শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - পর্ব ২

ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "


ছবি এঁকে অনেককে গোটা একটা ঘটনার কথা বলে ফেলা কী ভাবে শুরু হয়েছিল সে কথা আগের সংখ্যায় বলেছি। ছবি আঁকার জটিল দক্ষতাকে ধীরে ধীরে সহজ করে, শুরু হয়ে গেল চিত্রলিপি। এই চিত্রলিপির প্রথম ব্যবহার, মনে করা হয়, শুরু হয়েছিল ব্যবসার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বন্দর এলাকায়। আমাদের ভারতবর্ষেই হোক বা বিদেশে, নানান দ্রব্য সামগ্রী আমদানি বা রপ্তানির বাণিজ্য শুরু হয়েছিল অন্ততঃ হাজার পাঁচেক বছর বা তারও আগে। আমাদের সিন্ধু সভ্যতার বন্দরগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দর ছিল লোথাল। এই বন্দর থেকে সুদূর ইজিপ্ট, সুমের, বাহারিনের সঙ্গে যে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সে প্রমাণ অজস্র পাওয়া গেছে ওইসব দেশের বণিকেরা এদেশ থেকে পণ্যসামগ্রী কিনে নিয়ে যেত। বিভিন্ন দেশের বণিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর এবং আগে বন্দর শহরের পান্থশালায় বেশ কিছুদিন থাকত, বিশ্রাম করত। কোথায় কী পণ্য পাওয়া যায়, কোন পান্থশালায় থাকার সুবন্দোবস্ত আছে, সে সব তথ্য বিদেশীদের নানান ভাষায় বোঝানোর থেকে অনেক সহজ ছিল চিত্রলিপি। কারণ সংক্ষিপ্ত চিত্রলিপি বোঝার জন্যে কোন বিশেষ ভাষা না জানলেও চলে

 

মৌর্যসাম্রাজ্যের প্রথমদিকের মুদ্রার উভয় পিঠ  

ধীরে ধীরে চিত্রলিপির ব্যবহার বাড়তে লাগল এবং এই চিত্রলিপি দিয়ে খুব সহজেই অনেক ধরনের তথ্য, নির্দেশ, পোঁছে দেওয়া শুরু হয়ে গেল বহু মানুষের কাছে, এমন কী গোটা একটা সাম্রাজ্যের সমস্ত প্রজার কাছেও! মৌর্য রাজাদের প্রথম দিকের মুদ্রাগুলি (ওপরের ছবি) লক্ষ্য করলে এমন অনেক চিত্রলিপি দেখতে পাবে
এমনকি এই রকম চিত্রলিপির সংকেত মুদ্রিত অনেক বিদেশী মুদ্রা বিভিন্ন দেশে প্রচলন করতেও খুব একটা অসুবিধে হত না 

শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবে, আজও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই চিত্রলিপির ব্যবহারের গুরুত্ব কমেনি তো বটেই, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। রেলস্টশন, এয়ারপোর্ট, বড়ো বড়ো হসপিটাল, পার্ক, হাইওয়েতে চলার পথে, চিত্রলিপির বহুল ব্যবহার হয়। লিখিত কোন নির্দেশ না থাকলেও, বিশেষ কিছু চিত্র সংকেত দেখলেই আমরা প্রশাসনের বক্তব্য বা নির্দেশ স্পষ্ট বুঝে যাই। নিচেয় সেরকম কিছু চিত্রলিপি বা সংকেতের নমুনা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।


বড়োরাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ওপরের চিত্রলিপির নির্দেশ দেখেই আমরা সামনের রাস্তা এবং তার আশেপাশের খবরাখবর অগ্রিম পেয়ে যাই। আবার নিচের চিত্রলিপিটি দেখঃ-


পরের চিত্রলিপি থেকে ছেলেদের, মেয়েদের কিংবা বিশেষভাবে-সমর্থদের ব্যবহারের জন্য টয়লেট খুঁজতে আমাদের অসুবিধে হয় কী? হয় না। 

এমনকি ছোট্ট ছেলেমেয়েদের সহজে যোগ বিয়োগ শেখাতেও চিত্রলিপির কোন বিকল্প নেই, নিচের এই ছোট্ট যোগটি আপেলের চিত্রলিপি দিয়ে বোঝানো কত সহজ দেখলেই বুঝতে পারবেঃ-

৫ + ২ = ৭ 

  + =  


শুধু ছোটদের পড়াশুনোর জন্যে নয়, তোমাদের বাবা-কাকুদের মতো বড়োরাও নানান জটিল তত্ত্ব এবং তথ্য সহজে সবাইকে বোঝানোর জন্যে গ্রাফ বা চার্ট ব্যবহার করেন, সেগুলিও মূলতঃ চিত্রলিপি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিচের দুটি চিত্রলিপি দেখলে, ব্যাপারটা বোঝা যাবে।



 

ভাষার বাধা কাটিয়ে, চিত্রলিপি বা চিত্রসংকেতের ব্যবহার খুবই কার্যকরী সন্দেহ নেই। কিন্তু চিত্রলিপি অত্যন্ত সীমিত বিষয়েই ব্যবহার করা চলে। আজ এই লেখাটা আমি যে লিখছি এবং তোমরা যে পড়ছো, সেটা চিত্রলিপি দিয়ে বোঝাতে এবং তোমাদেরও বুঝতে গলদঘর্ম হতে হত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছবি বা চিত্রলিপির এই সীমাকে অতিক্রম করতে ধীরে ধীরে তাই এসে গেল ‘লিপি’ (script)  

‘লিপি’ (script) ব্যাপারটা বলতে ঠিক কী, সেটা বুঝতে গেলে ভাষা ব্যাপারটা কী, সেটা আগে বোঝা জরুরি। প্রাণীদের নিজ নিজ গোষ্ঠীতে পরষ্পরের সঙ্গে যোগাযোগের একটা অন্যতম মাধ্যম হল শব্দ বা আওয়াজ (sound)মুখের কয়েকটি অংশ যেমন, ঠোঁট, গলা, জিভ, তালু, নাক ব্যবহার করে অধিকাংশ প্রাণীই নানান আওয়াজ (sound) তৈরি করে। বাঘ, সিংহ, হাতি, পাখিদের আওয়াজ বা ডাক নিশ্চয়ই শুনেছ। এই ধরনের প্রাণীদের ভাষা যদিও খুব সীমিত, তবু শিকারের আগে কিংবা বিপদের সময়, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদানের জন্যে এই শব্দ খুবই অর্থবহ।

মানুষ প্রাণীদের মধ্যে সব থেকে উন্নত এবং বুদ্ধিমান। জঙ্গলের আদিম মানুষ সভ্য হতে হতে, যখন চাষবাস, পশুপালন, ব্যবসাবাণিজ্য শিখতে লাগল, গ্রামশহর বানাতে শিখল – এককথায় সভ্য মানুষের জীবনযাত্রা যত জটিল হয়ে উঠতে লাগল, তখন আর দু দশটা আওয়াজ দিয়ে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদান সম্ভব হচ্ছিল না। অনেকগুলি আওয়াজ দিয়ে গড়ে উঠতে লাগল অর্থবহ শব্দ (word), আবার অনেকগুলি শব্দ জুড়ে গড়ে তুলতে হল বাক্য (Sentence)তারপর বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে চলতে লাগল কথোপকথন (conversation)ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সকলের বোধগম্য অনেক নিয়ম, অনেক বিন্যাস (Syntax)যে নিয়ম বা বিন্যাস অনুসরণ করে কথা বললে একই গোষ্ঠীর সমস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে সকল কথা বলতে পারবে, বুঝতেও পারবে অন্যের সকল কথা। এই নিয়ম বা বিন্যাস হল ব্যাকরণ (grammar)একই গোষ্ঠীর বোধগম্য কথাবার্তার নাম হল ভাষা (language)  বিভিন্ন দেশে, এমনকি একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, মানুষের শব্দ উচ্চারণের পদ্ধতি আলাদা হওয়ার জন্যে ভাষাও হয়ে উঠল আলাদা আলাদা। দুই ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা বোঝার আগে বা বলার আগে সে ভাষা শিখতে হয়।

লিপি হল ভাষা অনুযায়ি প্রতিটি শব্দের চিহ্ন, তার মানে কথা বলতে যে যে শব্দ আমরা উচ্চারণ করি, ঠিক সেই শব্দটিকে সংকেতে লিখে ফেলা। “তোমরা আমার কথা বুঝতে পারছো?” পারছো, তার মানে, সামনে বসে আমি যা বলতাম, তা না বলে, আমি একই কথা এমন ভাবে লিখেছি, যেটা পড়ে তুমি বুঝতে পারছো। এটাই লিপি। এখানে যে সংকেতগুলির ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি হলো,

ত+ও+ম+র+আ আ+ম+আ+র ক+থ+আ ব+উ+ঝ+ত+এ প+আ+র+ছ+ও?

এই প্রত্যেকটি চিহ্নকে বলে অক্ষর বা বর্ণ (alphabet - আজকাল characterও বলা হয়) এই বর্ণকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে স্বরবর্ণ (vowel) এবং ব্যঞ্জনবর্ণ (consonant)স্বরবর্ণগুলিকে স্বাধীন বর্ণ বলা যায়, কারণ এদের উচ্চারণে অন্য কোন বর্ণের সাহায্য দরকার হয় না। অ আ ই ঈ উ ঊ এ ঐ ও ঔ। আরেকটা বিশেষত্ব হল, এই বর্ণগুলি গলা থেকে বেরোনো আওয়াজকে শুধু ঠোঁটের নিয়ন্ত্রণেই খুব সহজে উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণে কণ্ঠস্বর আর ঠোঁট ছাড়াও জিভ, তালু, দাঁত, নাকেরও সাহায্য নিতে হয়। ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ, স্বরবর্ণের সাহায্য ছাড়া খুবই কম ব্যবহার হয়। ওপরের শব্দগুলিতে, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ, ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে জুড়ে থাকা স্বরবর্ণগুলিকে ঠিকঠাক স্বরবর্ণের আকারে চেনা যাচ্ছে না। “তোমরা” – এখানে ও-বর্ণ (ো)ও-কার হয়ে গেছে, আর আ-বর্ণ (া) আ-কার হয়ে গেছে।  ব্যঞ্জনের সঙ্গে স্বর বর্ণগুলির সংযোগ, এভাবেই আলাদা আলাদা চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। এই শব্দে ‘ম’- বর্ণে কোন স্বরবর্ণের যোগ নেই, এখানে ম-বর্ণের উচ্চারণ বিশুদ্ধ ব্যঞ্জন বলা যায়।

এইভাবে অনেকগুলি স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ জুড়ে ঠিকঠিক কথা তৈরিকেই বলে শব্দ। কাজেই শুধু পরপর বর্ণ সাজালেই শব্দ হবে না, শব্দ মানে তার অর্থ থাকতে হবে, সেই শব্দর অর্থ যারা পড়বে তারা সক্কলে যেন বুঝতে পারে, তা নাহলে যে লিখছে সে জব্দ হয়ে যাবে। কারণ যে লিখছে সে তো অন্যকে বোঝানোর জন্যেই লিখছে!

ভাষা অনুযায়ি লিপির ধারণা এবং প্রচলন অন্ততঃ দুটো প্রাচীন সভ্যতায় আলাদা আলাদা ভাবে শুরু হয়েছিল।  কিন্তু এবার আসি সেই কথায়।  


    পণ্ডিতেরা মনে করেন, অন্ততঃ দুই বা তার বেশি প্রাচীন সভ্যতায় ভাষা অনুসারে লিপির সূত্রপাত হয়েছিল। তার মধ্যে প্রথম ধরা হয়, মোটামুটি ৩১০০ বি.সি.তে মেসোপটেমিয়ার সুমেরিয় সভ্যতায়। আর ৩০০ বি.সি.তে মেক্সিকোর ওলমেক (Olmec) অথবা জ্যাপোটেক (Zapotec) –এর মতো মেসোআমেরিকান (Mesoamerican) সভ্যতায়। এই দুই সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, অতএব ধরে নেওয়া যায়, এই দুই সভ্যতায় লিপির উদ্ভবে একে অন্যের  ওপর কোন প্রভাব ছিল না, স্বাধীনভাবেই লিপির সৃষ্টি হয়েছিল।

    এছাড়া আরও দুই সভ্যতার লিপি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক আছে - মোটামুটি ৩১০০ বি.সি.তে প্রাচীন মিশর (Egypt) এবং ১২০০ বি.সি.তে চিন। কেউ বলেন এই দুই সভ্যতাতেও স্বাধীনভাবে লিপির সৃষ্টি হয়েছিল, কেউ বলেন ওই দুই সভ্যতার সঙ্গে সুমেরিয় সভ্যতার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। বাণিজ্য এবং বণিকদের মাধ্যমে দুই সভ্যতার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তারই ফলে এই দুই সভ্যতার নিজস্ব লিপি রূপ পেতে শুরু করেছিল। তবে বেশির ভাগ পণ্ডিতেরা বলেন, প্রাচীন চিনের বর্ণমালার ওপর অন্য কোন সভ্যতার প্রভাব থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ প্রাচীনকালে চিনের সঙ্গে সুদূর মধ্য প্রাচ্যের সুমের সভ্যতার তেমন কোন যোগাযোগের প্রমাণ মেলেনি। আর চেহারা এবং ভাবনায়, সুমের লিপির সঙ্গে চিনা লিপির তেমন কোন মিলই পাওয়া যায় না। সুমেরিয় কিউনিফর্ম লিপির থেকে প্রাচীন মিশরের লিপিও আলাদা, কিন্তু পণ্ডিতেরা বলেন, এই দুই লিপির ভাবনা ও বিন্যাসে নাকি অনেক মিল আছে। 

    একই বিতর্ক চালু আছে আমাদের সিন্ধু উপত্যকার লিপি নিয়েও। মোটামুটি ২৬০০ বি.সি.তে এই সভ্যতায় লিপির সূত্রপাত। কিন্তু যেহেতু এই লিপিগুলির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি, তাই অনেক পণ্ডিত এগুলিকে লিপি বলে মানতে নারাজ, তাঁদের মতে এগুলি চিত্রলিপি কিংবা হয়তো লিখিত কোন সংকেত!

সুমেরীয় কীলক লিপি

সুমেরিয় সভ্যতায় ৪০০০ বি.সি.র শেষের দিকে লেখার শুরু হয়েছিল নরম মাটির ওপর গোলমুখ কলম দিয়ে আঁচড় কেটে। প্রথম দিকে শুধু ব্যবসার হিসেবপত্র রাখতেই এই লিপির শুরু। তারপর ২৭০০ থেকে ২৫০০ বি.সি.র মধ্যে কলমগুলো  হয়ে উঠল ছুঁচোলো সরু। এই ধারালো কলমের খোঁচা খোঁচা দাগের জন্যেই এই লিপির নাম কীলক লিপি

(Cuneiform Script)মোটামুটি ২৬০০ বি.সি. থেকে এই কীলক লিপি নির্দিষ্ট শব্দ বিন্যাস এবং সংখ্যার জন্যে আলাদা হয়ে গড়ে উঠতে থাকে। এই সময় শুধু যে বাণিজ্যের হিসেব রাখা হত, তাই নয়, রাজ্যের অনেক ঘটনা, তথ্য, নির্দেশিকাও লেখা হতে শুরু করল। ওপরের ছবিতে প্রাচীন ব্যাবিলন শহরের আলালা (Alalah) থেকে পাওয়া কীলক লিপির একটা নমুনা। নরম মাটির ওপর লিখে, সেটিকে রোদ্দুরে কিংবা আগুনে সাবধানে পুড়িয়ে এই ট্যাবলেটগুলি বানানো হত। সেই সময় সহজ উপযোগিতার জন্যে, এই লিপি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, এবং আশেপাশের অন্যান্য জনপদের লোকেরাও এই লিপির পদ্ধতি অনুসরণ করে, নিজস্ব লিপির ধারা তৈরি করতে শুরু করেছিল। তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন পারস্য লিপি।

মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফ লিপি


    মিশরীয় সাম্রাজ্যে লিপির একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল, সমাজের শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরই লিপি অনুশীলনের অনুমতি মিলত। এই লিপিগুলি মন্দির, মিশরের রাজা ফারাওদের নির্দেশ এবং প্রশাসনিক নানান কাজে ব্যবহার করা হত। মিশরীয় লিপিগুলিকে হিয়েরোগ্লিফিক্‌স্‌ (Hieroglyphics) বলা হয়, যদিও এই শব্দটি গ্রীক। মিশরীয়রা তাঁদের নিজেদের লিপিকে বলতেন “মেডু-নেৎজার” (medu-netjer), যার মানে “ঈশ্বরের কথা”। তাঁরা বিশ্বাস করতেন মহান দেবতা থথ (Thoth), তাঁদের লিখতে শিখিয়েছেন। তাঁদের আরো বিশ্বাস ছিল, দেবতা থথ তাঁদের  এই জ্ঞান উপহার দিয়েছিলেন এই বিশ্বাসে যে, মিশরীয়রা এই জ্ঞানটির পবিত্রতা দায়িত্বের সঙ্গে রক্ষা করবেন


মিশরীয় লিপির দেবতা থথ

    তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শব্দের অসীম ক্ষমতা! শব্দ মানুষকে আঘাত করতে পারে, আরোগ্য করতে পারে, সমৃদ্ধি আনতে পারে, আনতে পারে ধ্বংস, এমন কী মৃত মানুষকে বাঁচিয়েও তুলতে পারে! বিখ্যাত মিশরবিজ্ঞানী রোজেলি ডেভিড এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “এই লিপির উদ্দেশ্য শুধু মাত্র অলংকরণের জন্যে নয়, এমন কি প্রথমদিকে এই লিপি সাহিত্য কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হত না। এই লিপির গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল, কোন বিশেষ ধারণা বা ঘটনাকে বাস্তব অস্তিত্বে নিয়ে আসা! মিশরীয় মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, এইভাবে লিখে রাখলে, সেই সব অলৌকিক দৈবী ঘটনা বা ধারণা বাস্তবে বার বার ঘটবে”!

সমাধির দেওয়ালে হিয়েরোগ্লিফিক্স

    মিশরীয় মানুষদের বিশ্বাসকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেওয়াই যায়, কিন্তু একটু চিন্তা করলে গভীর একটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়। সেই যুগ থেকে আজও, একজন লেখক যখন লিখতে শুরু করেন, তিনি কোন একটি ঘটনা বা ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। লেখা শেষ করলেও তিনি নিজেই বুঝতে পারেন না, সেই ধারণাকে তিনি সঠিক প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন কী না! একজন পাঠক যখন সেই সম্পূর্ণ লেখাটি পাঠ করেন, তাঁর মনে নতুন এক ধারণার সৃষ্টি হয়। লেখাটি পড়ে তিনি কখনো মুগ্ধ হন, কখনো ক্রুদ্ধ হন, কখনো ভীত হন, কখনো বা নতুন জ্ঞানে আলোকিত হন। আর তখনই সেই লেখকের লেখা সার্থক প্রতিষ্ঠা পায়। সেই লেখা বার বার বহু যুগ ধরে, বহু পাঠকের মনে আলোড়ন তুলতে থাকে। আমাদের দেশের প্রাচীন লেখক মহর্ষি বেদব্যাস (যিনি মহাভারত লিখেছিলেন), কিংবা আমাদের একান্ত আপন এই সেদিনকার মহাকবি রবীন্দ্রনাথ, তেমনই দুই উদাহরণ হতে পারেন। যাঁদের লেখা পড়ে আজও আমরা মুগ্ধ হই, ঋদ্ধ হই।

    প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার ধারণায় মৃত্যুতে একটি জীবনের শেষ হয় না, বরং মৃত্যু হল এক জীবন থেকে অন্য এক জীবনে উত্তরণের পর্যায়। তাই মৃতের সমাধিতে প্রচুর উপহার সামগ্রী রাখা হত, রাখা হত প্রচুর খাবার এবং পানীয়!  সেই সমাধির দেওয়ালে সমস্ত উপহার সামগ্রীর বিবরণ লিখে রাখা হত। তার সঙ্গে লেখা হত, জীবিত অবস্থায় সেই মৃত মানুষটির কৃতিত্বের কথা। সেই কৃতিত্ব হয়তো কোন বড়ো যুদ্ধ জয় অথবা উচ্চস্তরের প্রশাসনিক দক্ষতা। সেই কৃতিত্ব যত বড়ো হত, উপহার সামগ্রীর পরিমাণ ততই বেশী হত। এর সঙ্গে আরো লেখা হত, মৃতব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা বাণী এবং তাঁর মঙ্গলের জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এইগুলিকেই হয়তো প্রথম আত্মজীবনী এবং সাহিত্যের সূত্রপাত বলা যায়।

    অন্য সমস্ত লিপির থেকে মিশরীয় লিপির বৈশিষ্ট্য হল একটি শব্দের বর্ণলিপির শেষে একটি চিত্র (Logogram) এঁকে, বিষয়টিকে বোঝানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় msh মানে কুমীর, আর miw মানে বেড়াল। বর্ণলিপি দিয়ে লেখার পরে দুই ক্ষেত্রেই কুমীর এবং বেড়ালের ছবি এঁকে বোঝানো হয়েছে। নিচেয় দেখানো ছবিটি লক্ষ্য করলে, বেশ মজা পাওয়া যায়অনেকটা আমাদের ছোটদের বইয়ে “অ-অজগর আসছে তেড়ে”-র পর অজগরের ছবির মতো!        

           


বিশেষজ্ঞরা ওপরের লিপির পাঠোদ্ধার করে বলছেন, ওপরের লিপিতে লেখা আছে – iw wnm msh nsw, তার মানে “The crocodile eats the king”- রাজাকে কুমীর খায়! সুন্দর এই লিপিতে লুকিয়ে রয়েছে কী ভয়ংকর বার্তা


পরের পর্ব - " লিখিব পড়িব - পর্ব ৩  " 


শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৫ " 


 

অন্যদিনের তুলনায় আজ বাড়ি ফিরতে একটু দেরিই হল জুজাকের। কমলি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন – বারবার বেরিয়ে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন, মানুষটা আসছে কিনা। আজ অমাবস্যা। দুপাশের গাছপালা, ঝোপঝাড়ে গভীর অন্ধকার। তারার আলোয় পথটাকেই অস্পষ্ট ঠাহর করা যায়। পথের প্রেক্ষাপটে মানুষের অবয়ব বুঝতে পারা যায়। কমলির উদ্বেগ বাড়ছিল, জুজাক গ্রামপ্রধান ঠিকই, তবে তিনি শুনেছেন রাজধানী থেকে আসা রাজকর্মচারীরা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামপ্রধানকে সমীহ করে না। তারওপর জুজাক কিছুটা মুখফোঁড় বদরাগীও বটে। আধিকারিকদের কোনো তির্যক প্রশ্নের ব্যাঁকা উত্তর দিয়ে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে তার জুড়ি নেই। তার এই স্পষ্টবাদী সরল চরিত্রের জন্যেই গ্রামের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে গ্রামপ্রধান বানিয়েছে। জুজাকের জন্য একদিকে কমলি যেমন গর্ব অনুভব করেন, অন্যদিকে ততটাই শঙ্কিতও থাকেন সর্বদা। তিনি জানেন দিনকাল বদলে চলেছে নিরন্তর। অপ্রিয় সত্যকথা কেউই সহ্য করতে পারে না। প্রশাসনিক আধিকারিকরা তো নয়ই।

আজ অন্য আরেকটি বিষয়ও কমলির দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ভল্লা। আজ গ্রামে সকলের সামনে সে নিজের মুখেই স্বীকার করেছে তার অপরাধের কথা। তার নির্বাসন দণ্ডের কথা। রাজকর্মচারীদের কাছে কী সে সংবাদ পৌঁছে গিয়েছে? যদি তারা জেনে গিয়ে থাকে ভল্লা জুজাকের ঘরেই আশ্রয় পেয়েছে। এই ঘরেই সে চিকিৎসা এবং সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে। সেটা কি তারা রাজদ্রোহীতা বলে মনে করবে? জুজাককে শাস্তি দেবে? কশাঘাত করবে? কিংবা বন্দী করে রক্ষীদের দিয়ে শারীরিক অত্যাচার করবে?

হতভাগা ছেলেটা গেলই বা কোথায় কে জানে? নিজের ঘরে কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে “আমি একটু ঘুরে আসছি, মা” বলে বেরিয়েছিল শেষ দুপুরে। এখনও পর্যন্ত তারও দেখা নেই। ঘরে থাকলে, একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসতে পারত ছেলেটা। জুজাকের সঙ্গে যারা গিয়েছিল তাদের বাড়ি গিয়েও খবর আনতে পারত। বলা যায় না, জুজাক হয়তো, তাদের কারো বাড়িতে বসে জমিয়ে গল্প করছে। লোকটার কাণ্ডজ্ঞান ওরকমই। তার জন্যে ঘরে যে কেউ উৎকণ্ঠায় বসে আছে, সে কথা তার মনেই পড়ে না।

ঘরবার করতে করতে কমলি লক্ষ্য করলেন, তুলসীমঞ্চের প্রদীপে তেল ফুরিয়ে এসেছে, সলতেটা ম্লান হয়ে জ্বলছে। দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে রেডির তেল এনে প্রদীপে ঢাললেন, সলতেটা একটু উস্কে দিলেন। আর তখনই বেড়ার দরজা খোলার শব্দ হল, চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, জুজাক ঢুকছে।

“এত রাত হল? কিছু গোলমাল হয়নি তো?”

জুজাক কোন উত্তর দিলেন না, ঘোঁত করে নাকে শব্দ করে, দাওয়ায় বসলেন। কমলি দৌড়ে গিয়ে ঘটি করে পা ধোয়ার জল আনলেন। ঘর থেকে নিয়ে এলেন জুজাকের গামছাখানা। জুজাক ঘটির জলে পা ধোয়া শুরু করতে, কমলি বললেন, “কিছু বললে না, তো? এত দেরি হল কেন?”

দুই পা ধুয়ে, গামছা দিয়ে ধীরেসুস্থে পা মুছতে মুছতে জুজাক বললেন, “গাঁয়ে ফিরেছি অনেকক্ষণ। ও পাড়ায় ঢুকতেই লোকজনের মুখে তোমার ছেলের গুণকীর্তন শুনছিলাম। তুমি শুনেছ?”

“শুনেছি”।

“তা আর শুনবে না? তোমার আদরের ছেলের জন্যে কাছারিবাড়িতে আমাকে কত কথা শুনতে হল। খাবার জল দাও তো”।

কমলি ঘর থেকে খাবার জল এনে দিলেন। “কী বলেছে তারা?”

জুজাক মাটির ঘটি হাতে তুলে নিয়ে নিঃশেষ করলেন ঘটিটা। তারপর তৃপ্তির শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হবে আর কী? গিয়েছিলাম কান্নাকাটি করে এ গ্রামের মানুষদের কিছুটা কর যদি কমানো যায়। অন্ততঃ সম্বৎসর সকলের পেটটা যাতে চলে যায়। সে কথায় কানই দিল না? বললে, ভল্লা তোমার বাড়িতে আছে? বললাম, আছে। বললে, একজন অপরাধী – যার রাজধানীর প্রশাসন থেকে নির্বাসন দণ্ড ঘোষণা হয়েছে। তাকে তুমি বহাল তবিয়তে খাওয়াচ্ছো, দাওয়াচ্ছো, চিকিৎসা করাচ্ছো। আর রাজার কর দিতেই তোমার নাকে কান্না শুরু হয়ে গেল?”

কমলি উদ্বেগের স্বরে বললেন, “কী অবস্থায় ছেলেটা এসেছিল তুমি বললে না?”

জুজাক একটু ঝেঁজে উঠে বললেন, “বলব না কেন? সব বলেছি”। তারপর একটু থেমে নরম স্বরে বললেন, “ওরা রাজ কর্মচারী। তাদের কাছে ভল্লার পরিচয় অপরাধী। সে আর মানুষ নয়, জন্তু। ওদের কথা ঘেয়ো কুকুরের মত যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই ওকে তাড়িয়ে দিইনি কেন? জগৎটা তোমার মতো মায়ের মন নিয়ে যে চলে না, কমলি”।

কমলি জুজাকের সহানুভূতির সুরে আশ্বস্ত হলেন। মানুষটাকে ওপরে ওপরে কঠোর মনে হলেও, মনটা নরম। তা যদি না হত, জুজাক জোর করেই ভল্লাকে তাড়িয়ে দিতে পারতেন। তৎক্ষণাৎ না হলেও, যেদিন ভল্লার প্রথম জ্ঞান হল, সেদিনই। আজকে রাজ-প্রতিনিধির যে তিরষ্কার তিনি শুনে এলেন – এমন যে হবে সেকথা জুজাক বহুবার বলেছেন। বারবার বলেওছেন, হতভাগাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব – কিন্তু দিতে পারেননি। মানবিক বোধের কাছে তার বাস্তব যুক্তি হেরে গেছে।

কমলি জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওদের কাছে এ খবর পৌঁছে দিল কে? নিশ্চই এই গাঁয়েরই কেউ?”

“সে তো বটেই। সব গ্রামেই ওদের গুপ্তচর থাকে। তাদের কাজই তো ওদের খবর দেওয়া। সে যাক, ছোঁড়াটাকে ডাক দেখি একবার”।

“সে তো সেই দুপুরের দিকে বেরিয়ে গেছে, এখনও ফেরেনি”।

“কোথায় গিয়েছে তোমাকে বলেও যায়নি? আশ্চর্য। কবিরাজদাদার বাড়িতে আমরা বেশ কয়েকজন কথাবার্তা বলছিলাম। সেখানে শুনলাম, সকালে ভল্লার বক্তৃতা শুনে কয়েকজন ছোকরা নাকি বেশ বিগড়ে গেছে। দুপুরের পর থেকেই তারাও বাড়িতে নেই। তবে কি...”।

কমলি আতঙ্কিত হয়ে বললেন, “তবে কি গো? ওই ছোঁড়াগুলো কি ভল্লাকে মারধোর করবে?”

জুজাক হেসে ফেললেন কমলির সরলতায়, বললেন, “মেয়েদের লাঞ্ছনা রোধ করতে গিয়ে সে অপরাধী হয়েছে। রাজ-প্রশাসন লম্পট মানুষটাকে শাস্তি না দিয়ে, সাজা দিয়েছে ভল্লাকে। এ গাঁয়ের ছোকরাদের চোখে ভল্লা এখন বীর। কবিরাজদাদা বলছিলেন, ভল্লা বোধ হয় ছোকরাদের নিয়ে একটা দল গড়তে চাইছে”।

কমলি অবাক হয়ে বললেন, “কিসের দল?”

জুজাক আবার একটু ঝেঁজে উঠলেন, বললেন, “তার আমি কী জানি? তোমার মনে আছে, কবিরাজদাদা ওর শরীরের লক্ষণ দেখে বলেছিলেন, ভল্লা সাধারণ এলেবেলে ছেলে নয়। যথেষ্ট শক্তিশালী যোদ্ধা। আরও বলেছিলেন, ওই চরম অসুস্থ অবস্থায় ওর এখানে আসাটা হয়তো আকস্মিক নয়। হয়তো গোপন কোন উদ্দেশ্য আছে। আজকে সকলের সামনে কবিরাজদাদা সে প্রসঙ্গ তোলেননি। কিন্তু আমারও এখন মনে হচ্ছে কবিরাজদাদার কথাই ঠিক”।

কমলি কিছু বললেন না। হাঁটুতে থুতনি রেখে গভীর চিন্তা করতে লাগলেন, ভল্লাকে দেখে কই আমার তো তেমন কিছু মনে হয়নি। এ গ্রামে আসা থেকে আমি তাকে যত কাছে থেকে দেখেছি, আর কে দেখেছে? তার কথাবার্তায়, তার মা ডাকে কোথাও কোন উদ্দেশ্যর সন্ধান তো তিনি পাননি। আজকে গ্রামের সবার সামনে মন খুলে নিজের অপরাধের কথা যে ভাবে সে স্বীকার করেছে, তার মনে যদি সত্যিই কোন পাপ বা অপরাধ বোধ থাকত, পারত ওভাবে বলতে?

জুজাক বললেন, “খাবার বাড়ো, খেয়ে শুয়ে পড়ি”।

কমলি তাড়াতাড়ি উঠে খাবার আনতে ঘরে ঢুকলেন। সেদিকে তাকিয়ে জুজাক বললেন, “তোমার ছেলে যত রাতই হোক বাড়িতে তো ঢুকবেই। তুমি ছাড়া তার জন্যে কে আর রাত জেগে খাবার কোলে বসে থাকবে?  এলে বলে দিও, সামনের অষ্টমীতে ওকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে কাছারি শিবিরে যেতে হবে। বলে দিও, না গেলে ওর তো বিপদ হবেই, আমাদেরও রক্ষা থাকবে না”।

 

জুজাক নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ার অনেকক্ষণ পর, ভল্লা বাড়ি ফিরল। দেখল কমলি-মা দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। মাথাটি ঘুমে ঢুলে পড়েছে। নিঃশব্দ পায়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াল ভল্লা, ফিসফিস করে বলল, “মা রে, খুব খিদে লেগেছে যে”। কমলি চমকে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, ভল্লা চকিতে তাঁর মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চুপ, চুপ। প্রধানমশাই জেগে গেলে, আমার আর রক্ষে থাকবে না”।

কমলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে। ভল্লার হাতের ছোঁয়ায় তিনি যেন ফিরে পেলেন তাঁর মৃত জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্পর্শ। সেও তার বাপকে ভয় পেত খুব। বাইরে কিছু অপাট কাজ করে এসে কাঁচুমাচু মুখে মায়ের কাছে সঁপে দিত নিজেকে। কমলি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভল্লার চোখের দিকে। তারপর ভল্লার হাত সরিয়ে নীচু স্বরে বললেন, “ঘরে যা, আমি খাবার নিয়ে আসছি”।

ভল্লা নিঃশব্দে দাওয়ায় উঠে জালা থেকে জল তুলে হাতপা মুখ ধুল, তারপর দাওয়া পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। তার প্রায় পিছনেই মাটির থালায় রুটি আর ডাল নিয়ে ঢুকলেন কমলি। ভল্লার হাতে থালাটি তুলে দিয়ে, কমলিও বসলেন মেঝেতে, জিজ্ঞাসা করলেন, “এত রাত অব্দি কোথায় ছিলি?”

রুটির টুকরো ছিঁড়ে মুখে নিয়ে ভল্লা বলল, “আমার এখানকার পাট তো এবার তুলতে হবে, মা। প্রধানমশাই তোকে বলেনি কিছু?”

“বলেছে। তোকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানকে, সামনের অষ্টমী তিথিতে যেতে হবে কাছারি-শিবিরে”।

“জানি তো। সেই ব্যবস্থাই করতে গিয়েছিলাম”।

“কোথায় যাবি, কোথায় থাকবি?”

“এ রাজ্যের সীমানার ঠিক বাইরে। এ গ্রামের পিছনে ক্রোশ দুয়েক দূর। কাল-পরশুর মধ্যে মাথা গোঁজার ঝুপড়িটা শেষ করে ফেলব। ঘরটা যেখানে তুলবো, তার কাছাকাছি – এই হাত তিরিশেক দূরে ছোট্ট একটা পুকুরও আছে। সেখানে জানিস তো মা, মাঝে মাঝে দু একটা হরিণ জল খেতে নামে। নিরিবিলি, সুন্দর জায়গা”।  

কিন্তু ও পাশে গভীর জঙ্গল তো, ওই জঙ্গলের মধ্যে কী করে থাকবি? তার চে পাশের রাজ্যে চলে যা। কিছু একটা কাজকম্মো জুটিয়ে নিতে পারবি না?”

ভল্লা হাসল, “পাশের রাজ্য যে এ রাজ্যের মিত্র রে, মা। ওদের রাজ্যে ঢুকলে, ওই রাজ্যের কোটালরাও আমাকে গোবেড়েন দিয়ে তাড়াবে। তার চে আমার ওই জঙ্গলই ভালো – সভ্য সমাজে নিশ্চিন্তে থাকুক রতিকান্তর মতো রাজশ্যালকরা, আর আমরা স্বস্তিতে থাকি গভীর জঙ্গলের নিরিবিলিতে”।

“ওখানে খাবি কি?”

“সে আমি দেখে এসেছি মা। জঙ্গলে কিছু শাক-পাতা, কন্দ-টন্দ পেয়ে যাবো। আর ওদিক দিয়েই কিছু ব্যাপারীদের যাতায়াত আছে তাদের থেকে, কিছু জোয়ার বাজরা, ভুট্টা যোগাড় হয়ে যাবে। ও নিয়ে তুই ভাবিস না, মা”।

“আমি যদি তোকে খাবার পাঠিয়ে দিই?”

“পাগল হয়েছিস, মা? ও কথা মনেও আনিস না। আমি থাকব রাজ্যের বাইরে, কিন্তু তোকে আর প্রধানমশাইকে ভয়ানক রগড়াবে আস্থানের রক্ষীরা। তোকে কেউ কিছু করলে আমি সইতে পারব, বল মা?”

কমলি কোন উত্তর দিলেন না। মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছুক্ষণ পর তাঁর দুই চোখ জলে ভরে উঠল। ভল্লা লক্ষ্য করে হাসতে হাসতে বলল, “অত উতলা হস না, মা। আমার যেতে তো এখনও সাত দিন। সেই সাতটা দিন তোকে আমি খুব জ্বালাবো, দেখিস। আর তার পরেও আমি সময় বুঝে ঠিক চলে আসব মাঝেসাঝে – কেউ টেরও পাবে না। আসব ঠিক ভূতের মতো, মাঝ রাতে। যে রাতে তোর বাড়ির পাঁদাড় থেকে শালিক পাখি বা কাক আচমকা ডেকে উঠবে, বুঝবি সে এই ভূত। কিন্তু, তুই আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যাবি না, মা। তাহলে কিন্তু ঘোর বিপদ”।

ধরা গলায় কমলি বললেন, “কবে যাবি?”

“কাছারি শিবির থেকে এখানে আর ফিরব না, সোজা আমার বাসায় গিয়ে উঠব”।

ভল্লার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কমলি এঁটো থালা নিয়ে উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “হ্যারে, তুই নাকি গাঁয়ের ছেলেদের নিয়ে দল করছিস?”

ভল্লা হেসে জিজ্ঞাসা করল, “দল করছি? কিসের দল? কে বলল তোকে? গাঁয়ের ছেলেছোকরারা আমার কাছে আসে, আমার সঙ্গে ঘোরে – গল্পগাছা করে। শুধু এ গাঁয়ের কেন, আশপাশের গাঁয়ের ছেলেরাও তো আসে। বুড়োদের কাজ-কম্ম নেই, বসে বসে খালি গুজব ছড়ায়। কোনদিন যদি দল গড়ি, সে কথা তোকেই প্রথম বলে যাবো, মা। তুই নিশ্চিন্ত থাক”।

“কি জানি? প্রধানও তো তাই বলল”।

“এ গাঁয়ের ছেলে ছোকরাগুলো বছরে ছমাস চাষবাস করে, আর বাকি ছমাস শুয়ে-বসে কাল কাটায়। তাদের দিয়ে যদি অন্য কিছু কাজ করাই মা, যাতে গাঁয়ের সকলের বাড়তি কিছু আয়-পয় হয়। কাজ-টাজ শিখে গাঁয়ের বাইরে থেকেও যদি তারা কিছু উপার্জন করে আনতে পারে, সেটাকে দল করা বলবি, মা? লোকের কথায় কান দিস না। আর এ নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনাও করিস না। যখন হবে নিজের চোখেই সবাই দেখতে পাবে। অনেক রাত হল, খেয়ে নিয়ে শুতে যা, মা। ঘুমে তোর চোখদুটো ছোট হয়ে আসছে। নাচদুয়োরে তোর জলছড়া দেওয়ার পরেই কাল আমি বেড়িয়ে যাব”।

কমলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ছেলেটা এই কদিনে বড়ো মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে তাঁকে।  সে মায়াকে পরম মমতায় তাঁর ধরে রাখতে সাধ হয় খুব, কিন্তু সাধ্য কোথায়?

             

                                                        ১২ 

বিগত কয়েকদিনে ভল্লার দলে যুবক ও তরুণের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সেই দলটিকে প্রধান দুটি বিভাগে সে ভেঙে নিয়েছে। প্রথমটিতে আছে পঁয়ত্রিশ জন, যারা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। এই দলটির পিছনেই সে সব থেকে বেশি সময় দেয়। সকালে সে নিজেই এই দলটির সঙ্গে দৌড়তে যায়। প্রথম তিনদিন সাধারণ দৌড়ের পর, চতুর্থ দিন সে যুক্ত করেছে, সাঁতারের অভ্যাস। পথহীন পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে সে ঝাঁপ দিয়েছিল গ্রামের পূর্ব সীমানার পুকুরটিতে। সে জানে সকালে পশ্চিমের ঘাটে গ্রামের মেয়েরা নিত্যকর্ম করতে যায়। তাদের বিড়ম্বিত না করে দীর্ঘ পুকুরটি সাঁতরে পার হয়ে সে এসে উঠল পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের আঘাটায়। সেখানে বসে দেখল, তার পিছনে সাঁতরে আসছে ছাব্বিশজন। বাকিরা আসছে অন্যান্য দিনের মতো একই দৌড়-পথে।

নজন দৌড়ে-আসা ছেলে সেখানে এসে উপস্থিত হলে, ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “তোরা জলে নামলি না, কেন? সাঁতার জানিস না?”

“তুমি তো বলোনি, ভল্লাদাদা। দৌড়ের পর সাঁতার কাটতে হবে। ওই সময় যা হাঁফাই – তারপরে আবার সাঁতার...”।

“আমার কথা ছেড়ে দে, তোদের ছাব্বিশজন বন্ধু তাহলে কেন এল? কী করে এল?” কেউ কোন উত্তর দিল না। ভল্লা আবার বলল, “তোরা যদি আমাকে নেতা বলে ভরসা করিস, তাহলে আমার কথা ছাড়াও, আমার আচরণও তোদের অনুসরণ করতে হবে। রণক্ষেত্রে সব সময় সব কথা চিৎকার করে বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না।  নেতাদের ইশারা, ইঙ্গিত, আচরণেই বুঝে নিতে হবে, কার কী করণীয়”। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ভল্লা আবার বলল, “ছেলেরা, এখন যে যার বাড়ি গিয়ে জলখাবার সেরে – ঠিক দুদণ্ডের মধ্যে উপস্থিত হবি মহড়াক্ষেত্রে”।

একজন জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, জলখাবার খেতে তুমি যাবে না?”

ভল্লা হেসে উত্তর দিল, “দুই বেলার আহারই আমার যথেষ্ট। নিয়মিত জলখাবারের প্রয়োজন অনুভব করিনা বহুদিন। তবে হ্যাঁ কোন কাজে দুপুরে খাওয়ার বিঘ্ন হতে পারে বুঝলে, ভরপেট জলখাবার করি”।        

গ্রামের বাইরের জঙ্গলে ভল্লা তার নির্বাসিত জীবনযাপনের জন্যে ছোট্ট দুটি কুটির গড়েছে। তার অদূরেই জঙ্গল সাফ করে বানিয়েছে, তরুণদের মহড়াক্ষেত্র। সেখানেই সে নিজের হাতে সকলকে মল্ল যুদ্ধ শেখাচ্ছে। শেখাচ্ছে, বল্লম চালাতে, ভল্লা ছুঁড়তে। পরে তির ছুঁড়তেও শেখাবে। মহড়ার সময় সে নির্দিষ্ট করেছে, মধ্যাহ্ন পর্যন্ত। মধ্যাহ্নের আহারের জন্যে দুদণ্ডের বিরতি, তার মধ্যেই ফিরতে হবে মহড়াক্ষেত্রে।    

ভল্লার দ্বিতীয় দলে আছে কুড়ি জন। তারা ভল্লার পরিকল্পনা মতো বাঁধ আর জলাধার নির্মাণে নিযুক্ত হয়েছে। ছেলেরা জলখাবার খেতে বাড়ি গেল, ভল্লা বাঁধের কাজ দেখতে যায়। নানান নির্দেশ দেয়। এই নির্মাণে তাঁর প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তবে এরাজ্যের নানান অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সময়, কিছু কিছু বাঁধ সে দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতা এবং তার সহজাত বুদ্ধিটুকুই সম্বল। কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে, সে সব শুধরে ধীরে ধীরে বাঁধ গড়ে উঠছে। এই কাজে সে কয়েকজন বয়স্ক অভিজ্ঞ কৃষকেরও সাহায্য নিচ্ছে। বাঁধের জল ব্যবহার করে সংলগ্ন জমিতে কী ধরনের চাষ করা সম্ভব – সে কথা তাঁদের থেকে ভাল আর কে বলতে পারবে? তাঁদের অনেকেরই মত, এই মাটিতে বাদাম এবং তুলোর চাষ হওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত জল পেলে, এবং বীজ পেলে তাঁরা এই জমিগুলি চাষ করতে আগ্রহী। ভল্লা তার পরিকল্পনার সাফল্যে কিছুটা স্বস্তি পেল। কিন্তু শস্য বীজ কিনতে অর্থের প্রয়োজন, সে ব্যবস্থাও যে তাকেই করতে হবে।            

 সারাদিন নানান কাজের মধ্যে পথচলা নানান মানুষের সঙ্গে ভল্লার পরিচয় হয়, আলাপ হয়। তাদের মধ্যে আছে কিছু বণিক। প্রতিবেশী রাজ্য থেকে নানান পসরা নিয়ে এরাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার গ্রাম ও ছোট ছোট শহরে তারা বিপণণ করে। আবার এই রাজ্য থেকেও বিচিত্র পসরা সংগ্রহ করে, পাশের রাজ্যে নিয়ে যায়। এরকমই একদিন এক সম্পন্ন বণিকের সঙ্গে ভল্লার পরিচয় ল, তার নাম অহিদত্ত।

বণিক অহিদত্ত প্রতিবেশী রাজ্যের বাসিন্দা হলেও, এ রাজ্যেও তাঁর প্রতিপত্তি, চেনা-পরিচিতি কম নয়। এমনকি এ রাজ্যের রাজধানীর বণিক মহলেও তাঁর বিস্তর জানাশোনা। প্রথম পরিচয়েই অহিদত্ত ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আচ্ছা, আপনিই সেই ভল্লা? আশেপাশের গ্রামের লোকজনের মুখে ইদানীং আপনার নামটা অনেকবারই শুনেছি। এমনকি আমাদের দিকেও কানে এসেছে।

আমি কয়েকদিন আগেই আপনাদের রাজধানী গিয়েছিলাম। আজ সেখান থেকেই ফিরছি। সেখানে আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আপনার সব কথা শুনেছি। সকলে তো ছ্যা-ছ্যা করছে, মশাই। আপনাদের মহারাজা মহাশ্বকে আমরা খুবই প্রাজ্ঞ বিচক্ষণ রাজা বলেই জানি। তাঁর রাজ্যে প্রজাদের সুখে-শান্তিতেই বাস করতে দেখেছি। তাঁর মতো রাজা কিনা চরিত্রহীন শ্যালককে এতটা মাথায় তুলছেন? আর আপনাকে দিলেন নির্বাসন দণ্ড? আপনি তো রাজধানীতে বিখ্যাত মানুষ, ভল্লামশাইওদিকের সাধারণ লোক আপনাকে ধন্যি ধন্যি করছে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “বিখ্যাত হয়ে কী লাভ, বণিকমশাই? কী অবস্থায় আমি এখানে এসেছিলাম, এই গ্রামের লোক সবাই জানেন। আমাকে আশ্রয় দিয়ে, সেবা করে সুস্থ করেছেন গ্রামপ্রধানমশাই আর তাঁর বউ, আমার কমলিমা। নির্বাসন দণ্ড পেয়ে এখনও আমি রাজ্যের বাইরে কেন যাইনি, এর জন্যে আমাকে যেমন অনেক দুর্গতি সইতে হবে, ওঁদেরও পোয়াতে হবে অনেক অপমান”।

বণিক অহিদত্ত কিছু বললেন না, গভীর বিরক্তিতে মাথা নাড়লেন। ভল্লা আবার বলল, “রাজ্যের বাইরে আমাকে যেতে তো হবেই,  দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাবো। কিন্তু ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে এই গ্রামের জন্যে কিছু করে যাব। আপনি তো জানেন এই গ্রামে চাষ-বাস তেমন কিছু হয় না, সম্বৎসরের অন্নসংস্থানটুকুও হয় কি না হয়। গ্রামের মানুষদের নিয়ে, সামান্য একটা সেচ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এক লপ্তে বেশ কিছু জমির জন্যে জলের ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। গ্রামের মানুষ পরীক্ষামূলক চাষ করতেও উৎসাহী। কিন্তু শস্যবীজ? সেটুকু কেনার সামর্থ্যও এ গ্রামের মানুষের নেই”।  

বণিক অহিদত্ত আশ্চর্য হলেন, বললেন, “শুনেছি আপনি অত্যন্ত সুদক্ষ ও বিশ্বাসী রাজরক্ষী, আপনার এই বিদ্যাও জানা আছে নাকি? আপনার পরীক্ষামূলক চাষের জন্যে কিসের বীজ দরকার?”

ভল্লা বলল, “বাদাম আর তুলো”।

অহিদত্ত বললেন, “আমাদের রাজ্যের এদিকেও  চিনাবাদাম আর তুলোর চাষ প্রচলিত। কত বীজ লাগবে? এক মণ করে পাঠালে হয়ে যাবে?”

ভল্লা অভিভূত হয়ে বলল, “তাহলে তো খুবই উপকার হয় বণিকমশাই। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার এই ঋণ অচিরেই শোধ করে দিতে পারব”।

“শোধের কথা পরে আলোচনা করা যাবে। আমি তিন-চারদিনের মধ্যেই আপনার কাছে দুরকমের বীজ পাঠিয়ে দেব”।

“আমার কাছে নয়, এই গ্রামের প্রধানের কাছে পাঠাবেন। তিনিই যথাযথ বিলি ব্যবস্থা করে দেবেন”।

ঠিক আছে। কিন্তু রাজ্যের বাইরে আপনি যাবেন কোথায়?”

সীমানার বাইরে পাশের জঙ্গলে থাকব। কাঠের পাটার ওপর মাটি লেপে দেওয়াল তুলেছি, আর ঘন পাতা বিছিয়ে ছেয়ে নিয়েছি চাল – ব্যস্‌ বাসা হয়ে গেছে। হয়তো কাল বা পরশু আমি চলে যাব”।

বণিক অহিদত্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনাকে আমাদের রাজ্যে যাওয়ার কথা বলতে পারতাম, কিন্তু আপনার বাসের পক্ষে মিত্ররাজ্যও নিরাপদ নয়। যাই হোক, এ গ্রামের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক একপ্রকার বাঁধা হয়ে গেছে। অতএব সীমানার বাইরে গেলেও আপনার যোগাযোগ থাকবে, বুঝতে পারছি। কিন্তু জঙ্গলে যে থাকবেন খাবেন কী”? তারপর একটু হেসে বললেন, “যাগ্‌গে, সে চিন্তা আমাদের – আপনার নয়। কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেব, আর আমিও আপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব। আজ চলি, অনেকদিন প্রবাসে কাটিয়ে আজ বাড়ি ফিরছি... আবার দেখা হবে, নমস্কার”।

ভল্লাও প্রতিনমস্কার করল। অহিদত্ত গোশকটে উঠে সঙ্গী লোকজনদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন সীমান্তের দিকে।

ভল্লার দলের ছোকরারা সকলেই তার আশেপাশে ছিল, এতক্ষণ শুনছিল ওদের দুজনার কথা। বণিক অহিদত্তের কথায়, ভল্লা এখন তাদের কাছে নায়ক হয়ে উঠল। এ বার্তা অচিরেই পৌঁছে যাবে এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামগুলিতে – এমনকি প্রতিবেশী রাজ্যের সংলগ্ন গ্রামগুলিতেও। যে উদ্দেশে ভল্লার এখানে আসা, এই প্রচার তার সুবিধেই করে দিল।                       

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭ "


বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১২শ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

  


এর আগের একাদশ অধ্যায়ঃ বিশ্বরূপদর্শনযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ১১শ পর্ব"


আগের দুটি পর্বে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয়সখা অর্জুনকে নিজের ঐশ্বর্য ও বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে নিজের সম্যক পরিচয় তুলে ধরলেন। অর্জুনও সখা শ্রীকৃষ্ণের অপার্থিব মহিমা জেনে যথাক্রমে রোমাঞ্চিত ও ভীত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এখন মানসিক স্থিতাবস্থা ফিরে পেয়ে - অর্জুন আবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এত দিনে তোমাকে ঠিকঠাক জানলাম, কিন্তু একটা কথা সহজ করে বলতো, তোমাকে যাঁরা ভক্তি করেন আর যাঁরা তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানে উপাসনা করেন - তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে?"       

দ্বাদশ অধ্যায়ঃ ভক্তিযোগ


অর্জুন উবাচ

এবং সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।

যে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।

অর্জুন উবাচ

এবং সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।

যে চ অপি অক্ষরম্‌ অব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।

অর্জুন বললেন- এইভাবে যে সকল ভক্ত সর্বদা আপনার চিন্তায় মগ্ন থেকে আপনার উপাসনা করেন, আর যাঁরা ইন্দ্রিয়ের অতীত অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, এই দুইয়ের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ যোগী?

 

শ্রীভগবানুবাচ

ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।

শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।

শ্রীভগবান উবাচ

ময়ি আবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।

শ্রদ্ধয়া পরয়া উপেতাঃ তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন – আমাতে মন সমর্পণ ক’রে, আমাকে সর্বদা চিন্তা ক’রে, পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে যিনি আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী।

 

৩,৪

যে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যমব্যক্তং পর্যুপাসতে।

সর্বত্রগমচিন্ত্যঞ্চ কূটস্থমচলং ধ্রুবম্‌।।

সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।

তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।

যেতু অক্ষরম্‌ অনির্দেশ্যম্‌ অব্যক্তং পর্যুপাসতে।

সর্বত্রগম্‌ অচিন্ত্যং চ কূটস্থম্‌ অচলং ধ্রুবম্‌।।

সংনিয়ম্য ইন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।

তে প্রাপ্নুবন্তি মাম্‌ এব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।

কিন্তু সর্ব অবস্থায় যিনি সমবুদ্ধি, সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত ক’রে, ইন্দ্রিয়সমূহের অতীত, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, সমস্ত মোহ-মায়ার ঊর্ধ্বে অচিন্ত্য, অচল, শাশ্বত নির্গুণ ব্রহ্মের যিনি উপাসনা করেন, তিনিও আমাকেই লাভ করে থাকেন।

  

ক্লেশোঽধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্‌।

অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহদ্ভিরবাপ্যতে।।

ক্লেশঃ অধিকতরঃ তেষাম্‌ অব্যক্ত-আসক্ত-চেতসাম্‌।

অব্যক্তা হি গতিঃ দুঃখং দেহবদ্ভিঃ অবাপ্যতে।।

তবে নির্গুণ ব্রহ্মে যাঁরা মন সমর্পণ করেছেন, তাঁদের সিদ্ধিলাভের জন্যে অনেক বেশী কষ্ট সহ্য করতে হয়। কারণ দেহের অভিমান ত্যাগ করে নির্গুণ ব্রহ্মে একনিষ্ঠ চিত্ত সংযোগ বিশেষ কষ্টকর।

 

৬,৭

যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।

অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।

তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।

ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্‌।।

যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।

অনন্যেন এব যোগেন মাং ধ্যায়ন্তঃ উপাসতে।।

তেষাম্‌ অহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।

ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময়ি আবেশিত-চেতসাম্‌।।

হে পার্থ, কিন্তু যাঁরা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ ক’রে, আমার একান্ত অনুরক্ত হয়ে, একনিষ্ঠ যোগসাধনায় আমার ধ্যান করেন ও আমার উপাসনা করেন, আমার সেই একনিষ্ঠ ভক্তগণকে আমি এই মৃত্যুময় সংসার সাগর থেকে অল্প সময়েই উদ্ধার করে থাকি।

 

ময্যেব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।

নিবসিষ্যসি ময্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।

ময়ি এব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।

নিবসিষ্যসি ময়ি এব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।

যদি আমাতেই মন স্থাপনা করো, আমাতেই যদি বুদ্ধি নিবিষ্ট করো, তবে জীবনের অন্তে তুমি যে আমাতেই আশ্রয় লাভ করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

 

অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্‌।

অভ্যাসযোগেন ততো মামিচ্ছাপ্তুং ধনঞ্জয়।।

অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্‌।

অভ্যাসযোগেন ততঃ মাম্‌ ইচ্ছ আপ্তুং ধনঞ্জয়।।

হে ধনঞ্জয়, যদি তুমি তোমার মন আমাতে স্থিরভাবে নিবেশ করতে সমর্থ না হও, তাহলে তুমি অভ্যাসযোগ সাধনায় আমাকে লাভ করার চেষ্টা করো।

  

১০

অভ্যাসেঽপ্যসমর্থোঽসি মৎকর্মপরমো ভব।

মদর্থমপি কর্মাণি কুর্বন্‌ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি।।

অভ্যাসে অপি অসমর্থঃ অসি মৎকর্মপরমঃ ভব।

মৎ-অর্থম্‌ অপি কর্মাণি কুর্বন্‌ সিদ্ধিম্‌ অবাপ্স্যসি।।

যদি অভ্যাস যোগেও আমাকে লাভ করতে ব্যর্থ হও, তাহলে তুমি আমার কর্মপরায়ণ হও। আমার জন্যে কর্ম করতে করতেই তুমি পরম মোক্ষ লাভ করতে পারবে।

 

১১

অথৈতদপ্যশক্তোঽসি কর্তুং মদ্‌যোগমাশ্রিতঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং ততঃ কুরু যতাত্মবান্‌।।

অথ এতৎ অপি অশক্তঃ অসি কর্তুং মৎ-যোগম্‌ আশ্রিতঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং ততঃ কুরু যত-আত্মবান্‌।।

আর যদি কর্মপরায়ণ হতেও সমর্থ না হও, তাহলে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, একমাত্র আমার শরণাপন্ন হয়ে, সমস্ত কর্ম থেকে ফলের প্রত্যাশা তাগ করো।

 

১২

শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্‌জ্ঞানাদ্‌ধ্যানং বিশিষ্যতে।

ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্‌।

শ্রেয়ঃ হি জ্ঞানম্‌ অভ্যাসাৎ জ্ঞানাৎ ধ্যানং বিশিষ্যতে।

ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগঃ ত্যাগাৎ শান্তিঃ অনন্তরম্‌।

অভ্যাস যোগের থেকে জ্ঞানযোগ শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানযোগের থেকে ধ্যানযোগ এবং ধ্যানযোগের থেকেও কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কারণ ত্যাগ থেকেই পরম শান্তি লাভ করা যায়।

 

১৩,১৪

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ।

নির্মমো নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।

ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণঃ এব চ।

নির্মমঃ নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যত-আত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।

ময়ি অর্পিত-মনঃ-বুদ্ধিঃ যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

সর্বভূতের প্রতি যে ব্যক্তির মনে কোন বিদ্বেষ নেই, সকলের প্রতি যিনি বন্ধুভাবাপন্ন ও করুণাময়, অথচ মমত্ববোধহীন নির্বিকার; যাঁর মনে অহংকার নেই, সুখ ও দুঃখে যাঁর একই অনুভব এবং ক্ষমাশীলযিনি মনে সর্বদাই সন্তোষ অনুভব করেন, যিনি একনিষ্ঠ চিত্তে, সংযত ইন্দ্রিয়ে এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে সর্বদা আমাতেই মন ও বুদ্ধি সমর্পণ করেন, তিনিই আমার প্রিয় ভক্ত।

 

১৫

যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ।

হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।

যস্মাৎ নঃ উদ্বিজতে লোকঃ লোকাৎ ন উদ্বিজতে চ যঃ।

হর্ষ-অমর্ষ-ভয়-উদ্বেগৈঃ মুক্তঃ যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।

যে ব্যক্তি অন্য কারো উদ্বেগের কারণ হন না এবং নিজেও কোন কারণেই উদ্বিগ্ন হন না। সকল আনন্দ, অমর্ষ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে মুক্ত যাঁর মন, তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয়। [অভিলাষের বস্তু না পাওয়ার যে দুঃখ, তাকেই বলে অমর্ষ।]

 

১৬

অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ।

সর্বারম্ভপরিত্যাগী যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

অনপেক্ষঃ শুচিঃ-দক্ষঃ উদাসীনঃ গতব্যথঃ।

সর্ব-আরম্ভ-পরিত্যাগী যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

সকল বস্তুতেই যিনি নিস্পৃহ ও নির্বিকার, যাঁর অন্তর ও দেহ শুদ্ধ, যিনি নিরলস দক্ষ, যিনি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়, যিনি সকল ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করেন, তিনিই আমার অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত।  

 

১৭

যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্‌ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।

যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

শুভা-অশুভ-পরিত্যাগী ভক্তিমান্‌ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।

যিনি সাফল্যে উৎফুল্ল হন না, ব্যর্থতায় বিদ্বেষ করেন না, যিনি শোক করেন না, কোন বস্তু কামনা করেন না, শুভাশুভ সকল বিষয়ই যিনি ত্যাগ করতে পেরেছেন, সেই রকম ভক্তই আমার প্রিয়।

  

১৮,১৯

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।

শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ।।


তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ।

অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্‌ মে প্রিয়ো নরঃ।।

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মান-অপমানয়োঃ।

শীত-উষ্ণ-সুখ-দুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ।।

তুল্য-নিন্দা-স্তুতিঃ-মৌনী সন্তুষ্টঃ যেন কেনচিৎ।

অনিকেতঃ স্থিরমতিঃ-ভক্তিমান্‌ মে প্রিয়ঃ নরঃ।।

শত্রু ও মিত্রকে যিনি সমান ভাবেন; সম্মান-অপমান, শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখে যাঁর সমান অনুভব, নিন্দা এবং স্তুতিতে যাঁর সমচিন্তা; যিনি কম কথা বলেন, খুব অল্পে সন্তুষ্ট থাকেন, স্থায়ী বাসস্থানহীন কিন্তু স্থিরবুদ্ধি সেই ভক্তিমান ব্যক্তিই আমার বিশেষ প্রিয়।

    

২০

যে তু ধর্মামৃতমিদং যথোক্তং পর্যুপাসতে।

শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাস্তেঽতীব মে প্রিয়াঃ।।

যে তু ধর্ম-অমৃতম্‌ ইদং যথা উক্তং পর্যুপাসতে।

শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাঃ তে অতীব মে প্রিয়াঃ।।

আমাতে নিবেদিত প্রাণ যে ভক্ত, একনিষ্ঠ শ্রদ্ধায় আমার বলা এই অমৃতরূপ ধর্মতত্ত্বের সাধনা করেন, তাঁরা সকলেই আমার অত্যন্ত প্রিয়।

  

ভক্তিযোগ সমাপ্ত

  এর পরের ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ পাশের সূত্রে - " গীতা - ১৩শ পর্ব

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...