বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৩

 



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দ্বিতীয় পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/২ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

তৃতীয় পর্বাংশ 


৪.২ প্রাক-গুপ্তযুগের ভারত

 ৪.২.১ সাতবাহন সাম্রাজ্য

আগের পর্বেই বলেছিলাম, মোটামুটি ৫০ বি.সি.ই-তে সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু হয়েছিল, রাজা সিমুকের হাত ধরে। তাঁর সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা না গেলেও এটুকু জানা যায়, তিনি মোটামুটি ২৯ বি.সি.ই-তে মগধের কাণ্ববংশের উচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন। সাতবাহন বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, সাতকর্ণি, তাঁর কথাও আগে বলেছি। তাঁর মৃত্যুর পর বেশ কিছু বছর, সাতবাহন বংশের তেমন কোন সংবাদ পাওয়া যায় না। এটুকু শোনা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই নাবালক পুত্র শক্তিশ্রী এবং বেদশ্রীর মাতা, রানি নায়নিকা অথবা নাগনিকা রাজ্য পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন। আরেকজন রাজার নাম পাওয়া যায়, যাঁর নাম হাল, তিনি প্রাকৃত ভাষায় একটি সংহিতা রচনা করেছিলেন, যার নাম “গাথা সত্তসই (গাথা সপ্তশতক)”। খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে সাতবাহন সাম্রাজ্যের অধীনস্থ মহারাষ্ট্র জয় করে, প্রথম আঘাত হানল শক-ক্ষত্রপেরা। যদিও শকেরা এই অধিকার খুব বেশিদিন আয়ত্ত্বে রাখতে পারেনি, তাদের পরাস্ত করে, মহারাষ্ট্র আবার জয় করে নিয়েছিলেন, সাতবাহন রাজা গৌতমীপুত্র[1] সাতকর্ণি।

নাসিকের একটি প্রস্তর লিপি থেকে জানা যায়, “তিনি ক্ষত্রিয়দের গর্ব এবং অহংকার চূর্ণ করেছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যে বর্ণপ্রথার পুনর্নিয়োগ করেছিলেন। তিনি শক, যবন এবং পহ্লবদের বিতাড়িত করেছেন, এবং সাতবাহন বংশের হারানো গৌরব আবার ফিরিয়ে এনেছেন”। এই লিপিটি লিখিয়েছিলেন তাঁর মা, রাণি গৌতমী বলশ্রী। এই লিপি থেকে আরও জানা যায়, কোন কোন রাজ্য বা অঞ্চল তাঁর অধিকারে ছিল, যেমন গুজরাট, সৌরাষ্ট্র, মালব, বেরার, উত্তর কোংকন এবং পুনা ও নাসিক। তিনি নিজের নামে, রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অন্য এক লিপি থেকে আরও জানা যায়, তাঁর রাজত্বকালের অষ্টাদশ বছরে নাসিকের কাছে “পাণ্ডুলেন” নামের একটি গুহা এবং চব্বিশতম বছরে বেশ কিছু জমি তিনি সন্ন্যাসীদের দান করেছিলেন। এর থেকে অনুমান করা যায় তিনি অন্ততঃ চব্বিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন।

গৌতমীপুত্রর পরে মোটামুটি ১৩০ সি.ই.তে রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র বাশিষ্ঠি পুত্র শ্রীপুলমাবি। তিনি প্রায় সমগ্র দক্ষিণ ভারতেই সাতবাহন সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবতঃ তিনিই বৈথান বা পৈথানে (ঔরঙ্গাবাদ থেকে ৫৬ কিমি দূরে গোদাবরী তীরে) রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জুনাগড় প্রস্তর লিপিতে তাঁকে দক্ষিণাপথের প্রভু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই লিপি থেকে আরও জানা যায় তিনি দুবার শক-ক্ষত্রপ রুদ্রদমনের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন, এবং অবশেষে রুদ্রদমনের কন্যাকে বিবাহ করে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এর পরিবর্তে তাঁকে শক-মহাক্ষত্রপকে অনেক অঞ্চলই ছাড়তে হয়েছিল। শ্রী পুলামাবির মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি ১৫৫ সি.ই.-তে।

যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি অথবা শ্রীযজ্ঞ সাতকর্ণি ছিলেন সাতবাহন সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর রাজত্বকাল মোটামুটি ১৬৫ থেকে ১৯৫ সি.ই.। তিনি সাতবাহন সাম্রাজ্যের বিস্তার আরও বাড়িয়েছিলেন, তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের সীমানায় ছিল বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে আরব সাগর। নৌবাণিজ্যেও তিনি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর প্রচলন করা মুদ্রার একদিকে ছিল মাছ, শঙ্খ ও অন্যদিকে ছিল  দুই-মাস্তুলের জাহাজের ছবি।  যজ্ঞশ্রীর মৃত্যুর পর সাতবাহন সাম্রাজ্য অতি দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করেছিল এবং আভিররা মহারাষ্ট্র এবং ইক্ষ্বাকু ও পল্লবেরা পূর্বদিকের রাজ্যগুলি অধিকার করে নেওয়াতে সাতবাহন সাম্রাজ্য ভেঙেই পড়ল।

 

৪.২.১.১ সাতবাহন সাম্রাজ্যের সামাজিক বিন্যাস

সমাজের মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। সমাজের উচ্চশ্রেণীতে ছিলেন মহাভোজ, মহারথী এবং মহাসেনাপতি– যাঁরা রাষ্ট্রের প্রশাসন এবং বিভিন্ন প্রদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিলেন আধিকারিকরা– যেমন, অমাত্য, মহামাত্র এবং ভাণ্ডাগারিক, তাছাড়াও ছিলেন, নৈগম (ধনী বণিক সম্প্রদায়), সার্থবাহ (মুখ্য বণিক) এবং শ্রেষ্ঠীন ( বণিকগোষ্ঠী বা গিল্ডের প্রধান)। তৃতীয় শ্রেণীতে ছিলেন বৈদ্য, লেখক (করণিক বা কেরানি), স্বর্ণকার, গন্ধিকা (গন্ধবণিক), হালকীয় (কৃষক) প্রমুখ। আর চতুর্থ শ্রেণীতে ছিলেন, মালাকার, বর্ধকী (সূত্রধর বা ছুতার), দাসক (জেলে)।

 

৪.২.১.২ ধর্ম

সাতবাহন বংশের রাজারা সাধারণতঃ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী হলেও, তাঁরা বৌদ্ধধর্মের প্রতিও সহিষ্ণু ছিলেন। বৌদ্ধভিক্ষুদের জন্যে চৈত্য-গৃহ, মন্দির এবং গুহা নির্মাণে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিলেন। বৌদ্ধবিহারগুলির পরিচালনার জন্যে নিয়মিত অর্থেরও সংস্থান করতেন। তবে প্রধানতঃ তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্মেই বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা নিয়মিত অশ্বমেধ, রাজসূয় এবং অন্যান্য যজ্ঞেরও আয়োজন করতেন এবং ব্রাহ্মণদের প্রচুর দান ও দক্ষিণা দিতেন। সাতবাহন রাজাদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের ঘনিষ্ঠতা দেখে খুব সহজেই আন্দাজ করা যায়, ব্রাহ্মণদের বর্ণাশ্রম বিধি সে সময় বেশ নমনীয় হয়ে এসেছে। সাতবাহন রাজাদের বর্ণ ক্ষত্রিয় না ব্রাহ্মণ সে কথা জানা যায় না। তাঁদের এত দীর্ঘ দিনের রাজত্বে কোন রাজাই সংস্কৃত জানার চেষ্টাও করেননি। অথচ ব্রাহ্মণরা তাঁদের যজ্ঞে পৌরোহিত্য করেছিলেন। অতএব ততদিনে “রাজা মানে রাজাই, তাঁর আবার বর্ণ বিচারের প্রয়োজন কি?” এমন ধারণা চলে এসেছে। এটাই হিন্দু ধর্মের লক্ষণ - হিন্দু সমাজে বর্ণভেদ তখনও ছিল, আজও আছে, কিন্তু রাজা, রাষ্ট্রীয় প্রধান, উচ্চবিত্ত এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের বর্ণ বিচার করবে কোন নির্বোধ?       

সাম্রাজ্যের বহু লোক শিব ও বিষ্ণু[2] এবং অন্যান্য দেবতাদের উপাসক ছিলেন, তাঁদের ধর্মাচরণে সাতবাহন রাজারা কখনও বাধা দেননি, বরং সকল ধর্মবিশ্বাসী মানুষই সদ্ভাবে নিশ্চিন্তে বসবাস করত। সাতবাহন রাজারা ব্রাহ্মণ্য হলেও, তাঁরা সংস্কৃতর থেকে প্রাকৃত ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভাষা ছিল প্রাকৃত। এমনকি রাজা হাল প্রাকৃত ভাষাতে “সপ্তশতক” সংহিতা রচনা করেছিলেন। সমসাময়িক কালে গুণাঢ্য তাঁর “বৃহৎকথা” লিখেছিলেন প্রাকৃতে। সর্ববর্মন নামে এক পণ্ডিত “কাতন্ত্র” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, কোন এক রাজার অনুরোধে। সেই রাজা সংস্কৃত জানতেন না এবং “পাণিনি” পাঠ তাঁর কাছে দুরূহ মনে হত।

 

৪.২.২ শক ও পহ্লব

খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে শকরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার যাযাবর গোষ্ঠী। চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে দলছুট হয়ে আসা ইউ-চি গোষ্ঠীর চাপে, শকরা তাদের সিরদরিয়া নদের অঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণের ব্যাক্ট্রিয়া, পার্থিয়ান এবং সিথিয়ান রাজ্যগুলিতে ঢুকে পড়েছিল। সেই সময়ে এই রাজ্যগুলি নিজেদের মধ্যে নিত্য যুদ্ধ করতে করতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, অতএব শকদের পক্ষে এই তিন রাজ্যে ঢুকে পড়া সহজ হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকেও পরবর্তীকালে শকরা বিতাড়িত হয়ে পূর্বদিকে সরে আসতে বাধ্য হল।

সে সময় কাবুল অঞ্চলে গ্রীক রাজ্য ছিল। গ্রীক রাজ্য পার হয়ে তারা আরও পূর্বে কান্দাহার এবং বালুচিস্তান অঞ্চলে চলে এসেছিল এবং কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে গেল সিন্ধু নদের নিম্ন অববাহিকায়। সেখানেই তাদের প্রথম নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা হল – যার নাম হিন্দু শাস্ত্রে শকদ্বীপ এবং গ্রীক ভৌগোলিকরা বলেন ইন্দো-সিথিয়া। এখান থেকেই শকরা পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজ্য স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। শকদেরই অন্য একটি শাখার সংস্কৃত নাম পহ্লব - কোন কোন ঐতিহাসিক তাঁদের ইন্দো-পার্থিয়ান বলেন। কিন্তু ভারতবর্ষে শক ও পহ্লবদের ইতিহাস সর্বদাই সংযুক্ত এবং দুই গোষ্ঠীকে আলাদা করে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন।

ভারতের উত্তরপশ্চিম সীমান্তে গান্ধার অঞ্চলে শক রাজত্বের প্রথম হদিশ পাওয়া যায় ৮০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি। প্রথম যে শক রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি মোয়েস বা মোগা। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন এজেস, তিনি ওই অঞ্চলের ইন্দো-গ্রীক রাজাকে পরাস্ত করে, আধুনিক ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে ফেলেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালের শুরু মনে করা হয় ৫৮ বি.সি.ই বা ৭৮ বি.সি.ই। মনে করা হয়, তিনিই তাঁর এই রাজত্বকাল থেকে নতুন অব্দের সূচনা করেছিলেন, যার নাম শকাব্দ। সাধারণতঃ ৭৮ বি.সি.ই থেকেই শকাব্দ গণনার হিসাব করা হয়, যদিও এই অব্দ গণনা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ এবং বিরোধ রয়েছে।

পহ্লবরাও উত্তর পশ্চিম ভারতে তাদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, প্রথম শতাব্দী বি.সি.ই-র শেষ দিকে। পহ্লবদের একজন রাজা ভগবান যিশুর শিষ্য সেন্ট টমাসের থেকে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁর নাম গণ্ডোফারিস বা গণ্ডোফার্নিস। সেক্ষেত্রে তাঁর রাজত্বকাল প্রথম শতাব্দী সি.ই.-র মাঝামঝি কোন এক সময়ে। শোনা যায় সেন্ট টমাস ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল থেকে গণ্ডোফার্নিসের রাজসভায় এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি দক্ষিণ ভারতে চলে আসেন। তবে এই তথ্য খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ ভারতে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের যে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তা অনেক পরবর্তী কালের।

পরবর্তীকালে চিনের ইউ-চি উপজাতিদের আক্রমণে, শক এবং পহ্লবরা আরও দক্ষিণে এবং পূর্বে ভারতের মূল ভূখণ্ডে সরে আসতে বাধ্য হন। এই অঞ্চলে তাঁদের অস্তিত্ব বোঝা যায় তাঁদের প্রশাসনিক আধিকারিকদের নাম থেকে।

শক ও পহ্লবরা মূলত অ্যাকিমিনিড এবং সেলুকীয় প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তাঁদের রাজ্যকে তাঁরা কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে নিতেন, এবং প্রত্যেক প্রদেশের প্রধান হতেন একজন সেনাধ্যক্ষ– যাঁকে “মহাক্ষত্রপ” বলা হত। প্রত্যেকটি প্রদেশকে আবার বেশ কিছু অঞ্চলে বিভক্ত করে, প্রত্যেকটির নিয়ন্ত্রণে নিযুক্ত হতেন একজন “ক্ষত্রপ”। এই ক্ষত্রপেরা নিজেদের নামে মুদ্রা প্রচলন করতে পারতেন এবং প্রজাদের জন্যে নির্দেশ লিপি প্রচার করতে পারতেন। অর্থাৎ এক একটি অঞ্চলে ক্ষত্রপেরা ছিলেন প্রায় স্বাধীন রাজা। এই কারণেই প্রধান রাজারা তাঁদের উপাধিতে “রাজাদের রাজা” বা “মহারাজা” ব্যবহার করতেন।

সাতবাহন সাম্রাজ্যের রাজাদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মধ্য ভারতে উজ্জয়িনী, মথুরা এবং পশ্চিম ভারতের গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু অঞ্চলে তাঁদের শক্তিশালী অস্তিত্ব ছিল। শক-ক্ষত্রপ রুদ্রদমনের সঙ্গে সাতবাহন রাজাদের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে শকদের প্রতিপত্তিকে সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার উল্লেখ আগেই করেছি।

 

৪.২.৩ কুষাণ রাজ্য ও কণিষ্ক

খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে, চীনের ইউ-চি-র পাঁচটি যাযাবর গোষ্ঠীর প্রধান কুজুলা কদ্‌ফিসিস ব্যাক্ট্রিয়াতে রাজ্য স্থাপন করেন। তারপর প্রতিপত্তিশালী শকদের তাড়িয়ে তিনি কাবুল থেকে কাশ্মীর – নিজের আয়ত্বে এনেছিলেন। এই রাজ্য থেকেই কুষাণ রাজ্য এবং বংশের সূত্রপাত হল। প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যুর পর, রাজা হয়েছিলেন ওয়েমা বা ভিমা কদ্‌ফিসিস। রোমান মুদ্রার অনুকরণে, কুষাণ রাজারাও স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন, যেগুলি মধ্য এশিয়ায় বহুল ব্যবহার হত। এছাড়া তামার মুদ্রাও প্রচলন করেছিলেন, তার নাম টেট্রাদ্রাখম– এই মুদ্রায় শিবের মূর্তির ছাপ থাকত।

কুষাণ বংশের সবথেকে প্রসিদ্ধ রাজা কণিষ্ক। যাঁর সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে সমগ্র উত্তর-পশ্চিম ভারত তো বটেই এমনকি, শোনা যায় গাঙ্গেয় উপত্যকার চম্পা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মথুরার কাছে একটি মুণ্ডহীন পাথরের পূর্ণাঙ্গ মূর্তি পাওয়া গেছে, বিশেষজ্ঞরা সেটিকে কণিষ্কের মূর্তি বলেই সনাক্ত করেছেন। মূর্তির পরনে আছে মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত কোট এবং বুট জুতো। রাজা কণিষ্কের রাজত্বকাল অনুমান করা হয় ৭৮ সি.ই.। কেউ কেউ মনে করেন, এ সময় থেকেই শকাব্দের গণনা করার প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। যদিও তাতে শকাব্দ গণনার হিসেব মেলে না। কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রধান দুই শহরের নাম পুরুষপুর (আধুনিক পেশোয়ারের কাছে) এবং মথুরা।

কণিষ্ক এবং অন্যান্য কুষাণ রাজারা বড়োবড়ো উপাধি ব্যবহার করতেন। পণ্ডিতেরা বলেন, এগুলি গ্রীস, রোম বা পারস্যের সম্রাটদের অনুকরণ। যেমন রোমান সম্রাটরা ব্যবহার করতেন, “দিভা ফিলিয়াস” (diva filius), যার অর্থ – স্বর্গের পুত্র, কুষাণ রাজারা নিজেদের “দৈবপুত্র” বলতেন। ইন্দো-গ্রীক রাজারা ব্যবহার করতেন “ব্যাসিলিয়স ব্যাসিলেই” (basileos basilei) – যার অর্থ রাজাদের রাজা, কুষাণ রাজারা নিজেদের বলতেন, “মহারাজাতিরাজ”।

 

৪.২.৩.১ কণিষ্ক ও বৌদ্ধধর্ম

এই সময়ে কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ সীমানায় ভারত, চীন ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য তো ছিলই, তার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল সংস্কৃতি ও ধর্মভাবনার আদানপ্রদান, তার মধ্যে ছিল বৌদ্ধ-জৈন-শৈব-ভাগবত-জরোথুষ্ট্রিয়ান-গ্রীকপ্রথার মিশ্রণ। বৌদ্ধরা দাবি করেন, রাজা কণিষ্ক তাঁদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁর সময়েই চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলন হয়েছিল। এই চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলনেই বৌদ্ধদের হীনযানী শাখা ভেঙে নতুন মহাযানী মতের উৎপত্তি হয়েছিল। এই সম্মেলন হয়েছিল কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে। এই সম্মলনের আহ্বায়ক ছিলেন, রাজা কণিষ্কের গুরু, পার্শ্ব। এবং সভাপতি ছিলেন বসুমিত্র এবং অশ্বঘোষ। এই সম্মেলনেই মহাযান ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের প্রধান শাখা হয়ে ওঠে। হীনযানী বৌদ্ধরা প্রাচীন পন্থী, তাঁরা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না এবং তাঁরা বুদ্ধকে দেবতা নয়, মহামানব হিসেবেই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু মহাযানীরা ভগবান বুদ্ধকে দেবতার আসনে বসিয়ে তাঁর পূজা এবং নানান অনুষ্ঠানের প্রথা প্রচলন করেছিলেন। তাঁরা ভগবান বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণ করে, ভক্তি ভরে তাঁর পূজার প্রচলন শুরু করলেন। এমন নয় যে এই সম্মেলন থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান মার্গের সূত্রপাত হল। মহাযানী বৌদ্ধদের গোষ্ঠী বহুদিন ধরেই সক্রিয় ছিল এবং তাদের সঙ্গে প্রাচীনপন্থীদের প্রায়শঃ মতবিরোধ ঘটছিল। এই সম্মেলনে সেই মতভেদ স্বীকৃতি লাভ করল এবং দুটি গোষ্ঠী আলাদা হয়ে গেল।

 

৪.২.৩.২ গান্ধার শিল্প

মহাযানী বৌদ্ধ ধর্ম ভারতীয় শিল্পের নতুন এক দিগন্ত খুলে দিল। এতদিন বৌদ্ধ শিল্প বা স্থাপত্য বলতে, কোথাও বুদ্ধদেবের মূর্তি বানানো হয়নি। সাঁচী বা ভারহুত স্তূপে তাঁর জাতকের অথবা তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য গল্পের অজস্র রিলিফ চিত্র দেখা গেছে। সেগুলিতে সরাসরি ভগবান বুদ্ধের মূর্তি কখনো দেখানো হয়নি, তার পরিবর্তে নানান প্রতীক ব্যবহার করা হত। যেমন তাঁর পদচিহ্ন, বোধি-বৃক্ষ, শূণ্য-আসন অথবা ছাতা। কিন্তু এখন থেকে শিল্পীদের হাতের ছেনির প্রিয়তম বিষয় হয়ে উঠল বুদ্ধ-মূর্তি গড়া। এই সময়ের অধিকাংশ মূর্তিই পাওয়া গেছে গান্ধার অঞ্চলে এবং পুরুষপুরের (পেশোয়ার) আশেপাশে। এই শিল্পকেই পরবর্তী সময়ে গান্ধার-শিল্প নাম দেওয়া হয়েছে। কখনও কখনও এই শিল্পকে গ্রেকো-বুদ্ধিষ্ট (Græco-Buddhist) বা ইন্দো-হেলেনিকও (Indo-Hellenic) বলা হয়, কারণ এই মূর্তির নির্মাণে গ্রীক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। এমনকি কিছু কিছু মূর্তিতে গ্রীক দেবতা অ্যাপোলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য পাওয়া যায়। যদিও পরবর্তী কালের বুদ্ধমূর্তিতে ভারতীয় ভাবনার নিজস্বতা স্পষ্ট ধরা পড়ে এবং সেই মূর্তিগুলিকেই ভারতীয় শিল্পে সর্বত্র অনুসরণ করা হয়েছে।

 

৪.২.৩.৩ কণিষ্কের পরবর্তী রাজারা

কণিষ্কের মৃত্যু সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা করা যায় না, কোন কোন মতে তিনি তেইশ, আবার কোন মতে তিনি একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে বাশিষ্ক এবং তাঁর পরে হুবিষ্ক রাজা হয়েছিলেন। বাশিষ্ক সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে হুবিষ্ক কণিষ্কের সাম্রাজ্যের পুরোটাই ধরে রাখতে পেরেছিলেন এবং যথেষ্ট প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তাঁর রাজত্বে তিনি নিজের নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। সেই মুদ্রায় তাঁর নিজের ছবি এবং অন্যান্য নানান দেবতার ছবি মুদ্রিত থাকলেও, বুদ্ধের ছবি বা প্রতীক দেখা যায় না। তবে হুবিষ্ক যে বৌদ্ধদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন, তাও নয়। শোনা যায় তিনি মথুরাতে বৌদ্ধ বিহার এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তিনি কাশ্মীরে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন, যার নাম হুবিষ্কপুর বা জুস্কপুর যার এখনকার নাম হুষ্কপুর বা উষ্কুর। হুবিষ্কের পরে আরেকজন রাজার নাম পাওয়া বাসুদেব। তিনিও নিজের নামে মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। তবে তাঁর সময়ে কুষাণ সাম্রাজ্য অনেকটাই ছোট হয়ে গিয়েছিল, হয়তো তাঁর রাজ্যের সীমানা ছিল পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের কিছুটা এবং মথুরা অঞ্চল। বাসুদেবের মুদ্রা থেকে অনুমান করা হয় তিনি শৈব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, কারণ তাঁর অনেক মুদ্রায় শিব এবং নন্দী (বৃষ বা ষাঁড়)-এর প্রতীক দেখা যায়। বাসুদেবের রাজত্বের শুরু অনুমান করা হয় ১৫২ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে এবং তিনি পঁচিশ কিংবা তিরিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন।

বাসুদেবের পরবর্তী রাজারা অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন এবং পারস্যের সাসানিয়ান রাজা ফিরিস্তর আক্রমণের পর খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষদিক থেকেই কুষাণবংশের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের দুর্বলতার সুযোগে স্থানীয় গোষ্ঠী নেতারা এখানে সেখানে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে তুলতে লাগলেন।


এর পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/৪



[1] সাতবাহন রাজা সাতকর্ণির নামের সঙ্গে তাঁর মাতৃদেবী গৌতমীর নাম সংযুক্ত হওয়া, আর্য বা ব্রাহ্মণ্য সমাজবিধির পরিপন্থী মনে হয় না? আর্য সমাজে পিতার নামের সঙ্গে পুত্রের নাম জুড়ে দেওয়া খুবই স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। যেমন, রামচন্দ্র দাশরথি, পাণ্ডুর পুত্রেরা পাণ্ডব, কশ্যপের পুত্র কাশ্যপ ইত্যাদি। অবশ্য ব্যতিক্রম ছিল, যেমন মাতা কুন্তীর নাম অনুসারে পাণ্ডবদের কৌন্তেয়ও বলা হত। আবার ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী বুদ্ধদেবও তাঁর মাতার গৌতমী নামটি নিয়েই “গৌতমবুদ্ধ” নামেই নিজের পরিচয় দিতেন। মাতার নামে পুত্রের পরিচয় অনার্য সমাজে প্রচলিত ছিল কি?   

[2] আমরা দেখেছি ইন্দ্র, অগ্নি, রুদ্র, পবন প্রমুখরা ছিলেন বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য দেবতা। তার পাশাপাশি সাতবাহন সাম্রাজ্যে শিব, বিষ্ণু এবং অন্যান্য দেবতাদের পুজো-প্রসঙ্গও সামনে আসতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আর্য - অনার্য ধর্মাচরণ মিলেমিশে যাচ্ছে - এবং সমাজে প্রাধান্য পাচ্ছে অনার্য বিশ্বাস ও ধর্মাচরণ। এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট আলোচনা করা যাবে পরবর্তী পর্বগুলিতে।    


মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


     


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের নবম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব 


২১


মহর্ষি ভৃগু স্নান থেকে ফিরে নিজের আসনে এসে বসলেন। বেদব্রত, ধর্মধর এবং নবীন যুবক তাঁর অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। মহর্ষি ভৃগু নবীন যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বৎস, তোমার নাম কী? কোন গ্রামে তোমাদের বাড়ি, তোমার পিতার নাম কী?”

“মহর্ষি, আমার নাম অর্চন, পিতা শমীক আর গ্রামের নাম বৈকণ্ঠপুর”। করজোড়ে নবীনযুবক বলল।

“তোমরা ভাইবোন কয়টি?”

“আজ্ঞে, আমরা চার ভাই, তিন বোন। আমিই মধ্যম। ভগিনীদের মধ্যে বড়ো ভগিনীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, আর দুই ভগিনী বালিকা”

“তোমার পিতা সুস্থ এবং সক্ষম তো?”

“হ্যাঁ মহর্ষি। তিনি এবং আমার মাতা দুজনেই আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করেছেন। দুজনেই সুস্থ এবং সক্ষম”।

“অতি উত্তম। তুমি কী জান, তোমাকে কেন এখানে আনা হয়েছে?”

“আজ্ঞে আচার্য বেদব্রত এবং আচার্য ধর্মধর, আমার পিতাকে বলেছেন, রাজ্যের বিশেষ কোন প্রয়োজনে আপনি যোগ্য লোকের সন্ধান করছেন। আমাকে যোগ্য বিচার করার জন্য আমার পিতামাতা গর্বিত। অবশ্য আমার কোন বিশেষ গুণের জন্য তাঁরা আমায় যোগ্য বিচার করলেন, সেটা আমি জানি না”।

“মানুষ নিজের দোষ কখনোই বুঝতে পারে না। সামান্য কিছু গুণ থাকলেই বহু মানুষ নিজেকে প্রতিভাধর মনে করে। আর গুণ থাকতেও যে নিজে বুঝতে পারে না, মনে রাখবে সেটাই তার বড়ো গুণ, অর্চন”। স্মিত মুখে মহর্ষি আরো বললেন, “রাজ্যের কোন প্রয়োজনে তোমাকে আমরা নির্বাচিত করেছি, সে কথা তুমি যথা সময়েই জানতে পারবে। কিন্তু এখন কোন কৌতূহল প্রকাশ করবে না। তুমি এখন এই আশ্রমেই থাকবে। আচার্যগণ তোমাকে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ অনুশীলন করাবেন। আমরা আশা করবো সেই শিক্ষা গ্রহণ করে, তুমি অতি দ্রুত নিজেকে উপযুক্ত করে তুলবে”।

“আমি চেষ্টা করবো, মহর্ষি”।

“খুব ভালো। আরেকটা কথা অর্চন, তোমাকে তোমার গ্রাম, পিতা-মাতা, ভাই-বোন সকলকেই ভুলে থাকতে হবে। তাঁদের কথা মনে করে, মন যেন দুর্বল না হয়ে পড়ে। এই আশ্রমে শিক্ষা ও অনুশীলন সম্পূর্ণ করার পর, তোমার নতুন এক পরিচয় হবে। নতুন এক দায়িত্ব হবে, আর সেই পরিচয়ে, তোমার অতীতকে ভুলে থাকতে হবে”।

মহর্ষির এই কথায়, অর্চন অনেকক্ষণ মাথা নত করে চিন্তা করতে লাগল। যখন মাথা তুলল, তার দুই চোখে জল, “মহর্ষি, পুত্র পিতা-মাতাকে ভুলে থাকতে হলে কী তাঁদের মঙ্গল হয়? না পুত্রের মঙ্গল হয়?”

“না অর্চন, সাধারণতঃ হয় না। কিন্তু তোমাকে ভুলে থাকতে হবে। তুমি যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারবে, এই রাজ্যবাসীর ততই মঙ্গল হবে। তোমার গ্রাম, তোমার পিতামাতা, আমরা, এমন কী তুমি নিজেও এই রাজ্যের বাইরে নও, অর্চন। তুমি সবার থেকে আলাদা, তুমি অসাধারণ, তোমার ভুলে থাকাতেই আমাদের সকলের মঙ্গল হবে”।

 বিশ্বপ্রভ আর ধরণী এই সময়ে কক্ষে ঢুকল সকলের আহার নিয়ে। দ্রুতহাতে পরিবেশণ করতে করতে বিশ্বপ্রভ বলল, “গুরুদেব, কাল আচার্য বেদব্রত যে মেয়েটিকে আশ্রমে এনেছেন, সেই কল্যাণী আপনার দর্শনপ্রার্থিনী। বাইরে অপেক্ষা করছেন”।

মহর্ষি নিজে উঠে দাঁড়ালেন, দ্বারের সামনের গিয়ে দেখলেন, আশ্রমবালিকা নবনীতার সঙ্গে অপরিচিতা এক কন্যা দাঁড়িয়ে আছেন। মহর্ষি বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, মা কল্যাণী? ভেতরে এসো”। কল্যাণী এবং নবনীতা দুজনেই মহর্ষির চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করল। তারপর মহর্ষি তাদের নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।

“আসনে বসো, মা। নবনীতা তুইও বোস। ধরণী তোমার আহার কম পড়বে না তো? ওদেরও আহার দাও। আহার করতে করতে পরিচয়ের আলাপ সেরে নেওয়া যাক”।

ধরণী বলল, “কম পড়বে না, গুরুদেব”। বেদপ্রভ ও ধর্মধরের প্রস্থানের পর থেকেই মহর্ষি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকতেন, আজ তাদের সুস্থ প্রত্যাবর্তনে এবং তাদের সঙ্গে আসা তরুণ-তরুণীকে দেখে তিনি এখন দুশ্চিন্তামুক্ত এবং সন্তুষ্ট, তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “তুমিই আমাদের ধরে রেখেছ, ধরণী। তুমি না থাকলে, আমরা কবেই অধরা হয়ে আশ্রম ছেড়ে পালাতাম”।

সকলেই আহার শুরু করার পর, মহর্ষি বললেন, “কল্যাণী, তোমার বাড়ি কোথায়? পিতার নাম?”

নম্র স্বরে কল্যাণী বলল, “আমার বাড়ি বৈকুণ্ঠপুর, পিতা ভদ্রক”।

“বৈকুণ্ঠপুর? অর্চন আর তুমি একই গ্রামের অধিবাসী”?

“আজ্ঞে হ্যাঁ, গুরুদেব। একই গ্রামের তো বটেই, দুজনে অভিন্নহৃদয়ও বটে”। আচার্য বেদব্রত মুচকি হেসে বললেন। অর্চন ও কল্যাণীর লজ্জারুণ মুখের দিকে তাকিয়ে, মহর্ষি আনন্দে হেসে উঠলেন, বললেন, “তোমরা তো অর্ধেক কাজ সেরেই ফেলেছ, বেদব্রত, ধর্মধর। এই বিষয়ে আমি কিছুটা দুশ্চিন্তাতেই ছিলাম। ওদের বিবাহ প্রস্তাবে বর্ণ এবং কুল নিয়ে যদি কোন দ্বন্দ্ব আসে! তবে ওদের দুজনের এই সম্পর্কে, উভয়ের বাড়ি থেকে কোন আপত্তি নেই তো?”

“আজ্ঞে না, গুরুদেব, আপত্তি নেই, বরং সম্মতি আছে। আগামী অগ্রহায়ণে ওদের বিবাহের দিন স্থির হয়েছে। শরতের মাঝামাঝি উভয়ের পিতাই আপনার দর্শনের অনুমতি চেয়েছেন, তাঁরা আশ্রমে এসে ওদের নিয়ে যাবেন”।

এই কথায়, মহর্ষি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, অর্চন তাঁর মুখের দিকেই তাকিয়েছিল, মহর্ষি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিবাহ ওদের হবে। কিন্তু সেই শুভলগ্ন আমরা স্থির করবো। কার্তিকী পূর্ণিমার পূর্বে ওঁদের সপরিবারে আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানিও এবং আশ্রমবাসের সাদর আয়োজন রেখো। বেদব্রত, বিশ্বপ্রভ ও ধরণী, এ দায়িত্ব তোমাদের, ভুলো না”।

বেদব্রত বললেন, “ভুলবো না, গুরুদেব”।

আহারের পর সকলের আচমন হয়ে যাওয়ার পর, মহর্ষি সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই আশ্রমে অর্চন ও কল্যাণী কয়েকমাস থাকবে। আমাদের দায়িত্ব ওদের থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করা। আশ্রমের আচার্যগণ যেমন যেমন বলবেন, সেই অনুসারে ওদের শিক্ষা ও অনুশীলনের ব্যবস্থাও আমাদের করতে হবে। অর্চন ও কল্যাণী, তোমরা বন্দী নও ঠিকই, কিন্তু আশ্রমের সর্বত্র তোমাদের অবাধ গতিবিধি আমার কাম্য নয়। কারণ আমি চাই না, তোমাদের দুজনকে আশ্রমের ভেতরে, বাইরে সকলে চিনে ফেলুক। এই কয়েকটা মাস, তোমাদের উভয়ের মধ্যে গোপনে, আড়ালে কিংবা সর্বসমক্ষে সাক্ষাৎ হোক, এও আমার কাম্য নয়। তোমাদের আবাস আলাদা, তোমাদের পাঠ আলাদা। আচার্যগণ যেমন যেমন নির্দেশ দেবেন, সেই অনুসারেই তোমাদের চলতে হবে”। একটু থেমে থেকে মহর্ষি আবার বললেন, “আমার বক্তব্য আশা করি সকলেই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছ?”

সকলে মাথা নেড়ে সম্মতি দেওয়ার পর, মহর্ষি বললেন, “ধরণী ও নবনীতা, তোমরা ওদের নিয়ে যাওবিশ্বপ্রভ তুমি আচার্যদের বার্তা দিও, বলো, আজ সন্ধ্যায় আমার কক্ষে, আমি সকলের সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় থাকবো”। সকলেই মহর্ষিকে প্রণাম করল। বিশ্বপ্রভ বলল, “সকলকেই বার্তা দেব, গুরুদেব”।

দ্বারের দিকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও অর্চন আবার ফিরে এল, বলল, “আমি কী আর একবারের জন্যেও বাড়িতে ফিরতে পারবো না, মহর্ষি”? তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মহর্ষি বললেন, “আমার তেমনই ইচ্ছা, অর্চন। বিষণ্ণ হয়ো না, ধৈর্য ধরো, যা হবে মঙ্গলই হবে”। আর কিছু না বলে, ধীর পায়ে অর্চন মহর্ষির কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

ওরা সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর, মহর্ষি, বেদব্রত ও ধর্মধরকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “তোমরা অসাধ্য সাধন করেছো, বৎস ধর্ম ও বেদ। বাস্তবে এমন সর্বসুলক্ষণ ছেলে যে পাওয়া যাবে, তাও আমাদেরই রাজ্যে, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। কন্যার কিছু কিছু লক্ষণ সু নয়, কিন্তু সেটুকু এখন আর ধর্তব্য হবে না, কারণ ওদের বিবাহ পূর্ব নির্ধারিত! আমাদের সমাজে অসবর্ণ বিবাহে ঘোরতর আপত্তি আছে, অতএব এক্ষেত্রে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেল”

দুজনেই মহর্ষিকে প্রণাম করলেন, বললেন, “এ সবই আপনার কৃপা গুরুদেব, আপনার শিক্ষা আর আশীর্বাদের ফল”।

মহর্ষি মৃদু হাসলেন, বললেন, “তোমরা উভয়েই দীর্ঘদিন গৃহের বাইরে, এখন বাড়ি যাও, সেখানে সকলেই তোমাদের জন্য অধীর প্রতীক্ষা করছেন। পক্ষকাল পরে তোমরা ফিরে এসো, আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে। নবীন রাজার অভিষেকের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে”।

 

২২

 

সন্ধেবেলা মহর্ষি ভৃগুর কক্ষে আজ জরুরি মন্ত্রণার আহ্বান। সন্ধ্যা আরতির পর গায়ত্রী জপ সেরে আচার্যরা একে একে উপস্থিত হলেন তাঁর কক্ষে। মহর্ষি ভৃগু সকলের অপেক্ষায় নিজ আসনে বসেই ছিলেন। স্মিতমুখে তিনি সকলের প্রণাম গ্রহণ করলেন, সকলকে আশীর্বাদ করে, নমস্কারও করলেন। সকলে আসন গ্রহণের পর, তিনি বললেন, “এই বর্ষা ঋতুতে সকলের শারীরিক কুশল তো? বৎস, বিশ্ববন্ধু তোমার কাছে পীড়িতের আনাগোনা বাড়ছে, না কমছে? সেই অনুযায়ী আমাদের সকলের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি অনুমান করা সম্ভব”।

“না গুরুদেব, এই সময়ে উদরাময় এবং জ্বরজারির মতো কিছু সাধারণ অসুখের প্রকোপ একটু বাড়লেও, আমাদের ব্যস্ততা বাড়ে, শরত আর হেমন্তে। ঋতু পরিবর্তনের সময় শারীরিক অসুস্থতা বাড়ে, বাড়ে নানান জটিলতাও। আপাততঃ আশ্রমবাসী এবং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক, মোটেই উদ্বেগজনক নয়

“অতি উত্তম, বিশ্ববন্ধু। ওদিকে প্রাসাদে রাজাবেণের কী অবস্থা? সর্বশেষ সংবাদ কী?”

“রাজাবেণের শারীরিক অবস্থা এখন অনেকটাই স্থিতু গুরুদেব, সংকট কেটে গেছেতবে তিনি আগের মতো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে”।

“কী রকম?”

“তিনি জীবিত থাকবেন, কিন্তু কোনদিনই কর্মক্ষম হতে পারবেন না। হাত-পা ইত্যাদি কর্মের ইন্দ্রিয়, অবশ থাকবে। দেখতে শুনতে পারবেন, কিন্তু কথা বলতে পারবেন না। তাঁর মস্তিকের কোন কোন অংশ অসাড় হয়ে পড়াতেই এই বিপত্তি”।

“মহারাণী সুনীথাকে এ কথা বলেছেন?”

“বলেছি, গুরুদেব। তিনি সব শুনে কেঁদেছেন ঠিকই, কিন্তু বেশ স্বস্তিও পেয়েছেন মনে হল”।

আচার্য বিশ্ববন্ধুর এই কথায় কেউ কোন কথা বললেন না, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, জিজ্ঞাসু চোখে। আচার্য বিশ্ববন্ধু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাণি পুত্রকে অন্ধ স্নেহ করেন এবং মাতা হিসাবে পুত্রের জীবনাবসান তাঁর কাছে অভিপ্রেত নয়। অতএব রাজা বেণের জীবন সংশয় না থাকাতে তিনি অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছেন! কিন্তু অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত রাজাবেণের নানান কীর্তি, তাঁর মনকে সর্বদাই অনুশোচনায় দগ্ধ করত। রাজা বেণের এই অসুস্থতার পর, মহারাণি নিজে রাজ্য পরিচালনা করাতে রাজ্যে আবার সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আতঙ্কিত প্রজারাও আবার রাণি সুনীথার উপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে। এমন কী যে রাজা বেণের প্রতি তাদের চরম বিতৃষ্ণা ছিল, তাদের সেই মনোভাবও আজ প্রশমিত। তারা এখন রাজাবেণের সুস্থতা কামনা করে, মন্দিরে আরাধনা করে! সব মিলিয়ে মহারাণি এখন, সুখে না থাকলেও, স্বস্তিতেই আছেন”।

“ঠিকই বলেছো, বিশ্ববন্ধু, সকল রাজ্যবাসীদের মতো আমরাও সকলে স্বস্তি পেয়েছি”।

আচার্য সুনীতিকুমার মহর্ষির এই কথায় বললেন, “গুরুদেব, সেক্ষেত্রে আমাদের ওই রাজা বদলের আর কোন প্রয়োজন রয়েছে কি? আমরা খুশী, সকল রাজ্যবাসী খুশী, মহারাণি নিজেও স্বস্তিতে। এই শান্তির পরিস্থিতিতে অকারণ চাঞ্চল্য সৃষ্টির চিন্তা হঠকারি সিদ্ধান্ত না হয়ে যায়”।

মহর্ষি ভৃগু সকল শিষ্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের সকলেরই কী তাই মত, বৎস”?

আচার্য রত্নশীল বললেন, “বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে, আচার্য সুনীতিকুমারের প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত। আমরা সকলেই এই রাজ্যে এই স্বস্তিটুকুই চেয়েছিলাম, আমাদের মনে হচ্ছে, আমরা সেই উদ্দেশ্যে সফল হয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা বিচার করলে, এই পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। মহারাণির বয়স হচ্ছে, মহারাজ অঙ্গের মহামন্ত্রী, অমাত্য, নগরপাল সকলেই বৃদ্ধ, তাঁদেরও বয়েস বাড়ছে। আমরা এই শান্ত পরিস্থিতির সুযোগে, যদি নবীন রাজাকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে ফেলতে পারি, তাঁর পক্ষেও রাজ্য পরিচালনার সব দিক বুঝে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। কী বলেন, আচার্য রণধীর?”

আচার্য রণধীর বললেন, “আমিও তোমার সঙ্গে একমত রত্নশীল। শান্তির সময় অলস বসে থেকে, অসময়ের অপেক্ষা করা, আমাদের উচিৎ নয়। আমরা জীর্ণ একটি গৃহের সংস্কার করে, কাজ চালাচ্ছি মাত্র। এইটুকুতে সন্তুষ্ট থেকে, যখন ঝড় হবে, তখন যা হোক কিছু করা যাবে, এমন ভাবনা আমার মনঃপূত নয়”।

এরপর সকলেই আচার্য রত্নশীল ও রণধীরকে সমর্থন করলেন। আচার্য সুনীতিকুমারও বললেন, “হুঁ, সে কথা ঠিক। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে, নতুন রাজা আমাদের চাই”।

এবার মহর্ষি ভৃগু বললেন,

“তাহলে এই ব্যাপারে আমরা সকলেই একমত, ভবিষ্যতের স্বস্তির জন্য, আমাদের এখনই নতুন রাজা চাই। বৎসগণ, তোমরা সারাদিনে নিশ্চয়ই জেনে গেছো, গতকাল নৈশাহারের সময়, বেদব্রত ও ধর্মধর দুটি ছেলেমেয়েকে আশ্রমে নিয়ে এসেছে। আজ সকালে আমি তাদের দুজনকেই সাক্ষাৎ করেছি, আলাপ-পরিচয় করেছি। বেদব্রত এবং ধর্মধরকে আমরা যে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সে কাজ তারা অত্যন্ত সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেছে। নবীন যুবক, যার পূর্বাশ্রমের নাম অর্চন, সুপুরুষ, বিনীত এবং সনাতন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের কাজ এখন থেকে শুরু হবে। অর্চন, যিনি হবেন আমাদের রাজা পৃথু তাঁকে সকলে মিলে শিক্ষা ও অনুশীলনে, রাজ সিংহাসনের যোগ্য বানিয়ে তুলতে হবে। বৎস রণধীর তুমি তাকে শেখাবে অস্ত্রচালনা আর রণবিদ্যা, বৎস সুনীতিকুমার তুমি শেখাবে রাষ্ট্রনীতি এবং কূটনীতি। বৎস রত্নশীল, তোমার দায়িত্ব, বাণিজ্য এবং রাজ্যের অর্থনীতি সম্পর্কে যতটা সম্ভব তাকে অবহিত করে তোলা। আমাদের হাতে আছে তিনটি মাত্র মাস। এত কম সময়ে সর্ব বিদ্যায় সে পারঙ্গম হয়ে উঠবে, এ বিশ্বাস আমি করি না। আমাদের সে প্রয়োজনও নেই, আমরা তাকে পণ্ডিত করে তুলতে চাইছি না। তবে মন্ত্রী ও অমাত্যদের তাত্ত্বিক আলোচনার সময়, কোন বিষয়ই তার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে উঠুক, সেটাও আমি চাই না”

আচার্য সুনীতিকুমার জিজ্ঞাসা করলেন, “এই নবীন যুবক কী কোন ব্রাহ্মণ পুত্র? অথবা ক্ষত্রিয়, বণিক কিংবা শূদ্র পুত্র?”

“সে কথা আমি তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, বৎস, সুনীতিকুমার। তোমরা জিজ্ঞাসা করে নিও। তবে আমার কাছে এই বর্ণবিচার জরুরি নয়। শূদ্র হয়েও সে যদি যোগ্য হয়, আমি সাগ্রহে তাকে রাজার সম্মান দিতে প্রস্তুত। আমি তাকে বলেছি, তার সমস্ত অতীত তাকে ভুলতে হবে। তার গ্রাম, পিতামাতা, আত্মীয় পরিজন সকলকেই ত্যাগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এই বর্ণভেদের পিছুটান তার থাকবে না, সে হবে একক, মৌলিক এবং স্বয়ম্ভূ। সে এখন যাই হোক, সফল রাজার যোগ্যতায় সে ক্ষত্রিয়ত্ব অর্জন করবে। আমার কাছে সেটাই বড়ো কথা”।

“আপনি যে কন্যার কথা বলেছিলেন, যিনি রাজা পৃথুর রাণি অর্চ্চি হবেন”?

“হ্যাঁ সে কন্যাও এখানে উপস্থিত। দৈববশে সে অর্চনের গ্রামেরই কন্যা। শুধু পরিচিতা নয়, একে অপরের প্রতি আসক্ত। কন্যার নাম কল্যাণী। কল্যাণী ও অর্চন - উভয়ের বাড়ি থেকেই ওদের এই সম্পর্কের অনুমোদন আছে। তারা আগামী অগ্রহায়ণে ওদের পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে”

“তার অর্থ এই নবীন যুবককে আমাদের রাজার পদে, আপনি অভিষেকের জন্য অনুমোদন করছেন?”

“করছি, বৎস সুনীতিকুমার”।

আচার্য রণধীর বললেন, “আপনার নির্দেশ অনুসারে, অর্চনের শিক্ষার জন্য আমাদের সকলে মিলে একটি প্রাত্যহিক শিক্ষাসূচী প্রস্তুত করতে হবে। সকাল ও দ্বিপ্রহর, বৈকাল ও সন্ধ্যা – এই চারটি সময়ে তার শাস্ত্রচর্চা এবং রণচর্চার বিভাগ তৈরি করতে হবে”।

“ঠিক বলেছ, বৎস রণধীর। আমার প্রস্তাবে সকালে ও বৈকালে যদি শরীরচর্চা ও অস্ত্র চালনা শিক্ষা করাও, ওর পক্ষে সুবিধা হবে। কিছুটা বিশ্রামের পর দ্বিপ্রহরে এবং সন্ধ্যায় শাস্ত্রচর্চা। দ্বিপ্রহরে বাণিজ্য ও অর্থনীতি এবং সন্ধ্যায় রাষ্ট্রনীতি। সমস্ত বিষয়গুলিকে এইভাবে ভাগ করে নিতে পারো। শুরুর দিকে সহজ কথায় সহজ তত্ত্ব শিক্ষা, তারপর ধীরে ধীরে কঠিন তত্ত্বের আলোচনা। অবশ্য সবটাই নির্ভর করবে অর্চনের শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ এবং ওর বুদ্ধিমত্তার ওপর”।

“যথার্থ বলেছেন, গুরুদেব, শিক্ষার্থীর আগ্রহ ছাড়া কোন শিক্ষাই সফল হতে পারে না”।

“অর্চনের যদি শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ ও মেধা না থাকে?” আচার্য সুনীতিকুমার বললেন।

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হেসে বললেন, “শিক্ষায় খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেই আমাদের মঙ্গল, বৎস সুনীতিকুমার। বেশি তত্ত্ব জানলে পাণ্ডিত্য আসে, কাজের ইচ্ছা চলে যায়। অন্য কেউ কাজ করতে চাইলে, তত্ত্বের বিতর্ক তুলে পণ্ডিতেরা কাজে বাধা সৃষ্টি করে। নিজে তো কোন কাজ করেই না, অন্যের ভুল ধরতেই তারা ব্যস্ত থাকে”

“গুরুদেব, আত্মসমলোচনায় আপনি কী বড্ডো কঠোর হয়ে উঠছেন না?”

অট্টহাস্যে হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “বৎস সুনীতিকুমার, যে কোন রাজ্যের প্রজাসাধারণই সেই রাজ্যের প্রশাসনের অন্নদাতা।  এমনকি সামান্য এই আশ্রমেরও পঠনপাঠনসহ সামগ্রিক ব্যয়ভার বহন করে সহস্র গ্রামবাসী, তাদের কঠোর পরিশ্রমের মূল্যে। এর পরিবর্তে আমরা ওই গ্রামবাসীদের কী প্রতিদান দিই বলো তো? এখন একটা সুযোগ এসেছে, আমরা যদি একজন প্রজাপিতা রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে এই রাজ্যে সুশাসন এনে দিতে পারি, তাতেই এই সরল সাধারণ গ্রামবাসীদের দানের কিছুটা প্রতিদান দেওয়া হবে”।

“কিন্তু এই রাজাও যদি ব্যর্থ হয়? ঠাকুর গড়তে গিয়ে যদি এই যুবকও বাঁদর হয়ে ওঠে”?

“হতে পারে, তেমন হলে হতাশই হবো। কিন্তু তাতেও একটা সান্ত্বনা তো থাকবেই, আমরা নিশ্চেষ্ট বসে থাকিনি, আমাদের সাধ্যমতো এবং বিবেকবুদ্ধি অনুসারে চেষ্টা করেছিলাম। তোমরা মনে কোন দ্বিধা না রেখে, আগামীকাল থেকেই অর্চনের শিক্ষা শুরু করো”।

“না, না, শিক্ষা তো সে পাবেই। আজই রাত্রে আমরা সকলে বসে, তার শিক্ষাক্রম এবং পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে ফেলবো, আগামীকাল থেকেই তার পাঠ শুরু হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি শুধু এই কাজের সম্ভাব্য ফলাফলের আলোচনা করছিলাম, গুরুদেব”।

“অতি উত্তম, বৎস। আমার আরেকটি প্রস্তাব আছে। প্রতি সপ্তাহে অর্চন কতটা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলো, সেটা পর্যালোচনা করে নিও। প্রয়োজন মনে করলে, পরবর্তী সপ্তাহের পাঠক্রমে পরিবর্তন করে নিতে পারবে”।

“তাই হবে, গুরুদেব”।

“বৎস সুনন্দ, এবার তোমার কাজ কতদূর এগিয়েছে বলো”।।

“গুরুদেব, চারণ কবিদের গাওয়ার মতো বেশ কিছু গান রচনা করেছি, সুরও দিয়েছি। আপনার অনুমোদন পেলে, সে সব গান আমি চারণকবিদের কণ্ঠে তুলে দেব। আপনি যখন থেকে বলবেন, তারা গ্রামে শহরে ছড়িয়ে পড়ে, দেশের মানুষকে সেই সব গান শোনাতে থাকবে”।

মহর্ষি ভৃগু আচার্য সুনন্দর মুখের দিকে প্রসন্নমুখে তাকিয়ে স্মিত হাস্যে বললেন, “বাঃদু একটা গান আমরাও সকলে শুনি না, সুনন্দ। আমাদের তাত্ত্বিক মনে কেমন ঝংকার তোলে দেখি”। 


এর পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব "


রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

ছিন্ন শিকল পায়ে

 


এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - " খাইদাই গানগাই 

ছোট্ট নীড়ে পক্ষীমাতার পক্ষপুটে বড়ো হতে থাকে পক্ষীশাবক। সে শাবক মাতার তত্ত্বাবধানে বড় হতে হতে তার ছোট্ট দুই ডানায় পেতে থাকে ওড়বার শক্তি। যেদিন তার ওড়বার সাধ্য হয়, সে খুঁজে পায় অনন্ত আকাশ। সে দিন থেকেই তার চোখে ধরা দেয় নীড়ের সংকীর্ণতা! নীড়ের উষ্ণ স্নেহ আর নিরাপত্তার চেয়েও বড়ো হয়ে ওঠে আকাশের বিস্তার আর তার নিজস্ব জগত। তারপর একদিন সে আর ফিরে আসে না তার বাসায়। শূণ্য নীড়ে অপেক্ষা করতে থাকা বিষণ্ণ পক্ষীমাতা একসময় মেনে নেয় সন্তানের দূরত্ব, দীর্ঘশ্বাস ফেলে উড়ে যায় জীবনের পরবর্তী লীলায়!

মাস দুয়েকের র‍্যাগিং পিরিয়ডের পর মাস দুয়েক হস্টেল জীবনের সঙ্গে ধাতস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। এই চারমাসে আমার মধ্যে অনেকখানি পরিবর্তন এসে গিয়েছিল সেটা আমি নিজেই উপলব্ধি করছিলাম। চারমাস আগে, যে আমি হস্টেলে এসেছিলাম, মানসিকতায় ও চালচলনে এই আমির সঙ্গে তার বিস্তর ফারাকআত্মবিশ্বাস ও বাস্তববোধ বেড়ে গিয়েছিল, কমে আসছিল সূক্ষ্ম অনুভূতিসমূহ। আশৈশব মা ও বাবার সাবলীল নিয়মের বন্ধনমুক্ত প্রায়-উচ্ছৃঙ্খল হস্টেল জীবনযাত্রার প্রভাব ফুটে উঠছিল আচারে ব্যবহারে।

হস্টেলে র‍্যাগিং পিরিয়ড যখন চলছিল, মাকে চিঠি লিখতাম নিয়মিত। সে চিঠিতে র‍্যাগিংয়ের কোন অত্যাচারের কথাই উল্লেখ থাকত না, কিন্তু আমার মানসিক অস্থিরতাটুকু বুঝে নিতে এতটুকু অসুবিধে হত না মায়ের – সেটা বুঝতে পারতাম মায়ের উত্তরসমূহে। র‍্যাগিং পিরিয়ড সমাপ্তিতে যত অভ্যস্ত হয়ে উঠতে লাগলাম হস্টেলের জীবনে্র সঙ্গে, আমার চিঠি লেখা অনিয়মিত হয়ে উঠতে লাগল। চিঠির ভাষা হয়ে উঠল সীমিত, সংক্ষিপ্ত আর অনান্তরিক - যেন নিয়মরক্ষা! বৃহত্তর জীবনপ্রবাহের অনুকূল বাতাসে বেয়ে চলা তরীর কি মনে পড়ে, পাড়ে বিছিয়ে রাখা শান্ত সবুজ মৃন্ময়ী আঁচলের কথা?

মায়ের পক্ষে সে পরিবর্তন উপলব্ধি না করার কোন কারণ ছিল না। অধীর আগ্রহে মা অপেক্ষা করছিলেন আমার ফেরার দরজা খুলে যখন তিনি বললেন – “এসে গিয়েছিস, আয়” তাঁর চোখের প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে গিয়েছিল আমার যাবতীয় পরিবর্তন। তাঁর আদরের ঘুনু যে আর সেই ঘুনু নেই – হয়ে উঠতে চলেছে মিঃ পান্নাবরণ সেটুকু বুঝে উঠতে তাঁর দেরি হয়নি।

বাড়িতে আসার দিন আমার প্রিয় রান্নার আয়োজনেই মা ব্যস্ত রইলেন। হস্টেলের রান্নার কোন ছিরিছাঁদ নেই এ কথা মা আমার মুখেই শুনেছিলেন। কিন্তু পরের দিন বাবা অফিস বেরিয়ে যাবার পরেই যখন আমিও বললাম, “ভাত দাও, বেরোব”।

মা যেন চমকে উঠলেন, বললেন, “কোথায় যাবি?” তেমন কোনো কাজ ছিল না, ছিল না তেমন কোন নির্দিষ্ট প্রোগ্রামওহয়তো কোন বন্ধুর বাড়ি যাবো, সেখান থেকে ঠিক করা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। স্পষ্ট কোন জবাব দিতে পারলাম না

ম্লান মুখে মা আবারও বললেন, “এই তো এলি, কদিন পরেই আবার চলেও যাবি, এর মধ্যে না বেরোলেই নয়”?

মায়ের চোখে চোখ রাখলাম – অসহায় বিষণ্ণতা চোখে। একা ও নিঃসঙ্গ। জোর করে আমাকে আটকে রাখার জোরটুকুও অবশিষ্ট নেই আর। এতই বড় হয়ে গেছি আমি! এর আগে আর কোনোদিন এভাবে দেখিনি মাকে, আমি হাসলাম, বললাম, “ঠিক আছে বেরোব না, হয়েছে?”

“হ্যাঁ হয়েছে”, উজ্জ্বল চোখে হেসে মা বললেন “দাঁড়া তোর জন্যে মাছের ডিমের বড়া আর চা করে আনি – তুই ভালোবাসিস”। ছোট্ট মেয়ের মতো খুশি হয়ে মা চলে গেলেন রান্নাঘরে।

 

মা যখন ডিমের বড়া আর চা নিয়ে এলেন, আমি শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলাম, মা বললেন, “নে ওঠ, গরম গরম খেয়ে নে, ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না”।

আমি উঠে পড়লাম। মায়ের কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিন্তু এতটুকু ক্লান্তি নেই, খুব খুশি। মা নিজের জন্যেও চা এনেছিলেন, বসে খেতে খেতে বললেন, “মামাবাড়ির ভামিমাসিকে মনে আছে তো, তোর?”

“হুঁ”

“গতমাসে মারা গিয়েছে”।

“তাই নাকি? আমার নির্বিকার স্বরে আমি নিজেই অবাক হলাম। এই দু বছর আগেও মামাবাড়ি গিয়েছিলাম যখন – তার চোখের দৃষ্টিতে দেখেছিলাম অহেতুকী ভালোবাসা। ভাঙাচোরা কালো মুখে নির্মল হাসি নিয়ে জিগ্যেস করেছিল, “পান্নাদাদা কখন এলে? ভালো আছো তো, বাবা? নদিদি ভালো আছে, বাবা ভালো আছে? হীরকদাদা ডাক্তার হয়ে গেল, নয়”? 

মা তাঁর নিজের মনেই তখনও বলে চলেছেন, “হ্যাঁ। দাদা চিঠি দিয়েছেবেচারা খুব কষ্ট পেল, জানিস? ভালো মানুষদের এমনই হয়। জীবনে শান্তি পায় না। শেষদিকে চোখে ভালো দেখতে পেত না। ছেলেরা, ছেলের বউরা কেউ দেখত না। বুড়ি একা একা সব কাজ করত। পুকুরঘাটে পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেয়েছিল খুব। বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারত না। কে দেখবে? কে পথ্যি করবে? এক গ্লাস জল গড়িয়ে দেবারও কেউ ছিল না মরবার সময়। বিছানায় শুয়ে থেকে থেকে বেড সোর – কি কষ্ট মানুষের। মরে গিয়ে শান্তিই পেল। সারাটা জীবন পরের বাড়িতে খেটে মরল বেচারা দুমুঠো অন্নের জন্যে। আমাদের ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি কি খাটতে পারত, ভামিমাসি। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা কামাইয়ের বালাই ছিল না। কোনদিন অসুখে পড়তে দেখিনি। সবসময় হাসিমুখ। খুব মায়া মমতা ছিল শরীরে।

একবার বেশ মজা হয়েছিল, জানিস। সেবার পোষের সংক্রান্তি কাটিয়ে মায়ের কাছে গেছি, দিন পনের থাকবো বলে। আমার তখন বছর চারেক বিয়ে হয়েছে, তুই তখনো হস নি - হীরুর তখন বছর আড়াই বয়েস। গাঁয়ে যাত্রা হচ্ছে – কি বেশ নাম ছিল ভুলে গেছি। খুব যুদ্ধ-টুদ্ধ ছিল আর কি, বুঝলি? মাঝে মাঝেই ভীষণ ঢাল-তলোয়ারের লড়াই হচ্ছে, খুব জমাটি পালা।  দাদা হয়েছিল কর্ণ – হ্যাঁ, মনে পড়েছে, যাত্রার নাম ছিল “কুন্তীপুত্র কর্ণ”। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। রণক্ষেত্রে কর্ণের রথের চাকা বসে গেল, লড়াই থামিয়ে কর্ণ গিয়েছে রথের চাকা মাটি থেকে টেনে তুলতে আর সেই সুযোগে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন ছুঁড়ে দিল পাশুপত অস্ত্র। ব্যস, কর্ণ মারা গেল। ঘর থেকে আলতা নিয়ে গিয়েছিল, দাদা মারা যাবার সময় সেটা কায়দা করে ঢেলে দিয়েছিল নিজের জামায় আর মেঝেয়...। ব্যস ভামিমাসি ফিট হয়ে গেল সেই দৃশ্যে...এত অক্ত কেন গো, এত অক্ত কেন? অক্ত জানিস তো, রক্ত – ভামিমাসিরা রক্ত বলতে পারত না, বলতো অক্ত, রঙকে বলতো অঙ। ভামিমাসির স্বামী তখনো বেঁচে ছিল – সে যত বলে ওটা অক্ত নয় গো, অক্ত নয় – ওটা অঙ। ভামিমাসি বুঝলে তো? এত সরলতা আর মায়া ছিল, মানুষটার মধ্যে। সেই মানুষটা এত কষ্ট পেল মারা যাবার সময় শুনে খুব মন খারাপ করছিল...”। 

মা চুপ করে গেলেন। আমি মুখের দিকে তাকিয়ে শুনছিলাম মায়ের কথা। ছোটবেলায় মায়ের কাছে অনেক গল্প শুনেছিভূতের গল্প, রূপকথার গল্প, রামায়ণ, মহাভারত আর পুরাণের গল্প - কিন্তু সে সব গল্প ছিল নিছক গল্পই। আজ মা যা শোনালেন সে তাঁর ফেলে আসা জীবনের কথা। তাঁর কণ্ঠস্বরে ছিল মায়া, প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে ছিল মমতা। 

আমার মামাবাড়ির প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ভামিমাসি ওতপ্রোত জুড়ে ছিল। তার বাইরে যে তার নিজস্ব একটা ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে, এমন কোনদিন কারো মনেও হয়নি, আমার তো হয়ইনি। আজকাল “ওয়ার্কহোলিক” বলে একটা কথা খুব শুনি, সফল ব্যক্তিত্বের বর্ণনায়ভামিমাসি কোন ব্যক্তিত্ব নয়, তার সারাদিনের কাজের কোন কৌলিন্যও ছিল না। মায়ের কাছে ভামিমাসির জীবনের এই একটামাত্র ঘটনা শুনে আমার চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গেলআমার ভাবনা চিন্তার নিদারুণ কূপমাণ্ডুক্য প্রকট হয়ে উঠল আমার নিজের চোখেই!     

 

আমরা যখন কাছে ছিলাম, মায়ের সমস্ত চিন্তা জুড়ে থাকত আমাদের সুবিধে-অসুবিধে, কল্যাণ – অকল্যাণ। আমাদের বড়ো করে তোলা, মানুষ করে তোলার চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিল তাঁর সমস্ত মনন। রেডিওতে বাংলা গান শোনা ছাড়া তাঁর আর কোন বিলাসিতা কোনদিন দেখিনি। কলকাতা শহরে এতদিন থেকেও কটা সিনেমা তিনি দেখেছেন, হাতে গুনে বলে ফেলা যায় অনায়াসে। তাও দেখেছেন হয় সত্যজিতের সিনেমা অথবা কোন মহাপুরুষের জীবনী – যা আমাদের সঙ্গে নিয়ে দেখা চলতে পারে। এও এক তপস্যা বলেই আমার মনে হল।

মায়ের সেই তপস্যা সিদ্ধ হয়েছে – দুই সন্তানের একজন ডাক্তার, অন্যজন হতে চলেছে ইঞ্জিনীয়ার। দুই শিশুর গর্বিতা জননী হিসেবে যে স্বপ্ন তিনি লালন করে এসেছেন এতদিন – তা আজ পূর্ণ। স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে অনলস শ্রমের পর আজ তাঁর লক্ষ্যহীন অখণ্ড অবসর। তিনি নিঃসঙ্গও হয়ে পড়েছেন নিদারুণ

উপলব্ধি করলাম এই কটা মাসে আমিও যেমন অনেকটা বড়ো হয়ে গেছি, মায়েরও বয়েস হঠাৎ অনেকটাই বেড়ে গেছে! দুই ভাইয়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে মায়ের কত কাজ যে কমে গেছে! জামাকাপড়ের আলনা এলোমেলো হয় না। দিনের পর দিন পড়ার টেবিল, বইয়ের শেল্‌ফ্‌ ঠিকঠাক সাজানো থাকে। বালিশের তলা থেকে ভিজে গামছার পুঁটলি বের হয় না। মিটশেফ থেকে চুরি হয় না কোন লোভনীয় খাবার! এককথায় তাঁর জীবন থেকে মুছে গেছে তাঁর পুত্রদের দৌরাত্ম্য। কারণ তাঁর দুই সন্তানই বড় হয়ে গেছে অনেক 

সারাদিন দৌরাত্ম্যহীন একলা ঘরে কাজ খুঁজতে খুঁজতে তাঁর মনে আসে ফেলে আসা অতীতের স্মৃতিতাই ভামিমাসির অবহেলিত মৃত্যুও তাঁর মনে নাড়া দিয়ে যায় ভীষণভাবে। ভামিমাসির কথা শেষ করে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গেলেন খালি চায়ের কাপ আর প্লেট নিয়ে।

খবরের কাগজের পাতায় চোখে পড়ল – অরুণাতে “সাড়ে চুয়াত্তর” চলছে। মাকে ডেকে বললাম, “মা, সিনেমা যাবে? “সাড়ে চুয়াত্তর” – দারুণ হাসির সিনেমা। তুলসী চক্রবর্তী আর ভানু ব্যানার্জি আছে...চলো দেখে আসি”।

“আমি? পাগল হয়েছিস নাকি? হঠাৎ আমাকে নিয়ে পড়লি কেন? আমার এখন কত কাজ। তুই বরং দেখে আয়”

“পাগল হবার কি আছে? ম্যাটিনি শো তিনটে থেকে শুরু। সাড়ে পাঁচটায় শো ভেঙে যাবে। ভাত খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আড়াইটে নাগাদ বেরোলেই যথেষ্ট। সারা জীবন তো অনেক কাজ করলে, আজ একটু ফাঁকি মারলে কেউ কিছু বলবে না, চলো”।

“বাবাঃ, তুই দিব্যি কথা শিখেছিস তো? টিকিট পাবি?” মুখে হাসি নিয়ে মা বললেন।

“আমি এখনই বের হচ্ছি, টিকিট ঠিক যোগাড় হয়ে যাবে। তুমি বরং এদিকে রেডি হও, আমি যাব আর আসবো”।

 সেদিন “সাড়ে চুয়াত্তর” দেখে মা খুশি হয়েছিলেন খুব, বাবা ও দাদা রাত্রে বাড়ি ফিরতে অনেকক্ষণ সিনেমা নিয়ে কথা বললেন। সেবার ছুটিতে দিন সাতেক বাড়িতে ছিলাম, চেষ্টা করেছিলাম যতটা সময় সম্ভব বাড়িতেই থাকতে। রোববার দিন মাকে সম্পূর্ণ ছুটিই দিয়ে দিলাম রান্নাঘরের কাজ থেকে। বেশ ক বছর আগে মা মাসখানেকের জন্যে একবরে শয্যাশায়ী রকমের অসুস্থ হয়েছিলেন। সে সময় মায়ের গাইডেন্সে আমার রান্নায় “হাতে খুন্তি” হয়েছিল। সেদিন আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া গেল আমার রান্নার বিদ্যে। মা রান্নাঘরের বাইরে বসে যোগাড় করে দিচ্ছিলেন আর অনর্গল কথা বলছিলেন। সনাতন বাংলার নিরামিষ রান্নার রেসিপি আর মায়ের হাতের রান্না খেয়ে কে কি বলেছিলেন তার অতীত স্মৃতি। বহুদিন পর মাকে সেদিন এত খুশি আর হাল্কা মেজাজে দেখে ভীষণ মায়া হল মায়ের ওপর।

মায়ের এই ছোট্ট নীড়ের বাইরে আমাকে তো যেতেই হবে। আমার পায়ের শিকল ছিঁড়ে গেছে কবেই। এখন ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে আমার এই ফিরে আসায় মা যে আনন্দটুকু পেলেন, সেটাই হয়ে রইল আমার সারা জীবনের সম্পদ।

এর পরের রম্যকথা পাশের সূত্রে - " রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম

শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৫

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের চতুর্থ পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪

 

সকালে জুজাকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি যে পুকুরটা দেখছিল, সেই পুকুরেই কয়েকটা ডুব দিয়ে নিল ভল্লা। গামছায় গা মুছে ভেজা কাপড় বদলে পরে ফেলল চাদরটা। তারপর নেংড়ানো ভেজা কাপড় কাঁধে ফেলে দ্রুত পায়ে বাড়ি ঢুকল। দড়িতে ভেজা কাপড় শুকোতে দিতে দিতে ভল্লা হাঁক পাড়ল “কই রে, মা। খিদেয় তো পেটে আগুন ধরে গেল, অসুস্থ শরীরে এই অনিয়ম সহ্য হয়?”

ডাক শুনে কমলি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, ভুরু কুঁচকে রাগী গলায় বললেন, “সভা ডেকে সবাইকে এতক্ষণ তোর গল্প শুনিয়ে এলি, এখন আমাকে দুষছিস, হতভাগা ছেলে?”

ভল্লা ভুরু নাচিয়ে হাসল, বলল, “চাদরটা ছেড়ে আসি, ততক্ষণ তুই খাবার বাড়। সত্যি খুব খিদে পেয়েছে রে, মা”।

“বাড়ছি, আয়। তোরা রাজধানীর রাজকাজ করা লোক, আমাদের এই অখাদ্য খাবার কী করে খাচ্ছিস, সে তুইই জানিস?”

ভল্লা নিজের ঘরে গিয়ে শুকনো ধুতি পরতে পরতে কমলি-মায়ের কথা শুনে বুঝল, তার গল্প-কথা গ্রামে সকলের কাছেই চারিয়ে গিয়েছে। এত দ্রুত ছড়িয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। অবিশ্যি কমলি-মা, গ্রাম প্রধানের বউ। তার ওপর এই কমলি-মায়ের সেবাতেই সে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। অতএব কমলি-মায়ের কাছে তার খবর যে উড়ে আসবে তাতে আর আশ্চর্য কি? তবে ভল্লা একটু অবাক হল, জুজাক বাড়িতে নেই! বৃদ্ধদের প্রভাতী আড্ডাতেও ছিল না! তার কথা বয়স্ক এবং বৃদ্ধরা কেউ কিছু বললও না। জুজাক কি গ্রামেই নেই? কোথায় গিয়েছে? কখন বেরিয়েছে? নিশ্চয়ই সে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই বেরিয়েছিল। কমলি-মা দুয়োরে জলছড়া না দিয়ে তো কাউকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দেওয়ার লোক নয়! লোকটা ফিরবেই বা কখন?

দাওয়ায় বেরিয়ে এসে ভল্লা দেখল আসন পাতা হয়ে গেছে, মাটির কটোরায় জলও রয়েছে। সে আসনে বসে এক চুমুকে কটোরার জল খেয়ে ফেলে, আরামের আওয়াজ করল “আঃ”। কমলি-মা ভেতর থেকে মাটির থালে ভুট্টার রুটি আর একটু ডাল নিয়ে বেরিয়ে এলেন, আসনের সামনে থাল রাখতে রাখতে বললেন, “খাওয়ার আগেই পুরো জলটা খেয়ে নিলি? খাওয়ার আগে জল খেতে নেই, তোর বাড়িতে কেউ বলেনি? মা, বোন, বউ কেউ নেই নাকি রে তোর”?

ভল্লা রুটির টুকরো ছিঁড়ে ডালে ভিজিয়ে মুখে পুরে বলল, “সবাই আছে, রে মা। তবে কিনা, যারা মায়ের কথার অবাধ্য হয়, তাদের প্রতিই মায়েদের আদর থাকে একটু বেশি। আর তাতেই তো আমার লোভ…” ভুরু নাচিয়ে হাসল ভল্লা, আবার বলল, “তোদের গাঁয়ের ওই ধুকধুকে বুড়োগুলোর সঙ্গে বকবক করতে করতেই তো গলা শুকিয়ে উঠেছিল – তাই জল দেখেই মেরে দিলাম ঢকঢক করে”। কমলি-মা ছোট্ট কলসিতে জল এনে ঢেলে দিলেন মাটির কটোরায়।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “প্রধানমশাই কোথায় গেছে, মা? দুপুরে খেতে আসবে না?”

“প্রধান গেছে, আস্থানে – রাজার কাছারি বাড়িতে। সঙ্গে গেছে আরও তিনজন। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে”।

“কিসের জন্যে গিয়েছে, জানিস মা?” ভল্লার কণ্ঠে কিঞ্চিৎ উদ্বেগ। ভল্লা জানে শীতের শেষে এই সব অঞ্চলের কর আদায়ের জন্যে কাছারিতে রাজকর্মচারীদের আগমন ঘটে। তারা প্রত্যক্ষ তদন্ত করে ফসলের পরিমাণ গণনা করে, কর নির্ধারণ করে। জুজাক কি সেই বিষয়েই কথা বলতে গেছে? অথবা কাছারির রাজকর্মচারীর কাছে, তার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে যায়নি তো? ভল্লা জানে জুজাক প্রথম থেকেই তার প্রতি বিরক্ত। তাছাড়া গ্রাম-প্রধান হিসেবে, তার মতো অচেনা-অজানা উটকো একজন লোকের গ্রামে এসে পৌঁছনোর সংবাদ দেওয়াটা, তার কর্তব্যও বটে! অবিশ্যি, যে রাজকর্মচারী এসেছে, সে রাজধানী থেকে যদি ভল্লার সংবাদ জেনেই এসে থাকে – তাহলে ভল্লার উদ্বেগের কারণ নেই অবিশ্যি।

“এসময় কাছারিবাড়ি কেন যায়, জানিস না? দু’বছর বাদে এইবার কিছু ফসল হয়েছে, রাজার লোক চিলের মতো এসেছে ছোঁ মেরে কর আদায় করতে। তাদের হাতে-পায়ে ধরে যদি কিছু কমানো যায়…”।

“আরেকটা রুটি দে না, মা। হুঁঃ, রাজার লোকরা চামার হয় জানিস না, মা? তারা যা কর আদায় করে নিজেরাই তার অদ্দেক ঝেড়ে দেয়। রাজধানীতে গিয়ে হিসেব দেয় – ইঁদুরে খেয়েছে, পাখিতে খেয়েছে, ঝুড়ি ফেটে মাটিতে পড়ে গেছে…। তোরা যদি এখানে এক ঝুড়ি ভুট্টার দানা দিস মা, রাজার কাছে জমা হবে তিন কুনকে…হ্যাঁ। বাকিটা মেরে দেবে রাজধানী পর্যন্ত রাজার নানান কর্মচারীরা”।

ঘর থেকে আরেকটা রুটি এনে ভল্লার পাতে দিয়ে কমলি জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলছিস?”

“করাধ্যক্ষ আর তাদের নীচের কর্মচারীদের ঠাট-বাট যদি দেখিস না, মা চমকে যাবি। প্রধানমশাই জানেন, তুই তো কোনদিন কাছারিতে কিংবা ওদের শিবিরে যাসনি, দেখিসনি”।

“তা যাইনি, তবে দূর থেকে দেখেছি বৈকি। আমাদের এই গ্রামের পিছন দিয়ে, রাজ্যের সীমানা বরাবর যে পথ আছে, সেই পথে ওদের যেতে দেখেছি। করাধ্যক্ষ পালকিতে বসে রাজার মতোই যায়। তার সামনে পেছনে দেখেছি অজস্র বলদের গাড়ি। পাশে পাশে চলে ঘোড়ার পিঠে বসা বল্লম আর ভল্ল নিয়ে রক্ষীদের সারি। শুনেছি সবার পিছনে থাকে ভৃত্য আর রাঁধুনির দল…সে দলও বিশাল। বিরাট সেই শোভাযাত্রা যেন শেষই হতে চায় না…”।

খাওয়া সাঙ্গ করে ভল্লা কটোরি থেকে জল খেল। কমলি বললেন, “ওমা কথা বলতে বলতে খেয়ালই করিনি, আরেকটা রুটি নে, লেবুর আচার আছে, আমার হাতে বানানো…”।

ভল্লা উঠে দাওয়ার ধারে রাখা জালার জল তুলে আঁচিয়ে নিয়ে বলল, “পাগল হয়েছিস, মা? আমাকে কী বক রাক্ষস ঠাউরেছিস? ও বেলা বরং দুটো রুটি দিয়ে তোর বানানো আচার চেখে দেখব…। কিন্তু একটা কথা বলি, ওই যে তুই বললি না, করাধ্যক্ষ রাজার মতো যায় – তুই বুঝি রাজা দেখেছিস?”

কমলি হাসলেন, “ধূর খ্যাপা ছেলে”, এঁটো থাল আর কটোরা তুলে, এঁটো জায়গায় জল ছিটিয়ে নিকোতে নিকোতে বললেন, “আমি রাজা কোথায় পাবো…গ্রামের পালা-পার্বণে লোকে রাজা-মন্ত্রী সাজে…সেই আমার রাজা দেখা…”।

ভল্লা হাসল, বলল, “তা বটে। আচ্ছা মা, তুই যে বললি গ্রামের পিছনে সীমান্ত বরাবর একটা পথ আছে, সেই পথটাই কি ওপরের ওই রাজপথে গিয়ে মিশেছে?”

কমলি বললেন, “হুঁ। ওই রাস্তা যেখানে রাজপথের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে একটা তেমাথার মোড় পরে। সোজা গেলে উত্তরের দিকে চলে যাওয়া যায় আর ডানদিকে ঘুরে গেলেই রাজপথ সেই তোদের রাজধানী পর্যন্ত...। আমার বাপের বাড়ি ওই তেমাথা থেকে উত্তরে, বেশি নয় ক্রোশ দেড়-দুই হবে...। বার-চারেক বাপের বাড়ি গিয়েছি – সে সময় প্রধানের মুখে শুনেছি। তা নইলে আমি আর জানবো কোত্থেকে বল?”

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “এখান থেকে ওই তেমাথার মোড় কদ্দূর বটে, মা?”

কমলি বললেন, “কত আর ক্রোশ খানেক হবে...”।

ভল্লা বলল, “অ। তুই খেয়ে নে মা, অনেক বেলা হল। আমি বরং উঠি, ঘরে গিয়ে একটু শুই। আমি থাকলেই আজেবাজে কথায় তোর আর খাওয়া হবে না”।

ভল্লা উঠে নিজের ঘরে গেল। পাতার বিছানায় শুয়ে নোনাপুর গ্রামের অবস্থানটা মাথার মধ্যে আঁকতে লাগল, চোখ বন্ধ করে।

 ১০

 

এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক ছোকরা জড়ো হয়েছে, ভল্লার নেতৃত্বে। বিচক্ষণ ভল্লা নিজের মতো করে সকলকেই বাজিয়ে দেখেছে। মনে মনে সে ষোলো-সতেরজনের একটা দল ঠিক করে ফেলেছে। যাদের স্বাস্থ্য-শরীর ভালো, চনমনে, ছটফটে। আর প্রত্যেকের মনেই কমবেশি আগুন আছে। মনের মধ্যে এই আগুন থাকাটা খুব জরুরি। যার মন মিয়োনো, নরম নরম, তাদের দিয়ে আর যাই হোক লড়াই চলতে পারে না। এই দলের প্রত্যেকেই ভল্লার কাহিনী শুনে উত্তেজিত। প্রতিবাদী কিছু একটা করার জন্যে টগবগ করছে। তবে ভল্লা জানে, মা-বাপ-ভাই-বোনের স্নেহের ছায়ায় বাড়িতে থেকে, মনের আগুন নিয়ে বিলাসিতা করা এক বিষয়। আর সম্মুখ যুদ্ধে নেমে, নিজে আহত হয়ে এবং শত্রুপক্ষকে আহত করে, হত্যা করে রক্তধারা দর্শনের উত্তেজনা সহ্য করা - সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সে রকম পরিস্থিতি না আসা পর্যন্ত কার কদ্দূর দৌড় নিশ্চিতভাবে বুঝে ওঠা যাবে না।  ভল্লার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, এই দলের মধ্যে অন্ততঃ দশ-বারোজন তাকে হতাশ করবে না।

প্রথম দিন আলাপের সময়েই এই দলটি তার কাছে বিদ্রোহের মন্ত্র জানতে চেয়েছিল। সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রে লড়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছিল। বলেছিল ভল্লাদাদা তুমি একা, তাই ওরা তোমাকে এভাবে চূড়ান্ত হেনস্থা করতে পেরেছে। তোমার ওপর ঘটে যাওয়া এই অপমানের শোধ তুলব আমরা সবাই মিলে। ভল্লা মনে মনে হেসেছিল। একটু বিদ্রূপের সুরে গম্ভীর মুখে ভল্লা বলেছিল, “খাওয়া, ঘুমোনো আর হাগতে-পাদতে-মুততে যাওয়া ছাড়া আর কী পারিস? ছুটতে পারিস? লাফাতে পারিস? গাছে উঠতে পারিস? সাঁতার কাটতে পারিস? অস্ত্র চালাতে পারিস কিনা জানতে চাইলাম না।  জানি, ও জিনিষ তোরা কোনদিন হাতেও ধরিসনি”।

ছেলেরা ক্ষুব্ধ হল ভল্লার কথায়, একজন বলল, “আমরা গ্রামের ছেলে, ভল্লাদাদা। ছুটতে পারব না? সাঁতার জানব না?  গাছে চড়তে পারব না?”

ভল্লা বলল, “আরে ধুর, ও তো সবাই পারে। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলায় দৌড়তে হয়। লাফাতে হয়। পাকা জাম পাড়তে গাছেও চড়তে হয়। চানের সময় জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার শেখা হয়ে যায়। ওই শিক্ষায় কী আর রাজসৈন্যদের মুখোমুখি হওয়া যায় রে?” একটু বিরতি দিয়ে আবার বলল, “ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি আর রাজার সৈন্যদের সঙ্গে লুকোচুরি তো, এক জিনিষ নয়, বাবু। ধরে নে একজন অশ্বারোহী তোর পিছু নিয়েছে, তির ছুঁড়ছে বারবার। পারবি তার সঙ্গে দৌড়ে। দৌড়ে পালাচ্ছিস, সামনে পড়ল একটা নদী – পারবি সেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ডুব সাঁতারে সেই নদী পার হতে?”

ছেলেরা কেউ কোন উত্তর দিল না। তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে। সকলের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “রাজশক্তির বিরুদ্ধে যাওয়ার আগে, নিজেকে শক্তিধর করে গড়ে তুলতে হবে। পারবি? না পারলে কী লাভ? আত্মহত্যা করার হাজার একটা পদ্ধতি আছে – শখ করে রাজসৈন্যের সামনে আত্মাহুতি দিতে যাওয়ার কোন মানে হয়? কাস্তের ডগায় হাত একটু কেটে গেলে ব্যথা হয় না? নিজের রক্ত ঝরতে দেখলে মনটা দুর্বল হয়ে পড়ে না? মা, দিদি, কিংবা বাবা এসে সে ব্যথার সেবা করলে আরাম লাগে না? লড়তে গিয়ে বল্লমের খোঁচায় যখন কাঁধে বা পেটে ক্ষত হবে, কে তখন তোর পাশে থাকবে? কার কাছে জানাবি সে ব্যথার কথা?”

ভল্লা চুপ করে যেতে, ছেলেরা চুপচাপ বসে অনেকক্ষণ চিন্তা করল। তাদের একজন বলল, “তুমি আমাদের শিখিয়ে নাও ভল্লাদাদাদা। তুমি হও আমাদের সেনাপতি”।

ভল্লা আরেকবার সকলের মুখের দিকে তাকাল – বলল, “তাহলে এখনই শুরু কর। আজ এখনই এখান থেকে দৌড় শুরু কর... সূর্যাস্ত হতে আর দণ্ড দুয়েক বাকি। এই পথ ধরে ওপরের রাজপথে যাবি – সরোবরের ধার দিয়ে এসে, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে – এই খানে ফিরে আসবি, সূর্যাস্তের আগে। কে কে পারবি?”

ওরা চলে যেতে ভল্লা গ্রামের দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করল। গ্রামের এদিকটা এখনও তার দেখা হয়নি। এদিকে বসত কম। বিচ্ছিন্ন কিছু আবাদি জমি, আর অধিকাংশই অনাবাদি পোড়ো জমি। ভল্লা হাঁটতে লাগল। অনেকক্ষণ চলার পর তার মনে হল, সে গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে এসেছে। জনহীন প্রান্তর - কিছু বড় গাছপালা, ছোটছোট ঝোপঝাড় সর্বত্র। আরও কিছুটা গিয়ে তার কানে এল বহতা জলের শব্দ। অবাক হল – এমন রুক্ষ প্রান্তরে কোথা থেকে আসছে এই ক্ষীণ জলধ্বনি। এগোতে এগোতে ভল্লা ছোট্ট একটা নালার পাশে দাঁড়াল। পূব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলেছে জলধারা। খুবই সামান্য – কিন্তু ভল্লার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে আসছে, এই জলধারা? এ অঞ্চলে বর্ষা হয় সামান্যই – তাহলে কোন উৎসমুখ এই জলধারাকে সজীব রেখেছে এই মধ্য শীতেও।

এই গ্রামের অবস্থান চিত্রটি সে মনে মনে চিন্তা করল কিছুক্ষণ। এই গ্রামে আসার সময় পাহাড়ের কোলে রাজপথের ধারে সেই সরোবর দেখেছিল। সেই রাজপথ থেকে অনেকটাই নিচে এই গ্রামের অবস্থান। আজ সকালে যে দীঘির ঘাটে সে বসেছিল, সেটি এই গ্রামের পূর্ব সীমানায় এবং তার পরেই রয়েছে খাড়া অনুচ্চ যে পাহাড়টি – তারই শীর্ষে রয়েছে রাজপথের সরোবরটি। আজ সকালে গ্রাম পরিক্রমণের সময় আরও কয়েকটি পুকুর সে লক্ষ্য করেছে। তাহলে ওই দুই সরোবর, ওই পুকুরগুলি এবং এই নালার উৎস কি একই? প্রকৃতির কি আশ্চর্য লীলা – সরোবর কিংবা পুকুরগুলি কখনো প্লাবিত হয় না, কিংবা জলহীনও হয় না। ওগুলিকে সম্বৎসর পরিপূর্ণ রেখে উদ্বৃত্ত জলরাশি প্রবাহিত হয় এই নালাপথে! বর্ষায় হয়তো এই নালার প্রবাহ গতি পায়। ভল্লা আশ্চর্য হল। সে নালাপথের উজান বরাবর এগিয়ে চলল পূর্বদিকে। লক্ষ্য করতে করতে চলল নালার এপাশের জমির প্রকৃতি, গাছপালা ঝোপঝাড়। ভল্লার কৃষিকাজে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবু রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে যেটুকু সে দেখেছে, তার মনে হল, আপাত অনুর্বর এই জমিকেও কৃষিযোগ্য করে তোলা সম্ভব। একটু পরিশ্রম করলে, এই নালার জল কৃষিকাজে সম্বৎসর ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রায় ক্রোশার্ধ হেঁটে সে পৌঁছল গ্রামের পূর্বসীমানার সেই পাহাড়তলিতে। এই জায়গাতেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা একটি শীর্ণ জলধারা সমতলে নেমেছে। এই জায়গায় জলধারা কিছুটা বিস্তৃত, বড়ো বড়ো কিছু পাথর আর নুড়ির মধ্যে দিয়ে পথ করে কিছুদূর বয়ে গেছে। তারপরেই শুরু হয়েছে শীর্ণ নালা প্রবাহ। ভল্লা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করল, আশপাশের জমি-জায়গা। তার মনে হল, এই সব পাথর-নুড়ি আর মাটি দিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব দুর্বল বাঁধ। তার উজানে বানিয়ে তোলা যেতে পারে ক্ষুদ্র জলাধার। এই স্থানটির অবস্থান যেহেতু একটু উঁচুতে, অতএব ওই জলাধার থেকে কৃত্রিম নালি কেটে জলকে চারিয়ে দেওয়া যেতে পারে সংলগ্ন নাবাল জমিগুলিতে। নিষিক্ত জমিতে চাষ করা যেতে পারে কিছু কিছু উপযোগী ফসল।

ভল্লা দক্ষ সৈনিক, তীক্ষ্ণবুদ্ধি গুপ্তচর। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সে জানে, একটি গ্রামের সকল অধিবাসীকে কখনও উত্তেজিত করা যায় না। কতিপয় মানুষ বিদ্রোহী হয়। ভল্লা জানে এই গ্রামেরও নির্বিবাদী অধিকাংশ মানুষ হয় উদাসীন থাকবে, নয়তো ক্ষুব্ধ হতে থাকবে ভল্লার ওপর। বিদ্রোহী ছেলেদের বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমা পরিজন সকলেই ভল্লার ওপর ক্রুদ্ধ হতে থাকবে, তাদের ছেলেদের “মাথাগুলি চিবিয়ে খাওয়ার” জন্যে। সেই ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে, গ্রামের অর্থনৈতিক কিছু উন্নতির দিশা দেখাতে পারলে। সামান্য হলেও, ওই জলাধার এবং উদ্বৃত্ত কিছু ফসলযোগ্য জমির সৃজন, বাড়িয়ে তুলবে ভল্লার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা।      

সন্ধ্যার কিছু আগে ভল্লা আগের জায়গাতেই ফিরে এল। সূর্য অস্ত গেলেও পশ্চিমদিগন্তে তার আলোর রেশ এখনও রয়েছে। বড়ো গাছের নিচে বসতে গিয়ে দেখল, তিনজন ছোকরা মাটিতে শুয়ে আছে। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তাদের বুকগুলো। ভল্লা খুশি হল, কিন্তু চেঁচিয়ে ধমক দিল তিনজনকেই। বলল, “দৌড়ে এসে হাঁফাচ্ছিস, কিন্তু শুয়ে শুয়ে হাঁফাচ্ছিস কেন? একজায়গায় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাঁফানো যায় না? ওঠ, উঠে বস। এতক্ষণের পরিশ্রমে পুরো জল ঢেলে দিলি, হতভাগারা”। ভল্লার কথায় তিনজনেই উঠে বসল এবং হাঁফাতে লাগল। ভল্লা বলল, “ধর শত্রুপক্ষের তাড়া খেয়ে, এ অব্দি নিরাপদেই এসেছিস। কিন্তু এরপর কী করবি?”

“ওফ্‌। আগে একটু দম নিতে দাও ভল্লাদাদা”।

ভল্লা আবারও ধমকে উঠল, “না, দম নিতে হবে, তার সঙ্গে ভাবনা চিন্তাও করতে হবে”। এই সময় আরও পাঁচজন ছেলে পৌঁছল। ভল্লা বলল, “বাঃ, প্রথম দিনেরপক্ষে ভালই – চল আমরা এসসঙ্গে নামতা বলি...এক এক্কে এক, এক দুগুণে দুই...জোরে জোরে চেঁচিয়ে...সবাই একসঙ্গে”। সন্ধের আগেই বাইশ জন এসে পৌঁছল, আরেকটু পরে পৌঁছল আরও বারো জন।

সকলে একটু ধাতস্থ হতে ভল্লা বলল, “বিয়াল্লিশ জন ফিরেছিস দেখছি, বাকিরা?”

“ওরা সরোবর অব্দি গিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নামেনি, ফিরে আসছে গ্রামের পথেই”।

ভল্লা হাসল, “এরকম রোজ দুবেলা দৌড়তে পারবি? খুব ভোরে আর আজকের মতো বিকেলে?”

“পারবো”।

“ঘোড়ার ডিম পারবি। কাল সকালে গায়ের ব্যথায় উঠতেই পারবি না। বোনকে দিয়ে গা-হাত-পা টেপাবি”।

“পারবো”। কেউ কেউ বলল, কিন্তু তাদের গলায় আগেকার সে জোর নেই।

ভল্লা হাসল, “কাল সকালে পায়ে, গায়ে, কাঁধে ব্যথা হবে। হবেই। কিন্তু কালকেও দৌড়তেই হবে, আজকের মতো এত তাড়াতাড়ি না হলেও – হাল্কা ছন্দে। একটু দৌড়লেই দেখবি – গায়ের ব্যথা কমে যাবে – কষ্ট কমে যাবে। আর দৌড়তে দৌড়তেও ভাববি, চিন্তা করবি – যা খুশি, যা তোর মন চায়। মনে রাখিস দৌড়লে আমাদের সর্বাঙ্গের পেশীর শক্তি বাড়ে। শক্তি বাড়ে আমাদের ফুসফুসের, আমাদের হৃদয়ের। কিন্তু মস্তিষ্ক? তার কী হবে? ভয়ংকর পরিশ্রমের মধ্যে, প্রচণ্ড আতঙ্কে, ভীষণ ক্লান্তিতেও আমাদের মাথা যেন কখনো অলস না থাকে। কোন কিছু না পেলে আমাকেই খুব গালাগাল দিবি। ভাববি কি কুক্ষণেই না ভল্লাদাদার কাছে গিয়েছিলাম। শয়তান লোকটা আমাদের সবাইকে খাটিয়ে মারছে, আর নিজে বসে বসে শুধু উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে। ও হ্যাঁ, কাল সকালে আমিও তোদের সঙ্গে দৌড়বো। কমলিমায়ের যত্নে শরীরটা বড়ো অলস হয়ে উঠেছে – সেটাকে আবার চাঙ্গা করতে হবে”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ "    

                         

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...