগালে শীতলতার অনুভব নিয়ে, মহর্ষি মৃদু হেসে বললেন, “তুমি বলতে চাও, রাজা বেণের অসুস্থতা তার পাপের প্রতিফল?”

এক ফালি চামড়ার টুকরোতে ঘষে, ক্ষুরে শান দিতে দিতে, চতুরমণি বলল, “কী বলছেন, মহর্ষি? প্রতিফল নয়? এখনো সূর্য চন্দ্র উঠছে গাছে গাছে ফুল ফুটছে। এই বর্ষায় মাটি সরস হচ্ছে, কৃষকের ঘরে ঘরে আজ ফসলের স্বপ্ন। এসব কি মিথ্যা?” ক্ষুরে ধার দেওয়া শেষ করে, চতুরমণি মহর্ষির দাড়ি বানানো শুরু করল। মহর্ষি কথা বলার অবস্থায় নেই, তাই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, “হুঁ”

“এদিকে ভোর থেকে দেখি আশ্রমে হুলুস্থূল কাণ্ড। কী ব্যাপার বলুন তো, কিছু জানেন? ধরণি আমাকে রাত থাকতে ডেকে তুলে বলল, দুজন আচার্যের জরুরি ক্ষৌরকর্ম আছে। ক্ষৌরকর্ম নিত্য কর্ম, তার আবার জরুরি কিসের? সে যাই হোক আমি সরঞ্জাম নিয়ে গেলাম, গিয়ে দেখি অতিথি নিবাসের বাইরে, ভূতের মতো জঙ্গুলে দাড়িগোঁফ নিয়ে দুজন বসে আছে। তাদের সঙ্গে একজন সুপুরুষ তরুণ। ধরণিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ আশ্রমের আচার্যদের সবাইকে চিনি। এরা কারা? কারাগার থেকে পালিয়ে আসা কয়েদি নয়তো? ধরণি হাসল, বলল, ওই জঙ্গল সাফ করে দিলেই তুমি চিনতে পারবে ওরা কারা? পুব আকাশে আলো তখনো ফোটেনি, বসলাম তাদের দাড়ি বানাতে। ক্ষুরে হচ্ছিল না মহর্ষি জানেন, কাস্তে থাকলে ভালো হত। দুজনের জন্যে আমার দুটো ক্ষুরের ধার পড়ে গেল। আপনার দাড়ি বানিয়ে পাথর ঘষে সে দুটোয় আবার শান দিতে হবে”। মহর্ষির এক গাল, কামিয়ে ক্ষুরে লেগে থাকা কামানো দাড়িগুলো বাটির জলে ফেলে, অন্য গাল ধরল চতুরমণি।

তার মধ্যে মহর্ষি বললেন, “দাড়িগোঁফের জঙ্গল সাফ করে কী পেলে বললে না তো?”

“এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন, মহর্ষি? কেটে কুটে গেলে আমাকে কিছু বলতে পারবেন না, এই বলে দিলাম। তবে চতুরমণির ক্ষুরে কারো গাল কিংবা থুতনি কেটেছে এমন কখনো হয়নি। আচার্য সুনীতি সেদিন বলছিলেন, চতুর, তোমার যেমন ক্ষুরধার বুদ্ধি, তেমনি ক্ষুরের ধার। গালের ওপর দিয়ে ক্ষুর টানো, মনে হয়, মাঠে লাঙ্গল টেনে চাষ করছো। আহা তোমার পা মাত্র দুটি, আর সেই দুই পায়ে আবার ক্ষুরও নেই। তবে তোমার হাত দিনদিন যেমন পেকে উঠছে, তাতে পায়ে ক্ষুর গজাতে আর বেশি দেরি লাগবে না, দেখে নিও। আচার্য সুনীতি আমাকে খুবই স্নেহ করেন, ভালোওবাসেন, মহর্ষি। কিছু কিছু মানুষ আছেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের কিছুতেই মন ভরে না। সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকে। বলে, তোমার হাতটা খুব শক্ত আর খসখসে। গালে জল ঘষার সময়েই নাকি তাদের মনে হয় গালের ত্বক উঠে যাচ্ছে! জিজ্ঞাসা করে, দাড়ি কামানোর আর দরকার আছে কী, চতুরমণি? গালের ছালচামড়ার সঙ্গে দাড়ি উঠে যায়নি? আপনার গালেও তো এই হাতেই জল ঘষলাম, আপনার কী মনে হয়, মহর্ষি, আমার হাত খরখরে?” মহর্ষি তখন মুখ উঁচু করে বসেছিলেন, আর চতুরমণি চিবুকের নিচে গলায় ক্ষুর টানছিল। অতি সাবধানে এবং সতর্কভাবে মহর্ষি বললেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা”।

গলার ওপর ক্ষুর থামিয়ে চতুরমণি বলল, “কার কথা মিথ্যে, আমার?”

মহর্ষি ওই অবস্থাতেই উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “পাগল হয়েছ, চতুরমণি? তোমার হাত কুসুমের মতো কোমল। তুমি কেন মিথ্যা বলবে? যারা ওই সব বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে”।

মহর্ষির কথায় সন্তুষ্ট চতুরমণি, গলার উপর ক্ষুর টানতে টানতে বলল, “আঃহা, আপনি বড্ডো কথা বলছেন, মহর্ষি। এত কথা বললে আর অস্থির হলে, আমার কাজ হয় না যে। হাতে এই লৌহ ক্ষুর নিয়ে বলছি, চতুরমণি সত্যি ছাড়া কখনো মিথ্যে বলে না। মিথ্যা কথা বললে এই আশ্রমে কী আপনি আমাকে রাখতেন? নয় নয় করে, বিশ-বাইশ বছর তো হয়েই গেল এই আশ্রমে। এ কবছরে কত পরামাণিক এলো, গেলো, সবই তো দেখলাম। এক এক জন যেন, অসি বিশারদ। কেটে কুটে রক্তারক্তি করে তুলতো। কিন্তু কথার বেলায়? নিজের কথা এমন সাতকাহন করে বলা, ও আমার ধাতে নেই, মহর্ষি! সেদিন আচার্য রণধীর বললেন, কতোটুকুই বা কথা তুই বলিস চতুর, কিন্তু তোর সব কথাই যেন কথকতা। তোর পেট থেকে কথা বের করা আর আকর থেকে সোনা উদ্ধার একই ব্যাপার”।

মহর্ষির দাড়ি কামানো হয়ে গিয়েছিল, পরিষ্কার জল দিয়ে মহর্ষির গাল ধুয়ে দিয়ে, চতুরমণি তার গামছা দিয়ে মহর্ষির মুখ মুছে দিলেন। সেই গামছা অত্যন্ত মলিন এবং বর্ষার কারণে তাতে পুতি দুর্গন্ধ। মহর্ষি চুপ করে সে সব সহ্য করে, এবার উঠতে যাচ্ছিলেন, চতুরমণি  ধমক দিয়ে উঠল, “উঠছেন কোথায়? এখনো স্ফটিকারি লাগাইনি তো! সব ব্যাপারে এত ব্যস্ত হলে তো চলবে না, মহর্ষি। কামানোর পর স্ফটিকারি না দিলে, কী হয় জানেন না বুঝি? স্ফটিকারি হল...”

মহর্ষি ওদের প্রাঙ্গণে ঢুকতে দেখেছিলেন - বেদব্রত, ধর্মধর আর সেই নবীন যুবক। চতুরমণির বাক্যের বন্যায় তিনি নির্বাক বসেছিলেন, যদিও তাঁর মুখে হাল্কা হাসির রেশ। পিছন থেকে চতুরমণির কথা শুনে, আচার্য বেদব্রত তার কথা শেষ করতে দিলেন না, বলে উঠলেন, “ওহে চতুরমণি, গুরুদেবের সামনে তোমার সকল জ্ঞানের ভাণ্ডার এভাবে মেলে ধরবে নাকি? গুরুদেব তোমার থেকে সব জেনে গেলে, তোমার আর থাকবে কী? আমাদের এখন কিছু জরুরি আলোচনা আছে, তুমি গুরুদেবকে মুক্তি দাও দেখি!”

মহর্ষির গালে স্ফটিকারি ঘষতে ঘষতে চতুরমণি বলল, “আমারও কী বসে বসে বাজে বকার জো আছে? ওদিকে রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, যে দিকে না দেখবো, সেখানেই কিছু না কিছু অনর্থ ঘটে যাবে। আচার্য রণধীর বলেন, তুমি কদিন না থাকলে, আশ্রমটা অন্ধকার হয়ে থাকে। আগুনের উত্তাপ কমে যায়, গাভীর দুধ পাৎলা হয়ে আসে, এমন কি গাছের পাতাটিও নড়ে না” ক্ষৌরকর্ম সেরে চতুরমণি, তার সঙ্গের ঝোলাতে সব সরঞ্জাম তুলে, নত হয়ে মহর্ষিকে নমস্কার করল, বলল, “আজ আমার একটু ত্বরা আছে, কাল ভোরে এসে ফিটকিরির তত্ত্বটি আপনাকে বুঝিয়ে বলব, মহর্ষি, আপনি চিন্তা করবেন না”।

আচার্য বেদব্রত আর ধর্মধর নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে হাসল। আর নবীন যুবক মহর্ষি ভৃগুর প্রসন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, এমন একজন মানুষের সামনে ক্ষৌরকারের এ কী প্রগলভতা! চতুরমণি বিদায় নেওয়ার পর তিনজনেই মহর্ষিকে প্রণাম করলেন।

নবীন যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি তার কাঁধে হাত রাখলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকারের ব্যবহারে আশ্চর্য হয়ো না, বৎস। এটাই স্বাভাবিক। সম্মানীয় মানুষদের থেকে আমরা সাধারণ মানুষ সর্বদাই একটা সমীহ দূরত্ব বজায় রাখি। তাঁদের গালে, গলায়, কানে মাথায় হাত দেওয়ার কথা আমরা কল্পনাও করি না। কিন্তু তুমি যত বড়ো মাপের মানুষই হও না কেন, ক্ষৌরকারকে তোমার অতি ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে নিয়মিত ঢুকতেই হবেআর সেই কারণেই অন্য মানুষ যখন সমীহে কথা কম বলে, এরা তখন অনর্গল কথা বলতেই থাকে। মানব চরিত্রের এও এক অদ্ভূত পাঠ, ভবিষ্যতে আরও অনেক দেখতে হবে, শিখতে হবে তোমাকে! চলো, তোমরা আমার কক্ষে গিয়ে বসো” 

নবীন যুবক এর আগে মহর্ষিকে দুএকবার দূর থেকে দেখেছে, বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমার থেকে আশৈশব তাঁর পাণ্ডিত্য আর সহৃদয় মহত্বের অনেক কথাও শুনেছে। আর আজ সেই মানুষটা তার কাঁধে হাত রেখে নিজের কক্ষে যখন ডেকে নিলেন এবং তার মনের দ্বন্দ্বটুকু অল্পকথায় বুঝিয়েও দিলেনসে অভিভূত হল। মহর্ষি তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসার পর, তাঁর সামনের দুই আসনে বসলেন আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধরনবীন যুবক সামনেই বসল, কিন্তু আচার্যদের থেকে কিছুটা দূরে, মাঝের দুটো আসন ছেড়ে। মহর্ষি প্রসন্ন মুখে লক্ষ্য করলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকর্মের পর স্নান করাটা জরুরি। তোমার পরিচয়ের কৌতূহলে আমি কিছুটা অনিয়ম করে ফেললাম। আমি স্নান সেরে এখনই আসছি। ততক্ষণ তুমি আচার্যদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলোচনা করো”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব "


সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

খাইদাই গানগাই

 


এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - "নবীন বরণ


আমাদের জলপাইগুড়ি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, অধিকাংশ ছাত্রই ছিল দক্ষিণবঙ্গের। স্বাভাবিক সমতলের বাসিন্দা, অজস্র নদীনালা পার হয়ে, বিশাল ফরাক্কা ব্যারেজে গঙ্গা পেরিয়ে আমরা যখন কলেজের ক্যাম্পাসে পৌঁছতাম, সেও ছিল অদ্ভূত অভিজ্ঞতা। চারিদিকে অনন্ত সবুজ গাছপালা, একটু এদিকসেদিক গেলেই জঙ্গল, পাহাড়, সবুজ গালিচা বিছানো চাবাগান, আমাদের আজন্ম দেখা কাঠখোট্টা শহর অথবা ধানক্ষেতে মোড়া সবুজ সমতল দেখা অভ্যস্ত চোখে, সে এক অদ্ভূত মায়ার সঞ্চার করতো।

নবীনবরণের কয়েকদিন পরেই, মার্চের মাঝামাঝি আমরা পিকনিকে গেলাম। গেলাম না বলে, বলা উচিৎ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। প্রথম বছরের আমাদের একটা অংশ থাকতাম এক নম্বর হস্টেলে, আমাদের থেকে এক বছরের সিনিয়রদের সঙ্গে। সেদিন পিকনিকে ৬০/৬৫ জন জুটেছিলাম, দ্বিতীয় বর্ষের অধিকাংশ, আমাদের জনা পনের, আর পঞ্চম বর্ষের জনা দশেক। প্রসঙ্গতঃ, সেবার তৃতীয় বর্ষের কোন ছেলে ছিল না। কারণ মধ্য শিক্ষা পর্ষদের পুরোনো হায়ার সেকেন্ডারির শেষ ব্যাচ বেরিয়েছিল ৭৬ সালে আর নতুন হায়ার সেকেণ্ডারির প্রথম ব্যাচ বেরিয়েছিল ৭৮ সালে এক রবিবার, হস্টেলের সামনে থেকে ভাড়া করা বাস ছাড়ল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ। বাসের সামনে JGEC College এর ব্যানার। বাসের মাথায় চোঙে গাঁক গাঁক করে গান বাজছে, সেই কমনরুমের কমন গান।

বাসের পিছনের সিটে কোন ছেলের বসার অধিকার ছিল না, কারণ সেই সিটগুলো রিজার্ভ করা ছিল বোতল বিলাসিনী সুরার পেটিতে। সিকিমি চ্যাংটা, ভুটানি আপ্‌সু আর ব্ল্যাক লেভেল কল্যাণি বিয়ার, আমাদের সকলের কল্যাণের জন্য। সুকনা ফরেস্টের প্রথম চেক পোস্টেই বাস আটকে গেল, জঙ্গলের মধ্যে মাইকের অনুমতি নেই। মাইকের চোঙ, রেকর্ড প্লেয়ার, ব্যাটারি সব জমা করতে হল ফরেস্ট অফিসে, তারপর ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল। সুরায় বীরত্ব বাড়ে। অতএব, দু একজন সুরারসিক দাদা, যারা বাসের মধ্যেই তরলস্রোতে ভাসছিল, তারা এই সিদ্ধান্তে্র তীব্র বিরোধিতা ক’রে, ফরেস্ট গার্ডদের উদ্দেশে হস্টেলের সুবচনী ও অমৃতবাণীতে আপ্যায়ন করে বলতে চেষ্টা করছিল ‘মাইক ছাড়া পিকনিক হয় নাকি, ***’সেই উদ্যমী দাদাদের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার উদ্যমও নেহাত কম নিতে হয়নি। তা নাহলে সেদিনের পিকনিকটাই মাটি হতে পারত।

জঙ্গলের ভেতরে কোর এরিয়াতে ঢোকার মুখেও আবার বাধা এল। কোর এরিয়াতে পিকনিক করার নিয়ম নেই। অতএব বাস সাইডে রেখে নেমে পড়তে হল, মাটিতে। প্রাথমিক গোছগাছ, রান্নার যোগাড়, ব্রেকফাস্টে ব্রেড, কলা, ডিম সেদ্ধ আর কফি খাওয়ার পর অনেকেই বসে গেল সুরার সুরে পাখা মেলতে। আমরা প্রথমবর্ষের কয়েকজন তখনো সুরাপানে অভ্যস্ত না হওয়ায় হাঁটা দিলাম জঙ্গলের দিকে এবং ঘটে গেল বিচিত্র অভিজ্ঞতা! খয়ের, শিশু, শাল, আরো অনেক নাম না জানা ঋজু গাছের আড়ালে সে এক অন্য জগৎ, যার রূপ, শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শ, আমাদের চেনা জগতের থেকে একদম আলাদা রকমের। আমাদের পায়ের নিচে শুকনো পাতা ভাঙার শব্দ, একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ আর উত্তুরে হিমেল হাওয়ার দমকে গাছের পাতায় পাতায় অস্ফুট নিশ্বাসের মর্মর শব্দ। শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে যে কান অভ্যস্ত, জঙ্গলের এই শব্দটুকু, আমার কানে অদ্ভূত এক নৈশব্দ্যের অনুভূতি আনল ঘ্রাণে এল গাছের গন্ধ, মাটির গন্ধ, সব মিলিয়ে বুনো জঙ্গলের গন্ধ।

আমাদের পিকনিকের জায়গাটা ছিল ছোট্ট একটা পাহাড়ি নদীর ধারে। শীতের নদীর ধারা শীর্ণ, ছোটবড়ো নুড়ি পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জলের অজস্র ধারা অস্ফুট শব্দে বয়ে চলেছে নিচের দিকে, বিশাল মহানন্দার বুকে মিশে যাওয়ার আনন্দে। সেই শীতল জলধারায় পা ডুবিয়ে নদীর বুকে পড়ে থাকা পাথরে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। তারপর যখন পেটে খিদের অনুভব তীব্র হতে লাগল, জঙ্গলের ঘ্রাণ ছাপিয়ে নাকে এল মাংস এবং ভাত রান্নার ঘ্রাণ। উপলব্ধি করলাম প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সীমা ততক্ষণই, যতক্ষণ পেটটি থাকে নিশ্চিন্ত। রান্না হতে কিছুটা দেরী, অতএব পাঁপড়ভাজা আর অর্ধসিদ্ধ মাংসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হল সুরার স্বাদ। এই জঙ্গলের মতোই আর এক নতুন অভিজ্ঞতা। ছোট্ট ছোট্ট চুমুকের ধারা আমার চেতনাকে অবশ করতে করতে, পোঁছে দিল – মহানন্দার দিকে নয় - মহানন্দর দিকে। তখন মাংসের ঝোলে নুন কম কিনা, মাংসটা আরেকটু সেদ্ধ হলে ভালো হত কিনা, ভাতটা একটু বেশি ফুটে গেল কিনা, এই সব তুচ্ছ বিষয়ের অনেক ঊর্ধে উঠে গেছে মন।


গরমে পটল, ঢ্যাঁড়স, শীতে বাঁধাকপি, আর সারা বছর আলু, আলু এবং আলু ও স্কোয়াশ, হস্টেলের খাওয়া বলতে এটাই জেনেছিলাম কটা বছর। যেদিন রাত্রে, খুব সম্ভব বুধবার, চিকেন হত, সাড়ে নটার ঘন্টা বাজার আগেই, ছেলেদের অনেকে ডাইনিং হলের দরজার সামনে লাইন লাগাত। ডাইনিং হলের ছেলেগুলোও বুঝতো চিকেনের মাহাত্ম্য। অন্যান্য নিরামিষ দিনে, যে ডাইনিং হলের দরজা উদার উন্মুক্ত থাকত, চিকেনের রহস্য বুকে নিয়ে  সে দরজাই বন্ধ হয়ে যেত সেই বিশেষ দিনটিতে। রান্না শেষ হবার আগেই ছেলেদের লাইন লাগত বন্ধ দরজার সামনে। সাড়েনটার ঘন্টা ধ্বনি শুনে হস্টেলের বারান্দা আর সিঁড়িতে শোনা যেত উদ্দাম গতিতে নিচের দিকে দৌড়ে যাওয়ার শব্দ। লক্ষ্য একটাই, চিকেন! আর আমরা যারা সাড়ে দশটার আগে খেতে যাওয়াটাকে বাচালতা ভাবতাম, আমাদের কপালে জুটত চিকেনের গলা, আর প্রায় স্বচ্ছ হয়ে যাওয়া চিকেনের ঝোল। মাঝে মাঝে মনে হত চিকেনও কি জিরাফের মতো গলা সর্বস্ব? আর ঝোল স্বচ্ছ হতে থাকার রহস্য লুকিয়ে থাকত, রান্নাঘরের উনুনে ফুটতে থাকা লবণাক্ত গরম জলের ডেকচিতে। প্রথমদিকে আসা ছেলেদের টানে, ঘন ঝোলে যে ভাঁটা আসত, সে সব ভরে যেত ঐ উষ্ণ লোনা জলের জোয়ারে!

প্রতি মাসে দুটো আইডি আর একটা গ্র্যাণ্ড ফিস্ট বাঁধা ছিলএই তিনটে দিন, বিশেষ করে জিএফের দিন বেঁচে থাকার একটা নতুন অর্থ প্রত্যেকবার খুঁজে পাওয়া যেত। মাসের অন্যদিন পটলের তরকারিতে যে পটলের দেখা মিলত লটারিতে, আইডির দিন সেই পটলের দুচারটে তৈলসিক্ত পিস অনায়াসে পাওয়া যেত। অথবা শীতের দিনে ফুলকপির বড়ো বড়ো পিস। আর চিকেনের স্বাদও হত অনন্য। খেতে খেতে মনে হত, আমাদের রান্নার কারিগর, যে নিপুণ দক্ষতায় মাসের অন্যদিনগুলোতে স্বাদবর্ণগন্ধহীন খাবার পরিবেশন করত, তারাই আবার ওই বিশেষ তিনটি দিনে কোন জাদুতে এমন তৃপ্তির রান্নাও করতে পারত!

মেসের দায়িত্বে থাকত অবশ্য হস্টেলের ছেলেরাই। প্রত্যেক মাসে হস্টেলের এক একটা উইং থেকে এক একজন ছেলেকে মেসের দায়িত্ব দেওয়া হতো। তাকে বলা হতো মেস ম্যানেজার। যাঁরা ভারতীয় শাস্ত্রমতে কর্মফলে বিশ্বাসী অর্থাৎ ভাল বা মন্দ কাজের পরিণামে ভাল ও মন্দ ফলের প্রত্যাশা করেন, তাঁরা মেস চালানোর কর্মে ব্যর্থ হবেন সন্দেহ নেই। কারণ অত্যন্ত মন্দ খাইয়ে, সারা মাস উঠতে বসতে হস্টেলের ছেলেদের গালাগাল খেয়ে, মেস ম্যানেজার ছেলেটি, মাসের শেষে যখন মেসের বিল ঘোষণা করত চুয়ান্ন টাকা তেত্রিশ পয়সা, তখন আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। বুকে জড়িয়ে ধরে বলতাম ‘গুরু হেব্বি করেচো’। আর যে ম্যানেজার সারা মাস যথেষ্ট ভালো খাইয়ে, সারা মাস আমাদের শুভেচ্ছা আর প্রশংসা শুনে বুক ফুলিয়ে ঘুরেছে,  মাসের শেষে যেদিন সে মেসের খরচ বলত তিয়াত্তর টাকা পঁইষট্টি পয়সা, সেদিন তার কপালে দুর্ভোগের অন্ত থাকত না। গালাগাল তো ছিলই, তার ওপর তার কানে কানে জিগ্যেস করা হত ‘গুরু, রেডিওটা কি মেসের পয়সায় কিনলি? অথবা গ্যাবার্ডিনের প্যান্টপিস কিনতে, হংকং মার্কেট কবে যাচ্ছিস’?

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, ১৯৭৯ সালে বাড়ি থেকে মাসে ১৫০/-টাকা পাঠালে আমাদের দিব্য চলে যেত। কলেজের ফি ছিল একত্রিশ টাকা, মেসের চার্জ ষাট-সত্তরের মধ্যে ঘোরাফেরা করত, বাকি পয়সায় সকাল ও বিকেলের টিফিন, শহরে সিনেমা দেখা, দিনে দুটো চারমিনার সিগারেট আর এন্তার বিড়ি, তাছাড়া টুকটাক কেনাকাটা। মেসের খরচ বাড়লে কোথাও না কোথাও রাশ টানতে হত। হয়তো সকালের টিফিনে, নয়তো রিকশা এড়িয়ে পায়ে হেঁটে শহরে যাওয়া, এই রকম আর কি!

একবার আমাদের উইংয়ে মেসের দায়িত্ব এল, মেস ম্যানেজার হল আমার এক রুমমেট। তখন আমরা থার্ড ইয়ারে, থাকি দু নম্বর হস্টেলে। আমার ঘষু রুমমেট আমার ঘাড়ে দায়িত্ব ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘষতে লাগল। [ঘষা এবং ঘষু শব্দদুটির অর্থ যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্যে বলি - টেবিল-চেয়ারে বসে অত্যধিক লেখাপড়ার জন্যে চেয়ারের সঙ্গে পাঠকের পশ্চাদ্দেশের অত্যধিক ঘর্ষণ জনিত যে অভ্যাস তাকেই এক কথায় প্রকাশ ঘষু বলা হয়ে থাকে।]  

খরচের কথা ভেবে নিত্য দিনের খাওয়ায় খুব যে কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছিলাম তা নয়। তবে আইডি আর জিএফ হয়েছিল জবরদস্ত। দুদিন আইডিতে চিকেনের জায়গায় মাটন হয়েছিল। আর জিএফের দিন শহরের নিরালা রেস্টুরেন্ট থেকে মাটন দোপেঁয়াজা এসেছিল। আর এসেছিল বিয়ার। প্রত্যেকের জন্য বড়ো কাচের গ্লাসে এক গ্লাস করে। সেই কাচের গ্লাসও ভাড়া করে নিয়ে আসা হল শহরের এক ডেকরেটারের থেকে। ক্ষীণকটি কিন্তু পৃথুল উর্ধাঙ্গওয়ালা সেই তিরিশটি গ্লাসের পূর্ণ দাম জমা রাখতে হয়েছিল সিকিউরিটি হিসেবে। ডেকরেটার ভদ্রলোক হস্টেলের কথা শুনে, কোন ঝুঁকি নেননি। বিয়ার বিতরণের দায়িত্ব ছিল আমার এবং আমাদের উইংয়ের সকলের। যারা বিয়ার খায় না, তাদের জন্যে ছিল সমমূল্যের চকোলেটবার। পরের দিন, একটা মাত্র গেলাস ভেঙে ডেকরেটরকে ঊণত্রিশটি গ্লাস যখন ফেরত দিয়ে এলাম, ডেকরেটর ভদ্রলোক অবাক হয়েছিলেন খুব, বললেন, ‘হস্টেলে এমন আবার হয় নাকি, মাত্তর একখান ভাঙসে, ওতো আমাগো হাতেও ভাঙে’। ভদ্রলোক সিকিউরিটির সমস্ত টাকাই ফেরত দিয়েছিলেন।

জিএফ খেয়ে ছেলেরা উচ্ছ্বসিত, প্রচুর প্রশংসায় আমাদের উইংয়ের জয়জয়কার। আমার মাথায় কিন্তু টিকটিক করছিল খরচের ঘড়ি, মাসের শেষের গালাগালি আর প্যান্টের পিস উপার্জনের বদনাম। যদিও সে সব কিছু হয়নি, কারণ মেসের চার্জ সীমার মধ্যেই ছিল, আর যেটুকু বেশী হয়েছিল, কেউ গায়ে মাখেনি, কারণ খাওয়ার তৃপ্তি ও আনন্দে সেটুকু পুষিয়ে যায়।

আমাদের ক্যান্টিনে সকালে পাওয়া যেত বাটারটুচ, ডিমটুচ আর ফ্রেঞ্চটুচ। রাস্তার ধারের মাইলস্টোনের আকারে লোফ, যার আদত নাম ছিল লুপ পাঁউরুটিহিটারের আগুনে সেই লুপ সেঁকে, ছুরির ফলা দিয়ে মাখনের মতো কিছু একটা লাগিয়ে চিনি মাখিয়ে দিব্যি খাওয়া হত। মাঝে মাঝে ফ্রাইং প্যানে হাফকাঁচা অমলেটের ওপর দুটো লুপের পিস চেপে ধরেই, প্লেটের উপর উল্টে দিয়ে পাওয়া যেত গরম গরম ডিমটুচ। কালা নমক ছিটিয়ে দেওয়া সেই লুপের স্বাদও মন্দ লাগত না। একটা প্লেটের ওপর একটিমাত্র ফেঁটানো ডিমে ছ পিস লুপ চুবিয়ে তেলে ভেজে পাওয়া যেত ফ্রেঞ্চ টুচ। স্বাদ বদলের জন্যে সেও বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু এই টিফিনের পর অন্ততঃ একটা অ্যান্টাসিড নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।

ঘরে জেলির শিশি কিনে রেখে, রুমমেটরা সকলে মিলে, উইংয়ে থাকা হিটারে পাঁউরুটি সেঁকে খাওয়াটা ছিল সেদিক থেকে অনেক নিরাপদ। অবশ্য সেক্ষেত্রে জেলি এবং পাঁউরুটি ডামা হত বিস্তর। আরেকটা মনে আছে, ঘরে চিঁড়ে, চিনি আর গুঁড়ো দুধের প্যাকেট কিনে রেখে, সকালে দুধচিঁড়ে মেখে খেতাম, সেও বেশ লাগত কলেজ যাওয়ার তাড়াহুড়োর মুখে। এই পদ্ধতিটা নিরাপদতো বটেই, ডামাও হতো খুব নগণ্য। কারণ চিঁড়ে ধুয়ে, ভিজিয়ে, মেখে খাওয়ার ধৈর্য কুলোতো না অনেকেরই।

বাড়ি থেকে মানি অর্ডার এলে অথবা, পরের দিকে ১৯৮২ সালে কলেজেই ব্যাংক হয়ে যাওয়াতে, ব্যাংক ড্রাফট এলে অন্ততঃ তিনদিন জলপাইগুড়িতে সিনেমা দেখা এবং মোগলাই পরোটা বাঁধা থাকত। আর হস্টেলের একঘেয়ে রান্না খেয়ে খেয়ে যখন জিভটা জুতোর শুকতলা হয়ে উঠত, তখন রুবি বোর্ডিংয়ের সরুচালের ভাতের সঙ্গে মুগের ডাল, পোস্ত আর চারামাছের সর্ষেঝাল অমৃত মনে হত, জিভ ফিরে পেত নতুন প্রাণ। মাসের শেষদিকের অর্থহীন পকেটে, মাসকলাই বাড়ির ঝুরিবুন্দিয়া, ঝুরিভাজার সঙ্গে বোঁদের মিশ্রণের নোনতা-মিঠে স্বাদ নিয়ে, বেঁচে থাকার অন্য অর্থ খুঁজে পেয়েছি কতদিন সেও অবশ্য এক প্লেট নিয়ে তিনজনে কাউন্টার করে খাওয়া হত। তারপর মাসকলাইবাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে দাঁতের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ঝুরিভাজার টুকরো অথবা বোঁদের কণা খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়তাম আমাদের হস্টেলের রাজ্যে। যেখানে আমরাই ছিলাম রাজা।

এর পরের পর্ব - " ছিন্ন শিকল পায়ে "


শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব " 






[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩

 পরের দিন খুব ভোরবেলাতেই ভল্লার ঘুম ভেঙে গেল। আজ বেশ সুস্থ বোধ করছে সে। শরীরের ব্যথা, বেদনা – গ্লানি নেই বললেই চলে। বিছানায় উঠে বসল, তারপর ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে এল। ভোরের আলো সবে ফুটেছে, বাইরের গাছপালার ডালে ডালে পাখিদের ব্যস্ততা টের পাওয়া যাচ্ছে তাদের কলকাকলিতে। হাওয়ায় সামান্য শিরশিরে ভাব। বিছানায় ফিরে গিয়ে সে গায়ের চাদরটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়াল। দড়ি থেকে টেনে নিল গামছাটা – কষে বেঁধে নিল মাথায়। তারপর প্রশস্ত অঙ্গন পেরিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে চলল পথের দিকে। কঞ্চি দিয়ে বানানো, বেড়ার পাল্লা খুলে সবে পথে নামতে যাবে, কমলি ডাক দিল, “অ্যাই, এই কাক ভোরে কোথায় চললি রে? পালাবার ফিকির বুঝি? এখনো তোর শরীর পুরোপুরি সারেনি…”। কমলির হাতে জলভরা ঘটি।

ভল্লা ঠোঁটে আঙুল রেখে কমলিকে ফিসফিস করে বলল, “প্রধানমশাই শুনতে পেলে এখনই হৈচৈ বাধাবে।  বিছানায় শুয়ে শুয়ে শরীরে এবার ঘুণ ধরে যাবে। একটু ঘুরেঘেরে আসি…গাঁয়ের লোকদের সঙ্গে চেনা পরিচয় করে আসি…। আমি পালাইনি রে, মা। প্রধানমশাইকে আমি ভয় পাই নাকি? ভয় করি তোকে।  তুই না তাড়ালে, আমি এ বাড়ি ছেড়ে, এই গ্রাম ছেড়ে সহজে নড়ছি না…এই বলে দিলাম, মা”।

ভল্লার চোখের দিকে তাকিয়ে কমলির চোখ ছলছল করে উঠল। বছর দশেক আগে তাঁর হারিয়ে যাওয়া দুই ছেলের বড়টি যেন ফিরে এসেছে তাঁর কাছে। কমলির প্রৌঢ় দুই পয়োধর আচমকাই যেন ভারি হয়ে ব্যথিয়ে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল, “তার নাম ছিল বুকা – সে আজ থাকলে ঠিক তোর মতই হত…”

ভল্লা বলল, “আমিই তো সেই…নিজের ছেলেকে চিনতে পারিস না, কেমন মা তুই?” চোখ আর নাক কুঁচকে ভল্লা হাসল। কমলি চোখের জল এড়াতে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “একটু দাঁড়া, নাচ দুয়োরে জলছড়া দিই, তারপর বেরোস…নইলে অমঙ্গল হয়…বেশি দেরি করিস না ফিরতে…”।

 পথে নেমে ভল্লার মনে পড়ল, সে এই গাঁয়ে ঢুকেছিল বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে। অতএব গাঁয়ে যেতে গেলে নিশ্চয়ই ডাইনে যেতে হবে। সে ডানদিকেই হাঁটা দিল ধীরে সুস্থে। পথের পাশে একটা বাবলা গাছ পেল। খুব সাবধানে কাঁটা সামলে ছোট্ট একটা ডাল ভেঙে, মুখে নিয়ে চিবোতে লাগল। নিমের ডালের থেকে তার বাবলার ডালই পছন্দ।

মন্থর পায়ে চলতে চলতে সে দেখল পথের দুপাশেই বাড়ি – তবে একটানা লাগাতার নয়। দুই বাড়ির মাঝখানে কোথাও খালি জমি – কোথাও পুকুর। বাড়িগুলি খুবই সাধারণ। বাঁশের বাতায় পুরু করে মাটি লেপে দেওয়াল। কাঠের কাঠামোর ওপর শালপাতার ছাউনি। ঝড়ঝাপটা, বৃষ্টি-বাদলায় এসব বাড়ি মোটেই নিরাপদ নিশ্চিন্ত আশ্রয় হতে পারে না। বেশ কিছু বাড়িতে ছাগলের খামার রয়েছে। সকাল বেলা সব বাড়ি থেকেই বেরিয়ে আসছে ছাগলের দল। কারো কম – চারপাঁচটা, কারো কারো বেশি পনের-বিশটা। দুটো ছোঁড়া হাতে পাঁচন বাড়ি নিয়ে তাদের জড়ো করছে। তারপর খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারণ জমির দিকে।

ভল্লা ছোঁড়াদুটোকে জিজ্ঞাসা করল, “শুধুই ছাগল, গরুবাছুর নেই?”

ছোঁড়াদুটো কথা বলল না, শুধু ঘাড় নেড়ে বলল, না।

“গ্রাম থেকে কতদূরে, রে? যেখানে এদের চড়াতে নিয়ে যাস?”

ছোঁড়াদুটোর একজন হাত তুলে দেখাল, বলল, “হোই তো হোথা”।

অন্যজন জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কমলিমায়ের বাড়ি এসেছ না? কোথা থেকে এসছ? যাবে কোথায়?”

ভল্লা ওদের মাথায় হাত রেখে বলল, “অনেকদূরের শহর থেকে এসেছি...তোদের সঙ্গে দেখা করতে, এখানে থাকতে...এখন আর কোত্থাও যাবো না আমি”।

ওদের তাড়া আছে, ভল্লার নেই। ছেলেদুটো ছাগলের পাল নিয়ে এগিয়ে গেল। ভল্লা দাঁতন চিবোতে চিবোতে বুঝতে লাগল, গ্রামের পরিস্থিতি। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে সে ধীরে ধীরে চলতে লাগল। এখনও পর্যন্ত কোন বাড়িতেই সে শস্যের গোলা দেখতে পেল না। এমনকি গ্রামপ্রধান জুজাকের বাড়িতেও সে শস্যগোলা দেখেনি। জুজাকের বাড়ির যে ঘরে রয়েছে, সে ঘরেরই এক কোণায় রাখা তিনটে বড় মাটির জালায় ভুট্টা আর জোয়ারের দানা দেখেছে। সে দিয়ে সারাবছরের খোরাক হয়ে যায়? জুজাক আর কমলিমায়ের মাত্র দুজনের সংসার…তাতেও সারাবছর চলতে পারে না। তাছাড়া শুধু পেটে খেলেও তো হয় না। তেল, নুন, কিছু কিছু মশলা, ধুতিশাড়ি, শীতের চাদর, কাঁথা-কম্বল সে সব কিনতেও তো ভরসা ওই শস্যদানাই! তার ওপর আছে শখ আহ্লাদ, পালা-পার্বণ, দায়-দৈব…।  

রাজধানী শহরের বিত্তবান মানুষের কাছে শস্যদানা থাকে না। তাদের থাকে কড়ি, রূপোর মুদ্রা, সোনার মুদ্রা। সেই মুদ্রা দিয়ে জগতের সব কিছু কিনে ফেলা যায় – ঘরবাড়ি, মূল্যবান কাপড়চোপড়, গয়না-অলংকার, বিলাসব্যসন, সুরা… কি নয়? ভল্লার মনে পড়ল রাজশ্যালক রতিকান্তর কথা। রাজার অনুগ্রহে প্রতিপালিত নিষ্কর্মা, লম্পট লোকটা কত অর্থের অনর্থক অপচয় করে চলেছে প্রত্যেকদিন। অথচ এইখানে এই গ্রামে কী নিদারুণ কঠিন পরিস্থিতি।

হাঁটতে হাঁটতে ভল্লা গিয়ে পৌঁছল অনেকটা উন্মুক্ত এক জমিতে। বাঁদিকে বিশাল এক জলাশয়। জলাশয়ের তিনদিকে ঘন গাছপালার সারি আর ঝোপঝাড়। আর সামনেই পাথরে বাঁধানো ঘাট। সেই ঘাট থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন এক অশ্বত্থ গাছ। শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে নিবিড় ছায়াময় করে তুলেছে বৃক্ষতল। সেখানে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে পাথর বিছানো বসার জায়গা। ভল্লার মনে হল, পাথরের ওই আসনগুলি গ্রামের মাতব্বর পুরুষদের বিশ্রম্ভালাপের জায়গা। অপরাহ্নে হয়তো অনেকেই আসে - কথাবার্তা, শলা-পরামর্শ, পরনিন্দা-পরচর্চা সবই চলে। গ্রামের পালা-পার্বণে উন্মুক্ত এই জমিতেই হয়তো গ্রামবাসীরা সমবেত হয়। হইহুল্লোড়, নাচ-গান করে।    

ভল্লা সেই জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে দাঁড়াল। স্বচ্ছ নির্মল জলের ওপর ছায়া পড়েছে তিনপাশের গাছপালা আর মাথার ওপরের সুনীল আকাশের। জলাশয়ের বিস্তার এতই বড়ো, জলের উপরে তিরতিরে তরঙ্গ উঠছে, প্রভাতী বাতাসের স্পর্শে। ভল্লা ঘাটে নেমে জলস্পর্শ করল, মুখ ধুয়ে, মুখে চোখে জল দিল। কিছুটা জল পানও করল। চাদরে মুখ মুছে ঘাটেই বসল।

কিছুক্ষণ আগেই সূর্যোদয় হয়েছে তার সামনে, কিছুটা ডানদিকে। ওদিকে ছোট্ট টিলা আছে একটা। ভল্লার মনে পড়ল, এই গ্রামে ঢোকার মুখে সে একটা সরোবরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। তার যতদূর ধারণা সেই সরোবরটা রয়েছে ওই টিলার কোলেই। ওখান থেকে আধক্রোশ মত পথ নেমে সে গ্রামে ঢুকেছিল। তার মানে সে এখন যে দীঘির সামনে বসে আছে, তার ওপারের ঝোপঝাড় বেয়ে ওই টিলার পায়ের কাছেই পাওয়া যাবে রাজপথ। কিন্তু ভল্লার মনে হল, সরোবরের পাড় ধরে যে পথে সে নেমে এসেছিল, সে পথ নেহাতই পায়ে চলা পথ। ও পথে গোরু কিংবা ঘোড়ার গাড়ির পক্ষে ওঠা-নামা সম্ভব নয়। অবশ্য  দক্ষ অশ্বারোহী ওপথে যাওয়া আসা করতে পারবে। তাহলে এই গ্রামে ঢোকার জন্যে সদর রাস্তাটি কোনদিকে? ভল্লাকে সেটা জানতে হবে।

নোনাপুর গ্রাম এই রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রাম। অর্থাৎ এই গ্রামের পশ্চিম দিকে রয়েছে প্রতিবেশী রাজ্যের সীমানা। সেই সীমানা এই গ্রাম থেকে কতদূরে? সাধারণতঃ কোন রাজ্যের সীমান্ত বরাবর কোন বসতি থাকে না। প্রতিবেশী দুই রাজ্যই জনহীন দূরত্ব বজায় রাখে। অতএব সেই অঞ্চলটি বনাকীর্ণ এবং হয়তো দুর্গম। যদিও ভল্লা জানে, প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকলেও সাধারণ জনগণের কিছু অংশ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাতায়াত করে থাকে। দৈনিক শ্রমের বিনিময়ে কিছু উপার্জনের আশায়। এবং নিয়ম বহির্ভূত কিছু বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। নোনাপুরের কথা সে যেমন শুনেছে এবং আজ সকালে গ্রামের পরিস্থিতি যতটুকু সে উপলব্ধি করেছে – তাতে পড়শী রাজ্যের সঙ্গে এই গ্রামের যোগাযোগ থাকা খুবই স্বাভাবিক।

“এই যে ছোকরা…”পিছন থেকে পুরুষ কণ্ঠের আচমকা ডাকে ভল্লার ভাবনা সূত্র ছিন্ন হল। পিছন ফিরে দেখল, ঘাটের প্রথম ধাপে জনৈক মধ্যবয়সী পুরুষ তাকে ডাকছে, সেই থেকে ঘাটে বসে কী করছ হে? জান না, সকালে গ্রামের মেয়েরা ঘাটে আসে নানান কাজে…”।  মধ্যবয়সী পুরুষের পিছনে চার-পাঁচজন নারী, মাটির কলসি কাঁখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেরই মুখভাবে বিরক্তি।

ভল্লা দ্রুত উঠে এল ঘাট থেকে, করজোড়ে বিনীত স্বরে বলল, “আমাকে মার্জনা করবেন, আমার অন্যায় হয়েছে। আসলে বিগত কয়েকদিন আমার জীবনের ওপর দিয়ে যে প্রবল ঝড় বয়ে গেল, সেই সব কথাই ভাবছিলাম…এই জায়গাটা এতই নিরিবিলি আর সুন্দর…”।

মধ্যবয়সী পুরুষ বলল, “তোমাকে তো বিদেশী মনে হচ্ছে…তুমিই কী সেই যুবক যে ভয়ংকর অসুস্থ অবস্থায় গ্রামপ্রধান জুজাকের বাড়িতে এসেছ?”

ভল্লা আগের মতোই সবিনয়ে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ আমিই সেই হতভাগ্য যুবক”।

মধ্যবয়সী সেই পুরুষ ভল্লার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোমার কথা অনেক শুনেছি। এস, আজ তোমার সঙ্গে আমাদের পরিচয়টা সেরে নেওয়া যাক”। 

 মধ্যবয়সী সেই পুরুষের পিছনে পিছনে ভল্লা উপস্থিত হল প্রাচীন সেই অশ্বত্থ গাছের কাছে। ভল্লা দেখল সেখানে আরও তিনজন মধ্যবয়সী এবং দুজন প্রায় বৃদ্ধ পুরুষ বসে আছে। সকলেরই কৌতূহলী দৃষ্টি ভল্লার দিকে। ভল্লার সঙ্গী পুরুষ পাথরের আসনে বসতে বসতে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই সেই যুবক, মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় জুজাকের ঘরে যে আশ্রয় নিয়েছিল। কবিরাজমশাইয়ের চিকিৎসায় এখন মনে হয় সুস্থ হয়ে উঠেছে”।

বৃদ্ধদের মধ্যে একজন বলল, “তা তোমার নামটি কি হে?”

ভল্লা মাটিতে উবু হয়ে বসে বলল, “আজ্ঞে আমার নাম ভল্লা”।

মধ্যবয়সীদের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করল, “বলি ভল্ল-টল্ল ছুঁড়তে পারো? নাকি শুধু নামই সার”?

খুব বিনীত স্বরে ভল্লা বলল, “আজ্ঞে, একটু আধটু পারি, তবে সে বলার মতো কিছু নয়...”।

আরেকজন মধ্যবয়সী বলল, “তা তুমি পাথরের আসন ছেড়ে মাটিতে বসলে কেন?”

“ছি ছি, আপনারা এই গ্রামের গুরুজন, আপনাদের সঙ্গে একাসনে বসাটা আমার মতো সামান্য জনের পক্ষে ন্যায্য হতে পারে না”।

“তা কোথা থেকে আসা হচ্ছে”?

“আজ্ঞে সেই সুদূর কদম্বপুর থেকে। তবে আমার বাড়ি কদম্বপুর থেকে দূরের এক গ্রামে। রাজধানীতে বাস করি কর্মসূত্রে”।

“তা রাজধানীতে কী রাজকার্য করা হয়?” একজন কিছুটা বিদ্রূপের সুরেই জিজ্ঞাসা করল।

লাজুক হেসে ভল্লা বলল, “আজ্ঞে রাজকার্য করার মতো বিচার-বুদ্ধি কিংবা বিদ্যা কি আর আমার আছে? গায়েগতরে কিছু বল আছে...সেই সুবাদে রাজধানীর অজস্র নগররক্ষীর মধ্যে আমিও একজন”।

ভল্লাকে যে ডেকে এনেছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার কথা বিশ্বাস করা গেল না, হে। নগররক্ষীই যদি হবে – তবে চোরের মার খেয়ে রাজধানী থেকে পালিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হলে কেন?”

কয়েকজন মাথা নেড়ে সায় দিল, দুজন বলল, “ঠিক কথা। সত্যি কথা বল, না হলে এই গ্রাম থেকে তোমাকে আজই বিদেয় করা হবে...”।

ভল্লা বিনীত সুরে কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “আজ্ঞে, শুধু এই গ্রাম নয়, এই রাজ্য থেকেই আমার বিদেয় হওয়ার কথা”।

উপস্থিত সকলেই উত্তেজিত হয়ে বললেন, “তার মানে? নির্বাসন দণ্ড? তুমি অপরাধী?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। নির্বাসন দণ্ড। কিন্তু আমি অপরাধী এ কথা আমি স্বীকার করব না। আমার মনে হয়, আমার কথা শুনলে আপনাদের বিচারে আপনারাও আমাকে অপরাধী বলতে পারবেন না”।

কৌতূহলী ছয় পুরুষ নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল, তারপর এক বৃদ্ধ বলল, “আমাদের বিচারে কী আসে যায়? আমরা তো প্রশাসনিক রায়ের ঊর্ধে নই। অতএব তোমার নির্বাসন দণ্ডের নিরসন আমরা করতে পারব না। কিন্তু তোমার কথা শোনার কৌতূহলও হচ্ছে। আমরা রাজধানী থেকে বহুদূরের বাসিন্দা – রাজধানীর পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। প্রত্যেক বছর কর আদায়ের জন্য যে করাধ্যক্ষ আমাদের পাশের গ্রামে দু-এক মাস অস্থায়ী শিবির স্থাপনা করে - তার থেকে এবং তার অধস্তন কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু সংবাদ পাই। তুমি বল হে ছোকরা। সত্যি মিথ্যে কিছু তো সংবাদ আমরা শুনতে পাবো”।

মাথ নীচু করে ভল্লা কিছুক্ষণ বসে রইল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে না তাকালেও অনুভব করল, তার পিছনেও অনেকে এসে দাঁড়িয়েছে। এবং তার অনুমান তাদের অধিকাংশই তার সমবয়স্ক যুবক এবং তরুণ। নচেৎ তারাও সামনে আসত এবং হয়ত বয়স্কদের পাশে বসত কিংবা দাঁড়াত। এই অনুভবে ভল্লা নিশ্চিন্ত হল। এরকম আসরে তার বিবরণ শোনাতে পারলে, তাকে একই কাহিনী বারবার বলে কালক্ষয় করতে হবে না। সে নিশ্চিত তার ঘটনার কথা অচিরেই এই গ্রামে তো বটেই – আশেপাশের গ্রামগুলিতেও প্রচার হয়ে যাবে।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে, ভল্লা তার বিবরণ বলতে শুরু করল। সেদিনের মধ্যাহ্নের রাজপথে সেই বানজারা রমণীদের কথা। তাদের সঙ্গে রাজশ্যালক লম্পট রতিকান্তর দুরাচারের কথা। নগররক্ষী হয়ে তার দায়িত্বের কথা। এবং ক্রুদ্ধ হয়ে রাজশ্যালকের দিকে ভল্ল ছোঁড়ার কথা, সবই বলল। বর্ণনার শেষে বলল, “বিশ্বাস করুন, রাজশ্যালককে বিদ্ধ করে ওই স্থানেই আমি নিধন করতে পারতাম। করিনি, ভীরু কাপুরুষ লম্পট রাজশ্যালককে আমি শুধু ভয় পাইয়ে নিরস্ত করতে চেয়েছিলাম। রাজশ্যালকের দেহরক্ষীরা আমাকে বন্দী করল। নির্মম অত্যাচার করে উপনগরকোটালের কাছে আমায় সঁপে দিল। আমার প্রতি উপনগরকোটাল কিছুটা স্নেহাসক্ত ছিলেন, রাত্রের অন্ধকারে তিনিই আমাকে রাজ্যত্যাগ করতে আদেশ করলেন। নচেৎ পরেরদিন আমার হয়তো প্রাণদণ্ডও হতে পারত।  প্রশাসনিক বিচারে আমার নির্বাসন দণ্ড হয়েছে। সে দুর্ভাগ্য আমাকে মাথা পেতে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। কিন্তু এ কথা চিন্তা করে আনন্দও পাচ্ছি যে, লম্পট রাজশ্যালক যে শিক্ষা পেয়েছে, অন্ততঃ কিছুদিনের জন্যে সে নিজেকে সংযত রাখবে। আর ওই বানজারা রমণীদের মতোই আরও অনেক কুলনারী, কুমারী কন্যারা ওই লম্পটের গ্রাসমুক্ত থাকবে”।

অন্য এক বৃদ্ধ মন্তব্য করল, “ওই রাজশ্যালকের চরিত্রহীনতার কথা আমাদের কানেও এসে পৌঁচেছে। কিন্তু আমাদের রাজা তো মহান। বিচক্ষণ, প্রজারঞ্জক, দূরদর্শী। তিনি তাঁর এই শ্যালকটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না?”

ভল্লা বিনয়ে হাতজোড় করে বলল, “অনেক কথাই কানে আসে। কিন্তু আপনারা প্রাজ্ঞ-গুরুজন, আমি অতি নগণ্য এক রাজকর্মী। আপনাদের সামনে আমার মতো ছোট মানুষের মুখে বড়ো কথা মানায় না। আমাকে ক্ষমা করবেন”।

পিছন থেকে কেউ একজন বলল, “আপনার আর ভয় কি? আমাদের এই গ্রাম শেষেই এক প্রহরের হাঁটাপথে এ রাজ্যের সীমানা। তার ওপারে গেলেই তো অন্য রাজ্য। আপনি নির্বাসনের দোরগোড়ায় পৌঁছেই গিয়েছেন। আপনি বলুন। আমরা শুনব”।

ভল্লা ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকাল, দেখল তার পিছনে অন্ততঃ পনের জন যুবক দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সঙ্গে আছে বেশ কিছু কিশোর ও বালক!

ভল্লা ঘুরে বসল, যাতে দুপক্ষকেই দেখা যায়। তার বাঁদিকে পাথরের আসনে বসা প্রাজ্ঞজনেরা, আর ডানদিকে অর্বাচীন যুবক-কিশোরের দল। তার কাছে অর্বাচীন যুবক-কিশোররাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ – তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য।

ভল্লা প্রাজ্ঞজনদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাদের অনুমোদন ছাড়া সব কথা প্রকাশ্যে আনা উচিৎ হবে কি?”

যে বৃদ্ধ রাজশ্যালক সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনিই বললেন, “আমরা সত্য সংবাদ শুনতে চাই...তুমি বলো”।

ভল্লা এবার যুবকদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে, ভাই? বসো না। নয়তো আমাকেই উঠে দাঁড়াতে হবে”। ভল্লার অনুরোধে সকলেই বসল। কৌতূহলী মুখে তারা তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে।

ভল্লা বলল, “দেখুন, আমি নগররক্ষী বটি, কিন্তু বিশেষ নগররক্ষীদের মধ্যে একজন। এই বিশেষ ব্যাপারটি বুঝতে গেলে, রাজশ্যালকের চরিতামৃতকথাও জানতে হবে। আগে সেই কথাটিই সেরে নিই।

দুর্গ প্রাকারের মধ্যেই রাজশ্যালকের নিজস্ব একটি মহল আছে। কিন্তু সে মহলে তিনি রাত্রিযাপন করেন না। কারণ তাঁর রাত্রিযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যে বিপুল আয়োজন, তাতে দুর্গের প্রশাসনিক বিধিবিধান ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।   

অতএব দুর্গের বাইরে ক্রোশ দুয়েক দূরে, রাজপথের ধারেই তাঁর নিজস্ব একটি প্রমোদভবন নির্মিত হয়েছে। তা প্রায় বছর দশেক তো হতে চলল। এবং বলা বাহুল্য, সে প্রমোদভবন নির্মাণ হয়েছে মহামান্য রাজার অনুমোদনেই!

সেই প্রমোদভবনের সম্মুখে আছে বিবিধ ফুল ও ফলের বিস্তৃত উদ্যান। বিচিত্র ফুলের প্রচুর লতাবিতান ও লীলাকুঞ্জ। বেশ কয়েকটি কৃত্রিম প্রস্রবণ। প্রমোদভবনে ঢোকার সিঁড়ির দুপাশে, অলিন্দে সাজানো আছে অজস্র নগ্নিকা মূর্তি। গৃহের অন্দরে কী আছে, জানি না, কারণ সেখানে আমাদের প্রবেশের অনুমতি নেই। ওই সমস্ত নগ্নিকা মূর্তির দুহাতে রাখা থাকে পেতলের দীপ। সন্ধ্যার পর সেই নগ্নিকা-মূর্তিদের করকমলের প্রতিটি দীপ যখন জ্বলে ওঠে সে প্রমোদভবনকে ঊর্বশী-রম্ভার নাচঘর মনে হয়।

সুসজ্জিত সেই প্রমোদভবনে রাজশ্যালক প্রতিদিন সন্ধ্যায় যান। সারারাত্তির সুরা ও নারীতে ডুবে থাকেন। খুব সম্ভবতঃ সূর্যোদয়ের পর সার্ধ প্রহরে তাঁর ঘুম ভাঙে এবং মোটামুটি দ্বিপ্রহরে তাঁর নিজস্ব ঘোড়ার গাড়িতে দুর্গ প্রাকারের ভিতর নিজের মহলে ফিরে যান। এই হচ্ছে তাঁর প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কোন ঋতুতেই তাঁর এই অভিসার যাত্রার কোন ব্যত্যয় হয় না – কারণ তাঁর কাছে সম্বৎসরে একটিই ঋতু – মধুর মধুঋতু!

নিত্যনৈমিত্তিক একই ভোগে সুরসিক রাজশ্যালকের সন্তুষ্টি হয় না। তিনি সর্বদা নিত্য-নতুন রমণী সম্ভোগের কামনা করেন। এবং কুলবধূদের কুলনাশ করে তিনি যে আনন্দ পান, বারবধূ সম্ভোগ তার তুলনায় কিছুই নয়। অতএব যাওয়া-আসার পথে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর থাকে, যে কোন যুবতী রমণী – সে সধবা কিংবা বিধবা। অধবা তরুণী কিংবা বালিকা। তাদের কেউ যদি সুন্দরী হয়, তবে রাজশ্যালকের গ্রাস থেকে সেই অভাগীদের পরিত্রাণের উপায় থাকত যৎসামান্য।

মহানুভব রাজার এই বিষয়টি অগোচরে ছিল না। রাজশ্যালকের এই দুরাচারের প্রতিকার চিন্তা করে তিনি আমাদের মতো বিশেষ কিছু রক্ষীকে নিযুক্ত করলেন। আমাদের কাজ রাজশ্যালকের যাত্রাকালে, তাঁর যাত্রাপথে কোনভাবেই যেন কোন রমণী তাঁর দৃষ্টিপথে না আসে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এক কথায় ওই সময়ে সকল রমণী যেন গৃহের ভিতরে থাকে। কেউ যেন কোনভাবেই রাজপথে, নিজ গৃহের সামনে প্রকাশ্যে না আসে”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা একটু বিরাম নিল, কিছুক্ষণ পর বলল, “মহানুভাব রাজা জেনেশুনেই এই ক্ষুধার্ত হায়নাকে রাজপথে অবারিত চলাচলের অনুমতি দিলেন। কিন্তু নিরীহ সাধারণ নগরবাসীকে পরামর্শ দিলেন ঘরের দরজায় খিল এঁটে থাক। আর আমাদের নির্দেশ দিলেন, সকলে দরজায় ঠিকঠাক খিল এঁটেছে কিনা সেদিকে নজর দিতে। স্বাধীন হায়নাটাকে জব্দ করার নির্দেশ তিনি দিতে পারলেন না!”

কথা থামিয়ে হঠাৎই ভল্লা যেন শিউরে উঠল, বলল, “ছি ছি। রাজার অন্নে প্রতিপালিত হয়ে আমি রাজ-সমালোচনা করে ফেললাম? আমার কর্তব্য বিনা বিবেচনায় রাজার নির্দেশ পালন করা। সেখানে বিবেকের তো কোন স্থান নেই! এ আমি, এ আমি কী বলে ফেললাম? ছিঃ”। মাথা নীচু করে ভল্লা মাটির দিকে তাকিয়ে বসে রইল চুপ করে।

উপস্থিত কেউই কোন কথা বলল না। সকলেই তাকিয়ে রইল ভল্লার দিকে। সকলেই যেন মনে মনে ভল্লার বক্তব্যের ভাল-মন্দ বিচার করে দেখছে। নির্বিচারে রাজাদেশ মান্য করাই উচিৎ নাকি কখনো কখনো বিবেকের নির্দেশকেও সমীহ করা বিধেয়?

সেই বৃদ্ধ আবার বললেন, “তুমি বলো ভল্লা। আমরা জানি তোমার বিচার এবং দণ্ডবিধান হয়ে গেছে। তার পরিবর্তন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবু তুমি বলো, আমরা শুনব”। বৃদ্ধকে সমর্থন করে বেশ কিছু যুবক বলে উঠল, “হ্যাঁ, ভল্লাদাদা বলো”।

ভল্লা মাথা তুলে সকলের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল, যুবকদের মধ্যে কয়েকজনের চোখে যেন ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ। ভল্লা বিলম্ব না করে বলল, “সেদিনের ঘটনার কথা আপনাদের আগেই বলেছি। বিবেকের তাড়নায় আমি ওই কাজ করেছিলাম। কিন্তু হত্যা তো করিনি, চরিত্রহীন লোকটার মনে ভয় ধরাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সর্বশক্তিমান মহানুভব রাজা কি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাঁর ওই লম্পট শ্যালককে? লোকটা দিনের পর দিন অপরাধ করেও যে দিব্য স্ফূর্তিতে রয়েছে, সে কি রাজার প্রশ্রয়ে নয়? ওই গর্ভস্রাব লোকটি প্রত্যেক রাত্রে অজস্র অর্থের যে অপচয় করে চলেছে, সে অর্থ কি তার নিজের উপার্জিত নাকি রাজকোষের? অর্থ উপার্জনের মতো কোন যোগ্যতাই যে তার নেই – সে কথা আমরা সকলেই জানি। আপনাদের মতো লক্ষ লক্ষ প্রজার ঘাম-ঝরানো পরিশ্রমের শুল্ক থেকে গড়ে ওঠা ওই রাজকোষের অর্থ, কোন অধিকারে ওই লোকটি এভাবে অপচয় করে চলেছে সে প্রশ্ন আপনারা করবেন না?”

বয়স্ক মানুষরা ভল্লার এই কথায় চমকে উঠলেন। জনৈক বৃদ্ধ বললেন, “উত্তেজনার বশে এ সব বলা তোমার সমীচীন নয় ভল্লা। তুমি রাজার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছ? সরাসরি আমাদের রাজাকেই তুমি অভিযুক্ত করছ? এ তো বিদ্রোহের কথা?”

“কিন্তু প্রশ্নগুলো তো অবান্তর নয়, জ্যাঠামশাই” যুবকদের মধ্যে জনৈক উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ভল্লাদাদা, তুমি জান না, আমাদের এই রুক্ষ বৃষ্টি-বঞ্চিত অঞ্চলে আমরা কী কঠোর পরিশ্রম করি এবং কত সামান্য ফসল ঘরে তুলতে পারি। সেই ফসলেরও রাজকর দিতে হয় এক-তৃতীয়াংশ! সারা বছর আমরা কী খাব, কী পরব। সে কথা রাজা তো চিন্তা করেন না। আর তাঁর শালা রাজধানীতে বসে নিত্য মোচ্ছব চালিয়ে যাচ্ছে?”

বয়স্ক মানুষরা শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। কথায় কথায় ছেলে ছোকরার দল উত্তেজিত হয়ে উঠছে। এরপর আর সামলানো যাবে না। এসব আলোচনার কথা রাজকর্মচারীদের কানে গেলে অশান্তি শুরু হবে। এই প্রসঙ্গ এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। সেই বৃদ্ধ মানুষটি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কথায় কথায় অনেক বেলা হয়ে গেল হে, চলো বাড়ি যাওয়া যাক – স্নান খাওয়া সারতে অবেলা হয়ে যাবে”।

ভল্লাও উঠে দাঁড়াল। সকলকে নত হয়ে প্রণাম করে বলল, “হ্যাঁ তাইতো, বেলা অনেক হল। আর দেরি হলে ওদিকে কমলি-মা আমার পিঠ ফাটাবে। ছোটমুখে অন্যায্য কিছু কথা যদি বলে ফেলে থাকি, ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন”।

ভল্লা গ্রামের ছোকরাদের আচরণে আশ্বস্ত হল। নিশ্চিন্ত হল। ছেলেগুলো একেবারে মিয়োনো নয়, ভেতরে আগুন আছে। ভল্লা তাড়াহুড়ো করবে না, ধৈর্য ধরে সে আগুনকে উস্কে নিতে পারবে। উত্তেজিত যুবকটির চোখে চোখ রেখে সে কিছুক্ষণ দাঁড়াল, তারপর একটু চাপা স্বরে বলল, “বাড়ি যাও ভাইয়েরা, পরে আরও কথা হবে”।   


পরের পর্ব পাশের সূত্রে -  " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৫

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...